অঙ্গগুলির সংক্রমণ বা উত্তরণগত অবস্থাসমূহ বিচার-বিবেচনা করে, এক কাজ থেকে অন্য কাজে রূপান্তরের সম্ভাবনা মনে রাখার পক্ষে এটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে আমি আর একটি উদাহরণ দেব। প্রেডানকুলেটেড বা পদযুক্ত সিরিপেডদের চর্মে দুটি সূক্ষ্ম ভাঁজ থাকে, যাকে আমি ওভিজেরাস ফ্রেনা বলি, এবং যা নিঃসৃত আঠালো রস দ্বারা ততক্ষণ পর্যন্ত ডিমগুলিকে ধরে রাখে যতক্ষণ পর্যন্ত না থলির মধ্যে এগুলি ফুটে বাচ্চা হয়। এই সিরিপেডদের কোন ফুলকা নেই, ছোট ফ্রেনাটি সমেত শরীরের এবং থলির সমগ্র পৃষ্ঠ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে, ব্যালানিডা অথবা অনড় বা। পদহীন সিরিপেডদের কোন ওভিজেরাস ফ্রেনা নেই, সুবেষ্টিত খোলকের মধ্যে, থলির নিচে ডিমগুলি মুক্তভাবে থাকে; ফ্রেনার মত একই আপেক্ষিক অবস্থানে এদের অনেক ভাঁজ সম্বলিত ঝিল্লি থাকে, যা থলি ও শরীরের সংবহনশীল ল্যাকুনার (ফাঁক বা গহ্বর) সঙ্গে স্বাধীনভাবে সংযোগ রক্ষা করে এবং যাকে সমস্ত প্রকৃতিবিদরা ফুলকা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আমি মনে করি কেউ এমন তর্ক করবেন না যে একটি গোত্রের ওভিজেরাস ফ্রেনা অন্য গোত্রের ফুলকার সঙ্গে সমপ্রস্থ; প্রকৃতপক্ষে এরা ক্রমে ক্রমে পরস্পরে রূপান্তরিত হয়। অতএব সন্দেহ করা উচিত নয় যে চামড়ার দুটি ছোট্ট ভাঁজ, যা প্রথমে ওভিজেরাস ফ্রেনা হিসাবে কাজ করেছে, কিন্তু যা এরূপে শ্বাসপ্রশ্বাসে অল্প সাহায্য করেছে, সোজাভাবে এর আকার বৃদ্ধি ও এদের আঠালো লালাগ্রন্থির বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা ক্রমশ ফুলকাতে রূপান্তরিত হয়েছে। যদি সমস্ত পেডানকুলেটেড বা পদযুক্ত সিরিপেডরা বিলুপ্ত হত এবং সেসাইল অথবা পদহীন বা অনড় সিরিপেডদের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণে লুপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকত, কেউ কি কখনও কল্পনা করবে যে এই পরবর্তী গোত্রের ফুলকারা থলি থেকে ডিমগুলি বের হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করার অঙ্গ হিসেবে পূর্বেই অবস্থিত ছিল?
প্রজননকালের ত্বরণ বা মন্দনের মাধ্যমে সংক্রমণ বা উত্তরণের আরও একটি, সম্ভবপর প্রণালী রয়েছে। ইউনাইটেড স্টেটস-এর অধ্যাপক কোপ এবং অন্যরা সম্প্রতি এটি জোরের সঙ্গে বলেছেন। এটি জানা গেছে যে নিখুঁত বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জিত হবার পূর্বে কতিপয় প্রাণী অতি প্রাথমিক বয়সে প্রজনন-ক্ষমতার অধিকারী হয়; এবং এই ক্ষমতা যদি একটি প্রজাতিতে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়, তাহলে এটি সম্ভবপর যে বিকাশের বয়স্ক দশায় একদিন না একদিন তা অন্তর্হিত হবে; এবং এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লার্ভাটি যদি পূর্ণবয়স্ক আকারটির থেকে বেশি পৃথক হয়, তাহলে প্রজাতির বৈশিষ্ট্য বিরাটভাবে পরিবর্তিত হবে ও হ্রাস পাবে। আবার, বহু সংখ্যক প্রাণী পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর তাদের প্রায় সমগ্র জীবনকালব্যাপী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন, স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে করোটির আকার প্রায়শই বেশি বেশি করে পরিবর্তিত হয়। এ বিষয়ে ডঃ মুরি শীল প্রাণীদের সম্বন্ধে চমৎকার কিছু উদাহরণ দিয়েছেন। প্রত্যেকেই জানেন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে পুরুষ হরিণদের শিংগুলি বেশি বেশি করে শাখায় বিভক্ত হয় এবং কোন কোন পাখির পালকগুলি আরও সূক্ষ্মভাবে বিকশিত হয়। অধ্যাপক কোপ বলেন যে কোন কোন লিজার্ডদের। (সরীসৃপ) দাঁতগুলি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকারে অতিশয় পরিবর্তিত হয়; ফ্রিজ মুলার লিপিবদ্ধ করেছেন যে অনেক ক্রাস্টেসিয়া বা খোলকী প্রাণী পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর, শুধুমাত্র তুচ্ছ অঙ্গের নয়, বরং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেরও নূতন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে, যদি প্রজননকালের বয়স হ্রাস পায়, প্রজাতির বৈশিষ্ট্যটি, অন্ততঃ তার পূর্ণবয়সাবস্থায়, রূপান্তরিত হবে; অথবা এমনটাও অসম্ভব নয় যে বিকাশের পূর্বে ও প্রাথমিক ধাপগুলি কয়েকটি ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত হবে এবং অবশেষে লুপ্ত হবে। সংক্রমণের বা উত্তরণের এই কিছুটা আকস্মিক প্রণালীর মাধ্যমে প্রজাতিগুলি প্রায়শই অথবা কখনও রূপান্তরিত হয়েছে কিনা, এ সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা নেই। কিন্তু যদি তা ঘটে থাকে, তাহলে এটি সম্ভব যে পূর্ণবয়স্ক ও তরুণদের মধ্যে এবং পূর্ণবয়স্ক ও প্রবীনদের মধ্যে পার্থক্যগুলি প্রাক্কালিক অবস্থায় ক্রমিক ধাপ দ্বারা অর্জিত হয়েছিল।
প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বটির বিশেষ প্রতিবন্ধকসমূহ
যে কোন অঙ্গ ধারাবাহিক, অল্প, সংক্রমণগত ধাপসমূহ দ্বারা সৃষ্ট হয়নি–এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যদিও আমরা অতিশয় সতর্ক হব, তথাপি সন্দেহাতীতভাবে প্রতিবন্ধকের গুরুতর ঘটনাগুলি ঘটে বা দৃষ্ট হয়ে থাকে।
সবচেয়ে গুরুতরগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে ক্লীব পতঙ্গদের সম্পর্কে, যাদের দেহগঠন পুরুষ অথবা উর্বর স্ত্রীদের থেকে প্রায়শই ভিন্নভাবে গঠিত হয়, এই বিষয়টি পরবর্তী অধ্যায়ে বিবেচিত হবে। মাছেদের বিদ্যুৎবাহী অঙ্গগুলি বিশেষ প্রতিবন্ধকের অন্য একটি ঘটনা উপস্থিত করে; কারণ এটি অনুমান করা অসম্ভব যে কোন্ কোন্ ধাপগুলি দ্বারা এইসব বিস্ময়কর অঙ্গ সৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু এটি বিস্ময়কর নয়, কারণ এর ব্যবহার কী তা আমরা এখনও জানি না। জিমনোটাস ও টর্পেডোতে এগুলি নিঃসন্দেহেই আত্মরক্ষার শক্তিশালী উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং সম্ভবতঃ শিকার ধরার জন্যও ব্যবহৃত হয়; তথাপি, ম্যাটেউসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এমন কি যখন প্রাণীটি বিশেষভাবে উত্তেজিত হয়, তখনও রে মাছের লেজে অনুরূপ একটি অঙ্গে অতি অল্প বিদ্যুৎ থাকে; এটি এতই অল্প যে উপরোক্ত উদ্দেশ্যের জন্য কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়। অধিকন্তু এইমাত্র উল্লিখিত অঙ্গটি ছাড়া, ডঃ আর. ম্যাকডোনেল দেখিয়েছেন যে রে মাছের মাথার কাছে আর একটি অঙ্গ থাকে যা বিদ্যুৎবাহী নয়, বরং যা টর্পেডো মাছে বিদ্যুৎ ব্যাটারীর প্রকৃত সমসংস্থ বলে মনে হয়। এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত যে এইসব অঙ্গ ও সাধারণ মাংসপেশীর মধ্যে আভ্যন্তরীণ গঠনে, স্নায়ুবিন্যাসে এবং বিভিন্ন বিকারক দ্বারা প্রক্রিয়াগত উপায়ে একটি ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। এটিও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা উচিত যে মাংসপেশীর সংকোচন ও তড়িৎ নির্গত হওয়া একই সঙ্গে ঘটে; ডঃ র্যাডক্লিফ জোরের সঙ্গে বলেন, “বিশ্রামের সময় টর্পেডো মাছের বৈদ্যুতিক অঙ্গে মাংসপেশী ও স্নায়ুতে বিশ্রামের সময় যে রকম বিদ্যুৎপ্রবাহ থাকে সেই রকম বিদ্যুৎপ্রবাহ থাকে বলে মনে হয়, এবং টর্পেডো মাছের বিদ্যুৎপ্রবাহ, অদ্ভুত হওয়ার পরিবর্তে, প্রবাহের শুধুমাত্র অন্য একটি ধরনের হতে পারে যা মাংসপেশী ও মোটর নার্ভের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে এর বেশি ব্যাখ্যায় আমরা যেতে পারি না, কারণ এইসব অঙ্গের ব্যবহার সম্পর্কে আমরা অতি অল্প জানি, এবং যেহেতু বর্তমানের ইলেকট্রিক মাছদের পূর্বপুরুষদের স্বভাব এবং দেহগঠন সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না, সেহেতু এটি বলা নিতান্তই দুঃসাহসিক হবে যে কোন ব্যবহারযোগ্য সংক্রমণ বা উত্তরণ সম্ভবপর নয় যার দ্বারা এইসব অঙ্গগুলি ক্রমশ বিকশিত হয়ে থাকবে।
