গ্যেটে রচনাসমগ্র

আত্মজীবনী

আত্মজীবনী

প্রথম পরিচ্ছেদ

১৭৪৯ সালের ২৮শে আগস্ট দুপুরের ঘড়িতে ঠিক বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আমি এসেছিলাম এই পৃথিবীতে। এসেছিলাম ফ্রাঙ্কফোর্ট শহরের একটা ঘরে। আমার জন্মলগ্নে গ্রহনক্ষত্রের অবস্থিত এমন কিছু খারাপ ছিল না। সূর্য বা রবি ছিল কন্যা রাশিতে। বৃহস্পতি ও শুক্রের দৃষ্টি ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। বুধও বক্রী ছিল না। শনি ও মঙ্গল ছিল উদাসীন। আমার জন্মের উপর একমাত্র চন্দ্রের দৃষ্টি ছিল বক্রকুটিল, যে দৃষ্টির বক্রতা শোধরায়নি কখনও আমার সারা জীবনের মধ্যে।

আমরা থাকতাম আমার বাবার মার বাড়িতে। আমার ঠাকুরমাকে আজও মনে পড়ে আমার। উনি থাকতেন একতলায় পিছনের দিকে একটা বড় ঘরে। সুন্দর রোগা রোগা চেহারার এক মহিলা। সব সময় সাদা ফিটফাট পোশাক পরে থাকতেন। আমি আর আমার ছোট বোন প্রায়ই তাঁর চেয়ারের কাছে খেলা করতাম। অসুস্থ অবস্থায় তিনি বিছানায় শুয়ে থাকলেও আমরা তার বিছানায় উঠে খেলতাম। কিন্তু তিনি বিরক্ত হতেন না কখনও।

শৈশবের অনেক দুষ্টুমির মধ্যে একদিনের একটা দুষ্টুমির কথা মনে আছে। একবার একটা মাটির বাসনপত্রের এক মেলা বসে শহরের শেষপ্রান্তে। সেখান থেকে আমাদের রান্নাঘরের জন্য অনেক মাটির থালা ও নানারকমের পাত্র কেনা হয়। একদিন বিকালে বাড়িতে খেলার কিছু না পেয়ে একটা মাটির প্লেট রাস্তায় ছুঁড়ে দিই। মাটির পাত্রটা বাঁধানো রাস্তায় পড়ে খান খান হয়ে ভেঙে গেল। আমি আনন্দে হাততালি দিতে লাগলাম। আমার সে আনন্দে আমার এক প্রতিবেশীও আনন্দ পেলেন। আমি চিৎকার করে উঠলাম, আর একটা। সত্যি আর একটা মাটির পাত্র এনে এইভাবে ভাঙলাম। এইভাবে আমার প্রতিবেশী দর্শক ভন অকসেনস্টাইনকে খুশি করার জন্য একে একে সব মাটির পাত্রগুলো সেদিন ভেঙে ফেললাম আমি। সেদিন যেন শুধু ভাঙ্গার আনন্দে মত্ত ও আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম আমি।

আমাদের বাড়ির সামনের দিকে ছিল বড় রাস্তা আর পিছনের দিকে ছিল প্রতিবেশীদের বড় বাগান। বাড়ির তিনতলার ঘরটাকে বলা হতো বাগানবাড়ি। কারণ সে ঘরের প্রতিটি জানালার ধারে ধারে অনেক রকম লতা ও চারা গাছ টবের উপর সাজিয়ে রাখা হতো। আমি ছেলেবেলায় সেখানে বসে আমার পড়া তৈরি করতাম। আরও বড় হয়ে আমার কোনও খুশির ভাব এলেই আমাদের তিনতলার সেই বাগান ঘরটাতে চলে যেতাম। কিন্তু মনে কোনও বিষাদ জমলে সে ঘরে কখনও যেতাম না। জানালার ভিতর দিয়ে প্রসারিত আমার দৃষ্টিটা মাঝে মাঝে চলে যেত শহরের সীমানা ছাড়িয়ে এক সবুজ প্রান্তরে। আজ বেশ বুঝতে পারছি এই ঘরটাই আমার শিশুমনে প্রথম এনে দেয় নিভৃত চিন্তার প্রেরণা। আর কিছু অস্পষ্ট অব্যক্ত কামনার বাধাবন্ধহীন ব্যাকুলতা। আমি স্বভাবতই গভীরতাপ্রিয় এবং ভাবুক প্রকৃতির। এই ঘরে এলেই আমি যেন আমার সে প্রকৃতিকে খুঁজে পেতাম।

ছেলেবেলায় রাত্রিবেলাটা আমার ভারি খারাপ লাগত। ছায়া ছায়া বিষণ্ণতায় ভরা পুরনো আমলের বাড়িটা রাত্রির অন্ধকারে কেমন যেন ভয়ঙ্কর দেখাত। তার উপর তখনকার দিনে ছেলেদের ভয় জয় করতে শেখাবার জন্য রাত্রিবেলায় একা একা শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। আমার বাবা-মাও সেই ব্যবস্থা করেছিলেন আমার জন্য। এক একদিন একা ঘরে ভয় লাগতেই উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতাম। বাবা বকতেন। তখন মা ফন্দি আঁটেন। তখন পীচফল পাকার সময়। আমার মা বলেন যে কোনও ভয় না করে একা ঘরে ঘুমোতে পারবে তাকে পীচফল বেশি করে দেওয়া হবে রোজ। এইভাবে ফলের লোভে পুরস্কারের লোভে ভয় জয় করতে শিখেছিলাম আমরা।

কেন জানি না আমার বাবা ছিলেন রোমক সংস্কৃতির উপাসক। ইতালীয় ভাষা, ইতালীয় গান, ইতালীয় শিল্পকলা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অগাধ। আমাদের। বাড়ির একটা ঘর ভর্তি ছিল ইতালীয় ছবিতে। জিওতিনাৎসী নামে একজন প্রবীণ ইতালীয় সঙ্গীত শিক্ষক আসতেন আমাদের বাড়িতে। আমরা গান শিখতাম। আমার মা ক্লেভিকর্ড বাজাতে শিখতেন। বিয়ের পর মাকেও গান শিখাতে হয় বাবার জেদে পড়ে।

আমার ঠাকুরমা মারা যাবার পর বাড়িটা আমূল সংস্কার সাধন করলেন। পুরনো বাড়িটা ভেঙে তার জায়গায় গড়লেন নূতন ধাচের নূতন বাড়ি আর আমাদের পাঠালেন পাবলিক স্কুলে। আমি যেন নূতন এক জগতে এসে পড়লাম। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী থেকে আসা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে প্রথম মেলামেশা শুরু হলো আমার। আগের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনতার সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু আমার সবচেয়ে ভালো লাগত শ্যোন নদীর সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নদীর স্রোত আর মালবোঝাই নৌকার আনাগোনা দেখতে। নীচেকার নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেতুর উপর দিয়ে অবিরাম চলে যেত জলস্রোত। কৌতূহলী হয়ে আমি দুদিকেই তাকাতাম। মাঝে মাঝে ঘিঞ্জি বাজারের নোংরা পথ পার হয়ে রঙিন জলছবি কিনে আনতাম। আবার মাঝে মাঝে চলে যেতাম রোমার হিলে। তবে আর একটা জিনিস ভালো লাগত আমার। তা হলো উঁচু উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা পুরনো কালের দুর্গ, বড় বড় বাড়ি আর বাগান দেখতে। অদেখা অচেনা কুহেলিঘেরা অতীতের প্রতি কেমন যেন এক সকরুণ মমতা গড়ে উঠেছিল আমার মনে। কিছু কিছু রূপকথা আর ইতিবৃত্ত শুনে সে মমতা বেড়ে উঠেছিল। আমরা শুনেছিলাম শার্লেমেদের রূপকথা, শুনেছিলাম যেমন করে হ্যাঁপস রুডলফ তার বীরত্ব আর সাহসিকতার দ্বারা শান্তি এনেছিল অশান্তির মাঝে। চতুর্থ চার্লস ও স্বর্ণবলদের কথাও শুনেছিলাম আমরা।

আমার মন কিন্তু পুরোপুরি অতীতাশ্রয়ী ছিল না। মানবজীবনের বিচিত্র অবস্থা যথাযথভাবে দেখার একটা আগ্রহও ছোট থেকে গড়ে উঠেছিল আমার মনে। ধনীর প্রাসাদ থেকে শুরু করে গরিবের কুঁড়ে আর কলকারখানা সংলগ্ন শ্রমিকবস্তিগুলো ঘুরে মানবজীবনের যে সব ছবি আমি পেয়েছিলাম সে ছবির মধ্যে কোনো সৌন্দর্য ছিল না, কোনও গুরুত্বও ছিল না। তাছাড়া সে সৌন্দর্য বা গুরুত্ব আমি দেখতেও চাইনি। তবু বলব অকৃত্রিম অকপট স্বাভাবিকতায় ভরা সে ছবির একটা নিজস্ব গুরুত্ব, একটা অন্তর্নিহিত মূল্য ছিল আমার ক্রমোদভিন্ন ও ক্রমাত্মপ্রকাশমান শিশুমনের কাছে।

একদিন ঘুরতে ঘুরতে রাজবাড়ির বাইরে এক অভিষেক উৎসবে চোখে পড়ে আমার। ছেলেমানুষ বলে দারোয়ানরা দয়া করে আমাদের ভিতরে কিছুদূর ঢুকে দেখতে দেয়। এত জাঁকজমক ও ঐশ্বর্যের ঘনঘটা জীবনে কখনও দেখিনি। তারপর বাড়িতে লোকের মুখে শুনেছিলাম আর একটি অভিষেক উৎসবের কথা। সে অভিষেক হলো সপ্তম চার্লসের অভিষেক, যে অভিষেক উৎসবে উপস্থিত ছিলেন পরমাসুন্দরী সম্রাজ্ঞী মেরিয়া থেরেসা। সে উৎসবে যেমন সব পুরুষদের দৃষ্টি দুর্বার বেগে গিয়ে পড়েছিল মেরিয়া থেরেসার উপর তেমনি সব নারীদের দৃষ্টিও কেড়ে নিয়েছিল সর্বাঙ্গসুন্দর চার্লস এর দুটি অপরূপ ভাষা ভাষা নীল চোখ।

যে কোনও মেলা ও উৎসব দেখতে ভালো লাগত আমার। যেমন সেটি বার্থোলোমিউর মেলা আর পাইপার কোর্ট উৎসব। পাইপার কোর্ট উৎসব অনুষ্ঠিত হতো শহরের যত সব বড় বড় ব্যবসায়ীদের দ্বারা অতীতের একটি দিনের স্মৃতিরক্ষার্থে। এই দিনটিতে ব্যবসায়ীরা একযোগে এক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারি চাঁদা তোলার রীতির অবসান ঘটায়। সম্রাট তাদের দাবি মেনে নেন। এই উৎসব আমার খুব ভালো লাগত। কারণ আমাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তি-কলাপগুলোকে আমাদের চোখের সামনে যেন অবিকল মূর্ত করে তুলত। এ উৎসবে নিষ্প্রাণ অতীত হয়ে উঠত যেন রঙে রসে জীবন্ত।

আমাদের বাড়িটা নূতন হয়ে ওঠার পর যে জিনিসগুলো সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করত আমার তা হলো বাবার সংগৃহীত বই আর ছবি। বিভিন্ন ধরনের বই সংগ্রহ করার বাতিক ছিল বাবার। তার মধ্যে ছিল চিরায়ত লাতিন সাহিত্য, ইতালির কবিদের রচনা, ট্যানোর সমগ্র রচনা, আইনের বই, অভিধান আর বিজ্ঞান ও কলার বিশ্বকোষ। এছাড়া কিছু সমালোচনাগ্রন্থও ছিল। তবে প্রতি বছরই বাবা কিছু আইনের বই কিনতেন।

আগে আমাদের পুরনো বাড়িটার দোতলার ছায়ান্ধকার যে ঘরখানায় দামী ছবিগুলো সাজানো থাকত সে ঘরে মোটেই মানাত না ছবিগুলোকে। নূতন বাড়ির একটা চকচকে ঝকঝকে ঘরে যখন নূতন করে সাজানো হলো ছবিগুলো তখন তাদের। সৌন্দর্য যেন অনেকগুণে বেড়ে গেল আগের থেকে। বড় বড় ছবিগুলো সব ছিল কালো ফ্রেমে আঁটা। তবে চিত্রশিল্প সম্বন্ধে বাবার একটা বিশেষ নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তিনি বলতেন, বড় বড় শিল্পীর আঁকা পূরনো ছবি ভালো, কিন্তু বর্তমান কালের শিল্পীদের আঁকা ছবির উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বর্তমান কালের এই সব ছবিই একদিন কালোত্তীর্ণ মর্যাদা লাভ করে চলে যাবে অতীতের মধ্যে। বাবা বলতেন শিল্প-সাহিত্য বা যে কোনও বস্তুর ক্ষেত্রে অতীতের বলেই যে কোনও বস্তু ভালো হতে হবে তার কোনও মানে নেই।

এই নীতির বশবর্তী হয়েই বাবা হার্ত, ট্রটমান, বো, স্কিৎস প্রভৃতি ফ্রাঙ্কফোর্টের নামকরা শিল্পীদের বাড়িতে এনে ছবি আঁকাতেন। তাই দিয়ে ঘর সাজাতেন।

কিন্তু একবার একটি অসাধারণ ঘটনা আমার মনের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়। আমার শান্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। ১৭৫৫ সালের ১লা নভেম্বর তারিখে লিসবন শহরে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে যে ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ড ঘটে যায় শহরে তা কল্পনাতীত আর তার খবর এক ব্যাপক সন্ত্রাসের সৃষ্টি করে সারা ইউরোপের মধ্যে। এই ঘটনায় ষাট হাজার লোক নিহত হয়। অসংখ্য বাড়িঘর, চার্চ, অফিস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। চারদিকে ফেটে যাওয়া মাটির ভিতর থেকে ধোঁয়া ও আগুন বার হতে থাকে। অসংখ্য উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গ ফেনায়িত করাল মুখ মেলে এগিয়ে আসে সর্বগ্রাসী। ক্ষুধায় এবং রাজপ্রাসাদের একটি বড় অংশ গ্রাস করে ফেলে। এই ভূকম্পন আরও অনেক জায়গায় অনুভূত হয়। এই ভয়াবহ ঘটনার পূর্ণ বিবরণ শুনে ধার্মিক দার্শনিক বিজ্ঞানী প্রভৃতি সকল শ্রেণীর মানুষই ভয় পেয়ে যায়। পণ্ডিতরা এ ঘটনার কোনও ব্যাখ্যাই করতে পারে না। আমার বালকমনেও এক দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এ ঘটনা। আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। যে ঈশ্বরকে কেন ধর্মশাস্ত্রের প্রথমেই বিশ্বের পরম স্রষ্টা, সংরক্ষক ও পিতা হিসাবে দেখানো হয়েছে। যিনি মানুষের ভালোমন্দ কর্মের বিচার করে পুরস্কার বা শাস্তির বিধান করে থাকেন সেই ঈশ্বর ভালোমন্দ এতগুলো মানুষকে কেন নির্বিচারে এই ব্যাপক ধ্বংসের কবলে ঠেলে দিলেন। আমি তো দূরের কথা, ধর্মতত্ত্বে অভিজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তিরাই এর কারণ খুঁজে পেলেন না অনেক চেষ্টা করেও।

ওল্ড টেস্টামেন্টে যে ক্রুদ্ধ দেবতার কথা লেখা আছে, পরের বছর গ্রীষ্মকালে একদিন সেই ক্রুদ্ধ দেবতার সাক্ষাৎ পেয়ে গেলাম হঠাৎ। তিনি আমাদের দেখা দিলেন মত্ত ঝড়ের বেগে। আমাদের বাড়ির পিছন দিকের বাগান থেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ এক প্রচণ্ড ঝড় ছুটে এল সহসা। লণ্ডভণ্ড করে দিল আমাদের বাড়ির সাজানো ঘরগুলোকে। অনেক জানালার কাঁচ ভেঙে দিল। সে ঝড়ের প্রচণ্ডতা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। ভয়ে। আমরা ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করে রেখেছিলাম। কিন্তু বাবা সেগুলো জোর করে খুলে। দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির জলে ভেসে যেতে লাগল ঘরগুলো। সত্যিই আমার বাবার মনটা ছিল শক্ত, খুব মজবুত। কোনও ঘটনার আঘাতেই সে মন ভাঙতে চাইত না। বাবা চাইতেন আমাদের মনও বাল্যকাল থেকে অমনি শক্ত ও মজবুত হয়ে গড়ে উঠবে। অমনি করে সব ভয় জয় করতে পারবে।

সেকালে শিক্ষাদীক্ষার আবহাওয়া ভালো ছিল না দেশে। শিক্ষাদানের নামে সর্বত্রই চলছিল আত্মম্ভরিতার প্রচার। আমার বাবা তাই আমার স্কুল জীবনেই বাড়িতেই নিজে আমাদের অনেক জিনিস পড়াতেন। তিনি বলতেন যিনি যে বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী তাঁর কাছ থেকে সেই বিষয় শিখতে হবে।

পড়াতে গিয়ে আমার সহজাত বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তির প্রশংসা করতে লাগলেন বাবা। আবার বোনকে বাবা যখন ইতালীয় ভাষা ও সাহিত্য পড়াতেন তখন আমি ঘরের এক কোণে বসে তা শুনে অনেক কিছু শিখে নিতাম। বাবা স্পষ্ট একদিন আমাকে বললেন, আমি যদি তোর মতো বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি পেতাম তাহলে আরও বড় হতাম জীবনে।

বাবা লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইনবিদ্যা পাশ করেন। বাবা বলতেন, তিনি জীবনে যা কিছু শিখেছেন প্রচুর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে শিখেছেন। অপরিসীম একাগ্রতা আর নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশুনা করে শিখেছেন। তাঁর সহজাত গুণ আর প্রতিভা বলে নাকি কিছু ছিল না।

আমার বাবা ও স্কুলের শিক্ষকরা যা পড়াতেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তা আয়ত্ত করে ফেলতাম আমি। কিন্তু একটা বিষয় আমার পড়তে ভালো লাগত না। তা হলো ব্যাকরণ। আমার মতে ব্যাকরণের নিয়মকানুনগুলো মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ সেগুলো ব্যতিক্রমে ভরা এবং সেগুলো ব্যাপক সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে শিখতে হয়। কোনও লেখার মধ্যে কিছু কিছু ব্যাকরণগত ত্রুটি থাকলেও ছন্দ, অলঙ্কার ও রচনালিখনে তাই তখনকার কোনও ছেলে পেরে উঠত না আমার সঙ্গে।

বাবা একদিন আমার বললেন আমার স্কুলের পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কলেজে যাব। তিনি আরও বললেন তাঁর মতো আমাকেও লিপজিগে গিয়ে শিখতে হবে আইনবিদ্যা। অন্যান্য পিতার মতো আমার পিতাও স্বভাবতই আশা করতেন তাঁর আরদ্ধ কাজকে আমি শেষ করব, তাঁর মনের কোণে জমে থাকা গোপন স্বপ্নকে সার্থক করে তুলব। তিনি বললেন, লিপজিগ ছাড়া আমাকে যেতে হবে ওয়েসলার, র‍্যাটিসবন এবং তারপর ইতালি। ইতালি থেকে আসার পথে যেতে হবে প্যারিসে। তার মতে ইতালি থেকে আসার পরে প্যারিস ছাড়া আর কোনো জায়গা ভালোই লাগবে না। কিন্তু কেন জানি বা বাবা আমাকে একটি জায়গায় যেতে নিষেধ করলেন। সে জায়গা হলো গর্টিনজেন। অথচ ঐ জায়গাটায় যাবার খুব ইচ্ছা ছিল, আশা ছিল।

ইতালি দেশটার প্রতি বাবার কেমন যেন একটা দুর্বলতা ছিল। সে দেশের নদী সমুদ্র, পাহাড়-প্রান্তর, বন-উপবন, ভাষা-সাহিত্য, শিল্প সব কিছুই যেন অনবদ্য, অতুলনীয় ছিল তাঁর কাছে। স্বভাবতই তিনি স্বল্পভাষী ও রাশভারি প্রকৃতির হলেও তিনি যখন আমার কাছে লেপনস শহরের বর্ণনা করতেন তখন কেমন যেন আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠত তাঁর নীরস অন্তর। তথাকথিত সেই ভূ-স্বর্গে সেই মুহূর্তে কল্পনার পাশা মেলে ছুটে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠত আমার বালকমন।

প্রতি রবিবার আমাদের এক সভা বসত। সভা মানে কবিতার আসর। আমরা কয়েকজন সহপাঠি মিলে একটি করে কবিতা লিখে আনতাম। আর তা একে একে পাঠ। করতাম। ছন্দ ও অলঙ্কারে আমার কিছু জ্ঞান হয়েছিল। তাই আমার কবিতায় ছন্দপতন বিশেষ ঘটত না। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, আমি যেমন আমার যে কোনও লেখায়। আনন্দ পাই তেমনি অন্য যেসব ছেলের ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কারে কোনও জ্ঞান নেই তারাও তেমনি আনন্দ পায় নিজেদের লেখায়। তারা প্রত্যেকেই মনে করে তাদের আপন আপন লেখা সবচেয়ে ভালো। কিন্তু একটা ঘটনায় আমি খুব ব্যথা পেলাম। আমাদের এক সহপাঠি বন্ধু তার শিক্ষকের কাছ থেকে কবিতা লিখে এনে বলত, সেটা তার লেখা। সে তার লেখার সঙ্গে আমার লেখার তুলনা করে অন্যায়ভাবে দাবি করত। আপন শ্রেষ্ঠত্বের। অবশেষে আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম হতাশ হয়ে। কিন্তু আর একটি ঘটনায় আমি আবার ফিরে পেলাম আমার হারিয়ে যাওয়া আশা আর উৎসাহ। একদিন আমাদের শিক্ষকরা আমাদের মতো যে সব ছেলেরা কবিতা লিখত তাদের নিয়ে এক কবিতা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করলেন। সেখানে কিন্তু আমার কবিতাই সাধারণভাবে সকলের প্রশংসা অর্জন করল।

সেকালে শিশুদের জন্য গ্রন্থাগার ছিল না। পাঠ্যপুস্তক আর বাইবেল ছাড়া অন্য কোনও বাইরের বই পড়তে পেতাম না আমরা। কিন্তু যে কোনও ভাবে হাতে একটা বই পেলাম আমি। বইটা খুব ভালো লেগে গেল আমার। বইটা হলো অভিদের ‘মেটামরফসিস’ বা রূপান্তর। এ বই-এর প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্র ছবির মতো ভাসতে লাগল আমার মনে। আমি অবসর পেলেই সে বই-এর ছত্রগুলো আবৃত্তি করে ফেলতাম।

এরপর আরও কয়েকটা বই পড়ার সৌভাগ্য হয় আমার। যেমন ফেনেলনের ‘টেলিমেকাস’, ড্যানিয়েল দিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো। ক্রুসো পড়ে মনে হলো ফসলেনবার্গ দ্বীপ কল্পনার সৃষ্টি নয় তা বাস্তবে আছে। আর একখানা বই আমাদের কল্পনাকে উদ্দীপিত করে তুলল। তা হলো লর্ড অ্যানসরের ভয়েজ রাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড। বাস্তব ঘটনা ও পরিবেশের সঙ্গে দেশীয় রূপকথার এমন অপূর্ণ মিলন আমি আর কোথাও দেখিনি।

ঐ সময় আমাদের শহরে ছেলেদের জন্য বেশ কিছু মধ্যযুগীয় রূপকথার বই বিক্রি হতে থাকে। তরুণ ছেলেমেয়েদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ঐ সব বই। এই সব বইয়ের মধ্যে ছিল ‘দি এমপারার অক্টেভিয়ান’, ‘দি ফেয়ার মেলুসিনা’, ‘দি ফোর সালয় অফ হাইম’, ‘দি ওয়ানডারিং জু’। সহজ ভাষায় লেখা এই সব বই পড়ে আমরা তার গল্পগুলো সহজেই বুঝতে পারতাম। অর্থাৎ এইভাবে দ্বিতীয়বার তাদের রস আস্বাদন করার সুযোগ পেলাম।

পড়াশুনোর আনন্দে বেশই বিভোর হয়ে ছিলাম আমি। কিন্তু বনভোজনের সময় হঠাৎ ঝড় এসে যেমন তার সব আনন্দ উপভোগ উড়িয়ে নিয়ে যায় মুহূর্তে তেমনি হঠাৎ অসুখ এসে ছিন্নভিন্ন করে দিল আমার সেই আনন্দকে। হঠাৎ একদিন জ্বর ও বসন্তরোগে আক্রান্ত হলাম আমি। বেশ কিছুদিন ভুগে যখন ভালো হলাম তখন দেখি। পড়াশুনার দিক দিয়ে পিছিয়ে গেছি আমি। কিন্তু সবচেয়ে সমস্যার সৃষ্টি করলেন আমার বাবা। অসুখের জন্য আমার পড়ার যে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতি পূরণের জন্য তিনি আমায় রোজ দ্বিগুণ পড়ার কাজ দিতে লাগলেন। আমার শরীর খুব দুর্বল। আমার খুবই কষ্ট হচ্ছিল সে পড়ার কাজ করতে। কিন্তু কোনও উপায় ছিল না।

দুঃখে যখনি অধৈর্য হয়ে পড়তাম আমি, অধৈর্যের পীড়নে যখন পীড়িত হতাম তখন নিজের মনকে নিজেই বোঝাতাম। তবে স্টইক সন্ন্যাসীদের কথা থেকে শেখা ও খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে পড়া ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা নামক গুণটিকে সেই বয়সেই আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম আমি। সেই গুণই আমাকে সান্ত্বনা দিত কোনও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে।

তবে বাবার এই শিক্ষাগত পীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মাঝে মাঝে আমরা ভাইবোনে চলে যেতাম আমাদের দিদিমার বাড়ি। আমাদের দিদিমা-দাদামশাই দুজনে যখনও জীবিত ছিলেন। তাঁদের বাড়িটা ছিল আমাদের শহরেই ফ্রেডবার্গ স্ট্রীটে। পুরনো দুর্গের মতো বাড়িটা আমার মোটেই ভালো লাগত না। ভালো লাগত শুধু বাড়ির পিছনের দিকের বিরাট বাগানটা। সে বাগানের একদিকে ছিল ফুলের গাছ আর অন্য একদিকে ছিল শাকসজি আর ফলের গাছ। এর মধ্যে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল জাম আর জামরুল গাছ। গেলেই আশ মিটিয়ে ফল পেড়ে খেতাম গাছ থেকে। আমার দাদামশাই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। কিন্তু রোজ কোর্ট থেকে এসেই খোন্তা নিয়ে বাগানবাড়িতে চলে যেতেন। মালী থাকা সত্ত্বেও নিজের হাতে ফুলগাছগুলোর যত্ন। নিতেন। সারা বাগানটা তদারক করে বেড়াতেন।

আর একটা কারণে আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতাম আমাদের দাদামশাইকে। সে কারণটি হলো এই যে তিনি ভবিষ্যতের সব কিছু বলে দিতে পারতেন। তিনি নাকি স্বপ্নে অনেক জিনিস আগে হতে জানতে পারতেন। একবার নিজের সম্বন্ধে এক ভবিষ্যদ্বাণী করেন দাদামশাই। তিনি দিদিমাকে বলেন, সরকারের আইনবিভাগের একটি পদ অল্পদিনের মধ্যেই শূন্য হবে আর সেই শূন্য পদে তিনিই অধিষ্ঠিত হবেন। কিছুদিন পর দেখা গেল সত্যিই এক ভদ্রলোক মারা গেলেন সেই বিভাগে আর তাঁকেই সরকার সেই পদে বসাল। দাদামশাই একমাত্র দিদিমার কাছে বলেন তিনি নাকি স্বপ্নে একথা জানতে পারেন। আর একটি মৃত্যুর কথাও আগেই বলে দেন তিনি।

আমি একবার দাদামশাই-এর বইখানা ওলটাতে ওলটাতে একটি খাতায় দেখি কি সব রহস্যময় কথা লেখা রয়েছে। আজ রাত্রিতে অমুকে আমার কাছে এসেছিল। অমুক ছাড়া সবাই চলে গেল। এইভাবে কারও নাম না করে তিনি অনেক কথা খাতায় লিখতেন। তার অর্থ আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।

আমার দুই মাসি ছিল। আমাদের শহরের মাঝেই দুজনের বিয়ে হয়েছিল দু জায়গায়। এক মাসির বাড়ি ছিল বাজারের কাছে ঘিঞ্জি জায়গায়। কিন্তু সে মাসি ছেলেবেলায় আমাদের বড় ভালোবাসত। শুধু আমাদের নয়, পাড়ার অনেক গরিব। ছেলেমেয়েদেরও সমানভাবে ভালোবাসত মাসি। তাদের গা পরিষ্কার করে দিত। চুল আঁচড়ে দিত। কোলে পিঠে করে খেলা করত তাদের সঙ্গে।

আমার এক মাসির বাড়িতে একটা ছোটখাটো গ্রন্থাগার ছিল। আমি একদিন। সেখানে হোমারের এক গদ্যানুবাদ দেখতে পাই। কিন্তু তাতে ট্রয় জয়ের পূর্ণ বিবরণ। পেলাম না। পেলাম শুধু বিকৃত রুচির কতকগুলি ছবি। ছবিগুলো দেখে তখন আনন্দ পেলেও এখন বুঝছি সেগুলি খুবই খারাপ ছবি। আমার মেসোমশাইকে কথাটা বলতে তিনি আমাকে ভার্জিল পড়ার কথা বললেন।

অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ধর্ম বিষয়েও আমাদের শিক্ষাদান করা হতো। কিন্তু তখনকার দিনের প্রোটেস্টান্ট ধর্ম আমাদের মনকে তৃপ্ত করতে পারেনি। সে ধর্মের কথা ছিল শুধু কতকগুলো নীরব নীতিশিক্ষার কথা যার সঙ্গে আমাদের হৃদয় ও উপলব্ধির কোনও সম্পর্ক ছিল না। এই জন্যই হয়ত ধর্মের ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছিল অনেক সম্প্রদায়, অনেক মত, অনেক পথ।

তবে আমি ধর্মের কথা বিভিন্নভাবে শুনেছিলাম তাতে আমার একটা কথা মনে হয়েছিল ঈশ্বর সম্বন্ধে। মনে হয়েছিল আমি ঈশ্বরকে খুঁজব প্রকৃতির মাঝে। আমি খুঁজব সেই ঈশ্বরকে যিনি একাধারে সারা বিশ্বের স্রষ্টা এবং পরিচালক, যে ঈশ্বরের মধ্যে নেই কোনও ক্রোধ বা রোষের প্রচণ্ডতা, আছে শুধু অফুরন্ত সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যের স্রোতই বিশ্বের সর্বত্র বিশেষ করে প্রকৃতির মাঝে খেলা করে চলেছে সর্বক্ষণ।

আমার মনে হয়েছিল যে ঈশ্বর প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং তিনি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে দিয়ে কাজ করে থাকেন সেই ঈশ্বর প্রকৃত ঈশ্বর। তবে এই ঈশ্বরকেই মানুষের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত করে তুলতে হবে। এই ঈশ্বরই মহাশূন্যে গ্রহনক্ষত্রের গতিপ্রকৃতি পরিচালনা করে থাকেন। তবে আমার এ কথাও মনে হয়েছিল যে এ ঈশ্বরের কোনও আকার নেই। এ ঈশ্বর অরূপ নিরাকার।

একদিন এই ঈশ্বরের উপাসনা করার জন্য ওল্ড টেস্টামেন্টের কায়দায় এক বেদী তৈরি করলাম। তার উপরে আগুন জ্বালাতে হবে। সেই আগুনের শিখা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের, ভগবানের প্রতি ভক্তের সুনিবিড় কামনার দ্যোতক হয়ে জ্বলতে থাকবে।

একদিন ভোর হতেই উঠে পড়লাম আমি। তখনও সূর্য উঠতে দেরি আছে। সূর্য ওঠার আগেই বেদীতে আগুন জ্বালব আমি। কিন্তু সুগন্ধি কাঠ কোথায়? একমাত্র সুগন্ধি ধূম পরিবৃত্ত অগ্নিই হতে পারে আমার অন্তরের প্রতিনিধি। অনেক কষ্টে আমি অবশেষে কিছু সুগন্ধি চন্দনকাঠ যোগাড় করে বেদীর উপর রেখে তাতে অগ্নিসংযোগ করলাম। আমার ধারণা আমি এইভাবে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাব। তখন সূর্য উঠেছে, কিন্তু চারদিকের বাড়িগুলোর আড়ালে সে সূর্যের মুখ দেখতে পেলাম না। যাই হোক, বেদীতে আগুন জ্বলতে লাগল। সুগন্ধি ধোঁয়া উঠতে লাগল যজ্ঞবেদী হতে। আর আমি চোখ বন্ধ করে একমনে ধ্যান করতে লাগলাম ঈশ্বরের।

চোখ বন্ধ করে একমনে ধ্যান করছিলাম। কিন্তু দেখতে পাইনি যজ্ঞবেদীর আগুন প্রবল হয়ে কখন বেদীর কাছে রাখা ফুল, পূজোর উপকরণ ও আরও কিছু জিনিসপত্র সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমার নিজের ঘরে এই পূজোর আয়োজন করেছিলাম আমি। হঠাৎ আমার ধ্যান ভেঙে গেল আমার। না ভাঙলে ঘরের সমস্ত জিনিস এবং এমনকি আমিও পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম।

তারপর এ কাজ আর আমি কখনও করিনি।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

আমার সাতটা বছর শান্তিতেই কেটেছিল। সারা দেশে তখন বিরাজ করত নিরঙ্কুশ শান্তি। কিন্তু সহসা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সেই অবিচ্ছিন্ন শান্তির ধারা। এল অশান্তি। এল যুদ্ধ। ১৭৫৬ সালের ২৮শে আগস্ট তারিখে বাধল অস্ট্রিয়ার সঙ্গে প্রুশিয়ার যুদ্ধ। প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিক ষাট হাজার সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেদিন। অস্ট্রিয়ার পাক্সলি শহরের উপর। রাজনৈতিক মতবাদের দিক থেকে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল আমাদের দেশের লোকেরা। একদল সমর্থন করতে লাগল প্রশিয়ার রাজা। ফ্রেডারিককে আর একদল সমর্থন করতে লাগল অস্ট্রিয়াকে।

আমাদের পরিবারের মধ্যেও দেখা দিল এক ফাটল। আমার দাদামশাই অস্ট্রিয়ার পক্ষ অবলম্বন করলেন অথচ আমার বাবা সম্রাট সপ্তম চার্লস কর্তৃক মনোনীত ইম্পিরিয়াল কাউন্সিল-এর সদস্য হিসাবে অবলম্বন করলেন ফ্রেডারিকের পক্ষ। ফলে রবিবার আর আমাদের দাদামশাই-এর কাছে যাওয়া হতো না। এমনকি মা নিষেধ করে। দিয়েছিলেন তাঁর নাম যেন কখনও উচ্চারণ না করি।

সুতরাং তখন আমার বালক মনেও পড়েছিল প্রুশিয়ার প্রভাব। প্রুশিয়ার হয়ে অনুভব করতাম জয়ের আনন্দ। কিন্তু আমার দাদামশাই-এর কথা মনে করে সেই আনন্দের মাঝেও অনুভব করতাম এক নিদারুণ বেদনা! সঙ্গে সঙ্গে লিসবনের সেই ভূমিকম্পের মতো এই যুদ্ধের ঘটনাটাও নতুন করে প্রচণ্ডভাবে কাঁপিয়ে দিল আমার ঈশ্বরবিশ্বাসের ভিত্তিভূমিটাকে। আমার কেবলি মনে হতো আমার দাদামশাই সব দিক দিয়ে একজন আদর্শ চরিত্রের মানুষ হয়েও কেন আজ রাজনৈতিক কারণে জনসাধারণের ও শহরের বহু বিশিষ্ট লোকের কাছ থেকে পাচ্ছেন দুঃসহ অবহেলা আর অপমান? এখানে কি ঈশ্বরের করার কিছু নেই? আর জনমতেরই বা সততা কোথায়? কোথায় তাদের ন্যায়বিচার? লোকে কি বলবে বলে ছোট থেকে আমাদের যে জনমতের জুজুর ভয় দেখানো হয় আসতে সে জনমত অর্থহীন।

যুদ্ধের সময় ছেলেদের বাইরে বার হতে দেওয়া হতো না। সারাদিনই আমাদের মতো ছেলেদের সবসময় থাকতে হতো বাড়ির ভিতর। তাই মাঝে মাঝে আমাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য পুতুলনাচের অনুষ্ঠান হতো। আমাদের বাড়িতে একবার পুতুলনাচ হয়েছিল আর তাতে পাড়ার ছেলেমেয়েদের প্রচুর ভিড় হয়েছিল।

মাঝে মাঝে রাত্রিবেলায় স্বপ্ন দেখতাম আমি আর সেই স্বপ্নের কথাগুলোকে গল্পের মতো করে বলতাম আমার খেলার সঙ্গী-সাথীদের কাছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমার কথা বিশ্বাস করত। কেউ আবার স্বপ্নের কথা অর্থাৎ বন, বাগানবাড়ি কোথায় আছে তা মিলিয়ে দেখবার চেষ্টা করত।

একদিনকার এমনি এক স্বপ্নের কথা মনে আছে আমার। একদিন রাত্রিতে আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আয়নার সামনে নূতন পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছি। তখনও আমার সাজসজ্জা শেষ হয়নি, এমন সময় এক সুদর্শন যুবক এসে হাসিমুখে দাঁড়াল আমার সামনে। আমি তাকে অভ্যর্থনা জানাতে সে বলল, তুমি জান আমি কে? আমি বললাম, তোমাকে দেখতে লাগছে ছবিতে দেখা বুধগ্রহের মতো। সে বলল, হ্যাঁ, আমি তাই। দেবতাদের এক বিশেষ অনুরোধে আমি এসেছি তোমার কাছে। তার হাতের উপর রাখা তিনটি আপেল দেখিয়ে সে তখন বলল, দেখতে পাচ্ছ এই আপেলগুলো? আমি ভালো করে দেখলাম তার হাতের তিনটি আপেল তিন রং-এর এবং সেগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। একটি আপেল লালচে, একটি সোনালী আর একটি সবুজাভ। আমি তখন হাত বাড়িয়ে আপেলগুলো নিতে গেলাম তার হাত থেকে। কিন্তু সে সরে গিয়ে বলল, এগুলো তোমার জন্যে নয়। তুমি এই আপেলগুলো শহরের তিনজন খুব সুন্দর যুবককে দেবে। তাহলে তারা তাদের পছন্দমতো সুন্দরী স্ত্রী খুঁজে পাবে। এই বলে আপেলগুলো আমার হাতে দিয়ে যুবকটি চলে গেল। আমি আপেলগুলো হাতে। নিয়ে দেখতে লাগলাম আশ্চর্য হয়ে। কিন্তু আপেলগুলো সহসা বড় হতে হতে মাঝারি আয়তনের তিনটি পুতুলের আকার ধারণ করে। তারা রূপান্তরিত হলো তিনটি নারী মূর্তিতে। তাদের শাড়ির রং ছিল ঠিক সেই আপেল তিনটির মতো। তাদের মধ্যে দুজন পালিয়ে গেল আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে। আর একজন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে তার পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে নাচতে লাগল। অনেকক্ষণ ধরে তার নাচ দেখতে লাগলাম। আমি ভাবলাম সে আমায় ধরা দেবে। তাই যেমন তাকে ধরতে গেলাম অমনি আমার মাথায় কে যেন জোর আঘাত দিল আর আমি পড়ে গেলাম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেলা হয়ে গিয়েছিল আমার।

স্টইক সন্ন্যাসীদের অনেক আত্মনিগ্রহের কথা শুনে আমিও নিজের উপর তা প্রয়োগ করতাম। এর মধ্যে একটি আত্মনিগ্রহ আমাদের শিখতে হলো শিক্ষকদের কাছ থেকে। সেটা হলো দৈহিক যন্ত্রণা সহ্য করতে শেখা। এই সহনশক্তি শিক্ষা দেওয়াই হলো বেশির ভাগ খেলাধূলার লক্ষ্য। আমাদের শিক্ষক আমাদের মুখে গায়ে ঘুষি মেরে যেতেন আর তাই চুপ করে আমাদের সহ্য করে যেতে হতো। কোনও কথা বলতে পেতাম না। এর থেকে আমরা ক্রোধ দমন করতে ও দৈহিক যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করতাম।

১৭৫৭ সালটা মোটের উপর শান্তিতে কেটে গেল। যে সব সংসারে রাজনৈতিক মতামতের জন্য ফাটল ধরেছিল সে সব সংসারেও অনেকটা শান্তি ফিরে এল। ফাটলের অনেকখানি পূরণ হলো। আমার বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না। দেশভ্রমণে বার হয়েছিলেন।

অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরলেন বাবা। ফিরে কি মনে হলো, আমাদের শহরের পৌর প্রতিষ্ঠানে এক অবৈতনিক প্রশাসকের পদ চাইলেন। কিন্তু তাঁর সে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে বড় ব্যথা পেলেন। যাই হোক, ঠিক এই সময় উফেনব্যাক নামে একজন নামকরা গাইয়ে আসেন আমাদের শহরে। আমাদের সকলের দৃষ্টি তখন চলে যায় সেই দিকে।

ব্যারন ভন বেকেন নামে একজন সামন্তের কথা আমার আজও মনে আছে তিনি বড় অদ্ভুত প্রকৃতির লোক ছিলেন। একবার শহরের বহু ভিখারীকে ডেকে তাদের প্রত্যেকের ছেঁড়া কাপড় আর কম্বল সব কেড়ে নিয়ে তাদের পোশাক বিতরণ করেন এবং এক ঘোষণা জারি করে বলে দেন, প্রতি সপ্তাহে তিনি তাঁর বাড়িতে ভিখারীদের কিছু দান করবেন। কিন্তু যারা এই দান নিতে চায় তাদের প্রত্যেকে ফর্সা জামাকাপড় পরে আসতে হবে। তিনি যেমন সমাজের অভিজাত শ্রেণীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন তেমনি নিঃস্ব গরিব ও ভিখারীদের খাওয়াতেও ভালোবাসতেন।

এরপর মনে পড়ে আমার ডাক্তার ওর্থের কথা। তিনি ধনী ঘরের সন্তান হয়েও প্রচুর পড়াশুনা করেন। জ্ঞানের গভীরতা, পাণ্ডিত্য, প্রশাসনিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনও সরকারি পদ গ্রহণ করেননি। তিনি রিফরমেশান অফ ফ্যাঙ্কফোর্ট’ নামে একখানি বই লেখেন এবং তা প্রকাশ করেন। আমি যৌবনে বইখানি পড়েছিলাম। বইখানির ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। জন মাইকেল ভন লোরেন নামে আর একজন লেখকের কথা মনে আছে। তিনি কাউন্ট অর রিভেয়া’ ও ‘দি টু রিলিজিয়ন’ নামে দুখানি বই লিখে বেশ নাম করেন। প্রথম বইখানি শিক্ষামূলক রোমান্স। তাতে অভিজাত সমাজের জন্য বেশ কিছু নীতিশিক্ষার কথা ছিল। আর দ্বিতীয় বইখানি ধর্ম বিষয়ে বিতর্কে ভরা। এই বই পড়ে অনেক ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে নেমে যান। এর ফলে রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের দৃষ্টি পড়ে তার উপর এবং তাঁকে লিনজেনের সভাপতির পদ দান করেন।

আমাদের প্রতিবেশী ভন অকসেনস্টাইনের নাম আগেই করেছি। তার তিনটি ছেলে ছিল। এই পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র জীবদ্দশায় কোনও নাম-যশ লাভ করতে পারেননি। কিন্তু মৃত্যুর পর হঠাৎ খ্যাতি অর্জন করে প্রচুর। মৃত্যুকালে যাজকদের কাছে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করে যান তার মৃতদেহ সমাধিক্ষেত্রে নিয়ে যাবে দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা। এতে সমাজের উচ্চশ্রেণীর অনেকে রেগে যান। কিন্তু পরে দেখা গেল অনেকে আবার এই রীতি গ্রহণ করছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা এই রীতির পক্ষপাতী হয়ে ওঠে কারণ এতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়র খরচ কম পড়ে।

আমাদের শহরের আর এক অদ্ভুত পরিবারের কথা মনে আছে। সে পরিবারের নাম হলো সেনকেনবার্গ পরিবার। তাদের বাড়িতে একটি পোষ খরগোস ছিল বলে সেই জন্য স্থানীয় রাস্তার নাম হেয়ার স্ট্রিট হয় আর সেই পরিবারের তিনটি ছেলেকে তিনটি খরগোস বলত পাড়ার লোক। অথচ পরবর্তীকালে তিনটি ছেলেই আপন আপন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করে। বড় ছেলে ছিল রাজপরিষদের নামকরা সদস্য। দ্বিতীয় ছেলে ছিল সুযোগ্য জেলাশাসক। আর তৃতীয় ছেলে ছিল ডাক্তার।

ভন লোয়েন যেমন অভিজাত সমাজের উচ্ছখল লোকদের নৈতিক অনুশাসনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চেয়েছিলেন, ভন মোসের নামে এক ব্যবসায়ী তেমনি কয়েকখানি বই লিখে ব্যবসায়ীদের অসাধুতা দূর করে তাদের সৎ জীবন যাপন করার শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবসায়ী মহল তাঁর কথা শুনেছিল বলে মনে হয় না। ফলে মনে কোনওদিন শান্তি পাননি মেসের। এমন একটা দুঃসহ দুরন্ত অনুভূতির সঙ্গে সারাজীবন তাঁকে যুদ্ধ করে যেতে হয়েছিল যে অনুভূতিকে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না তার পক্ষে। আমার সেই অনুভূতিকে একেবারে দূর করে দিতেও পারছিলেন না মন থেকে।

আমার বাবা মনে করতেন ছন্দই হলো কবিতার প্রাণ। তাই বেছে বেছে সেই সব প্রবীণ ও নবীন কবিদের কাব্যগ্রন্থ কিনে ঘরে সাজিয়ে রেখেছিলেন যারা ছন্দে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যানিস, হেগেডন, ড্রোনিংগার, জগেলার্ত ও হলার।

এমন সময় ক্লপস্টক নামে একজন আধুনিক কবি হঠাৎ নাম করে বসলেন, তাঁর ‘মেসিয়া’ নামে একখানি কাব্যগ্রন্থ আমাদের শহরের প্রায় ঘরে ঘরে স্থান পেল। অনেকে আবৃত্তি করল তাঁর কবিতা। বাবা সব নামকরা আধুনিক কবিদের কবিতার বই ঘর কিনে সাজিয়ে রাখতেন। নূতনদের বাবা পছন্দ করতেন, কিন্তু ক্লপস্টকের কবিতা ‘হেক্সামিটার বা ষষ্ঠপার্বিক ছন্দে লেখা বলে বাবা তাঁর কবিতার বই কেনেননি। বাবা বলতেন, ও ছন্দ ছন্দই নয়।

যাই হোক আমাদের পরিবারর এক বন্ধু ‘মেসিয়া’ বইখানি আমার মার হাতে দিয়ে যান। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী হলেও বইখানি পছন্দ করেছিলেন এবং এর অনেক কবিতা তিনি আবৃত্তি করে পড়তেন। আমরাও মার সহযোগিতায় বাবাকে লুকিয়ে বাড়িতে সে বই-এর অনেক কবিতা মুখস্থ করতাম।

একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটল। সন্ধের দিকে নাপিত এসে বাবার ঘরে তাঁর দাড়ি কামাবার জন্য মুখে সাবান মাখাচ্ছিল। ঠিক এই সময় তারা দুই ভাই-বোনে চাপা গলায় আগুনের কাছে এক কোণে বসে ‘মেসিয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে আমাদের ভাব এসে গিয়েছিল। হঠাৎ আবেগের মাথায় আমার ছোট বোন একটা ছত্র বলতে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে আর নাপিত চমকে যাওয়ায় তার হাত থেকে অনেকটা সাবানের ফেনা পড়ে যায় বাবার জামার উপর। বাবা রেগে গিয়ে এর। কারণ অনুসন্ধান করে অবশেষে বইটির কথা জানতে পারলেন। সেদিন থেকে ক্লপস্টকের ‘মেসিয়া কাব্যগ্রন্থখানি চিরদিনের জন্য নির্বাসিত হলো বাবার বিচারে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

১৭৫৯ সাল এসে গেল। কিন্তু নববর্ষের পারস্পরিক সাদর সম্ভাষণের মিস্টি আবহাওয়াটা কেটে যেতে না যেতেই আমাদের শহরের উপর নেমে এল দুর্দিনের করাল কালো ছায়া। ফরাসি সৈন্যরা দলে দলে আমাদের শহরের ভিতর দিয়ে মার্চ করে যেতে লাগল। শহরের কৌতূহলী জনতা রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে তাদের দেখল। কিন্তু তাদের বাধা দেবার কোনও ক্ষমতা ছিল না আমাদের। এমনি করে একদিন দেখা গেল শহরের সামান্য রক্ষীদের হারিয়ে দিয়ে শহরটা দখল করে নিল ফরাসিরা।

শান্তিপ্রিয় শহরবাসীদের কাছে এক বিরাট দুঃখের কারণ হয়ে উঠল ব্যাপারটা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেলেন আমার বাবা। কারণ তাঁর নতুন বাড়িটার এক বড় অংশ ছেড়ে দিতে হলো বিদেশী সৈন্যদের অফিসের জন্য। বাবা ছিলেন প্রুশিয়ার পক্ষে তাই কার্যত তিনি বন্দি হয়ে রইলেন তার ঘরে।

কাউন্ট থোরেন নামে এক ফরাসি সামরিক অফিসার অফিস খুলল আমাদের একতলার বাইরের ঘরে। ফরাসি সৈনিকরা ঘিরে রইল বাড়িটাকে। নগরবাসী ও ফরাসি সৈন্যদের সঙ্গে কোথাও কোনও দ্বন্দ্ব বা বিবাদ বাধলে এবং কোন পক্ষ অভিযোগ জানালে থোরেন তার বিচার করবে এবং শাস্তি বিধান করবে। সারা দিন তাঁর কাজকর্মের অন্ত ছিল না।

কিন্তু লোক হিসাবে খারাপ ছিল না থোরেন। আসার প্রথম দিকে একদিন আমাদের বাড়িটা বাবার সঙ্গে ঘুরে দেখার সময় আমাদের ছবির ঘরটা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। বলে, এই সব শিল্পীদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের সঙ্গে আলাপ করবে। আমাদের বাড়ির সকলের সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করত থোরেন। রোগা ছিপছিপে চেহারার মানুষটা ছিল লোহার মতো শক্ত এবং অসাধারণ গাম্ভীর্যে ভরা মুখে ছিল বসন্তের দাগ। কিন্তু কড়া সামরিক অফিসার হলেও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি থোরেনের অনুরাগ ছিল অপরিসীম। আমরা সবাই অবাক হয়ে যাই তা দেখে।

তবু কিন্তু বাবার মন ভিজল না, গলা তো দূরের কথা। মা তো থোরেনের সঙ্গে কথা বলার জন্য সাধ করে ফরাসি শিখতে লাগল। আমাদের পরিবারের বন্ধুরা ও মা নিজে বাবাকে বোঝাতে লাগল, থোরেন ছাড়া অন্য লোক এসে অবস্থা আরও খারাপ হবে। কিন্তু থোরেন যত ভালো লোকই হোক বাবা এই চাপিয়ে দেওয়া অবাঞ্ছিত পরাধীন পরিবেশটা কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিলেন না মনে মনে। আগে তিনি আমাদের যেভাবে পড়াতেন এখন তেমন করে মন দিতে পারলেন না পড়ানোয়। কোনও কাজেই তার উৎসাহ নেই।

কাউন্ট থোরেনের সঙ্গে একজন দোভাষী ছিল। সে হচ্ছে আমাদের শহরের লোক। ফরাসি এবং জার্মান দুইই জানত বলে এই কাজ পায়। সে রোজ কাজ সেরে আমাদের বাড়ির ভিতরে এসে মজার মজার গল্প বলত। কোনো কোনো মামলায় থোরেন কি কি রায় দিত তার একটা করে ফিরিস্তি দিত। এই সব গল্প শুনে আমার মা ও আমরা মজা পেতাম। এই দোভাষী আবার অবসর সময়ে আমার মাকে ভাষা শেখাত।

অদ্ভুত একটা রোগ ছিল থোরেনের। সে রোগের নাম হলো হাইপোকনড্রিয়া বা বিষাদময়তা। মাঝে মাঝে গম্ভীর ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ত থোরেন। কাজ ফেলে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরের মধ্যে চলে যেত। আর বার হতো না, কারও সঙ্গে দেখা করত না। একমাত্র খাস চাকর ছাড়া কেউ তার কাছে যেতে পারত না। এক-এক সময় দু-তিন দিন পর্যন্ত এইভাবে থাকত। আমরা বলতাম ওর ঘাড়ে ভূত চেপেছে। ভূতটা ছেড়ে গেলেই আবার স্বাভাবিক মানুষ হয়ে উঠত থোরেন।

একবার থোরেন সত্যি সত্যি শহরের নামকরা আধুনিক শিল্পীদের ডেকে তাদের কাছ থেকে তার পছন্দমতো বেশি কিছু ছবি কিনে নেয়। সেই ছবিগুলো আমাদের এক ঘরে ভরে রাখে। ঘরখানা স্টুডিওর মতো দেখাত। তার মতো কড়া সামরিক অফিসারের সূক্ষ্ম শিল্পরুচি দেখে আশ্চর্য হলাম আমরা। একদিন ছবির ঘরে ঢুকে আমি একটা ফটোর বাক্সের তালা খুলে তার মধ্যে কোনও নিষিদ্ধ ছবি দেখার চেষ্টা করি। ঢাকনা বন্ধ করার আগেই কাউন্ট থোরেন ঘরে ঢুকে আমাকে এভাবে দেখে দারুণ। রেগে যায়। গম্ভীরভাবে আমাকে হুকুম দেয় আমি যেন আটদিন এ ঘরে আর না ঢুকি। আমার দোষের কথা বুঝতে পেরে আমি মাথা নত করে নীরবে বেরিয়ে যাই ঘর থেকে। সে হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করছিলাম আমি।

এই সময় আমি ফরাসি ভাষা শিক্ষা করি। কিছু কিছু কথা বলতে পারতাম এবং বুঝতাম। এমন সময় একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম অপ্রত্যাশিতভাবে। আমাদের শহরের একটা থিয়েটারে তখন বেশ কয়েকদিন ঘরে ফরাসি নাটক দেখানো হচ্ছিল। আমার দাদামশাই আমাকে একখানা সিজন টিকিট দিয়েছিলেন যাতে আমি রোজ যে কোনও নাটক দেখতে পারি। আমার বাবা এটা না চাইলেও মার সহযোগিতায় আমি সেখানে যেতাম। কিন্তু মিলনান্তক নাটক আমার মোটেই ভালো লাগত না। সে নাটকের সংলাপ কোনও রেখাপাত করত না আমার মনে। ভালো লাগত বিয়োগান্ত নাটক। দীর্ঘ বিলম্বিত লয়ে বাঁধা ছায়িত সংলাপ, নায়ক-নায়িকার ধীর উদাত্ত কণ্ঠস্বর, সদা সতর্ক পদক্ষেপ ও অঙ্গসঞ্চালন, গুরুগম্ভীর পরিবেশ–সব মিলিয়ে আমার বড় ভালো লাগত। অনেক সংলাপ আমার মুখস্থ হয়ে গেল।

দিরোনেস নামে একটি ছেলের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। সে একবার তার বোনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বোনটি বয়সে আমার থেকে কিছু বড় ছিল। দেখতে মেয়েটি ভালো ছিল–সবল সুগঠিত চেহারা, বাদামী রং কালো চুল। কিন্তু তার ভাসা ভাসা চোখ দুটো সব সময় বিষাদের ছায়ায় কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। মেয়েটিকে আমার ভালো লাগে এবং তার কাজে আমার প্রিয় করে তোলার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকি। যখনি তাদের বাড়ি যেতাম আমি কোনও ফুল বা ফল বা কোনও না কোনও একটা জিনিস উপহার দিতাম মেয়েটিকে। কিন্তু কোনও কিছুতেই তার মুখে হাসি ফোঁটাতে পারিনি আমি। অবশেষে একদিন মেয়েটির বিষাদের কারণ জানতে পারলাম। একদিন তার ঘরে বিছানার পাশে দেওয়ালে একটি ফটো দেখলাম। ছবিটি এক সুন্দর চেহারার ভদ্রলোকের। দিরোনেস আমাকে যা বলল তাতে বেশ বুঝতে পারলাম, ঐ ভদ্রলোক তাদের মার প্রথম পক্ষের স্বামী এবং তার দিদি হচ্ছে এ ভদ্রলোকের মেয়ে তারা দুই ভাই তার মার এক পক্ষের স্বামীর ছেলে। এবার বুঝলাম তার বাবাকে অকালে হারিয়ে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্যই মেয়েটি সতত বিষাদগ্রস্ত হয়ে থাকে।

কাউন্ট থোরেন ছিল ফরাসি রাজার লেফটন্যান্ট। সেই সূত্রে বহু গণ্যমান্য ফরাসি লোক ও উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার প্রায়ই দেখা করতে আসত তার সঙ্গে। এক সময় দেখা গেল রাজা নিজে এলেন কাউন্টের সঙ্গে গোপনে পরামর্শ করার জন্য। দেখলাম থোরেনের কাছে ঘন ঘন সেনাবাহিনীর অফিসারেরা দেখা করতে আসছে। এমন সময় একটা গুজব রটনা হয়ে গেল। শোনা গেল প্রুশিয়ার রাজা ফার্ডিন্যান্ড আবার আসছেন। তিনি শীঘ্রই ফরাসিদের তাড়িয়ে দেবেন ফ্রাঙ্কফোর্ট শহর থেকে। অনেকে ব্যগ্রভাবে সেই মুক্তির দিনের প্রতীক্ষা করতে লাগল। কথাটা শুনে আমার বাবা খুব আশান্বিত হলেন। খুশি হলেন মনে মনে। কিন্তু আমার মা কেমন যেন মুষড়ে পড়লেন। তাঁর কথা হলো এই যে ফরাসিদের শহর থেকে তাড়াতে পারলেই যুদ্ধ বাধবে। ফরাসিরা তাতে হেরে গেলেও পালিয়ে যাবার সময় যে ক্ষয়ক্ষতি করে যাবে তার ফল খুবই খারাপ হবে। তার থেকে যে অবস্থা বর্তমানে রয়েছে তাই থাক।

শহরের মধ্যে প্রচুর সৈন্য আনাগোনা করতে লাগল। আমাদের বাড়িতে দিনরাত সমানে লেগে থাকত ভিড় আর গোলমাল। বাড়ি থেকে ছেলেদের বার হতে দেওয়া হতো না। আমার বাবা ছিলেন প্রুশিয়ার পক্ষে। যুদ্ধ শুরু হতেই তিনি এগিয়ে গেলেন বিজয়ী বীরদের শহরে বরণ করে আনার জন্য। কিন্তু বাবা বেশ কিছুটা শহরের বাইরে এগিয়ে দেখলেন উল্টো ফল ফলেছে। দলে দলে আহত বন্দি জার্মানরা ফিরে আসছে শহরে। শুনলেন ফরাসিদের অবস্থা বর্তমানে ভালো। আপন দেশবাসীদের বন্দিদশা দেখে বাবা কেমন যেন আত্মহারা হয়ে পড়লেন। তিনি হতাশ মনে বিষণ্ণ মুখে বাড়ি ফিরে একে দুঃখে জলস্পর্শ করলেন না। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আকাশ পাতাল কি সব ভাবতে লাগলেন। মা ও আমরা সকলে পীড়াপীড়ি করেও কিছু খাওয়াতে পারলাম না বাবাকে।

সেদিন থোরেনকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল। সে অফিস থকে ঘোড়ায় চেপে কোথায় যাচ্ছিল। আমরা তার কাছে গিয়ে তার হাত চুম্বন করলাম। সে খুশি হয়ে আমাদের মিষ্টি দেবার হুকুম দিল তার লোকদের। কিন্তু ঘরে ফিরে আবার জন্য খারাপ লাগছিল আমাদের। বাবা তখনও কিছু খাননি। অনেক করে কোনওমতে মধ্যাহ্নভোজনে রাজি করালাম আমরা। নিচেকার খাবার ঘরে গিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে খাবেন।

কিন্তু তখন আমরা ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি আমরা তাঁকে এর দ্বারা বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। বাবা উপর থেকে সিঁড়ি নিয়ে নিচে নামবার সময় দুর্ভাগ্যক্রমে থোরেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মুখোমুখি হতেই থোরেন বাবাকে বলল, এই ভয়ঙ্কর বিপদটা যে এত সহজে কেটে গেল এর জন্য তুমি আশা করি নিজেকে ও আমাদের সম্বর্ধনা জানাবে।

আমার বাবা কিন্তু গম্ভীর মুখে বললেন, কোনওক্রমেই না। তার থেকে তুমি আমি সব যদি নরকে যেতাম তাও ভালো ছিল।

এতে কাউন্ট থোরেন রেগে গিয়ে বলল, এর জন্য দুঃখ পেতে হবে তোমায়। তুমি বুঝতে পারবে এভাবে অকারণে আমাকে অপমান করা তোমার উচিত হয়নি।

সেকথায় কান না দিয়ে বাবা নিচে নেমে এসে খাবার টেবিলে বসলেন। সাধ্যমতো যা পারলেন খেলেন। কাউন্ট থোরেনকে কিছু শক্ত কথা বলে মনটা যেন কিছুট হাল্কা হয়েছে তার।

কিন্তু সে রাতে আমরা যখন ঘুমিয়ে ছিলাম এক তুমুল ব্যাপার ঘটে যায়। জানতে পারলাম পরের দিন সকালে। দোভাষী সেই ফরাসি ভদ্রলোকের কাছ থেকে সব শুনলাম আমরা। শুনলাম গত রাতে আমরা বাড়ির ছেলেরা শুতে যাবার পর থোরেন বাবাকে গ্রেপ্তার করে গার্ড হাউসে নিয়ে যাবার হুকুম দেয়। বাবার পরিত্রাণের কোনও উপায় ছিল না। তার অধীনস্থ কর্মচারীরা সে হুকুম তামিল করতে কিছু দেরি করে আর সেই অবসরে দোভাষী সব নিয়মকানুন ভুলে গিয়ে কাউন্ট থোরেনের খাস কামরায় চলে যায়। মা ও আমাদের নামে আবেদন জানায় থোরেনে কাছ। বলে এ দণ্ডাদেশ মকুব করতেই হবে। থোরেন বলে, সে এ অপমান কিছুতেই সহ্য করবে না। তার হুকুম নড়চড় হবার নয়। কিন্তু দোভাষী অনেক করে বুঝিয়ে বলতে থাকে, আমার বাবা আসলে লোকটা খারাপ নয়, হঠাৎ কি মনে করে কথাটা বলে ফেলেছেন। তাছাড়া আমার মা ও আমরা ছেলেমেয়েরা তার আনুগত্য তো মেনেই নিয়েছি। সুতরাং থোরেনের মতো একজন সদাশয় অফিসার যদি সকলের সকল অভিযোগ ধৈর্য ধরে শুনে সকলের প্রতি সুবিচার করেন, তাঁর পক্ষে সামান্য একটা তুচ্ছ ব্যাপারে একজন নিরীহ লোককে এ শাস্তি দান করা শোভা পায় না।

যাই হোক, অবশেষে দোভাষীর আবেদন মঞ্জুর হয়। শাস্তির আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় থোরেন। পরের দিন দোভাষী আমাদের বাড়িতে এসে এ ব্যাপারে থোরেনের সঙ্গে যা যা কথা হয় সব গর্বের সঙ্গে বলে যায়। কোনও খুঁটিনাটি বাদ দেয়নি। এর মধ্যে হয়ত কিছু অত্যুক্তিও থাকতে পারে।

সেই দিন থেকে কেমন যেন বেশি গম্ভীর দেখাত থোরেনকে। বাবাও সাবধান হয়ে যান। হঠাৎ দেখা গেল অদ্ভুত খেয়াল চাপল থোরেনের মাথায়। সে শহরের নামকরা আধুনিক চিত্রশিল্পীদের ডেকে যে সব ছবি কিনেছিল তাতে তার মন ঠিকমতো তৃপ্ত হয়নি। সে লক্ষ্য করেছিল তাদের হাত ভালো হলেও প্রত্যেকের এক-একটি বিশেষ দিকে প্রতিভা আছে। কেউ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি ভালো ফুটিয়ে তুলতে পারে, কেউ মানুষের বিচিত্র জীবনধারা, কেউ মানুষের মন ও দেহ। থোরেন সবাইকে ডেকে বলল, তোমরা সবাই মিলে এমন একখানি বড় ছবি আঁকবে যাতে এই সব কিছু থাকবে, সার্থকভাবে ফুটে উঠবে। সকলের সব প্রতিভা একখানি ছবির মধ্যে ধরে রাখবে থোরেন, এই ছিল তার অভিপ্রায়। তার এই অভিপ্রায়ের অর্থ শিল্পীরা ঠিক বুঝতে না পারলেও মোটা টাকার লোভে রাজি হয়ে গেল সকলে। সে ছবির কাজ শেষ হতেই একদিন দেখা গেল থোরেন তার সব সংগৃহীত ছবি গাড়িতে করে পাঠিয়ে দিল তার ভাই-এর কাছে। আমাদের ঘরটা খালি হয়ে গেল।

তার অফিস সমেত থোরেনকে আমাদের বাড়ি থেকে যাবার জন্য অনেক আবেদন-নিবেদন যায় ফরাসী রাজার কাছে। অবশেষে সে আবেদন মঞ্জুর হয় এবং একদিন তার দলবল নিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে চলে যায় থোরেন। তবু তার কথা আমি ভুলিনি কখনও।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমাদের নিজস্ব ঘরখানা আবার আমি ফিরে পেলাম। এই ঘরে থাকত থোরেনের ছবিগুলো। ঘরটা খালি হলেও বেশ কিছুদিন ধরে সেই সব ছবির ভূতগুলোকে আমি যেন আমার ঘরের দেওয়ালগুলোতে চলাফেরা করতে দেখতাম।

কাউন্ট থোরেন ও তার দলবল চলে যাওয়ার পর ঘরগুলো পরিষ্কার ও ঝাড়ামোছা হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নূতন ভাড়াটে এল। এলেন প্রসিদ্ধ আইনজীবী, বাবার অন্যতম বন্ধু মরিৎস। মরিৎস নিজের আইনব্যবসা ছাড়াও বড় বড় সামন্তদের পরিবারের ও রাজপরিবারের মামলা-মোকদ্দমা দেখাশোনা করতেন। মরিৎস বাবার কাছে প্রায়ই এলেও তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা ঘর থেকে বেরোয় না। আমাদের বাড়িতে আসত না। তাই থোরেনরা চলে যাবার পর আমাদের বাড়িটাকে বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগত।

মরিৎস শিল্পী না হলেও কিছু কিছু আঁকতে পারতেন। আমি ঘরবাড়ির স্কেচ করে তাঁকে দেখাতাম। তারপর ল্যান্ডস্কেপ পেস্টিং-এ মন দিলাম। আমার বাবা অসীম ধৈর্যের সঙ্গে নিজে শিখে আমাকে শেখাতেন। তারপর গান। অনেকদিন ধরেই আমাদের গান। শেখাবার কথা হচ্ছিল। অবশেষে ঠিক হলো আমরা ভাইবোনে হাপসিকউ শিখব। কিন্তু শিক্ষক পছন্দ হচ্ছিল না। এমন সময় একদিন আমার এক সহপাঠি বন্ধুর বাড়ি গিয়ে দেখি সে একজনের কাছে ঐ বাজনা শিখছে। শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতি আমার ভালো লাগল। তার ডান ও বাঁ হাতের আঙুলগুলো সমানে চলত এবং প্রত্যেকটা আঙুলের একটা করে নাম দিয়েছিলেন। কখন কোন আঙুলটা চালাতে হবে তা খুব সুন্দরভাবে দেখিয়ে দিতেন।

আমি বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলে সেই শিক্ষককে নিযুক্ত করলাম। কিন্তু লোকটার নীরস গুরুগম্ভীর ভাব দেখে অল্পদিনের মধ্যেই মোহমুক্ত হলাম আমরা। আবার বোন তো আমায় গাল দিতে লাগল। আমার বাবা অবশ্য আমার গান-বাজনা শেখার উপর তেমন জোর দিতেন না। তিনি শুধু চাইতেন আমার বোনই কিছু গান বাজনা শিখুক। আর চাইতেন আমার পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও আমি কিছু ছবি আঁকতে শিখি।

এই সময় গিফেন নামে এক ফরাসি যুবককে দিয়ে একটি বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ফরাসি ছাড়াও গ্রীক ও লাতিন ভাষা শেখানো হতো। পিফেন গান বাজনাও জানত। মস্ত বড় গাইয়ে ফেলতিনি নোরার সঙ্গে তার ভাব ছিল এবং নোরার কাছ থেকে একটা বড় পিয়নো কিনে আনে আমার বোনের জন্য। এই পিয়ানো বাজনা শিখতে আমার বোনের বড় কষ্ট হতো। এই সময় বাবা আবার ইংরেজি শিক্ষার জন্য একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন।

ছোট থেকে আমার ইহুদি ভাষার শেখার শখ ছিল। আমারও আশা ছিল এই ভাষা শিখে আমি ওল্ড টেস্টামেন্ট গ্রন্থটি পড়তে পারব। আমার প্রায়ই মনে হতো ইহুদি জাতি সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ঈশ্বরের অনুগৃহীত এমনই এক জাতি যারা পৃথিবীর মধ্যে হাজার বছরের ইতিহাস রচনা করেছে। যুগ যুগ ধরে কত কথা ও কাহিনী গড়ে উঠেছে তাদের নিয়ে। কল্পনার পাখায় চড়ে আমার মন চলে যেত সেই সুদূর পৌরাণিক অতীতের অজানা রাজ্যে। একটি পরিবার কিভাবে বংশ বিস্তার করে এগিয়ে যায় আরবের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস বিধৌত ভূখণ্ড হতে প্যালেস্টাইন, জর্ডন ও পর ঈজিপ্টের পথে। কত সব মরুভূমি, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের দেশ ঘুরে একটি জাতি এগিয়ে চলেছে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথে। আদ্রাবাথ, মোজেস জ্যাকব, র‍্যাশেল, জোশেফ প্রভৃতি কত সব পৌরাণিক চরিত্র ভিড় করে আসত আমার মনে। তাদের আশা, আকাক্ষা, আত্মদহন, দুঃখ-কষ্ট, প্রেম-ভালোবাসা সব নাড়া দিত আমার মনকে। হাজার বছরের একটা প্রকাণ্ড অতীতের ধূসর পটভূমিকা সহসা জীবন্ত হয়ে উঠত আমার মনে।

বাইবেলের এইসব ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে আমি এক বিরাট পদ্য রচনা শুরু করে দিলাম। লেখা শেষ হলে আমাদের বাড়িতে যে যুবকটি থাকত এবং যার হাতের লেখা খুব ভালো ছিল তাকে দিয়ে ভালো করে প্রথম থেকে লেখালাম। তারপর বই বাঁধাই কারখানা থেকে ভালো করে বাঁধাই করে বাবাকে দেখালাম। এই বই আমি লিখেছি আমার অবসর সময়ে আমার পড়ার কাজ বাঁচিয়ে। দেখে খুশি হলেন বাবা।

আমার বাবা বলতেন কোনও কাজ শুরু করলে তা যেমন করেই হোক শেষ করতে হবে। কাজের পথে যত বাধা, বিপত্তি, দুঃখকষ্ট আসুক না কেন তা শেষ করতেই হবে। তার মতে মানুষের জীবনে একমাত্র লক্ষ্য হবে পূর্ণতা, আর তার একমাত্র গুণ হবে অধ্যবসায়। তাই দীর্ঘ দিনের শ্রম ও সাধনায় এ কাজ আমি সম্পন্ন করেছি তা দেখে প্রীত হলেন বাবা।

কিন্তু আমি যাই করি বা যত ভাষাই শিখি, লেখা বা ছবি আঁকায় যত কৃতিত্বই দেখাই তার মূল লক্ষ্য হতে বিচ্যুত হননি বাবা। তিনি একবার যা বলেন তা ভোলেন না। একবার যা লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেন তার থেকে সরেন না। তিনি চেয়েছিলেন আমাকে আইন পড়িয়ে তাঁর আরদ্ধ কাজ সম্পন্ন করবেন। তাই তিনি একদিন হঠাৎ আমাকে একটি হালের আইনের বই দিলেন পড়তে। যদিও আমার কাছে বইখানি খুবই কঠিন ঠেকছিল তবু বাবার হুকুম তা পড়ে শেষ করতেই হবে।

একদিন আমাদের শহরে নেহাৎ কৌতূহলের বশে ইহুদিদের বস্তি দেখতে যাই। তারা যে ঘিঞ্জি নোংরা বস্তিতে থাকত তা দেখে দুঃখ হতো আমার। ঈশ্বরপ্রেরিত যে জাতির কথা বাইবেলে ফলাও করে পড়েছি সেই জাতির অবশিষ্টাংশ এরা। এদের এই শোচনীয় অবস্থা দেখে সত্যিই কষ্ট হয় আমার। আমি আমার অবসর সময়ে মাঝে মাঝে সেই বস্তিতে যেতাম। তাদের জীবনযাত্রা লক্ষ্য করতাম। অনেক উৎসবে যোগ দিতাম। খ্রিস্টান হয়েও তাদের সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহারে মুগ্ধ হতাম আমি।

আমার ইচ্ছা না থাকলেও যৌবনে পা দিয়ে আমাদের দেশের প্রথা অনুসারে ঘোড়ায় চাপা ও ফেন্সিং খেলা শিখতে হলে আমায়। আমাদের শহরে তখন দুজন ফেন্সিং খেলোয়াড় এ খেলা শেখাতেন। একজন জার্মান ও আর একজন ফরাসি ভদ্রলোক। আমি ফরাসি ভদ্রলোকের কাছেই এ খেলা শিখতে থাকি। তবে ঘোড়ায় চাপা বাপারটা আমার মোটেই ভালো লাগত না। পরে অবশ্য আমি খুব ভালো ঘোড়সওয়ার হয়ে উঠি এবং একনাগাড়ে কয়েকদিন ঘোড়ার পিছে চেপে থাকতে পারি অক্লান্তভাবে।

আমি বড় হয়েছি দেখে বাবা আমাকে এই সময় তার ব্যবসায় সাহায্য করতে বলেন। আমাদের যে কারখানায় অনেক লোক কাজ করত এবং বাবাকে যেখানে দেখাশোনা করতে হতো দীর্ঘ সময় ধরে, আমাকে সেখানে যেতে বললেন বাবা। কাজের তদারক করতে বললেন। কর্মীদের উপর নজর রাখতে বললেন। এইভাবে কর্মস্থলে গিয়ে শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্কটিকে ভালোভাবে দেখতে পাই। আর তা থেকেই উদ্ভুত এক সাম্যবোধ জাগে আমার মনে। উচ্চ, অভিজাত ও নিম্ন সকলের মধ্যে কোথায় প্রকৃত পার্থক্য তা বুঝতে চাই আমি। সব মানুষ সমান হোক তা আমি হয়ত চাইনি। আমি চেয়েছিলাম মানবজীবনের বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে অন্তত সমতা বিরাজ করুক, কারণ শ্রেণী নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যেই আছে অস্তিত্বের সংরক্ষণ প্রচেষ্টা, বাঁচার এক অপরিহার্য তাগিদ।

এই সময় ভন ওলেনস্লেগার আমাদের পরিবারের খুব প্রিয় হয়ে ওঠেন। ওলেনম্নেগারের নাটকে বেশ জ্ঞান ছিল। তিনি যুবকদের নিয়ে বেশ আমোদ-প্রমাদ করতে পারতেন। তাঁর নাটক করার খুব শখ ছিল। তাঁর নির্দেশনায় আমরা স্লেগারের ক্যানিয়ুট মঞ্চস্থ করি। এতে আমি আমার বোন ও ছোট ভাই তিনজনেই তিনটি ভূমিকায় অভিনয় করি। এরপর রেসিনের লেখা ট্র্যাজেডি ব্রিটানিকাশও মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে নিরোর ভূমিকায় অভিনয় করি। আমার বোন নেয় এগ্রিপিয়ার ভূমিকা। এইভাবে ভন ওলেনম্নেগার এক রীতিমতো নাট্যপ্রীতি জাগিয়ে তোলেন আমার প্রথম যৌবনে।

১৭৬৩ সালের প্রথম বসন্তে একদিন এক জাতীয় উৎসবে মেতে ওঠে আমাদের শহর। কারণ ঐ দিন হুবার্তসবার্গ সন্ধি সম্পাদিত হয়। কিন্তু চারদিকের আনন্দোৎসবের মাঝে আমার কেবলি মনে পড়তে থাকে ভন রেনেকের কথা। আপন কন্যার সঙ্গে মামলায় হেরে গিয়ে স্বেচ্ছাকৃত এক প্রায়ান্ধকার কারাজীবন যাপন করে চলেছেন তিনি। তাঁদের মুখে আমি কোনওদিন বিন্দুমাত্রও হাসি ফুটে উঠতে দেখিনি। একবার তার পরিবারের বন্ধুস্থানীয় একটি লোকের সঙ্গে তাঁর মেয়ে পালিয়ে যায়। এটা মনঃপুত না হওয়ায় তিনি তাদের সন্ধান করেন। সন্ধান পেয়ে মামলা করেন। কিন্তু তাঁর প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় মামলায় হেরে যান রেনেক। হেরে গিয়ে তার বাড়ির একতলায় এক অন্ধকার ঘরে আশ্রয় নেন। সে ঘর থেকে বিশেষ বার হতেন না। সে ঘরের দেওয়াল চুনকাম করা হয় না কখনও। কিন্তু রেনেক আমাকে বড় ভালোবাসতেন এবং তার ছোট ছেলেকে আমার সঙ্গে মিশতে বলতেন।

আমি তাঁর কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খিটখিটে মেজাজ অনেকটা শান্ত ও নরম হতো। তাঁর বাড়িতে গেলে খাওয়া-দওয়া ভালোই হতো। তিনি অতিথিবৎসল ছিলেন। কিন্তু তার একটা স্টোভ ছিল। সেই স্টোভটা জ্বালতে গেলেই ধোয়া হতো আর তাতে অতিথিদের কষ্ট হতো। একদিন এক অতিথি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রেনেক বলেন মানুষকে যে সব অশুভ শক্তি কষ্ট দেয় তারা যদি ঈশ্বরের কাছে যেত তাহলে ভালো হতো। একবার তার মেয়ে তাঁর প্রথম ছেলেকে নিয়ে দেখা করতে আসে। জামাই ভয়ে আসেনি। কিন্তু যে মেয়েকে নিয়ে এত কাণ্ড, এত মামলা-মোকদ্দমা, সে মেয়ের আর মুখদর্শন করবেন না তিনি। আমার প্রতি রেনেকের কিছুটা দুর্বলতা ছিল। তাঁর অনমনীয় মনকে নমনীয় করার জন্য আমাকে ডাকা হলো। অবশেষে অনেক করে মেয়ের সঙ্গে দেখা করে একবার নাতির মুখ দেখার জন্য রাজি করলাম রেনেককে। যে। রেনেক সেই অন্ধকার ঘরখানা ছেড়ে, তাঁর স্বেচ্ছানির্বাসনের সেই জগৎ ছেড়ে কোথাও বার হতেন না, সেই রেনেককে নিয়ে প্রতি রবিবার বিকালে বেড়াতে বেরোতাম। তিনি গোলাপী রং ভালো না বাসলেও তাঁকে গোলাপী ফুল ভালোবাসতে শিখিয়েছিলাম।

ভন ম্যালাপার্ট নামে এক ধনীও রেনেকার মতো একা একা থাকতেন। কিন্তু পরে তাঁর সঙ্গে রেনেকার ভাব করিয়ে দিই। ম্যালাপার্টের ফুলবাগানে বসন্তের ফুলের ছাড়াছড়ি হতো। যেখানে-সেখানে রেনেককে পাঠিয়ে দিতাম কৌশলে।

এরপর মনে পড়ে হাৎ হুয়েসজেনের কথা। ধর্মের দিক থেকে তিনি সংস্কারপন্থী ছিলেন না বলে কোনও সরকারি পদ পাননি। কিন্তু কৃত আইনজীবী হিসাবে নাম করেছিলেন। হুয়েসজেনের মাথায় টাক ছিল। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকত। গণিতে তার জ্ঞান ভালো ছিল এবং তিনি নিজের বুদ্ধিতে সব এক ঘড়ি তৈরি করেন যা ঘণ্টা-মিনিট ছাড়া সূর্য-চন্দ্রের গতিবিধি বলে দিতে পারত। কিন্তু হুয়েসজেন আইনবিদ্যাকেই সবচেয়ে ভালোবাসতেন এবং মনে করতেন প্রত্যেক ছাত্রেরই আইন পড়া উচিত। কারণ এই আইনের দ্বারা নিপীড়িত উৎপীড়ত মানুষের উপকার করা যায় সবচেয়ে বেশি।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

আমার শিক্ষা, স্বভাব, গৃহ, পরিবেশ এমনই ছিল যে আমি সমাজের নিচুতলার লোকদের সঙ্গে মিশতে পারতাম না। কখনও কোনও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠত না তাদের সঙ্গে। বিশেষ করে মিস্ত্রী বা কারিগরদের আমি দেখতে পারতাম না। কোনও অসাধারণ বা বিপজ্জনক কাজের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে যাবার সাহস ছিল আমার। কিন্তু সে কাজ সম্পন্ন করার মতো উপযুক্ত কৌশল ও কর্মশক্তি ছিল না।

এই সময় অপত্যাশিতভাবে আমি একটা জটিল ঘটনাজালের মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। আমি বলি পাইলেদস নামে আমার এক বন্ধু ছিল। একদিন ফোর্ট গ্যালাসের কাছে পাইলেদস-এর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আমার। তার সঙ্গে তার দু-একজন বন্ধুও ছিল। দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের পরই সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, আমি তোমার কবিতা আমার সঙ্গীদের কাছে পড়ে শুনিয়েছিলাম। তারা কেউ বিশ্বাস করতেই চায় না যে এটা তোমার লেখা।

আমি বললাম, কবিতা সম্বন্ধে যার যা খুশি বলতে পারে। এতে বলার কিছু নেই। ছেড়ে দাও।

পাইলেদস কিন্তু অত সহজে ছাড়ল না। সে বলল, আমার বন্ধুদের বক্তব্য, এই ধরনের কবিতা লেখার জন্য যে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা থাকা দরকার তা তোমার নেই। আমি কোনও উত্তরই দিলাম না। তখন পাইলেদস তার সঙ্গীদের বলল, ঠিক আছে, তোমরা ওকে কোনও বিষয়বস্তু দাও। ও সঙ্গে সঙ্গে এইখানে কবিতা লিখে দেবে।

আমি তাতে রাজি হলাম। তখন ঠিক হলো আমাকে একটি প্রেমপত্র ছন্দোবদ্ধ কবিতায় লিখে দিতে হবে। ধরে নিতে হবে কোনও এক যুবতী তার প্রেমিককে তার মনের কথা জানাচ্ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে একটা বেঞ্চের উপর বসে পড়লাম। ওরা আমাকে সাদা কাগজ দিল। ওরা কাছাকাছি থেকে আমার উপর নজর রাখতে লাগল। আমি লিখতে শুরু করলাম। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম যেন কোনও তরুণী যুবতী আমাকে ভালোবাসে এবং যে আমাকে তার মনের গভীর গোপন কথাগুলো জানাচ্ছে।

কবিতাটি শেষ হলে পাইলেদস ও তার বন্ধুরা একবাক্যে প্রশংসা করল আমার। তারা আমাকে বিশেষ ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। বলে গেল শীঘ্রই আবার দেখা হবে।

সত্যিই দেখা হলো। গ্রামাঞ্চলে এক প্রমোদভ্রমণের ব্যবস্থা হলো। পাইলেদস তার একদল বন্ধু নিয়ে হাজির হলো। তারা সবাই বলল, আমার চিঠিটা নিয়ে একটা বেশ মজার ব্যাপার করেছে তারা। তাদের এক বন্ধুর ধারণা মাত্র একদিনের পরিচয়েই এক যুবতী প্রেমে পড়েছে। ওরা তাই আমার সেই ছন্দোবদ্ধ প্রেমপত্রটি একটু সম্পাদনা করে। অন্য হাতে লিখিয়ে সেই বন্ধুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছে। সে চিঠি পেয়ে বন্ধু ভাবছে তার প্রেমিকাই সে চিঠি লিখেছে। এবার সে চিঠির জবাব দিতে চায়। কিন্তু সে ক্ষমতা তার নেই। তাই আমার সাহায্য একান্ত দরকার।

খেলাচ্ছলে ছলনা ও প্রতারণা করে ছেলেবেলায় আমরা অনেক আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু এখন দেখলাম সব বয়সের মানুষই এ ধরনের ছলনায় আনন্দ পায়। যাই হোক, আমি মত দিলাম। তার চিঠির উপাদান আমাকে দিয়ে দিল। আমি লিখে দিলাম।

এরপর একদিন সন্ধ্যার সময় কোনও এক হোটেলের এক ভোজসভায় নিয়ন্ত্রণ পেলাম আমি। গিয়ে দেখলাম পাইলেদস-এর সেই প্রেমিক বন্ধুটি এই ভোজসভার ব্যয়ভার বহন করছে। আমি গিয়ে বসলাম। খেলাম। কিন্তু ওদের সঙ্গ আর আমার ভালো লাগছিল না। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম এ ধরনের লেখা আর লিখব না। অকারণে একটি মানুষকে ছলনার দ্বারা প্রতারিত করে বিগত সন্ধ্যাটা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর হয়ে উঠল। কিন্তু হঠাৎ একটা মিষ্টি ঘটনা ঘটে আমার মনটাকে অন্যদিকে নিয়ে গেল।

খাবার পর আমাদের কিছু মদের দরকার ছিল। আমাদের মধ্যে একজন হোটেলের পরিচারিকাকে ডাকল। কিন্তু পরিচারিকার বদলে এল পরমা সুন্দরী একটি মেয়ে। নাম তার গ্ৰেচেন। তার মুখ-চোখ অপরূপ লাবণ্য। সুন্দর সুগঠিত দেহ। আঁটসাঁট পোশাক। একবার তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আমাদের অনুরোধে আমাদের কাছে। বসে একপাত্র মদ পান করল ঘেঁচেন।

সেদিন সন্ধ্যায় সেইখানেই ব্যাপারটার ইতি ঘটলেও আমার মনের মধ্যে সব সময় সব জায়গায় গ্রেচেনের ছবিটা আনাগোনা করতে লাগল। যেহেতু তার বাড়িতে যাওয়ার কোনও অজুহাত ছিল না আমার সেই হেতু একটি চার্চে গেলাম তার দেখা পাবার আশায়। দেখা পেলাম। কিন্তু তার কাছে গিয়ে আলাপ করতে পারলাম না।

সেদিন না পারলেও আবার একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। পাইলেদস আবার আমাকে ডাকল সেই হোটেলের এক সান্ধ্য ভোজসভায়। তার বন্ধুর যে প্রেমপত্র আমি লিখে দিয়েছিলাম সেটা তারা মিথ্যা করে বলেছে, নির্দিষ্ট ঠিকানা পাঠিয়ে দিয়েছে। এবার মেয়ের তরফ থেকে উত্তর দেবার পালা। সেই উত্তর আমায় লিখতে হবে। এসব লেখা আর লিখতাম না আমি। কিন্তু হোটেলে গেলে গেচেনকে দেখতে পাব বলে রাজি হয়ে গেলাম।

হোটেলে গিয়ে আমি আমার লেখা পড়ে শোনালাম। আমি যেন গ্রেচেনকে লক্ষ্য করেই এ চিঠি লিখেছি। কিন্তু আসলে পাইলেদস-এর বন্ধু যে মেয়েটিকে ভালোবাসে সে ধনী ঘরের মেয়ে। সুতরাং কিছু অদল-বদল করতে হলো। গ্ৰেচেন কাছ থেকে সব শুনছিল। একসময় আমার বন্ধু উঠে যেতেই গ্ৰেচেন নিজে থেকে আমার কাছে মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলল, এসব কি করছেন আপনি? এটা অপরকে প্রতারণা করা হচ্ছে। এতে লাভ কি?

আমি বললাম, আসলে ব্যাপারটা মজার। নির্দোষ আমোদ।

গ্ৰেচেন বলল, এটা একটা মজার ব্যাপার নিশ্চয়, কিন্তু নির্দোষ নয় মোটেই। আমি দেখেছি এর মধ্য দিয়ে অনেক যুবক নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

আমি বললাম, এখন কি করব! চিঠিটা লেখা হয়ে গেছে। এখন শুধু কিছু সংশোধন করা দরকার।

গ্ৰেচেন বলল, থাক, সংশোধন করতে হবে না। পকেটে রেখে দাও। আমি একজন গরিব ঘরের মেয়ে। আমাকে ওরা প্রথমে চিঠিটা নকল করতে বলেছিল। আমি রাজি হইনি। আর তুমি ধনী ঘরের পুরুষ ছেলে হয়ে জেনেশুনে এমন কাজ করছ যাতে কোনও ভালো হবে না, বরং তার থেকে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।

গেচেনের এই সব কথায় তাকে আরও ভালো লেগে গেল আমার। আবেগে আত্মহারা হয়ে পড়লাম আমি। আমি বললাম, কি হবে টাকা-পয়সা বা ধন-ঐশ্বর্যে যদি আমি আমার আকাক্ষিত বস্তুকে না পাই।

এমন সময় আমার হাত থেকে লেখা চিঠিটা নিয়ে শান্তভাবে পড়তে লাগল। পড়ে আপনার মনে বলল গ্রেচেন, চমৎকার লাগছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এত ভালো লেখা কোনও ভালো বা সৎ উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

গ্ৰেচেন চিঠিটা আমার হাতে দিলে আমি বললাম, কোনও প্রেমিকার কাছ থেকে এই ধরনের চিঠি পাওয়া কতই না ভাগ্যের কথা। আচ্ছা, যদি কেউ তোমাকে ভালোবেসে শ্রদ্ধার সঙ্গে এই ধরনের লেখা লেখে তাহলে তুমি কি করবে?

আমি কাগজটা তার দিকে এগিয়ে দিতেই গ্রেচেন মৃদু হেসে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে কলম দিয়ে কাগজটাতে তার সই করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি আবেগে আত্মহারা হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। কিন্তু গ্রেচেন বলল, না, আলিঙ্গন বা চুম্বন নয়, পারলে পরস্পরকে আমরা ভালোবেসে যাব।

কাগজটা পকেটে ভরে রেখে বললাম, এ আর কেউ পাবে না। ব্যাপাটার এইখানেই ইতি। তুমি আমাকে মুক্ত করলে অবাঞ্ছিত এই ব্যাপারটা থেকে।

গ্ৰেচেন বলল, তোমার বন্ধুরা না আসতেই চলে যাও।

আমার যেতে মন সরছিল না। তবু যেতে হবে। গ্ৰেচেন আমার দুটো হাতের মধ্যে হাত দিয়ে মৃদু চাপ দিল। আমার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। জল এল চোখে। আমি তার হাত দুটো তুলে নিয়ে আমার মুখের উপর একবার চেপে ধরেই ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম।

প্রথম প্রেমের আবেগের সঙ্গে যেন এক আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা জড়িয়ে থাকে। গ্ৰেচেনের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যের এক নূতন জগৎ খুলে গেল আমার সামনে। আমার জীবন-যৌবন যেন হঠাৎ অর্থময় হয়ে উঠল। আমি তার সই করা সেই কাগজটা বার করে পকেট থেকে বার করে সেটাকে চুম্বন করতে লাগলাম। বুকের উপর চেপে ধরলাম।

পরের রবিবার আবার আমি নিজের থেকে পুরনো বন্ধুদের আড্ডায় গেলাম। চিঠিটা ঠিক করে দিইনি বলে তারা মোটেই রাগ করেনি আমার উপর। বরং তারা নিজেরা যেচেই বলল, তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এই ধরনের কাজ আর করবে না। এর থেকে আমি যদি কিছু বিয়ের ও মৃত্যুর উপর কবিতা লিখে দিই, তাহলে তার থেকে তারা উপকৃত হবে এবং আমিও যা পাব তাতে হোটেলের বন্ধুদের খাওয়ার খরচটা হয়ে যাবে।

তারা সবাই ছিল স্বল্পবিত্ত ঘরের ছেলে। সব দিন হোটেলে কিছু খাবার পয়সা থাকে না। তাদের অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমি রাজি হয়ে গেলাম। তারা পরদিন সন্ধ্যায় আমাকে হোটেলে নিমন্ত্রণ করল। গ্ৰেচেনও নাকি তাদের সঙ্গে খাবে। গ্ৰেচেনের কথা শুনে উল্লসিত হয়ে আমি পরের দিন সন্ধ্যার জন্য ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম।

পরের দিন সন্ধ্যা হতেই হোটেলে হাজির হলাম। গ্ৰেচেনকে দেখে খুশি হলাম। বন্ধুরা সব হইহুল্লোড় করতে লাগল। গ্রেচেন একপাশে চুপ করে বসে রইল। আমার চোখ সব সময়েই প্রায় নিবদ্ধ ছিল গ্রেচেনের উপর। ঠিক হলো, তার বন্ধুরা একে একে তাদের জীবনের লক্ষ্য কি তা বলে যাবে। পাইলেদস-এর পর আমি বললাম।

আমার প্রতি আচরণের ব্যাপারে গ্রেচেন একটা সঙ্গতি আর রীতি মেনে চলত। আমি যখন কিছু লিখতাম বা পড়তাম তখন সে আমার কাছে ঘন হয়ে বসে আমার পিঠের উপর হাত রেখে তা দেখত। কিন্তু আমি যদি কখনও তার পিঠে বা কাঁধের উপর হাত রাখার চেষ্টা করতাম তাহলে সে সরে যেত। গ্ৰেচেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া শক্ত ছিল। সে কখনও চরকা কাটার কাজ করত, কখনও বা সেলাই-এর কাজ করত। কখন কোথায় কি কাজ করত বোঝাই যেত না। একদিন আমার লোকের জন্য একটা নামকরা বড় ফুলের দোকান থেকে ফুল আনতে গিয়ে দেখি ঘেঁচেন অন্য পোশাক পরে সেই ফুলের দোকানে অস্থায়ীভাবে কোনও এক কর্মচারীর পদ পূরণ করছে। আমাকে দেখতে পেয়ে গ্ৰেচেন ইশারা করে আমাদের পরিচয়ের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করল।

পরে গ্ৰেচেনকে সে কথা জিজ্ঞেস করায় সে বলল, তোমরা সেদিন আমার জীবনের লক্ষ্যের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলে নারীদের উচিত ভদ্র কাজের মধ্য দিয়ে তাদের অবসর সময় কাটানো। আমি সেদিন দেখলাম একটি ফুলের দোকানে একদিনের জন্য একটি কাজ খালি আছে। তাই ঢুকে গেলাম।

তবু আমার মনে হলো গ্ৰেচেনের মতো সুন্দরী মেয়ের পক্ষে ঐ দোকানের কর্মচারিণীরূপে মোটেই মানায় না।

একদিন সন্ধ্যার সময় হোটেলে খাবার পর একটা মজার খেলা হলো। গ্ৰেচেন ও তার এক জ্ঞাতি ভাই কবিতা লেখা শিখতে লাগল আমার কাছে। মোটমুটিভাবে তাদের একে একে শিখিয়ে দিতে লাগলাম কিভাবে ছন্দ অলঙ্কার ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হয় কিন্তু শিখিয়ে দিলেও তারা তা পারল না। তবু গ্ৰেচেন কাছে থাকায় আমার খুব ভালো লাগছিল খেলাটাকে।

একদিন সন্ধ্যায় সময় তারা ডেকে বলল জোশেফ রাজা নির্বাচিত হচ্ছে। অভিষেক উপলক্ষে দারুণ ধুমধাম হবে। সত্যিই অভিষেক উপলক্ষে সে উৎসব চলল, নানারকমের ঐশ্বর্যের যে বিপুল সমারোহ দেখলাম তার তুলনা হয় না।

সেদিন সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আমার ঘরে বসে আমি বিশ্রাম করছি এমন সময় মা এসে মুখ ভারী করে বললেন, শুনেছি আজকাল তুমি নাকি কুসঙ্গে মিশছ। আমাদের কানে সব কথা এসেছে। তুমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলো।

কোনও এক তৃতীয় ব্যক্তির দ্বারা তিনি সমস্ত ব্যাপারটার তদন্ত করবেন। কাউন্সিলার স্লিদেলই তদন্ত করবেন।

স্লিদেলের কথা মনে পড়ল আমার। একদিন উনিই ‘মেসিয়া’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থ আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও দিয়েছিলেন আমাদের।

স্লিদেল এসে আমার সামনে চোখে জল নিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, তোমার মতো এক নিরীহ যুবক সঙ্গদোষে ধাপে ধাপে নরকের পথে নেমে যাবে এটা খুবই পরিতাপের বিষয়।

আমি বললাম, আমি জ্ঞানত কোনও অন্যায় বা অপরাধ করিনি এবং কোনও কুসঙ্গেও মিশিনি।

স্লিদেল বললেন, দেখো, আমাদের বাধা না দিয়ে কথাটা স্বীকার করাই ভালো।

আমি বললাম, কি জানতে চান আপনি?

স্লিদেল বললেন, তুমি একটি লোকের চাকরির জন্য তোমার দাদামশাই-এর কাছে সুপারিশ করেছিলে?

আমি বলল, হ্যাঁ করেছিলাম।

স্লিদেল আরও তিনজন ছেলের নাম করে বললেন, তুমি এদের সঙ্গে মেলামেশা করো?

আমি বললাম, প্রথম ছেলেটি ছাড়া আমি ওদের কাউকেই চিনি না।

স্লিদেল তখন আমার উপর স্বীকারোক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে লাগলেন। বললেন, তুমি কোথায় কোথায় যাও, কার কার সঙ্গে মেশো আমরা সব জেনেছি। আমার কাছে স্বীকার না করলে ম্যাজিস্ট্রেটের লোক আসবে। সেটা খুব খারাপ হবে। তুমি অপরের হয়ে চিঠি লিখে দিয়েছ। অনেক জাল চিঠি ধরা পড়েছে।

আমি মনে মনে ভাবলাম, কার্যত আমি কোনও অন্যায় করিনি ঠিক তবে আমি নিম্নশ্রেণীর এমন সব ছেলেদের সঙ্গে মিশেছি যারা যে কোনও অপরাধ করতে পারে। অবশ্য তারা আমার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেনি।

অবশেষে আমি স্লিদেলকে বললাম, যা যা হয়েছে আমি সব আপনাকে বিশ্বাস করে বলব। তবে যেন আমার কথা সত্য বলে ধরে নেয়া হয় এবং আমি যাদের সঙ্গে মিশতাম তাদের যেন অযথা কোনও শাস্তি দেওয়া না হয়।

প্রথম থেকে অর্থাৎ পাইলেদস-এর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে যা যা হয়েছিল, যা যা আমি করেছিলাম, বা লিখেছিলাম সব বললাম স্লিদেলকে, গ্রেচেনের কথাও বললাম। বলে মনে ব্যথা পেলাম দারুণ। ভাবলাম এ সব না বললেই ভাল হতো। আমার কোন ক্ষতি না হলেও তাদের ক্ষতি হবে হয়ত। যাই হোক, আমার চোখে জল দেখে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেলেন স্লিদেল।

স্লিদেল চলে গেলে আমি মেঝের উপর শুয়ে কাঁদতে লাগলাম। আমার বোন এসে একসময় সান্ত্বনা দিল আমায়। বলল, কোনও ভয় নেই। বলল, নিচেতে বাবার কাছে। আর একজন দাঁড়িয়েছিল। স্লিদেল গিয়ে তারে সব বলতে তারা সন্তুষ্ট হলো। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। সবাই বলল, ব্যাপারটা এমন কিছু নয়।

তবু আমি আমার বন্ধুদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে রইলাম। যারা একদিন আমায় বিভিন্নভাবে আনন্দ দান করেছে, সঙ্গ দান করেছ, তাদের জন্য দুঃখ হতে লাগল। আমার। আমি বাড়ির মধ্যে স্বেচ্ছানির্বাসন গ্রহণ করলাম। সারা দিনরাত বাড়ির মধ্যেই ভেবে ভেবে কাটাতে লাগলাম।

পরদিন বাবা আমাকে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমি গেলাম না। দিনকতকের মধ্যেই আমার অসুখ করে গেল। ডাক্তার ডাকতে হলো। অসুখের মধ্যেই আমার বন্ধুদের ভাগ্য সম্বন্ধে স্লিদেলের কাছে জানতে চাইলাম। অবশেষে আমাকে জানানো হলো আমার বন্ধুদের কারও কিছুই হয়নি। গ্ৰেচেন শহর থেকে গ্রামে চলে গেছে। তবে আমার মনে হলো, গ্রেচেন নিজে থেকে যায়নি। তাকে হয়ত আমার । জন্যই যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আর একথা ভাবতে গিয়ে অসুস্থ শরীরেই দারুন কষ্ট পেলাম মনে। আমার মনে হলো পাইলেদস অথবা গ্ৰেচেন হয়ত চিঠি লিখেছিল আমায় । কিন্তু সে চিঠি আমাকে দেওয়া হয়নি।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

আমার দেখাশোনার জন্য একজন লোক নিযুক্ত করা হলো। ভদ্রলোক বেশ অমায়িক লোক। আর আগে আমার বাবার বন্ধুর এক ছেলেকে পড়াতেন। সেই ছেলেটি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে। ঠিক হলো, ভদ্রলোক আমার পাশের ঘরে থাকবেন এবং আমার সঙ্গ ও সান্ত্বনা দান করে সাহায্য করবেন আমার আরোগ্য লাভে। মোটামুটি ভদ্রলোককে আমার ভালোই লাগল।

কথা বলে জানলাম উনি আমার সবকিছুই শুনেছেন। আমি তাকে একদিন কথায় কথায় ঘোচেনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন, গ্রেনেচ খুব ভালো মেয়ে। তদন্তকারীদের সামনে গ্ৰেচেন খুব ভালো সাক্ষ্য দিয়েছে। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, আমার সম্বন্ধে কি বলেছে? উনি তখন উত্তর করলেন, আপত্তিকর কিছুই বলেনি; বরং খুব ভালো কথা বলেছে। তদন্তকারীরা তার আচরণে মুগ্ধ। গ্রেনে বলেছে, তুমি নাকি ছেলেমানুষ। তোমাকে ও ভাই-এর মতো স্নেহ করত। তুমি যাতে কুসঙ্গে না মেশো বা কারও প্ররোচনায় বিপথে না যাও তার জন্য ও সাবধান করে দিত তোমায়। এখন সে গ্রামে চলে গেছে। তোমাদের বন্ধুদের কোনও ক্ষতি হয়নি।

কথাটা শুনে কিন্তু মনে দুঃখ পেলাম আমি। গ্ৰেচেনের উপর রাগও হলো। গ্ৰেচেন আমাকে ছেলেমানুষ ভেবে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। যে একদিন আমার লেখা কবিতার প্রশংসা করেছিল নিজের মুখে সেই ঘেঁচেন আমাকে তুচ্ছ ভেবে আমার গুরুত্বকে উড়িয়ে দিয়েছে। ভাবলাম গ্রেচেনের নাম আর করব না। তার কথা কখনও ভাবব না।

আমার দেখাশোনার জন্য যিনি নিযুক্ত হয়েছিলেন তাকে আমি আমার ‘ওভারসিয়ার’ বলতাম। একটু সুস্থ হলে আমি আমার ওভারসিয়ারের সঙ্গে বেড়াতে বার হলাম একদিন। কিন্তু শহরের পথে বার হতেই আমার মনে হতে লাগল পাইলেদস আর তার বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে। তাদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা ভেবে আমার কষ্ট হতে লাগল মনে। যেদিকেই তাকাই ভয় ভয় ঠেকে, যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তাহলে কি বলব তাদের? তাদের দেখা না পেলেও তাদের প্রেতগুলো যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরের পথ পথে-ঘাটে। আমি ওভারসিয়ারকে বললাম বন দিয়ে বেড়াতে চলুন। লোকালয় ভালো লাগছে না।

ফার, ওক প্রভৃতি বড় বড় গাছগুলোর শীতল ছায়ার মধ্যে বসে বসে ভাবতে বড় ভালো লাগছিল আমার। তবে কোনও কথা নয়, শুধু একা থাকতে মন চাইছিল আমার। আমি একটা গাছের তলায় একা একা বসেছিলাম। আমার ওভারসিয়ার ছিলেন একটু দূরে। নির্জন বনভূমির শান্তশীতল স্তব্দতায় আমার অন্তরের সব জ্বালা, দুঃসহ স্মৃতির সব উত্তাপ যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। বনভূমিতে এ ফাঁকা মাঠে ঘুরে বেড়িয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে ছবি আঁকার শখ হলো আমার। আমার দু’একটা ছবি দেখে বাবাও খুশি হলেন। তিনি নিজে ছবি ভালোবাসতেন। আমার ওভারসিয়ার এইসময় বাবাকে বললেন আমি দেহ ও মনের দিক থেকে সেরে উঠেছি। আমি খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি নিজেকে বর্তমানের পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে।

আগের থেকে কিছুটা স্বাধীনতা পেলাম আমি। বাইরে বেড়াতে দেওয়া হলো আমাকে। পাহাড় অঞ্চলে চলে গেলাম বেড়াতে। হামবার্গ ক্রোনবার্গ থেকে শুরু করে রাইনের উপত্যকা পর্যন্ত বেড়ালাম। কিছু ছবিও আঁকলাম। কিন্তু ছবিগুলো তাড়াহুড়ো করে আঁকায় মোটেই ভালো হয়নি। ছবি নয় যেন কতকগুলো ছবির কাঁচা উপাদান। তবু বাবা ধৈর্য ধরে সেগুলো নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে বসে গেলেন। সম্পূর্ণ বা আংশিক সংশোধনের চেষ্টা করতে লাগলেন।

আমার বাবা ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। তিনি ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাওয়া-দাওয়ার উপর নজর রেখেছেন, পিতার কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন এতেই তিনি সন্তুষ্ট। মা ছিলেন শিশুর মতো সরল, আত্মভোলা। বাড়িতে আমার বোনই যেন একমাত্র কথা বলার লোক। আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট আমার বোনই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু।

এই সময়ে এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। তার কাছে আমি ইংরেজি ভাষা শিখতাম। আর সে আমার কাছে জার্মান ভাষা শিখত। সে প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসত। আমার বোনকে ভালোবাসত সে এবং ইংরজি ভাষাতে সে তার ভালোবাসার কথা জানাত। ছেলে হিসাবে সত্যিই সে ছিল যোগ্য সব দিক দিয়ে। লম্বা, ছিপছিপে চেহারা, মুখ-চোখ স্বাভাবিক। মুখে ছিল কিছু কিছু বসন্তের দাগ। আমার বোনের চেহারাটাও বেশ লম্বা আর সুগঠিত ছিল। মুখখানা তত সুশ্রী ছিল না। এ নিয়ে আমার বোনের দুঃখ ছিল মনে। কিন্তু গুণের দিক থেকে সে ছিল তুলনাহীন।

মাঝে মাঝে আমরা প্রমোদভ্রমণে বার হতাম। বেশিরভাগই নৌকোয় করে জলপথে যাওয়া হতো। সবাই প্রায় জোড়ায় জোড়ায় অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী অথবা প্রণয় প্রণয়ীতে মিলে যেত। আমার বোনও তার সেই ইংরেজি প্রণয়ীকে সঙ্গে নিয়ে যেত। একমাত্র আমারই কোনও সঙ্গী ছিল না। আমি শুধু একা একা তাদের সব আনন্দ লক্ষ করে যেতাম। তাই নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম। তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোকে আমার অনুভূতির রসে ভিজিয়ে আমার কবিতার মধ্যে নূতনভাবে রূপ দেবার চেষ্টা করতাম।

এমনি করে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার দিন ঘনিয়ে আসতে লাগল। নূতন। পরিবেশে গিয়ে কেমন লাগবে, আমার জীবন কি রূপ নেবে, আমার শিক্ষাদীক্ষা কেমন হবে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত রইল না আমার মনে। তবে একটা বিষয়ে আশ্বস্ত হলাম আমি। অর্থাৎ আমাদের শহরটা ফেলে দূরে থাকতে পারব। গ্ৰেচেনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হবার পর থেকেই শহরটাকে আর মোটেই ভালো লাগত না আমার। মনে হতো এ শহরটা থেকে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে পেলে বেঁচে যাই। আমার জীবন থেকে গ্ৰেচেন চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার যৌবন-জীবন হতে প্রথম প্রেমের সবুজ সজীব চারাগাছটা মূল সমেত উৎপাটিত হয়ে যায় একবারে। তার জায়গায় কোনও নূতন চারাগাছ গজিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। আমি আর শহরের মধ্যে। গ্ৰেচেনদের পাড়া দিয়ে যেতাম না। গোটা শহরটা আমার বন্দিশালা বলে মনে হলো।

আর কোনও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আগের মতো মিশতাম না আমি। বেশি কথা খুব একটা বলতাম না। কবিতাই ছিল আমার অবিরাম সহচর। সময় কাটাবার একমাত্র উপায়।

অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার দিনটি এসে গেল। পুস্তক-বিক্রেতা ফ্লেসার সম্প্রতি আমার সঙ্গী ছিলেন। ফ্রেসারের স্ত্রী উইটেনবার্গে তাঁরা বাপের বাড়ি যাচ্ছে। আমরা যাব লিপজিগ। জীবনে প্রথম বাড়ি-ঘর, শহর, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে দূরে যাচ্ছি আমি। প্রত্যেককেই একবার করে যেতে হয়। এটাই হয়তো প্রকৃতির নিয়ম। কারণ এইভাবেই মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে তখনই সে বাড়ি-ঘর, বাবা-মা, ভাই-বোনের সাহচর্য ও সাহায্য ছেড়ে স্বাধীনভাবে কোথাও গিয়ে নিরাপদ জীবনযাপন করতে চায়।

লিপজিগ বিরাট শহর। কাজ-কারবারের প্রচুর ভিড়। অসংখ্য কর্মব্যস্ত মানুষের বিপুল আলোড়নে সব সময় স্পন্দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হাথ বমি নামে একজন অধ্যাপকের হাতে পরিচয় পত্র দিলাম। তিনি ইতিহাস আর আইনবিদ্যার অধ্যাপক। কিন্তু আমার আইন মোটেই ভালো লাগে না। আমার ঝোঁক হচ্ছে প্রাচীন বিষয়ের সাহিত্য পাঠের উপর। প্রথমেই কথাটা বললাম না।

পরে অবশ্য আমার ইচ্ছার ব্যাপারটা শুনে আমাকে ভালো করে বোঝালেন হাথ। তিনি বললেন আইন পড়লে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পরিষ্কার হয়। তাছাড়া আমার বাবার একান্ত ইচ্ছা আমি আইন পড়ি। মনে আমার যাই হোক, হাথের কথা ও যুক্তি আমার ভালো লাগল। অধ্যাপকদের মধ্যে হফ্রাথকেই আমার খুব ভালো। লেগেছিল। তাঁর স্ত্রীও আমাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। তিনি রুগ্ন বলে বাড়ি থেকে সন্ধ্যার দিকে কোথাও বেরোতেন না। তাই আমাকে রোজ সন্ধ্যার সময় যেতে বলতেন তাঁদের বাড়ি। আমার কাছে অনেক বড় বড় পরিচয়পত্র ছিল। আমি অভিজাত বংশের ছেলে। তাই অল্প দিনের মধ্যেই শহরের অভিজাত সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলাম। তাদের মনমতো পোশাক পরে ও তাদের মনমতো ভাষা বলে তাদের সঙ্গে অনেক মিশতাম। কিন্তু তাদের আদবকায়দা আমার ভালো লাগত না।

তর্কবিদ্যার জন্য দর্শনবিদ্যার ক্লাসে যেতে ভালো লাগত না আমার। তাছাড়া দর্শনের অধ্যাপক জগৎ, জীবন, আত্মা, ঈশ্বর সম্বন্ধে যা বা বলতেন তা আমার আগে থেকে জানা ছিল না।

আইনবিদ্যর ক্লাসেও ঐ একই অভিজ্ঞতা। আমার কাছে আইনের যে সব বই ছিল এবং যেসব তত্ত্ব ও বিষয় পড়তাম, বুঝতাম, শিখতাম, অধ্যাপক তাই বোঝাতেন। কিন্তু নূতন কথা বলতেন না। এজন্য তার বক্তৃতার সব কিছু খাতায় লিখে নেবার কোনও উৎসাহ পেতাম না। অবশ্য আমি এটাও উপলব্ধি করলাম, আমি যে পরিমাণ পড়েছি সেই পরিমাণে পাঠ্য বিষয়গুলো হজম বা আত্মসাৎ করতে পারিনি। এজন্য আরও সময় দরকার।

প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও অভিজাত সমাজের মেয়ে-পুরুষের প্রতি কিছুদিন পর বিতৃষ্ণা জেগে উঠল আমার মনে। আমার মনে হতে লাগল, ওরা যেন আমার সব স্বাতন্ত্রকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। ওরা চাইছে আমি নিজেকে নিঃশেষে হারিয়ে ফেলি ওদের মাঝে। আমার এতদিনের ধ্যান-ধারণা, ভাবধারা, চিন্তা, কল্পনা সব কিছু নস্যাৎ করে দিয়ে তার জায়গায় ওদের চিন্তা, ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

তাই অভিজাত সমাজের সভা-সমিতির থেকে মাদাম বমির সাহচর্য আমার অনেক ভালো লাগত। উনি জার্মান কবিতার একজন বড় সমঝদার ছিলেন। উনি যখন দেশের আধুনিক কবিতার সমালোচনা করতেন তখন আমি তা মন দিয়ে শুনতাম। উনি বলতেন, যে সব দুর্বলমনা কবি বসন্তকালীন সুখপিয়াসী পাখির মতো শুধু বসন্তের গান গায় তাদের আমি দেখতে পারি না। আমি ভালোবাসি সেই সব কবিতা যার মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়েছে চিরকালের কোনও শাশ্বত কথা বা কাহিনী।

তাঁর স্বামী হাথ বমি সাধারণভাবে কবিতা মোটেই পছন্দ করতেন না। হাত দম্পতির বাড়িতে আর একজন সহৃদয় অধ্যাপকের সংস্পর্শে আমি আসি। তিনি হলেন অধ্যাপক মোরাস। উনিও মাদাম হফ্রাথকে সমর্থন করতেন কবিতার আলোচনায়। মোরাসের মিষ্টি ব্যবহার আমার এত ভালো লেগে গেল যে আমি তার বাড়ির যাওয়া আসা শুরু করেছিলাম। মাদাম বমির থেকে আরও যুক্তিপূর্ণ ও পরিণত ভাষায় চিরায়ত সাহিত্য সম্বন্ধে আমার বুঝিয়ে দিতেন মোেরাস।

জেনেমিয়াদস নামে আরও একজন অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। তিনি কবিতা মোটেই ভালোবাসতেন না। তিনি শুধু প্রবন্ধ লিখতে বলতেন। আবার আমার কোনও গদ্য রচনাও ভালো লাগত না তার। তিনি বলতেন আমার গদ্য রচনায় রীতি বড় সেকেলে। তাছাড়া তার মধ্যে যে পরিমাণে রোমান্সের আবেগ আছে সে পরিমাণে জীবনবোধমূলক কোনও সারবস্তু নেই। আমিও তা স্বীকার করলাম। চিঠিতে মানুষ যেমন তার প্রিয়জনদের কাছে আবেগ প্রকাশ করে তেমনি আমারও সব লেখাতেই আবেগের আতিশয্য এসে যেত।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

আমি যে যুগে জন্মেছিলাম সে যুগ জার্মান সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমগ্রভাবে ছিল সমৃদ্ধির যুগ। তার পূর্ববর্তী যুগের সাহিত্য ছিল বিদেশী ভাষা ও চিন্তাধারার দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত। রাজনৈতিক কারণে বিদেশী প্রভাব অনুপ্রবিষ্ট হয়ে যায় কাব্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে। সেই প্লাবন দ্বারা আনীত পলিমাটিতে যে সৃষ্টি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তার মধ্যে স্বদেশী ভাষা আর স্বদেশী চিন্তাধারাই ছিল প্রধান উপজীব্য। যে যুগের নামকরা লেখকদের মধ্যে লিসকাউ, রাবেনা ও গটশেভ, বেলির প্রভৃতির নাম অবশ্যই করতে হয়। সৃজনশীল সাহিত্যের সঙ্গে সমালোচনা সাহিত্যও উন্নত হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবে।

আমি যে সব সাহিত্যরসিক বন্ধুদের সঙ্গে খুব বেশি মিশতাম তারা হলেন ক্লোজার আর কেনেন। তাছাড়া বিভিন্ন সাহিত্যগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে লেখা আর সমালোচনা পড়ে আমার একটা ধারণা স্পষ্ট হলো। আমাদের যুগের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় দোষ এই যে সে যুগে সব লেখাই অনাবশ্যকভাবে আবেগপ্রধান ও দীর্ঘায়িত হয়ে উঠত। তাতে আসল বক্তব্য খুব কম থাকত আর যাও বা থাকত বা অস্পষ্টভাবে কুয়াশায় ঢাকা। আমি বুঝলাম লেখার মধ্যে আরও স্পষ্টতা, পরিমার্জিত চিন্তাশীলতা ও সংক্ষিপ্ত হওয়া প্রয়োজন। আমার কিন্তু রেনির আর উইল্যান্ডের লেখা খুবই ভালো লাগত। উইল্যান্ডের লেখার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল আলোছায়ার এক অপূর্ণ খেলা। বাস্তব অভিজ্ঞতার এক প্রখর প্রতপ্ত আলোর ঝলকানির সঙ্গে অবান্তর এক আদর্শের ছায়াপথ।

প্রাণমাতানো এক চঞ্চল খেলা মেতে উঠত তাঁর লেখার মধ্যে। এই আবহাওয়ার মধ্যে আমিও লেখা শুরু করে দিলাম। কবিতা লেখার উপর জোর দিলাম। আবার কিছু লেখা বাড়িতে বাবার কাছে ফেলে আসি। তারপর এখানে এসে বহু সুযোগ্য। সাহিত্যরসিক ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশার ফলে আগের থেকে অনেক পরিণত লেখাও কিছু লিখি। কয়েকটি প্রবন্ধও লিখেছিলাম।

এই সময় গ্রেনেচের মতো আর একটি মেয়ের প্রেমে পড়ি। সেও হোস্টেলে কাজ করত। তার নাম ছিল অ্যালেত্তে। মেয়েটি গ্রেনেচের মতোই ছিল সুন্দরী। কিন্তু গ্ৰেচেনের থেকে অনেক শান্ত ও স্বভাবা। গ্ৰেচেনের তেজস্বিতা ও দৃঢ়তা তার ছিল না। সে আমাদের খাবার তৈরি করত, রাত্রে মদ এনে দিত। আমাদের ফরমাশ খাটত। তাকে খুব ভালো লেগে গেল আমার। এই ভালো লাগা যতই ভালোবাসায় পরিণত হয়ে উঠল ততই তার চরিত্র সম্বন্ধে সন্দেহ জাগত আমার মনে। আমি বেশ বুঝতে পারলাম এ সন্দেহ অকারণ, সত্যিই সে নিরীহ। তবু মন আমার বুঝত না। কেবলি মনে হতো সে হয়ত গোপনে আরও কাউকে ভালোবাসে, মনে হতো হয়ত হে বহুবল্লভা। অথচ আমি জানতাম অ্যালেত্তে আমায় মন-প্রাণ নিয়ে ভালোবাসে এবং আমাকে খুশি করার জন্য সে অনেক কিছু করে। তবু একদিন আমি আমার সন্দেহের কথা তাকে বলে কত মনোকষ্ট দিলাম তাকে।

তবে অ্যালেত্তের প্রতি আমার আবেগের প্রবণতাটা কমতে আমি প্রেমিকাদের খামখেয়াল নামে একটি নাটিকা লিখে ফেললাম। গ্ৰেচেনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশতে যে পরিণাম ভোগ করতে হয়েছিল আমার তাতে একটা শিক্ষা হয়েছিল। আমার তথাকথিত ভদ্র সমাজটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছিলাম। যে অভিজাত সমাজ মুখে বড় বড় ন্যায়-নীতি, আইন-কানুন প্রভৃতির কথা বলে তারাই সুড়ঙ্গপথে পার করে বেশি। এই নৈতিক অনুশাসন সব বইয়ের ব্যাপার। মুখের কথা যা শুধু সমাজের উপরিপৃষ্ঠে ভেসে বেড়ায়। সমাজের গভীরে বা মানুষের বাস্তব আচরণে তার কোনও স্থান নেই। শহরের পিচঢালা মসৃণ রাজপথের দুধারে বড় বড় সুদৃশ্য বাড়িগুলোতে যারা বাস করে তারা লোকচক্ষে দ্র ও অভিজাত শ্রেণী। সবাই তাদের খাতির করে। কিন্তু সেই সব বাড়িতে ঘুরে ঘুরে আমি দেখেছি অবৈধভাবে টাকা রোজগার, অবৈধ সংস্পর্শ, স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া, বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রভৃতি নানা অকর্ম-কুকর্ম ও অশান্তি লেগেই আছে। সেখানে। তার উপর তাদের বাড়িতে খুন, ডাকাতি, মেয়ে নিয়ে অশান্তি, বিষ খাওয়া প্রভৃতি কত অশান্তি। অনেক সময় অনেক পরিবারের বন্ধু হিসাবে আমি তাদের বিপদে সাহায্য করতাম। সেই সব বিপদের কথা বাইরে প্রকাশ করতাম না। এই সব পরিবারের কোনও নোংরামি বা দুর্ঘটনার কথা বাইরে বড় একটা প্রকাশ হতো না বলে কেউ জানতে পারত না। এই সব পারিবারিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা নিয়ে আমি দু-একটা নাটকও লিখেছিলাম। কিন্তু যত কুকর্মের কথা স্কুলভাবে বলা ছিল বলে সে নাটক সার্থক শিল্পরসে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

এরপর কিছু হাসির নাটক লিখি আমি। এই সময় মাদাম বমি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকে আমি আর বিশেষ যেতাম না তাদের বাড়িতে। তার স্বামীর বক্তৃতা আমার ভালো লাগত না। তিনি আমাকে প্রায়ই বকতেন। তাই আমি তাঁকে এড়িয়ে চলতাম। একদিন তার ক্লাসে আমি তার বক্তৃতার নোট না লিখে আমার খাতার পৃষ্ঠায় ছবি আঁকছিলাম। তাই দেখে আমার পাশের ছাত্ররা অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল।

আমার অমনোযোগী মনটাকে আরও গভীর ও আগ্রহশীল করে তোলার জন্য অধ্যাপক লোকটি আমাকে ধর্মের দিকে টানার চেষ্টা করলেন। নিয়মিত চার্চে যাওয়া, স্বীকারোক্তি করা, সমবেত প্রার্থনা ও যোগ প্রভৃতির প্রতি অভ্যাস গড়ে তুলতে বললেন। এসবও আমার ভালো লাগত না। তবু গেলার্তকে আমাদের ভালো লাগত। তাছাড়া প্রোটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় রীতিনীতি আমার মোটেই পছন্দ হতো না। অথচ গেলার্ত আমাদের বোঝাতে চাইত ক্যাথলিকদের থেকে প্রোটেস্ট্যান্টদের রীতিনীতি অনেক ভালো। এখানে স্বীকারোক্তির জন্য বাধ্য করা হয় না কোনও মানুষকে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বীকারোক্তির পক্ষে, কারণ মানুষ অনেক গোপন অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করে হালকা হয়ে ওঠে মনে মনে। আমার এই ধরনের একটা গোপন কথা ছিল। ধর্ম সম্বন্ধে এক বিরাট সংশয় ছিল আমার মনে। এই সংশয়ের কথা আমি স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ব্যক্ত করতে চাই কোনো সহৃদয় মানুষের কাছে। কিন্তু তারও কোনো ব্যবস্থাই নেই আমাদের ধর্মীয় রীতিতে।

হঠাৎ এক মহান ব্যক্তির সংস্পর্শে এলাম লিপজিগ শহরে। আমি যেন এই ধরনের একটা মানুষকেই খুঁজছিলাম। তিনি হলেন বেহরিস্ক। আগে তিনি কাউন্ড লিন্দেনাদের ছেলের গৃহশিক্ষক ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল তিরিশের কিছু বেশি। রোগা অথচ সুগঠিত চেহারা। লম্বা নাক। সাদাসিধের উপরেই বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতেন।

বেহরিস্ক এক অদ্ভুত মানুষ। কবিতা তিনি ভালোবাসতেন। তবে আধুনিক কোনও কবির কবিতা ভালো লাগত না তাঁর। আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কিছু অমিল ছিল তাঁর। তবু বেহরিস্ক তাঁর সেই ভালো না লাগার কথা এমন সুন্দরভাবে বুদ্ধির সঙ্গে পরিহাসরসিকতা মিশিয়ে বলতেন আর তার উপর আমি কিছু বলতে পারতাম না। তাছাড়া তাঁর জার্মান ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশুনা ছিল প্রচুর। লিখতেও ভালো পারতেন। এক উন্নতমানের রুচিবোধ ছিল তাঁর আর তাই দিয়ে যে কোনও কবিতা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভালো-মন্দ দিকগুলো বলে দিতে পারতেন তিনি।

বেহরিস্ক আমায় ভালোবাসতেন। তাঁর প্রেরণাতেই নূতন করে কবিতা লিখতে শুরু করি আমি। কিন্তু বেহরিস্ক এই শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আমার কবিতা কখনও ছাপানো চলবে না। আমি আমার লেখা কবিতাগুলো তাঁর হাতে লিখে দেব আর তিনি সেগুলোর থেকে থেকে বেছে ভালো করে লিখে তার একটি সংকলন বাঁধিয়ে আমার হাতে তুলে দেবেন।

এই ধরনের একটা সংকলন সত্যিই সুন্দরভাবে আত্মপ্রকাশ করল রেহরিস্কের চেষ্টায়। লেখাগুলো খুবই প্রশংসা পেল। সংকলন পড়ে বাড়ি থেকে বাবা একখানা চিঠি লিখে পাঠালেন আমায় প্রশংসা করে। অধ্যাপক ক্লোডিয়াস ও গেলার্ত গদ্য ও পদ্যের রীতি সম্বন্ধে কিছু গালভরা উপদেশ দিলেও মোটের উপর ভালো বললেন।

কিন্তু হঠাৎ রেহরিস্কের মৃত্যু ঘটায় আমি দারুণ মুষড়ে পড়লাম। উনি ছিলেন একাধারে আমার বন্ধু, পরিচালক এবং প্রধান উপদেষ্টা। সেই রেহরিস্ককে বাদ দিয়ে জীবনে কিভাবে চলব তা খুঁজেই পেলাম না। এক অদম্য শোকাবেগের বিহ্বলতায় বেশ কিছুদিন কেটে গেল আমার।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

বেহরিস্কের পর যিনি আমার সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তিনি হলেন ওয়েজার। বেহরিস্কের সঙ্গে কতকগুলো বিষয়ে যেমন তার পার্থক্য ছিল তেমনি আবার কতকগুলো সাদৃশ্যও ছিল। এই কারণেই দুজনের মধ্যে আসে তুলনার কথা। সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের কথা, বেহরিস্কের মতো ওয়েজারও অন্তহীন কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিতে চাইতেন জীবনটাকে।

ওয়েজার ছিলেন শিল্পরসিক। নিজেও আঁকতে পারতেন। তবে রেহরিস্ক যেমন কাব্যরসিক হয়েও আধুনিক কবিতা পছন্দ করতেন না তেমনি ওয়েজারও শিল্পরসিক হলেও আধুনিক শিল্প পছন্দ করতেন। তিনি প্লেজেনবার্গ প্রাসাদে অ্যাকাডেমি অফ ডিজাইন-এর অধিকর্তা ছিলেন। তবে অবসর সময়ের সমস্তটাই ছবি এঁকে কাটাতেন। প্রাচীন শিল্পরীতিতেই তিনি ছিলেন বিশ্বাসী। ওয়েজারের একটা গোঁড়ামি ছিল, একবার যদি তিনি কাউকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করতেন তাহলে সে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা হতে কখনও টলতেন না তিনি। কোনও অবস্থাতেই তাঁর মতের পরিবর্তন হতো না।

ওয়েজার যে ঘরে থাকতেন সে ঘরটা ছিল শিল্পরসের আবহাওয়ায় সিক্ত। বেহরিস্কের সংস্পর্শে এসে আমি যেমন নাটক ছেড়ে নূতন করে কবিতা লিখতে শুরু করি, তেমনি ওয়েজারের সংস্পর্শে এনে নূতন করে চিত্রশিল্প আঁকতে শুরু করি। তবে আধুনিক শিল্প বাজে হচ্ছে ওয়েজার-এর এ মত কিছুতেই মানতে পারলাম না আমি।

আমি আমার ছবি আঁকার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলাম। শিল্প সম্বন্ধে ওয়েজারের শিক্ষাদীক্ষা আমাদের মনে যথেষ্ট উৎসাহ ও প্রেরণার সঞ্চার করত। কিন্তু ওয়েজারের নিজের আঁকা ছবিগুলো মোটেই ভালো লাগত না আমাদের। তাঁর হাতে কোনও বস্তুর আকৃতিটা মোটেই ফুটে উঠত না ভালো করে।

ওয়েজারের আর একট বড় কাজ হলো থিয়েটারের জন্য একটা বড় বাড়ি নির্মাণ। সে বাড়ির সামনে প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিস ও অ্যারিস্টোফেনস-এর মূর্তি স্থাপন করা হলো আর সেই সব মূর্তি চারপাশে রইল আধুনিক জার্মানির নাট্যকারদের মূর্তি। আবার তার সঙ্গে ছিল কলাবিদ্যার বিভিন্ন অধিষ্ঠাতী দেবীর ছবি।

ওয়েজার চিত্রশিল্প সৃষ্টির কাজে নিজে খুব সার্থক না হলেও আমাদের আঁকার কাজে শিক্ষা দিতেন ভালো। আঁকার কাজে শিক্ষার্থীদের কোথায় কি ত্রুটি তা ঠিক করতে পারতেন। তবে নিজের হাতে কোনও বিষয়ে দেখিয়ে না দিয়ে তিনি শুধু আমাদের দোষটা ধরিয়ে ভাবতে বলতেন যাতে আমরা নিজেরাই উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারি।

এই সময় দার্জেনভিলের লেখা চিত্রকরদের জীবনী গ্রন্থটি জার্মান ভাষায় অনূদিত হলো। সেই অনুবাদটির মধ্য দিয়ে চিত্রকলার এক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলাম আমরা। আবার আমার মনে এই সব বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন শিল্পীর ছবি দেখে কবিতা লেখার প্রেরণা জাগত আপনা থেকে।

ওয়েচারের আর একটা গুণ ছিল। মৃত ব্যক্তিদের ছবি আঁকতে ভালোবাসততা। মৃতদের স্মরণ করার একটা ঝোঁক ছিল।

তখন লিপজিগ শহরে জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সমন্বয় ঘটেছিল। এঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বেশ নামকরা। তাঁরা হলেন হুবার, কুশপ আর উইঙ্কলার হুবার জার্মান সাহিত্যের ইতিহাসটাকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন। এটা সত্যিই বিরাট কাজ যার জন্য ফরাসিরা কৃতজ্ঞ থাকবে চিরদিনের জন্য। বাকি দুজন ছিলেন শিল্পরসিক।

কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত রসতৃপ্তি ঘটেনি। কিছুতেই মন ভরছিল না আমাদের। আমরা চাইছিলাম এর নূতন আলো। চাইছিলাম আমাদের পরিচিত কোনও শিল্পী সে আলো নিয়ে আসবে।

মানুষের মন সাধারণত দুভাবে আনন্দ পায়। এক হচ্ছে প্রত্যক্ষীকরণ আর অন্যটি হলো ধ্যানধারণা। প্রত্যক্ষীকরণের মধ্য দিয়ে আনন্দ পেতে হলে হাতের কাছে পার্থিব বস্তু বা উপাদান ভালো থাকা চাই। কিন্তু ধ্যানধারণার একটা সুবিধা এই যে, এর মাধ্যমে বাস্তব প্রতিরূপ ছাড়াই কোনও ভালো বিষয়বস্তুকে মনের মতো উপভোগ করা যায়।

এই সময় আমি আর্নল্ডের ‘মি হেস্ট্রি অফ দি চার্চ অ্যান্ড অফ হেরেটিকস’ নামে একখানি বই পাই হাতে। বইখানি পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আর্নল্ডের মধ্যে ধর্ম বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আমার মতের মিল হয়। যুগে যুগে দেশে দেশে ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের ধারণা যাই হোক, ধর্মের ইতিহাস ও দর্শন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে মানবাত্মা নিরন্তর সংকোচন ও প্রসারণের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য সাধন করে চলেছে। মানুষের সত্তাটি একাধারে আত্মগত ও বিশ্বগত। কখনও সে সত্তা বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে নিজের মধ্যে নিজেকে কেন্দ্রীভূত করে সংগঠিত করে চলেছে, আবার কখনও বা নিজেকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিকে সম্প্রসারিত করতে চাইতে। নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে।

নবম পরিচ্ছেদ

বসন্তকাল আসতেই আমি ভালোভাবে সেরে উঠলাম। আমি আমার হারানো স্বাস্থ্য আবার ফিরে পেলাম। আর আমার বাড়িতে থাকতে ভালো লাগছিল না। তাছাড়া বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ভালো যাচ্ছিল না। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে যাতে মনে হতো সব কিছু মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, মানুষ যেন ইচ্ছামতো জীবনের যে কোনও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। কথায় কথায় আমিও কয়েকটি ক্ষেত্রে আঘাত দিয়ে ফেলেছি তাঁকে।

এরপর আমি স্ট্রসবার্গ শহরে আইন পড়তে গেলাম। রাইন নদীর ধারে অবস্থিত ছবির মতো সাজানো শহরটাকে আমার ভালো লাগত। শহরটার চারদিকে বড় বড় গাছে ভরা প্রান্তর। নদীর ধারটা বড় চমৎকার।

আমি সেখানে আমার আইনপড়া সম্পর্কে ডক্টর সালিকম্যান নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললাম। আমাকে কতদিন থাকতে হবে, কতগুলো বক্তৃতায় যোগদান করতে হবে সেসব বিষয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন এখানে কাজ চালাবার মতো মোটামুটি ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, আইনবিদ্যা গভীরভাবে পড়তে হবে জার্মানির কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি আমাকে বলতেন, এখন যা করে হোক একটা ডিগ্রি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দাও।

এতে কিন্তু আমার মন ভরছিল না। আমি সব কিছুর ইতিহাস জানতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম আমি যা পড়ব তার ক্ষেত্রটি হবে একই সঙ্গে বিরাট ব্যাপক এবং গভীর এবং আমি তাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করব।

আমি যে বোর্ডিংয়ে থাকতাম সেখানে বেশিরভাগ সদস্য ডাক্তারি ছাত্র ছিল। তারা সব সময় চিকিৎসাবিদ্যার কথা বলত। ডাক্তারি পড়ার ছাত্রদের তাদের পাঠ্য বিষয়ের প্রতি অনুরাগের আতিশষ্যের কারণ প্রধানত দুটো। প্রথম কথা, মানুষের রোগ ও দেহতত্ত্বের ব্যাপারটার একটা নিজস্ব আকর্ষণ আছে। মানুষ হিসাবে সবাই তা জানতে চায়। আর একটা কারণ আর্থিক লোভ। ডাক্তারি পাশ করে চিকিৎসা ব্যবসায় শুরু করলেই আসবে টাকা আর প্রতিষ্ঠা। এজন্য দেখতাম ডাক্তারির ছাত্ররা সব সময় সর্বশক্তি দিয়ে পড়াশুনো করত অথবা গভীর আগ্রহের সঙ্গে পড়ার বিষয়ে আলোচনা করত।

আমি আইনের ছাত্র হলেও তাদের আলোচনার স্রোত আমাকে অনেক সময় অনেক দূরে টেনে নিয়ে যেত। দেহতত্ত্বকে কেন্দ্র করে সাধারণভাবে বিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহকে বাড়িয়ে দিত।

এমন সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যা আমাদের মনটাকে দিনকতকের জন্য পড়াশুনোর চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। হঠাৎ খবর এল অস্ট্রিয়ার ডিউককন্যা ও ফ্রান্সের রানি মেরি আঁতানোৎ স্ট্রসবার্গ হয়ে ফ্রান্সে তাঁর স্বামীর কাছে যাবেন। স্ট্রসবার্গে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হবে এবং শহরের বাইরে রাইন নদীর তীরে অবস্থিত এক সুসজ্জিত প্রাসাদে তিনি ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে মিলিত হবেন। এই উপলক্ষে এক বিরাট উৎসবে মেতে উঠল সারা শহর। পরে প্যারিসে বাজি পোড়ানো হলো। হুড়োহুড়ি ও পুলিশের বাড়াবাড়িতে কিছু লোক নিহত ও আহত হলো।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রেটারি ও প্রভাবশালী কর্মচারী মাসম্যান-এর সঙ্গে হঠাৎ আমার পরিচয় হয়ে গেল। সে ছিল ভালো বাগ্মী এবং বিচক্ষণ। তার সঙ্গে অনেকে মিশতে চাইত। কিন্তু আমার কিছু কিছু বিষয়ে জ্ঞান ছিল আমার বিচারবুদ্ধি সংস্কারমুক্ত ছিল বলে সে আমাকেই বেশি পছন্দ করত তার সঙ্গী হিসাবে। সে আমার হিতাকাক্ষী হিসাবে পরামর্শ দিত বিভিন্ন বিষয়ে।

আমি স্ট্রসবার্গে ফ্রান্সের রানির আগমন উপলক্ষে জীবনে এই প্রথম ফরাসি ভাষায়। একটি কবিতা লিখি।

গ্ৰেচেনের সঙ্গে আমার প্রেম সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে আমি সাধারণত আনন্দোৎসবের ঘটনাকে এড়িয়ে চলতাম। আমি নিজেকে যেন আত্মনিগ্রহের পথে ঠেলে দিয়েছিলাম স্বেচ্ছায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও লিপজিগে থাকার সময় আমোদ-প্রমোদের সাধারণ উপকরণ বা উপাদান থেকে সরে থাকতাম আমি।

কিন্তু স্ট্রসবার্গে আসার পর এ বিষয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে সুযোগ পেয়ে গেলাম। একে একে নাচের আসতে যেতে শুরু করলাম। শুধু শহরের মধ্যে নয়, মাঝে মাঝে গ্রামাঞ্চলেও যেতাম। পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে অবসয় পেলেই যেমন জার্মান শিক্ষা সংস্কৃতির সম্বন্ধে চর্চা করতাম তেমনি সন্ধের দিকে কোথাও কোনও নাচগাচের আসরে সুযোগ পেলেই যোগদান করতাম।

এক সময় লার্সে নামে এক যুবকের সঙ্গে আলাপ হয় আমার। আলাপ-পরিচয় হতে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠি আমরা। সে সব সময় নিজেকে নায়ক ভাবত। সে প্রায়ই বলত ঈশ্বর তাকে নায়ক করেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কি যুদ্ধ কি প্রেম সবেতেই সিদ্ধহস্ত সে। যুদ্ধের বীর ও প্রেমের নায়ক হিসাবে সে সব সময় তার মাথা উঁচু করে থাকবে। দ্বিতীয় কোনও ভূমিকা সে কখনও কোথাও গ্রহণ করবে না। আমি তার কথা মনে রেখেছিলাম, ‘আইরন হ্যান্ড’ নাটকে ফ্রৎস নামে একটি চরিত্রের মধ্যে তাকে মূর্ত করে তুলি আমি। সে সব সময় বড় বড় কথা বলত এবং সে কখনও কোনো অবস্থায় কারও কাছে মাথা নত করলেও আত্মমর্যাদা ত্যাগ করত না।

শুধু নাচের আসরে গেলেই হবে না। ভালো নাচ শিখতে হবে। ওয়ালৎস নৃত্য আমার শিখতে ভালো লাগত। কিন্তু এ বিষয়ে আমার কোনও পারদর্শিতা ছিল না। তাই একজন নাচের শিক্ষকের কাছে নিয়মিত নাচ শিখতে লাগলাম। তার একটা ছোট বেহালা ছিল। আমি অল্পদিনের মধ্যেই ভালোভাবে নাচ শিখে তাঁকে সন্তুষ্ট করলাম।

তার দুটি মেয়ে ছিল। তাদের বয়স তখনও কুড়ি পার হয়নি। তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাদের মধ্যে ছোট এমিলিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম আমি। কিন্তু এমিলিয়ার ও আমার এই ঘনিষ্ঠতা বড়বোন লুসিন্ডা মোটেই ভালো চোখে দেখত না। উল্টে ঈর্ষাবোধ করত এমিলিয়ার উপর।

একদিন এক বুড়ির কাছে তার ভবিষ্যৎ গণনা করতে যায় লুসিন্ডা। আমি তাকে ও তার বোনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। বুড়ি লুসিন্ডার হাত দেখে বলে, তার প্রেমিক দূরে আছে। সে যাকে ভালোবাসে সে কিন্তু তাকে ভালোবাসে না; সুতরাং মিলনের আশা কম। তাদের প্রেমের মাঝখানে একজন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার চিঠিপত্র লিখে বা কিছু টাকা দিয়ে দেখতে পার।

লুসিন্ডা বলল, আমার ভালোবাসা যদি সত্য হয় তাহলে আর কিছুই লাগবে না। সে আমার প্রেমের প্রতিদান দেবেই।

বুড়িকে টাকা দিয়ে চলে এলাম আমরা। আমি প্রায়ই তাদের বাড়ি যেতাম। একদিন এমিলিয়া তার জীবনের সব কথা খুলে বলল আমায়। সে বলল, সে আগে একটি ছেলেকে ভালোবাসত। সে এখন দূরে। তবু আজও তাকে ভালোবেসে যায়। তবে তুমি আসার পর থেকে তোমার গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারছি না। এদিকে দিদি লুসিন্ডা আবার তোমাকে ভালোবাসে অথচ তুমি আমার প্রতি আসক্ত। হায়, তুমি আমাদের দুজনের কাউকেই সুখী করতে পারলে না। একজনকে ভালোবেসে শুধু দুঃখ দিলে আর একজনকে ভালোবাসা দিতে না পেরে দুঃখ দিলে।

আমরা সোফায় বসে কথা বলছিলাম। এমিলিয়ার কথা শেষ হতে আমি তাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে চুম্বন করলাম। সে বলল, এই হয়ত আমাদের শেষ দেখা। আমি উঠে পড়লাম। সে দরজার কাছ পর্যন্ত এগিয়ে এল।

এমন সময় লুসিন্ডা ঝড়ের বেগে পাগলের মতো ঘরে ঢুকল। তার বোনকে বলল, একা তোর কাছেই ও শুধু বিদায় নেবে? আমি কেউ নই? আর আগেও তুই এইভাবে আমার প্রেমিককে ছিনিয়ে নিয়েছিস।

এই বলে সে জোর করে আমাকে ধরে আমার গালে তার চোখ দুটো ঘষতে লাগল। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে দিয়ে সোফার উপর সটান শুয়ে পড়ল লুসিন্ডা। এমিলিয়া তার কাছে গেলে সে তাকে সরিয়ে দিল।

আমি কোনওরকমে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে। মনে মনে সংকল্প করলাম এ বাড়িতে জীবনে আর কোনওদিন আসব না।

দশম পরিচ্ছেদ

জুং স্টিলিং-এর মতো হার্ডারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আমার জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আর একটা বিরাট আকর্ষণশক্তি ছিল যা আমাকে ক্রমাগত টানত তার দিকে। তার সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে মিশলেও তাকে কিন্তু আমি আমার কতকগুলো ব্যক্তিগত গোপন কথা বলিনি। যেমন গোয়েৎস ভর বার্লিসিঞ্জেন ও ফাউস্টকে নিয়ে আমি যে লেখার কথা ভাবতাম তাদের কথা বলিনি তাকে।

যাই হোক, হার্ডারের একবার অসুখ করতে বাইরে কোথাও বেড়াতে যাবার জন্য মন হাঁপিয়ে উঠল আমার। আমি সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম। হার্ডার রোগমুক্ত হতেই আমরা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে হার্ডার আর একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আর দুজন পাবর্ত্য অঞ্চলের অধিবাসীকে নিয়ে আমি ঘোড়ায় চেপে জেবার্নের পথ রওনা হলাম।

জেবার্নে একমাত্র দেখার জিনিস হলো বিশপের প্রাসাদ। এরপর আমরা পাহাড়ের উপর উঠে জেবার্ন স্টেয়ার্স নামে এক স্থাপত্যকীর্তির বিরাট নিদর্শন দেখলাম। তখন সবেমাত্র সূর্য উঠছিল পাহাড়ের মাথায়। সেদিন ছিল রবিবার। বেলা নটার সময় আমরা পাহাড় থেকে নিচে শহরে নেমে এলাম।

এরপর আমরা বুখনওয়েলার নামে আর একটি শহরে গেলাম। সেখানে ওয়েল্যান্ড নামে আমাদের এক বন্ধু ছিল। সে আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। আমরা আরও উপরে উঠার মনস্থ করলাম। পার্বত্য প্রদেশের আরও মনোরম দৃশ্য হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল আমাদের। পাহাড়ের উপর অবস্থিত লিচেনবার্গের প্রাসাদ দেখার পর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়েই সহসা সামনে দেখতে পেলাম আলসেসিরি বিশাল প্রান্তর যা দূরে-বহুদূরে পাহাড়ের ছবি আঁকা দিগন্তের কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়, নদী, যা কিছুই দেখি তাই বিস্ময় সৃষ্টি করে আমার মনে। তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন জাগায়। পথে কোনও নদী দেখলেই মনে হয় ছুটে যাই তার উৎসদেশে। কোনও পাহাড় দেখলেই মনে হয় তার মাথায় উঠে যাই। দেখি তার বুকের অরণ্যের মাঝে।

এরপর আমরা উত্তর-পশ্চিমের পর্বতমালার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এগিয়ে যেতে লাগলাম লোরেনের পথে। এরপর শুরু হলো অরণ্যপথ। এক-একটা পাহাড়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক-একটা গহন অরণ্য। পথে যেতে যেতে একটি মুখখোলা কয়লাখনি দেখলাম। তারপর দেখলাম একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। পাহাড়ের মাথায় পাথরগুলো আগুনে পুড়ে লাল হয়ে উঠেছে। অনবরত ধোঁয়া উঠছে। পাহাড়ের কাছে যেতেই আমাদের পায়ে গরম অনুভব করলাম। কেউ জানে না কখন কিভাবে আগুন এল এখানে।

এরপর ফেরার পালা। এই সময় ইংরেজ লেখকও কবি গোল্ডস্মিথের ‘ভিকার অফ ওয়েকফিল্ড’ বইখানি আমাকে সঙ্গদান করত। বইখানির জার্মান অনুবাদ পড়তে লাগল আমার। আমার প্রিয় সেসেনহেমে ফিরে এলাম।

ওয়েল্যান্ড আমাদের সঙ্গেই ছিল। আমরা যে গাঁয়ের পান্থশালায় ডেরা নিয়েছিলাম সেখানে এক পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হই আমি। সে পরিবার ওয়েল্যান্ডের পরিচিত। পরিবার মানে দুই বোন, এ ভাই আর বাবা-মা। আমার মনে হলো, ঠিক যেন সম্প্রতি পড়া গোল্ডস্মিথের ওয়েকফিল্ড। প্রতিটি চরিত্র হুবহু মিলে যাচ্ছে। আমার অবশ্য ছোট বোনও ফ্রেডারিকাকেই বেশি সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বলে মনে হতো, তবে বড় বোনও কম সুন্দরী নয়।

ওদের বাবার থেকে মার ব্যক্তিত্বই বেশি মনে হলো। শিক্ষিতা ও মার্জিত রুচিসম্পন্না ভদ্রমহিলাকে দেখলে একই সঙ্গে ভয় ও শ্রদ্ধা জাগে। বোন দুজনের মধ্যে দেখলাম গ্রাম্যতা ও নাগরিকতার দ্বৈত সমন্বয়ে গড়া একটা মিশ্র ভাব।

বিশেষ করে ছোট বোন সুন্দরী ফ্রেডারিকার সঙ্গে আলাপ করে তার স্বভাবের অনাবিল মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। একদিন তার কাছে বসে অনেকটা সময় কাটালাম। পরে ওয়েল্যান্ডকে প্রশ্ন করলাম, ফ্রেডারিকা কি কাউকে ভালোবেসেছিল বা এখনও বাসে? সে কি কারও বাগদত্তা? ওয়েল্যান্ড আমার সব প্রশ্নের উত্তরেই ‘না’ বলল। আমি বললাম, কোনও মানুষ ভালো না বাসলে এত প্রাণ খুলে হাসতে পারে না। আমার মনে হলো ফ্রেডারিক নিশ্চয় কাউকে ভালোবেসে হারিয়ে আবার তাকে খুঁজে পেয়েছে। জীবনের পরম ধনকে হারিয়ে পাওয়ার দ্বিগুণ আনন্দে তাই এত আত্মহারা। অথবা তার কোনও দীর্ঘায়িত প্রণয়সম্পর্ক আশা-নিরাশার চড়াই-উত্রাই পার হয়ে অবশেষে শুভ পরিণয়ে সার্থক হতে চলেছে।

একাদশ পরিচ্ছেদ

আবার ফিরে এলাম আমার পড়ার জায়গায়। ফিরে এলাম আমার ছাত্রজীবনে। মনের মধ্যে সংকল্প গড়ে তুললাম, আইনবিদ্যায় আমায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করতে হবে। চিকিৎসাবিদ্যা আমাকে আকৃষ্ট করলেও আমার আরব্ধ কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হবেই।

তবু সেসেনহেম গাঁয়ের সেই সন্ধ্যাটা ভুলতে পারলাম না। ভুলতে পারলাম না ফ্রেডারিকের কথা। আমি সেখানে এক সন্ধ্যায় একটা গল্প লিখে ওদের শুনিয়েছিলাম। ওরা আগ্রহসহকারে শুনেছিল। গল্প শেষ হলে আমার আবার এই ধরনের গল্প লিখতে বলেছিল।

ওদের কথা ভেবেই আমি একদিন ঘোড়ায় করে আবার গিয়ে উঠলা সেসেনহেম গাঁয়ে।

আমি ফ্রেডারিকদের বাড়ি গিয়ে দেখলাম ওরা দুই বোন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাকে দেখেই সে তার দিদিকে বলল, সে যা বলেছিল তাই সত্য হলো। আমি আজ তাদের বাড়ি যাব একথা সে নাকি আগেই অনুমান করে তার দিদি অলিভিয়াকে বলেছিল।

অলিভিয়া হাসতে লাগল। ওদের মা আমাকে আত্মীয়ের মতোই সহজভাবে অভ্যর্থনা করলেন। পরদিন সকালে ফ্রেডারিকা আমাকে সঙ্গে করে বেড়াতে নিয়ে গেল। ওর মা ও দিদি ব্যস্ত ছিল বাড়ির কাজে। আজ ওদের বাড়িতে কয়েকজন অতিথি আসবে। সেদিন ছিল রবিবার ফ্রেডারিকার পাশে ছুটির দিনের উজ্জ্বল সকালটাকে এমন এক সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশে কাটাতে অদ্ভুত ভালো লাগছিল আমার।

ওদের বাড়িতে ফিরে এসে দেখলাম ওদের অতিথিরা এসে গেছে, দেখলাম ওরা ফ্রেডারিকাকে খুব ভালোবাসে। আমি জীবনে যত মেয়ের সংস্পর্শে এসেছি তাদের সাধারণত দুই শ্রেণীতে ভাগ করে দেখি আমি। এক শ্রেণীর মেয়েদের ঘরের মধ্যে ভালো লাগে। ভালো লাগে তাদের পাকা গৃহিণীরূপে। আমার মন হয় ফ্রেডারিকা এমন শ্ৰেণীর মেয়ে যাকে ভালো লাগে ঘরের বাইরে। সে এখন মুক্ত আকাশের তলে বিস্তৃত পথের উপর দিয়ে চলে তখন তার দেহের অপূর্ব যৌবনসৌন্দর্য ফুল্লকুসুমিত উদার উন্মুক্ত প্রান্তরের সঙ্গে যেন মিশে এক হয়ে যায়। তার মুখের হাস্যোজ্জ্বল আনন্দ যেন নীল আকাশ থেকে টাটকা ঝরে পড়া এক আশ্চর্য বস্তু। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য সে যেন ঘরের মধ্যেও বয়ে আনে আর তাই বোধ হয় যে কোনও অপ্রীতিকর প্রতিকূল অবস্থাকে কত সহজে কাটিয়ে উঠতে পারে ফ্রেডারিকা।

ওদের বাড়িতে থাকার সময় একদিন রাতে হঠাৎ লুসিন্ডাকে স্বপ্নে দেখলাম। সে স্বপ্ন উত্তেজনায় উত্তাল হয়ে উঠল আমার দেহের সমস্ত রক্ত। মনে হলো লুসিভা আমাকে আবেগের সঙ্গে ধরে আমার মুখে চুম্বন করে আমার কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। তার মুখে ফুটে উঠেছে তীব্র ঘৃণার ভাব। সে তার বোনকে অভিশাপ দিচ্ছে। অভিশাপ আমার উপরেও বেশ কিছুটা পড়েছে। আর সেই অভিশাপ বর্ষণের মাঝে স্লানমুখে দাঁড়িয়ে আছে তার বোন।

আমি আবার শহরে ফিরে এলাম। ফ্রেডারিকার বাবাকে একটা কথা দিয়েছিলাম। উনি একটা বাড়ি তৈরি করতে চান গাঁয়ে। কিন্তু ওঁর পরিকল্পিত নক্সাটা কারও পছন্দ হচ্ছে না। আমি তাই শহরে এসেই আমার এক পরিচিত স্থপতিকে দিয়ে একটা সর্বাঙ্গ সুন্দর বাড়ির নক্সা করালাম। এরপর ফ্রেডারিকাদের আসতে বললাম ঐসবার্গ শহরে। এ শহরে ওদের এক আত্মীয় পরিবার আছে। সেখানে এসে ওরা সহজেই উঠতে পারে। ওরা কিন্তু কেউ শহরে আসতে চায় না। অলিভিয়া তো একবারে গ্রাম্য আচারে-ব্যবহারে। কিন্তু ফ্রেডারিকারও কোনও মোহ বা আগ্রহ নেই শহরের প্রতি। কিন্তু আমি তো ওদের বাড়ি কতবার গেছি, কতদিন থেকেছি। আর ওরা আমার একটা অনুরোধ রাখবে না।

অবশেষে ওরা এল। কিন্তু সত্যিই আমার ভালো লাগল না। আমার মনে হলো আমি সত্যিই ভুল করেছি। যদি আমি মনোরম গ্রাম্য পরিবেশে মুক্ত আকাশের তলে প্রবহমান নদীর ধারে নুয়েপড়া গাছের ছায়ায় দেখেছি, যাদের অঙ্গলাবণ্যকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখেছি, তাদের শহরের এই ইট কাঠ পাথরের কৃত্রিম পরিবেশে মোটেই ভালো লাগল না।

অবশ্য অন্তরের ভালোবাসা কোনও পরিবেশ মানে না। প্রতিকূল পরিবেশকেও অনুকূল করে তোলে। তবু পরিবেশের আনুকূল্যে ভালোবাসা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বেশি। সার্থকতা লাভ করে সহজে। তাই ওরা যখন চলে গেল তখন আমার মনে হলো আমার বুক থেকে যেন একা ভারী বোঝা নেমে গেল। আমি আবার সহজভাবে পড়াশুনোয় মন দিতে পারলাম।

ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে পড়তে আসার সময় আমি আবার বাবাকে কথা দিয়ে এসেছিলাম আমি ভালোভাবে আইন পাশ করব। বিশ্ববিদ্যালয় লাতিন ভাষায় লেখা আমার গবেষণার কাজ সমর্থন করল। আমি আইনের ডিগ্রি পেলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমায় বলল, এখন এই মুহূর্তে সেটা যেন প্রকাশ না করি। পরে ভালো করে আরও বড় করে সেটা লিখে যেন প্রকাশ করি। বাবাকে একথা জানালে তিনি আমাকে সেটা এখনি প্রকাশ করতে বললেন। কিন্তু আমি ভবিষ্যতে সেটা আবার ভালো আকারে প্রকাশ করার জন্য তার কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

আমি ডিগ্রি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধ্যাপক স্কফলিন মারা গেলেন। আমার মনের উপর তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত তবু পড়াশুনার অন্ত ছিল না তার। সারা জীবন ধরে তিনি রয়ে গেছেন শিক্ষার্থী। অসাধারণ হয়েও সাধারণ এই নিরহঙ্কার মানুষটি সহজেই টেনে নেন আমার মনকে। তিনি আমাদের পড়াতেন রাজনীতি।

এই সময় ফরাসি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো করি। কিন্তু সে সাহিত্যের কাছে আমি যা আশা করেছিলাম তা পেলাম না। ভলতেয়ার যিনি দীর্ঘকাল ফরাসি সাহিত্যের ক্ষেত্রটিকে আচ্ছন্ন করেছিলেন তিনি সৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। দিদেরো, রুমা, হলবার্ক প্রভৃতি এঁদের কল্পনা এতই নিচু যে আমরা তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারিনি আমাদের চিন্তাভাবনাকে।

সাহিত্যের মধ্যে আমি যা খুঁজছিলাম হঠাৎ তা পেয়ে গেলাম। এক অভাবিত সাফল্যের সঙ্গে পূর্ণতার সঙ্গে পেয়ে গেলাম শেকসপিয়ারের মধ্যে। শেকসপিয়ার নিয়ে তখন স্ট্রসবার্গ জ্ঞানচর্চা শুরু হয়েছিল। তাঁর মূল রচনার সঙ্গে সঙ্গে জার্মান ভাষায় অনূদিত রচনাও বিভিন্ন জায়গায় পড়া ও অভিনীত হতো। শেকসপিয়ারের উপর আমার বন্ধু হার্ডার একটা প্রবন্ধ লিখেছিল। এইরকম অনেকেই লিখত তখন। আলোচনা করত চারদিকে।

হঠাৎ কি খেয়াল হতে আমি একবার ওডিলেনবার্গে তীর্থযাত্রায় যাই। সেখানে গিয়ে অদ্ভুত এক কাহিনী শুনি। রোমান আমলের এক সুপ্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মাঝে দেখতে পাই একটি ভূমিসাৎ প্রাসাদের একটি দেওয়াল আজও দাঁড়িয়ে আছে। লোকে বলত ঐখানে কোনও এক ধর্মপ্রাণা কাউন্টকন্যা একা এক পবিত্র ধর্মজীবন যাপন। করতেন। আমি সে কাহিনী শুনে সেই অদৃষ্টপূর্ণ কাউন্টকন্যার এক মূর্তি কল্পনায় খাড়া করি।

কিন্তু যখন যেখানে যাই ফ্রেডারিককাকে ভুলতে পারি না কখনও। স্মৃতির মাঝে সমানে চলে তার স্বচ্ছন্দ আনাগোনা।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

দীর্ঘ অনুপস্থিতির আর দেশভ্রমণের পর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম। এবার কিন্তু আগের থেকে দেহমন দুটোই আমার অনেক উজ্জ্বল। মাকে আবার তেমনি মমতাময়ী ও স্নেহময়ীরূপে ফিরে পেলাম আমি। আপোসহীন অনমনীয় বাবা তার কল্পনাপ্রবণ আবেগপ্রবণ আমার মাঝে মা-ই ছিলেন একমাত্র সেতুবন্ধন। তিনি আমাদের সব দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দিতেন।

এই সময় আমরা শহরে এক সান্ধ্যসভায় যাতায়াত করতাম। শহরের উচ্চশিক্ষিত বিশিষ্ট লোকরা সেখানে আসতেন। তাঁরা আমাকে সাহিত্য সৃষ্টির কাজে দারুণভাবে উৎসাহ যোগাতেন। আমার সমাপ্ত, অসমাপ্ত বা আরদ্ধ অনেক লেখা আমি তাঁদের কাছে পড়ে শোনাতাম। তারা সব মন দিয়ে শুনতেন এবং উৎসাহ দিতেন। ফাউস্টের পরিকল্পনার কথাটা তাঁদের আমি প্রথম বলি। বলি যে মেফিস্টোফোলিসের মতো এক বন্ধু সত্যিই আমি আমার জীবনের পেয়েছিলাম।

এই সময় বাইবেল নিয়েও নূতন করে পড়াশুনা করি। ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের সব ধর্মগত সত্যকে মেনে নিতে পারল না আমার মন। আমি সব কিছু চিরে চিরে বিচার করে দেখলাম। আমার যুক্তিবাদী প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবাপন্ন মনে প্রথাগত ও ধর্মগত সত্য সম্পর্কে নানারকমের প্রশ্ন জাগতে লাগল।

এত সব সত্ত্বেও ফ্রেডারিকার কথাটা ভুলতে পারলাম না কিছুতেই। আর তার জন্যই কাব্যচর্চা করতে লাগলাম আবার। এই কাব্যরসই আমাকে মুক্তি দিল সকল বেদনার হাত থেকে। অন্য সব জার্মান আধুনিক কবিদের মধ্যে ক্লপস্টকের লেখা আমার ভালো লাগত। আর প্রাচীনদের মধ্যে ভালো লাগত হোমার।

ঘটনাক্রমে আমি দুজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হই যাদের প্রকৃতি আমার ভালো লাগে এবং যাদের জীবনকে আমি গোয়েৎস ও ওয়ার্দার এই দুই রচনার নায়ক হিসাবে মূর্ত করে তুলি। অবশ্য ওয়ার্দারের মধ্যে আমার নিজের গভীর আন্তর্জীবনের ব্যথা-বেদনার অনেকখানি মিশে ছিল। ওয়ার্দার ছিল আমার বন্ধু এবং তার অপ্রাপণীয়া প্রেমিকা লোত্তে যেন ছিল আমারও প্রেমিকা। তবে ওয়ার্দারের মতো আমার প্রেমাবেগ অতখানি ভয়ঙ্কর এবং আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারেনি।

ক্লোসার বলে আমার এক বন্ধু আমার বোনের প্রতি তার প্রেমাসক্তির কথা প্রকাশ করে। আমার বোনকে বিয়ে করতে চায় সে। আমি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে যাই তার কথা শুনে। অবশ্য এর কোনও প্রতিবাদও করিনি আমি।

আমার বন্ধু বাগ্মী মার্ককে দেখেই আমি আমি গোয়েৎস ভন বার্লিশিঞ্জেনের কথা ভাবি। মার্ককে সঙ্গে করে আমি একবার ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে কবনেন্তস-এর পথে রওনা হই। পথে পাই রাইন নদীর উপত্যকায় অবস্থিত অনেক শান্ত সুন্দর সাজানো এক গ্রাম।

জেরুজালেম নামে একটি ছেলে তার এক বন্ধুর স্ত্রীকে ভালোবাসত। এই ব্যর্থ প্রেমের বেদনাকে জয় করতে পারেনি সে কোনওমতে। তাই সে বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। জেরুজালেমের এই হৃদয়যন্ত্রণা আর মৃত্যুই আমার ওয়ার্দারের পটভূমি রচনা করে। আমি তখন ওয়ার্নারের মধ্য দিয়ে জেরুজালেম ও আমার নিজের ব্যর্থ প্রেমের অনতিক্রম্য বিষাদ ও বেদনাকে এক বাঅয় রূপ দান করি। এক ভ্রান্ত আবেগপ্রবণ যুবকের অপ্রকৃতিস্থ মনের বিচিত্র গতিপ্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলি আমি এই রচনার মধ্যে। ওয়ার্দারের আত্মহত্যার কথা লিখতে গিয়ে আমি নিজেও এই আত্মহত্যার কথা ভাবি এবং যুক্তি দিয়ে তা সমর্থন করি।

‘ওয়ার্দারের দুঃখ’ এই ছোট বইখানি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তার আবেদন অপরিসীম। ওয়ার্দারের দুঃখ সকল শ্রেণীর নরনারীর মর্মকে স্পর্শ করে বিদীর্ণ করে।

গোয়েৎস ভন বার্লিশিঞ্জেনকে নিয়ে লেখা নাটকখানিও সে যুগের সত্যকে অনেকখানি প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছিল।

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

আমার বিভিন্ন রচনা যতই প্রকাশিত হতে লাগল ততই সাড়া পড়ে গেল আমার বন্ধুদের মধ্যে। আমার যেসব পুরনো বন্ধুদের কাছে আগে আমার কত কবিতা ও বিভিন্ন রচনা করে শোনাতাম, তাদের মতামত চাইতাম, তারা তখন ভাবতেই পারেনি সেই সব রচনা একদিন প্রকাশিত হবে ও জনপ্রিয়তা লাভ করবে।

এই সব দেখে আমার এবং আমার প্রকাশিত সাড়া জাগানো অনেক রচনা পড়ে পুরানো বন্ধুরা যেমন দেখা করতে আসত আমার সঙ্গে তেমনি অনেক সাহিত্যানুরাগী নূতন বন্ধুও জুটল।

এই সব বন্ধুদের মধ্যে লেস ছিল অন্যতম। সে বড় হাসতে পারত। তার এই পরিহাসরসিকতার জন্য আমার ভালো লাগত তাকে। এই লেৎস একবার তার লেখা একটি কাব্য-নাটক আমাকে দেখাবার জন্য নিয়ে আসে। কাব্য-নাটকটি তার প্রেমাস্পদকে নিয়ে লেখা। সে এক সুন্দরী মহিলাকে ভালোবাসত। কিন্তু মেয়েটির প্রতি আরও কয়েকজন আসক্ত ছিল এবং সে তার সঙ্গে ব্যবহার করে কিছুই বুঝতে পারত

মহিলাটি তাকে ঠিক ভালোবাসে কিনা। মহিলাটি ছিল খুব খেয়ালী। এক সময় খুব ভালো থাকে, আবার এক সময় খুব রেগে যায়। যাই হোক, তার মিলনাত্মক কাব্য নাটকটি Disodatin বা সৈনিকগণ পড়ে আমার মোটেই ভালো লাগল না। আমি সরাসরি চিঠিতে জানালাম, এর মধ্যে কবিতাই নেই, তুমি এ লাইনের লোক নও। তার থেকে তুমি তোমার অভিজ্ঞতার কথা গদ্যে দিয়ে একটা প্রেমের গল্প খাড়া করার চেষ্টা করো।

এরপর আমার ‘আয়রন হ্যান্ড’ নাটকটি প্রকাশিত হলে সে তার সমালোচনা করে একখানা চিঠি দিল। আমার প্রতিভার সঙ্গে তার তুলনা করল। যাই হোক, আমি তাকে উৎসাহ দিয়ে চিঠি দিলাম। আসল কথা পেঁৎস কবিতা লিখত, সে ছিল বড় খেয়ালী। কোনও একাগ্রতা ছিল না। তাই দেশের কাব্যাক্যাশে ধূমকেতুর মতো হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

অথচ আবার অন্য এক বন্ধু ক্লিঙ্গার ছিল কিন্তু লেস-এর ঠিক বিপরীত। সে দৃঢ়চেতা, অধ্যবসায়ী। সেও কবিতা লিখত এবং এখনও টিকে আছে কাব্যের জগতে। সে ছিল রুশোর ভক্ত। তার লম্বা ছিপছিপে চেহারার মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব ছিল।

এই সময় ল্যাভেটার নামে এক খ্রিস্টান সাধক আমাদের দেশে বেড়াতে আসে। আমার সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে ওঠে। আমার বন্ধু ফ্রানিল কিটেনবার্গও একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। এদের দুজনের মধ্যে প্রায় তর্ক-বিতর্ক হতো। আসলে ল্যাভেটার ছিল ভক্ত। তার দেহ-মন দুটোই ছিল খ্রিস্টের উপর সমর্পিত। কিন্তু ফ্রলিন ও আমার দেহ-মনের সমস্ত চেতনা ল্যাভেটারের মতো খ্রিস্টের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল না। খ্রিস্টধর্মের মহিমা আমরা মনে মনে স্বীকার করি। মোট কথা, ভক্তি ও জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই সকল ধর্মসাধনার ক্ষেত্রে। ভক্তির মধ্যে মানুষ চিরকাল তার আবেগ অনুভূতি কল্পনা সব ঢেলে এক সাকার ঈশ্বরকে জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু জ্ঞান সব সময় মানুষকে টেনে নিয়ে যায় নির্বিশেষে নিরাকার ঈশ্বরের দিকে। কারণ বিশুদ্ধ জ্ঞান কখনও কোনও সীমা মানতে চায় না।

ফ্রলিন ভন কিটেনবার্গ ছিল জ্ঞানযোগী। সে নিয়মিত যোগসাধনা করত বলে আমি তার কাছে প্রায়ই যেতাম। যতক্ষণ তার কাছে থাকতাম ততক্ষণ আমার চিত্তের সকল সংক্ষোভ, অন্তরের সমস্ত দ্বন্দ্ব ও আলোড়ন স্তব্ধ হয়ে থাকত তার প্রভাবে। আমি বেশ কিছুক্ষণের জন্য এক পরম আত্মিক প্রশান্তি লাভ করতাম। আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম তার শরীর ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবু সে যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে জানালার ধারে একটি চেয়ারে বসে আমার কথা অথবা আমার কোনও লেখা শুনত তখন তার দেহগত অসুস্থতার কথা একটুও জানতে পারা যেত না।

সূর্যাস্তের স্নান আলোয় ফ্রলিনের কাছে বসে থাকতে আমার খুব ভালো লাগত। মনে হতো গোটা পৃথিবীটার রূপ রং সব বদলে গেছে। মনে হতো গোধূলির ছায়াছায়া ধূসরতায় শুধু আমার নয়, পৃথিবীর সব মানুষের সব কামনা-বাসনার দূরন্ত রং মুছে গেছে চিরদিনের মতো। ফ্রলিন প্রায়ই বলত একমাত্র ঈশ্বরই মানুষের বেদনার্ত আত্মাকে চিরশান্তি দান করতে পারেন। এটা ছিল তার পরম বিশ্বাস। এ বিশ্বাসে আমি কখনও আঘাত দিতাম না কোনও ছলে।

এই সময় মোরাভীয় ধর্মমতের সঙ্গে পরিচিত হই আমি এবং ফ্রলিনের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসি। মোরাভীয়রা বলত মানুষের ধর্মজীবন এবং বাস্তব জীবনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। যে সমাজে শিক্ষকরা হবে শাসক এবং ধর্মযাজক বিচারক সেই সমাজই হবে আদর্শ সমাজ।

আমি একবার যুবরাজের আমন্ত্রণে মেয়ে বেড়াতে যাই। আমার বাবা একদিন অনেক রাজসভায় ঘুরে বেড়ালেও যুবরাজ বা রাজকুমারদের সঙ্গে মেলামেশা পছন্দ করতেন না। ফ্রলিনকে আমি মায়ের মতো জ্ঞান করতাম এবং তাকে আমার ব্যক্তিজীবনের সব কথা বলতাম। কিন্তু সে তখন শয্যাগত থাকায় তার পরামর্শ নেওয়া হলো না। যুবরাজের সঙ্গে আমার একটা বিষয়ে মতপার্থক্য হলো। উনি গ্রিক শিল্পরীতি পছন্দ করেন না। আমার মতে দেহগত শক্তি ও সৌন্দর্যের পরিপূর্ণ বিকাশই গ্রিক শিল্পকলার লক্ষ্য। এই শিল্পরীতি তাই অসংখ্যক শিল্পীকে যুগ যুগ প্রেরণা যুগিয়ে আসছে।

আমি বাড়ি ফিরে আসতেই আমার বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে আমাদের সংসারী করার জন্য পরিকল্পনা করেন। আমি কিন্তু এ বিষয়ে তখনও মনস্থির করে উঠতে পারিনি। আমার দুই-একজন বন্ধু আমাকে আমাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে পাকাপাকিভাবে। বসবাস করার জন্য অনুরোধ করে বিশেষভাবে।

আমাকে আমার কাকা নাগরিক পরিষদ থেকে কৌশলে সরিয়ে দিলেও তখন আমার কাজের অভাব ছিল না। অনেক অফিস এজেন্সিতে আমি চেষ্টা করলেই কাজ পেতাম। এই সময় একটি মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েটি সুন্দরী এবং গৃহনিপুণা। সবদিক দিয়ে আদর্শ স্ত্রী হবার যোগ্য। কিন্তু আমি খেলার ছলে উড়িয়ে দিলাম এ পরিকল্পনাটাকে।

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

একদিন আমার এক বন্ধু সন্ধের সময় কোনও গানের আসরে যাবার জন্য অনুরোধ করল। মানুষ কোনওভাবে একবার নাম করলেই অনেক বন্ধু জুটে যায়। অনেক জায়গা থেকে অনেক নিমন্ত্রণ আসে। গানের এই আসরটি বসবে কোনও এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে।

বেরোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, নির্দিষ্ট সময়ের একটু পরেই বেরিয়ে পড়লাম তাড়াহুড়ো করে।

কোনও একটি বাড়ির একতলার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম আমরা। ঘরটির আসবাবপত্র সাধারণ ধরনের হলেও ঘরখানি প্রশস্ত। ঘরের মধ্যে লোক ছিল অনেক। ঘরের মাঝখানে একটি পিয়ানো বাজিয়ে গান গাইবে।

আমি পিয়ানোর কাছেই বসলাম। মেয়েটি যখন গান শুরু করল আমি তার চেহারা এবং গতিভঙ্গি ভালো করে লক্ষ করলাম। তার চেহারা মোটামুটি সুন্দর। কিন্তু তার সবচেয়ে যেটা ভালো লাগল তা হলো তার প্রতিটি আচরণের মধ্যে শিশুসুলভ এক সরলতা। গান শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সে এগিয়ে এসে আলাপ করল আমার সঙ্গে। আমি বললাম, এটা আমার পক্ষে সৌভাগ্যের কথা যে আপনার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনেই আপনার প্রতিভার সঙ্গেও পরিচিত হলাম।

আমরা পরস্পরের মুখপানে তাকালাম। কিন্তু আমরা কেউ কথাবার্তায় আবেগের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলাম না। আমাদের আপন আপন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের বাঁধ দিয়ে ঘেরা একটি ব্যবধানকে সাবধানে বজায় রেখে চললাম আমরা। আমার বিদায় নেবার সময় মেয়েটির মা ও সে নিজে আমাকে শীঘ্রই আর একবার তাদের বাড়ি যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানাল।

আমিও সুযোগ পেলেই মাঝে মাঝে তাদের বাড়ি যেতাম। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পেতাম। তার মধ্যে আমার এক মনমতো সঙ্গিনীকে খুঁজে পেলাম।

এই সময় বাবার সঙ্গে আমার অনেকদিন পর মতবিরোধ হলো।

জীবন সম্বন্ধে আমার উন্মার্গগামী দৃষ্টিভঙ্গি মোটেই ভালো লাগত না আমার বাবার। আমি সব সময় মানুষের মধ্যে যে বৃহত্তর জীবনাদর্শনের সন্ধান করে যেতাম তা কখনও কার মধ্যে খুঁজে পেতাম না। ফলে সব মানুষেরই অপূর্ণ বলে মনে হতো আমার। যারা সৎ, তারা সাধারণত ধার্মিক হয়, তারা কাজের লোক হতে পারে না। আর যারা কর্মঠ, যারা কাজের লোক, তারা বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারে না।

আমার অন্যতম পুরনো বন্ধু জং স্টিলিং ছিল চোখের ডাক্তার। আমাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের হের ভন লার্সেনার নামে এক ধনী বয়স্ক ভদ্রলোকের দুটি চোখই খারাপ হয়ে যায়। তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে যান। এদিকে তখন স্টিলিং চোখের ছানি অপারেশনের দ্বারা নাম করেছিল। চোখ অপারেশনে তার হাত এত ভালো যে প্রায় সব ক্ষেত্রেই সফল হয়। লার্সেনারকে শহরের ডাক্তাররা পরামর্শ দেন স্টিলিং-এর কাছে অপারেশন করতে।

সুতরাং স্টিলিংকে আসতে বলা হয় এবং ঠিক হয় সে এলে আমাদের বাড়িতে উঠবে। সে আসবে জেনে আমার বাবা-মাও খুশি হন।

যথাসময়ে স্টিলিং এসে অপারেশন করল লার্সেনারের দুটি চোখ। কিন্তু অপারেশন শেষ করার পর স্টিলিং কিন্তু খুশি হতে পারল না। সে বলল, দুটি চোখ একসঙ্গে অপারেশন করা উচিত হয়নি তার, যদিও লার্সেনার ও তার লোকজনরা তাকে তাই করতে বলেছিল। এর আগে যে স্টিলিং প্রায় একশোটি ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, এই স্টিলিং লার্সেনারের ক্ষেত্রে সাফল্যের আশ্বাস দিতে পারল না। অথচ সফল হলে লার্সেনারের কাছ থেকে পেত প্রচুর টাকা। সে অনেক কিছু আশা করেছিল। স্টিলিং আমার কাছে স্পষ্ট স্বীকার করল, অপারেশন ভালো হয়নি। সে নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

স্টিলিং স্বভাবত ছিল নীতিবাদী এবং ধর্ম প্রবণ। সে ভালোবাসা তার সহানুভূতিসূচক পরিবেশ ছাড়া টিকতে পারত না। সে কোথাও কোনো মানুষের কাছে। আন্তরিকতা না পেলে তাকেই মোইে সহ্য করতে পারত না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই সঙ্গে সমন্বয় করে চলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল স্টিলিং-এর। সে একই সঙ্গে ছিল বর্তমানে স্থির ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর সে ছিল ভবিষ্যত্মখী ও আশাবাদী।

তবে স্টিলিং-এর একটা জিনিস আমার পছন্দ হতো না। সে তার জীবনের সব ব্যর্থতা ও সফলতাকে ঈশ্বরের বিচার হিসাবে ব্যাখ্যা করত। কোনও কাজে সফল হলে বলত ঈশ্বরের ইচ্ছায় সে সফল হয়েছে। আবার কোনও কাজে ব্যর্থ হলে বলত তার কোনও ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য ঈশ্বর তিরস্কার করেছেন। এই ব্যর্থতার মাধ্যমে। আমি তার একথা শুনতাম। কিন্তু কোনও মন্তব্য করতাম না। কোনও উৎসাহ দিতাম না। যাই হোক, এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে অতিশয় আঘাত পেয়েছিল সে মনে। সে হতাশায় ভেঙে পড়েছিল ভীষণভাবে। সে বলত টাকা এবং নাম-যশ দুটির থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো সে। এইভাবে ভগ্নহৃদয়ে বিদায় নিল সে আমাদের কাছ থেকে।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

সেদিনের সেই গানের আসরে যে মেয়েটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল সেই লিলি স্কোরেন নামে মেয়েটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধীরে ধীরে আলাপ-পরিচয়ের সব স্তর অতিক্রম করে প্রণয়ে পরিণত হলো। প্রায়ই সন্ধ্যার সময় আমি তাদের বাড়িতে যেতাম। সে আমাকে একে একে তার নিজের ও পরিবারের অনেক কথা অনেক কাহিনী বলতে থাকে। সে বলে তার মধ্যে আমাকে আকর্ষণ করার একটা ক্ষমতা আছে। কিন্তু এবার সে হার মানতে বাধ্য হয়েছে। কারণ সে আমার দ্বারাও কম আকৃষ্ট হয়নি। এর আগে সে যেমন অপরকে আকর্ষণ করতে তেমনি কেউ তার কাছে এলে স্বচ্ছন্দে তাকে এড়িয়ে যেতেও পারত। কিন্তু এবার সে নাকি জল হয়ে পড়েছে আমার কাছে।

লিলি সাধারণত আমার কাছে সাদাসিধে পোশাক পরে আসত। কিন্তু তাকে নিয়ে কোনও নাচগানের আসরে যেতাম তখন সে রীতিমতো জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরত। অনেক গহনা পরত। কিন্তু সেই সব জমকালো পোশাক ও মূল্যবান অলঙ্কারের উজ্জ্বলতার মধ্যে আমি যেন সেই একই লিলিকে দেখতাম। দেখতে দেখতে তার সেই পোশাক ও অলঙ্কারের উজ্জ্বলতা উবে যেত আর তার চেহারাটা অনাবৃত হয়ে উঠত আমার চোখের সামনে এক অকপট স্পষ্টতায়। তার সেই স্ফীত বুকের রহস্য কতবার অনাবৃত করে দিয়েছে আমার কাছে সেই বুক একই ভাবে আছে। যে অধরোষ্ঠ কতবার চুম্বন করেছি সেই অধরোষ্ঠের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই দৃষ্টি সেই হাসি সব ঠিক আছে।

আমি আমার কাব্যচর্চা করে গেলেও লিলির সংস্পর্শে আসার পর কিছু গান লিখেছিলাম। এ গান কেউ শুনলে বা গাইলে বেশ বুঝতে পারতাম লিলির সঙ্গে কাটানো আমার সেই আনন্দোজ্জ্বল মুহূর্তগুলো কিভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে এই সব গানের মধ্যে।

শীতের পর বসন্ত এল। কিন্তু এ বসন্তকে শহরে থেকে গ্রামাঞ্চলেই অনুভব ও উপভোগ করা যায় বেশি। কোনও নদীর ধারে ফাঁকা মাঠে কোনো নির্জন ফুলের বনে এ বসন্তের মায়াময় আবেগ সারা দেহমনে উপভোগ করা যায়। বিশেষ করে বসন্তের এই মনোরম গ্রাম্য পরিবেশ কোনও নূতন প্রেমসম্পর্কের পক্ষে খুবই অনুকূল।

আমি সাধারণত সকালের দিকটা কাব্যচর্চা বা লেখালেখির কাজ করতাম। দুপুরের দিকটায় আমাদের বাড়ির কাজ অর্থাৎ বাসার কোনও কাজের কথা বললে করে দিতাম। বাবা সাধারণত বিষয়-সম্পত্তির বা আইনের ব্যাপারে আমার সঙ্গে পরামর্শ করে উনি নিজেই সব কাজ করতেন। ওঁর নিজের আইনজ্ঞান ছিল। তাছাড়া বিভিন্ন লোককে আইনের পরামর্শ দেবার জন্য উনি ওঁর অধীনে কিছু উকিলকে রেখে দিয়েছিলেন। তাদের দিয়েই দরকার হলে কাগজপত্র সই করাতেন। আমি বেড়াতে যেতাম বিকালে এবং আমার আমোদ-প্রমোদের ব্যাপারগুলো সন্ধের দিকেই সারতাম।

এই সময় জন আঁদ্রে নামে আর একজন সঙ্গীতসাধকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় যে গানকে ভালোবাসত এবং যাকে আমি গান লিখে দিতাম। সে আমার গান সুর সহযোগে গেয়ে শোনাত। একই সঙ্গে এইভাবে গান ও কবিতার রস উপভোগ করতাম।

কুমারী ডেলফ নামে একটি মেয়ে লিলিদের বাড়ি যাতায়াত করত। লিলির মা তাকে ভালোবাসত। ডেলফ লিলির সঙ্গে আমার প্রেম সম্পর্কের কথা জানত। একদিন সে লিলির মার কাছ থেকে আমাদের বিয়ের অনুমতিসহ লিলিকে নিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে বলে, নাও, পরস্পরে হাতে হাত দাও।

আমি অবাক হয়ে গেলাম। মনে হলো ডেলফ যেন এক অসাধ্য অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তুলেছে। সে আমদের বাড়ির মতও নিয়েছে।

যাই হোক, আমরা দুজনেই হাতে হাত রাখলাম। পরে পরস্পরকে আলিঙ্গন করলাম। সঙ্গে সঙ্গে লিলির রূপটা আরও সম্পূর্ণ হয়ে উঠল আমার চোখে। সে এমনিতেই দেখতে সুন্দরী ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা সব ঠিক হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো হঠাৎ সে যেন আগের থেকে অনেক বেশি সুন্দরী হয়ে উঠেছে। তখন থেকে তার দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রতঙ্গ, তার মনের সব সুষমা আমার, শুধু একান্তভাবে আমার।

লোকে বলে মানুষ নাকি তার আকাঙ্ক্ষিত সুখ বা উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়ায় বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না স্থিরভাবে। বিয়ের ব্যাপারে আমাদের ও লিলিদের বাড়ির সম্মতি পেয়ে আমরা দুজনেই যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলাম। কিন্তু আবেগের উন্মাদনার একটা দিক তলিয়ে দেখিনি। সেটা হলো আর্থিক দিক।

আমি বেশ বুঝতে পারলাম বাবা এ বিয়েতে কোনওরকমে মত দিলেও তিনি মনেপ্রাণে এ প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ তিনি পুত্রবধূ হিসাবে চেয়েছিলেন আরও অভিজাত বাড়ির মেয়ে। সুতরাং তিনি আমাকে এ বিয়ের জন্য আর্থিক সাহায্য নাও করতে পারেন। আমি তখন স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জনের কথা ভাবলাম। চাকরির চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু ব্যাপারটা যত সহজ ভেবেছিলাম কার্যক্ষেত্রে ততটা সহজ বলে মনে হলো না।

আমি অনেকটা দমে গেলাম। এদিকে আমার বোনের বিয়েটা সেই ক্লোজারের সঙ্গে হয়ে গেল। কিন্তু আমার বোন আমাকে বার বার লিলিকে বিয়ে করতে নিষেধ করল। কেন তা জানি না।

কেন জানি না লিলির সঙ্গে আমার বিয়েতে কোনও পক্ষের অমত না থাকলে দুটি পরিবারের মধ্যে যাওয়া-আসা বা কোনওরকম ঘনিষ্ঠতা হলো না।

ষোড়শ পরিচ্ছেদ

লিলির ব্যাপারে আমার বোনের আপত্তির কারণ হলো দুটি পরিবারের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে বিরাট তারতম্য। আমার বোন স্পষ্ট করে আমায় বলল, তুমি কি ভেবেছ। তুমি লিলিকে বিয়ে করে এনে আমাদের পুরনো বাড়িটার একটা ঘরে ভরে রেখে দেবে? সে আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত নয়। সে আমাদের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের ঠিকমতো অভ্যর্থনা জানাতে পারবে না।

আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম শুধু আমার বোনের কথাগুলো। কিন্তু কোনও কথা বললাম না। তাকে শুধু বললাম, এখন কিছু বলতে পারছি না। তবে তোমার কথা মনে থাকবে।

আমি সুইজারল্যান্ডে বেড়াতে গেলাম কিছুদিনের জন্য। জুরিখে গিয়ে দেখা করলাম ল্যাভেটারের সঙ্গে। আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাদর অভ্যর্থনা জানাল ল্যাভেটার। দারুণ খুশি হলো। তার স্ত্রীকেও বেশ ব্যক্তিত্বপূর্ণ মহিলা বলে মনে হলো। মনে হলো ভদ্রমহিলা সব বিষয়েই সমর্থন করে চলে তার স্বামীকে। দুজনের কী অদ্ভুত মিল।

সমগ্র সুইজারল্যান্ডের মধ্যে আমার সবচেয়ে ভালো লাগল রাইনের জলপ্রপাত। এটি হচ্ছে শাকসেন পার্বত্য অঞ্চলে। তারপর যে জিনিসটি ভালো লাগল আমার তা হলো জুরিখের লেক। এই দুটি দৃশ্যই আমি জীবনে কখনও ভুলব না।

আমি ল্যাভেটারকে তার দেহতত্ত্বের গবেষণার কাজ সম্বন্ধে খবর জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, কাজটা এখনও শেষ হয়নি। তবে তার প্রায় অর্ধেক লেখা ছাপা হয়ে গেছে। এতে যে সব তথ্য ও তত্ত্ব লেখা আছে তা সবই তার অভিজ্ঞতালব্ধ।

রাইনের নিম্ন উপত্যকা ধরে আমি ল্যাভেটারদের সঙ্গে নূতন করে যাত্রা শুরু করলাম। আমার ভ্রমণ তখন শুরু হয়েছে সবেমাত্র। দেখলাম ল্যাভেটারের গবেষণার কাজের সত্যিই বেশ প্রচার হয়েছে। ও যেখানেই যাচ্ছিল বহু লোক ওকে দেখতে ও ওর সঙ্গে আলাপ করতে আসছিল। অনেক বিদেশী ভ্রমণকারীও ওর নাম শুনেছে। লোকের ভিড় দেখে ল্যাভেটার নিজেও বিবৃত হচ্ছিল।

আমরা মানুষের ভিড় এড়িয়ে জনপথ থেকে দূরে চলে গেলাম খাঁটি পর্বতের রাজ্যে। গোলোকধাঁধার মতো কত প্রায়ান্ধকার গিরিপথ, কত সুদৃশ্য পর্বতশৃঙ্গ যার উপরে মেঘের উপর মেঘ জমেছে। তুষার আর কুয়াশা জমে আছে যাদের গায়ে। আবার এক এক জায়গায় পথের দুধারে দাঁড়িয়ে আছে খাড়াই পাহাড়। ঠিক যেন রঙ্গ মঞ্চের দৃশ্যপটে আঁকা। এ পাহাড় যুগ যুগ ধরে স্থাণুর মতো অচল অটলভাবে এই। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সুখদুঃখের যে তরঙ্গ মানুষের জীবনকে ক্রমাগত অসহায়ভাবে দোলাচ্ছে সে তরঙ্গ ওদের কাছে যেতে পারে না। ওদের স্পর্শ করতে পারে না।

পাহাড়ের রাজ্যে অনেক ঘোরাফেরার পর আমরা সেই পার্বত্য প্রদেশে এক তীর্থস্থান দর্শন করলাম। সেটা হলো মেরিয়া আইনসীভাইন চার্চ। চার্চটি এক উঁচু পাহাড়ের উপর। সে পাহাড়ে উঠতে উঠতে ক্লান্ত হয়ে উঠলাম আমরা। তারপর অতিকষ্টে গিয়ে দেখলাম ডেভিল স্টোন বা শয়তানের পাথর।

আমার আমরা সমতলে ফিরে এলাম। আবার সেই উদার উন্মুক্ত প্রান্তর আর কুয়াশাঢাকা হ্রদ। আমরা অনেক পথ পার হয় অনেক ওঠানামা করে অবশেষে নিশ্চিন্ত। ও পরিপূর্ণ বিশ্রামের আশায় সেন্ট গথার্ড হসপিনে এসে উঠলাম। এখানে এক ফাদার আমাদের ইতালি যাবার কথা বললেন। কিন্তু জার্মানি ফিরে যাবারই মনস্থ করলাম।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ

পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবার সময় আমি একটি কবিতায় লিখেছিলাম, আমি তোমার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি লিলি, কিন্তু না, আমি তোমার বন্ধনে আজও আবদ্ধ আছি। আমি একের পর এক বন, পাহাড় আর উপত্যকা পার হয়ে চলেছি, কিন্তু যেখানেই যাচ্ছি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারছি না। তুমি দেখছি সব সময় আমার সঙ্গেই আছ।

বাড়ি ফিরে তাই আমি লিলির সঙ্গে দেখা না করে পারলাম না। আমি কিন্তু বাড়ি গিয়ে শুনলাম লিলিকে আমার অনুপস্থিতিকালে বোঝানো হয়েছে আসল ব্যাপারটা। বোঝানো হয়েছে আমার আশা তাকে ত্যাগ করতেই হবে। এ বিচ্ছেদ অনিবার্য। তার উত্তরে লিলি নাকি তাদের বলেছ সে আমার জন্য আমার সঙ্গে তার সবকিছু ছেড়ে, বাড়িঘর দেশ আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে আমেরিকায় গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পার।

লিলির জন্য আমিও তা পারি। কিন্তু আমি পরক্ষণেই অন্য কথা ভাবলাম। ভাবলাম, আমার বাবার এই সুন্দর সাজানো বাড়ি, এত সব বিষয়-সম্পত্তি, এই নিশ্চিন্ত আরামঘন জীবনযাত্রা, সবকিছু ত্যাগ করে অজানা দূরদেশে গিয়ে নিশ্চিত জীবনযাত্রার মধ্যে নিজেকে ঠেলে দেওয়ার কোনও অর্থই হতে পারে না। সুতরাং লিলির এ প্রস্তাবে আমি সাড়া দিতে পারলাম না। তার প্রতি আমার ভালোবাসার কোনও ফাঁকি না থাকলেও আমি তা পারলাম না।

এই সময় এগমঁত নাটকটি লেখা শুরু করি। আয়রন হ্যান্ড’-এ যেমন নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহের ঘটনাকে রূপদান করেছি, তেমনি এ নাটকের বিষয়বস্তুও রাজনৈতিক। এতে দেখাতে চেয়েছি, কোনো স্বৈরাচারী দুর্ধর্ষ শাসকের কাছে গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা বা অধিকারের কোনও মূল্য নেই। এই নাটকে আমি আবার আমার প্রতিহত প্রেমাবেগকেও বাণীরূপ দান করলাম।

এইভাবে লিলির কাছ থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমি বাড়ির মধ্যে স্বেচ্ছানির্বাসন গ্রহণ করলাম। একমনে এগমঁত নাটক লিখে যেতে পারলাম। এই সময় ওয়েগনারের কাউন্টের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে আবার মনস্থ করি। কিন্তু যথাসময়ে কাউন্টের দূত না আসায় আমি ইতালি চলে যাওয়াই স্থির করি।

ইতালি যাবার পরে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয়ে গেল ডেলফের সঙ্গে। দেখা হবার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ল লিলির কথা। যাকে এড়িয়ে দূরে পালিয়ে যাচ্ছি সে যেন আমার সামনে অন্যের রূপ ধরে এসে দাঁড়াল। ডেলফ আমায় অনেক করে বুঝিয়ে বলল। আমার সংসারজীবন সম্পর্কে তার পরিকল্পনার কথা বলল। কিন্তু আমার মনে কোনওরূপ সাড়া জাগাতে পারল না সে কথা। কেমন যেন বৈরাগ্যে ধূসর হয়ে গেছে আমার সে মন। আমার প্রতিহত প্রেমাবেগ এক ভয়ঙ্কর শূন্যতায় আবর্তিত হতে লাগল যেন। গ্রেচেন, ফ্রেডারিক, লিলি–এদের সকলের মধ্যে সেই এক নারী, এক প্রেম ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি ধরে এসেছে আমার কাছে, কিন্তু কোনও না কোনও কারণে তারা চলে যেতে বাধ্য হয়েছে আমার কাছ থেকে। আমি এবার সম্পূর্ণরূপ মুক্ত সব মোহ থেকে। আমি এখন তাদের আর কাউকেই চাই না।

হোটেল থেকে ইতালির পথে আবার যাত্রা শুরু করব এমন সময় ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে লোক এল। একটি চিঠি দিল। ওয়েগনারের কাউন্টের লোকের আসতে কেন দেরি হয়েছে তার কারণ তাতে সবিস্তারে লেখা আছে। কাউন্টের অনুরোধ ফিরে যেতে হবে। অগত্যা আবার জার্মানির পথ ধরলাম।

পথ ভাবতে লাগলাম, আমি কোথায় চলেছি তা আমি জানি না। শৈশব থেকে বাল্যে, বাল্য থেকে যৌবনে আমার সারাজীবন ধরে আমি কী খুঁজে চলেছি। পাহাড়ে প্রান্তরে, জলে-স্থলে, সুন্দর-অসুন্দরে, রূপে-অরূপে, ইন্দ্রিয়ে ও অতীন্দ্রিয়ের মাঝে কী খুঁজেছি আমি? যা খুঁজেছি তা কি আমি পেয়েছি কোনওদিন? তা কি কেউ পায়?

গাড়ি এড়িয়ে চলেছে। চালকের হাতে লাগাম ধরা। আমার মনে হলো, কোনও এক অদৃশ্য দেবতার দ্বারা প্রহৃত হতে হতে অবিরাম কালের অশ্ব ছুটে চলেছে সারা বিশ্বজীবনের বিপুলতায়তন বেগভার নিয়ে। সেই আশ্চর্য অশ্বের লাগাম ধরার শক্তি সবার নেই। হয়তো কোনও মানুষেরই নেই। তবু মানুষের মতো বাঁচতে হলে সে লাগামটা শক্ত মুঠিতে ধরে রাখতেই হবে।

উইলেম মেস্তার (উপন্যাস)

উইলেম মেস্তার (উপন্যাস)

প্রথম পরিচ্ছেদ

নাটকটা ভাঙতে দেরি হচ্ছিল। সাজঘরের জানালা দিয়ে মঞ্চের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল বারবারা। আজ তার মালিক সুন্দরী মেরিয়ানা এক ছোকরা অফিসারের অভিনয় করে প্রচুর আনন্দ দান করেছে দর্শকদের। কিন্তু মেরিয়ানার জন্য বারবারা অধৈর্য হয়ে পড়েছে অন্য কারণে। মেরিয়ানার গুণে মুগ্ধ ধনী ব্যবসায়ীর পুত্র নৰ্বার্গ একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে ডাকে।

প্যাকেটটা খুলে দেখেছে বারবারা। মেরিয়ানার পুরনো পরিচারিকা হিসেবে এ অধিকার তার আছে। দেখেছে তাতে আছে মসলিনের কাপড়, ক্যালিকোর ছিট আর কিছু ভালো নূতন ধরনের ফিতে আর কিছু টাকা। নবার্গকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই বারবারার। কি করে মেরিয়ানার চোখে নৰ্বার্গকে ভালো লাগানো যায়, কি করে তার মনে নৰ্বার্গের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জাগানো যায় এই চিন্তায় সব সময় কাতর সে।

খ্রিস্টোৎসবের উপহারের মতো নৰ্বার্গের সব উপহার টেবিলের উপর থরে থরে সাজিয়ে রাখল বারবারা। তারপর উৎকর্ণ হয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল মেরিয়ানার পদধ্বনির। কিন্তু যার জন্য এত কাণ্ড সে একবার ফিরেও তাকাল না এই সব উপহারের পানে। মেরিয়ানা ঘরে ঢুকে আপনার মনে চঞ্চলভাবে পায়চারি করতে লাগল ঘরময়। কোনও দিকে তাকাল না। বারবাবার দিকেও না। বারবারা একবার জিজ্ঞাসা করল, কি বাছা, তোমার শরীর খারাপ করেনি তো? একবার চেয়ে দেখো, নৰ্বাৰ্গ কি পাঠিয়েছে। এতে তোমার ভালো নাইটগাউন হবে।

মেরিয়ানা বলল, নৰ্বার্গ যখন আসবে তখন তোমরা যা বলবে করব। কিন্তু এখন আমাকে জ্বালিও না। এখন আমি শুধু একমাত্র তাকে ভালোবাসি, সে আমাকে ভালোবাসে।

প্রতিবাদে ফেটে পড়তে চাইছিল বারবারা। কিন্তু মেরিয়ানা আদরের ভঙ্গিতে তার বুকটা জড়িয়ে ধরতেই হেসে ফেলল ফোকলা দাঁতে। বলল, এখন পুরুষের পোশাকটা ছেড়ে ফেলো তো বাছা। ও পোশাকে তোমাকে মোটেই মানায় না।

এই বলে বারবারা মেরিয়ানার পায়ে হাত রাখতেই হাতটা সরিয়ে দিল মেরিয়ানা। বলল, এখন নয়, এখন আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।

বারবারা বলল, কেউ আসবে? ছোকরা মেস্তার? সেই ব্যবসায়ীর বকাটে নিঃস্ব ছেলেটা? উদারতার একটা আবেগ পেয়ে বসেছে তোমায়। যত সব নিঃস্ব অপদার্থ ছোঁড়াদের সঙ্গে তোমার কারবার বেশি। অবশ্য পরের উপকার করে নাম কেনার মধ্যে একটা মোহ আছে।

সে কথায় কান না দিয়ে মেরিয়ানা বলল, আমি তাকে ভালোবাসি। দারুণ ভালোবাসি। আমি যদি তার গলাটা এই মুহূর্তে জড়িয়ে ধরতে পারতাম।! আমি যদি তাকে সারাজীবন ধরে রেখে দিতে পারতাম।

বারবারা শান্তভাবে বলল, সংযত করো নিজেকে। একপক্ষ কালের মধ্যে নবার্গ এসে পড়বে। তার আগে আজ একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে সে।

একপক্ষ কাল অনেক দেরি। তার আগে অনেক কিছু ঘটতে পারে।

এমন সময় উইলেম মেস্তার মেরিয়ানার ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে বারবারা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে অন্তরে চাপা বিক্ষোভ নিয়ে।

পরের দিন সকালে মার সঙ্গে দেখা হতে উইলেমকে তার মা বলল, তার এত ঘন ঘন থিয়েটারে যাওয়ার জন্য তার বাবা অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন তার উপর। অবশ্য আমি নিজেও মাঝে মাঝে যাই। তবু আমি থিয়েটারের ব্যাপারটাকে ঘৃণা করি। এতে আমাদের গৃহকোণের শান্তি অনেকখানি নষ্ট হচ্ছে।

উইলেম বলল, বাবা আমাকে একথা অনেক আগেই বলেছেন। কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখো মা, যে কাজ সঙ্গে সঙ্গে টাকা-পয়সা এনে দেয় সে কাজ ছাড়া জীবনে কি কিছু করার নেই আমাদের? অপ্রয়োজনীয় কোনও বস্তুতে যদি কোনও আনন্দ না থাকে তাহলে বাবা কেন এই নতুন বাড়িটা করে ঘরগুলো এমন করে সাজিয়েছেন? আমাদের পুরনো বাড়িটাতে তো বেশ চলে যাচ্ছিল। প্রতি বছর বাবা কি তাঁর ঘরগুলো অলঙ্করণের জন্য প্রচুর টাকা খরচ করেন না? এসবও থিয়েটারে যাওয়ার মতো অপ্রয়োজনীয়। তার থেকে থিয়েটারে দেখবে একই সঙ্গে আনন্দ ও শিক্ষার উপকরণ অনেক পাওয়া যায়।

মা বললেন, থিয়েটারে যাও ক্ষতি নেই, তবে বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তোমার বাবা মনে করেন, এতে তোমার মনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আর তার জন্য দোষ পেতে হচ্ছে আমাকে। আজ হতে বারো বছর আগে একবার আমি তোমাকে পুতুলনাচ দেখাই তখন তার জন্য আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়।

উইলেম তাড়াতাড়ি বলল, বেচারা পুতুলগুলোকে দোষ দিও না মা। ফাঁকা ফাঁকা বাড়িটার মধ্যে সেই পুতুলনাচ দেখে তখন প্রচুর আনন্দ পাই। গোলিয়াথ নামে একটা বিরাট রাক্ষস সারা রাজ্যটাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছিল। তখন ডেভিড এসে রাজাকে বলল, সে যুদ্ধ করে হারাবে রাক্ষসকে। এর পরেই যবনিকা পতন হলো। আমাদের কৌতূহল আর ধরে না। পরে যখন এই ডেভিড রাক্ষসটাকে মেরে তার মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল আর তার মাংসগুলো মাঠে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠি আমরা। তার বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ সুন্দরী রাজকন্যাকে লাভ করে ডেভিড।

তবে তার চেহারাটা খুবই বেঁটে দেখে একটু হতাশ হয়েছিলাম আমি।

মা বললেন, আমি জানি, এটা তোমার মনে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল পরে তুমি কতবার মোম দিয়ে ডেভিড আর গোলিয়াথের মূর্তি বানিয়ে আলপিন ফুটিয়ে গোলিয়াথকে মারতে। তবে তার জন্য আমাকে অশান্তি ভোগ করতে হয়।

উইলেম বলল, এর জন্য অনুশোচনা করো না মা। এই পুতুলনাচের কথা ভাবতেও আমার ভালো লাগে। এই কথা বলেই চাবি এনে আলমারি খুলে কাপড়ের পুতুলগুলোকে বার করল উইলেম। তার মনটা সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল সেই সূদুর শৈশবে, অনাবিল সুখশান্তি আর সৌন্দর্যে ভরা এক কল্পলোকে।

স্বভাবত বড় কল্পনাপ্রবণ উইলেম। কোনও বস্তুকে তার ভালো লাগলেই কল্পনার রং-রস দিয়ে তাকে আরও বেশি সুন্দর করে তুলত মনে মনে। প্রথম আলাপেই ভালোবেসে ফেলে সে থিয়েটারের পেশাদার অভিনেত্রী মেরিয়ানাকে। তার স্বাভাবিক নাট্যপ্রীতি নৈশ রঙ্গশালার উজ্জ্বলতা ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে মিলে মিশে এই ভালোবাসাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য এর সঙ্গে তার প্রতি মেরিয়ানার আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ ও আগ্রহের নিবিড়তাও একটা মিষ্টি গভীরতা এনে দেয় তার ভালোবাসার মধ্যে। মেরিয়ানা সত্যিই তাকে যেন একটু বেশি খাতির ও আদরযত্ন করত। উইলেমের ভালোবাসার প্রতিদান একটু বেশি করেই দিত মেরিয়ানা। তাকে কাছে পেলে ছাড়তে চাইত না, অধীর আগ্রহে, তার জন্য প্রতীক্ষা করত। তবে উইলেম হয়ত লক্ষ্য করেনি মেরিয়ানার চিন্তায় ও আচরণে একটা গভীর উদ্বেগ উঁকি মারত মাঝে মাঝে। প্রায়ই ভয় হতো মেরিয়ানার তার প্রকৃত অবস্থার কথাটা হয়ত একদিন জেনে ফেলবে উইলেম।

পূর্বরাগের উচ্ছ্বাসটা উইলেমের মনে কিছুটা থিতিয়ে গেলে ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখল সে। কিন্তু তাতে তার ইচ্ছাটা হয়ে উঠল আরও তীব্র আর সঙ্কল্পটা হয়ে উঠলও আরও অটল। মেরিয়ানার কাছে নিয়মিত যাবার এক পরিকল্পনাও খাড়া করল উইলেম। ঠিক করল সারাদিন কাজকর্ম সারার পর সন্ধ্যার পর বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে যথারীতি উপস্থিত থাকবে। বাড়ির সকলের সঙ্গে বসে খাবে। তারপর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে খামারবাড়ি দিয়ে চুপিসারে যাবে রাতে। সোজা চলে যাবে মেরিয়ানার কাছে।

একদিন মেরিয়ানার বাসায় কতকগুলো পুতুল নিয়ে গেল উইলেম। প্রথমে পুতুলগুলোকে নিয়ে নিজেই খেলা করতে লাগল মেরিয়ানা। তাদের প্রেমের কথা শেখালে লাগল। পরে তার আদর গিয়ে পড়ল পুতুলের মালিকের উপর। এমন সময় রাস্তায় গোলমালের শব্দ শোনা গেল। বারবারা বলল, একদল লোক হোটেল থেকে বেরিয়ে মদের নেশায় মাতলামি করছে।

মদের কথা শুনে উইলেম কিছু পয়সা দিয়ে বারবারাকে বলল, আমাদের জন্যও কিছু মদ নিয়ে এস। আমাদের সঙ্গে তুমিও খাবে।

খাবার সময় বারবারা পুতুলনাচের কথাটা তুলল উইলেমের কাছে। উইলেম তার সেই ছোটবেলাকার পুতুলনাচের কথাটা নূতন করে শোনাতে লাগল। সেই সঙ্গে তার বাবার অনুশাসন কথাটাও বলল। বলল, বাবা এসব মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার পুতুলনাচের একটা অনুষ্ঠানের সময় বাবা সব পুতুলগুলো কেড়ে নেন। আমি মাকে তা বলায় মা চেষ্টা করেও বাবার মন ঘোরাতে পারেন নি। বেশি আনন্দ বা ফুর্তি ভালো নয়। সব আনন্দানুষ্ঠাই ভালো নয়। ছেলেরা তো দূরের কথা ভালো-মন্দ জ্ঞান বুড়োদেরও নেই।

আমাদের নূতন বাড়িটা হবার সময় একজন ইঞ্জিনিয়ার বাবাকে বিশেষ সাহায্য করেন। তাঁর সঙ্গে বাবার বন্ধুত্বও ছিল। তিনি একবার জোর করে আমাদের বাড়ির ছাদে একটা পুতুলনাচের ব্যবস্থা করেন। তাঁর পীড়াপীড়িতে বাবা মত দিতে বাধ্য হন। পাড়ার ছেলেদের সব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অনেক দিন পর আবার পুতুলনাচ দেখলাম। পুতুলনাচ দেখতে আমার বড় ভালো লাগত। যদিও আড়াল থেকে মানুষেরা পুতুলগুলোকে নাড়াত, নিজেরাই কথা বলত, তবু অনুষ্ঠান আরম্ভ হলে আমার মনে হতো পুতুলগুলো সব জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওরা নিজেরা চলাফেরা ও অঙ্গভঙ্গি করে। অভিনয় করছে, কথা বলছে, হাসছে, কাঁদছে মানুষের মতো। সে এক বিপুল আনন্দমেশানো বিস্ময়। সে বিস্ময়ে শিহরণ লেগেছিল আমার সর্বাঙ্গে।

এইভাবে একে একে মেরিয়ানাকে ছেলেবেলাকার প্রধান প্রধান সব ঘটনা, সব ভালো লাগা মন্দ লাগার কথা একের পর এক করে বোঝাতে লাগল উইলেম। শোনাতে শোনাতে রাত বাড়তে লাগল। ঘুমে চোখ দুটো জড়িয়ে এল মেরিয়ানার। তবু সেদিকে কোনও খেয়াল নেই উইলেমের। শুনতে শুনতে ঘুমভেজা চোখে মেরিয়ানা যখন তার উপর ঢলে পড়ল তখন শুধু তাকে আরও টেনে নিল বুকের কাছে।

আর পুতুলনাচের প্রতি আগ্রহ ও নাট্যপ্রীতির কথা বলতে গিয়ে নাট্যতত্ত্বের মধ্য চলে গেল উইলেম। বলল, ট্রাজেডি আমাদের ভালো লাগত না। ট্রাজেডির থেকে ভালো কমেডি লেখা অনেক কঠিন। কিন্তু হে আমার প্রিয়তমা, কোনও নাটক, কোনও কবিতা যতই ভালো হোক না কেন, আমাকে সেই সৌন্দর্যের জগতে নিয়ে যেতে পারবে না। কোনও কবিতার যাদু নয়, তোমার এই নিবিড় বাহুবন্ধনের মধ্যে যে উত্তপ্ত প্রাণস্পন্দন অনুভব করছি সেই প্রাণস্পন্দনই আমাকে নিয়ে যাবে মায়াময় এক চিত্র সৌন্দর্যের রাজ্যে।

এই বলে মেরিয়ানাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল উইলেম। তার বাহুর চাপ আর কণ্ঠস্বরের আবেগসিক্ত তীব্রতায় জেগে উঠল মেরিয়ানা, জেগে উঠেই নিজের ভুল বুঝতে পারল সে। আর তা সংশোধনের জন্য আদর করতে লাগল উইলেমকে।

এইভাবে মেরিয়ানার নিবিড় সান্নিধ্যের মধ্য দিয়ে রাতের পর রাত কেটে যেতে লাগল উইলেমের। মেরিয়ানাকে যখন প্রথম পায় উইলেম তখন পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে আশঙ্কা ছিল। অন্তত সংশয় আর আশঙ্কা ছিল। মনে হতো হয়ত বা এ মিলন স্থায়ী হবে না। কিন্তু এইভাবে দিনের পর দিন নির্বিঘ্নে কেটে যাওয়ায় মনে সাহস বেড়েছে উইলেমের। মেরিয়ানার প্রতি তার যে ভালোবাসার ধারণাটা ভাসা ভাসা ছিল, আশা-আশঙ্কার আলো-ছায়ায় চঞ্চলভাবে কাঁপত অনুক্ষণ, আজ তা বিশ্বাসের দৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত।

উইলেমকে পেয়ে মেরিয়ানাও খুবই সুখী। উইলেমকে কাছে পেলে ছাড়তে মন চায় না তাকে। সে যতক্ষণ কাছে থাকে ততক্ষণ কখনও তার বাহুলগ্ন হয়ে, কখনও বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে থেকে, কখনও তার গলা জড়িয়ে কোনদিকে কাটিয়ে দেয় সময়টা। কিন্তু উইলেমের মতো মেরিয়ানার এই সুখ, মিলনের এই আনন্দ অনাবিল। নয়। উইলেম তার কাছ থেকে চলে গেলেই তীব্র অনুশোচনা জাগে মনে। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকে। ভাবে সে প্রতারণা করছে উইলেমের সঙ্গে আর উইলেমের ভালোবাসা পাওয়া মানেই প্রতারণার কাছে সফল হওয়া। এমনকি উইলেম যখন কাছে থাকে তখনও বুকে মুখ গুঁজে থেকে বা তার বাহুলগ্ন হয়েও এই আত্মধিক্কার, অনুশোচনার দংশন হতে রক্ষা পায় না মেরিয়ানা। সে যখনই নিজের অন্তরের পানে তাকিয়ে দেখে তখনই মনে হয় সেটা যেন একফালি শূন্য পতিত জমি। সেখানে দেবার মতো কিছুই নেই তার। মনে হয় একথা যখনি জানতে পারবে উইলেম তখনি সে ছেড়ে চলে যাবে তাকে। কিন্তু এই সংশয় আর শঙ্কার দুঃখ যতই প্রবল হয়ে ওঠে তার মধ্যে ততই সে আরও নিবিড়ভাবে সমস্ত অন্তর দিয়ে জড়িয়ে ধরতে চায় উইলেমকে। তার ভালোবাসার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চায় নিজেকে।

সেদিন তার নিজের ঘরে কিছু বই ও কাগজপত্র ঘাঁটছিল, এমন সময় তার বন্ধু ওয়ার্নার এসে ঘরে ঢুকল। ঢুকেই তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, আবার ঐসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করছ? তুমি তো শুধু একটা কিছু লিখতে শুরু করবে, আর কিছু পরেই সেটা ফেলে রাখবে। কোনও একটা লেখা বা কাজ তুমি কখনও একেবারে শেষ করো না। এটা তোমার বড় দোষ।

উইলেম বলল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষ কোনো কাজে সফলতা লাভ করে পূর্ণতা লাভ করে।

এই বলে উইলেম একটা নাটক বার করে দিল তার কাগজের স্তূপ থেকে। ওয়ার্নার সেটা দেখেই বলল ওটা ফেলে দাও, আগুনে পুড়িয়ে দাও। ও লেখাটা আমার বা তোমার বাবার কারোই ভালো লাগেনি। লেখার ছন্দটা ভালো হয়েছে, কিন্তু আসলে বক্তব্যটা বাজে। এতে তুমি যে আদর্শ ব্যবসায়ী চরিত্র এঁকেছ তা একেবারে অচল।

উইলেম ক্ষীণ প্রতিবাদের সুরে বলল, তোমাদের মতো ব্যবসাদারেরা শুধু জীবনের পথটাকে বড় করে দেখে, কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত অর্থের কথাটা তলিয়ে দেখে না।

ওয়ার্নার বলল, আমার মনে হয় তুমিও আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের কাজকর্ম ও ভাবধারার প্রতি মোটেই সহানুভূতিশীল নও। যদি হতে তাহলে বুঝতে ব্যবসাগত কাজকর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের কত বড় বড় গুণ ও অন্তরবৃত্তি বিকাশলাভ করে।

উইলেম বলল, অবশ্য আমি যে দেশভ্রমণ করতে চলেছি তাতে আরও কিছু শিক্ষা হবে আমার। আরও অনেক কিছু দেখতে পাব। বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে ওয়ার্নার বলল নিশ্চয়। তুমি যে কোনও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজারে গিয়ে দেখবে ব্যবসায়ীরা। আসলে কি চায়। নদী, সমুদ্র, আকাশ মাটির বেশির ভাগই তো পৃথিবীর রাজা রাজড়ারা অধিকার করে রেখে দিয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীরা কিছু পণ্যদ্রব্য নিয়ে কেনাবেচা করে জীবনধারণের কিছু উপকরণ সংগ্রহ করতে চাই। পণ্যদ্রব্যের ক্রমাগত হাত বদল হচ্ছে। আর তার মধ্য দিয়েই ব্যবসায়ীরা কিছু লাভ করছে। তুমি কোনও শহরে গিয়ে দেখবে সব মানুষই কিছু না কিছু করছে। অসংখ্য কর্মব্যস্ত মানুষ নিরন্তর এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই একটা করে উদ্দেশ্য আছে, লক্ষ্য আছে। কর্মব্যস্ত সেই মানুষের ভিড়ের মধ্যে তুমিও নিজেকে মিশিয়ে দিতে পার। দেখবে তার মধ্যে সত্যিই আনন্দ আছে, দেখবে প্রতিটি পণ্যদ্রব্যের প্রচলনগতিই মানুষের জীবনকে গতি দান করে। অর্থ দান করছে।

এ-কথার কোনও প্রতিবাদ করল না উইলেম। বাধা দিলো না কোনওরূপ। বুদ্ধিমান ওয়ার্নার বাধা না পেয়ে বলে যেতে লাগল, যারা পরিশ্রমী, কর্মঠ, বুদ্ধিমান, বাস্তববাদী, ভাগ্যদেবী তাদেরই মাথার উপর জয়ের মুকুট পরিয়ে দেন। জানবে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বুঝে সময় বুঝে তাকে চালনা করা বড় কঠিন কাজ এবং এর জন্য প্রচুর বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতার দরকার। তুমি তোমার কল্পনাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও কাব্যপ্রতিভাকে যদি এইদিকে চালাতে পারতে তাহলে তুমিও অনেক কিছু করতে পারতে। যখন কোনো পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী জাহাজ থেকে মাটিতে পা দেয়, তার জীবন ও পণ্যসম্পর্কিত অনিশ্চয়তা আর খেয়ালী সমুদ্রের কবল থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিত মাটির জগতে ফিরে আসে তখন যেন সে নবজীবনের আনন্দে হয়ে ওঠে আত্মহারা, তখন তার সেই আনন্দ দেখে যে কোনও সাধারণ মানুষ ও আনন্দ লাভ না করে পারে না। তবে অবশ্য ব্যবসার ব্যাপারে এটাও ঠিক যে সব সময় অঙ্কের হিসাবে কাজ হয় না। অঙ্কের হিসাব যতই নির্ভুল হোক, ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন না হলে ব্যবসাতে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করা যায় না।

দুজনের স্বভাবের মধ্যে কিছু অমিল থাকলেও উইলেম ও ওয়ার্নারের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে তেমনি তাদের বাবাদের মধ্যেও গড়ে উঠেছে দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব। ব্যবসাগত প্রবৃত্তির দিক থেকে উইলেমের বাবা বৃদ্ধ মেস্তার আর ওয়ার্নারের বাবা বৃদ্ধ ওয়ার্নার দুজনেই সমান। তবে বৃদ্ধ মেস্তার বেশ কৃপণ প্রকৃতির। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুব হিসেব করে চলেন। বাড়িতে বড় একটা কাউকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান না। বৃদ্ধ ওয়ার্নার কিন্তু একজন পাকা ব্যবসায়ী হলেও খাওয়ার ব্যাপারে অনেক উদার। আমোদ-প্রমোদের দিকেও তার নজর আছে। জীবনকে কিভাবে ভোগ করতে হয় তা তিনি জানেন। দুজনেই একই কারবারের শরিক।

সেদিন বৃদ্ধ মেস্তার ও বৃদ্ধ ওয়ার্নার এক জায়গায় বসে কারবার সম্বন্ধে কথা বলছিলেন। মেস্তার তাঁর ছেলে উইলেম সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। বৃদ্ধ ওয়ার্নার পরামর্শ দিলেন, তোমার ছেলেকে একবার বাইরে পাঠিয়ে দাও। কাজকর্ম শিখুক। অনেক জায়গায় অনেক কোম্পানিতে আমাদের করবারের অনেক টাকা পড়ে আছে। সেই টাকাগুলো ও গিয়ে আদায় করুক, তাহলে তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবস্থাগত সম্পর্কগুলো নূতন করে গড়ে উঠবে।

বৃদ্ধ মেস্তার তাতে রাজি হলেন সঙ্গে সঙ্গে। ঘোড়ার জন্য আটকাচ্ছিল। কিন্তু মেস্তার ঠিক করলেন আগামী পরশু দিন সোমবারেই উইলেম চলে যাক।

উইলেমকে ডেকে পাঠানো হলো। তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো সিদ্ধান্তের কথা। একথা শুনে খুশি হলো উইলেম। একটানা একঘেয়ে জীবনযাত্রা থেকে মুক্ত নূতন জায়গায় জীবন শুরু করার সুযোগ আপনা হতে এসে গেল তার। শুধু তাই নয়, তার মধ্যে ভাগ্যদেবীর প্রসন্নতার আভাস পেল। তবে একবার মেরিয়ানার সঙ্গে দেখা করতে হবে। রাত্রির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল উইলেম।

মেরিয়ানার বাড়িতে নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল মেরিয়ানা। তাদের আসন্ন বিচ্ছেদের কথা সব খুলে বলল উইলেম। বলল, আমি যেখানে ব্যবসার কাজে যাচ্ছি সেখানে ঘর পেলেই তোমাকে নিয়ে যাব। আশা করি। বিয়েতে তোমার কোনও আপত্তি হবে না।

মেরিয়ানা এ-কথার কোনও উত্তর দিল না। তার চোখের জল চেপে রেখে শুধু নীরবে চুম্বন করতে লাগল উইলেমকে। তাকে বুকের উপর চেপে ধরল আরও জোরে। এরপর বিদায় নেবার আগে একবার উইলেম জিজ্ঞাসা করল সে পিতা হতে চলেছে কি না। তাতেও কোনো স্পষ্ট উত্তর দিল না মেরিয়ানা। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে একটা চুম্বন করল।

পরের দিন সকালে বুকে এক গম্ভীর হতাশা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল মেরিয়ানা। নিঃসঙ্গতার এক দুর্বিষহ বেদনায় ভারী হয়ে উঠল তার অন্তরটা। যাকে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে তার সেই ভালোবাসার মানুষ দূরে চলে যাচ্ছে আর যাকে সে ভালোবাসে না অথচ সে জোর করে তাকে পেতে চায় এই অবাঞ্ছিত মানুষটা কাছে আসার ভয় দেখাচ্ছে। চোখ দিয়ে জলের ধারা নীরবে বয়ে যেতে লাগল মেরিয়ানার।

বারবারা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চুপ করো, শান্ত হও, কেঁদে কেঁদে সুন্দর চোখদুটো নষ্ট করো না বাছা। দুজন প্রেমিককে সহ্য করা কি একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার নয়? একজনকে যদি ভালোবাসতে নাই পার তাহলে তার ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ তাকে অন্তত কিছু ধন্যবাদ দিতে পার। তাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পার।

সে-কথায় কান না দিয়ে মেরিয়ানা বলল, হায়, আমার হতভাগ্য উইলেম একদিন রাতে আমার কাছে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে গেছে। স্বপ্নে দেখছে সে যখন এক দূর পার্বত্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একা একা তখন হঠাৎ আমাকে একটা পাহাড়ের চূড়ার উপর দেখতে পায়। কিন্তু আমাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যেতেই আমি সেই চূড়া থেকে কোথায় নেমে যাই। এইভাবে আমাদের বিচ্ছেদের আভাস আগেই পেয়েছিল সে। সে সেই স্বপ্নে আরও দেখেছিল অন্য একটা লোক কোথা হতে এসে আমার হাত ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমায়।

বারবারা এবার অধৈর্য হয়ে বলল, তুমি তো জান, আমি তোমার জন্য সব কিছু করতে পারি। এখন বলো, কি চাও, কি পেলে খুশি হবে তুমি।

মেরিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কি আর চাইব আমি? যে উইলেম আমাকে ভালোবাসে, যাকে আমি ভালোবাসি সে ব্যবসার কাজে আটকে পড়ে থাকবে বিদেশে।

বারবারা বলল, হ্যাঁ ওরা এমনই প্রেমিক যারা শুধু হৃদয় ছাড়া আর কিঝুঁই সঙ্গে আনে না। হৃদয় আর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না তাদের প্রেমিকাদের।

মেরিয়ানা বিরক্ত হয়ে বলল, এখন ঠাট্টা রাখো। কাজের কথা ভাব, সে আমাকে বিয়ে করতে চায়।

বারবারাও বিরক্ত হয়ে বলল, অমন নিঃস্ব অবস্থায় বিয়ে করার লোক আমাদের অনেক আছে।

মেরিয়ানা বলল, আমাকে দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নিতেই হবে। তবে আমার গর্ভে যে সন্তান বেড়ে উঠছে তার খাতিরে উইলেমকে আমাকে পেতেই হবে। এখন ঠিক করে ফেল আমি কি করব।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বারবারা বলল, যৌবনে মানুষ বড় চরমপন্থী হয়ে ওঠে। দুটোর একটাকে কেন বাছতে হবে? একই সঙ্গে দুজনের কাছ থেকে লাভ আর আনন্দ পেতে দোষ কি? একজনকে তুমি ভালোবাসবে আর একজনকে তার দাম দেবে। তবে একটা কাজ আমাদের করতে হবে। দুজন প্রেমিক যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়।

মেরিয়ানা বলল, যা করার করো। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না।

উইলেমকে প্রথমে এক জায়গায় যেতে হলো ঘোড়ার জন্য। বৃদ্ধ ওয়ার্নার একটা চিঠি দিয়েছিলেন সঙ্গে। চিঠিটা দেখলেই মালিক পত্রবাহককে ঘোড়া দিয়ে দেবে। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে উইলেম দেখল বাড়ির মালিক নেই। তার স্ত্রীরও মনমেজাজ খারাপ। উইলেম চিঠিটা দেখাতেই গিন্নী বলল, তাদের সৎ মেয়ে হঠাৎ এবটা ছোকরার সঙ্গে পালিয়ে গেছে। তাই তার বাবা মেয়ের খোঁজে ব্যস্ত।

উইলেম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাড়ির মালিক এসে গেল। উইলেমের চিঠি দেখে বিশেষ খাতির করল উইলেমকে। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোড়াটা দিয়ে দিল। তবে রাত্রিটার মতো উইলেমকে তার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতে বলল।

রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে এবং লোকটাকে তার মেয়ের জন্য কিছু সান্ত্বনা দিয়ে পরের দিন সকালে ঘোড়ায় চেপে তার আসল গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা হলো উইলেম। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই এক অশ্বারোহী সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দেখে থমকে দাঁড়াল। শুনল, মেয়েটি তার প্রেমিকসমেত ধরা পড়েছে।

একটা গাড়িতে খড়ের উপর তাদের বসিয়ে রাখা হয়েছে। ওদের দুজনকে দেখে মায়া হলো উইলেমের। মেয়েটিকে দেখে সাবালিকা মনে হলো। মনে হলো ওর বাবা জোর করে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিয়ে চায় মেয়েটাকে। দুজন তদন্তকারী অফিসার মেয়েটাকে জেরা করতে লাগল। মেয়েটা নির্ভিকভাবে বলতে লাগল, আমার বয়স কত জানতে চাইছেন? আমি আপনার বড় ছেলের সমবয়সী। আমার সৎ মা বাড়িতে আমায় এমন জ্বালাতন করতেন যে সে বাড়িতে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না আমার পক্ষে। তাছাড়া আমি যার সঙ্গে এসেছি তাকে ভালোবাসি। তাকে আমি অনেক আগে থেকেই সাথী হিসাবে বরণ করে নিয়েছি।

একজন অফিসার বলল, তা তো হবে না। তোমার প্রেমিককে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হবে, তার বিচার হবে। আর তোমাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

মেয়েটি দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, আমার প্রেমিকের দোষ নেই। ও তো আমাকে জোর করে আনেনি। আমি স্বেচ্ছায় এসেছি ওর সঙ্গে। আমি কোনও অপরাধ করিনি। তবু আমাকে লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে ফেলা হয়েছে। অথচ কোনও উচ্চ আদালতে আমাদের নিয়ে গেলে আমরা মুক্তি পাব।

আর্লম্যান নামে একজন বয়োপ্ৰবীণ তদন্তকারী অফিসারকে উইলেম অনুরোধ করল ওদের কথা বিবেচনা করার জন্য। অফিসার মেয়েটির লম্বা বক্তৃতা শুনেও বেশ কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। বেশ ভিড় জমে গিয়েছিল। কিন্তু কি করবেন তা ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না।

অফিসার যাই করুক ওদের দেখতে বড় ভালো লাগছিল উইলেমের। ওদের প্রতি এক সকরুণ সহানুভূতির সঙ্গে সঙ্গে কবিসুলভ এক ভাবানুভূতি জেগে উঠল তার মনে। তার মনে হলো, প্রেমের দুটি রূপ আছে-একটি সলজ্জ, অন্যটি সোচ্চার। একটির রূপ প্রচ্ছন্ন, ললিতকোমল ও শান্ত, অন্যটি প্রকাশ্য, দৃপ্ত এবং সংগ্রামশীল। উইলেম এতদিন প্রেমের যে রূপ দেখে এসেছে সে প্রেম ভীরু, দুর্বল, আত্মগোপনকারী। কিন্তু আজ মেয়েটির স্পষ্ট স্বীকারোক্তি আর দৃপ্ত কষ্টস্বরের মধ্যে প্রেমের একটি অদৃষ্টপূর্ব রূপ দেখে ধন্য হলো উইলেম। যে প্রেম গোপন গৃহকোণ থেকে প্রকাশের স্বচ্ছ আলোয় নিজেকে টেনে এনে রাজপথের উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের কথা অকপটে ঘোষণা করতে পারে, সব বাধাকে অস্বীকার করে সমাজ ও সংসারে আপন প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে পারে, সে প্রেমের মধ্যে অবশ্যই এক বিরল গৌরব আছে। সে গৌরব দেখে নিজেকে ধন্য মনে করল উইলেম।

অফিসার আর্লম্যানের কাছে ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমতি চাইল উইলেম। আর্লম্যান সহজেই সে অনুমতি দান করল। উইলেম সোজা মেলিনার প্রেমিকের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আমি দেখব একটা মিটমাট করতে পারি কি না। মেয়েটির বাবা আমাদের কাজ-কারবারের সঙ্গে জড়িত। কিছু লেনদেনও আছে। মনে হয় সফল হতেও পারি।

দুঃখে মুহ্যমান যুবকটি কিছুটা ভরসা পেল। সে আগে থিয়েটারে অভিনয় করত। এবার সে উইলেমের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কথাবার্তা বলতে লাগল। উইলেম ভেবেছিল বন্দি ব্যাঙ যেমন মুক্তির পাবার সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি যুবকটি মুক্তি পেলে দুজনেই অভিনয়ের জগতে চলে যাবে। উইলেম বলল, সুযোগ্য অভিনেতার জন্য যা যা দরকার অর্থাৎ সুন্দর চেহারা, মধুর কণ্ঠস্বর, তীক্ষ্ণ অনুভবশক্তি-তা সবই তোমার আছে।

কিন্তু যুবকটি বলল, তা আছে। তবে আমি আর মঞ্চে ফিরে যাব না ভবিষ্যতে।

কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল উইলেম। কিন্তু তার প্রেমিকের কথা সমর্থন করে মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে। আমরা আর অভিনয় করব না। অন্য কিছু কাজ-কারবারের কথা ভাবছি।

উইলেম বলল, অভিনেতার জীবনে কত সুযোগ আছে। তার ভবিষ্যৎ কত উজ্জ্বল। তাছাড়া যার যা পেশা তাই নিয়েই থাকতে হয়। তাতেই উন্নতি হয়। যখন তখন এক পেশা ছেড়ে অন্য পেশা ধরতে নেই।

মেলিনা বলল, আপনি কখনও অভিনয়ের কাজ করেননি, তাই একথা বলেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঈর্ষা, ম্যানেজারদের পক্ষপাতিত্ব, দর্শকদের নিয়ত পরিবর্তনশীল রুচি প্রভৃতি পদে পদে বাধা, কত অসুবিধা ভোগ করতে হয় অভিনেতাদের তার ঠিক নেই।

যুবকটি বলল, যাই হোক, আপনি মিটমাটের চেষ্টা করুন। আমার প্রেমিকার বাবাকে বলেন কেরাণি, কর আদায়কারীর যে কোনও পদে আমি চাকরি করতে রাজি আছি। যে কোনও একটা চাকরি পেলেই তাতে আমার চলে যাবে।

উইলেম কথা দিল, পরের দিন সকালেই সে মেয়েটির বাবার সঙ্গে কথা বলবে।

হোটেলে রাতটা কাটিয়েই সকালে বেরিয়ে পড়ল উইলেম। উইলেম গিয়ে দেখল মেয়েটির বাবা বাড়িতেই আছে। তাকে সব কথা বিজ্ঞতার সঙ্গে বুঝিয়ে বলল, লোকটিও কথা কথা ধৈর্য ধরে শুনল। শুনে যা বলল, তাতে উইলেম একরকম সাফল্যই লাভ করল। লোকটি বলল, তার মেয়ে যুবকটিকে বিয়ে করতে পারে। সে মামলা তুলে নেবে। তাদের কোনও শাস্তিও দেবে না। কিন্তু বিয়ের পণ হিসাবে কোনও যৌতুক পাবে না। তাছাড়া তার মেয়ে তার মাসির যে সম্পত্তি পেয়েছিল। তা তার বাবার কাছে বছর কতেকের জন্য রাখতে হবে। অর্থাৎ তার বাবাই তার আয় উপসত্ত্ব ভোগ করবে। উইলেম তার মেয়ে-জামাইকে ঘরে রাখার জন্য অনুরোধ করল লোকটিকে। কারণ এখন ওদের কোনও সংস্থান নাই। লোকটি তার উত্তরে বলল, তার মেয়েকে ঘরে জায়গা দিতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে। ছোকরাটিকে নিয়ে। ওই ছোঁড়াটার উপর তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীরও লোভ ছিল। কিন্তু যুবকটির দৃষ্টি ছিল তার মেয়ের উপর। তাই তারা পালিয়ে যায়।

কথাটা শুনে লজ্জায় পড়ে গেল উইলেম। এই গোপন কথাটা জানলে সে এ অনুরোধ করত না।

যাই হোক, মিটমাটের ব্যবস্থা শেষ করে মনটাকে স্থির করে মেরিয়ানাকে একখানা চিঠি লিখল উইলেম। কয়েকদিন ধরে তার মনে হচ্ছিল, রাত্রিবেলায় খাওয়ার পর কাগজ নিয়ে বসে পড়ল। লিখল,

যে মধুর রাত্রি তার নীল আবরণ দিয়ে আমাদের ঢেকে রাখত, আমাদের মিলনের নিবিড়তাকে মধুর করে রাখত, সেই রাত্রিরই শান্ত নীরব আকাশে তোমাকে চিঠি লিখছি মেরিয়ানা। এখন আমি এক নববিবাহিত যুবকের কাছে আছি যার সামনে জীবনের এক নতুন দিগন্ত খুলে গেছে, যে একটু পরেই তার নববধুর বুকের উপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাদের প্রেম স্বভাবতই তোমার কথা, আমাদের ভালোবাসাবাসির কথা মনে পড়িয়ে দিল নতুন করে, আরও তীব্র করে।

আমার ফিরতে আরও কিছুদিন দেরি হবে। তা হোক। কারণ একথা ভাবতে খুবই ভালো লাগছে যে এই বিচ্ছেদের পর আগের থেকে আরও মধুর হয়ে উঠবে আমাদের মিলন। পুনর্মিলনের সেই মধুর নিরবচ্ছিন্নতা এই বিচ্ছেদের সব বেদনা, সব যন্ত্রণাকে ভাসিয়ে দেবে। আমি আমাদের সন্তানের জন্য কিছু ভাবি না। আমাদের মিলনের সুখস্মৃতিরূপেই সে সন্তান আনন্দ বর্ধন করে যাবে আমাদের। একটা কথা প্রায়ই মনে হয় আমার প্রিয়তমা। বক্তৃতামঞ্চ থেকে নাট্যমঞ্চ কোনও অংশে কম নয়। ঈশ্বর এবং প্রকৃতি আমাদের যে শক্তি, যে যোগ্যতা দান করেছেন তার বিকাশ সাধনের জন্য আমি মঞ্চে অবতীর্ণ হব যে কথা দর্শকরা যুগ যুগ ধরে শুনতে চাইছে, তোমাতে আমাতে দুজনে এক সুন্দর জোট বেঁধে সেকথা তাদের প্রাণভরে শোনাব। এত সব কথা মুখে বলে জানানো সম্ভব নয় বলেই চিঠি লিখে জানালাম। এখন এখানেই ইতি। বিদায় প্রিয়তমা, আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। বন্ধ হয়ে আসছে। এখন রাত্রি নিশীথ।

প্রথম কিস্তির কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে গেল উইলেম। আবার তাকে যেতে হবে আর এক জায়গায়। আবার বার হতে হবে। কিন্তু তার প্রস্তুতির জন্য দিনকতক লাগবে। তাই বাড়ি ফিরেই পরদিন বিকালের দিকে মেরিয়ানার সঙ্গে দেখা করতে গেল উইলেম। চিঠিখানা ডাকে ফেলেনি। সঙ্গে করে নিয়ে গেল। ভাবল হাতেই দেবে। বিকালে বা সন্ধ্যায় এর আগে কখনও যায়নি সে মেরিয়ানার কাছে। সাধারণত সে যায় গভীর রাত্রিতে। কিন্তু আজ ঠিক করল, সন্ধে হতেই সে চিঠিখানা তার হাতে দিয়ে আসবে। পরে রাত্রি গম্ভীর হলে গিয়ে তার উত্তর চাইবে।

মেরিয়ানাকে কাছে পেতে ইচ্ছা করছে আর একটা কারণে। বাইরে থেকে যে বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধু ওয়ার্নার এসেছিল তার প্রেম সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে। মেরিয়ানার প্রতি তার গোপন প্রেম, তার বাড়িতে গভীর রাত্রিতে নিয়মিত যাওয়া এসব কথা সব জেনেছে ওয়ার্নার। শুধু তাই নয়, সে মেরিয়ানা সম্বন্ধেও অনেক খবর সংগ্রহ করেছে। ওয়ার্নার তাকে সাবধান করে দিয়েছে, মেরিয়ানা ভালো মেয়ে নয়। মেরিয়ানা তাকে উপরে ভালোবাসার ভান করলেও আসলে আর একটা লোকের কাছে সাহায্য নেয়। আর একটা লোকের সঙ্গে তার আছে এক গোপন সম্পর্ক।

ওয়ার্নারের কথা শুনে মনটা কিছু খারাপ হলেও মেরিয়ানার প্রতি কিছুমাত্র বিশ্বাস হারায়নি উইলেম। মেরিয়ানার মতো সুন্দরী মেয়ে কখনও খারাপ হতে পারে, সে কখনও বিশ্বাস করতে পারে না একথা। তার ভালোবাসা কখনও মিথ্যা হতে পারে না। এ বিশ্বাস এখন অটুট আছে তার।

এই অটুট বিশ্বাসে বুক বেঁধে মেরিয়ানার বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল উইলেম। ঘরে ঢুকেই ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেরিয়ানার বুকে। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। কিন্তু আবেগের প্রবলতায় একটা জিনিস লক্ষ্য করেনি উইলেম। মেরিয়ানার আদর-অভ্যর্থনায় ও আচরণে আগের মতো আন্তরিকতা নেই, আবেগের সেই উষ্ণ নিবিড়তা নেই।

সেটা যে নেই মেরিয়ানা নিজেও সচেতন সে বিষয়ে। তাই তার কারণ হিসাবে একটা যুক্তি দেখাল। বলল, আজ তার শরীর খারাপ। উইলেম বলল, এখন এসেছে এমনি দেখা করতে, আজ রাতে আবার আসবে সে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে মেরিয়ানা বলল, আজ না, অন্যদিন এসো। আজ শরীরটা বড় খারাপ।

কোনও কিছু সন্দেহ না করে সরল বিশ্বাস মেরিয়ানার সব কথা মেনে নিল উইলেম। এ নিয়ে সে আর পীড়াপীড়ি করল না। তবে অনেক আশা অনেক উৎসাহ নিয়ে যে চিঠিটা তুলে দিতে এসেছিল মেরিয়ানার হাতে, সে চিঠিটা বার করল না। পকেটেই তা রয়ে গেল। মেরিয়ানার এই নিরুত্তাপ ভাব দেখে সে চিঠি তার হাতে দেবার কোনও যুক্তি খুঁজে পেল না উইলেম।

তবে সবেমাত্র সন্ধে হয়েছে। মেরিয়ানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে গেল উইলেম। কয়েক দিনের বিচ্ছেদের পর নিবিড়তর মিলনের আশায় সম্ভাব্য যে আনন্দের আবেগ ও উত্তেজনার ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠেছিল বুকে, সে ঢেউ আপনা হতেই অসময়ে ফেটে মিলিয়ে গেল। মনে মনে মুষড়ে পড়ল উইলেম। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগল না কিছুতেই। তাই পোশাক পরে আবার বেরিয়ে পড়ল পথে।

পথে বার হতেই এক অচেনা পথিকের সঙ্গে দেখা হলো। পথিক তাকে কোনো এক ভালো হোটেলের সন্ধান দিতে বলল। কথা বলতে বলতে তাকে সঙ্গে করে নিকটবর্তী একটা হোটেলে নিয়ে গেল উইলেম। হোটেলে পৌঁছে পথিকটি উইলেমকে এক কাপ চা খেয়ে যাবার অনুরোধ করল। হাতে কোনও কাজ না থাকায় উইলেম বসে পড়ল ভদ্রলোকের কাছে। উইলেমের পরিচয় জানতে পরে পথিকটি বলল, সে নাকি তার পিতামহকে চিনত। তার পিতামহের কেনা যে ছবিগুলো তার বাবা বিক্রি করে দেন সে ছবিগুলো সে নাকি কিনে নেয়। যাই হোক, একথা-সেকথার পর ভদ্রলোক উইলেমকে বলল, তুমি ভাগ্যে বিশ্বাস করো? তুমি কি বিশ্বাস করো অদৃশ্য কোনও শক্তি উপর থেকে আমাদের জীবনকে চালনা করছে?

উইলেম বলল, তোমার মতো এক যুবকের পক্ষে একথা সাজে না।

ভদ্রলোক তখন বলল, মনে করো তুমি একটা বড় কাজ করতে চলেছ অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু মাঝপথে অকস্মাৎ কোনও বাধা এসে গেল। তুমি তা করতে পারলে না। এখানেও কি তুমি নিয়তির বিধানে বিশ্বাস করবে না?

উইলেম বলল, একথার উত্তর এত তাড়াতাড়ি এখানে দেওয়া সম্ভব নয়।

চা খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ল উইলেম। পথে কোথায় একজন লোক। একটা মিস্টি গানের সুর বাজাচ্ছিল বাদ্যযন্ত্রে। সেই সুর শুনতে শুনতে হঠাৎ মেরিয়ানার কথা মনে পড়ল তার। ইচ্ছা না থাকলেও ধীরে ধীরে মেরিয়ানার বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলো। তখন বেশ রাত হয়েছে। সদর দরজা বন্ধ। তবু তার সামনে বোয়াকটায় একটু বসল উইলেম। দরজায় কাঠগুলোয় হাত বুলিয়ে দেখল। এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কতদিন মেরিয়ানা তার জন্য অপেক্ষা করেছে কত উষ্ণনিবিড় আগ্রহে। দরজার চৌকাঠ পার হবার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু সে দিন কি আর ফিরবে না? আজ কেন তাকে যেতে নিষেধ করল মেরিয়ানা? কিন্তু এসব কথা এখানে বসে ভেবে কোনও ফল হবে না।

এই সব ভাবতে ভাবতে আবার বাড়ির পথে রওনা হলো উইলেম। কিন্তু কয়েক পা যেতেই হঠাৎ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল আধো অন্ধকারে কোন এক পুরুষের ছায়ামূর্তি মেরিয়ানার বাড়ির সদর দরজা থেকে নিঃশব্দে বার হয়ে কোথায় চলে গেল। এক অদম্য কৌতূহলের বশে পথের উল্টো দিকে এগিয়ে চলল উইলেম লোকটাকে অনুসরণ করার জন্য। সে স্পষ্ট দেখল লোকটা মেরিয়ানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা পথ ধরে চলে গেল। কিন্তু উইলেম কিছুটা এগিয়ে যেতেই আর তাকে দেখা গেল না। হয়তো কোনও পাশের গলিপথে ঢুকে পড়েছে।

বাড়ি ফিরে এ বিষয়ে সব সন্দেহ, সব সংশয় মন থেকে মুছে ফেলল উইলেম। সেই চিঠিটা বার করে তার শেষে কয়েকটা কথা জুড়ে দিল। লিখল, হে আমার প্রিয়তমা, গত রাতে তোমার কি হয়েছিল? কেন তুমি যেতে নিষেধ করলে আমায়?

তোমার হয়ত ওখানে থাকতে আর ভালো লাগছে না। কিন্তু ধৈর্য ধরো, সময়মতো। আমি তোমার একটা ব্যবস্থা করবো। ওই কালো গাউনটা পরেছিলে কেন? আমি তো তোমাকে একটা সাদা নাইটগাউন পাঠিয়েছি। সেটা পরলে তোমাকে বড় সুন্দর দেখাবে। চিঠি পাঠাবে বুড়ি সিবিলের মাধ্যমে। শয়তান নিজে তাকে দূত আইরিস হিসাবে বেছে নিয়েছে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

এমন অনেক রোগ আছে যা বলবান লোকদের ধরলে বেশি দুর্বল করে দেয়, বেশি করে কায়দা করে। উইলেমের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। মেরিয়ানার সঙ্গে তার ব্যর্থ প্রেম সম্পর্কটা একটা দুষ্ট রোগের মতো অত্যধিক আবেগে স্ফীত উইলেমের অন্তরটাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেল একেবারে। তবু একেবারে আশা ছাড়ল না উইলেম। তার ধারণা আবার মিলন ঘটবে তাদের। সব সংশয়, আর ভুল বোঝাবুঝির মেঘ কেটে যাবে নিঃশেষে।

কিন্তু তার বন্ধু ওয়ার্নার মেরিয়ানার জীবন সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যেভাবে তার মুখোশ খুলে দিয়েছে তাতে তার প্রতি মেরিয়ানার প্রতারণার বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। অবশেষে উইলেম যখন দেখল মেরিয়ানাকে ফিরে পাওয়া আর সম্ভব নয় তার পক্ষে তখন তার অভাবটাকে আর এক চরম ক্ষতি বলেই ধরে নিল। কিন্তু আবার সঙ্গে সঙ্গে দেখল এ ক্ষতি সহজভাবে সহ্য করা অসম্ভব তার পক্ষে। নিজের অন্তরকে ঘৃণা করতে লাগল উইলেম। নীরব অশ্রু আর অবদমিত শোকাবেগকেই একমাত্র ওষুধ বা প্রতিকার বলে ভাবতে লাগল।

বর্তমানের দুঃখটাকে ভোলার জন্য অতীতের হারিয়ে যাওয়া সুখের ও মিলনের দিনগুলোকে কল্পনার রং-রস দিয়ে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করে নূতন করে। কিন্তু তাঁরা বাঁচে না। উইলেম শুধু একবার অতীতের গভীর অন্ধকার খাদটার মধ্যে নিবিড় হতাশার সঙ্গে তাকায়। তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মধ্যে। এইভাবে বর্তমানের জীবনযন্ত্রণাকে ভুলতে গিয়ে স্বেচ্ছায় আর এক যন্ত্রণার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে উইলেম। যৌবনে স্বাভাবিক উন্মাদনা বশে তার বর্তমানের ক্ষতিটাকে অপূরণীয় ভেবে এক বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা দান করে।

প্রথম প্রেমে এক তিক্ত ব্যর্থতা লাভ করার সঙ্গে এক বিরাট রূপান্তর এল উইলেমের জীবনে। প্রেমের ক্ষেত্রে তার আকাঙ্ক্ষিত বস্তুকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে শিল্প সাধনার প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা জাগল তার মনে। কবিতা লেখা ও অভিনয় করার মধ্যে কোনও যুক্তি খুঁজে পেল না। তার মনে হলো কবিতা কতকগুলো শব্দের ছন্দোবদ্ধ গ্রন্থন যার মধ্যে গাঁথা থাকে কতকগুলো বাঁধাধরা নীরস চিন্তা আর আবেগ। আবার তার চেহারা, আবেগানুভূতির স্বচ্ছন্দ ও সংযত প্রকাশ, তার বাকভঙ্গিমা, অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি সব মিলিয়ে তার যে সহজাত অভিনয়প্রতিভা ছিল এবং যার নিয়মিত চর্চা করলে সে একজন উচ্চস্তরের অভিনেতা হতে পারত, সে প্রতিভাও বিষাদ ঠেকল তার কাছে।

এখন কাব্যসাধনা ও অভিনয়চর্চা দুইই ছেড়ে ব্যবসার কাজে মন দিল উইলেম। কখনও এক্সচেঞ্জে, কখনও কাউন্টিং হাউসে, কখনও বিক্রয়কেন্দ্রে, স্টোরে, কখনও অফিসঘরে বা প্রচারকেন্দ্রে সব সময় ঘুরে বেড়াত উইলেম অক্লান্তভাবে। তার উপর যখন সে কাজের ভার দেওয়া হতো, সে তাই প্রচুর যত্নও পরিশ্রমের সঙ্গে করত। তার এই নূতন কর্মতৎপরতা দেখে তার বন্ধুরা বিস্মিত হলো, তার বাবা খুশি হলেন।

মন থেকে সব প্রেম ও কাব্যসাধনার স্মৃতি চিরতরে মুছে দেবার জন্য একদিন সন্ধের সময় নিজের ঘরে আগুন দিয়ে সব চিঠিপত্র ও লেখা কবিতা পোড়াতে লাগল উইলেম। তার এতদিনের প্রিয়বস্তুগুলো তারই চোখের সামনে দেখতে দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

এমন সময় ওয়ার্নার ঘরে ঢুকল। ঢুকেই উইলেমের কাণ্ড দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। তার বুঝতে দেরি হলো না উইলেম কি করছে। উইলেম নিজে থেকেই বলল, যে কাজে আমার কোনও সহজাত প্রতিভা বা যোগ্যতা নেই তা যে সত্য সত্যই আমি ছেড়েছি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেবার জন্যই আমি এ কাজ করছি।

ওয়ার্নার তাকে বাধা দিয়ে বলল, কোনও কবিতা সৃষ্টি হিসাবে সার্থক বা পূর্ণতা অর্জন করতে না পারলেও তা পুড়িয়ে ফেলার কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।

উইলেম বলল, কবিতা হয় রসোত্তীর্ণ হবে অথবা তার অস্তিত্ব থাকবে না। যার কাব্যসৃষ্টির কোনও জন্মগত প্রতিভা নেই তার এ কাজে হাত দেওয়া মোটেই উচিত নয়। যদি তা সে করে তাহলে বলব সে বিষয়ে সে প্রতারণা করছে সকলের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে। সব মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু অনুকরণপ্রবৃত্তি আছে। সে ভাবে প্রকৃতি জগতে ও মানব জগতে তোনও বস্তু বা ঘটনা দেখলেই তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ বিষয়ে তার ক্ষমতা আছে।

ওয়ার্নার বলল, তোমার অন্তরের অনুভূত সত্যগুলোকে এভাবে জোর করে নির্বাসিত করা উচিত নয়। এই সব স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোর সঙ্গে মানিয়ে চলাই ভালো। কারণ এগুলোকে অস্বীকার করলে নিজের আত্মাকেই অস্বীকার করা হয়। তাছাড়া এটা এক নির্দোষ আনন্দের ব্যাপার। এ আনন্দ ত্যাগ করার কোনও অর্থই হয় না।

উইলেম বলল, কি কারণে আমি এসব পুড়িয়ে ফেলেছি। তার কারণ হলো এই যে এই কাগজপত্রগুলোর মধ্যে আমার অতীতের কামনা-বাসনাগুলো সব লেখা আছে। বর্তমানে আমি যতই এই সব কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করে জীবনের কোনও বৃহত্তর অর্থ চাই ততই এই সব লেখাগুলো আমাকে সেই সব ব্যর্থ কামনা-বাসনাদের কথা জোর করে মনে পড়িয়ে দেয়। আমার তা মোটেই ভালো লাগে না। মোটেই না।

এই বলে আরও দুটো কাগজের প্যাকেট পুড়িয়ে ফেলল উইলেম। আর তার সামনে হতবুদ্ধি হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল বিব্রত ওয়ার্নার। তার করার বা বলার আর কিছুই ছিল না। এর আগে সে উইলেমকে দু তিনবার বাধা দিতে গিয়েও পারেনি।

এমনি করে প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাব্যসাধনা ও শিল্পসাধনায় জলাঞ্জলি দিয়ে কাজ-কারবার ও পৈত্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে খুব বেশি করে মন দিল উইলেম। ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট লোকদের সঙ্গে কথাবার্তা, লেখা চিঠিতে কিছু কিছু কাব্যিক আবেগের সংমিশ্রণতার সাফল্যের মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে লাগল। ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল উইলেম। তখন তার বাবা আবার বাইরে পাঠাবার মনস্থ করলেন তাকে। বললেন, বাইরে যেসব পাওনা টাকাগুলো পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে সেগুলো আদায় করে আনুক।

এবার উইলেমকে পাঠানো হলো পার্বত্য অঞ্চলে। ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে পড়ল উইলেম। পার্বত্য এলাকায় এই তার প্রথম যাওয়া। পাহাড়ের উত্তুঙ্গ, শৃঙ্গ, শ্যাওলাধরা বড় বড় পাথর, গভীর খাদ প্রভৃতি দেখতে খুব ভালো লাগছিল তার। আপনা থেকে মুখ দিয়ে গান বেরিয়ে এল উইলেমের। তার সঙ্গে নিজের লেখা কিছু গানও।

এমন সময় কয়েকজন লোকের কাছে শুনল হকড নামে এক জায়গায় এক নাটকের অনুষ্ঠান হবে।

অবাক হয়ে গেল উইলেম কথাটা শুনে। এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে আবার থিয়েটার! তা যদি হয় আমি অবশ্যই তা দেখতে যাব।

লোকগুলো বলল, থিয়েটার হবে এক কারখানায়। কারখানার মালিক তার কর্মচারীদের নিয়ে একখানা নাটক মঞ্চস্থ করছে। এখানে তো আর কোনও আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা নেই। তাই মালিক মাঝে মাঝে ওই থিয়েটারের আয়োজন করে।

উইলেম সেখানে গিয়ে দেখল কারখানার মালিক তাদের কারবারের একজন খরিদ্দার। তার কাছে তাদের কোম্পানি কিছু টাকাও পাবে। তার কাছে দেনাদারদের যে তালিকা আছে তাতে তারও নাম আছে। যাই হোক, উইলেমকে দেখে খুশি হলো সেই কারখানার মালিক। সব টাকা মিটিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। তার থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করল। তার স্ত্রী বলল, উইলেমকে দেখতে ঠিক তার বাবার মতো।

রাতে নাটক দেখে বিশ্রাম করে পরের দিন সকালে আবার হোটেলে চলে গেল উইলেম। কিন্তু টাকা আদায়ের ব্যাপারে এই পার্বত্য এলাকায় বিশেষ সুবিধা করতে পারল না সে। আইনগত বিষয়ে পরামর্শদাতারও একান্ত অভাব এখানে। দুচারদিন এই পাহাড়-জঙ্গলে রাজ্য ছেড়ে সমতলভূমির দিকে রওনা হলো উইলেম।

উঁচু-নিচু বন্ধুর পার্বত্য পথ, ছায়াঘন জঙ্গল, তার উপর মেঘ বৃষ্টি কুয়াশা প্রভৃতির অবাঞ্ছিত অন্যভ্যস্ত অভিজ্ঞতার পর সমতলে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল উইলেম। উর্বর ঘাসেঢাকা সবুজ উপত্যকা, অবারিত সুন্দর প্রান্তর, আর তার বুক চিরে বয়ে যাওয়া কত মন্থরগতি নদী দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল তার। এমনি এক নদীর ধারে ছোট্ট এক সাজানো সুন্দর এক শহর পেয়ে গেল উইলেম।

শহরের মধ্যে খোঁজ করে একটা ভালো পান্থশালায় উঠল উইলেম। দেখল তার সামনে ভিড়। কোথা হতে এক দড়ির খেলা দেখানো নাট্যদল এসেছে। রাত রাত্রি থেকে দু-তিনদিন ধরে তাদের খেলা দেখানো চলবে।

কিছুক্ষণ পরেই এক ফুলওয়ালী মেয়ে ফুল বেচতে এল। উইলেম তার থেকে কিছু ফুল কিনল। তার কিছু পরে তার ঘরের উল্টো দিকে এক ঘরের জানালায় তার হঠাৎ চোখ পড়ল, এক সুন্দরী যুবতী চুল আঁচড়াচ্ছে। হঠাৎ একটি ছেলে এসে বলল, আপনি যে ফুল কিনেছেন তার থেকে কিছু ঐ ভদ্রমহিলা চাইছেন। সানন্দে তা দিল উইলেম।

ওর কিছু পরে লার্তেস নামে এক ভদ্রলোকে এসে আলাপ করল উইলেমের সঙ্গে। আলাপ-পরিচয়ের পর লার্তেস উইলেমকে সঙ্গে করে সেই সুন্দরী যুবতীর ঘরে নিয়ে গেল। লার্তেসই আলাপ করিয়ে দিল। যুবতীটি প্রথমেই তার ফুলের জন্য ধন্যবাদ জানাল উইলেমকে। উইলেম দেখল মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী।-তার চোখ, মুখ, চুল সব মিলিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে তার দেহের লাবণ্যকে। লার্তেস বলল, আমি আর ফিলিনা একই নাট্যদলের অংশীদার। আমরা জাহাজে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে যেতে নেমে পড়েছি এখানে। জায়গাটা খুব ভালো লাগায় দু-চারদিন থেকে যেতে চাই।

উইলেমকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল ফিলিনা। সে তখন একটা কালো পোশাক পরেছিল। পোশাকটা একটু ছোট হলেও তাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। উইলেমের একটা হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল তার শোবার ঘরে। ফিলিনার একটা হাতে ছিল উইলেমের দেওয়া সেই গোলাপ ফুলটা।

লার্তে দোকান থেকে কিছু মিষ্টি নিয়ে এল উইলেমের জন্য। এসেই ফিলিনার কোলের উপর কিছু চিনির রসে পাক দেওয়া বাদাম ছুঁড়ে দিল। তা দেখে ফিলিনা উইলেমকে লক্ষ করে বলল, দেখছেন, এই বীরপুরুষ আমাকে কত শিশু ভাবছে। অথচ উনিই এই সব জিনিস খেতে বেশি ভালোবাসেন।

উইলেম হেসে ফেলল কথাটা শুনে। লার্তেস প্রস্তাব করল, আজকের দিনের আবহাওয়াটা বড় চমৎকার। চলো বাইরে কোনও গ্রামাঞ্চলে গিয়ে বেড়িয়ে আসি। ওখানেই খাওয়াটা সেরে নেব।

ফিলিনা উৎসাহিত হয়ে বলল, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। তাহলে আমাদের এই নবপরিচিত বন্ধুটিও বেশ কিছুটা আনন্দ পান।

উইলেম বলল, আমি আমার ঘর থেকে মুখ-হাত ধুয়ে চুলটা আঁচড়ে আসছি।

ফেলিনা বলল, আপনি এটা এখানেই সারতে পারেন। এই বলে সাবান পাউডার প্রভৃতি সব প্রসাধন্দ্রব্যের ব্যবস্থা করে দিল সঙ্গে সঙ্গে।

সকলে তৈরি হয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করল। ফিলিনার মনটা বড় নরম। যাবার পথে ভিখিরি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু না কিছু পয়সা ছুঁড়ে দিচ্ছিল সে। অবশেষে মিল নামে একটা পান্থশালায় এসে পৌঁছল ওরা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে খাবার জন্য তৈরি হলো তারা। এমন সময় ওরা দেখল অদূরে স্থানীয় খনিশ্রমিকরা এক নাচগানের অনুষ্ঠান করছে। অনুষ্ঠানটা একই সঙ্গে গীতি ও নৃত্যনাট্য ধরনের। তাতে দেখা গেল মঞ্চের উপর এক খনিশ্রমিক গাঁইতি দিয়ে কয়লা কাটছে আর গান গাইছে। এমন সময় এক কৃষক এসে তাকে গানের মধ্যে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেন সে মাটি কাটছে। কেন সে তার জমিটাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। খনিশ্রমিক তার উত্তরে বলল, এইভাবেই মাটির ভিতর থেকে সব খনিজ সম্পদ বার করে আনতে হয়। তাতে অসংখ্য মানুষের মঙ্গল হয়। এভাবে দেখা গেল প্রথমে কৃষকটি রেগে গেলেও পরে খনিশ্রমিকের কথায় শান্ত হয়ে চলে গেল।

অনুষ্ঠান শেষ হলে ওরা অন্যত্র চলে গেল কথাবার্তা শুরু করল নিজেদের মধ্যে। ফিলিনা গান শুরু করল। তার গলাটা বড় মিষ্টি। গান শুনতে শুনতে ওরা আবার সেই শহরের হোটেলে ফিরে গেল। সন্ধ্যায় হবে হোটেলের সামনে দড়ি নাচের খেলা। ফিলিনা বলল, তোমাদের ঘরের চেয়ে আমার ঘরটা এ বিষয়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক। তোমরা দুজনেই আমার ঘর থেকে অনুষ্ঠান দেখবে।

অনুষ্ঠানের প্রথমে কিছু অপটু ছেলেমেয়ে ও কিছু আনাড়ি লোক খেলা দেখিয়ে হাসাল দর্শকদের। অবশেষে এল এ খেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দুজন বড় খেলোয়াড় নার্সিস আর লান্দ্রিনেত্তে।

অনুষ্ঠান শেষে খেলোয়াড়দের তাঁবুর বাইরে অদ্ভুতদর্শনা একটি মেয়ে দেখে তাকে ডাকল উইলেম। মেয়েটি ওদের কাছে আসতে উইলেম জিজ্ঞাসা করল তার বয়স কত।

মেয়েটি বলল, তা সে জানে না। তাদের দলের কেউ জানে না।

উইলেম আবার জিজ্ঞাসা করল, তোমার বাবার নাম কি?

মেয়েটি বলল, সে শয়তানটা মারা গেছে।

উইলেমের মনে হলো, মেয়েটির বয়স বারো-তের হবে। তার মুখ-চোখ ভালো। বয়স অনুপাতে তার স্বাস্থ্য খুবই উন্নত। কিন্তু সেই অনুপাতে তার হাত-পাগুলো পুষ্ট হয়নি। তাকে দেখতে সত্যিই ভালো লাগছিল উইলেমের। ফিলিনা তাকে কিছু মিষ্টি দিতেই সে চলে গেল।

লার্তেস আবার একটা প্রস্তাব আনল। আগামীকাল জাগারহানস শহরে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারবে। জাগারহানস হচ্ছে এক বিরাট বনাঞ্চল। খুব নিস্তব্ধ আর মনোরম। বেড়াবার জায়গা হিসেবে চমৎকার। ওরা তিনজনেই যাবে।

আনন্দের মিষ্টি উত্তেজনায় সারারাত ভালো ঘুম হলো না উইলেমের। সকাল। হতেই মুখ-হাত ধুয়ে কাপড়-জামা পরে ফিলিনার ঘরে গিয়ে দেখে ফিলিনা নেই। বেশ কিছুটা হতাশ হয়ে লার্তেসের ঘরে গেল উইলেম। লার্তেস শান্ত কণ্ঠে বলল, ফিলিনা যেখানে যাক তারা দুজনে যাবে।

রওনা হবার আগে কিছুক্ষণ মেয়েদের সম্বন্ধে কথাবার্তা হলো ওদের মধ্যে। উইলেম লক্ষ করল মেয়েদের সম্বন্ধে খুব একটা উৎসাহ নেই লার্কেসের। একসময় লার্তেস বলল, ফিলিনা কাউকে ঠকায় না। অবশ্য সাময়িকভাবে নিরাশ করতে পারে। সে মেয়ে হিসাবে আদিমাতা ঈভের সুযোগ্য বংশধর। সে এমনই এক জাতের মেয়ে যে দেওয়া-নেওয়ার মাত্রা সম্বন্ধে অতিমাত্রায় সচেতন। তাকে যতটুকু দেবে, ঠিক ততটুকুই পাবে তার কাছ থেকে।

সহসা মেরিয়ানার কথাটা মনে পড়ে গেল উইলেমের। জাগারহানসের জঙ্গলে গিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত ঘুরতেই একটা পাথরের ধারে ফিলিনাকে একা একা বসে। থাকতে দেখল ওরা। লার্তেস তাকে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল তার সঙ্গীরা কোথায়। ফিলিনা উত্তরে বলল, সে আগেই তাদের বিদায় দিয়েছে। ফিলিনা বলল, লোকগুলো ভীষণ কৃপণ প্রকৃতির। হোটেলে খেতে গিয়ে বার বার প্রতিটি জিনিসের দাম জিজ্ঞাসা করছে আর এ ওর মুখপানে তাকাচ্ছে। আমি ওদের ভাবগতিক বুঝতে পেরে ওয়েটারকে এমন এক ডিনারের অর্ডার দিলাম যার বেশির ভাগ উপকরণ হোটেলে নেই। অগত্যা ওরা বাইরে চলে গেল। ওরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। আমিও ওদের বিদায় দিয়ে মুক্তি দিলাম। আর ওরা এক দিকে মুখ করবে না।

একথা-সেকথার পর হঠাৎ একসময় ফিলিনা বলল, তোমরা দুজনে কিছু ফুল নিয়ে এস্র। বেশি করে আনবে।

ওরা দুজনে ফুল আনলে সেই ফুল দিয়ে একটা মালা গেঁথে নিজের গলায় পরল ফিলিনা। তারপরেও অনেক ফুল অবশিষ্ট থাকায় আর একটা মালা গেঁথে উইলেমের গলায় গম্ভীরভাবে পরিয়ে দিল। তখন লার্তেস হেসে বলল, আমাকে তাহলে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হবে?

ফিলিনা তখন নিজের গলা থেকে মালাটি খুলে লার্তেসের গলায় পরিয়ে দিল। বলল, শূন্য হাতে কাউকে ফিরতে হবে না।

লার্তেস শুধু বলল, এখান থেকে আমরা দুজনেই যদি তোমার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী হই?

ফিলিনা তখন নীরবে লার্তেসের মুখের কাছে তার মুখটা বাড়িয়ে দিল যাতে লার্তেস চুম্বন করতে পারে। তার পরমুহূর্তে দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করলে উইলেমকে। তারপর বলল, পুরুষ নারীর কাছে সাধারণত যা চায় তা আমি তোমাদের দুজনকেই দিলাম। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনও কারণ নেই।

ফিলিনা বলল, এখন সবেমাত্র বিকেল। চলো ওদের খেলা আরম্ভ হবার আগেই আমি কিছুক্ষণের জন্য নাচব। আমাদের ঘরে চলো।

ঘরে গিয়ে ফিলিনার সঙ্গে লার্তেসও নাচতে লাগল। কিন্তু উইলেম ভালো নাচতে জানে না। তার অভ্যাস নেই। তখন লার্তেস ও ফিলিনা দুজনেই উইলেমের হাত ধরে তাকে নাচ শেখাতে লাগল।

ওদের দড়িনাচের খেলা আরম্ভ হবার আগে হঠাৎ আসরের সামনে একটা গোলমাল শুনে ছুটে গেল উইলেম। দেখল মিগনন নামে সেই অদ্ভুতদর্শনা মেয়েটিকে দলের ম্যানেজার নির্মমভাবে মারছে। মিগনন নাকি ডিমের নাচ দেখাতে রাজি হয়নি।

মিগননের চিৎকারে লোক জড়ো হয়েছিল। তার প্রতি করুণাও অনেকের জেগেছিল। কিন্তু ম্যানেজারের শাসনের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়নি। উইলেম ছুটে গিয়ে ম্যানেজারের গলার জামার কলারটা চেপে ধরল। তার হাতের চাপে মিগননকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো ম্যানেজার। আর ছাড়া মেয়ে মিগনন তীরবেগে কোথায় ছুটে পালিয়ে গেল। লোকটা তখন আস্ফালন করতে বলতে লাগল, কোথায় পালাবি, আমি তোকে খুন করব। তুই ডিমের নাচ দেখাব বলে দর্শকদের দেখাসনি।

উইলেম বলল, তার আগে এই শহরের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে তোমাকে বলতে হবে ওকে কোথা থেকে তুমি চুরি করে এনেছ? আমি তোমাকে সহজে ছাড়ব না। এর জন্য যেখানে যেতে হয় যাব।

ম্যানেজার তখন বলল, আমি ওর পেছনে যা খরচ করেছি সেই খরচটা আমাকে দিয়ে দিন। তারপর ওকে নিয়ে যা খুশি করুন। আমাদের দেখার দরকার নেই।

উইলেম বলল, ঠিক আছে। খেলা ভেঙে যাক। আমি তোমার দাবি মিটিয়ে দেব।

অনুষ্ঠান শেষে হ্যাঁনেজারকে একশো ডুকেট দিয়ে মিগনানকে যুক্ত করল উইলেম। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। উইলেমের ভয় হতে লাগল ভয়ে ও মনের দুঃখে কোনও পুকুরে ঝাঁপ দেয়নি তো বেচারি।

পরের দিন সকালেই নাচের দল তাঁবু গুটিয়ে চলে গেল। আর তার কিছু পরেই কোথায় হতে মিগনন এসে হাজির হলো উইলেমের সামনে। উইলেম তখন বাইরের ঘরে লার্তেনের সঙ্গে বসেছিল। লার্তেস বলল, কোথায় ছিলি। এখন থেকে তুই মুক্ত। তোমাকে আমরা কিনে নিয়েছি লোকটার কাছ থেকে।

মিগনন খুশি হয়ে বলল, কত দাম দিতে হয়েছে?

লার্তেস বলল, একশো ডুকেট।

আর কোনও কথা না বলেই ওদের ঘর পরিষ্কারের কাজে লেগে গেল মিগনন।

হঠাৎ রাস্তায় গোলমাল শুনে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উইলেম দেখল, একটা চতুর্দোলায় নাসিস আর লান্দ্রিনেত্তাকে বসিয়ে বাহকরা শহর পরিক্রমা করছে। খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তার কথা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে তাই তাদের যাবার সময় তাদের একবার দেখার জন্য বিরাট ভিড় জমে যায় পথের দুধারে দুপাশের বাড়িগুলোর বারান্দা ও ছাদে। সমগ্র দল তাদের জন্য গর্বিত। তাই তাদের নিয়ে সারা শহর পরিক্রমার ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। নাসির্স ও লান্দ্রিনেত্তার খাতির ও জনপ্রিয়তা দেখে সমগ্রভাবে নাট্যশিল্প সম্বন্ধে শ্রদ্ধা জাগল উইলেমের মনে। লার্তেস ও ফিলিনাকে বলল উইলেম, জনগণের কাছ থেকে এই বিপুল শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভ করা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব? সত্যিকারের প্রভাবশালী অভিনেতার মর্যাদা দিতে মানুষ জানে।

উইলেমের কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারল না লার্তেস। লার্তেস ও ফিলিনা দুজনেই তাই চুপ করে রইল।

ফিলিনা আর মিগনন দুজনেই বেশ একটা গভীর ছাপ ফেলেছিল উইলেমের মনে। ওদের দুজনের কাউকে ছেড়ে যেতে মন সরছিল না তার। তাই যাই যাই বা উঠি উঠি করেও যেতে পারছিল না। তাই কাজের অজুহাত দেখিয়ে আরও কিছুদিন বয়ে গেল হোটেলটায়। লার্তেস ও ফিলিনার সাহচর্যে দিনগুলো তার কোনওমতে কেটে যাচ্ছিল।

এমন সময় হঠাৎ একদিন মেলিনা আর তার নবপরিণীতা স্ত্রী এসে হাজির হলো সেই হোটেলটায়। মেয়েটির বাবাকে বলে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা উইলেমই করে দেয়। বিয়ের পরে ওদের ঘরে জায়গা দিতে রাজি হয়নি মেয়ের বাপ। তাই তারা কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। মেলিনা ভালো অভিনতো বলে ভালো থিয়েটারের দলের সন্ধান করে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। কার কাছে এই ধরনের এক থিয়েটারের দলের সন্ধান পেয়েই এখানে এসে হাজির হয়েছে এরা।

উইলেম লার্তেস ও ফিলিনার সঙ্গে মেলিনাদের পরিচয় করিয়ে দিল। বলল, ওরা দুজনেই সুযোগ্য অভিনেতা। কিন্তু ওদের তেমন পছন্দ করল না লার্তেস ও ফিলিনা। বরং ওদের মনে হলো ওদের তিনজনের মিলিত সাহচর্যে কেমন সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। তার মাঝে কোথা হতে একটা বাধা এসে জুটল।

মেলিনা কিন্তু যে কাজের জন্য এখানে এসেছে তার কথা একবারও ভুলে যায়নি। সে শুনেছে এখানে একটা থিয়েটারের দল ছিল। সে দলের পোশাকগুলো এখনও আছে। শুধু কিছু টাকা হলেই একটা নূতন দল খোলা যায়।

একদিন উইলেমকে সঙ্গে করে পোশাকগুলো দেখতে গেল মেলিনা। একটা ভালো থিয়েটার দলে যা যা পোশাক দরকার তা সব আছে। পোশাকগুলো একটা ঘরের মধ্যে দেখে নূতন করে তার অবদমিত নাট্যপ্রীতি হঠাৎ জেগে উঠল উইলেমের মনে। মেলিনা বলল এই সব দামী পোশাক পাওয়া ভাগ্যের কথা। শুধু দুশো ক্রাউন হলেই দলটা চালু করা যায়। মেলিনা লার্তেস ও ফিলিনাকে দলে নিতে চাইল। তারপর উইলেমের কাছ থেকে টাকা চাইল। মেলিনা প্রস্তাব দিল উইলেম টাকাটা দিয়ে দলের মালিক হতে পারে। ওরা অভিনেতা হিসাবে তার অধীনেই কাজ করবে।

উইলেম বলল, সে বাড়ি ফিরে গিয়ে কথাটা ভেবে দেখবে। বাড়ি না গিয়ে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু মেলিনা বার বার টাকার জন্য চাপ দিতে থাকায় সে তার বন্ধু ওয়ার্নারকে সব কথা জানিয়ে একটা চিঠি দিল।

এদিকে মিগননের প্রতি দিনে দিনে মায়াটা বেড়ে যাচ্ছিল উইলেমের। মেয়েটা অদ্ভুত ছটফটে আর চঞ্চল। কিন্তু খুব ভোরে ওঠে। সব কাজ ঠিকমতো করে। রাত্রে একটা মেঝের উপর শোয়। কিন্তু কোনও বিছানা নেয় না। অনেক করে বলা সত্ত্বেও নেয় না।

সেদিন হোটেলের বসার ঘরে ওরা তিনজন বসেছিল এমন সময় একজন বৃদ্ধ দুটি তরুণীকে নিয়ে হোটেলে এসে উঠলেন। হোটেলে সে কখন নূতন লোক আসছে সেদিকে ফিলিনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল সব সময়। একটু সুযোগ পেলেই লোকেরা পিছনে লাগতে ছাড়ত না। আবার এক মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নিতেও পারত।

বুদ্ধ ভদ্রলোকের পোশাক-আশাকের মধ্যে কিছু দৈন্যের ছাপ ছিল। অথচ তাকে দেখে বেশ বিদগ্ধজন বলেও মনে হচ্ছিল। তাকে দেখে উইলেম কিন্তু এক নজরেই চিনে ফেলল। সে তাদের শহরে অতীতে অনেকবার মঞ্চে মেরিয়ানার সঙ্গে অভিনয় করতে দেখেছে ভদ্রলোককে। তিনি মেরিয়ানাকে অভিনয় করতেও শেখান। বহুদিন পর ভদ্রলোককে দেখে মেরিয়ানার ভুলে যাওয়া কথাগুলো আবার মনে পড়ল উইলেমের।

ফিলিনা তার বালক ভৃত্যকে ডেকে বলল, আমাদের খাবার টেবিল সাজাও, এঁদের নিয়ে আমরা একসঙ্গে খাব। কিন্তু ফ্রেডারিক রেগে গিয়ে বলল, আমি শুধু আপনার কাজ করার জন্যই নিযুক্ত। আর পাঁচজনের জন্য আমি খাটতে পারব না।

ফিলিনা তখন রেগে গিয়ে বলল, তাহলে তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। তুমি যেতে পার।

ফ্রেডারিক তৎক্ষণাৎ তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেল। উইলেম সঙ্গে সঙ্গে মিগননকে ডেকে বলল, এই ভদ্রমহিলা যা যা বলবেন সব শুনবে।

খাবার সময় উইলেম কিন্তু বেশি কথা বলল না। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পানে। সে শুধু ভাবছিল একটুখানি সুযোগের কথা। একটু সুযোগ। পেলেই বৃদ্ধকে কোথাও আড়ালে নির্জনে নিয়ে গিয়ে মেরিয়ানার কথা জিজ্ঞাসা করবে। মেরিয়ানা এখন কোথায় কি করছে তা জানতে ইচ্ছা করছে তার। এ ইচ্ছা ক্রমশ প্রবল আর অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে তার মনে।

খাওয়ার পর বৃদ্ধকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে বার হলো উইলেম। একথা-সেকথার পর মেরিয়ানার কথাটা তুলল সে। সে এখন কি করছে কোথায় আছে তার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানেন কি না এই সব প্রশ্ন একের পর এক তুলে ধরল সে বৃদ্ধের কাছে।

প্রশ্ন শুনে বিরক্তির সঙ্গে নাসিকা কুঞ্চিত করলেন বৃদ্ধ। বললেন, ঐ ঘৃণ্য মেয়েটার কথা আর তুলবেন না মশাই। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি আমি ওর কথা আর কখনও ভাবব না।

উইলেম একবার ভাবল সে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে দেবে। কিন্তু বৃদ্ধ অত সহজে থামবেন না। তার আগে উথলে উঠেছে অন্তরে। তিনি তার সব কথা বলবেন। তিনি বললেন, তার সঙ্গে একদিন আমার একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল এটা ভাবতেও এখন লজ্জাবোধ হয় আমার। আপনি যদি একে চেনেন তাহলে কেন একথা বলছি তার মানেটা বুঝতে পারবেন। প্রথমে তো মেয়েটাকে ভালোই লেগেছিল। দেখতে সুন্দরী, স্বভাবও নম্র বিনয়ী, তার আচরণও ভালো। কিন্তু ওসব উপরকার ব্যাপার। তখন বুঝতেই পারিনি মেয়েটা এতদূর অবিবেচক এবং অকৃতজ্ঞ হতে পারে।

হঠাৎ বৃদ্ধের চোখে জল এল। তা দেখে ব্যস্ত ও বিব্রত হয়ে পড়ল উইলেম। তবে কি কোনও খারাপ খবর আছে? খবর যাই হোক সব জানতে চায় উইলেম। সে জিজ্ঞাসা করল, কি হলো? আপনি সব কিছু বলে যান। আমি শুনতে চাই। কিছুই লুকোবেন না।

বৃদ্ধ বললেন, বলার আর কীই বা আছে। আমি তার জন্য যে মনোবেদনা লাভ করেছি তা ক্ষমার অতীত। অথচ একদিন মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করত। আমার কথা মান্য করে চলত। আমার স্ত্রী তখন বেঁচে ছিল। আমি তাকে আপন মেয়ের মতো স্নেহ করতাম। আমি তাকে আমার নিজের বাড়িতে নিজের মেয়ের মতো রাখার এক পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী হঠাৎ মারা যেতেই সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।

আজ হতে বছর তিনেক আগে যখন আমি আপনাদের শহর ছেড়ে চলে যাবার উদ্যোগ করি তখন এক বিষাদময় ভাবান্তর লক্ষ্য করি মেরিয়ানার মধ্যে। লক্ষ্য করি সে সন্তানসম্ভবা। সে নিজেও তা স্বীকার করে এবং সঙ্গে সঙ্গে থিয়েটারের ম্যানেজার তাকে অভিনয়ের কাজ থেকে বরখাস্ত করবে এই ভেবে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। পরে দেখা যায় ম্যানেজার কোনওভাবে কথাটা জানতে পেরে সত্যি সত্যিই তাকে বরখাস্ত করে। তারপর আমি শহর ছেড়ে চলে আসি।

বৃদ্ধের প্রতি মেরিয়ানা কি অন্যায় করেছে এবং তার প্রকৃত দোষ কোথায় বৃদ্ধ তা বললেন না। তাঁর বলা এত কথার মাঝে কোথাও তা পাওয়া গেল না। উল্টে তার কথার ফাঁকে শত দোষারোপ এবং কটুক্তি সত্ত্বেও মেরিয়ানার প্রতি তাঁর স্নেহশীল আসক্তি আর অনুকম্পার ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৃদ্ধের সব কথা শুনে মেরিয়ানার সঙ্গে তার প্রেম সম্পর্কের প্রসঙ্গটা আবার উঠে এল তার মনের উপর। বাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর নেবার এক অদম্য আগ্রহ জাগল সঙ্গে সঙ্গে। গভীর রাত্রিতে শোবার ঘরে ঢুকে উইলেম স্পষ্ট বুঝতে পারল আজ রাত্রে ঘুম আসবে না তার চোখে। এমন সময় হঠাৎ মিগনন এসে একটা প্রার্থনা জানাল তার কাছে। এখন মিগননই তার একমাত্র সান্ত্বনা। মিগননের আনুগত্য আর সরলতার তুলনা হয় না। মেয়েটাকে দারুণ ভালো লাগে তার। তার প্রতি অন্তহীন মমতা জাগে অন্তরে।

মিগনন বলল, আজ সে সেই ডিমের নাচ দেখাবে তাকে যে নাচ না দেখাবার জন্য ম্যানেজার তাকে একদিন নির্মমভাবে প্রহার করে এবং দল ছাড়তে হয় তাকে। তবে এ ঘরে আর কেউ থাকবে না।

খুশির সঙ্গে রাজি হলো উইলেম। একটানা ভাবনা-চিন্তা থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পাবে, পাবে এক মিষ্টি বৈচিত্র্যের আস্বাদ। প্রথমে বাইরে থেকে একটা কার্পেট বয়ে আনল মিগনন। তারপরে সেটা ঘরের মেঝের উপর পেতে দিল। তার চার কোণে চারটা বাতি জ্বেলে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর একজন বেহালাদারকে ডেকে এনে ঘরের এক কোণে বসিয়ে দিল। এরপর আনল এক ঝুড়ি ডিম। ডিমগুলো বার করে সারা কার্পেটের সর্বত্র এমনভাবে ছড়িয়ে রাখল যাতে একটি ডিম থেকে আর একটি ডিমের মাঝে ফাঁক থাকে এবং একটি পা রাখার মতো জায়গা রেখে ডিম সাজিয়ে রাখার পর কাপড় দিয়ে চোখ দুটো বেঁধে দিল মিগনন।

সব প্রস্তুতি শেষে নাচ শুরু করল মিগনন। সে এক আশ্চর্য নাচ। বেহালার ঝঙ্কারের তালে তালে মিগনন যখন পা ফেলে ফেলে নেচে চলছিল তখন প্রতি মুহূর্তে উইলেমের মনে হচ্ছিল এই বুঝিবা ডিমের গায়ে তার পা লেগে যাবে অথবা একটা ডিমের সঙ্গে অন্য ডিমের ঠোকাঠুকি হবে। কিন্তু একটি ডিমের গায়ে একটিবারের জন্য তার পা লাগল না। চোখ বাঁধা থাকলেও এমনভাবে পা ফেলছিল মিগনন আর সেই সতর্কিত প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে ভয়ঙ্কর অথচ মধুর একটা ছন্দ ছিল যা না দেখলে বা না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না। বেহালার সুরঝঙ্কার মিগননের পায়ের সেই অবিশ্বাস্য ও একাধারে ভীষণ সুন্দর ছন্দটাকে মূর্ত করে তুলছিল।

নাচের শেষের দিকে পায়ে করে একে একে সব ডিমগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে রাখল মিগনন অভ্রান্তভাবে। তারপর নিজের হাতে চোখের বাঁধনটা খুলে দিয়ে প্রথাগত ভঙ্গিতে মাথাটা নত করে উইলেমের সামনে। অবশেষে আবার ডিমের ঝুড়ি আর কার্পেটটা গুটিয়ে ঘর থেকে চলে যাবার জন্য তৈরি হলো। উইলেম খুশি হয়ে বলল, আমি তোমার নাচ দেখে সন্তুষ্ট হয়েছি মিগনন। আমি তোমাকে একটা পোশাক করিয়ে দেব।

মিগনন তখন বলল, পোশাকটা যেন আমার স্যুটের রঙের মতো হয়। এখন আপনার কিছু দরকার আছে?

উইলেম বলল, না, তুমি শোওগে।

বেহালাবাদক উইলেমের কাছে এসে বলল, ও অনেকদিন ধরে আমাকে এই বাজনার কথা বলছে। আমার পারিশ্রমিকও দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি নিইনি। আমি প্রথমে এ নাচের বাজনা জানতাম না। ওই আমাকে এর সুর শিখিয়ে তৈরি করে নিয়েছে।

উইলেম বলল, এ নাচের কথা সেদিন প্রথমে শোনার পর থেকে দেখার ইচ্ছা। হচ্ছিল। আজ তা দেখে প্রচুর আনন্দ পেলাম।

যাই হোক, রাতটা কেটে গেল উইলেমের। দু-একবার মেরিয়ানার কথাটা মনে এলেও মোটের উপর ঘুম হয়েছিল। সকাল হতেই মিগননের ডাকে ঘুম ভাঙল। দর্জিকে সঙ্গে করে ডেকে এনেছে মিগনন। আর পোশাকের কাপড়ও পছন্দ করে এনেছে দর্জির মারফৎ। আকাশী-নীল রংটা খুব পছন্দ মিগননের। অথচ প্রেমের ব্যাপারে ঘা খাবার পর থেকে একমাত্র ধূসর রং ছাড়া আর কোনও রং পছন্দ হয় না উইলেমের।

কিছুটা বেলা হবার সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনা ও লার্তেস দুজনে আবার এক নূতন জায়গায় বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করল। এবার ওরা নৌকোয় করে যাবে। এক একদিন এক-এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে সেখানে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে সত্যিই এক আনন্দ আছে যা ঘরের মধ্যে পাওয়া যায় না।

সানন্দে রাজি হয়ে গেল উইলেমস। ওদের সঙ্গে সেই বৃন্ধ আর মেলিনা-দম্পতিও। আছে। আজ ওরা নদীপথে নৌকোয় করে বেশ কিছুটা যাবার পর নদীর ধারে কোনও এক মনোমতো জায়গায় নেমে বসবে ও খাবে।

মোটামুটি ওরা সবাই অভিনেতা। লার্তেস ও ফিলিনা, মেলিনা, বৃদ্ধ-এরা সবাই। পেশাদার অভিনেতা। উইলেম পেশাদার অভিনেতা না হলেও নাট্যকার এবং অভিনয় বোঝে। ফিলিনা নৌকোতে উঠে একটা প্রস্তাব করল, ওরা মুখে মুখে এই নৌকোয় একটা নাটকের অভিনয় করবে। এমন সময় নদীর এক ঘাট থেকে এক যাজক এসে। ওদের নৌকোয় উঠল। তাকেও ওরা দলে টেনে নিল। সব মিলিয়ে দৈনন্দিন কতকগুলো বাস্তব ঘটনা নিয়ে নাটক বেশই জমে উঠল। কারণ ওরা প্রত্যেকেই অভিনেতা। ওদের সহজাত অভিনয় প্রতিভার জোরে একজনের সংলাশ শেষ না হতে হতে আপনা থেকে সংলাপের কথা এসে যাচ্ছিল ওদের মুখে।

অভিনয় শেষ হয়ে গেলে মাঝি নদীর কূলে এক জায়গায় নৌকো ভেড়াল। ওরা নেমে খাওয়া সেরে নিল। তারপর কিছুক্ষণ এখানে-সেখানে বেড়াল। উইলেম সেই যাজকের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

কিন্তু ফিরে যাবার জন্য রওনা হবার সময় সেই যাজককে আর কোথাও পাওয়া গেল না। মেলিনার স্ত্রী বলল, এটা অভদ্রতা। যাবার সময় আমাদের কাছ থেকে ভদ্রভাবে বিদায় নিতে পারত।

দুটো ঘোড়ার গাড়িতে করে ওরা রওনা হলো। ফেরার পথে আর নৌকায় করে গেল না। ফিলিনা ও মেলিনার স্ত্রী উইলেমের উল্টো দিকে বসল। গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে গান ধরল ফিলিনা। গান গেয়ে সারা পথটা কাটাল সে।

মেরিয়ানার সঙ্গে তার প্রেমসম্পর্কটা ছিন্ন হওয়ার পর উইলেম নারীদের প্রতি খুব সতর্ক হয়ে উঠেছিল মনে মনে। প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কোনও নারীর বাহুবন্ধনে ধরা। দেবে না। তার মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিল যে নারীমাত্র চটুল প্রেমাভিনয়ে সিদ্ধ এক-একটি ছলনাময়ী। তাই যাতে কোনও ছলনাময়ীর বিলাসকলার কবলে না। পড়ে তার জন্য সদাজাগ্রত থাকত সব সময়। কোনও নারীর প্রতি কখনও কোনো কামনা জাগলেও সে কামনাকে ব্যক্ত করত না কখনও বাইরে। বুকে চাবি দিয়ে ভরে রাখত সেই অব্যক্ত কামনাকে।

এমন সময় ফিলিনা এল তার জীবনে। গানে-গল্পে, অভিনয়ে-হাসিতে, হুল্লোড়ে সব সময় ভরে দিতে লাগল তার মনটাকে। পান্থশালার এক অচেনা মেয়ে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে তার মনটাকে একথা কখনও ভাবতে পারেনি উইলেম। মেরিয়ানার আঘাত, তার অভাব ও বিচ্ছেদ যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল তার মনে সে শূন্যতার অনেকখানি আপনা থেকে পূরণ করে দিল ফিলিনা। অথচ প্রতিদানে কিছুই চাইল না তার কাছ থেকে। এখানে আসার প্রথম দিনে ফিলিনা তার ঘরে তাকে যে সব প্রসাধন্দ্ৰব্য দিয়েছিল ভদ্রতা ও সৌজন্যের খাতিরে তার জন্য তাকে একটা উপহার। দেবে বলেছিল উইলেম। কিন্তু সে উপহার আরও দেওয়া হয়নি।

হোটেলে ফিরে এসে সবাই উঠল উইলেমের ঘরে। কারণ তার ঘরটাই বেশ গোছাল অবস্থায় ছিল। বৃদ্ধের কাছে একটা নাটকের বই ছিল। ওরা এসেই সেই নাটক থেকে অভিনয় করতে লাগল।

পরদিন সকালে উঠেই উইলেম শুনল গতকাল লার্তেস তার যে ধার করা ঘোড়াটা করে বেড়ানোর জায়গা থেকে আসছিল সেটা পথে পড়ে যায়। লার্তেস ঘোড়ায় চড়তে বা চালাতে ভালো জানে না। ফলে পড়ে গিয়ে ঘোড়টা এমন আঘাত পায় যে তার সেরে উঠতে অনেক সময় লাগবে। ঘোড়া হোটেলের মালিকের কাছ থেকে ধার করা। উইলেম ঘোড়ার মালিককে জানিয়ে দিল তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সে দেবে।

হোটেলের মালিক তার ঘর থেকে চলে যেতেই ফিলিনার ঘরের দিকে তার চোখ পড়ল। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফিলিনা তাকে নমস্কার করছে। সঙ্গে সঙ্গে তার সেই প্রতিশ্রুত উপহারের কথাটা মনে পড়ে গেল।

একটু পরে দোকানে গিয়ে উপহার কিনে আনে উইলেম। আনে দুটো কানের দুল, একটা টুপি, একটা নেকটাই আর কিছু প্রসাধদ্রব্য। এই উপহারগুলো যখন ফিলিনার হাতে তুলে দেয় উইলেম তখন তা মাদাম মেলিনা দেখে। দেখে ঈর্ষাবোধ করে। ভাবে ফিলিনার প্রতি দুর্বলতা আছে উইলেমের। সে কথা মাদাম মেলিনা ঠাট্টার ছলে প্রকাশ করলে উইলেম বলল, যে মেয়ের সব কিছু আমি জানি, যার জীবনযাত্রার প্রতিটি খুঁটিনাটি আমার সব জানা তার প্রতি কোনও ভালোবাসাই অনুভব করি না। আসলে ফিলিনাকে দেওয়া আমার এই উপহার বন্ধুত্ব আর সৌজন্যের পরিচায়ক। তবু কিন্তু এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট হলো না মাদাম মেলিনা।

হোটেলের মালিক একজন অচেনা বৃদ্ধ গায়ককে নিয়ে এল। সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ইনি একজন ভালো গায়ক। আপনাদের কাজে লাগবে। এর গান শুনে দেখতে পারেন।

মেলিনা বলল, উনি যেতে পারেন। আমাদের এত সময় নেই।

কিন্তু ফিলিনা জেদ ধরল, ওরা গান শুনবেই।

প্রথমে বীণা বাজাতে শুরু করল বৃদ্ধ। অপূর্ব তার সুরঝঙ্কার। মুগ্ধ হয়ে গেল উপস্থিত সকলে। বৃদ্ধকে উইলেম অনুরোধ করল, আপনি একটা বাজনার সঙ্গে একটা গান করুন। বাণীহীন সুর আকাশপথে উড্ডীয়মান অধরা পাখির মতো। কিন্তু বাণীময় সঙ্গীতের সুর শুনে মনে হয় আকাশগামী অধরা পাখিটা হাতে এসে ধরা দিয়েছে। শধু তাই নয়, আমাদের মধ্যেও আকাশপিপাসা জাগিয়ে আমাকেও কোথায় যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সকলের সনির্বন্ধ অনুরোধে একটি বড় গান গাইল বৃদ্ধ! বেশ ভরাট মিষ্টি গলা। সে গানের বিষয়বস্তু ছিল মানবতা, ভালোবাসা, দেশপ্রেম প্রভৃতি কতকগুলো গুণের জয়গান। তার গলাটা এমনি মিষ্টি ও ভরাটি যে সে গাইছিল আর সকলের শুনতে ভালো লাগছিল। তার গান থামলে ফিলিনা বলল, আপনি সেই রাখাল তাকে সাজাও, এই গানের সুরটা বাজাতে পারবেন? তাহলে আমি গানটা গাইব।

বৃদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে বীণাটা তুলে বাজাতে লাগল। তার তালে তালে গান গাইতে লাগল ফিলিনা। ফিলিনা ভালোই গাইল। তার গান শেষ হলে বৃদ্ধকে মন দিয়ে। আপ্যায়িত করা হলো। উইলেম উঠে গিয়ে বৃদ্ধের হাতে একটা মুদ্রা দিল তার পারিশ্রমিক হিসাবে। বলল, আবার আপনার গান শোনা যাবে। তার দেখাদেখি অন্যান্য সকলেও কিছু কিছু দিল। তবে উইলেমই দিল সবচেয়ে বেশি।

উইলেম যাবার আগে ফিলিনাকে বলল, তোমার গানটা কাব্যিক বা নীতিবাগীশ না হলেও মঞ্চে এইভাবে গাইলে প্রচুর প্রশংসা পাবে দর্শকদের কাছ থেকে। এই বৃদ্ধ

দ্রলোকের বাজনার হাত ও গানের গলা অনেক শিল্পীকেই হার মানিয়ে দেবে। হয়ত লক্ষ্য করে থাকবে ওর গানের মধ্যে অনেক নাট্য উপাদান আছে। যেগুলো গীতিনাট্যে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

মেলিনা বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলল, আমাদের মতো শিল্পীকে উনি লজ্জা দিতে পারবেন কি না জানি না। তবে একটা বিষয়ে সত্যিই উনি আমাদের হারিয়ে দেবেন। সেটা হচ্ছে নিজের কাজ গুছিয়ে নেবার বা স্বার্থপূরণের কৌশল। দুদিন পরে কি করে আমাদের খাবার জুটবে বলে আমরা যখন ভাবছি তখন উনি আমাদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছেন। যে পয়সা দিয়ে আমরা চাকরির খোঁজ করে বেড়াবো, উনি কৌশলে তাতেও তার ভাগ নিচ্ছেন।

কথাটা শুনে খুবই দুঃখিত হলো উইলেম। মনে হলো এটা যেন তাকেই লক্ষ করে বলা। কারণ সে আর ফিলিনাই বৃদ্ধের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল। এরপর উইলেমকে সরাসরি আক্রমণ করল মেলিনা। আজ একপক্ষকাল হয়ে গেল। থিয়েটারের পোশাক বাছাই করে বন্ধক দেওয়া আছে, আমরা আশা করে বসে আছি অথচ আপনি টাকা দিলেন না। অথচ টাকার জন্য বাড়িও যাই যাই করে গেলেন না। আপনি টাকা দিলে এতদিন আমরা কাজ শুরু করে দিতাম। অথচ আপনি বাজে খরচ ঠিকই করে যাচ্ছেন।

এবার রেগে গেল উইলেম। বলল, সেই এই ধরনের অকৃতজ্ঞ এবং হৃদয়হীন লোকদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চায় না।

হোটেলের বাইরে ঘরে একা বসেছিল উইলেম। এমন সময় ফিলিনা গান করতে করতে এসে তার ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে আবদারের ভঙ্গিতে বলল, মেলিনার জন্য আমরা এ হোটেলে আর থাকব না। কাছাকাছি অন্য এক হোটেলে উঠে যাব। তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। তাছাড়া তোমার এখন বাড়ি যাওয়া হবে না।

উইলেম বলল, তুমি কি পাগল হয়েছ ফিলিনা? আমার এখানে থাকা চলবে না। আমাকে এবার বাড়ি যেতেই হবে। আমাকে ছেড়ে দাও।

ফিলিনা তাকে আরও জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে করতে বলল, তাহলে তো কিছুতেই ছাড়ব না।

উইলেম বলল, কি করছ? লোক রয়েছে যে।

সত্যিই তাদের কাণ্ড দেখে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দু-চারজন লোক জড়ো হয়ে দেখছিল। ফিলিনা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বকে উঠতেই তারা চলে গেল। লজ্জার ভয়ে আর জোর করার চেষ্টা না করে নীরবে শান্তশিষ্ট স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করে যেতে লাগল উইলেম। ফিলিনা বলল, আগে কথা দাও, এখন চলে যাবে না, তবে ছাড়ব।

অবশেষে প্রতিশ্রুতি দিল উইলেম। সে আগামী বা পরের দিন বা তারপরের দিনও বাড়ি যাবে না।

কথা পেয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল ফিলিনা। দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল, আমি একবার আমার ঘরে যাচ্ছি, আমার দরকার। ফিরে এসে যেন আমি তোমাকে এখানেই দেখি।

ফিলিনা চলে গেল। উইলেম কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়ল। কোনও প্রয়োজন ছিল না, তবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যেতে লাগল মেলিনার ঘরের দিকে। এক রহস্যময় দুর্বোধ্য প্রবৃত্তির তাড়নায় সে যেন না গিয়ে পারল না। কিন্তু মেলিনার ঘরে কাছে যেতেই সে এসে ক্ষমা চাইল তার কাছে। বলল, রাগের মাথায় যা তা বলে ফেলেছি, কিছু মনে করবেন না। আমার হাতের টাকা ফুরিয়ে আসছে, নিজের স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ক্ষমতা নেই। তার উপর সন্তান আসছে। তাই কোনো আনন্দের আসর বা উৎসব আমার ভালো লাগে না, সব সময় চাকরি বা কাজ-কারবারের কথা ভাবি। প্রাণ খুলে হাসতে বা আনন্দ উপভোগ করতে পারি না আপনাদের মতো। আমাকে ক্ষমা করবেন।

মেলিনার কথা শুনে শান্ত হলো উইলেম। বলল, ঠিক আছে, আজই রাতে না হয় সকালে তোমাকে টাকা দেব আমি।

হঠাৎ ফিলিনার সেই বালকভৃত্য ফ্রেডারিককে ফিরে আসতে দেখে বিরক্ত হয়ে নিজের ঘরে চলে এলে উইলেম। এসে দেখল মিগনন কি লিখছে। মন ভালো থাকলে তার লেখাটা নিয়ে দেখত, তার বিচার করত। কিন্তু আজ কিছু না বলে বিশ্রামের জন্য পোশাকটা খুলতে লাগল। এমন সময় হোটেলের সদর দরজার কাছে চোখ পড়তেই দেখল ঘোড়ায় চেপে কে একজন গণ্যমান্য আগন্তুক এসে হাজির হলো। আর হোটেলের মালিক ব্যস্তভাবে তার দিকে ছুটে গেল।

কৌতূহলের বশে উইলেম তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হোটেল মালিক বলল, হের স্টলমেস্তার, অবশেষে আমাদের মনে পড়ল?

আগন্তুক ঘোড়া থেকে না নেমেই বলল, কাউন্ট তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসছেন। প্রিন্স ডনের সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে দিনকতক থাকবেন তারা।

হোটেল মালিক বলল, আপনিও থাকলে ভালো হতো। ঘর আছে, কোনও অসুবিধা হবে না।

হঠাৎ মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয় উঠল উইলেমের। সে সেখানে আর না দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ বীণাবাদক ও গায়কের সন্ধানে চলে গেল। শুনল সে নাকি একটা অখ্যাত পল্লীতে চলে গেছে। খুঁজে খুঁজে একটা বাড়িতে তার বাজনা শুনতে পেল উইলেম। উইলেমকে দেখে খুশি হয়ে একটি গান স্পষ্ট ভাষায় গাইতে লাগল বৃদ্ধ। গানটার মানে হলো এই যে, যে কোনওদিন দুঃখ ভোগ করেনি, যে কোনওদিন চোখের জল ফেলেনি সে ঈশ্বরকে জানতে পারেনি, পারবেও না কোনওদিন।

ঈশ্বরই আমাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসেন, আমাদের পাপের পথে নিয়ে যান আবার তিনিই অনুতাপের মোচড় দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেন আমাদের অন্তরকে।

প্রথমে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর বৃদ্ধের কাছে সরে গেল উইলেম। গান শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। চোখে জল আসছিল। রোধ করতে পারছিল না। যে বেদনা হিম হয়ে জমে ছিল এতদিন অন্তরে, এই সকরুণ সুরের আঘাতে উত্তাপে তা গলে জল হয়ে বেরিয়ে এল চোখ থেকে।

গান থামলে উইলেমকে বৃদ্ধ বলল, আমি আজ সন্ধ্যায় আপনার জন্য ওখানে অপেক্ষা করেছিলাম। আপনাকে গান শোনাতে চেয়েছিলাম কিন্তু দেখতে না পেয়ে এখানে চলে আসি।

উইলেম দেখল মেঝের উপর ছোট একটি বিছানায় বসে আছে বৃদ্ধ। এছাড়া আর কোনও আসবাব নেই। উইলেমও সেখানে বসে বলল, গান শোনাবার এটাই হলো উপযুক্ত জায়গা। যেখানে অন্য কোনও মানুষ নেই সেখানেই আপনার আত্মা ধরা দেবে আপনার কাছে। যে গান আমাকে শোনাতে চেয়েছিলে সেই গান আমাকে শোনাও বন্ধু।

গান শুনে হোটেলে ফিরে এসে উইলেম দেখল মেলিনা একজন উকিল সঙ্গে করে টাকা ধার করতে এসেছে তার কাছে। উইলেম তাকে তিনশো ক্রাউন দিল। মেলিনা তার বিনিময়ে থিয়েটারের মালপত্র সব বন্ধক রাখল তার কাছে। বলল, কাল সকালে সেগুলো তার কাছে নিয়ে আসবে। মেলিনা চলে গেলে হঠাৎ ফ্রেডারিকের চিৎকার শুনে বাইরে গিয়ে দেখল তার সামনে মিগনন অবাক হয়ে দেখছে ফ্রেডারিককে। ফ্রেডারিক পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে। আসল ঘটনাটা জানতে পারল হোটেলের মালিকের কাছ থেকে। আসল কথা হলো স্টলমেস্তার প্রথম দেখার সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনার প্রেমে পড়ে গেছে। ফিলিনার কাছে একসঙ্গে খেতে চায়। ফিলিনা ফ্রেডারিককে খাবার টেবিল সাজাতে বলে। ফ্রেডারিক স্টলমেস্তারকে দেখেই রেগে যায়। তার উপর খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে যখন দেখে স্টলমেস্তার ফিলিনার পা ঘেঁসে বসে রয়েছে তখন সে খাবার সমেত একটা প্লেট স্টলমেস্তারের গায়ে ফেলে দেয় আর অসতর্কতার ভান করে। তাতে সে প্রতিশোধের আনন্দে নিজেই হেসে ওঠে আর স্টলমেস্তার তাকে একটা লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়। তাই বাইরে এসে ফ্রেডারিক পাগলের মতো শাসাচ্ছে। সে দেখে নেবে স্টলমেস্তারকে।

কথাটা শুনে উইলেমের মনেও ঈর্ষা জাগল। জাগল লার্তেসের মনেও। তারা ভাবতেই পারেনি এত সহজে একজন বয়োপ্রবীণ আগন্তুকের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেবে ফিলিনা।

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলল উইলেম। সে কালই বাড়ি চলে যাবে। আর এখানে একদিনও থাকবে না। নিজের ঘরে বসে বিছানায় শুয়ে আপন মনে বলে উঠল, আমি চলে যাব। তার বিষাদ দেথে মিগনন কাছে এসে বলল, কি হয়েছে মালিক।

উইলেম বলল, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি রে।

মিগননের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কাঁদ-কাদ গলায় বলল, আমি তাহলে কোথায় যাব মালিক? আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যাবে?

হঠাৎ উইলেমের মনে হলো মিগনন হয়ত পড়ে যাবে। মূৰ্ছিত হয়ে পড়বে। সে তাকে ধরে নিল। জড়িয়ে ধরল। বারবার বলতে লাগল, আমি তোকে ছাড়ব না। চিরদিন আমার কাছেই রেখে দেব বাছা। আমার মেয়ের মতো থাকবি। হঠাৎ চোখ মেলে মিগনন বলল, তুমি আমার বাবা। আমি তোমার সন্তান।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

পরদিন সকালে উঠে মিগননকে প্রথমে দেখতে পেল না উইলেম। কিছুক্ষণ পরেই একটা যন্ত্র হাতে গান গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকল মিগনন। সে গানের বাণী বড় চমৎকার! যেখানে আছে থোকা থোকা ফোঁটা ফুলে ভর্তি লেমন গাছ, আছে লম্বা লরেল আর ঘনসন্নিবিশস্ট মার্বেল, যেখানে ঘনকৃষ্ণ পাতার ফাঁকে ফাঁকে সোনার বরণ কমলালেবু দোল খায় আর অদূরের নীল সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাকে দুরন্ত বাতাস এসে খেলা করে এই সব গাছদের সবুজ সংসারে, জান কি সে জায়গা কোথায়? জান কি সে দেশে কোন দিকে? হে পিতা, হে আমার পিতা, আমি তোমাকে নিয়ে যাব সেই দেশে।

গাণের বাণীটা ভালো লাগায় কাগজে টুকে নিল উইলেম।

এদিকে গান শেষ হতেই মেলিনা ডাক দিল দরজার বাইরে। একটু আগে সে টাকা মিটিয়ে দিয়ে থিয়েটারের পোশাকগুলো নিয়ে এসেছে। এবার সে হাতের কাছে যে সব অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছে তাদের নিয়ে চমৎকার একটা দল গড়তে পারে। উইলেমকে জানাবার মতো কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না মেলিনা। সে বলল, আপনি আমাকে এই বিপদে সাহায্য করে যে মমতাপূর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না আমি। আমি এবার এখানে আমার যে সব বেকার অভিনেতা বন্ধুরা রয়েছেন তাদের কাজ দিতে পারব। আপনার সঙ্গে আমার যখন প্রথম দেখা হয় তখন থিয়েটার ও অভিনয়ের প্রতি আমার গভীর বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর এ ধারণা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছি আমি। আমার স্ত্রী আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেও অভিনয় করবে এবং এর দ্বারা জীবনের চরম আনন্দ আর জনগণের প্রশংসা দুটোই অর্জন করবে। আমিও এখনও এটাকে পেশা হিসাবেই নিতে চাই।

মেলিনার কথাগুলো শুনে খুশি হলো উইলেম। দেখল মেলিনার স্বভাবটা বদলে গেছে একেবারে। এখন সে সকলের প্রতি প্রতিটি আচরণে ভদ্র ও সৌজন্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উইলেমের কাছ থেকে বেরিয়ে মেলিনা প্রতিটি অভিনেতার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করতে লাগল। তার দলের যারা আসলে অভিনয় করবে তার শর্তাবলি সব জানিয়ে দিল তাদের। আপাতত অবশ্য তাদের বেশি বেতন দিতে পারবে না। কিন্তু দল একবার দাঁড়িয়ে গেলে তারা লাভবান হবে সকলে।

এই সব কথাবার্তা চলতে থাকাকালেই কাউন্ট এসে হাজির। আগের দিন স্টলমেস্তার যে কাউন্টের আগমন ঘোষণা করেছিল সেই কাউন্ট এক গাড়ি মাল আর তার পত্নীকে সঙ্গে করে হোটেলে এসে উঠলেন। হোটেল নূতন যারা আসে তাদের। যেচে আলাপ করে ফিলিনা। স্বভাবটাই এইরকম। সব সময় হাসিখুশিতে ভরা থাকে যেমন তার মুখটা তেমনি মনেও কোনও মান-অপমান বোধ নেই। ফিলিনা সোজা। কাউন্টপত্নীর কাছে চলে গেল।

কাউন্টপত্নী জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি?

কাউন্টপত্নীর গাউনের আঁচলটাকে চুম্বন করে ফিলিনা। সরলভাবে হাসিমুখে বলল, সামান্য এক অভিনেত্রী, আপনার সেবায় সতত প্রস্তুত।

এদিকে কাউন্টের চারদিকেও অন্যান্য অভিনেতারা ভিড় করেছে। এতগুলো অভিনেতাকে একটি হোটেলের মধ্যে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন কাউন্ট। স্ত্রীকে বললেন, এরা যদি ফরাসি হতো তাহলে এদের দিয়ে রাজপ্রসাদে একটা নাটক করিয়ে রাজাকে প্রীত করতাম।

কাউন্টপত্নী বললেন, হলেই বা এরা জার্মান। এদের দিয়েও করানো যেতে পারে। এদের দলে যখন এতে লোক রয়েছে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া ব্যারন ওদের সাহায্য করতে পারেন।

এরপর কাউন্ট একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন এই দলের ম্যানেজার কে, কত জন অভিনেতা আছে। মেলিনা এগিয়ে এসে ম্যানেজার হিসাবে পরিচয় দিল। কাউন্ট তখন সব অভিনেতাদের জড়ো করে বললেন এক জায়গায়। তিনি একজন নাট্যসমালোকও বটেন। তিনি নিজে সবাইকে দেখে অভিনেতাদের যোগ্যতা সম্বন্ধে একটা আঁচ করে নেবেন। সবশেষে বললেন, তোমার কোন নাটকটা মঞ্চস্থ করতে চাও তা জানাবে।

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সকলকে দেখার পর কাউন্ট সবচেয়ে খুশি হলেন সেই বৃদ্ধ অভিনেতাকে দেখে যে দুটি মেয়ে নিয়ে একদিন এসে ওঠে এই হোটেলে এবং যে একদিন মেরিয়ানার সঙ্গে উইলেমদের শহরে এক মঞ্চে অভিনয় করত। অথচ মেলিনা তাকে কাউন্টের সামনে হাজির করেনি। সে ঘরের এক কোণে বসেছিল। কাউন্ট বললেন, এ যে কোনও অভিনয় করতে পারবে।

বৃদ্ধ আধ-ময়লা আধ-ছোঁড়া পোশাক পরে মাথা নত করে কাউন্টের সামনে এসে দাঁড়াল। কাউন্ট বললেন, হাস্যরসের ভূমিকা তো বটেই তাছাড়া যে কোনও ভুমিকায়

অভিনয় কররার যোগ্যতা এর আছে। আমরা চোখ-মুখ দেখলেই বুঝতে পারি।

ফিলিনা এদিকে উইলেমকে তার উপরকার ঘর থেকে জোর করে নিয়ে এল কাউন্টপত্নীর কাছে। তার কথা কাউন্টপত্নীর কাছে আগেই বলেছিল ফিলিনা। বলেছিল, আর একজন শিক্ষক ও সুন্দর যুবক আছে আমাদের দলে। সে নাটক ও কবিতা লিখতে পারে।

কাউন্টপত্নীকে নমস্কার করে দাঁড়াল উইলেম। তার পানে গভীর আগ্রহভরে তাকিয়ে লজ্জায় মাথাটা নত করলেন কাউন্টপত্নী। কাউন্টপত্নীকে দেখে ভালো লাগল উইলেমের। কাউন্টপত্নী বয়সে যুবতী এবং সুন্দরী। তাঁর চোখ-মুখে চমৎকার একটা মার্জিত ভাব।

এমন সময় কাউন্ট ফিরে এলে উইলেমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কাউন্ট তার প্রতি কোনও বিশেষ মনোযোগ দিলেন না। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। কাউন্টপত্নী উইলেমের পানে তাকিয়ে বললেন, আবার আমাদের দেখা হবে। এখন চলি।

তারপর ফিলিনাকে কাউন্টপত্নী বললেন, তুমি কিন্তু আবার আমার কাছে আসবে মেয়ে। তবে পোশাকটা একটু ভালো পরবে।

ফিলিনা বলল, আমার এর থেকে ভালো পোশাক নেই।

কাউন্টপত্নী তখন সঙ্গে তার প্রতীক্ষমানা এক সহচরীকে একটা সিল্কের গলবন্ধনী আর একটা টুপি আনতে বললেন। তার নিজের হাতে তা ফিলিনাকে পরিয়ে দিলেন।

কাউন্টের কথায় রাজপ্রাসাদে একখানা নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যাপারে যাবতীয় ব্যবস্থাদি করার জন্য এক ব্যারনও সামন্ত এসে কথা বলতে লাগল মেলিনার সঙ্গে। মেলিনা এটার প্রতীক্ষা করছিল। তার প্রত্যাশা অনেক এ বিষয়ে। রাজপ্রাসাদে অনুষ্ঠান করার জন্য বায়না হলেই তার দল জাতে উঠে যাবে। প্রথম কথা ওই অনুষ্ঠানের জন্য যে টাকা সে পাবে তাতে উইলেমের ঋণ অর্ধেক শোধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় কথা হলো এই যে, শহরে তাদের দলের নামটা ছড়িয়ে যাবে এর ফলে।

যাই হোক, প্রথম কথা হলো নাটক বাছাই। তারপর অভিনেতাদের মধ্যে অভিনয়ের ভূমিকা বিতরণ। ব্যারণ আসার সঙ্গে সঙ্গে মেলিনা বলল, আমাদের দলের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী উইলেম খুব ভালো কাব্যনাটক লিখতে পারেন। ব্যারণ তা দেখতে চাইলেন। উইলেমের লেখা মোটামুটি পছন্দ হলো ব্যারনের। ব্যারণ উইলেমকে প্রাসাদে যাবার জন্য নিয়ন্ত্রণ করলেন। সেখানে গেলে কাউন্টপত্নীর সঙ্গে দেখা হবে ভেবে মনে মনে উল্লসিত হলো উইলেম। মেলিনারও গর্বে ভরে গেল বুকটা।

লার্তেসকে দেওয়া হলো প্রেমিকের ভূমিকা। ফিলিনাকে দেওয়া হলো প্রেমিকার দাসীর ভূমিকা। বৃদ্ধকে দেওয়া হলো হাস্যরসের এক ভূমিকা, তাঁর মেয়েদের দেওয়া হলো প্রেমিকার ভূমিকা। মেলিনা নিজে নিল বীরত্বব্যঞ্জক এক ভূমিকা। উইলেম কিছুই নিল না। মেলিনা বারবার তাকে কোনও না কোনও ভূমিকা গ্রহণের জন্য জ্বালাতন করতে লাগল। উইলেম কোনও ভূমিকা নিল না। তা না নিয়ে সে নাটকের দিকে মন দিল। এরপর প্রস্তুতির পালা। রীতিমতোভাবে রিহার্সাল দিতে হবে। দিনের পর দিন চলতে লাগল রিহার্সাল।

অবশেষে একদিন প্রাসাদে যাবার খবর এল। গোটা দলটাকে রাজপ্রসাদে গিয়ে দিনকতক থাকতে হবে। ওরা সেখানে গেলে প্রাসাদের সীমানার ভেতরেই কোনও এক সুবিধাজনক জায়গা বেছে নিয়ে মঞ্চ তৈরি কর হবে। ব্যারন কথা দিলেন সেখানে কাউন্ট ও কাউন্টপত্নী আছে। ওরা গেলে থাকা-খাওয়ার কোনও অসুবিধা হবে না।

কিন্তু যাবার দিন সকাল থেকে বৃষ্টি নামল। তবু দলের সবাই যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। দু-তিনটে ঘোড়ার গাড়িতে সব মালপত্র তুলে দেওয়া হলে ওরা সবাই চেপে বসল। হোটেলের মালিকও গেল ওদের সঙ্গে। বিকালের দিকে গাড়ি ছাড়ল। বন, উপত্যকা ও গ্রাম ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল গাড়িগুলো বৃষ্টির জল আর কনকনে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে। সন্ধ্যা হতেই একটা পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে যেতে প্রাসাদের আলো দেখা গেল দূর থেকে। যাত্রীরা আশ্বস্ত হলো। সকলেই ভাবতে লাগল ঐ প্রাসাদের আলোকোজ্জ্বল এক-একটি প্রশস্ত কক্ষে তারা পাবে আরামঘন আশ্রয়।

কিন্তু প্রাসাদের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াতেই কেউ কোনো খোঁজখবর নিতে এল না। ওরা গাড়ি থেকে নেমে মালপত্র নামিয়ে বৃষ্টিতে একরকম ভিজতে লাগল। অনেকক্ষণ পর স্টলমেস্তার আলো নিয়ে এসে মেলিনাকে নিয়ে গেল ভিতরে। তার অনেক পরে একজন আলো হাতে এসে ওদের একটা ঘর খুলে দিল। সকলেই বাক্স পেটরা নিয়ে সেই ঘরে ঢুকল; পাশাপাশি দুটো বড় ঘর। কিন্তু কোনও আসবাবপত্র বা বিছানাপত্র নেই। কোনও খাবারেরও ব্যবস্থা নেই।

অনেকে অধৈর্য হয়ে উঠল। চেঁচামেচি করতে লাগল। কাউন্টপত্নীর একজন দাসী এসে উইলেমকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু উইলেম রাজি হলো না তাতে। এতগুলো লোককে অসুবিধায় রেখে সে একা সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।

অবশেষে প্রায় গভীর রাতে সকলের জন্য খাদ্য-পানীয় ও প্রয়োজনীয় বিছানাপত্র এল। মেয়েরা সবাই একটা ঘরে আলাদা রইল। পুরুষেরা রইল অন্য একটা ঘরে। ঠাণ্ডার জন্য ঘরে আগুন জ্বালাল। কিন্তু ঘরের চিমনিটার মুখ ব্যবহারের অভাবে বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বার হলো না। ফলে সব ধোয়া ঘরে মধ্যেই ঘুরপাক খেতে লাগল। তাতে ঠাণ্ডার থেকে বেশি কষ্ট হতে লাগল সকলের।

যাই হোক, সকলে খাওয়ার পর মধ্যরাত্রিতে শুয়ে পড়ল। কিন্তু পাশাপশি শোবার জন্য একে অন্যের গায়ে খোঁচা দিয়ে বারবার রসিকতা করতে লাগল। তাতে সকলেরই ঘুমের ব্যাথাত ঘটতে লাগল। তবু ভালো, শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবটাকে রসিকতার আনন্দ দিয়ে ভরিয়ে দিতে চাইল। পরদিন কাউন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে সকলে একসঙ্গে চরম অব্যবস্থার অভিযোগ তুলল। অভিযোগ শুনে অবাক হয়ে গেলেন কাউন্ট। কারণ। তিনি প্রাসাদের স্টিউয়ার্ডকে তাদের দেখাশানার সব ভার দিয়ে গিয়েছেন। তাদের আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য। লক্ষ্য রাখতে বলেছেন। কিন্তু তারা যথাকর্তব্য পালন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে ভৎর্সনা করলেন কাউন্ট। কাউন্টের সঙ্গে সঙ্গে ব্যারনও এলেন। তিনি গতকাল ঘোড়া থেকে কোথায় পড়ে গিয়েছিলেন বলে পায়ে চোট লেগেছে। তাই খোঁড়াচ্ছিলেন।

কাউন্ট মেলিনাকে সঙ্গে করে এক জায়গায় নিয়ে গেলেন। নাটক মঞ্চস্থ করার জায়গাটা নির্বাচিত হলো। মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

এদিকে দলের ম্যানেজার হিসাবে মেলিনা এক আদেশ জারি করে হাতে লিখে তা টাঙিয়ে দিল ঘরের দেওয়ালে ও দরজার সামনে। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল দলের প্রতিটি অভিনেতা অভিনেত্রীদের থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করবে। তারা কোনও অবস্থাতেই কারও সঙ্গে অশোভন আচরণ করবে না। যদি কেউ এই নির্দেশ অমান্য করে তাহলে তাকে জরিমানা দিতে হবে।

দলের লোক যাই করুক, প্রাসাদের অফিসার বা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা প্রায়ই এই নির্দেশ ভঙ্গ করতে লাগল। তারা যখন-তখন ঘরে এসে অভিনেত্রীদের সঙ্গে রসিকতা করতে লাগল।

একসময় ব্যারন এসে উইলেমকে কাউন্টপত্নীর কাছে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। ব্যারন বললেন, আপনার যে যে লেখা কবিতা ভালো লাগে তার কিছু নিয়ে যাবেন কাউন্টপত্নীর কাছে। তাঁকে শোনাবেন। তিনি বড় সমঝদার।

উইলেম রাত্রিতে অনেক ঘেঁটে কিছু পুরনো লেখা থেকে বাছল। আবার কিছু লিখল নূতন। তারপর ভালো করে নির্বাচন করে পকেটে রেখে দিল। সত্যি সত্যি এক সময় ডাক পড়ল তার।

অন্দরমহলে একটি ঘরে গিয়ে উইলেম দেখল কাউন্টপত্নীর কাছে ব্যারণ-পত্নী বসে রয়েছে। তার উপর ফিলিপ বসে রয়েছে কাউন্টপত্নীর পায়ের কাছে। ফিলিনা খুব চালাক। সে কাউন্টপত্নীর কাছে কাছেই প্রায় সব সময় থাকে। তাকে গান শুনিয়ে হাসির কথা বলে আনন্দ দেয়, নানারকমের উপহার আদায় করে।

কাউন্টপত্নী উইলেমের দিকে আগ্রহভরে তাকালেন। দু-একটা কথা বললেন কিন্তু তার লেখার কথা কিছু বললেন না। উইলেমও তা বার করতে সাহস করল না। করত যদি অনবরত নানা ধরনের লোক আসা-যাওয়া না করত। অবশেষে ঘণ্টাখানেক বৃথা অপেক্ষা করার পর চলে গেল উইলেম। কিন্তু কাউন্টপরী তার কবিতা না শুনলেও যথাসময়ে তিনি তাঁর দাসীকে দিয়ে দুটো উপহার পাঠিয়ে দিলেন উইলেমকে। একটা ছোট পকেট বই ইংল্যান্ডের আমদানি, আর একটা ফুলগোজা দামী ওয়েস্টকোট। বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে একটু কৃতজ্ঞতা অনুভব না করে পারল না উইলেম।

এদিকে কি ধরনের নাটক মঞ্চস্থ হবে, কিসে খুশি হবেন যুবরাজ তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা চালাতে লাগলেন কাউন্ট। যুবরাজের আসতে আর বেশি দিন বাকি নেই। কাউন্ট উইলেমকে একটা ভূমিকা লিখতে বললেন প্রথমে। নাটক শুরু হবার আগে একটা দীর্ঘ ভূমিকা থাকবে যা শুনে যুবরাজ যেন খুশি হন। উইলেম কথা বলে বুঝল আসল জীবনের ঘটনার থেকে প্রতীক আর রূপক বেশি ভালোবাসেন কাউন্ট। ব্যারন এক সময় উইলেমকে বললেন, কাউন্ট যা বলে বলুক। তুমি যে নাটক পছন্দ করো তার গল্পটা একবার কাউন্টপত্নীকে শুনিয়ে তাঁর মত নিয়ে আসবে। তাহলে আর কিছু ভাবতে হবে না।

ব্যারনপত্নী কাউন্টপত্নীর সঙ্গে উইলেমের এক গোপন সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিল। পিছনের দরজা দিয়ে নিয়ে গেল তাকে। কাউন্টপত্নীর কাছে তখন মাত্র তার এক বান্ধবী বসে ছিল। তার সামনেই তার নাটকের মূল পরিকল্পনার কথাটা বলল উইলেম। সুন্দর করে আবেগের সঙ্গে বুঝিয়ে দিল তার আবেদনের কথাটা।

কাহিনী হলো। পাড়াগাঁয়ের এক শান্ত প্রকৃতির পরিবেশে একদল কৃষক বালক বালিকা নাচছিল। নাচের শেষে তারা একটা গান গাইবে সমবেত কণ্ঠে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের দলের এক বৃদ্ধ বীণাবাদক মিগননকে অর্থাৎ এক বালিকাকে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবে। বীণাবাদক বীণা বাজিয়ে শান্তিও আনন্দের গান গাইবে আর বালিকাটি ডিম সহযোগে এক নাচ দেখাবে। এমন সময় সহসা সামরিক সঙ্গীত শুনে চমকে উঠবে তারা। হঠাৎ একদল সৈনিক এসে হাজির সেখানে। তারা বালিকাটিকে ধরতে যাবে। বৃদ্ধ গায়ক বাধা দিতে গিয়ে বন্দি হবে। বালিকাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে তারা। এমন সময় আবির্ভাব ঘটবে সামরিক নেতার। এই নেতাই হবে নাটকের নায়ক। সে হবে একই সঙ্গে সামরিক অধিনায়ক এবং কাহিনীর নায়ক। সে এসে সকলের সব অভিযোগের প্রতিকার করবে। দেশে শান্তিও শৃঙ্খলা স্থাপন করবে। তার সম্মানার্থে সারা দেশ জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে এক বিরাট আনন্দোৎসব।

নাটকের কাহিনী শুনে খুশি হলেন কাউন্টপত্নী। তবে শুধু বললেন, কাউন্টকে খুশি করার জন্য কিছু রূপক ঢুকিয়ে দেবেন। ব্যারণ পরামর্শ দিলেন ঐ সামরিক অধিনায়ককে প্রতিহিংসা ও যুদ্ধবিবাদের এক অপদেবতারূপে উপস্থাপিত করা যেতে পারে। এরপর শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মিনার্ভা এসে তাকে বশীভূত করবে। হঠাৎ উইলেমের মনে পড়ে গেল কাউন্টের কথাটা। কাউন্টও এক সময় তাকে বলেছিলেন মিনার্ভাকে নাটকের কোথাও ঢুকিয়ে দিতে অর্থাৎ তার সম্পর্কে কোনও এক নাটকের অবতারণা করতে। যাই হোক, ঠিক হলো লার্তেস করবে ঐ সেনাপতি ও নায়কের ভূমিকা। এরপর অন্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের ভূমিকা বুঝিয়ে দিল। কিন্তু সকলে একবাক্যে উইলেমকে কোনও একটা ভূমিকা গ্রহণ করতে বলল। অবশেষে সকলের অনুরোধ উপেক্ষা না করে রাজি হলো উইলেম। সে ঠিক করল এক কৃষক নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে সে এবং কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করবে সেই সুযোগে।

কাউন্টপত্নী মুস্কিলে পড়লেন তার স্বামীকে নিয়ে। কাউন্ট যে ধরনের নাটক চেয়েছিলেন এ নাটক তা হবে না। তবে তাঁর পছন্দমতো কিছু কিছু ঘটনা এবং চরিত্র থাকবে। তখন ব্যারনপত্নী ও জার্নো নামে এক কর্মচারী বলল, রিহার্সালের সময় বিভিন্ন কাজে ও কথায় এমনভাবে তারা ভুলিয়ে রাখবে কাউন্টকে যে তিনি ভালো করে পুরো নাটকটার রিহার্সাল দেখতেই পাবেন না।

এদিকে উইলেমও একটা বিপদে পড়ল। মিগনন ডিমের নাচ নাচতে রাজি হচ্ছে না। আসলে সে চায় না উইলেম এইভাবে নাটক নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকুক। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, না বাবা, আমি মঞ্চে নাচতে পারব না। আর তুমি ওসব ছেড়ে দাও।

অবশেষে যুবরাজ এসে গেলেন। তিনি শুধু দেশের রাষ্ট্রনেতা নন, একজন সদাশয় ব্যক্তি। প্রাসাদদ্বারে এক বিরাট অভ্যর্থনা জানানো হলো তাঁকে। কাউন্ট এক হুকুম জারি করে বললেন কোনও অভিনেতা যেন এককভাবে যুবরাজের সামনে না যায়। তারা সমবেতভাবে মঞ্চে অবতীর্ণ হবে এবং অভিনয় শেষে পরিচিত হবে তার সঙ্গে।

প্রথমে উইলেমের লেখা প্রশস্তি পাঠ করা হলো। খুশি হলেন যুবরাজ। তারপর। সন্ধে হতেই আলোকমালায় সুসজ্জিত এক বিরাট প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যাওয়া হলো যুবরাজকে। নাটক শুরু হলো। সকলেই আপন আপন সাধ্যমতো অভিনয় করল। নাটক শেষে যুবরাজ প্রীত হলেন। তিনি সব অভিনেতাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। বিশেষ করে নাট্যকার উইলেমের সঙ্গে কিছু কথা বললেন।

এরপর রোজ সন্ধের সময় সেই প্রাসাদ অন্তর্গত প্রেক্ষাগৃহে সেই একই নাটক মঞ্চস্থ করে চলল ওরা। নাটক দেখার জন্য দূর গ্রাম-গ্রামান্তর হতে প্রচুর লোক আসতে লাগল। প্রাসাদে অনেক অতিথিও আসতে লাগল। ব্যারন, কাউন্ট প্রভৃতি আত্মীয় স্বজনরা আসতে লাগল বিভিন্ন জায়গা থেকে।

কিন্তু উইলেমের কেবলি মনে হতে লাগল সাধারণ মানুষের ভালো লাগলেও তাদের নাটক বিদগ্ধজনের তেমন ভালো লাগেনি। যুবরাজ একবার করে এসে বসলেও বেশিক্ষণ থাকেন না। তাছাড়া কোনও উচ্চশিক্ষিত রসিকজনও তাদের নাটক আগ্রহভরে শোনেন না।

তবে উইলেমের একটা ব্যাপার খুব ভালো লাগল। সে লক্ষ করল, সে যখন মঞ্চে অভিনয় করে বা কবিতা আবৃত্তি করে তখন কাউন্টপত্নী একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সে দৃষ্টির অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না উইলেমের। সে নিজেও যখন অভিনয় করে মঞ্চে, কাউন্টপত্নীর মুখপানেই তাকিয়ে থাকে। কাউন্টপত্নীর প্রতি এক আবেগঘন আগ্রহ ও আসক্তি বেড়ে যেতে থাকে উইলেমের। তীক্ষ্ণ গভীর দুটি দৃষ্টির পথ ধরে তাদের দুজনের অন্তর যেন জন্ম, সমাজ ও পরিবেশ প্রভৃতি অনেক দুস্তর ব্যবধান পার হয়ে কাছে এসে পড়ে পরস্পরের।

এদিকে লার্তেসের প্রতি বেশ কিছুটা আকৃষ্ট হয়ে পড়েন ব্যারনপত্নী। লার্তেও ব্যারনপত্নীর প্রতি আসক্ত হয়ে উঠল রীতিমতো। একদিন না বুঝে ভুল করে ব্যারনের কাছে তাঁর পত্নীর প্রশংসা করতে থাকে লার্তেস। ব্যারনপত্নী নারীজাতির মধ্যে এক অমূল্য রত্ন, সর্বগুণে ভূষিতা-এই ধরনের কথা বলল লার্তেস। ভেবেছিল স্ত্রীর প্রশংসা শুনে খুশি হবেন ব্যারন। কিন্তু তার ফল হলো উল্টো।

লার্তেসের বলা গুণাগুণ শুনে ব্যারন মৃদু হেসে বললেন, অপরিচিত ব্যক্তিরা যারা ওর সংস্পর্শে আসে তারই একথা বলে। কত প্রৌঢ়, কত যুবক ওর একটুখানি কৃপা পাবার জন্য কত সেবা করে।

কাউন্ট প্রতিদিন সকালে দলের অনেককে ডেকে পাঠাতেন। তাদের অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করতেন। তাদের সুখ-সুবিধার জন্য নজর রাখতেন। এক একদিন রাত্রিবেলায় খাবার পরও ভোজসভায় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনেই তাদের ডাকা হতো। এদের দলের লোকেরা খুশি হতো। তাদের গুরুত্ব বেড়ে গেল।

কাউন্ট উইলেমকে আলাদাভাবে ডেকে একটা কথা বারবার বললেন। বললেন, ফরাসি নাট্যকার রেসিনের লেখা পড়। বই না থাকলে আমি দেব। আমার কাছ থেকে নেবে। আমাদের যুবরাজ নিজে রেসিনের ভক্ত। তাহলে তাঁর অনুগ্রহ পেতে তোমার দেবি হবে না।

কাউন্টের কথা শুনে রেসিন পড়ল উইলেম। তাঁর নাটকে অভিজাত সমাজের কথাই বেশি। যেন ভিন্ন এক জগৎ সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে। পড়তে সত্যিই ভালো লাগল তার।

কাউন্ট ও যুবরাজ উভয়েরই প্রিয়পাত্র জার্নো একদিন উইলেমকে বলল ভিন্ন এক কথা। শেকস্‌পিয়ার পড়েছে।

উইলেম বলল, না, কারণ যখন শেকস্‌পিয়ার জার্মানিতে খ্যাতি লাভ করে তখন নাট্যজগতের সঙ্গে আমার কোনও পরিচয় ছিল না। আমরা তখন ছোট। তবে শেকস্‌পিয়ার সম্বন্ধে আমি যেটুকু শুনেছি তাতে তো তাঁর নাটক পড়ার কোনও উৎসাহ পাইনি। কোনও আগ্রহ জাগেনি আমার মনে।

জার্নো বলল, আমি তোমাকে কিন্তু অনুরোধ করব একবার চেষ্টা করে জোর করে শেকস্‌পিয়ারের নাটক পড়তে। দেখবে অদ্ভুত এক রস পাবে তাতে।

এদিকে ব্যারন দলের লোকদের কাছে আচরণের ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করতে লাগলেন। তিনি সেই বৃদ্ধ অভিনেতাতে বেশি পছন্দ করতেন। একদিন তাকে ডেকে একটা কোট উপহার দেন। তাতে দলের অন্যরা ঈর্ষাবোধ করে।

খাওয়া, থাকা ও মাইনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলের লোকেরা ক্রমশই সোচ্চার দাবি জানাতে থাকে। সব ব্যাপারেই একটু বেশি সুবিধা চায় তারা। উইলেম কিন্তু কোনও ব্যাপারেই চোখ-কান দেয় না। সে একটা ঘরে দিনরাত শেকস্‌পিয়ারের নাটক নিয়ে পড়াশুনা করে। একমাত্র সেই বীণাবাদক ও মিগনন ছাড়া সে ঘরে ঢোকার আর কারো অনুমতি ছিল না। যখন নাটকের অনুষ্ঠান ও রিহার্সাল হতো তখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসত উইলেম।

একদিন রাত্রিবেলা চেঁচামেচি শুনে ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল উইলেম। এসে দেখল ছোট একটা ছেলেকে নিয়ে ভিড় জমে গেছে। তাকে মারার ব্যবস্থা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানল সেই বৃদ্ধ হাস্যরসিক অভিনেতা সন্ধের পর ব্যারনের সঙ্গে দেখা করে অন্দরমহল থেকে নিচের তলায় নেমে আসছিল তখন এই চোর ছেলেটা বাইরের থেকে লুকিয়ে প্রাসাদে ঢুকে উপরে আসছিল। ওর কাছে ধাক্কা খেয়ে বৃদ্ধ পড়ে যায়। তার চিঙ্কারে লোক ছুটে এসে ধরে ফেলে ছেলেটাকে। তারপর কাউন্টকে খবর দেওয়া হয়। ব্যারণ ও স্টলমেস্তার ছুটে আসে।

উইলেম দেখল, ছেলেটা ফ্রেডারিক। হোটেল থেকে সেদিন স্টলমেস্তারের কাছ থেকে লাথি খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আবার হঠাৎ আজ কোথা থেকে এসে হাজির। ফ্রেডারিককে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে এসে ঘটনাটা কি তা জিজ্ঞাসা করল উইলেম। ফ্রেডারিক বলল, সে খোঁজখবর নিয়ে ফিলিনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। হঠাৎ বুড়োটার গায়ে ধাক্কা লেগে যায়। তার কোনও দোষ নেই। উইলেম স্টলমেস্তার ও কাউন্টকে অনুরোধ করে, ওকে ছেড়ে দিতে। আমি চিনি ছেলেটাকে। ফিলিনার কাছে যাচ্ছিল সেকথা গোপন করে গেল উইলেম। ওরা ছেলেটাকে ছেড়ে দিল। উইলেম তাকে ডাকল।

ফ্রেডারিক সোজা উইলেমের ঘরে চলে গেল।

ফিলিনা আর ব্যারনপত্নী দুজনে মিলে একটা ষড়যন্ত্র করছিল। তারা কিছুদিন ধরে চাইছিল কাউন্টপত্নী আর উইলেম ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠুক পরস্পরের সঙ্গে। তারা তাই ঠিক করল একদিন নির্জন ঘরে দুজনের মিলন ঘটাতে হবে।

একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে একটা সুযোগ পেয়ে গেল ওরা। কাউন্ট শিকারে চলে গেলেন। বললেন, আজ-কাল দুদিন আসবেন না। ব্যারনপত্নী সোজা উইলেমের কাছে এসে তাকে অনেক করে বলে রাজি করালেন।

কাউন্টপত্নীর প্রতি উইলেমের আসক্তির কথাটা তিনি জানতেন। ঠিক হলো উইলেম কাউন্টের পোশাক পরে তাঁর শোবার ঘরে বসে থাকবে। তখন হঠাৎ তারা কাউন্টপত্নীকে পাঠিয়ে দেবে সে ঘরে। প্রথমে বুঝতে না পেরে স্বামী ভেবে কাঁধে হাত রেখে আদর করবেন। কি মজা হবে। উইলেম ভয় পেয়ে গেল। যদি পরে রেগে যান কাউন্টপত্নী? এই প্রতারণা যদি পছন্দ না করেন?

ব্যারনপত্নী বললেন, সে ভার আমার। তোমাকে ভাবতে হবে না।

ব্যারনপত্নী জানতেন উইলেমের প্রতি কাউন্টপত্নীর একটা দুর্বলতা আছে। একটা গোপন আসক্তি আছে। তাই উপরে যাই বলুন খুশি হবেন মনে মনে।

যে কথা সেই কাজ। উইলেমকে অন্য পথে কাউন্টের ঘরে নিয়ে গিয়ে সাজিয়ে দিলেন ব্যারনপত্নী। তাকে কাউন্টের টুপি, কোট প্রভৃতি প্রিয় পোশাকে সাজিয়ে চেয়ারে বসিয়ে রেখে কাউন্টপত্নীকে ডাকতে গেলেন।

চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ ভূত দেখে যেন চমকে উঠল উইলেম। ঘরের একদিকের দরজা খুলে কাউন্ট ভিতরে ঢুকে তাকে একবার চকিতে দেখেই দরজা বন্ধ। করে চলে গেলেন। শিকার থেকে অকস্মাৎ কাউন্ট ফিরে এসেছেন জানতে পেরে ভয়ে আঁতকে উঠল উইলেম। সে বুঝে উঠতে পারল না কাউন্ট তাকে এই জঘন্য অপরাধের জন্য কি শাস্তি দেবেন।

কথাটা ব্যারনপত্নীও জানতে পেরে ছুটে এলেন উইলেমকে বাঁচাবার জন্য তিনি তাড়াতাড়ি উইলেমকে বার করে তাঁর নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে পোশাক খুলে দিলেন। তাকে ছেড়ে কাউন্টকে সামলাবার জন্য চলে গেলেন।

কাউন্ট কিন্তু মোটেই রাগলেন না। শুধু কিছুটা গম্ভীর হয়ে রইলেন। শিকার থেকে হঠাৎ ফিরে এসে একটু বিশ্রাম করেই উইলেমকে ডেকে পাঠালেন। ভয়ে কাঠ হয়ে গেল উইলেম। ভাবল হয়তো কাউন্ট তার বিচার করবেন। শাস্তি দেবেন।

কিন্তু যা ভেবেছিল উইলেম তার কিছুই হলো না। কাউন্ট তাকে শুধু কতকগুলো নির্বাচিত কবিতা ও নাট্যাংশ পড়ে যেতে বললেন। উইলেম যতদূর সম্ভব ভালো করে পড়ে যেতে লাগল। পড়া শেষ হলে তিনি প্রশংসা করলেন তার আবৃত্তির। তারপর ভালোভাবেই বিদায় দিলেন।

ব্যারনপত্নী তাঁর প্রিয়পাত্র জার্নোকে কথাটা সব বললে জার্নো বলল, কাউন্ট নিশ্চয়ই মনে ভেবেছেন ওটা ওর প্রেতাত্মা। তাই ভয়ে কোনও কথা বলেননি। এর একমাত্র প্রতিকার হলো নানারকম ভূতপ্রেতের কথা বলে কাউন্টের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। তাঁর মনটাকে দুর্বল করে দিতে হবে। অতিপ্রাকৃতের প্রতি বিশ্বাসটাকে গাঢ় করে তুলতে হবে। হলো ঠিক তাই। কাছে পেলে বা সুযোগ পেলেই ব্যারনপত্নী ও জার্নো দুজন মিলে যত সব ভৌতিক ঘটনার কথা বলতে লাগল। কাউন্টও তাই বিশ্বাস করতে লাগলেন। তার মুখের হাসিখুশি আনন্দময় ভাবটা পাল্টে গেল দিনে দিনে। তিনি গম্ভীর হয়ে উঠলেন।

আবার একদিন হঠাৎ জার্নোর সঙ্গে দেখা হলো উইলেমের। তখন তার শেকস্পীয়ারের অনেক ভাল ভাল নাটক পড়া হয়ে গেছে। এক নতুন জগৎ আর এক অনাস্বদিতপূর্ণ রসের সন্ধান পেয়েছে সে নাটকের মধ্যে। তার জন্য সে ঋণী জার্নোর কাছে। সে ঋণ অকুষ্ঠ ভাষায় স্বীকার করল উইলেম। বলল, শেকসপিয়ারের প্রতিটি চরিত্র কেমন জীবন্ত, কেমন স্বাভাবিক। অথচ তারা প্রত্যেকেই মানব জীবনের এক একটা সমস্যাকে তুলে ধরেছে। তারা প্রত্যেকেই দেখাচ্ছে সব জীবনের মধ্যেই যেন একটা রহস্য আছে।

জার্নো খুশি হয়ে বলল, দেখো, তোমাকে দেখে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। তোমার বংশপরিচয় ও সাংসারিক অবস্থার কথা আমি কিছুই জানি না। তবু আমি– বলব তুমি এইভাবে আর থেকো না। কি হবে এ দলে থেকে? এই লোকগুলোর দ্বারা। কিছু হবে না, কোনও ক্ষমতা নেই তাদের। শুধু শুধু কি হবে এ দলে থেকে? তার থেকে তুমি আমাদের মাঝে চলে আসতে পার। যুবাজের সেবা করতে পার কাজের। মধ্য দিয়ে।

কথাটা কিন্তু মনঃপুত হলো না উইলেমের। মনে মনে বলল, জার্নো যাই বলুক, সে তার দল বা মিগননকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। ওরা যত অপদার্থই হোক ওদের মধ্যে প্রাণ আছে।

অবশেষে একদিন যুবরাজের যাবার দিন স্থির হয়ে গেল। কাউন্ট ঠিক করলেন ঐ দিন তাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানানো হবে। উইলেম তার জন্য একটি নূতন কবিতা রচনা করে তা আবৃত্তি করল। সভায় কাউন্টপত্নী তার পানে সমানে তাকিয়ে দেখে সে কবিতা উপভোগ করলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন।

সভাশেষে কাউন্টপত্নী ব্যারনপত্নীর সঙ্গে তাঁর ঘরে গিয়ে পৌঁছতেই উইলেমের ডাক পড়ল। কবিতার খাতা নিয়ে তাকে এই মুহূর্তে যেতে হবে কাউন্টপত্নীর ঘরে।

যে কবিতা দেখাতে গিয়ে আবৃত্তি করল উইলেম তা কবিতা হিসাবে সত্যিই ভালো। কিন্তু উইলেম মোটেই ভালোভাবে তা আবৃত্তি করতে পারল না। তার দৃষ্টি সব সময় নিবদ্ধ ছিল সুসজ্জিত কাউন্টপত্নীর উপর। কবি হিসাবে যে অঙ্গের অলঙ্কারকে এতদিন অর্থহীন বাহুল্য ও অপ্রয়োজনীয় আতিশয্য বলে গণ্য করে এসেছে, আজ স্বচক্ষে দেখল সেই অলঙ্কার আর বেশভূষার জৌলুস শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে কাউন্টপত্নীর অঙ্গ লাবণ্যকে। সে আরও দেখল কাউন্টপত্নীও ঘন ঘন তার দিকে তাকাচ্ছেন। কিন্তু কাউন্টপত্নীর এমন দৃষ্টি কোনওদিন দেখেনি। এক সূতীক্ষ বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে যাচ্ছিল যেন সে দৃষ্টির মধ্যে আর তার আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠছিল উইলেমের সারা দেহ। তার সমগ্র মস্তিষ্কের মর্মমূল পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছিল যেন সে আঘাতে।

উইলেম দেখল এর মাঝে ফিলিনা এসে কাউন্টপত্নীর তোষামোদ শুরু করে দিয়েছে। বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কাউন্টপত্নীর রূপের প্রশংসা করে বলতে লাগল, এমন বাহু না হলে এ ব্রেসলেট মানায় না, এমন গলা বা বুক না হলে এ হার মানায় না।

কাউন্টপত্নী কপট রাগের সঙ্গে বললেন, চুপ কর ফিলিনা। তোর এই সব ন্যাকামি সব সময় আর ভালো লাগে না।

ফিলিনা সে কথায় কান না দিয়ে উইলেমকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ এই শিল্পীকেও চমৎকার মানিয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় আজ ও কোনও গোপনস্থানে আপনার সঙ্গে মিলিত হলে ভালো হতো।

কপট রাগের সঙ্গে কাউন্টপত্নী বললেন, আমার কাছে আদর পেয়ে পেয়ে তোর স্পর্ধা বেড়ে গেছে ফিলিনা। এ ধরনের কথা আর কখনও বলিস না।

পড়া শেষ করে উইলেম বসেছিল একটি চেয়ারে। এমন সময় কাউন্টপত্নী একটা কৌটো থেকে একটা হীরের আংটি বার করে সেটি উইলেমের দিকে তুলে ধরে বললেন, আমার এই সামান্য উপহারটি গ্রহণ করবেন। আমি আপনার এমনই এক বান্ধবী যে শুধু আপনার উন্নতি ও মঙ্গল চায়।

উইলেম তার কবিতা লেখা একটি কাগজে নাম সই করে কাউন্টপত্নীকে দিয়ে বলল, এটা আমার নামের স্বাক্ষর। কিন্তু আপনার নামের স্বাক্ষর আমার অন্তরে মুদ্রিত হয়ে আছে। তা কখনও মুছে যাবে না। আপনার একগাছি চুল দেবেন? এই আংটির সঙ্গে জড়িয়ে রাখব?

ফিলিনা কাউন্টপত্নীর বাঁ হাতথানি ধরেছিল। উইলেম আবেগের বশে কাউন্টপত্নীর ডান হাতখানি তুলে নিল নিজের হাতের মধ্যে। এমন সময় ফিলিনা ও ব্যারনপত্নী। বেরিয়ে গেল ঘর হতে। বুঝতে পারল তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। নতজানু হয়ে কাউন্টপত্নীর পাশে বসল উইলেম। তাঁর ডান হাতখানি তখনও ছিল তার হাতের মধ্যে। এবার উইলেম কাউন্টপত্নীর হাতখানি চুম্বন করে বলল, এবার আমি যাই।

উঠতে যাচ্ছিল উইলেম কিন্তু হঠাৎ একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। কি করে কি হলো তা জানে না। হঠাৎ উইলেম দেখল কাউন্টপত্নী দুহাত দিয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁট দুটো তার মুখের কাছে তুলে দিয়েছে। কাউন্টপত্নীর মুখে মুখ দিয়ে তার দেহটাকেও বুকের কাছে টেনে নিল উইলেম। এইভাবে নিবিড়তম এক আলিঙ্গন ও চুম্বনের বন্ধনে কতক্ষণ আবদ্ধ ছিল তা জানে না, হঠাৎ চমকে উঠল উইলেম, কাউন্টপত্নী যেন হঠাৎ ভয়ে চমকে উঠে ছাড়িয়ে নিল নিজকে। অথচ কেউ আসেনি ঘরের দরজার বাইরে। তবে কি এক কাল্পনিক শঙ্কার শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন কাউন্টপত্নী? এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন উইলেমের দিকে। সে দৃষ্টির অর্থ সে বুঝতে পারল না। কাউন্টপত্নী বললেন, তুমি চলে যাও এই মুহূর্তে। আমাকে যদি ভালোবাস তাহলে চলে যাও। আর দেরি করো না।

অবশেষে একদিন কাউন্ট আর কাউন্টপত্নী প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

সৈন্যদের শিবির উঠে গেছে। যুবরাজ তাঁর সৈন্যদের নিয়ে চলে গেছেন। প্রাসাদের চারপাশে মাঠগুলোতে সৈন্যদের যে ছাউনি গড়ে উঠেছিল সে ছাউনি আর নেই। মাঠগুলো আবার ফাঁকা হয়ে উঠেছে। একদিন সকালে লার্তেস প্রাসাদের একটি ঘরের জানালা থেকে মাঠের দিকে তাকিয়ে এইসব দেখছিল আর ভাবছিল। এমন সময় ফিলিনা এসে মাদাম মেলিনার কথা তুলল। মাদাম মেলিনার পেটটা বড় হয়ে উঠেছে। অথচ তা ঢাকার চেষ্টা করছে না। ঐভাবেই সব কাজ করে যাচ্ছে। ফিলিনা বলল, এমন নির্লজ্জ মেয়ে কখনও দেখিনি আমি।

ওরা যখন এইসব কথাবার্তা বলছিল তখন ব্যারন এসে উইলেমকে ডাকলেন। ব্যারন বললেন, কাউন্ট আপনাকে সামান্য কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। যদিও আপনার বুদ্ধি ও প্রতিভার সঠিক মূল্য দান করা সম্ভব নয়, তথাটি আপনার অমূল্য সময় ও শ্রম ব্যয়ের ক্ষতিপূরণস্বরূপ সামান্য কিছু দান করেছেন। এটা গ্রহণ করুন। আপনি তাঁর জন্য অনেক খেটেছেন। অনেক কিছু করেছেন।

এই বলে ব্যারন একটি থলি বার করে উইলেমের হাতে দিতে গেলেন। কিন্তু উইলেম বলল, দেখুন, এটা আমি নিতে পারব না। আমাকে ক্ষমা করুন। আমার মনে হচ্ছে এটা যদি আমি গ্রহণ করি তাহলে আমি যা কিছু তার জন্য করেছি তা সব পণ্ড হয়ে যাবে। তাহলে তাদের মধুর স্মৃতি কেমন যেন কলুষিত হয়ে যাবে আমার কাছে। আর তা হয়ে যাবে আমার স্বার্থপরতার জন্য। যেখানে টাকার ব্যাপার সেখানে কোনও প্রীতি বা শ্রদ্ধাসিক্ত কোনো স্মৃতি বেঁচে থাকতে পারে না।

তবু ছাড়লেন না ব্যারন। বললেন, তাহলে কি বলতে চান কাউন্ট আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকবেন চিরদিন? আপনি যদি তাঁর এ দান, এ উপহার গ্রহণ না করেন তাহলে তিনি ভাববেন আপনি এতে সন্তুষ্ট নন। তাহলে আমি কোন মুখে তার কাছে দিয়ে দাঁড়াব?

উইলেম শান্ত কণ্ঠে বলল, যদি বিবেকের নির্দেশ মানতে হয় তাহলে এ দান গ্রহণ করা আমার উচিত নয়? তবু এ দান আমি গ্রহণ করব বর্তমান প্রয়োজনের খাতিরে। বর্তমানে এই দলকে চালাতে হলে টাকার দরকার এবং মহামান্য কাউন্টের এই সদয় দান সে বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করবে আমাদের। দলের সকলেই উপকৃত হবে এতে।

ব্যারন বললেন, সত্যিই এটা এক আশ্চর্যের কথা যে মানুষ মানুষের কাছ থেকে আর সব উপহার খুশির সঙ্গে গ্রহণ করে, কিন্তু একমাত্র টাকা নিতে চায় না। ভাবে টাকা নিয়ে ছোট হয়ে যাবে।

ব্যারন চলে গেলে নিজের ঘরের ভিতরে গিয়ে থলেটা খুলে উইলেম দেখল সব স্বর্ণমুদ্রা। গণনা করে দেখল যেদিন সে প্রথম হোটেলে এসে ওঠে এবং ফিলিনার সঙ্গে ফুল নিয়ে আলাপ হয়, সেদিন তার কাছে যে পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছিল, কাউন্ট তাকে আজ সেই পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা দান করেছেন। অনেকখানি আশস্ত হলো উইলেম। কাগজ-কলম টেনে নিয়ে বাড়িতে একটা চিঠি লিখতে বসল। চিঠিতে আশ্বাস দিল বাড়ির সকলকে। লিখল সে শুধু বাজে কাজে সময় ও অর্থ ব্যয় করছে না। তাতে কিছু লাভও হচ্ছে।

হঠাৎ স্টলমেস্তার এসে হাজির। সে বলল, তোমরা সবাই তৈরি হয়ে নাও। কাউন্ট ঘোড়া পাঠিয়ে দিচ্ছেন; ঘোড়ার অভাব হবে না। দিন কতকের জন্য তোমাদের বাইরে যেতে হবে। সব মালপত্র গুছিয়ে নাও।

উইলেম দেখল তার একটি বাক্স মাদাম মেলিনা নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করছে। উইলেম মিগননকে বলল, থাকগে, না দিক। অন্য বাক্স নিয়ে কাজ চালাও।

মেলিনা এসে বলল, আমরা বাইরে যাচ্ছি। এখানে যা হয় হোক। বাইরে যাবার সময় এবার একটু ভদ্রভাবে যেতে হবে আমাদের। তার জন্য মিগননকে মেয়ের পোশাক পরতে হবে। আর বীণাবাদককে দাড়ি কামাতে হবে।

কথাটা শুনে মিগনন আর বৃদ্ধ বীণাবাদক দুজনেই ক্ষেপে গেল। মিগনন উইলেমকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি বেটাছেলে, মেয়েছেলের পোশক পরব না। বৃদ্ধ গায়কও বলল, দাড়ি কামানো হবে না। তার জন্য তাকে দল ছাড়তে হলেও তার কোনও ক্ষতি নেই।

ফিলিনা বলল, কাউন্ট কিন্তু এই সব ভালোবাসেন। তাঁর মতে নাটকে মানুষ যে পোশাক পরে সে পোশাক যথাসম্ভব দৈনন্দিন বাস্তব জীবনেও ব্যবহার করা উচিত। যে দাড়ি গায়ককে রাত্রিবেলায় মঞ্চে পরতে হয় সে দাড়ি দিনের বেলাতেও পরা ভালো। তার মানে এই যে অভিনয় জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের ব্যবধানটা যত চলে যাবে ততই অভিনয়ও সহজ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

কথাটা শুনে অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা হাসতে লাগল। বৃদ্ধ গায়ক উইলেমকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, আমাকে যেতে দিন। আমি আর এখানে থাকব না।

উইলেম বুঝল মেলিনার কথায় বৃদ্ধের রাগ হয়েছে। উইলেম বলল, আপনার কোনও চিন্তা নেই। আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আপনার চুল-দাড়িতে হাত দেবে না। এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমি। আমি থাকতে কেউ আপনার কিছু করতে পারবে না।

বৃদ্ধ বলল, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আপনার চারপাশে যারা রয়েছে তারা সবাই ভালো নয়। আমার কিছু গোপন কথা আছে, আমার জীবনের একটা গোপন অংশ আছে। সেটা ওরা নির্মমভাবে টেনে বার করতে চায়। কিন্তু আমি তা পারব না। তাই আমি আমার সেই গোপন কথার সম্পদ, জীবনের সেই অনাবিষ্কৃত দিকটি নিয়ে বিদায় নিই।

উইলেম কিন্তু ছাড়ল না। বলল, আমি আপনার গোপন কথার কিছুই জানতে চাই না। আপনার ভাগ্যকে আমার হাতে সঁপে দিতে পারেন।

যাই হোক, উইলেমের কথায় রয়ে গেল বৃদ্ধ।

আগে যে রাজপ্রাসাদে ছিল তার থেকে কিছু দূরে একটা ছোট শহরে তার দল নিয়ে থেকে যেতে চাইল মেলিনা। উইলেমও বাড়ি যাব-যাব করেও গেল না। এই দল ছেড়ে কোথাও যেতে মন সরছিল না তার। তার পোশাকটাও পথিকের মতো হালকা ও সাদাসিধে করে নিল। একটা হালকা ওয়েস্ট কোট, ঢিলে প্যান্ট, ফিতেওয়ালা বুট জুতো, মাথায় গোল টুপি আর সিল্কের নেকটাই। ফিলিনা তার পোশাকের দারুণ প্রশংসা করল।

অবসর সময়ে দলের সবাই একটা আনন্দ উপভোগ করত। তা হলো হঠাৎ ওরা সবাই মিলে একটা নাটক করত মুখে মুখে। আর সেই নাটকে কিছুদিন আগে যে সব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিল তাদের এক-একজনকে চরিত্র হিসাবে খাড়া করে হাসাহাসি করত। বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে তাদের উপস্থাপিত করে তারা মজা পেত।

উইলেম একদিন তার প্রতিবাদ করে বলল, ওসব করা উচিত নয়। তাদের জন্মের জন্য তারা দায়ী নয়। ছোট থেকে যারা পার্থিব ঐশ্বর্যের দ্বারা পরিবৃত থাকে সব সময় তারা অন্তরের ঐশ্বর্যের কোনও দাম দিতে জানে না। এ জন্য তাদের দোষ দেওয়া উচিত নয়।

এরপর উইলেম প্রস্তাব করল, আমাদের অভিনয় প্রতিভাকে ক্রমে ক্রমে বাড়িয়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। নিয়মিত অভ্যাস দরকার। তোমরা যদি অভিনয়ে কৃতিত্ব দেখাতে পার তাহলে বসে বসে কাজের জন্য ভাবতে হবে না।

ওরা সবাই তখন প্রস্তাব করল পরিচালনার জন্য একজনকে সাময়িকভাবে প্রধান করে একটা সিনেট গঠন করা হবে। প্রধানকে সকলের ভোটে নির্বাচন হতে হবে।

মেলিনা তাতে রাজি হলো। ওরা সবাই মিলে ভোট দিয়ে প্রথমে উইলেমকে ম্যানেজার নির্বাচিত করল। তারপর তাকে সর্ববিষয়ে সাহায্য করার জন্য একটা সিনেট গঠন করা হলো। মেয়ে-পুরুষ মিলিয়ে তার সদস্য নির্বাচন করা হলো।

লার্তেসের একটা দোষ। মেয়েদের সে দেখতে পারে না। কোনও মেয়েকেই সে ভালোবাসার চোখে দেখতে পারে না। একটা জায়গায় দুই-একদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল। স্থানীয় একটি মেয়ে লাতেঁসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার কিছু বিষয়-সম্পত্তি ছিল। কিন্তু লার্তেস তার প্রতি এমন নীরস ঔদাসিন্য দেখায় যে, মেয়েটা চলে যেতে পথ পায় না।

কথাটা উঠতে ফিলিনা হাটের মাঝে হাঁড়ি ভেঙে দিল। লার্তেসের পূর্ণ জীবনের একটি গোপন কথা বলে দিল সকলের কাছে। তখন লার্তেসের বয়স মাত্র আঠারো। কোনও এক নাটকের দলে সে কোনও এক বৃদ্ধ অভিনেতার চোদ্দ বছরের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। কাজ শেষে যখন বৃদ্ধ তার মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন। লার্তেস তাকে অনুনয়-বিনয় করে। সে মেয়েটিকে বিয়ে করতে চায়। অবশেষে অনেক করে বৃদ্ধ রাজি হয়। লার্তেস মেয়েটিকে বিয়ে করে। বিয়ের পর লার্তেস তার নূতন বউকে নিয়ে একটি ঘরে থাকত। সে একদিন রিহার্সালে যায় সন্ধ্যার সময়। রাত্রিবেলায় বাড়ি ফিরে দেখে তার ঘরে তার নূতন বউ-এর কাছে রয়েছে তার আগের প্রেমিক। এরপর সে মেয়ের আগেকার প্রেমিক লার্তেসকে ডুয়েলে আহ্বান করে। ডুয়েল লড়তে গিয়ে আঘাত পায় লার্তেস। সেই থেকে ও মেয়েদের ঘৃণা করে। তাদের সততায় বিশ্বাস করতে পারে না।

এবার ওদের যাত্রা শুরু হবে। মেলিনা এসে বলল, সব ঠিক। এবার রওনা হতে হবে। কাউন্টের নির্দেশমতো ওরা যাবে এক শহরে। সেখানে ওদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু হঠাৎ একটা বাধা এসে উপস্থিত হলো। স্থানীয় দু-একজন বলল যে পথে তারা যাবে এবং যেটা সোজা পথ সে পথ ভালো নয়। এখন যুদ্ধের সময়। প্রায়ই দস্যু দেখা যায় সে পথে। সব কেড়ে নেয়। জীবনও সংশয় হয়ে ওঠে। হয় যাত্রা স্থগিত করতে হবে, না হয় ঘুর পথে যেতে হবে অনেক কষ্ট করে।

উইলেম বলল, যুদ্ধের সময় এরকম গুজব প্রায়ই রটে। সুতরাং গুজবে কান না দিয়ে সোজা পথেই যাত্রা শুরু করা যাক। সবাই সমর্থন করল তাকে। লার্তেস বলল সে যাবেই ঐ পথে। বৃদ্ধও তাই বলল। আসন্ন সন্তান-সম্ভবা মেলিনাও বেশ মনের জোর দেখাল। দুটো কোচে ওরা মালপত্র নিয়ে উঠে বসল। দ্বিতীয় দিনে পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে গাড়ি যাবার সময় গাড়ির চালকরা বলল, শহরটা এখনও অনেক দূরে, গাছপালায় ঘেরা ঐ পাহাড়টায় বিশ্রাম করে নিন আপনারা।

সকলেই রাজি। ছোট পাহাড়টার মাথায় উঠতে হলে একটা ঘন জঙ্গল পার হতে হয়। সতর্কতার জন্য কিছু অস্ত্রও ছিল ওদের হাতে। উইলেমের কাছে ছিল দুটো রিভলবার আর লার্তেসের ছিল একটা বন্দুক। ফ্রেডারিক সেই বন্দুকটা কাঁধে তুলে নিল। ওরা পাহাড়ের উপর উঠে চারদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। চারদিকে শুধু পাহাড় আর বন। কোনও কোনো জনমানব বা কোনও প্রাণীর চিহ্ন নেই। চারদিক ভীষণভাবে নিস্তব্ধ। উইলেমের মনে হলো জীবনে এত আনন্দ আর কখনও পায়নি। এমন পরিবেশ, এমন আনন্দঘন মুহূর্ত জীবনে আর কখনও আসেনি। দলের অন্য সকলেও খুব খুশি। মেয়েরা গুনগুন করে গান করতে লাগল। খাবার জন্য কিছু আলু সেদ্ধ করতে লাগল। মালপত্র সব গাড়িতেই রইল। ঘোড়াগুলো জোয়ালমুক্ত করে গাছে বেঁধে দিল চালকরা।

হঠাৎ একটা বন্দুকের শব্দ শোনা গেল। তারর একদল সশস্ত্র দস্যু বনভূমি পার হয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের একজন গাড়িতে উঠে মালপত্র নামাতে শুরু করে দিল। লার্তেস তার বন্দুকটা নিয়ে গুলি করল। গাড়ির উপর থেকে পড়ে গেল লোকটা। উইলেমও এগিয়ে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে বাধা দিল। কিন্তু সংখ্যায় দস্যুরা বেশি থাকায় পেরে উঠল না ওরা। লার্তেস আর উইলেমকে আহত করে মালপত্র নিয়ে পালিয়ে গেল দস্যুরা। একমাত্র ফিলিনা তাদের সর্দারকে অনেক কয়ে বলে তার বাক্সটা রক্ষা করল।

আঘাতটা উইলেমেরই বেশি লেগেছিল। কতক্ষণ অচৈতন্য পড়ে পড়েছিল তা সে। নিজেই জানে না। চেতনা ফিরলে দেখল সেই পাহাড়ের উপরেই সে আছে। মাথাটা ফিলিনার কোলে রয়েছে। পায়ের কাছে বসে আছে মিগনন। আর কেউ নেই। সেই স্তব্ধ নির্জন বনভূমিতে শুধু তারা তিনজন।

ফিলিনার কাছ থেকে জানল দলের অন্যরা সব কিছু হারিয়ে রাগে-দুঃখে পাগলের মতো হয়ে গেছে। তারা নিকটবর্তী একটা গাঁয়ের এক পান্থশালায় গিয়ে উঠেছে। বৃদ্ধ গায়ক গেছে তার জন্য ডাক্তার ডাকতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার এসে উইলেমের ক্ষতস্থানগুলো ব্যান্ডেজ করে দিল। ক্ষত দিয়ে প্রচুর রক্ত বার হওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছে উইলেম। উত্থানশক্তি রহিত । এমন সময় একদল অশ্বারোহীকে তাদের দিকে আসতে দেখে আবার ভয় পেয়ে গেল ওরা। কিন্তু পরে দেখল তারা তাদের সাহায্য করতে এসেছে। তাদের পুরোভাগে একজন নারী অশ্বারোহী। অদ্ভুত পোশাক আর টুপির জন্য তাকে চেনা যাচ্ছিল না। অশ্বারোহীদল তাদের নির্দেশে চলছিল। সেই নারী নেমে এসে তার গায়ের কোটটা। খুলে উইলেমের গায়ে চাপিয়ে দিল। তারপর একজন গ্রাম্য সদরকে নির্দেশ দিল উইলেমকে বয়ে নিয়ে গিয়ে যেন পাশের গায়ে তার ঘরে শুইয়ে রাখে।

সেই সর্দার আরও লোকজন এনে উইলেমকে বয়ে নিয়ে গেল বাঁশের মাচায় করে। পাশের গায়ের পান্থশালাতেই দলের সব লোকরা উঠেছে। সর্দার উইলেমকে প্রথমে সেখানেই তুলল। পরে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। সর্দার প্রস্তুতির জন্য বাড়ি গেলে তার দলের লোকেরা দুর্ঘটনার জন্য উইলেমকে দায়ী করে গালাগালি করতে লাগল। তারা একবাক্যে সর্দার ও ফিলিনাকে বলল, ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও। ওরই জন্য আমরা সব হারিয়েছি। ওই জোর করে আমাদের এই পথে আনল।

মেলিনা এতদিন যা সঞ্চয় করেছিল সব গেছে। তার স্ত্রী একটা মরা ছেলে প্রসব করে।

বারবার ওদের এক কথা শুনে কথা বলার ক্ষমতা না থাকলেও উঠে বসে উইলেম। বলল, আমি কি তোমাদের জন্য কিছু করিনি? আমি প্রস্তাব করেছিলাম মাত্র। তোমরা সবাই তখন আমাকে সমর্থন করেছিলে এ পথে আসার জন্য। তবে কেন আমাকে দোষ দিচ্ছ?

মেলিনাকে বলল, তোমাকে যে টাকা ঋণ হিসাবে দিয়েছি সে ঋণ থেকে মুক্তি দিলাম তোমায়। তোমরা সব ভুলে আমার পাশে এসে দাঁড়াও। আমি তোমাদের দুঃখ বুঝতে পারছি। আমি কথা দিচ্ছি তোমরা যে যা হারিয়েছ তার দ্বিগুণ-তিনগুণ আমি দেব তোমাদের।

তবু তারা শান্ত হলো না। বিশ্বাস করল না উইলেমের কথায়। এদিকে সর্দার এসে উইলেমকে নিয়ে গেল। উইলেম বুঝতে পারল উত্তেজনার জন্য তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে।

ফিলিনা ও মিগনন উইলেমের সঙ্গে এল।

পরদিন সকলে ঘুম ভাঙলে শুনল সেই নারী আবার তাকে দেখতে এসেছিল। উইলেমের মনে হলো নারী না, কোন দেবদূত স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। তার কোটটা গায়ে দিয়ে কেবল সে কোটের গন্ধ শুঁকতে ইচ্ছা করেছিল তার। কারণ সে কোটে সেই নারীর স্পর্শ আছে। ডাক্তার এসে তাকে ক্ষতস্থান ধুয়ে দিয়ে গেল। উইলেম ফিলিনাকে। বলল, তুমি এবার যেখানে খুশি যেতে পার ফিলিনা। তোমার বাক্সে আমার যা কিছু সম্পদ রক্ষা করেছ এজন্য ধন্যবাদ। তার জন্য আমার সোনার হাতঘড়িটা আমি তোমাকে দেব।

ফিলিনা বলল, আমি কোথাও যাব না।

মিগননের মতো বৃদ্ধ বীণাবাদকও সঙ্গী হয়ে উঠল উইলেমের। একটু সুস্থ হয়েই লার্তেস দেখা করতে এল তার সঙ্গে। সে বলল, হোটেলে যখন দলের লোকেরা তাকে অপমান করে তখন সে অন্য ঘরে অসুস্থ ছিল। তা নাহলে সে কখনই চুপ করে থাকত না। উইলেমের প্রতি তার আনুগত্য ও সমর্থন আজও অটুট আছে।

লার্তেস বলল, সার্লোর অধীনে ওরা আবার একত্র হয়ে একটা নতুন দল গড়তে চায়। যাবার সময় তোমার কাছে ওরা পাথেয় খরচ চাইবে। মনে হয় এতদিন দল চালিয়ে ফিলিনা কিছু টাকা করেছিল। কিন্তু সব গেছে।

ফিলিনা বলল, ওদের টাকা দেবার কি আছে? সর্দার ওদের প্রত্যেককে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে।

তবু ওরা যখন উইলেমের কাছে এল, উইলেম তাদের প্রত্যেককে কিছু কিছু দিল।

একদিন সকালবেলায় হঠাৎ ঘুম ভাঙতে উইলেম দেখল তার বিছানার এক ধারে ঘুমিয়ে আছে ফিলিনা। রাত্রিতে হয়ত বই পড়তে পড়তে তার ঘুম এসে যায়। বইখানা পাশে পড়ে রয়েছে। মাথার চুলগুলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এই অগোছালো ভাবের মধ্যে ফিলিনাকে খুব ভালো লাগছিল উইলেমের। এই ভালো লাগার মধ্যে দিয়ে তার প্রতি তার অন্তরের অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা। তাকে যখন দলের সবাই ত্যাগ করে যায় তখন একমাত্র ফিলিনাই তার পাশে থেকে দিনরাত সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলে। মিগননও করে। কিন্তু মিগননের সে একদিন উপকার করেছে। কিন্তু ফিলিনার জন্য সে এমন কিছু করেনি যার জন্য ফিলিনা এই বিপদের দিনে একখানি করতে পারে তার জন্য। সুতরাং ফিলিনার ঋণ সে শোধ করতে পারবে না। এখন ফিলিনার ঘুমটা ভেঙে গেল। সে আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। উইলেম তাকে বলল, তুমিও দলের অন্যান্যদের সঙ্গে চলে যাও। সার্লোর অধীনে গিয়ে কাজ করো।

এই ফিলিনা দলের লোকদের পাথেয় খরচ হিসাবে টাকা নেওয়ার জন্য ঝগড়া করে তার সঙ্গে। ফিলিনা কথাটার জের টেনে বলল, তুমি যদি আমাকে তাড়াতে চাও, আমি চলে যাব। ফ্রেডারিক আমার কাছে থাকলে আমি ভাবতাম না। তোমাদের কাউকে আমার দরকার হতো না। কিন্তু ডাকাত পড়ার পর থেকে ছেলেটা কোথায় যে চলে গেল তার ঠিক নেই।

উইলেম চুপ করে রইল। তার কষ্ট হচ্ছিল মনে। ফিলিনার সেবার অভাবটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করবে সে। তবু কোনও কথা বলল না দেখে ফিলিনা সত্যি সত্যি চলে গেল।

উইলেম এবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। এবার সে হাঁটতে পারে। এখানে একজন গ্রাম্য যাজক আসেন। তাকে প্রায়ই সান্ত্বনা আর পরামর্শ দেন। ফিলিনা চলে গেছে এবং দেহে কিছুটা বল পেলে সেই অজ্ঞাতনামা নারীর খোঁজ করতে লাগল উইলেম। চকিতে সে একবারে যতটুকু দেখেছে তার আহত আবিল চৈতন্যের মধ্যে তাকে দেখেছে, কাউন্টপত্নীর সঙ্গে তার অনেকটা মিল আছে। যার জন্য সে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরে আসতে পেরেছে, যার জন্য নবজীবন লাভ করেছে তাকে একটু কৃতজ্ঞতা জানাতেও পারেনি। কিন্তু সর্দার বা যাজক শত অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো সন্ধান দিতে পারল না সেই সুন্দরী অশ্বরোহিণীর। হঠাৎ কোটের পকেটে হাত দিয়ে একটি চিঠি পেল উইলেম। এই কোট তার সেই সুন্দরী উদ্ধারকারিণীরই দেওয়া। সে চিঠি তারই হাতে লেখা তারই কোনও আত্মীয়কে। উইলেমের কাছে কাউন্টপত্নীর হাতে লেখা একটি গান ছিল। মিলিয়ে দেখল দুজনের হাতের লেখার মধ্যে অদ্ভুত মিল আছে।

পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের জন্য আরও দিনকতক থাকতে হলো উইলেমকে। কিন্তু মনে চিন্তা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে পারল না। কিছু না কিছু সে করতে চায়। অজ্ঞাতনামী সেই সুন্দরীরও কোনো খোঁজ না পেয়ে একদিন মিগনন আর বৃদ্ধ বীণাবাদককে সঙ্গে নিয়ে সার্লোর বাড়ির পথে রওনা হলো উইলেম। সার্লো তার নাট্যজগতের অন্তরঙ্গ বন্ধু। শেকস্‌পিয়ার নিয়ে কত আলোচনা হয়েছে তার সঙ্গে।

সার্লোকে আগেই একটা চিঠি দিয়েছিল উইলেম। তাই উইলেম তার বাড়িতে পা দিতেই দুহাত বাড়িরে ছুটে এল সার্লো। সাদর অভ্যর্থনার পর উইলেমকে কাছে বসিয়ে সার্লো বলল, তোমার দলের লোকদের কিছুই হবে না। যত সব অপদার্থের দল।

উইলেম কোনও কথা বলল না। ওদের প্রতি এখনও সমান মমতা আছে তার। অপদার্থ হলেও ওদের নিয়ে কিছু করা হবে এ বিষয়ে একটা গোপন বিশ্বাস মনটাকে দোলা দেয় তার। কথায় কথায় উইলেম শেকসপিয়ারের হ্যামলেট’ নাটকের কথাটা তুলল।

সার্লো বলল, পলিনিয়াসের ভূমিকায় অভিনয় করার আমার বড় ইচ্ছা। আমার বোন অরেলিয়াও ওফেলিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে যদি যুবরাজ হ্যামলেটের ভূমিকার জন্য উপযুক্ত লোক পাওয়া যায়।

অরেলিয়ার সঙ্গে আলাপ করল উইলেম। ওফেলিয়ার চরিত্রটাকে ভালোভাবে জানতে চাইল অরেলিয়া। উইলেম গোটা হ্যামলেট নাটকটা নিয়েই আলোচনা করতে লাগল। সে বলল, সে বিরাট কাজের ভার হ্যামলেটের উপর দেয়া হয়েছিল তার অপরিণত অপটু অশক্ত অন্তরাত্মা সে ভার সহ্য করতে পারেনি। একটা ওক গাছের চারাকে একটা ছোট্ট কাঁচের জারে বসালে যেমন হয়, তার শেকড়গুলো বড় হলে জারটার যেমন ফাটল ধরে, হ্যামলেটেরও ঠিক তাই হয়েছিল। হ্যামলেটের ট্রাজেডি এইখানে। নায়ক শুধু ভেবেছে খলনায়কের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সে কিছুই করেনি। কিন্তু নাটকটা এমনভাবে সাজানো যে খলনায়ক নিজেকে নিরঙ্কুশ করার জন্য নায়কের জন্য যে মৃত্যুফাঁদ পাতে সে ফাঁদে নায়কের সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও পড়ে যায়।

পরদিন অরেলিয়া ব্যক্তিগত কারণে তার ঘরে উইলেমকে ডাকল। উইলেম ঘরে ঢুকে দেখল, সোফার উপর বসে আছে অরেলিয়া। কিন্তু কোনও বিশেষ কথা হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যে সার্লো আর ফিলিনা ঘরে ঢুকল। এরপর সার্লো আর অরেলিয়া দুজনেই বেরিয়ে যেতে ফিলিয়া রয়ে গেল।

প্রথমে সারা ঘরময় শিশুর মতো অবুঝ আনন্দে লাফিয়ে বেড়াতে লাগল ফিলিনা। তারপর মেঝের উপর শুয়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল। প্রথমে ফিলিনাকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল উইলেম। তার সেই বিস্ময়কে উপহাস করে ফিলিনা বলল, তোমার আগেই আমি এখানে চলে এসেছি। দেখলো তো? আমি কিন্তু সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। এবার এখানকার কথা শোনো। এখানে আসার পর থেকে আমার মন্দ লাগছে না। কিন্তু এদের সম্বন্ধে কিছু জেনে রাখা উচিত তোমার। থিয়েটারের দল করে কিছু পয়সা করবে সার্লো। সে এখন আমাদের নতুন দলের ম্যানেজার। এই দলে একটা নাচিয়ে মেয়ে আছে। তার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে সার্লো। আবার এক অভিনেত্রীর সঙ্গে বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি। তার উপর শহরে আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছে। তার বোন অরেলিয়ার স্বামী মারা গেছে। এই দলেরই এক অভিনেতার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তার মৃত্যুর পর এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে তার আলাপ হয়। ভালোবাসা হয়। কিন্তু তাকে ফেলে সে পালায়। এই বাড়িতে তিন বছরের একটা ফুটফুটে ছেলে আছে। দেখে মনে হয় ওর বাপ খুব সুন্দর ছিল। ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লাগে। অরেলিয়া কিন্তু সেই লোকটার জন্য এখনও হাহুতাশ করে। তার ভাই সার্লো আবার তার প্রেমিকাদের তালিকায় আমার নামটাও লিখে নিয়েছে। আমার প্রতিও তার একটা দুর্বলতা গড়ে উঠেছে। আমার কথা শোনো, তুমি অরেলিয়াকে ভালোবাস। তাহলে ভালোবাসাবাসির খেলাটা বেশ জমে উঠবে। তুমি অরেলিয়াকে ভালোবাসবে, অরেলিয়া ভালোবাসবে সেই পলাতক ভণ্ড প্রেমিকটাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসব আর আমাকে ভালোবাসবে সার্লো। একজন যার পিছনে ছুটে চলবে, সে ছুটে চলবে আর একজনের পিছনে। তা না হলে, ভালোবাসার খেলা।

এরপর একদিন অরেলিয়া সত্যি সত্যিই তার জীবনের কথা সব খুলে বলল উইলেমকে। বলল, আমার মা আমার খুব ছেলেবেলায় মারা যান। আমি মানুষ হই আমার পিসির কাছে। তাঁর নীতিজ্ঞান মোটেই তীক্ষ্ণ ছিল না। আমি আমার যৌবনে একজনকে না বুঝে না ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। সে আমার দাদার অধীনে অভিনয় করত। কিছুদিন পরে সে মারা যায়। আমাদের কোনও সন্তানও হয়নি। তারপর এক ভদ্রলোকে আসেন এখানে বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করে। ভদ্রলোক প্রথমে আমার কাছে প্রতিটি কাজে ও কথাবার্তায় নিঃস্বার্থ প্রেমের ভান করে যাতে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। জীবনে প্রথম ভালোবাসা জাগে আমার হৃদয়ে। তাকে খুশি করার জন্যই যেন দিনে দিনে ভালো অভিনয় করতে শিখি। সে আমার অভিনয় দেখে খুব প্রশংসা করত। কিন্তু হঠাৎ বাড়ি থেকে একখানা চিঠি পেয়ে সেই যে চলে গেল আর এল না। এখন কিভাবে এক পরিত্যক্ত অনাথা বিধবা দিন কাটাচ্ছে নিবিড় হতাশার মধ্যে তা দেখ নিজের চোখে।

অরেলিয়া বড় আবেগপ্রবণ। নিজের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই কেঁদে ফেলে। হঠাৎ সার্লো ঘরে এসে তার চোখে জল দেখে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছুরি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অরেণিয়া ঝড়ের বেগে সোফা থেকে উঠে গিয়ে সেটা কাড়ার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগল। অবশেষে সেটা কেড়ে নিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সার্লো বলল, একটা অভিনেত্রী কখনও ছোরা-ছুরি নিয়ে বাস করে না।

অরেলিয়া বলল, ছোরাটা দেখতে ধারাল এবং ভয়ঙ্কর বলেই সে খারাপ হবে তার কোনও মানে নেই।

সার্লো চলে গেলে অরেলিয়া উইলেমকে বলল, এখানে আমার মোটেই ভালো লাগে না। যে দলটা এসেছে তাদের কাউকে আমার ভালো লাগে না। আমার দাদার কাছে থাকতেও আর আমার ভালো লাগে না।

ওদিকে সার্লো ক্রমাগত তার দলের লোকদের অযোগ্যতার কথা বলতে থাকায় উইলেম নতুন করে তাদের অভিনয় শেখাতে লাগল। তবু এত কিছু সত্ত্বেও ওদের মন পেল না উইলেম। মেলিনা সহ দলের প্রায় সবই তখনও ক্ষুব্ধ তার প্রতি। একমাত্র লার্তেস ও ফিলিনা তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

আর একদিন সার্লোর খোঁজে এসে উইলেম অরেলিয়ার সঙ্গে দেখা করল তার ঘরে গিয়ে। উইলেম একা সোফার উপর বসল। অরেলিয়া বলল, কাল সন্ধ্যায় নাটক আর না। আজ সকালে আমি আমার ভূমিকা বুঝে নিলাম।

উইলেম বলল, তোমার প্রতিভা আছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার যৌবনসমৃদ্ধ। সুন্দর চেহারা ও প্রতিভা আছে। তুমি একদিন চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করবে জীবনে। অতীতের জন্য কিছু ভেবো না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অরেলিয়া বলল, আমরা নারীরা এমনই দুর্বল প্রকৃতির যে আমরা কাউকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের যৌবন সৌন্দর্য জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি সব তোমাদের মতো পুরুষদের পায়ে বিলিয়ে দিই। কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে সব সমৰ্পণ করি।

এই বলে ঘরের মধ্যে অশান্তভাবে পায়চারি করে বেড়াতে লাগল অরেলিয়া। এক সময় বলল, বুঝি বন্ধু, সব বুঝি। কিন্তু অতীতের চিন্তা-ভাবনা থেকে মনকে বিচ্ছিন্ন। করে নেওয়া যে কত কঠিন কাজ তা কি করে বোঝাব? আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না লোকটা আমাকে ত্যাগ করলেও কেন আমি তাকে ভালোবাসব না? কোন যুক্তিতে আমি তাকে ভালোবেসে যাব না তা সত্যিই বুঝতে পারছি না। ভাবতে গিয়ে মাথাটা আমার ঘুরে যায়। হ্যাঁ, তবু আমি ভালোবেসে যাব তাকে। যতদিন বাঁচব ভালোবাসব।

অরেলিয়ার একটা হাত ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল উইলেম। তাকে মেরিয়ানার কথাটা বলল। মেরিয়ানাও তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সঙ্গে। তবু সে নূতন উদ্যামে বুক বেঁধে কাজ করে চলেছে। একদিন সেও এমনকি করে ভেঙে পড়েছিল প্রথম প্রেমে ঘা খেয়ে। কিন্তু আজ আর সেকথা ভাবে না। অরেলিয়া বলল, তুমি কখনও কোনও মেয়েকে মিথ্যা বলে ঠকাওনি একথা জোর গলায় বলতে পার?

উইলেম শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, পারি। সে কথা বলার কোনও প্রয়োজন হয়নি। যে মেয়েকে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করতে পরব না তাকে আমি কোনওমতেই ভালোবাসা জানাব না। সে আমার ভালোবাসা পাবে না।

অরেলিয়া বলল, তাহলে হাজার মিথ্যাবাদী পুরুষের মাঝে তুমি একটা। তবে তোমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো?

উইলেমস তার একটা হাত ধরেই বলল, হ্যাঁ আছে। অরেলিয়া বলল, ঠিক আছে। আমি মেনে নিচ্ছি তোমার কথা।

এই বলে ডান হাত দিয়ে তার পকেট থেকে ছুরিটা বের করে উইলেমের একটা হাতের চাটু চিরে দিল সেই ছুরিটা ডগাটা দিয়ে। তারপর তার রুমাল দিয়ে তার হাতটা বেঁধে দিল। তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল উইলেমের হাত থেকে। উইলেম আশ্চর্য হয়ে বলল, একি করলে অলেরিয়া, তোমার হিতাকাক্ষী বন্ধুকে আঘাত করলে?

চুপ! তার একটা হাত দিয়ে উইলেমের মুখটা চেপে ধরল। তারপর ড্রয়ার থেকে ওষুধ এনে লাগিয়ে দিল। বলল, আমার মতো অর্ধপাগল এক নারীকে ক্ষমা করো। মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্তের জন্য দুঃখ করো না।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

কদিন ধরে অরেলিয়ার মাথাটা যেন বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। সে সব সময় হাহুতাশ করতে থাকে। তখন তাকে একটা নির্জন বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া সে একা একা থাকতেই ভালোবাসে। আর তিন বছরের ছেলে ফেলিক্স এ বাড়িতে রয়ে গল। মিগননের সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মিগনন তার দেখাশোনা করতে লাগল। মিগননের কাছে সে ভালোই থাকে।

সার্লো একটু গানের ভক্ত। সমস্ত দলের মধ্যে তাই দুজনকে বেশি পছন্দ করত। তারা হলো বৃদ্ধ বীণাবাদক আর মিগনান। লার্তেসও কিছু গল্প জানত বলে তাকেও ভালোবাসত।

একদিন হঠাৎ উইলেম বাড়ি থেকে ওয়ার্নারের লেখা একটি চিঠি পেল। চিটি খুলে দেখল তার বাবা মারা গেছে। হঠাৎ মাত্র কয়েক দিনের অসুখে অকালে মারা গেছেন তার বাবা। ওয়ার্নার লিখেছে সে তার বোনকে সান্ত্বনা দিচ্ছে এবং তাদের বাড়িতেই আছে। সুবিধাবাদী ধান্দাবাজ লোকেদের আনাগোনা চলেছে অনবরত। সুযোগ পেলই যা পাবে চুরি করে নিয়ে যাবে এটা-ওটা।

ওয়ার্নার আরও লিখেছে সে স্থায়ীভাবে তাদের পৈতৃক বাড়িতে বাস করতে আসেনি। তার বোনের সঙ্গে তার বিয়েটা হয়ে গেলেই তারা তার বাড়িতে চলে। আসবে। তার মাও তাদের বাড়িতে এসে থাকবেন। তখন তাদের বাড়িটা মোটা টাকায় বিক্রি করে দিয়ে সেই দিয়ে গ্রামাঞ্চলে এক বিরাট খামারবাড়ি কিনবে। তাদের ইচ্ছা তখন অর্থাৎ আজ হতে মাস ছয়েক পরে উইলেমই সে খামারবাড়ি দেখাশোনা করবে।

তার উত্তরে উইলেম লিখল ওয়ার্নারকে, তোমার চিঠিখানা সুলিখিত। এতে তুমি যথোচিত বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছ। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারলাম না। আমি যদি প্রভাবশালী কোনও সামন্তবংশের সন্তান হতাম তাহলে আমি ঘরে থেকেই আমার সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারতাম। আমার প্রতিভার সম্যক বিকাশ সাধন করতে পারতাম। কারণ সমাজের সর্বস্তরে রাজাদের মতো সামন্তদেরও প্রভাব প্রসারিত। কিন্তু আমি একজন সাধারণ ঘরের ছেলে। আমাকে অনেক অসুবিধা ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে আমার প্রতিভার বিকাশের জন্য কাজ করে যেতে হবে।

আমার জন্মগত প্রবৃত্তি ও প্রবণতাকে অবলম্বন করেই আমার ব্যক্তিসত্তার চরম উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে চাই। আমার সাধনায় সিদ্ধিলাভ না করা পর্যন্ত আমি কাজ করে যাব। আমার সাধনার উপযুক্ত পরিবেশ আমি এই বিদেশে খুঁজে নিয়েছি। তোমার চিঠি পাবার আগেই আমি আমার জীবনের লক্ষ্য ও কর্মপন্থা ঠিক করে ফেলেছি। আমি জানি আমার যা কিছু পৈতৃক সম্পত্তি আছে তা যোগ্য লোকের হাতেই আছে। শুধু মাঝে মাঝে প্রয়োজন হলে তোমার কাছ থেকে কিছু চাইব। তবে যতদূর মনে হয় আমার নিজের খরচ আমি এখন থেকে নিজেই চালিয়ে নিতে পারব।

চিঠিখানা পাঠিয়ে দিয়েই সার্লোর সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ল উইলেম। সার্লো অনেক আগে থেকেই তাপে চাপ দিচ্ছিল, এভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় না থেকে চুক্তিবদ্ধভাবে কিছু করা ভালো। উইলেম বলল, সার্লেই ম্যানেজার থাকবে। সার্লোর দলে থেকে সে অভিনয় করে যাবে এবং নাটকও লিখবে। উইলেম এ চুক্তির ফলে সবাই কাজ পেল। কিন্তু একমাত্র লার্তেস ছাড়া আর আর কেউ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল না, অথচ তারা এই চুক্তির জন্য কত প্রত্যাশা করেছে। তারা বলল, ফিলিনা উইলেমকে প্রভাবিত করে এই কাজ করিয়েছে।

যাই হোক, চুক্তিপত্রে সই করতে গিয়ে হঠাৎ উইলেমের মনে পড়ল সেই সুন্দরী অশ্বারোহিণীর কথা যার মুখ চকিতে একবার সেই বনভূমিতে শায়িত অবস্থায় আবিষ্ট। চেতনার মধ্য দিয়ে দেখেছিল, যার মুখখানা দেখতে অনেকটা কাউন্টপত্নীর মতো। ভাবতে ভাবতে অভিভূত হয়ে পড়েছিল উইলেম। সই করার পরেও কলমটা তার হাতে আটকে পড়েছিল যেন। যেন পাথরের মতো জমে গেলে তার হাতটা। পাশে থেকে মিগনন তাকে নাড়া না দিলে সে ওইভাবেই থাকত।

ঠিক হলো ওরা হ্যামলেট মঞ্চস্থ করবে। হ্যামলেটটা ইংরাজি ভাতা থেকে জার্মান ভাষায় নাটকের আকারে অনুবাদ করবে উইলেম। তবে সার্লোর মতে কিছু বাদ দিয়ে এখানকার দর্শকদের উপযোগী করে তুলতে হবে। অর্থাৎ বলতে পার গম পেষাই করে আটা বের করে ভূষিটাকে বাদ দিতে হবে।

উইলেম প্রথমে রাজি হতে পারল না। বলল, নাটকের ব্যাপারে গমের উদাহরণ খাটে না। বরং বলতে পারত গাছ। সব মিলিয়ে একটা গোটা গাছ; তার থেকে শাখা প্রশাখা, পাতা, কাণ্ড কিছুই বাদ দিতে পার না।

সার্লো প্রতিবাদ করে বলল, একটা আস্ত গোটা গাছ তো আর টেবিলের উপর উপস্থাপিত করতে পার না দর্শকদের জন্য। কিছু কাটছাঁট করতেই হবে।

উইলেম বলল, নাটকটা অনুবাদ ও সম্পাদনা কিসের ভিত্তিতে করব তা ভেবে ঠিক করে রেখেছি আমি। দুটো বিষয়ে আমাকে লক্ষ্য রেখে চলতে হবে। এক হলো। চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক আর অন্যটা হলো বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে চরিত্রের সম্পর্ক। এই সব ঘটনার মধ্যে লার্তেসের ফ্রান্সযাত্রা, তার প্রত্যাবর্তন, হ্যামলেটকে ইংল্যান্ড পাঠানো, ফোর্টিব্রাসের পোল্যান্ড অভিযান প্রভৃতি। আরও অসংখ্য ঘটনা আছে। কিন্তু এইসব ঘটনা এমনভাবে গ্রথিত হবে যাতে কেন্দ্রগত ঐক্য ব্যাহত না হয়, বিশেষ করে। নায়কের অনুপস্থিতিতে নাটকের কোনও বিশেষ নাট্য তাৎপর্য লাভ করতে না পারে। তবে আমি ঠিক করেছি ঘটনাগুলোকে এইভাবে সাজাব। হ্যামলেট হোরেশিওকে তার কাকার গোপন অপরাধের কথা খুলে বলতেই হোরেশিও তাকে পরামর্শ দিল তার সঙ্গে। নরওয়ে গিয়ে সেখানে হ্যামলেট সৈন্য সংগ্রহ করুক। তখন এক বিরাট সেনাদল নিয়ে ডেনমার্ক ফিরে এসে তার কাকার উপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে। হ্যামলেটও ধীরে ধীরে তার কাকা ও মার উপর অস্বাভাবিকভাবে বিরূপ হয়ে উঠবে। তখন রাজা। হ্যামলেটকে যুদ্ধজাহাজে করে নরওয়ে পাঠানো স্থির করলো। দুজন গুপ্তচর রোজেনক্রান্তস ও গিল্ডারস্টার্ন তার উপর কড়া নজর রাখবে। হ্যামলেটের প্রতিদ্বন্দ্বী। লার্তেস ফ্রান্স থেকে ফিরে এলে তাকেও পাঠানো হবে তার পিছনে। এরপর সমাধিক্ষেত্রে ওফেলিয়ার সমাধির কাছে লার্তেসের সঙ্গে দেখা হলো উইলেমের। রাজা তখন দেখল আর বেশি দূর এগোতে দেওয়া ঠিক হবে না। হ্যামলেটকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে দেওয়া হোক পৃথিবী থেকে। তারপরেই শুরু হলো সেই ভয়ঙ্কর ক্রীড়াপ্রতিযোগিতা লার্তেস আর হ্যামলেটের মধ্যে। তারপর চার-চারটে মৃতদেহের ছড়াছড়ি। দেখাতেই হবে। কোনও উপায় নেই।

সার্লো উৎসাহিত হলে বলল, ঠিক আছে। শেষ করে ফেলো।

উইলেমের অনুবাদের কাজ শেষ হয়ে যেতেই ভূমিকা বিতরণ শুরু হয়ে গেল।

উইলেম নিজে করবে হ্যামলেটের অভিনয়। তার অনেকদিনের ইচ্ছা। সার্লো করবে পলোনিয়াসের চরিত্রে অভিনয়। তারও এটা অনেক দিনের ইচ্ছা। অরেলিয়া নিল ওফেলিয়ার ভূমিকা। উইলেমকে এ বিষয়ে আগেই কথা দিয়েছিল সে। ফিলিনা করবে হ্যামলেটের মা অর্থাৎ রানির ভূমিকা। মুস্কিল হলো রাজা ক্লডিয়াস আর হ্যামলেটের বাবা মৃত রাজার প্রেতের ভূমিকা নিয়ে। সার্লো বলল, হাস্যরসিক বৃদ্ধ অভিনেতাকে দেওয়া হোক এই ভূমিকা। কিন্তু উইলেম প্রতিবাদ করল। লার্তেসকে দেওয়া হলো লার্তেসের ভূমিকা। এক নবাগত যুবককে দেওয়া হলো হোরেশিওর ভূমিকা।

সার্লো একবার বলল, রোজেনক্রান্তস আর গিল্ডারস্টার্ন চরিত্র দুটো বাদ দাও অথবা একটার মধ্যে দিয়ে সেরে দাও।

কিন্তু উইলেম বলল, এইসব ছোটখাটো চরিত্রের মধ্য দিয়ে শেকসপিয়ার মানব চরিত্রের অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। তাদের মতো ভীরু, তোষামোদকারী, মাথামোটা অথচ সাবধানী চরিত্র সমাজে খুব বেশি ঘোরাফেরা করে। এই ধরনের আরও দু-একটা চরিত্র থাকলে ভালো হতো।

ফিলিনা রানির ভূমিকা পেয়ে খুব খুশি। সে বলল, প্রথম স্বামীকে খুব ভালোবাসা সত্ত্বেও দ্বিতীয় একজনকে বিয়ে করা, এই তো? আমি এমনভাবে অভিনয় করব যাতে মনে হবে দরকার হলে তৃতীয় একজনকেও বিয়ে করতে পারি।

কথাটা শুনে রেগে গেল অরেলিয়া। সে আজকাল ফিলিনাকে মোটেই সহ্য করতে পারে না। সার্লো একসময় বলল, এটা দুঃখের বিষয় রানির দুটো নাচ নেই। প্রথম স্বামী ও দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে দুটো নাচ দিতে হবে।

সঙ্গে সঙ্গে ফিলিনা বলল, আমি যা সুন্দর নাচতাম না। আমার পায়ের পাতাগুলো দেখনি তো?

এই বলে পা দুটো ফিলিনা টেবিলের তলা থেকে বার করতেই সার্লো তার চটির প্রশংসা করতে লাগল। সে বলল, এ চটি কাউন্টপন্থী তাকে দিয়েছে। সকলের সামনেই আদর করে ফিলিনাকে জড়িয়ে ধরল সার্লো। অরেলিয়া রাগ করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

অন্য একদিন উইলেমের একটা কথায় রাগ করে অরেলিয়া। উইলেম সেদিন সার্লোকে বলেছিল, এখন যত হ্যামলেট পড়ছি ততই মনে হচ্ছে আমার চেহারার সঙ্গে হ্যামলেটের কোনো মিল নেই। ওরা নর্ম্যান, ডেনমার্কের লোক। ওদের চুল হবে কোঁকড়া।

সার্লো বলল, চেহারা যাই হোক, অভিনেতার কাজ হলো অভিনেয় চরিত্রকে যথাযথভাবে রূপ দান করা, ফুটিয়ে তোলা।

অরেলিয়াও তাই বলল। তাছাড়া দর্শকদের মনোভাবেরও একটা মূল্য আছে নাট্যরস আস্বাদনের ব্যাপারে। আমাদের যদি অভিনেতাকে দেখে মনে হয় অভিনেয় চরিত্রের সঙ্গে এ খাপ খেয়ে গেছে তাহলে সেটাই যথেষ্ট। সুতরাং অমতের কোনও কারণ থাকতে পারে না।

সার্লো বলল, আমাদের প্রম্পটার খুব ভালো নাটক পড়তে পারে। খুব ভালোভাবে প্রম্পট করতে পারে। একবার আমি আমার সংলাপ সব ভুলে গিয়েছিলাম মঞ্চের উপর। কিন্তু ও আমার মুখে সব কথা যুগিয়ে দিয়েছিল চমৎকারভাবে।

অরেলিয়া বলল, একবার ও কিন্তু প্রম্পট করতে গিয়ে আমার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল, তার কারণ ও আমার সংলাপ পড়তে গিয়ে আবেগে নিজেই অভিভূত হয়ে পড়েছিল। ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। তাই ঠিকমতো পড়তে বা কথা যোগাতে পারেনি আমায়।

সার্লো বলল, অভিনয় সম্বন্ধে ওর কিন্তু পুরো জ্ঞান আছে। সংলাপগুলো পড়ার সময় তোমার কণ্ঠের ওঠানামা কেমন হবে তা ও সব জানে। ওর পড়াটা এত ভালো যে, অভিনেতারা তার থেকে অনেক সাহায্য পায়।

উইলেম বলল, উনি তো নিজেও অভিনয় করতে পারেন। উনি মঞ্চে নামেন না কেন?

সার্লো বলল, ওর গলার স্বরটা ভারী মোটা আর চেহারাটাও ভালো নয়।

উইলেম বলল, কিন্তু রাজা ক্লডিয়াসের ভূমিকাটা তো ওঁকে দেওয়া যেতে পারে।

সার্লো সঙ্গে সঙ্গে কথাটা লুফে নিল। বলল, হ্যাঁ, এ-ই হচ্ছে উপযুক্ত লোক। তবে ভ্রাম্যমান নাট্যদলের নাটকাভিনয়ের সেই দৃশ্যটা বাদ দিতে হবে। এই প্রসঙ্গে অর্থাৎ সেই নাটকের প্রতিক্রিয়া হিসাবে রাজার যে সংলাপ আছে, সেটা কঠিন হবে ওর পক্ষে।

উইলেম বলল, এই ভ্রাম্যমান নাট্যদলের নাটকাভিনয়ের উপস্থাপনার পিছনে শেকসপিয়ারের একটা বড় উদ্দেশ্য আছে। কারণ এই নাটকের অভিনয় একদিকে যেমন হ্যামলেটের বিবেককে এক তীব্র খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দেয় তাকে, অন্যদিকে তেমনি রাজাকেও সচেতন করে দিল তার গোপন অপরাধ সম্বন্ধে। তাঁর বিবেককে আঘাত দিল। আমরা ওকে এ বিষয়ে শিখিয়ে-পড়িয়ে ভালো করে মেজে ঘষে নেব।

সার্লো বলল, তা না হয় হলো। কিন্তু প্রেতের ভূমিকাটা কাকে দেবে? ও বৃদ্ধের দ্বারা হবে না।

উইলেম বলল, বাইরে দু-একজন লোক প্রায়ই আসছে অভিনয় করার জন্য। তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিলেই হয়।

কিন্তু একদিন সন্ধেবেলা একটা মজার ব্যাপার ঘটল। কি করে কি হলো তা কেউ বুঝতে পারল না। উইলেম তার ঘরে ঢুকেই একটা খামের চিঠি পেল। তাতে লেখা আছে, আপনার হ্যামলেট মঞ্চস্থ করার জন্য শ্রম ও নিষ্ঠাসহকারে যেখাবে কাজ করে চলেছেন তাতে আমরা খুব খুশি। প্রেতের ভূমিকায় অভিনয় নিয়ে কোনও চিন্তা করার নেই। যথাসময়ে প্রেত আবির্ভূত হবে।

চিঠি যে কে লিখে পাঠিয়েছে তা কেউ বুঝতে পারল না। উইলেম সার্লোকে দেখাল। সার্লো অনেকক্ষণ দেখে এবং অনেক ভেবে বলল, আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা একথার উপর ঠিক নির্ভর করতে পারব কিনা।

সার্লো চলে গেলে অরেলিয়া উইলেমকে বলল, এ নিশ্চয়ই কার্লোর কাজ।

সেদিন সকালে প্রথম স্টেজ রিহার্সালে নেমে একটা কথা মনে পড়ে গেল উইলেমের। অতীতের এমনি কোনও এক সকালে তাদের শহরে এমনি এক রিহার্সালের সময় এই একই দৃশ্যপট সাজানো ছিল মঞ্চে। সে দৃশ্যেও ছিল চাষিদের ছোট ছোট কুঁড়ে। সেদিনের রিহার্সালের নায়িকা ছিল মেরিয়ানা। সেই সকালে মেরিয়ানা সর্বপ্রথম প্রেম নিবেদন করে তাকে। মঞ্চের ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল এক ফালি সূর্যের রশ্মি এসে মেরিয়ানার বুক আর কটিদেশকে আলোকিত করে তুলেছিল। উইলেমের কেবলি মনে হতে লাগল একটু পরেই যেন মেরিয়ানা এসে হাজির হবে মঞ্চে। পুরনো স্মৃতির ব্যথাভারে এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল উইলেম। যে সে তার অভিনয়ের কথা ভুলে গেল একেবারে। দুজন বাইরের শৌখিন অভিনেতার ডাকে চমক ভাঙল উইলেমের।

এই দুজন শৌখিন অভিনেতা হলো স্থানীয় দুজন যুবক। এরা তাদের দলের বেতনভুক্ত অভিনেতা নয়। তবে প্রায়ই আসে, তাদের রিহার্সাল দেখতে। তারা কিন্তু ভালো সমঝদার। তাদের রুচিবোধ ও রসবোধ আছে। তারা তাদের অভিনয় ও মঞ্চ পরিচালনা দেখে দোষত্রুটি সম্বন্ধে যে সব মন্তব্য করে তা একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। তার থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করার চেষ্টা করে সার্লো এবং উইলেম দুজনেই। এই যুবক দুজনের একজন নিছক নাট্যপ্রীতির খাতিরেই আসে তাদের কাছে। আর একজন মাদাম মেরিলার প্রতি আসক্ত।

যাই হোক, ওরা মোটের উপর দলের শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু। রিহার্সালের সময় ওদের উপস্থিতি খুবই উপকারে লাগে। বিদগ্ধ দর্শকের মতো ওরা সব কিছু খুঁটিয়ে দেখে, মুক্ত কণ্ঠে সমালোচনা করে। যেমন ওরা সেদিন বলল, কোনও বিয়োগান্ত নাটকে কোনও অভিনেতা হাত বেশি দোলাবে না। মেয়েরা তাদের হাত পোশাকের ভঁজের ভিতরে ঢোকাবে না। এটা ঠিক নয়। ওদের দ্বারা একটা উপকার হলো। যেহেতু হ্যামলেট অনেক তরোয়াল খেলা ও সামরিক দৃশ্য আছে, ওরা সেই সব অভিনেতাদের শেখাত। লার্তেস ও উইলেম দুজনেই ভালো করে তলোয়ার খেলাটা শিখে নেয়। বিশেষ উদ্যমের সঙ্গে ওরা আর একটা জিনিসের উপর জোর দিল। ওরা সব অভিনেতাকে বলল, কথাগুলো জোরে বলবে, মঞ্চ থেকে যাতে শ্রোতারা সব শুনতে পায়। সব কথা শুনতে না পেলে অভিনয় ভালো হলেও শ্রোতাদের ভালো লাগে না। এইভাবে যুবক দুজন উইলেমের মন জয় করে। উইলেম তাদের এক কোণে বসতে বলে।

অভিনয়ের যাবতীয় পোশাক আর দৃশ্যসজ্জার কাজ এগিয়ে চলতে লাগল। কোন দৃশ্যে কি কি থাকবে, কিভাবে দৃশ্য সাজানো হবে তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলো সার্লো আর উইলেমের মধ্যে।

হঠাৎ একসময় সার্লো অদ্ভুত একটা কথা বলল উইলেমকে। তুমি কি শেষ দৃশ্যে সত্যি সত্যিই হ্যামলেটকে মৃত দেখাতে চাও?

উইলেম বলল, তা না দেখিয়ে উপায় কি? নাটকের মূল পরিকল্পনাই তো এইভাবে হয়েছে।

সার্লো বলল, কিন্তু দর্শকরা তা চায় না।

উইলেম বলল, সাধারণ দর্শকদের মতে সব সময় চলতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তারা কি চায় না চায় সেটাকে সব সময় প্রাধান্য দিলে ভালো নাটক দেখাতে পারবে না। তারা অনেক সময় বাজে মিথ্যা আবেগে আপ্লুত হয়ে আনন্দ পেতে চায়।

সার্লো তবু থামলো না। বলল, যারা টাকা দেয় তাদের ভালো লাগা মন্দ লাগাটাও দেখত হবে বৈকি।

উইলেম বলল, ফেরিওয়ালারা যখন মিষ্টি ফেরি করে তখন তাদের ডাকে শিশুরাই ক্রেতা হিসাবে ছুটে যায় তাদের কাছে। বড় মানুষেরা তাদের কথায় ভোলে না। তুমি যদি ভালো জিনিস তোমার নাটকের মধ্যে পরিবেশন করো তাহলে দর্শকের মনে ধীরে ধীরে তাদের রুচিবোধ উন্নত হবে। তখন তুমি যে টাকা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছ তার দ্বিগুণ তারা দেবে।

প্রধান রিহার্সাল হয়ে গেল। চলল অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু কয়েকটা দৃশ্য ভালো জমল না। কারণ হ্যামলেটের বাবা মৃত রাজার ছবি সামনে না রাখার অথবা প্রেত না আসায় হ্যামলেট ও তার মার যৌথ অভিনয়ে কেউ কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। সার্লো আর বিশ্বাস করতে পারলো না। একটা উড়ো চিঠির উপর আর নির্ভর করে থাকা যায় না। প্রেতের ভূমিকা কাউকে বিলি করে দেওয়া হোক।

উইলেম বলল, আমাদের কোনও হিতাকাক্ষী নিশ্চয় একথা লিখেছে। তার কথা অবিশ্বাস করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।

তখন ঘরের মধ্যে দলের অনেকেই ছিল। ফিলিনা বলল, তোমরা শেকসপিয়ারের উপর অনেক খবরদারি করেছ। নাটকটি কাটছাঁট করেছ।

সার্লো আর উইলেম জানতে চাইল কোন জায়গাটা বাদ দেওয়া হয়েছে যার জন্য খারাপ লাগছে তার।

ফিলিনা তা স্পষ্ট করে বলল না। তা না বলে ও একটা গান করতে লাগল আপন মনে। কথা বলতে বলতে তখন রাত হয়ে গেছে অনেক। সবাই উঠে পড়ল। শুধু অরেলিয়া আর উইলেম বসে রইল। অরেলিয়া বলল, আমি ঐ মেয়েটাকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। ওকে দেখলেই আমার ঘৃণা হয়। ওর মাথার চুলগুলো কোঁকড়ানো বলে আমার দাদার একটা দুবর্লতা আছে ওর উপর। আর তোমাকে দেখেও কেমন যেন নরম মনে হয় ওর প্রতি। তুমিও ওকে বেশ একটু খাতির করে চলো যে খাতির পাবার কোনও যোগ্যতা নেই ওর।

উইলেম বলল, আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা ঋণী ওর কাছে। আমি কৃতজ্ঞ ওর কাছে। আসলে দোষ হচ্ছে যে পরিবেশে ও মানুষ হয়েছে সেই পরিবেশের। ওর স্বভাবগত চরিত্রটা খারাপ নয়।

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাগে আগুন হয়ে উঠল আরেলিয়া। বলল, তোমরা সব পুরুষই এক। নারীদের গুণাগুণ বিচার করার কোনও ক্ষমতাই নেই তোমাদের।

উইলেম বলল, তুমি কি আমাদের সন্দেহ করো? আমি যতক্ষণ ওর কাছে থাকি তার পূর্ণ বিবরণ দান করতে পারি।

অরেলিয়া অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলল, নাও, নাও, খুব হয়েছে। এখন দেবী হয়েছে। স্বর্গলোকের উজ্জ্বল পাখি আমার। যাও যাও খুব হয়েছে।

অরেলিয়া আর দাঁড়াল না। অরেলিয়া চলে গেলে কেমন ভারী হয়ে উঠল উইলেমের মনটা। তার মনের কথাটা ঠিক বোঝাতে পারল না অরেলিয়াকে।

পোশাক খুলে শুতে যাবার জন্য শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল উইলেম। কিন্তু ঘরের চৌকাঠের কাছে মেয়েমানুষের একজোড়া চটি দেখে থমকে দাঁড়াল। উইলেম বুঝতে পারল এ চটি ফিলিনার। ঘরের পর্দাটা উড়ছে। উইলেমের মনে হলো ফিলিনা তার শোবার ঘরে ঢুকে তার বিছানায় হয়ত শুয়ে আছে। এক নির্লজ্জ রসিকতায় মেতে উঠেছে যেন। উইলেম কড়া গলায় ডাকল, বেরিয়ে এস ফেলিনা, আমি এসব বাজে রসিকতা ভালোবাসি না।

কোনও সাড়া না পেয়ে পর্দাটা সরাতেই দেখল ঘরের ভিতর কেউ নেই। দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল উইলেম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। রাত্রে মোটেই ঘুম হলো না তার। চারদিকে খুঁজেও ফিলিনার দেখা পেল না। কিন্তু বুঝতেও পারল না কে এই নারী।

ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল উইলেম। অনেক বেলায় সার্লো এসে ডাকাডাকি করতে লাগল। বলল, কত কাজ আজ। আজ রাত্রেই নাটকাভিনয়।

সন্ধ্যার সময় নাটক শুরু হবার আগে উইলেম দেখল বেশ লোক হয়েছে। শ্রোতাদের বেশি ভিড় হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নাটক শুরু করলেও কিছুক্ষণ পরেই প্রেত এসে হাজির হলো কিন্তু তার মুখ ও সারা দেহ কাপড়ে ঢাকা থাকায় কেউ তাকে চিনতে পারল না। কেউ বুঝতে পারল না কে এইভাবে প্রেত সেজে তার পূর্ব প্রদত্ত পত্রগত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এসেছে।

হোরেশিও দেখিয়ে দিলে তার কথামতো প্রেতের দিকে কিছুটা এগিয়ে এল হ্যামলেট বেশী উইলেম। প্রেতকে ঠিক না চেনার এক অতিপ্রাকৃত রহস্যময় অনুভূতি গাঢ় হয়ে উঠল উইলেমের মনে। তার উপর সম্প্রতি তার পিতৃবিয়োগ হওয়ায় সেই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলো তার আপন হৃদয়ের অকৃত্রিম শোকানুভূতি। সব মিলিয়ে অপূর্ব হয়ে উঠল হ্যামলেটের অভিনয়। প্রেতও তার দীর্ঘ সংলাপটি ভালোভাবেই ব্যক্ত করল। স্বল্প ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘেরা শুভ্র বস্ত্রাবৃত প্রেতমূর্তি ও তার রহস্যময় সংলাপ এক চমৎকার অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি করল মঞ্চের উপর। অতিপ্রাকৃত হলেও বাস্তব সত্যের প্রতীতী জন্মাল দর্শকদের মনে। অভিভূত হয়ে গেল দর্শকরা। এই দৃশ্য শেষে হ্যামলেট যখন মঞ্চ ত্যাগ করে প্রস্থান করল তখন ঘন ঘন হাততালি দিতে লাগল দর্শকরা। এরপর সব অভিনেতাই উৎসাহ পেয়ে ভালো অভিনয় করল। সব মিলিয়ে অদ্ভুত সাফল্য লাভ করল নাটাকাভিনয়।

অভিনয় শেষে অভিনেতারা ঠিক করল আপন আপন নাটকীয় পোশাক পরেই। একসঙ্গে বসে নৈশভোজন করবে। খাওয়ার পর ওরা সবাই আনন্দ করতে লাগল। মেয়েরা গান করতে শুরু করল। সেই উন্নাসিক বৃদ্ধও বীণাবাদকের বীণায় একটা সুর বাজাতে লাগল। মাদাম মেলিনা এতদিন পর উইলেমের প্রতি এত গভীর শ্রদ্ধাসিক্ত আসক্তি দেখাতে লাগল। লার্তেস শিস দিতে লাগল মুখে। সার্লো মুখে বাজি ছোঁড়ার শব্দের অনুকরণ করতে লাগল। সমস্ত দলটার মধ্যে একবার অরেলিয়ায় চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে রইল। তারপর একসময় বলল, এবার ওঠা যাক।

ক্লান্ত হয়ে উইলেম তার ঘরে গিয়ে পোশাক ছেড়ে আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসছিল তার। কিন্তু হঠাৎ কিসের একটা মৃদু শব্দ হলো বিছানায়। সঙ্গে সঙ্গে কিছু বোঝার আগেই এক অদৃশ্য নারীর নরম দেহ জড়িয়ে ধরল তার দেহটাকে। তার মুখে তার ঠোঁট দুটো চেপে ধরল এমন জোরে যে উইলেম তা ঠেলে প্রথমে সরিয়ে দিতে পারল না।

কোনওরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে পোশাকটা পরতে গিয়ে সে দেখল ঘরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল এবং দরজাটা খোলা। ঘরের আলো জ্বেলে দেখে বিছানায় বা ঘরে কেউ নেই। তবে কে এই নারী! আশ্চর্য হয়ে ভাবতে। লাগল উইলেম। প্রথমে তার সন্দেহ হলো এ নিশ্চয় ফিলিনার কাজ। কিন্তু পড়ে দেখল। সে নয়। এদিকে-সেদিক তাকাতে বিছানার উপর দেখল একটা ওড়না পড়ে রয়েছে। তার মনে হলো এই ওড়নাটাই প্রেমূর্তির গায়ে জড়ানো ছিল। তার আঁচলের কাছে সেলাই করা একটা লেখা, এই প্রথম এবং শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি পালিয়ে যাও যুবক, পালিয়ে যাও।

এই লেখাটাতে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।

পরদিন সকালবেলায় ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল এরপর কোন্ নাটকের রিহার্সাল শুরু করবে আজ সন্ধে থেকে। অনেক আলোচনার পর ঠিক হলো, হ্যামলেটই অভিনীত হবে আবার। উইলেম তখন সতর্কবাণী খোদিত সেই রহস্যময় ওড়নার কথাটা বলল। তখনই ঠিক হলো প্রেতের ভূমিকা দলের কাউকেই দেওয়া। হবে। বাইরের কোনও লোককে প্রেতের ভূমিকা দেওয়া হবে না। এলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সার্লো বলল, আমাদের দলের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে এইভাবে ভয় দেখানো বরদাস্ত করব না আমরা।

প্রাথমিক আলোচনা ও কথাবার্তার পর সভা ভঙ্গ হতে আপন আপন ঘরে সবাই চলে গেল। হঠাৎ মিগনন ছুটে এসে উইলেমের ঘরে ঢুকে বলল, মালিক, মালিক, আগুন লেগেছে। শীগগির বেরিয়ে আসুন। অরেলিয়া একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে। তার ছেলে ফেলিক্সকে উইলেমের হাতে তুলে দিল। মিগননও তাকে বলল, আপনি ছেলেটাকে দেখুন। আমি অন্য সবাইকে দেখছি। এই বলে মিগনন ছুটে অন্যত্র চলে গেল।

উইলেম প্রথমে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। সে দেখল বীণাবাদক উপরতলা থেকে তার বীণা হাতে বেরিয়ে আসছে। ফেলিক্সকে বীণাবাদকের হাতে তুলে দিয়ে উইলেম আগুনের উৎসটা কোথায় তা দেখার জন্য খুঁজে বেড়াতে লাগল। পরে দেখল আগুনের উৎস এ বাড়িতে নেই। ধোঁয়াটা আসছে বাগানবাড়ির ওধার থেকে। কিন্তু উৎস যেখানেই থাক, আগুনটা ক্রমশ জোর হতে লাগল। তিন-চারটে বাড়ির কাঠের জিনিসপত্র এবং অনেক কিছু পুড়ে গেল। উইলেম পাড়ার লোকদের সাহায্যে অনেক কষ্টে আগুন নেভাল। এমন সময় মিগনন এসে উইলেমকে ব্যস্তভাবে ডাকাডাকি করতে লাগল, মালিক তাড়াতাড়ি এস, ফেলিক্সকে বুড়োটা মেরে ফেলবে। ও হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে।

মিগননের সঙ্গে বাগানবাড়িতে ছুটে গিয়ে উইলেম দেখল শুকনো কাঠ আর খড়ের গাদায় আগুন জ্বলছে। আর তার পাশে ফেলিক্সকে শুইয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বীণাবাদক তার বীণাটা ধরে রয়েছে। উইলেম গিয়ে বৃদ্ধকে বলল, এসব কি হচ্ছে?

মিগনন তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে তুলে নিয়ে চলে গেল। ছেলেটা তখন চিৎকার করে কাঁদছিল। বৃদ্ধ উইলেমের কথার কোনও উত্তর দিল না। তাকে আর কিছু না বলে তাদের বাড়িটায় চলে এল সে। তার ট্রাঙ্কটা কোনওরকমে রক্ষা পেয়েছে। তবে কাপড় জামা অনেক পুড়ে গেছে। গোটা বাড়িটার ঘরগুলো থেকে ধোঁয়া বার হচ্ছিল।

মিগনন উইলেমকে দেখতে পেয়ে বলল, মালিক, আজ একটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি আমরা। মৃত্যুর কবল থেকে কোনওরকমে বেঁচে গেছে ফেলিক্স। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আসল ব্যাপারটা জানতে পারল অবশেষে। মিগননের হাত থেকে লণ্ঠনের আলো দিয়ে খড়ের গাদায় বুড়ো বীণা-বাজিয়েটাই আগুন লাগায়। তারপর ছেলেটাকে পাশে ফেলে তার গলাটা ছুরি বার করে কাটতে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন ছেলেটাকে উৎসর্গ করতে যাচ্ছে সে। এমন সময় মিগনন তা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে লোক ডাকে। ছেলেটাকে কেড়ে নিয়ে অন্যত্র সরিয়ে রেখে উইলেমকে ডেকে আনে।

কিন্তু আগুনের জন্য তখন এ বিষয়ে আর মন দিতে পারল না উইলেম। সারাটা রাত কেটে গেল আগুন নেভাতে গিয়ে। তখন সকাল হয়ে গেছে। কনকনে শীতে কাঁপছিল সবাই। আগুন নিভে গেলেও ঘরগুলো গরম ছিল। জিনিসপত্র বেশ কিছু পুড়ে গেলেও মানুষজনের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে ঘরগুলোর কিছু কিছু ক্ষতি হওয়ায় উইলেম আপাতত বাগানের মধ্যে যে বাড়িটা খালি ছিল সেখানে গিয়ে উঠল। বৃদ্ধ বীণাবাদককে আর দেখা গেল না। কেউ তার খোঁজও করল না।

সেই দিনই বেলা দশটার সময় সার্লো দলের সবাইকে ডাকল। বলল, রিহার্সাল হবে হ্যামলেটের। আজ রাত্রেই আবার অভিনয় হবে। বিশেষ করে যে সব দৃশ্যে নূতন লোক ভূমিকা গ্রহণ করছে।

আজকের রাত্রিতে নাটকের অভিনয় নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু বাদানুবাদ হয় সার্লোর। নগর কর্তৃপক্ষ ও জেলাপ্রশাসক বললেন, এত বড় অগ্নিকাণ্ডের পর নাট্যানুষ্ঠান দিনকতক বন্ধ থাক।

সার্লো বলল, প্রথম কথা, আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নাটক করে তা পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয় কথা, এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে দলের লোকের মনমেজাজ খুব খারাপ। নাটকের অভিনয় আবার সেই মনকে খুব তাড়াতাড়ি আনন্দ দান করে গরম করে তুলতে পারে।

অবশেষে অনুমতি পায় সার্লো। নাটকের ঘোষণা শুনে দর্শকদেরও বেশ ভিড় হয়। প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হয়ে যায়। তবে আজকের দর্শকরা প্রায় সব নূতন। তাই তারা গতকালের অভিনয়ের সঙ্গে আজকের অভিনয়ের গুণগত মানের কোনো বিচার করে দেখতে পারল না। মোটের উপর নির্বিঘ্নেই কেটে গেল নাটকের অভিনয়।

অভিনয় শেষে ফিলিনা তাকে একটু ধাক্কা দিয়ে কি বলল বুঝতে পারল না উইলেম। হঠাৎ সেদিনকার কথাটা মনে পড়ে গেল তার। ফিলিনার সেই চটিজোড়াটা যেটা সরিয়ে রেখেছিল সে তা পুড়ে গেছে। তার ঘরের সেই দরজাটাও পুড়ে গেছে। যাই হোক, বাগানবাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল উইলেম। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল বাগানে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। ফিলিনা যা বলল তাতে মনে হলো ও রাত্রিতে তার কাছে আসবে। কিন্তু উইলেমের মনে হলো ও না এলেই ভালো হয়। তবে তার কাছ থেকে কয়েকটা কথা জানতে চায় সে।

বাগানবাড়ির ভেতর থেকে বীণাবাদকের গলার স্বর ভেসে আসতেই থমকে দাঁড়াল উইলেম। বাড়ির সদর দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। তার চাবি তার কাছে। হঠাৎ চোখে পড়ল তার বীণাবাদক তার হাতের বীণাটা নিয়ে ভেতর থেকে দরজার কাছে এসে দরজা বন্ধ করে পাঁচিল টপকাতে যাচ্ছে। উইলেম বাইরে থেকে বাধা দিল। নিজের হাতে দরজাটা খুলে বাড়ির ভিতরে ও বৃদ্ধকেও জোর করে ঢুকিয়ে দিল। বৃদ্ধ বলল,

আমাকে ছেড়ে দাও। আমি চিরদিনের মতো চলে যাব এখান থেকে।

উইলেম বলল, তুমি বাগানবাড়ি থেকে চলে যেতে পার কিন্তু শহর থেকে পালাতে পারবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সব জেনে গেছেন। তোমাকে খুঁজছে অনেকে।

বাড়ির ভিতর থেকে জোর করে বৃদ্ধকে নিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।

উইলেম বুঝতে পারল মস্তিষ্কের বিকৃতির জন্য এই জঘন্য কাজ করে ফেলেছে বৃদ্ধ বীণাবাদক। তাই ভাবতে লাগল কি করা যায় ওকে নিয়ে। এমন সময় লার্তেস এসে তাকে একটা খবর দিল। লার্তেস বলল, আমি কিছুক্ষণ আগে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করে জানলাম তারও বিষাদের অত্যধিক চাপ থেকে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছিল। কিন্তু এক গ্রাম্য যাজক তা সরিয়ে দিয়েছে।

সেই যাজকের খোঁজ নিয়ে বৃদ্ধকে সেখানেই পাঠিয়ে দিলে উইলেম। তার আগের বীণাটা পুড়ে যাওয়ায় আবার তাকে একটা বীণা কিনে দেওয়া হয়। সেই বীণাটা তার সঙ্গেই দেওয়া হলো।

এদিকে ফিলিনার হাবভাবটা কেমন হয়ে উঠছিল দিনে দিনে। সমগ্রভাবে দল ও দলের লোকজনদের প্রতি তার একটা অনাসক্তি গড়ে উঠেছিল যেন দিনে দিনে। ফিলিনা অন্য একটা ঘর ভাড়া করে উঠে গিয়েছিল। সে থাকত এলমিরা নামের একটি লোকের সঙ্গে। সে সার্লোর কাছে খুব কম আসত। এত অরেলিয়া বিশেষ খুশি হয়। কিন্তু সার্লো মাঝে মাঝে তার কাছে যেত। তার প্রতি একটা দুর্বলতা তখনও ছিল। একদিন সার্লো উইলেমকে নিয়ে ফিলিনার বাড়ি গেল তার সঙ্গে দেখা করতে।

ওরা গিয়ে দেখল, ফিলিনা একজন যুবক অফিসারের সঙ্গে বসে রয়েছে ভিতরকার ঘরে। বাইরের ঘরে সার্লো আর উইলেম বসতে ফিলিনা একবার ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। সার্লো এবং উইলেম দুজনেই বলল, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ, আমরা একটু আলাপ করতে চাই।

ফিলিনা বলল, আসলে উনি একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা। বিশেষ কারণে উনি আমার কাছে পুরুষ সেজে আছেন।

উইলেম বলল, আমি একবার দেখা করতে চাই ওঁর সঙ্গে। ওঁর নাম কি?

ফিলিনা বলল, তা বলব না। আমি প্রথম ওঁকে জানাব। ওঁর মত হলে আমি তোমাদের খবর দেব। তখন এসে আলাপ করবে।

উইলেমের একবার মনে হলো, মেয়েটি হয়ত তার মেরিয়ানা। অনেকটা তার মতো দেখতে। তবে মেরিয়ানার থেকে একটু লম্বা মনে হলো।

কিন্তু দুই-একদিনের মধ্যেই দল ছেড়ে জায়গাটা ছেড়ে চলে গেল ফিলিনা। তার বাড়িওয়ালার কাছে শুনল। সেই যুবক অফিসারের সঙ্গে ফিলিনা তার সব ভাড়া ও দেনা মিটিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আর আসবে না। কোথায় গেছে তা কেউ জানে না।

ফিলিনার এই আকস্মিক অন্তর্ধান দলের লোকদের মধ্যে এমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারল না। সার্লোও ব্যাপারটা সহজভাবে মেনে নিল। তার জায়গায় অভিনয়ের জন্য অন্য মেয়ের ব্যবস্থা করল।

ফিলিনা ছিল দলের মধ্যে এক সংযোগসূত্র। দলের বিভিন্ন লোকের মধ্যে যেটুকু ফাঁক থাকত হাসিখুশি দিয়ে তা ভরিয়ে তুলত ফিলিনা। ফিলিনা চলে যেতে কেমন যেন শিথিল হয়ে উঠল পারস্পরিক যোগসূত্র। ফিলিনা উইলেম আর সার্লো দুজনকেই খুশি রাখত। অরেলিয়ার সব বিতৃষ্ণা ও বিরক্তি নীরবে সহ্য করত। কেউ কোনও বিষয়ে রেগে গেলে তা মতান্তর দেখা দিয়ে তাকে বোঝাত। তাই প্রথম প্রথম ফিলিনার অভাবটা বোঝা না গেলেও ক্রমে তা সবাই অনুভব করতে লাগল।

ফিলিনা চলে যাবার পর অরেলিয়ার জ্বর হতে লাগল, মেজাজটাও খিটখিটে হয়ে। উঠল। একদিন উইলেম তার কাছে ফরাসি ভাষায় একটা লেখা পাঠ করতে গিয়ে বেশ বকুনি খেল। অরেলিয়া বলল, যে লোকটা আমাকে ঠকিয়ে চলে যায় সে ফরাসি ভাষায় কথা বলত। সেই থেকে ফরাসি ভাষা শুনলেই লোকটাকে মনে পড়ে। আমার মাথায় নূতন করে আগুন জ্বলে যায়।

উইলেম হঠাৎ একদিন এর মাঝে বীণাবাদকের খবর নিতে গেল সেই গ্রামে। যাজকের কাছে যেতেই উইলেম দেখল বৃদ্ধ বীণাবাদক একটি ছেলেকে বীণা বাজানো শেখাচ্ছে। যাজক বললেন, মানুষের বিক্ষিপ্ত ব্যথাহত ও হতাশাগ্রস্ত মনকে যদি কোনও সৃষ্টির কাছে নিয়োজিত করতে পারা যায় এইভাবে তাহলে সে কখনই উন্মাদ হতে পারে না। আবার অনেক উন্মাদ ব্যক্তিকেও এইভাবে সারিয়ে তোলা যায়।

কথা বলতে বলতেই ডাক্তার এলেন। উইলেম আলাপ করল তার সঙ্গে। ডাক্তার কথা প্রসঙ্গে বললেন, আরও দুটি কেস আমি পেয়েছি। এই দুটি কেসেই দেখা যায় এক গম্ভীর হতাশা আর বিষাদ থেকে এই উন্মাদ ভাব গড়ে উঠেছে। এঁরা দুজনেই কোনও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের স্বামী-স্ত্রী। এক কাউন্ট ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের কোনও সন্তানাদি নেই। এদের বয়স কম। একবার এই কাউন্ট শিকারের ব্যাপারে দু-এক দিনের জন্য বাইরে যান। তখন বাড়ির লোকজনেরা তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে এক যুবককে কাউন্টের পোশাক পরিয়ে তাঁর শোবার ঘরে বসিয়ে রাখে। তারা ভাবে কাউন্টপত্নীকে এইভাবে ঠকিয়ে বেশ মজা করবে। কিন্তু আসলে আমার মনে হয় তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কাউন্ট ও কাউন্টপত্নীকে হেয় প্রতিপন্ন করে পরিবারের উপর কলঙ্ক আরোপ করে। কাউন্ট ঐ সময় হঠাৎ ফিরে এসে তার শোবার ঘরে তার বেশে এক যুবককে বসে থাকতে দেখে আতঙ্গগ্রস্ত হয়ে অন্য ঘরে চলে যান। তাঁর ধারণা হয় তিনি নিজেই প্রেতাত্মাকে দেখেছেন অর্থাৎ তার মৃত্যুর সময় আর বেশি দিন বাকি নেই। এখন কাউন্ট ভদ্রলোক তার বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়-পরিজন কারও সঙ্গে মেশেন না।

উইলেম রুদ্ধশ্বাসে সব শুনে বলল, আর তাঁর স্ত্রী?

ডাক্তার বললেন, স্ত্রীর মানসিক অবস্থা আরও খারাপ। তিনি আরও বেশি পরিমাণে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঐ যুবকটি প্রাসাদ থেকে চলে যাবার সময় তাঁর কাছে যখন বিদায় নিতে যায় তখন তার প্রতি তার গোপন আসক্তির কথাটা প্রকাশ করে ফেলেন কাউন্টপত্নী। তখন যুবকটি সাহস পেয়ে কাউন্টপত্নীকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করে। কাউন্টপত্নীর বুকের কাছে তাঁর স্বামীর একটা ফটো ছিল। আবেগের বশে যুবকটি কাউন্টপত্নীর বুকের উপর চাপ দিতে গিয়ে ফটোটা ভেঙে ফেলে। তাতে তার বুকের কাছটা সামান্য একটু হয়ত ছিঁড়ে যায়। আসলে আমি ডাক্তার হিসাবে বলছি তাতে তার দেহের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবু তার ধারণা সেই ক্ষতটা বেড়ে উঠছে দিনে দিনে এবং শীঘ্রই সেটা এক দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে পরিণত হয়ে তাঁর যৌবনসৌন্দর্যকে চিরতরে নষ্ট করে দেবে।

আর শুনতে পারল না উইলেম। চোখে-মুখে হাত দিয়ে এক সকরুণ অসহনীয়তাকে প্রকাশ করে অকস্মাৎ চলে গেল সে। অবাক হয়ে তার পথপানে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার। উইলেম ভাবতে লাগল এই পারিবারিক দুর্ঘটনার জন্য সেই হচ্ছে একমাত্র দায়ী। তারই জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এক সুখী দম্পতির সুন্দর জীবন।

ফিরে এসে উইলেম দেখল অরেলিয়ার অসুখটা বেড়ে উঠেছে। তার ইচ্ছা ছিল অরেলিয়াকে সেই মনের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে দেখাতে। কিন্তু দেখল আর তা সম্ভব নয়। তাছাড়া অরেলিয়া যাবে না। তার জ্বর বেড়ে গেছে। মেজাজটা আরও খিটখিটে হয়ে উঠেছে। আজকাল সার্লো আর বেশি খোঁজখবর নেয় না তার। ফিলিনা চলে যাওয়ার পর হাস্যরসিক বৃদ্ধ অভিনেতার দুই কন্যার একজন এলমিরার উপর

অত্যধিক আসক্ত হয়ে উঠেছে সে। এলমিরা শেষের দিকে ফিলিনার কাছেই থাকত।

এদিকে উইলেমের অনুপস্থিতিতে মেলিনা এক চক্রান্ত করে বসেছে। সে অনেক বুঝিয়ে সার্লোকে হাত করে। সে বলে এই থিয়েটার ছেড়ে এক নূতন অপেরার দল গড়ে তোলা যাক। উইলেমের হাত থেকে পুরো কর্তৃত্বভাব সার্লো নিয়ে নিক। তাতে লাভ বেশি হবে আর জনপ্রিয়তাও তাড়াতাড়ি বেড়ে যাবে।

একদিন সেই অপেরায় খুব প্রাণ দিয়ে অভিনয় করল অরেলিয়া। ভূমিকাটা খাপ খেয়ে গিয়েছিল তার ব্যথাহত ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে। আবেগটা একটু বেশি প্রকাশ করে ফেলল সে। তবু তা দর্শকদের ভালো লাগল। স্বাভাবিক মনে হলো। ফলে প্রচুর হাততালি পেল। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় এত পরিশ্রম তার সইল না। অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগল তার অভিনয় শেষ হবার পর থেকেই।

অরেলিয়া উইলেমকে ডেকে পাঠাল। ফেলিক্স তার কাছে বারবার আছে। মিগনন তাকে খুব ভালোবাসে। অরেলিয়া উইলেমের হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল, আমরা। অবিশ্বস্ত বন্ধুর হাতে এটা পৌঁছে দেবে। আমি আর বেশিক্ষণ বাঁচব না। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে সে এলে ওকে আমি শেষবারের মতো আলিঙ্গন করব। আর আমি তার আগেই মরে গেলে তাকে তুমি সান্ত্বনা দেবে। বলতে আমি তাকে ক্ষমা করেছি। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।

হঠাৎ মেজাজটা অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে উঠল অরেলিয়ার। এতটুকু বিরক্তি বা অসহিষ্ণুতার ভাব নেই। কোনও রোগযন্ত্রণা বা দুর্বলতার চিহ্নও নেই।

পরদিন নিয়মিত খবর নিতে গিয়ে উইলেম দেখল অরেলিয়া আর নেই। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেই তার অবিশ্বস্ত বন্ধুর উদ্দেশ্যে আপন প্রতিশ্রুতি অনুসারে রওনা হলো উইলেম। অরেলিয়া তার মনের কথা আত্মজীবনীমূলক একটি রচনায় সব লিখে যায়। সেটা উইলেম পড়ে দেখে। লেখাটা ভালোই হয়েছে। উইলেম ঠিক করল লোকটার দেখা পেলে সে প্রচুর ভর্ৎসনা করবে তাকে। আসলে তার হৃদয়হীনতাই অরেলিয়ার অকালমৃত্যুর কারণ হলো। ফেলিক্সকে মিগননের কাছে রেখে একদিন সকালে তার বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল উইলেম।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

অরেলিয়ার স্বীকারোক্তি

আট বছর পর্যন্ত আমার স্বাস্থ্যটা ভালোই ছিল। কিন্তু এই সময় একবার নয় মাস কাল শয্যাগত হয়ে থাকতে হয় আমাকে এক কঠিন রোগে। এই দীর্ঘ রোগভোগ কালেই আমার আজকের এই মানসিকতার ভিত্তি রচিত হয়। তারপর থেকেই শরীরটা আবার ভেঙে পড়ে। জ্বর, সর্দি প্রায়ই হতো।

যতক্ষণ দেহে আমার রোগ থাকত আমি চুপ করে নীরবে থাকতাম বিছানায়। আমার সহ্যশক্তি বেড়ে গিয়েছিল দিনে দিনে। কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি পাগলের মতো জীবনকে উপভোগ করতে চাইতাম। হাতের কাছে যা কিছু আনন্দের উপকরণ হিসাবে পেতাম তাই অপরিসীম আগ্রহে ও আকুলতায় জড়িয়ে ধরতাম। বাবা আমাকে অনেক পুতুল ও ছবির বই এনে দিতেন। তিনি নিজে অবসর সময়ে বাইবেলের কাহিনী শোনাতেন। তবে আর একটু বড় হলে পুতুল ও ছবিগুলো প্রাণহীন মনে হলো আমার। কাছে। আমার দৃষ্টি পড়ল তখন পোষা কুকুর, পাখি প্রভৃতির উপর যাদের ভালোবাসলে ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়া যায়।

বছর খানেক পরে সেরে উঠলাম আমি। আমার হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পেলাম। কিন্তু বালসুলভ এক উচ্ছলতা উবে গেল আমার প্রকৃতি থেকে। বয়স অনুপাতে কেমন যেন বেশি গম্ভীর হয়ে উঠলাম। এরপর কিছু বইপত্রও পড়লাম। তাদের মধ্যে ছিল ক্রিশ্চান জার্মান হার্কিউলেস, লি রোমান অক্টেভিয়া প্রভৃতি আরও কত কি। পড়ার সঙ্গে রান্নাও শিখতাম মার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে শিখতে লাগলাম ফরাসি ভাষা, চিত্রশিল্প আর নৃত্য। আমাকে ফরাসি ভাষা শেখাবার জন্য একজন গৃহশিক্ষক ছিলেন। তার শেখাবার কৌশলটা ছিল বড় চমৎকার। বড় হৃদয়গ্রাহী। তিনি যতক্ষণ থাকতেন বড় ভালো লাগত আমার। আবার কখন আসবেন তার জন্য মুহূর্ত গণনা করতাম আমি।

একবার এক নাচের আসরে দুটি সুদর্শন যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। তখন আমার বয়স তের কি চোদ্দ। ছেলে দুটি ছিল ভাই। একজন আমার সমবয়সী আর একজন আমার থেকে দু বছরের বড়। তারা দুজনেই দেখতে ছিল ভারি সুন্দর। তাদের আমার খুব ভালো লাগত। আমি তাদের সঙ্গে নাচতে ভালোবাসতাম। তাদের সঙ্গে নাচবার জন্য আমি যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করতাম। একবার বড় ভাইয়ের অসুখ করে। আমাকে তারা বাড়িতে ডেকে পাঠায়। আমাকে দেখে অসুস্থ ছেলেটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আমার প্রতি তার এক ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই আমি। তখন থেকে তাদের দুজনের মধ্যে তাকেই ভালোবাসতে থাকি আমি। তার শরীরটা রোগা এবং প্রায়ই সে ভুগত বলে তার জন্য প্রার্থনা জানাতাম আমি ঈশ্বরের কাছে। কিন্তু তাতে ছোট ভাই রেগে যেত।

ঠিক এই সময় একদিন বাবা তাঁর এক পরিচিত যুবককে বাড়িতে নিয়ে এলেন। যুবকটি ভালো চাকরি করত বৈদেশিক বিভাগে। এক সান্ধ্য আড্ডায় তার সঙ্গে রোজ দেখা হতো বাবার। সেইখানেই আলাপ। তার কথাবার্তা ও আচরণ বেশি মিষ্টি লাগল আমার। বাবাও তার প্রায়ই প্রশংসা করতেন। একদিনকার এক ঘটনায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম আমরা দুজনে। যুবকটির নাম ছিল নার্সিস।

একদিন কোনো এক বাড়িতে এক সান্ধ্য ভোজসভায় আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। এই ধরনের ভোজসভায় আমার যেতে মোটেই মন সরত না। আমাদের সমাজে লোকদের মোটেই ভালো লাগত না আমার। কারণ তাদের মধ্যে কোনও সংস্কৃতিবোধ ছিল না। বিজ্ঞান বা কলাবিদ্যা কোনওটার প্রতিই ঝোঁক ছিল না তাদের। তারা শুধু পশুর মতো খেতে আর ফুর্তি করতে জানত। হৈ-হুঁল্লোড় করে আমোদ-আহ্লাদের প্রতি তাদের প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমার নিজের সমাজের প্রতি অনীহার যে ফাঁক বা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল আমার মনে নার্সিস তা পূরণ করে দিয়েছিল।

আমার বোনরা গেলেও এই সান্ধ্য ভোজের আসরে আমি গেলাম না। কিন্তু যখন শুনলাম নার্সিসও সেখানে নিমন্ত্রিত হয়েছে এবং যাবে তখন না গিয়ে পারলাম না। গিয়ে দেখি সবাই খুব মদ্যপান করছে। ফরফিট’ খেলা চলছে। ওই খেলায় হারলেই তাকে জরিমানা দিতে হয়। নার্সিস হারলে তার জরিমানা স্বরূপ একটা শাস্তি দেওয়া হয় তাকে। সে উপস্থিত প্রত্যেকের কানে কানে একটা করে মিষ্টি কথা বলে বেড়াবে। নার্সিস তাই করতে শুরু করে দিল। কোনও এক ক্যাপ্টেনের এক সুন্দরী স্ত্রী ছিল। সেই মহিলার কানে মিষ্টি কথা বলতে গিয়ে অনেকক্ষণ তার গা ঘেঁষে কানে মুখটা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নার্সিস। এতে তার স্বামী ক্যাপ্টেন খুব রেগে গেল। রেগে গিয়ে এক ঘুষি মেরে দিল নার্সিসকে। তারপর দুজনেই তারবারি বার করল খাপ থেকে। কিন্তু নার্সিস তা বার করার আগেই ক্যাপ্টেন তার পিঠে, মাথায় ও হাতে তরবারির ঘা বসিয়ে দিল। নার্সিসের গা থেকে রক্ত পড়তে লাগল। তাকে নিয়ে আমি সেই বাড়িরই একটা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। ক্যাপ্টেনকে ওরা শান্ত করল। তারপর ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে দিল নার্সিসকে। কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ল সে। তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। আঘাতের জন্য জ্বর এসে গেল।

কথাটা শুনে আমার বাবা খুব রেগে গেলেন। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ডুয়েল লড়ে তাকে আহত করলেন। এদিকে নার্সিস সেরে উঠতে মাস দুই লাগল। সেরে উঠতেই আমাদের বাড়ি এসে প্রথমে আমাকে ধন্যবাদ জানাল যেন আমিই তার একমাত্র উদ্ধারকারিণী।

এরপর থেকে প্রায়ই সে আমাকে তার প্রেমের কিছু কিছু নিদর্শন পাঠাত। মাঝে মাঝে আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হতো। তবে আমাদের মেলামেলার মধ্যে কোনও উত্তাপ বা উচ্ছ্বাস ছিল না। আমি আমার মনের কথা কারও কাছে বলতে পারতাম না। স্বভাবতই এই সময় প্রায়ই ঈশ্বরের কথা ভাবতাম। আমার স্বাস্থ্য ও দেহগত কান্তি ফিরে পাওয়ার জন্য প্রায়ই ধন্যবাদ জানাতাম তাকে।

বসন্তকাল আসতেই একদিন খবর না দিয়ে হঠাৎ আমার কাছে এসে হাজিল হলো নার্সিস। আমি তখন আমার ঘরে একা ছিলাম। সে এল এবার পূর্ণ প্রেমিকের বেশে। আমাদের ভালোবাসাবাসির ব্যাপারে সে খোলাখুলিভাবে আমার মত চাইল।

তার প্রতি আমার কিছুটা শ্রদ্ধা ও আসক্তি থাকলেও তাকে আমার সম্পূর্ণরপে নির্ভরযোগ্য বলে মনে হলো না। তবু আমি সরাসরি তাকে প্রত্যাখান না করে আমার বাবা-মার মত নিতে বললাম। সে বাবাকে বুঝিয়ে বলল। বাবা আমার মত চাইলেন। আমি চুপ করে রইলাম।

যাই হোক, এইভাবে আমাদের প্রেম পারিবারিক সমর্থন লাভ করল। কিন্তু আমার অমতে বিয়ে হলো না। নার্সিসকে আমি সত্যিই ভালোবাসতাম। আমার বেশভূষযার সকল পরিপাট্য, আমার নৃত্যের সমস্ত ছন্দ তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। আমি তাকে খুশি করার জন্য এসব করতাম। কোনও ভোজসভায় সে না গেলেও আমিও যেতাম না। তবু দেহ-মনের ব্যবধানটা আমাদের মাঝে সমানেই রয়ে গেল। এতে নার্সিসের অমত ছিল। তা থাকাই স্বাভাবিক। তবু আমার জেদ। দেহসংসর্গহীন কামগন্ধহীন এক মহৎ প্রেমের বায়বীয় ভাবাদর্শে মত্ত হয়ে উঠেছিলাম আমি যেন মনে মনে।

আমি বই পড়তে ভালোবাসতাম। বেশির ভাগ সময় একটা একা থাকতে চাইতাম। নার্সিস প্রায়ই আমার জন্য বিভিন্ন রকমের বই নিয়ে আসত। নানা বিষয় আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করত। আমি কিন্তু আমার মনের কথা বেশি প্রকাশ করতাম না। এই সময় আমাদের পাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এসে বাস করতে থাকে। কোনও কাউন্টের পরিবার। উঁচু মহলে তাদের যোগাযোগ। ক্রমে আমি তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলাম।

সরকারি বিভাগে এক সময় কিছু ভালো পদ খালি হলো। তাতে নার্সিস ঢোকার জন্য অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু পরে দেখা গেল তার থেকে অযোগ্য ব্যক্তি সে পদ পেয়ে গেল। তার সঙ্গে আমিও কিছুটা হতাশ হলাম। তবু তাকে সান্ত্বনা দিলাম।

আমাদের মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে শহরের চারদিকে কথা উঠতে লাগল। আমার সুনাম জড়িয়ে আছে এ কথার মধ্যে। আমি আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলার জন্য চাপ দিলাম নার্সিসের উপর।

কিন্তু নার্সিস স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে ভালো চাকরি না পাওয়া পর্যন্তক আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। তবে চাকরি পেলেই বিয়ে করবে। আমি বাড়িতে জানিয়ে দিলাম আমাদের বিয়ের ব্যাপারে সব ঠিক হয়ে আছে। তার জন্য ভাবতে হবে না। মাস নয়েকের মধ্যে নার্সিস চাকরি পেয়ে গেল। এবার নার্সিস এসে আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করল। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে এমন এক শর্ত জুড়ে দিল যা মানা সম্ভব হলো

আমার পক্ষে। নার্সিস বলল, তার স্ত্রী হিসাবে আমার কোন গোঁড়া মতবাদ পোষণ করা চলবে না। অর্থাৎ তার মতে চলতে হবে। আমার নিজের মত সব ব্যাপারে জাহির করা চলবে না। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে জানিয়ে দিলাম আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। নার্সিস তখন বিদায় নিল আমার কাছ থেকে চিরদিনের জন্য। পরে বিয়ে হয় ওর। সুখে ঘর-সংসার করতে থাকে। আমার কাছেও বিয়ের জন্য অনেক ভালো ভালো। প্রস্তাব আসতে লাগল। কিন্তু আমি কিছু ঠিক করতে পারলাম না।

তবে নার্সিসকে হারিয়ে আমি যেন এই মাটির পৃথিবীতে ফিরে এলাম। মহৎ প্রেমের বায়বীয় ভাবাদর্শটা কেমন উবে গেল মুহূর্তে। আমি আমার বেশভূষা ও পোশাক-আশাকের দিকে মন দিলাম। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেলা করতে লাগলাম।

এই সময় আমাদের বাড়িতে আমার বাবার এক খুড়তুতো ভাই যাতায়াত শুরু করলেন। তিনি আমাদের বাড়ি আগে বিশেষ আসতেন না। বহুদিন তাঁকে দেখিনি। তিনি তার মার একমাত্র সন্তান। ভবিষ্যতে সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন তিনি। বর্তমানেও তাকে কোনো চাকরি করতে হয় না। কিন্তু আমার বাবাকে চাকরির মাইনেটার উপর নির্ভর করতে হয়।

কাকাকে আসা-যাওয়া করতে দেখে আমাদের বাড়ির কেউ কেউ মনে করল, তিনি আর বিয়ে-থা করবেন না। তিনি বিয়ে করেছিলেন কিন্তু তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান। মারা যায়। তারপর থেকে তিনি আর বিয়ে করেননি। তাই সবাই ভাবল আর যদি কাকা বিয়ে না করেন তাহলে তার প্রচুর বিষয়সম্পত্তি সব আমাদের দান করে যাবেন।

কিন্তু কাকা এবার তার আসল উদ্দেশ্যটা বললেন। তিনি বললেন, আমার ছোট্ট বোনটাকে তিনি তাঁর ঠিক করা এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। পাত্রটি ভালো। ভবিষ্যতে তিনিই তাদের দেখাশোনা করবেন। আর পাশের গ্রামে একটা চার্চে আমার একটা চাকরি ঠিক করেছেন। যা হোক কিছু করে নিয়মিত মাইনে পেয়ে যাব।

কাকার পছন্দ করা পাত্রকে আমার ছোট বোনের ঠিক পছন্দ না হলেও কাকার মুখের উপর কথা বলতে পারলাম না। সুতরাং বিয়ে হলো। আমিও চাকরি করতে লাগলাম। কিন্তু আমার শরীরে সহ্য হলো না। অসময়ে খাওয়া-দাওয়া, অত্যধিক হাঁটাহাঁটি এ সব সহ্য হলো না আমার শরীরে। আমি ক্রমশই ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলাম। আমার শরীর ভেঙে গেল।

বিপদের উপর বিপদ। আমার মা এক দুরারোগ্য রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। পাঁচ বছর পর মারা গেলেন। আমার বাবাও সঙ্গে সঙ্গে শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। স্বাভাবিকভাবে এই পারিবারিক অশান্তির জন্য আমার মন-মেজাজ দারুণ খারাপ হয়ে উঠল।

অন্ধকারের মাঝে আবার এক আলোকরশ্মি দেখতে পেলাম আমি। কতখানি নির্ভরযোগ্য সে আলো তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না। তবু সে আলোকে গ্রহণ না করে পারলাম না। এই সময় ফিলো নামে এক মধ্যবয়সী বিশিষ্ট ভদ্রলোক আমাদের পাড়াতে কিছু সম্পত্তি কিনে বাস করতে লাগলেন। আমরা পরিচিত হয়ে উঠলাম পরস্পরের সঙ্গে। তিনি আমার উপর বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। নার্সিসের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকলেও ফিলো তার থেকে আরও প্রাণখোলা এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন।

যদিও আমি ঈশ্বরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম তথাপি রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে এটা বেশ বুঝতে পারলাম যে একমাত্র মৃত্যুর পর ছাড়া ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন সম্ভব নয়। মাটির পৃথিবীতে থাকতে হলে রক্তমাংসের মানুষ চাই। নার্সিসকে ভালোবেসে যে ভুল করেছিলাম আবার সেই ভুল করে বসলাম আমি। আমি ফিলোকেও ভালোবেসে ফেললাম। দিনে দিনে সে ভালবাসা বেড়ে যেতে লাগল। আমি আমার এক ভালোবাসার অনুভূতিটাকে নিজেই ঘৃণা করতে লাগলাম। তবু সে অনুভূতিটাকে দূর করতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম মানবজীবনের এক শাশ্বত দুর্বলতার ফাঁদে ধরা পড়ে গেছি আমি। এ থেকে পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই। আমার রুগ্ন বাবাকে রোজ দেখতে আসত ফিলো। কাকাও তাকে ভালোবাসতেন।

কাকা এবার আমার ছোট বোনের বিয়ের দিন ঠিক করলেন। বিরাট জাঁকজমকের ব্যবস্থা করলেন। বিয়ের সময় আমি ফিলোর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ফিলো আমাকে চুপিচুপি বলল, কোনও বিয়ের সময় বরকনের হাতে হাত দেখলেই আমার সর্বাঙ্গে যেন আগুনের এক ঢেউ খেলে যায়।

কাকা আমার যে বোনের বিয়ের উপলক্ষে সবাইকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে গেলেন। আমরা কাকার বাড়িতে দিনকতক থেকে গেলাম বিয়ে উপলক্ষে। আমার বোনর বিয়ে হয়ে গেল। সেখানে এক ডাক্তারের সঙ্গে পরিচয় হলো আমাদের। কাকার প্রাসাদোপম বাড়িতে কিছু ভালো ছবি ছিল। আমি তা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।

কাকা আমার যে বোনের বিয়ে দিলেন তাকে একটা গ্রাম্য এস্টেট দিয়েছিলেন। জমিজমা ঘরবাড়ি সব ছিল তাতে। বিয়ের পর আমার বোন সেখানে চলে গেল।

এরপরেই শুরু হলো দুঃখের পালা। আমার অসুখ বেড়ে গেল। আমার এক বোনের বিয়ে হলেও আর এক অবিবাহিত বোন ছিল বাড়িতে। তার স্বাস্থ্য ছিল ভালো। আমি যখন রুগ্ন বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, আমার বোন সংসারের কাজকর্ম করত। হঠাৎ তার হৃদরোগ দেখা দিল। তিন সপ্তাহ ভোগার পর মারা গেল সে। শোকে-দুঃখে বাবার রোগ যেন আরও বেড়ে গেল।

আমার বিবাহিত বোন সন্তানসম্ভবা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তার প্রসবব্যথা দেখা দিল। বাবা অসুস্থ শরীরেই বোনকে দেখতে গেলেন আমাকে নিয়ে। তিনি বললেন, হয়ত শেষ বয়সে আমাকে সব সন্তানই হারাতে হবে।

যাই হোক, আমার বোন ভালো হয়ে উঠল। নির্বিঘ্নে সন্তান প্রসব হলো। তবে যাবতীয় সেবা-শুশ্রূষার কাজ আমাকেই করতে হলো। আমাকে তাদের ঘরে থেকে। যেতে হলো কিছুদিন। বোনের স্বামীর সঙ্গে আমার বোনের সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল। না। তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। অনেক সময় তাদের ঝগড়া মেটাতে হতো আমাকে। আমি অনেক করে আমার ভগ্নিপতিকে বোঝাতাম।

আমার বোন আবার সন্তানসম্ভবা হলো কিছুকাল পরে। প্রসবব্যথা উঠলে আবার তাকে দেখতে গেলেন বাবা। আর এক পুত্রসন্তান প্রসব করল সে। ছেলের মুখ দেখে। খুশি হলেন বাবা। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে আর বেশিদিন বাবা রইলেন না এ জগতে।

বাবার মৃত্যু এক অদ্ভুত পরিবর্তন নিয়ে এল আমার জীবনে। বাবা বেঁচে থাকতে সব সময় কাজ নিয়ে থাকতাম। ঘর-সংসারেরর কাজ, সেবা-শুশ্রূষার কাজ, কত রকমের কাজ। সময়ের কত অভাব। একটু ইচ্ছেমতো পড়াশুনো করতে পারতাম না। সব সময় বাঁধাধরা নিয়মের মধ্য দিয়ে চলতে হতো। কিন্তু এখন আমার হাতে অফুরন্ত সময়। আমি একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না এই সময়। কোনও প্রিয়বস্তুর পিছনে। ছুটে চলা বা কোনো প্রিয় কাজ করে যাওয়ার মধ্যে মানুষের প্রকৃত সুখ নেই। মানুষ যে পথ ন্যায়ের পথ, ধর্মের পথ বা মহৎ পথ বলে মনে করে সেই পথে অবাধে চলতে পারার মধ্যেই আমার প্রকৃত সুখ। সে পথ চলায় দুঃখ থাকলেও তাতে পাওয়ার অপার সুখ।

আমি সবাইক ছেড়ে একা সেই পথেই চলা শুরু করেছিলাম। আমি তাতেই সুখ পেতাম। আমার সে সুখের অর্থ কেউ বুঝতে পারত না। এই সময় আমার মনটা এতই সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছিল যে আমি আমার দেহটাকে বাইরের এক জড়বস্তু বলে মনে করতাম। আমার মনে হতে দেহ-আত্মা দুটো পৃথক বস্তু। মনে হতো আমার দেহের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই।

আমার কাকার বাড়িতে যে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সেই প্রকৃতিবাদী ডাক্তার একবার বেড়াতে এলেন আমাদের বাড়িতে। দিনকতক তার সঙ্গে কথা বলে বেশ কাটল। তিনিও আমাকে বলতেন দেহটাকে বাইরের প্রকৃতি জগতেরই এক অঙ্গ বলে মন করবেন। ঈশ্বর যদি বিশ্বাস করেন তাহলে প্রকৃত জগতের সব বস্তুর মধ্যেই সেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করবেন। দেখবেন তাতে আনন্দ পাবেন। বুঝবেন সেই ঈশ্বরই প্রতিটি বস্তুর স্বরূপ। আসল সত্তা।

সত্যি কথা বলতে কি, আমি ঠিক তাই দেখতাম।

এদিকে আমার এই বিবাহিত বোনকে নিয়ে আবার বিপদে পড়লাম। প্রায় প্রতি বছরই তার সন্তান হতে লাগল একটি করে। কিন্তু কন্যা সন্তান হতে লাগল বেশি। এতে তার স্বামী বিরক্তিবোধ করতে লাগল। তার চাই পুত্র সন্তান। আমার বোন সন্তানসম্ভবা হলেই সে আশা করত পুত্র সন্তান। কিন্তু কন্যা হলেই হতাশ হতো। তার মুখ ভার হতো। তার একটা কারণও ছিল। যে বিরাট ভূসম্পত্তির যে মালিক হয়েছিল ভবিষ্যতে তারা এই সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে, তাদের বাবাকে সাহায্য করতে পারবে।

এবার আমার বোনের চতুর্থবার। এবারও তার স্বামী অন্যবারের মতো পুত্র সন্তান আশা করেছিল। নিবিড় প্রত্যাশায় দিন গণনা করছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারল না। হঠাৎ ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেল। এদিকে আমার বোন পর পর দুবার দুটি কন্যা সন্তান প্রসব করার পর এবার সত্যিই একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। দুঃখের বিষয় তার স্বামী এত আশা করেও তা দেখে যেতে পারল না।

প্রসবের পর আমার বোনও আর রইল না পৃথিবীতে। তিন-চারটি সন্তানের বোঝা আমার ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে অকালে মারা গেল হঠাৎ।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

আবার বসন্ত এল। রঙে রসে পত্রপল্লবে উজ্জ্বল হয় উঠল চারদিকের প্রকৃতি। আকাশে মেঘ-বৃষ্টি নেই, সমুদ্রে ঝড় নেই, পাহাড়ে কুয়াশা নেই। যেদিকেই তাকানো যায় শুধু আলো আর রং। নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল উইলেম ঘোড়ায় চেপে। একটা পাহাড়ের কাছে একটা লোককে দেখতে পেয়ে তাকে কাউন্ট লোথারিরও বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞাসা করল। লোকটি বলল, ঐ পাহাড়টার ওধারে। ওই কাউন্ট লোথারিওর সঙ্গে দেখা করে তাকে অরেলিয়ার দেওয়া চিঠি আর পাণ্ডুলিপিটা দিতে হবে।

লোথারিওর প্রাসাদে যেতেই এক মোটা ভদ্রলোক তার সামনে এগিয়ে এল। বলল, কাউন্টের সঙ্গে দেখা হবে না। অনেক লোক আগে থেকেই তাঁর দর্শনপ্রার্থী হয়ে। বসে আছে। উইলেমের অনেক অনুনয়-বিনয়ে লোকটি তাকে কাউন্টের কাছে নিয়ে গেল।

কাউন্টের চেহারা দেখতে ভালো। কিন্তু তখন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। উইলেমকে দেখেই বললেন, আপনাকে বসিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত। একটা অদ্ভুত সংবাদ পেয়ে আমি ব্যস্ত ও বিব্রত আছি। আপনি আজ রাত্রিটা এখানে থেকে যান।

এরপর বিশপ আব্বেকে ডেকে বলে দিলেন, দেখবেন এর যেন কোনও অসুবিধা হয়। উইলেম অরেলিয়ার কাগজপত্র সব দিয়ে দিল।

শোবার সময় পোশাক ছাড়তে গিয়ে দেখল তার পুঁটলির কাপড়চোপড়ের সঙ্গে সেই ওড়নাটা ভরে দিয়েছে মিগনন; সেটার এক প্রান্তে লেখা ছিল, পালাও যুবক, পালাও। লেখাটা পড়ে উইলেমের মনে হলো কোথায় কার কাছে পালাবে সে। তার মনে হলো একথা না বলে বলা উচিত ছিল, নিজের কাছে ফিরে যাও।

রাত্রিতে একটা স্বপ্ন দেখল উইলেম। সে স্বপ্নে মেরিয়ানা আর অরেলিয়া দুজনকেই দেখল।

সকালে উঠতেই উইলেম শুনল কাউন্ট লোথারিও ঘোড়ার চেপে কোথায় বেরিয়ে গেছেন। বিপশ আব্বের সঙ্গে কথা হচ্ছিল উইলেমের। এমন সময় একজন বিক্ষুব্ধ মহিলা ঘরে ঢুকে আব্বোকে বিক্ষোভের সঙ্গে বলল, তাকে তোমরা কোথায় পাঠালে? এই তোমাদের চক্রান্ত।

আব্বে শান্তভাবে বললেন, আপনি শান্ত হোন, তিনি এখনি এসে পড়বেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা কোচ এসে থামল প্রাসাদের সামনে। আহত কাউন্টকে ধরাধরি করে নামানো হলো। ভদ্রমহিলা চিৎকার করে বলতে লাগল, ও আহত হয়েছে। হা ভগবান, কি হবে!

হঠাৎ উইলেম কাউন্টের দলের মধ্যে জার্নোকে দেখতে পেল। জার্নোর সঙ্গে তার। আগে থেকেই পরিচয় ছিল। জার্নোর সঙ্গে উইলেমের পরিচয় হয় এর আগে। ওরা দল বেঁধে নাটক করার জন্য সেই সময় কাউন্টের প্রাসাদে বাস করত। জার্নো ঠাট্টা করে উইলেমকে বলল, যেখানেই নাটক সেখানেই তুমি। এখানেও এখন এক নাটক জমে উঠেছে।

জার্নো অন্যত্র চলে গেলে আব্বে উইলেমকে বললেন, কিছুদিন আগে আমাদের কাউন্ট লিভিয়া নামে এক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মহিলাটি এই প্রাসাদেরই। একজন হিসাবে বাস করতে থাকেন। পরে কাউন্ট কিছুটা অনাসক্ত হয়ে পড়েন তার প্রতি। এতে লিভিয়া চলে যান। কথাটা তার পূর্ববর্তী স্বামী জানতে পেরে কাউন্টকে এক ডুয়েলে আহ্বান জানান। আজ সেই ডুয়েলে কাউন্ট ও লিভয়ার স্বামী দুজনেই আহত হলো। এই জন্য লিভিয়া এত বিক্ষুব্ধ। এখন তিনি কাউন্টের জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন।

উইলেম আশ্চর্য হয়ে দেখল কাউন্টের চিকিৎসার জন্য সে সার্জন এল সেই সার্জেনই একদিন সে পথের ধারে জঙ্গলে দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা করে। জার্নো ও সার্জেনকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল উইলেম। আগেকার সেই রহস্যটা ঘনীভূত হয়ে উঠল আরও।

আব্বে উইলেমকে বললেন, কাউন্ট চান আপনি দিনকতকের জন্য এখানে তার আতিথ্য গ্রহণ করুন। তিনি একটু সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনার বাড়িতে চিঠি দেবার প্রয়োজন হলে দিন। আমার যথাশীঘ্র পাঠিয়ে দিব।

ডাক্তার এসে জার্নোকে খবর দিল, ভয়ের কোনও কারণ নেই। কাউন্ট শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবেন। উইলেম তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ডাক্তার চলে গেল। উইলেম একসময় জার্নোকে বলল, আপনি তো অনেক কিছু জানেন। আচ্ছা বলতে পারেন কি এই কাউন্ট পরিবারের সঙ্গে আগেকার সেই আমাদের পরিচিত কাউন্ট পরিবারের কোনও সম্পর্ক আছে কি না?

জার্নো বলল, যে কাউন্টের ভূত হয়ে তাঁকে তুমি ভয় দেখিয়েছিলে তিনি এই কাউন্ট লোথারিওর ভগ্নিপতি। যে কাউন্টপত্নী তোমার জন্য আজ পাগল হতে বসেছে। সেই কাউন্টপত্নী লোথারিওর আপন বোন। লোথারিওর কোনো সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর বিষয়সম্পত্তি গরীব-দুঃখীদের অর্থাৎ তথাকথিত এক নিম্নশ্রেণীর লোকদের দান, করে যাবেন।

উইলেম ভয়ে ভয়ে বলল, লোথারিও আমার সম্পর্কে সব ব্যাপার জানেন।

জার্না বলল, সব জানেন।

উইলেম বলল, তাহলে আমি চলে যাই এখান থেকে। আমি তাহলে কেমন করে কোন মুখে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব?

জার্নো উত্তর করল, কিন্তু এখন তো আগের মতো অত সহজে পালিয়ে যেত পারবে না বন্ধু। এখন আমার অফুরন্ত অবসর। আমার বন্ধু, পরম উপকারী হিতাকাক্ষী বন্ধু যুবরাজের মৃত্যু ঘটায় এখন আমি নিঃসঙ্গ কর্মহীন। এখন তোমার সেই বেদের খবর কি? তাদের নিয়ে আবার কি নাটক করলে?

উইলেম বিরক্তির সঙ্গে বলল, খুব শাস্তি পেয়েছি। তাদের কথা আর বলো না। ওরা একেবারে অপদার্থ। এতটুকু চিন্তাশক্তি ওদের কারও নেই। নিজেদের প্রকৃত যোগ্যতা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই ওদের। ওরা সবাই মনে করে ওরা এক-একজন মহান অতুলনীয় অভিনেতা। বিন্দুমাত্র কেউ ওদের সমালোচনা করলেই ক্ষেপে যায়। ওরা চির অভাবী। কিন্তু যুক্তি ও সুরুচিকে ওরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।

উইলেম একটু চুপ কর থেকে বলল, তুমি সব জার্নো। একবার আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে পার না?

জার্নো বলল, ধীরে ধীরে সব হবে। ধৈর্য ধরো।

জার্নো একবার সেই মানসিক রোগের ডাক্তারকে পাঠাল প্রাসাদে যাঁর আশ্রমে বৃদ্ধ বীণাবাদককে ভর্তি করে দিয়েছে উইলেস এবং যার সঙ্গে একদিন তার আলাপও হয়। এই ডাক্তারই বর্তমানে তার পরিচিত কাউন্টদম্পত্তির চিকিৎসা করছেন।

উইলেম কৌতূহলের সঙ্গে বৃদ্ধ বীণাবাদকের কথা জিজ্ঞাসা করল। ডাক্তার বললেন, মনে হয় ভালো হয়ে যাবে। কোনও এক আত্মীয়ের সঙ্গে ওর ভালোবাসা হয়, একটা সন্তানও হয়। তাদের মৃত্যু হবার পর হতাশা ও বিষাদের আতিশয্যে ও এই রকম হয়ে পড়ে। ওর সমগ্র অস্তিত্ব হয়ে ওঠে এক অন্তহীন অন্ধকার শূন্যতা। ওর একটা ধারণা হয়, কোনো এক বালকের দ্বারা ওর মৃত্যু হবে। প্রথমে ও মিগননের পোশাকের জন্য তাকে বালক ভেবেছিল। পরে ওর রাগটা পড়ে ফেলিক্সের ওপর। বেটাছেলেদের সব পুড়িয়ে মারার জন্যই হয়ত ও বাড়িতে আগুন লাগায়।

ডাক্তার চলে গেছেন। কাউন্টদম্পতির কথা আর জিজ্ঞাসা করা হলো না। এদিকে জার্নো একটা বড় কাজের ভার দিল উইলেমের উপর। জার্নো বলল, ডাক্তার এইমাত্র বলেছেন লিভিয়াক দুই-একদিনের জন্য বাইরে কোথায় সরিয়ে নিয়ে যাওয় দরকার। ও দিনরাত কাউন্টের কাছে বসে আছে। ওর অত্যধিক প্রেমানুরাগ এবং আদরযত্নের আতিশয্য কাউন্টের আরোগ্যলাভের পথে প্রচুর বাধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ওকে এমনি কোথাও যেতে বললে কাউন্টকে ছেড়ে যেতে চাইবে না। তাই আমরা একটা পরিকল্পনা করেছি। আমরা ওকে বলব আমাদের এই পরিবারের উকিলের বাড়িতে একবার ওকে যেতে হবে। তার প্রণয়িনী ফ্রলিন থেরেসা তাকে ছেড়ে চলে গেছে এইমাত্র আমরা খবর পেয়েছি। লিভিয়া গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেবে। তিনি বলবেন থেরেসা হয়ত কাছাকাছি কোথাও আছে। লিভিয়া তখন বলবে আমরা তখন তাকে খুঁজে নিয়ে আসছি। তারপর যে ঘোড়ার গাড়িতে করে তোমরা যাবে তাতে করেই এখানে-সেখানে খোঁজ করে বেড়াবে। লিভিয়া ফিরতে চাইলে সরাসরি তাকে বাধা দেবে না। কিন্তু তখন রাত্রি হয়ে যাবে। তার কোচম্যানকে বলা থাকবে সে ঘুরপথে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটিয়ে দেবে।

উইলেম বলল, এভাবে কাউকে আমি প্রতারণা কখনও করিনি, যদিও অবশ্য এ প্রতারণা একজনের ভালোর জন্য।

উইলেমের যেতে মন সরছিল না দেখে জার্নো বলল, ওখানে গেলে তোমার লাভ ছাড়া লোকসান হবে না। থেরেসা সাধারণ মেয়ে নয়। ওখান থেকেই তুমি তোমার কাউন্টপত্নীর খোঁজ পেয়ে যাবে।

আর কোনও প্রতিবাদ করল না উইলেম। গাড়ি এসে নিচের তলায় গাড়িবারান্দার কাছে দাঁড়াল। লিভিয়ার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। ঝি-চাকরদের বলল, রাত্রির আগেই চলে আসবে।

গাড়িতে ওঠে লিভিয়া উইলেমকে বলল, থেরেসার সঙ্গে একসময় লোথারিওর ভালোবাসা ছিল। সে অনেক পুরুষকেই ঠকিয়েছে।

নির্দিষ্ট বাড়ির সমানে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই উকিল ভদ্রলোক এসে ওদের অভ্যর্থনা করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বললেন, থেরেসা চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। কাছাকাছি কোনও শহরেই আছে।

উইলেমরা বলল, আমরা তাঁকে খুঁজে এনে দেব।

আবার গাড়ি ছেড়ে দিল। কয়েকটা গা ঘুরে বেড়াতে হলো। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। লিভিয়া কোচম্যানকে ফিরে যেতে বলল। তখন রাত্রি হয়ে গেছে। কোচম্যান বলল, পথ হারিয়ে ফেলেছি। সকাল না হলে উপায় নেই।

এইভাবে সারারাত পথেই কেটে গেল। চোখের পাতা এক করল না লিভিয়া। কিছুটা বেলার পর কোনও এক গাঁয়ের এক বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই এক যুবতী এসে গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়াল। তাকে দেখে কিছুক্ষণ তার পানে তাকিয়ে উইলেমের কোলের উপর মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল লিভিয়া।

উইলেমকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। থেরেসার সঙ্গে পরিচয় হলো তার। থেরেসা নিজের মুখেই তার পরিচয় দিলো। এক মুহূর্তেই তার বন্ধু করে নিল। তাকে লিভিয়ার কথা জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, লিভিয়া খুব রেগে গেছে। তাকে যারা ভুলিয়ে ঘর থেকে বার করে এনেছে তাদের দলে তোমাকেও টেনেছে। সে বলেছে তোমার মুখ সে আর দেখবে না।

কাউন্ট লোথারিওর খুব প্রশংসা করতে লাগল উইলেম। থেরেসা বলল আমার মনের কথাটাই আপনি বলে দিলেন। আমিও সত্যিই খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখি লোথারিওকে।

উইলেম বলল, তাঁর মতো উদারহৃদয় আর সরল প্রকৃতির লোক আমি খুব কম দেখেছি। কিন্তু তিনি যাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছেন তারা সবাই ভালো নয়। সেটাই। সুখের বিষয়।

এইভাবে থেরেসার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল উইলেম। তাকে বিশ্রাম করতে বলে ঘরের কাজে অন্যত্র উঠে গেল থেরেসা। বর্তমানে তার কোনও ঝি-চাকর বা বঁধুনী নেই। আগে ছিল। তাই ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়।

সারা দুপুর ও বিকেলটা একা একা কাটাল উইলেম। সন্ধের একটু আগে তার ঘরের দরজা খুলে হঠাৎ একজন সুদর্শন যুবক ঢুকল। ঢুকেই বলল, বেড়াতে যাবেন?

উইলেম ভালো করে তাকিয়ে দেখল থেরেসাই পুরুষের পোশাক পরে এসেছে। যাই হোক, দুজনেই বেড়াতে বের হলো। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা মাঠ পার হয়ে ওরা একটা পাহাড়ের উপর উঠতে লাগল। তারপর একটা বসার জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ল দুজনে। থেরেসা বলতে আরম্ভ করল তার নিজের জীবনের ইতিহাস।

আমার বাবা ছিলেন এই অঞ্চলের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সদা আনন্দময়, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন মিতব্যয়ী এক মানুষ। নির্ভরযোগ্য বন্ধু, স্নেহশীল পিতা। বাবার চরিত্রে আমি শুধু একটা দোষই দেখছি। সেটা হলো অযোগ্য স্ত্রীর প্রতি অত্যধিক অসংগত সহনশীলতা। আমার মা ছিলেন বাবার ঠিক উল্টো প্রকৃতির। নারীসুলভ বোধ মার চরিত্রে খুঁজে পেতাম না আমি। তাঁর মন সময় সময় বাইরে পড়ে থাকত। থিয়েটার, যাত্রা, নাটক, লোকজন নিয়ে বাইরের জীবনেই থাকতেন তিনি। স্নেহ-ভালোবাসায় কোনও আন্তরিকতা কোনওদিন ছিল না তাঁর মধ্যে। তিনি কখনও আমাকে আদর করেছেন বা ভালোবেসে কিছু তুলে দিয়েছেন হাতে-একথা আমার মনে পড়ে না। বরং বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে প্রায়ই তিরস্কার করতেন। যতক্ষণ মা বাড়িতে থাকতেন না, ততক্ষণ আমরা অর্থাৎ আমি ও বাবা বেশ ভালো থাকতাম। বাবার সঙ্গে বেড়াতে যেতাম। মাঠে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতাম। হাসিখুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠত আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত। কিন্তু মার কাছে বাবার সেই আনন্দোজ্জ্বল মূর্তিটি কেমন ম্লান হয়ে যেত এক বিমর্ষতায়। কথায় কথায় রাগারাগি করতেন মা। মার সামনে কোনও কথা বলতে পারতেন না বাবা। তার কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেও পারতেন না। মার কাছে বাবাকে যেন নিষ্প্রভ দেখাত সব সময়।

এক সময় মা দূর গ্রামাঞ্চলের এক এস্টেটে চলে গেলেন। সংসারে আমি আর বাবা। আমরা তখন হাতে স্বর্গসুখ পেলাম। মার অবর্তমানে প্রতিটি মুহূর্ত অবাধ স্বর্গসুখ অনুভব করতে লাগলাম। কিন্তু সে স্বর্গসুখ বেশি দিল সইল না। হঠাৎ বাবার ডান অঙ্গটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেল। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় বাকশক্তি হারিয়ে ফেললেন বাবা। সব সময় তাঁকে দেশে মনে হতো তিনি যেন কি বলতে চাইছেন। বাবা বলতে বা লিখতে পারতেন না। অন্য সময় এর আগে বাবার চোখ দুটো আয়নার মতো ঝকঝক করত। কিন্তু এখন সে চোখ এমনই ঘোলাটে হয়ে উঠল যে তাতে কোনও ভাব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে পারত না।

অবশেষে সব কষ্ট থেকে মুক্তি পেলেন বাবা। বাবা মারা গেলেন। বাবার মৃত্যুর পর মার কাছে লিখলাম। তাঁর কাছে লিভিয়া তখন থাকত। আমার সমবয়সী লিভিয়া তাঁর দেখাশোনা করত। কিন্তু মা আমাকে যেতে নিষেধ করলেন। আমাকে কোনওমতেই তিনি সহ্য করতে পারবেন না। আমি নিজের জন্যেই ভাবছিলাম। এমন সময় একদিন লিভিয়া এসে হাজির হলো আমার কাছে। মা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।

আমাদের পাড়ায় এক ধনী সম্পত্তিশালিনী মহিলা ছিলেন। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি তাকে বললাম আমি তাঁর ঘরসংসার দেখাশোনা করব। ভদ্রমহিলা রাজি হলেন। আমি তাঁর ঘরেই থাকতাম। কিন্তু লিভিয়া আসাতে লিভিয়াকেই তিনি। রাখলেন ঘরের কাজকর্ম করার জন্য। অবশ্য তিনি আমাকেও তার সম্পত্তি দেখাশোনার কাজ দিলেন। তাঁর অনেক বন ছিল। আমি সেই বনাঞ্চল থেকে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করলাম। লিভিয়া যে বাড়িতে থাকত সেই বাড়িতে কাউন্ট লোথারিও মাঝে মাঝে যাতায়াত করতেন। তিনি ছিলেন ঐ মহিলার আত্মীয়। সেই সূত্রে লিভিয়া ও আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ-পরিচয় হয়। একবার আমি পুরুষের পোশাক পরে বন্দুক কাঁধে করে শিকার করতে যাই। লিভিয়া দেখতে খারাপ না হলেও সমাজের নিচু স্তর থেকে আসা এক মেয়ে সে। আর আচার-আচরণ ও কথাবার্তার মধ্যে কোনো মার্জিত ভাব বা সূক্ষ্মতা ছিল না। আমার মধ্যে এই ভাবটা থাকায় লোথারিও আমাকেই পছন্দ করত বেশি।

একদিন সেই ভদ্রমহিলা আমাকে জানিয়ে দিলেন লোথারিও আমার পাণিগ্রহণ করতে চেয়েছে। আমার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে একথা শুনে এক অপার আনন্দ অনুভব করলাম আমি। এরপর লোথারিও যেদিন এল সেই বাড়িতে সেদিন দুহাত। বাড়িয়ে লোথারিও জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমিও খুশি হয়ে আলিঙ্গন করলাম তাকে। তারপর আমার বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেল।

একদিন লোথারিও এলে আমি তার একটা ফটো চাইলাম। তার ফটোটা সযত্নে রাখার জন্য আমি আমার গয়নার কৌটোটা এনে খুলে ফেললাম। হঠাৎ তার মধ্যে আমার মার ফটোটা দেখে ছোঁ মেরে সেটা তুলে নিল লোথারিও। ভালো করে দেখে। বলল, কে এই মহিলা? সুইজ্যারল্যান্ডে বেড়াতে যাবার সময় তার সঙ্গে আলাপ হয় আমার। সাময়িকভাবে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল।

আমি বললাম, উনি আমার মা। এখন ফ্রান্সে থাকেন। মার ছবিখানা নিয়ে কি একবার ভাবল লোথারিও। তারপর হাতে মুখটা ঢেকে বেদনার্ত অস্ফুট স্বরে বলল আমার মতো হতভাগ্য লোক আর পৃথিবীতে নেই।

এই বলে আমাকে কোনও কথা না বলে বেরিয়ে চলে গেল সে। বাইরে ঘোড়ায় চেপে আমার পানে তাকিয়ে হাতটা নাড়িয়ে ঘোড়া ছেড়ে দিল।

পরে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সুইজারল্যান্ডে থাকার সময় মার সঙ্গে এক অবৈধ সংসর্গ হয় লোথারিওর। সেই জন্য সে আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। আমিও এ বিষয়ে এ নিয়ে তাকে কোনও পীড়াপীড়ি করিনি। আমি তাকে সহজেই মুক্তি দিই। এই সুযোগে লিভিয়া ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল লোথারিওর সঙ্গে।

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠটা ভারী হয়ে উঠল থেরেসার। সে একটা হাত আবেগের সঙ্গে বাড়িয়ে দিল উইলেমের দিকে। উইলেম সে হাতটা নিয়ে চুম্বন করল। তারপর বলল, চলো, যাওয়া যাক।

ওরা থেরেসার বাড়ি ফিরে দেখল দরজার সামনে বিষণ্ণ মুখে বসে রয়েছে লিভিয়া। লিভিয়া উইলেমকে বলল, আমি ওদের চক্রান্ত বুঝতে পেরেছি। আমাকে সরিয়ে দিয়ে ওরা সব লুটেপুটে খাবে। তোমাকেও ওরা ওদের স্বার্থ চরিতার্থ করার যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।

সন্ধের সময় দুটো ছোট ছেলে এল থেরেসার কাছে পড়তে। থেরেসা বলল, আমি সন্ধেয় গ্রামের কিছু গরিব ছেলেমেয়েকে পড়াই। লোথারিওর বোনও মাঝে মাঝে আসে। এই মহীয়সী নারীর সঙ্গে তুমি যদি পরিচিত হও তাহলে তার সৌন্দর্যে, ঔদার্যে ও মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়ে যাবে।

উইলেম এই কথা স্বীকার করতে পারল না যে এই নারীর সঙ্গে ঘটনাক্রমে অনেক আগেই সে পরিচিত হয় এবং সেই পরিচয় অনেক দুঃখ নিয়ে আসে তার জীবনে। যাই হোক, থেরেসা প্রসঙ্গ পাল্টে দেওয়ার পুরনো স্মৃতির অপ্রীতিকর এক পীড়নের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে গেল উইলেম।

পরদিন কাউন্ট লোথারিওর প্রাসাদে ফিরে যাবার জন্য তৈরি হলো উইলেম। লিভিয়ার সঙ্গে দেখা করে বলল, কাউন্ট আমাকে ভীষণ ভালোবাসে এবং শীঘ্রই দেখা হবে আমাদের সঙ্গে। দিনকতকের মধ্যেই আমি যাচ্ছি। ওদের সব চক্রান্ত ভেঙে দেব আমি।

প্রাসাদে একা একা ফিরে এল উইলেম। দেখল আব্বে ও ডাক্তার নেই। কাউন্টের কাছে রয়েছে শুধু জানেনা। কাউন্ট এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। জার্নো বলল, আজ তাহলে আপনার ভ্রমণটা বেশ আনন্দদায়ক হয়েছে।

কাউন্ট বললেন, তা ঠিক বলতে পার। বেশ কিছুদিন পর আমি ঘোড়ায় চেপে নদী পার হয়ে মাঠের ওপারে গ্রামে চলে গেলাম পুরনো অভ্যাসের বশে। ঠিক সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে ঘোড়ার বেগটা কমিয়ে দিলাম।

জার্না বলল, আপনি এক চাষির মেয়েকে ভালোবাসতেন। আপনি হয়ত তাদের বাড়িতেই চলে গিয়েছিলেন।

. কাউন্ট বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই। সেই মেয়েটির দূরে কোথাও বিয়ে হয়েছে। সে এখন ছয়টি সন্তানের জননী। তবে শুনেছি সে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে করে তার বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। তাদের বাড়ির সামনে কজন ছেলেমেয়ে খেলা করছিল। আমি যেতেই একটি মেয়ে একটি ছেলেকে আমার ঘোড়ার কাছ থেকে নিয়ে গেল। আমি ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়াটা দূরে এক জায়গায় বেঁধে রেখে তাদের বাড়িতে গেলাম। তাদের দেখে ঠিকই চিনতে পারলাম। সে আগের থেকে বেশ মোটা হয়েছে। আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। সেও আমায় চিনতে পেরে হাতটা বাড়িয়ে দিল। তার মুখে লজ্জারুণ ভাব নেই। অন্তরের কোনও গোপন আলোড়ন মুখে-চোখে রঙিন চাঞ্চল্যে ফেটে পড়ল না। তবু তাকে আমার ভালো লাগল। তার কোলে ছেলে ছিল। আগেকার দিনের তার সেই তারুণ্যে যত সব চঞ্চলতা, যৌবনের যত উত্তাল আর উদ্দমতা মাতৃত্বের এক শান্ত শীতল যৌবনের মধ্যে কেমন গাঢ় ও স্তব্ধ হয়ে উঠেছে। সে গাঢ়তা সে স্তব্ধতার মধ্যে কম মনোহারিতা নেই।

আমি বললাম, দীর্ঘ দশ বছর পর তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে।

সে হাসিমুখে বলল, আমারও যে কি আনন্দ হচ্ছে তোমাকে দেখে তা বুঝিয়ে বলতে পারছি না। আমি তার স্বামীর কথা তুললাম। সে তার ছেলেমেয়েদের সবাইকে ডাকল। বড় মেয়েটি মুখখানা তার মতোই হয়ে উঠেছে। আমার মনে হলো আমি যেন এক কমলালেবুর বনে এসেছি। আমার চারদিকে শুধু ফল আর ফুলের এক অদ্ভুত সোনালী সংসার।

কাউন্টের কথা শেষ হয়ে গেলে উইলেম ফেলিক্সের কথা তুলল। কাউন্ট অশান্ত হয়ে বলল, আপনি কার কথা বলছেন?

উইলেম বলল, অরেলিয়ার গর্ভে আমার ঔরসে যে সন্তানের জন্ম হয় তার কথা বলছি।

লোথারিও বললেন, অরেলিয়ার গর্ভে আমার কোনও সন্তানের জন্ম হয়নি। তার কোনও সন্তান হয়নি। সে নিজের মুখে আপনাকে একথা বলেছিল?

উইলেম বলল, না, স্পষ্ট করে বলেনি। তবে অনেকেই তাই মনে করেন।

কাউন্ট বললেন, যাই হোক, আপনি ওদের নিয়ে আসুন এখানে। আপনি মিগনন নামে যে মেয়েটির কথা বলছেন সে থাকবে থেরেসার কাছে। খুব ভালো থাকবে। আর ফেলিক্স আপাতত আপনার কাছেই থাকবে।

জার্নো বলল, তবে তোমায় থিয়েটার ছাড়তে হবে। ও তোমার দ্বারা হবে না।

উইলেম বলল, আগে ওদের নিয়ে আসি তো। তারপর সেকথা ভেবে দেখা যাবে।

একটা বিষয়ে নিশ্চিত হলো উইলেম। সে কাউন্টের কাছে জানতে পারল, ফেলিক্স অরেলিয়ার সন্তান নয়। এক বৃদ্ধার কাছ থেকে পাওয়া একটি ছেলে যাকে সে মানুষ করত এবং যাকে অনেকে তার ছেলে মনে করত।

অবশেষে এই শহরে তার বাগানবাড়িতে পৌঁছে দেখল সব ঠিক আছে। একটি ঘরে সে ফেলিক্স ও মিগননকে এক বৃদ্ধার কাছে বসে থাকতে দেখল। এদের দুজনকেই সে নিয়ে যাবে থেরেসার কাছে। তার কাছে ওরা সুখে থাকবে। আর তাতে সে নিজে হয়ে উঠবে নিশ্চিন্ত।

হঠাৎ যেন ভূত দেখে চমকে উঠল উইলেম। এই বৃদ্ধা আর কেউ নয়, বারবারা মেরিয়ানার গৃহকত্রী। প্রথমটার চিনতে পারেনি। উইলেম কড়াভাবে জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা তুমিই কি ফেলিক্সকে অরেলিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলে?

এদিকে ছেলেরা উইলেমকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বারবারা চুপ করে থাকায় উইলেম আবার জিজ্ঞাসা করল, মেরিয়ানা এখন কোথায়?

এবার বারবারা ভারী গলায় বলল, সে আর ইহলোকে নেই।

উইলেম ব্যস্ত হয়ে বলল, আর ফেলিক্স

ফেলিক্স হচ্ছে মেরিয়ানারই হতভাগ্য সন্তান। সে রত্ন আজ তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি সে আমাদের একদিন অনেক দুঃখ দিয়ে আজ তোমাকে প্রচুর সুখ দান করবে।

বারবারা উঠে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে উইলেম বলল, কোনও কাগজপত্র আছে?

বারবারা উঠে গিয়ে মেরিয়ানার একটি চিঠি এনে দিল। সত্যিই মেরিয়ানার হাতের লেখা। উইলেম চিনতে পারল। মেরিয়ানা লিখেছে, জানি না এ চিঠি তোমার হাতে পৌঁছবে কি না। যদি তোমার হাতে যায় তাহলে তোমার হতভাগ্য সেই বান্ধবীর জন্য দুফোঁটা চোখের জল ফেলো। মনে রাখবে তোমার প্রেমই তার মৃত্যু ঘটায়। কয়েকদিন প্রসবযন্ত্রণা ভোগ করার পর একটি পুত্র প্রসব করে মারা যাচ্ছি আমি। আমি তোমার প্রতি বিশ্বস্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছি। বারবারার কথা শুনবে?

বারবারা বলল, তবু ভালো, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও, তোমার প্রেমাস্পদকে হারালেও তোমার সন্তানকে পেয়েছ। তুমি যদি শোনো সে তোমার জন্য কতখানি কষ্ট করেছে, কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কতদূর বিশ্বস্ত ছিল তোমার প্রতি তাহলে দুঃখ রাখবার জায়গা থাকবে না তোমার মনে।

মিগনন উইলেমকে বলল, হ্যাঁ, মালিক, ফেলিক্স তোমারই ছেলে।

উইলেম বারবারাকে বলল, হ্যাঁ তোমাকে শুনতে হবে। মেরিয়ানার সব কথা, শেষ কথা শুনতে হবে।

বারবারা উইলেমের ঘরে এল গভীর রাতে। এল মেরিয়ানার কথা শোনাতে। তিন গ্লাস শ্যাম্পেন নিয়ে এসে নিজে এক গ্লাস খেয়ে উইলেমকে এক গ্লাস দিয়ে এক গ্লাস রেখে দিল মেরিয়ানার আত্মার জন্য। বলল, মেরিয়ানার কাছে রাত্রিতে যখন তুমি আসতে তখন আমি এমনি করে তিন গ্লাস শ্যাম্পেন আনতাম।

বারবারা বলল, মেরিয়ানার সঙ্গে তোমার যেদিন শেষ দেখা হয় সেদিন তুমি তার ঘরের মেঝের উপর একখানি চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলে এবং তা নিয়ে গিয়েছিলে। তা মনে আছে? তাকে কি লেখা ছিল?

উইলেম বলল, হ্যাঁ সব মনে আছে। সে চিঠি কোনও এক বিক্ষুব্ধ প্রেমিকের লেখা যার সঙ্গে আগের দিন সন্ধ্যার তার প্রেমিকা ভালো ব্যবহার করেনি এবং যে সেদিন সন্ধ্যাতেও আসে ভালো ব্যবহারের প্রত্যাশায়। সে প্রেমিক সেদিন রাতেও এসেছিল তোমাদের ঘরে। তাকে আমি অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে দেখেছি তোমাদের বাড়ি থেকে।

উইলেমের কথায় বেশ কিছুটা ক্ষোভ ছিল। বারবারা বলল, তুমি তাকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলে, কিন্তু সে রাত্রে মেরিয়ানা কত কষ্টে কাটায়, কত দুঃখ পায় তার খবর তুমি জান না। তুমি জান না সেই ক্রুদ্ধ প্রেমিকের সঙ্গে দুটি দিনের মধ্যে একদিনও কোনও কথা বলেনি মেরিয়ানা। আমি শুধু তাকে মিথ্যা অজুহাত আর মিষ্টি কথায় তুষ্ট করে পাঠিয়ে দিই। আসল কথা তুমি আসার পর থেকে এক বিরাট পরিবর্তন আসে মেরিয়ানার জীবনে। তার আগে নবার্গ নামে এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে তার আলাপ হয়। ছেলেটি তাকে মনপ্রাণে ভালোবাসে। আমিও বারবার তাকে নর্বার্গের নিবেদিত প্রেমকে বরণ করে নেবার জন্য অনুরোধ করি। মাঝে মাঝে তাকে কত ভালো ভালো উপহার পাঠাত নৰ্বার্গ। মেরিয়ানার মন কুণ্ঠা ও দ্বিধার দোলায় দুলতে থাকে সব সময়। তুমি তার সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে সব কুণ্ঠা দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে তোমাকেই গ্রহণ করে বসে সে। আমার এতে ইচ্ছা না থাকলেও বাধা দিতে পারিনি কারণ তার সুখই হলো আমার সুখ। আমার কথার অবাধ্য হলেও আমি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারতাম না তার কাছ থেকে। মেয়েটা ছিল শিশুর মতো সরল এবং সৎ। তার সরলতা ও সততার সুযোগ নিয়েছে অনেকে অনেকবার। তুমি রাগ করে চলে গেলে, আর এলে না। অথচ দিনের পর দিন সে পথ চয়ে বসে থেকেছে। তোমার কথা ভেবে ভেবে দিন কাটিয়েছে। আর সেই প্রতিটি মুহূর্তের সকল দুঃখ-বেদনার নীরব সাক্ষী হয়ে আছি আমি। তোমার মনে যাই থাক একবার দেখা করে সব কথা বলতে পারতে। কিন্তু তুমি আর একবারও এলেও না। তার মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী একমাত্র তুমিই। পালা করে আমরা দিনের পর দিন জানালার ধারে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। যদি তুমি রাস্তা দিয়ে যাও। সে জানালা থেকে একবার সরে গেলেই আমাকে গিয়ে দাঁড়াতে হতো। বিরক্তি সত্ত্বেও তারই জন্য এ কাজ করতে হতো আমায়।

উইলেম অধৈর্য হয়ে বলল, খুব হয়েছে বারবারা। অনেক কিছু করেছ, এবার একটা কাজ করো। আমার মেরিয়ানাকে বার করে দাও। তুমি নিশ্চয়ই তাকে লুকিয়ে রেখেছ কোথাও।

বারবারা বলল, সে আর ইহজগতে নেই। তার কবরের কাছে ফেলিক্সকে নিয়ে যাও। বলবে তোমার মাকে প্রণাম করো।

কিন্তু বারবারার এত কথাতেও উইলেম ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না ফেলিক্স তার ঔরসজাত সন্তান কি না। এ বিষয়ে সন্দেহাতীত কোনও সত্যে পৌঁছাতে পারছিল না সে। কেবলি মনে হচ্ছিল বারবারা তার সঙ্গে চাতুরি খেলছে। পরের ছেলের সব দায়িত্বভার তার কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইছে কৌশলে।

মাদাম, মেলিনা তার এই সন্দেহ বাড়িয়ে দিল। বলল, ফেলিক্স অরেলিয়ার ছেলে। ও তোমার ছেলে নয়।

লার্তেস, সার্লো বা দলের অন্য সবাই উইলেমের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতে লাগল। উইলেম বলল, সে অভিনয় আর করবে না। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে একমাত্র মাদাম মেলিনা ছাড়া আর তাকে এ বিষয়ে ভেবে দেখার জন্য কোনও অনুরোধ করল না। মাদাম মেলিনা বারবার তাকে বলল, আপনি আবার ফিরে আসুন। আমরা আপনার কাছে অনেক ঋণী।

উইলেম বলল, সে কথা তো কেউ স্বীকার করে না।

স্থানীয় নাট্যমোদী লোকেরা উইলেমের অভিনয়ের প্রচুর প্রশংসা করতে লাগল। তাকে নাট্য জগতে আবার ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। কিন্তু উইলেম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওয়ার্নারকে একটা চিঠিতে লিখে দিল, আমি অভিনয় ছেড়ে দিয়ে তোমার কথামতো চলতে চাই। আমি আবার আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে ফিরে যেতে চাই।

একবার ঠিক করল উইলেম বারবারা, ফেলিক্স, মিগনন, এই তিনজনকেই থেরেসার কাছে পাঠিয়ে দেবে। সেইখানে ওরা থাকবে। মাঝে মাঝে ও গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবে। কিন্তু পরে ঠিক করল বারবারাকে একটা মাসিক বৃত্তি দিয়ে বিদায় করে দেবে। শুধু মিগনন আর ফেলিক্সকে পাঠাবে থেরেসার কাছে।

মনে মনে উইলেম যতই ভাবতে লাগল ফেলিক্স থেরেসার কাছে থাকবে, থেরেসা তাকে মার মতো স্নেহ করবে, তাকে কোলে করবে, ততই থেরেসা আরও প্রিয় হয়ে উঠতে লাগল তার কাছে। ফেলিক্সকে কোলে করা অবস্থায় থেরেসার এক কাল্পনিক মূর্তি খাড়া করে বড় আনন্দ পাচ্ছিল সে মনে মনে।

মিগনন তাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। অনেক করে তাকে বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিল থেরেসার কাছে। তারই জন্য ফেলিক্সকেও তার সঙ্গে পাঠাতে হলো। ফেলিক্সকে সে ভালোবাসে এবং তার টানে টানে সেও যাবে। ওদের পাঠিয়ে দেবার পর কাজকর্ম ও কথাবার্তা সব সেরে সে রওনা হলো কাউন্ট লোথারিওর প্রাসাদের অভিমুখে। প্রাসাদে গিয়ে দেখল শুধু জার্নো ছাড়া আর কেউ তখন প্রাসাদে নেই। জার্নো আর ডাক্তার আব্বে বাইরে গেছে। কাউন্ট নিজেও নেই। তবে তিনি আমাদের সকলকে একটা কাজের ভার দিয়ে গেছেন। এই অঞ্চলে একটা বড় ভূসম্পত্তি বিক্রি হচ্ছে। তিনি সেটা কেনার ভার আমাদর সকলের উপর দিয়ে গেছেন। দরদাম সব কিছু ঠিক করতে হবে।

কিছুক্ষণ আগে আব্বে এসে গেল। আব্বে ফেলিক্সকে এর মধ্যেই দেখে ফেলেছেন থেরেসার বাড়িতে। একথা-সেকথা বলার পর ফেরিক্সের কথা তুলে উইলেম তার মনের আসল সন্দেহের কথাটা বলল আব্বেকে। আব্বে অকুণ্ঠভাবে বললেন, ফেলিক্স। তোমারই সন্তান। তার মাও গুণবতী রমণী ছিলেন। আমি বলছি। এতে কোনও সন্দেহ। করো না।

এমন সময় ফেলিক্স একজনের সঙ্গে এসে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাকে বুকের উপর চেপে ধরল উইলেম। তার সকল সন্দেহ, সকল জ্বালা দূর হয়ে গেল। নিমেষে।

প্রাসাদের মধ্যে হঠাৎ ওয়ার্নারকে দেখে অবাক হয়ে গেল উইলেম। পরে জানল কাউন্ট লোথারিও যে ভূসম্পত্তি কিনতে যাচ্ছেন সেটি আসলে তাদের। ওয়ার্নার তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চয় কথাবার্তা বলছে। ওয়ার্নার তার শেষ চিঠিটা পেয়েছিল যথাসময়ে।

ওয়ার্নার বলল, আমার মনে হয় এই নূতন পরিবেশে কাউন্টের মতো এই সব দ্র ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তোমার উন্নতি হয়েছে। এখন তোমার চেহারা ও পোশাক-আশাকের উন্নতি হয়েছে।

উইলেম বলল, বাড়ির মেয়েদের খবর কী?

ওয়ার্নার বলল, সব ভালো আছে। আমার ছেলে হয়েছে দুটি। তোমার মা-বোন ভালো আছে। জমিজমার ব্যবস্থাও সব ঠিক হয়ে গেলে তুমি যাবে। তোমার কাজ আছে।

ফেলিক্সের কথাটা ওয়ার্নারের কাছে তুলল না উইলেম। ওয়ার্নার কিভাবে সেটা নেবে বুঝতে পারল না। অথচ ফেলিক্স তার কাছে সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওয়ার্নারওে তার কথা কিছু জিজ্ঞাসা করেনি।

হঠাৎ উইলেমের একটা কথা মনে হলো। মনে হলো যে সে ফেলিক্স, মিগননের প্রতি ঠিকমতো নজর দেয়নি। মিসননের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারত। ফেলিক্সের মতো সোনার চাঁদ ছেলের জন্য আরও আদর-যত্নের ব্যবস্থা করতে পারত।

অনেক ভাবনা-চিন্তা করে থেরেসাকে একখানা চিঠি খিলল উইলেম। থেরেসার মতো সেবাপরায়ণা মেয়ের উপরেই সে তার নিজের ও ছেলেদের ভবিষ্যৎকে অকুণ্ঠভাবে ছেড়ে দিতে পারে। সে তাই সংক্ষেপে চিঠিখানিকে থেরেসার কুশল জিজ্ঞাসা করে তাকে তার অন্তরের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও একই সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবও জানিয়েছিল।

চিঠিখানা থেরেসার কাছে সবেমাত্র পৌঁছতে কাউন্ট লোথারিও ফিরে এলেন প্রাসাদে। ব্যস্তভাবে বললেন, তোমার বোন তোমাকে অবিলম্বে তার বাড়িতে তোমাকে পাঠিয়ে দিতে বলেছে। এদিকে মিগননের অবস্থা খারাপ। তোমার সেখানে অভিলম্বে যাওয়া একান্ত দরকার।

হঠাৎ উইলেমের মনে হলো থেরেসাকে চিঠিটা লিখে ভুল করেছে। এ চিঠি লেখা উচিত হয়নি তাকে। এই কাউন্ট লোথারিওই ছিলেন একদিন থেরেসার প্রেমিক এবং মনোনীত স্বামী-এ কথাটা কোনওদিন ভুলে যেতে পারবে না।

কাউন্ট তার বোনের লেখা একটুকরো কাগজ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে লোকটা কাউন্টপত্নী কি না তা বুঝতে পারল না। কাউন্ট লোথারিওর দুটি বোন আছে। একজন হচ্ছে সেই কাউন্টপত্নী যার সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে ব্যারনপত্নীর মাধ্যমে। আর একজনের নাম নাটালিয়া যে সেই জঙ্গলে দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত ও আহত হলে তার আরোগ্যলাভের ব্যবস্থা করে অনেক উপকার সাধন করে। অনিন্দ্যসুন্দরী বীরাঙ্গনা মূর্তিটি তার অন্তরের অনেকখানি শ্রদ্ধা ও আসক্তি কেড়ে নেয়।

লোথারিও তার বোনের বাড়ি থেকে যে ঘোড়ার গাড়িতে করে এসেছিলেন সেই গাড়িতে করেই পরদিন রাত্রিশেষে ফেলিক্সকে নিয়ে রওনা হলো উইলেম। দুটি বোনের মধ্যে কোন বোন তাকে ডেকেছে তা নিশ্চিতভাবে জানতে না পারায় যেতে মন সরছিল না তার। গাড়িতে অনবরত সেই কথাই ভাবছিল।

শহরের মধ্যে একটি বড় বাড়ির গাড়িবারান্দার নিচে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল। বাড়ির চাকর এসে দরজা খুলে দিল। আর একজন চাকর এসে বলল, আপনার জন্য অনেক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। তাকে সঙ্গে করে দোতলার একটি ঘরে নিয়ে গেল। ফেলিক্সকে বিছানার উপর শুইয়ে দিল উইলেম। উইলেম চাকরের মুখে ব্যারনপত্নী আছে শুনে ভেবেছিল কাউন্টপত্নীই তাকে ডেকেছেন। কিন্তু তার ঘরে যে এসে হঠাৎ ঢুকল সে হচ্ছে লোথারিওর অন্য বোন নাটালিয়া। উইলেম নতজানু হয়ে নাটালিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত চুম্বন করল। নাটালিয়া তার কুশশ জিজ্ঞাসা করার পর মিগননের কথা তুলল। বলল, আপনি ফিলিক্সকে তার কাছে রাখার ব্যবস্থা করলে সে ভাল থাকবে। এখন সে মেয়েছেলের পোশাক পরে। আমি তাকে ভালো পোশাক দিয়েছি।

পরদিন সকালে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল উইলেম। চাকর এসে প্রাতরাশের জন্য ডেকে নিয়ে গেল। উইলেম গিয়ে দেখল, নাটালিয়া তার জন্য অপেক্ষা করছে। কথায় কথায় নাটালিয়ার কাছ থেকে জানতে পারল উইলেম তাদের আর এক ভাই আছে। তিনি প্রায় হাসিখুশির সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। তাঁর নাম ফ্রেডারিক। আব্বে সম্বন্ধে প্রশ্ন করে উইলেম জানল আব্বে হচ্ছে নাটালিয়াদের গৃহশিক্ষক। বর্তমানে তার দাদার কাছেই থাকেন। তবে ওঁর জীবনের একমাত্র আদর্শ হলো, কাজ করে যাওয়া। তবে তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ ইচ্ছামতো কোনও মহৎ কাজ করতে পারে না। মানুষ আপন জন্মগত কর্মপ্রবৃত্তি আর প্রেরণার বশেই কাজ করে যায়। ইচ্ছা করলেই কেউ কবি হতে পারে না।

এমন সময় ডাক্তার ঘরে ঢোকায় আলোচনাটা থেমে গেল। ডাক্তারকে মিগননের কথা জিজ্ঞাসা করায় বললেন, সে অনেক কথা। বলছি।

নাটালিয়া ফেলিক্সকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বলে গেল, ছেলেটাকে আগে হতে দেখতে সে মনে মনে প্রস্তুত হয়ে উঠবে আপনাকে দেখার জন্য।

নাটালিয়া চলে গেল ডাক্তার অবাধে ও অকুষ্ঠভাবে বলতে লাগলেন, মিগননের ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়। আপনি শুনলে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাবেন। ওর বিভিন্ন কথা, গান প্রভৃতি থেকে আমরা জেনেটি ওর বাড়ি ইত্যালির মিলান শহরের কোথাও। ওর শৈশবে দড়ির খেলা দেখানোর একটি দল ওকে চুরি করে নিয়ে আসে। তাইও আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেনি। তারপর ও একদিন অদ্ভুত এক স্বীকারোক্তি করে বসে। আপনার নিশ্চয় সেই আশ্চর্য এক রাত্রির কথা মনে আছে যে রাত্রে এক অদৃশ্য নারী জড়িয়ে ধরে আপনাকে, অথচ আলো জ্বেলে আর দেখতে পাননি তাকে। সেই রাতে আপনি হ্যামলেটের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

উইলেম শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় কোনওরকমে বলল, আমার ভয় হচ্ছে। সে মেয়ে মিগনন নয় নিশ্চয়?

ডাক্তার বললেন, সে মেয়ে মিগনন কিনা জানি না, তবে ও কিন্তু সে রাতে আপনার বিছানার ভিতরে লুকিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। এই কামনা সে রাতে প্রবল হয়ে উঠেছিল ওর মনে। কিন্তু সাদা পোশাকপরা অন্য এক মেয়েকে দেখে তাকে প্রতিদ্বন্দিনী ভেবে ও পালিয়ে গিয়ে বৃদ্ধ বীণাবাদকের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আকাক্ষিত ব্যক্তির প্রতি অদম্য সঙ্গলিপ্সার সঙ্গে অজানা প্রতিদ্বন্দ্বিনীর প্রতি এক প্রবল ঈর্ষা মিলেমিশে সে রাতে ভয়ঙ্করভাবে বিক্ষুব্ধ ও উত্তাল করে তুলেছিল ওর অনুভূতিকে।

উইলেম বিব্রত হয়ে ডাক্তারকে বলল, কিন্তু তার কাছে আমি গিয়ে কি করব? বরং আমার উপস্থিতি অহেতুক উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে তার মধ্যে। তাতে কোনও ফল হবে না।

ডাক্তার বললেন, যেখানে আমি রোগ নিরাময় করতে পারি না সেখানে সে রোগকে কিছুটা প্রশমিত করতে পারি। প্রেমের বস্তুর উপস্থিতি প্রেমিক-প্রেমিকার মন থেকেও ধ্বংসাত্মক চিন্তাগুলোকে সরিয়ে দিতে পারে। তার অনেক প্রমাণ আমি পেয়েছি। তবে তুমি গিয়ে তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবে। তার ফল কি হয় সেটা আমরা লক্ষ্য করব।

নাটালিয়া এসে উইলেমকে সঙ্গে করে মিগননের কাছে নিয়ে গেল। উইলেম গিয়ে দেখল মিগনন শান্তভাবে শুয়ে আছে, আর তার বুকের উপর ফেলিক্স খেলা করছে। ফেলিক্সকে পেয়ে ও অনেকখানি শান্ত হয়ে উঠেছে। উইলেম যা ভেবেছিল তা কিন্তু হলো না। তাকে দেখে কোনও উত্তেজনা প্রকাশ করল না মিগনন। শুধু বোঝা গেল সে খুশি হয়েছে মনে মনে উইলেমকে দেখে।

ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল মিগনন। অবশ্য দুর্বলতা তখনও ছিল তার দেহে। রোজ একবার করে উইলেম তাকে নিয়ে বেড়াত। তার জীবনের উদ্ধারকর্তাকে প্রেমিক হিসাবে কল্পনা করেছিল মিগনন তার অপরিণত মনে। উইলেম যখন কাছে না থাকত তখন ফেলিক্স থাকত তার কাছে।

নাটালিয়া বলল, থেরেসার সঙ্গে আপনার বিয়ের কথা ঠিক হওয়ার কথাটা জানতে পারলে খুব রেগে যাবে।

উইলেমও বিয়ের কথাটা মিগননকে জানাতে সাহস পেল না।

অবশেষে থেরেসার বহু প্রতিক্ষিত চিঠিটা এসে গেল। নাটালিয়া নিজে তার বান্ধবীর চিঠিটা উইলেমের হাতে তুলে দিল। বলল, এখন খুশি তো? থেরেসা আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। আমার মতামত চেয়েছিল। আমার প্রতি আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। উইলেম গম্ভীর মুখে চিঠিটা খুলল। তাতে লেখা আছে, আমি তোমার, তুমি আমার। আমরা যেহেতু কোনও আবেগের দ্বারা প্রভাবিত হইনি, আমাদের পারস্পরিক শুভেচ্ছা উৎফুল্লতা ও যুক্তিবোধের দ্বারা আমাদের বিবাহ-বন্ধনকে সার্থক করে তুলব। আমি তোমার ফেলিক্সকে বুকে চেপে ধরে অনেক শান্তি পাব। তাকে মার মতো মনে মানুষ করব। আমি ভাবব, সে আমারই সন্তান। তুমি আমার বাড়িতে চলে এলেই আমরা হয়ে উঠব একচ্ছত্র অধিপতি। আমরা শুরু করব আমাদের সুখের জীবন।

নাটালিয়া তার ভাই লোথারিওকে একটা চিঠি লিখল। এমন সময় হঠাৎ জার্নো এসে হাজির। জার্নো এসে বলল, আমি জানি না আমার বন্ধু কি মনে করবে। তার নিয়তি ঘটনার গতিকে ফিরিয়ে দিতে পারে।

উইলেম বলল, আজ আমি সত্যিই খুশি। আজ আমার সারা জীবনের সকল আশা, সকল আকাক্ষা সফল হতে চলেছে এই মিলনের মধ্যে।

জার্নোর কাছ থেকে উইলেম যখন শুনল থেরেসা তার মার নিজের সন্তান নয় বলে কাউন্ট লোথারিও তার মন পাল্টেছে এবং থেরেসাকে গ্রহণের পথে অন্য কোথাও বাধা নেই, তখন উইলেম বলল, তিনি আমার অকৃত্রিম অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি তাঁরই জন্য, তাঁকে প্রীত করার জন্যই থেরেসার পাণিগ্রহণ করতে চেয়েছিলাম আবার তাঁরই খাতিরে থেরেসাকে ত্যাগ করে তার হাতে তুলে দিতে পারব। একথা কাউন্টকে গিয়ে জানিয়ে দিয়ে যাও।

জার্নো ঘোড়ায় করে চলে গেল।

কাউন্ট লোথারিও সত্যি সত্যিই তাঁর মত পাল্টেছেন। তিনি এখন নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছেন সুইজারল্যান্ডে থাকাকালে থেরেসার যে কুপথগামিনী ব্যভিচারিণী মার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়, থেরেসা তার সন্তান নয়। থেরেসার মা অন্য নারী, তিনি ইহজগতে নেই। এবার থেরেসাকে গ্রহণ করতে কোনও বাধা নেই।

উইলেম প্রথমে ভেবেছিল এটা বুঝি জার্নোর চক্রান্ত। কিন্তু লোথারিওর একখানি চিঠি তাদের সব সন্দেহ ভঞ্জন করে নিল। নাটালিয়াকে লোথারিও লিখেছেন, তোমার উপর এমন গুরুদ্বায়িত্ব এসে পড়েছে নাটালিয়া। তার তোমরই উপর নির্ভর করছে তোমার এই ভাই-এর ভবিষ্যৎ সুখ-শান্তি। একদিকে থেরেসাকে বোঝাতে হবে তোমাকেই। আবার আমার বন্ধুও যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। তাকে কোনও মতেই তুমি ছাড়বে না। আশা করি শীঘ্রই মন ঠিক হয়ে যাবে।

নাটালিয়া চিঠি পড়ে শান্ত কণ্ঠে উইলেমকে বলল, কথা দাও, তুমি আমার অমতে কোনওদিন আমার এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে না।

উইলেম তার হাত বাড়িয়ে বলল, কথা দিচ্ছি, এবার হতে তোমার মতেই চলব এ ব্যাপারে। তোমার অমতে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব না।

বাগানে গিয়ে কিছু ফুল তুলল নাটালিয়া। বিভিন্ন রঙের বিচিত্র ধরনের ফুল। নাটালিয়া বলল, তোমাকে নিয়ে আমার কাকার কাছে যাব। আমার জীবনের সব আনন্দ সকল শান্তি এখন তোমার হাতেই নির্ভর করছে।

ফুল তোলার পর কথা বলতে বলতে প্রাসাদের এমন একটি দিকে যেতে লাগল যেখানে সচরাচর কেউ যায় না। নাটালিয়া বলল, এ দিকটায় আমার কাকা থাকতেন, এ ফুল তাঁরই জন্য নিয়ে যাচ্ছি।

হলঘরে ঢুকতেই মর্মরপ্রস্তরের এক মূর্তি দেখতে পেল উইলেম। জানল ইনিই ছিলেন নাটালিয়ার কাকা। এ এক অদ্ভুত জগৎ। চারদিকে শুধু নানা ধরনের ভালো ভালো ছবি। কত অপরূপ ভাস্কর্য ও চিত্রকলার সার্থক নিদর্শন। দেখতে দেখতে দুচোখ জুড়িয়ে গেল উইলেমের এই নির্জন পরিত্যক্ত অঞ্চলে আপাতদৃষ্টিতে কোনও প্রাণচাঞ্চল্য দেখতে না পেলেও এই শিল্পসৃষ্টির মধ্যে স্তব্ধ জীবনের এমন এক চিরন্তন রূপ দেখতে পেল উইলেম, যে রূপ অবিচ্ছিন্ন কালপ্রবাহে চিরপ্রবহমান। মৃত্যুশীতল এক অতীতাশ্রয়ী স্তব্ধতার সঙ্গে কালজয়ী প্রাণচঞ্চলতার এক প্রচ্ছন্ন তাপপ্রবাহ মিলেমিশে এক অদ্ভুত জীবন রসায়নে পরিণত হয়ে উঠেছে যেন।

কথা বলতে বলতে ওরা হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় ছেলেরা ছোটাছুটি করতে করতে এগিয়ে এল তাদের দিকে। ফেলিক্স বলল, আমি আগে এসেছি। মিগনন বলল, আমি। আসলে হঠাৎ থেরেসা আসায় ওরা খবর দিতে এসেছে ছুটে। মিগনন হাঁপাচ্ছিল। নাটালিয়া তাকে ধরে বলল, দুষ্টু মেয়ে কোথাকার, আমি তোকে বলেছি না, মোটেই ছুটবি না। বুকটা লাফাচ্ছে।

থেরেসা এগিয়ে এসে আবেগের সঙ্গে উইলেমকে বলল, কেমন আছ হে আমার বন্ধু? ওদের দ্বারা তুমি তাহলে এখনও প্রতারিত হওনি?

উইলেম এগিয়ে যেতেই ছুটে গিয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল থেরেসা। বলল, হে আমার মনের মানুষ, আমার স্বামী। তুমি আবার চিরদিনের। বলতে বলতে পাগলের মতো চুম্বন করতে লাগল উইলেমকে। ফেলিক্স তার গাউনটা ধরে টানতে টানতে বলল, মা, আমি এখানে রয়েছি।

হঠাৎ মিগনন দাঁড়িয়ে এসব দেখতে দেখতে নাটালিয়ার পায়ের কাছে পড়ে গেল। উইলেম তাকে দুহাতে তুলে ধরে ঘরে নিয়ে গেল। তাকে মৃত ভেবে আকুলভাবে কাঁদতে লাগল। তাকে থেরেসা সরিয়ে নিলে গেল অন্য ঘরে। কিন্তু কারও কোনও সান্ত্বনায় কান দিল না উইলেম। বলতে লাগল, আমারই হৃদয়হীনতার জন্য ওর মৃত্যু ঘটেছে। ও আমার কত উপকার করেছে। নিজে আহত হয়েও রক্তাক্ত দেহে আমার সেবা করে আমাকে বাঁচিয়েছে।

ডাক্তার ও সার্জেন এসে বললেন, একেবারে আশা ত্যাগ করবেন না। দেখি কি করতে পারি।

উইলেম লক্ষ্য করল এই সার্জেনই নাটালিয়ার নির্দেশে এই বনে গিয়ে তার চিকিৎসা করে।

ঠিক এই সময় কাউন্ট লোথারিও, আব্বে ও জার্নো এসে হাজির হলো প্রাসাদে। জার্নো উইলেমকে সরিয়ে নিলে গেল। কিন্তু তার কোনও কথা ভালো লাগল না উইলেমের। কুষ্ঠির কথা, তার ভবিষ্যতের কথা, কোনও কিছুই আকৃষ্ট করতে পারল না তাকে। বিশেষ করে এই শোকদুঃখের সময়ে জার্নো তার বিয়ের কথাটা তোলায় তার রাগ হলো জার্নোর উপার। জার্নো বলল, ঐ আব্বে এসে গেছেন। সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে সকল কথা ওঁকে বলো। সাক্ষাৎ নিয়তির মতো উনি সব ঠিক করে দেবেন। উনি অনেকের মধ্যে অনেক মিলন অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটিয়ে থাকেন।

এক জায়গায় সবাই যখন বসে গল্প করছিল, একজন দূত এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল কাউন্ট লোথারিওর হাতে। কাউন্ট বললেন, তোমার মালিক কখন আসবেন?

কিন্তু দূত তা বলতে পারল না। এই অতিথি কে হাতে পারে এই নিয়ে সবাই যখন জল্পনা-কল্পনা করছিল তখন ফ্রেডারিক এসে হাজির হলো সবাইকে অবাক করে দিয়ে। আশ্চর্য হলো উইলেম যখন সে নিজের চোখে দেখল কাউন্ট লোথারিও ও নাটালিয়ার ভাই হচ্ছে তার অতিপরিচিত ফিলিনার বালকভৃত্য ফ্রেডারিক।

এদিকে উইলেমকে তাদের প্রাসাদে দেখে খুব খুশি হলো ফ্রেডারিক। বলল, ইনি যখন অভিনয় করতেন তখন আমি এদের সাজাতাম। ইনি আমার যথেষ্ট উপকার করেছেন। একবার ঘুষিবৃষ্টি হতেও আমাকে রক্ষা করেন।

ফ্রেডারিককে দেখে পুরনো দিনের অনেক কথা মনে পড়ল উইলেমের। একটু সরে গিয়ে ফ্রেডারিক তাকে বলল, ফিলিনার জন্য আমি তোমাকে ঈর্ষা করতাম। একদিন রাত্রে ফিলিনাই সাদা পোশাক পরে তোমার ঘরে যায়। এতে আমার ঈর্ষা আরো বেড়ে যায়। ছোকরা অফিসারের বেশে আমিই শেষের দিকটায় তার ঘরে ছিলাম। আমার সঙ্গে সে তোমাদের দল ছেড়ে চলে আসে এবং এখন একটা নির্জন প্রাসাদে আমার সঙ্গেই থাকে। গ্রামাঞ্চলের সেই প্রাসাদে আমরা বেশ সুখেই আছি।

ফ্রেডারিক চলে গেলে জার্নো এল উইলেমের কাছে। উইলেম বলল, এখানকার ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন দেখছি আমার থেরেসার প্রতি আর সে আসক্তি নেই।

সেদিন নাটালিয়ার পাশে উইলেম আর জার্নো বসেছিল। নাটালিয়া একসময় জার্নোকে বলল, কয়েকদিন ধরে দেখছি তুমি যেন কি ভাবছ সব সময়।

জার্নো বলল, হ্যাঁ সত্যিই তাই। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমি ভাবছি। অবশ্য ব্যাপারটা আমার বন্ধু উইলেমের উপর অনেকটা নির্ভর করছে। শোনো বন্ধু, অল্পদিনের মধ্যে তুমি আমার সঙ্গে আমেরিকা যাচ্ছ।

আকাশ থেকে পড়ল যেন উইলেম। আমেরিকা যাব। আমি একথা কখনও ভাবিওনি।

জার্নো বলল, আজ সারা পৃথিবীর মধ্যে আমেরিকা দ্রুত সমৃদ্ধি ও উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন দেশের লোক তাই সেখানে গিয়ে গড়ে তুলছে নূতন নূতন উপনিবেশ। গড়ে উঠছে কত রকমের কাজ-কারবার। তুমিও আমার সঙ্গে যেতে পার। অবশ্য দুটো বিষয়ের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে পার। হয় তুমি জার্মানিতে যেতে।

উইলেম বলল, তোমার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখতে হবে। এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না।

ফ্রেডারিক সব সময়ে বেশি কথা বলে। সে এই কথা শুনে ভ্রমণের গুণাগুণ সম্বন্ধে এক দীর্ঘ বক্তৃতা শুরু করে দিল। তারপর শেষকালে বলল, লিভিয়াকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। ব্যর্থ প্রেমের সব দুঃখ অন্তত সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দিতে পারবে। আমাদের বন্ধু উইলেম তো পরিত্যক্ত রমণীকে ভালোবেসে গ্রহণ করতে ওস্তাদ। না হয় তো আমিই লিভিয়াকে গ্রহণ করে আমেরিকা পাড়ি দিতে পারি।

জার্নো বলল, বড় দেরি হয়ে গেছে, আমি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।

নাটালিয়া বলল, ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে আহত নারীকে এ প্রস্তাব দান করা এক জঘন্য কাজ।

নাটালিয়া আরও কি বলতে যাচ্ছিল এমন সময় আব্বে এসে আর একটা প্রস্তাব উত্থাপন করলেন উইলেমের কাছে। বললেন, কাউন্টের কাকার বন্ধু এক ইতালীয় ভদ্রলোক আসছেন এখানে। উনি সমগ্র জার্মানি পরিভ্রমণ করবেন। উনি সঙ্গে এমন একজন জার্মান যুবক চান সে ভালো জার্মান ভাষা জানে এবং যে সামাজিক মেলামেশায় সক্ষম। আমরা তাই তোমাকেই ঠিক করেছি।

উইলেম বলল, আপনি বললেই যে মানতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমাকে ভেবে দেখতে হবে ব্যাপারটা। তাছাড়া আমি গেলে আমার ছেলে ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।

আব্বে বললেন, তা কি সম্ভব হবে?

একমাত্র নাটালিয়ার উপস্থিতি ছাড়া আর কারও উপস্থিতি ভালো লাগছিল না উইলেমের। তবে নাটালিয়া কাছে থাকলেও ওদের যে কোনও প্রভাব বিসদৃশ ঠেকছিল উইলেমের কাছে। মনে হচ্ছিল এক-একটা প্রস্তাব হলো তাকে এখান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলার এক-একটা হীন চক্রান্ত। মনে হচ্ছিল বিয়ে বা নিবিড় পারিবারিক সুখশান্তি তার ভাগ্যে আর নাই। মেরিয়ানাকে সে প্রথমে ভালোবেসেছিল, কিন্তু পায়নি। তারপর ফিলিনার প্রতি তার প্রেমাসক্তি জাগে, কিন্তু তাকেও কাছে পায়নি। তারপর অরেলিয়ার। অকাল মৃত্যু তার প্রতি তার আসক্তিকে ঘন হতে দেয়নি। পরিশেষে তার বারবার প্রতিহত ও ব্যর্থ প্রেমের নদীটি ক্লান্ত থেরেসার বুকে চিরতরে ঢলে পড়তে চায় ক্লান্ত হয়ে, কিন্তু এরা তাও হতে দিল না। এখন শুধু বাকি আছে নাটালিয়া।

ফেলিক্সকে কোলে করে বুকে চেপে ধরে কিছুটা শান্তি পেল উইলেম। সেই ইতালীয় ভদ্রলোক হঠাৎ এসে পড়লেন। সকলের সঙ্গে আলাপ করার পর উইলেমের সঙ্গেও আলাপ-পরিচয় হলো। ইতালির লম্বার্ডি অঞ্চলের লোক। বয়স অল্প।

ইতালীয় ভদ্রলোক তাঁর পরিচয়ের যে পূর্ণ বিবরণ লিখে এনেছিলেন তাতে অনেক আশ্চর্য নূতন কথা জানা গেল। অনেক জটিলতার জট খুলল। তাতে জানা গেল, বৃদ্ধ বীণাবাদক তাঁর অর্ধোন্মাদ ভাই অগাস্টিন এবং মিগনন তার স্পেরাবা নামে এক বোনের বিকলাঙ্গ মেয়ে, সমুদ্রতীরের একটি বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল। স্পেরাবা থাকত কনভেন্টে। সেখান থেকে সে চুরি হয়ে যায়। তার টুপিটা সমুদ্রের এক খাড়ির জলে। ভাসতে দেখা যায়। লোকে ভাবে সে জলে ডুবে গেছে। মিগননা তাঁর ভাইঝি। ভাইঝির মৃত্যুসংবাদে মার্শেজী কাতর হলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভাইঝির ত্রাণকর্তা উইলেমের প্রতি জানালের অকৃত্রিম মমতা।

উইলেমকে মার্শেজী বললেন, আপনি ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে চলুন। দেখবেন মিগননের জন্মস্থান, তার বাল্যের লীলাভুমি। আপনি তাকে স্নেহ করতেন।

এমন সময় সহসা কাউন্টপত্নী এসে হাজির হলেন। উইলেমের হাতটা ধরে একটু চাপ দিয়ে তার মুখপানে গভীর দৃষ্টিতে একবার তাকালেন। তারপর তার বোন। নাটালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

আগে মার্শেজীর হাতে লেখা বিস্তৃত বিবরণটি সকলের সামনে পড়ে শোনালেন। হতভাগ্য মিগনন ও বৃদ্ধ বীণাবাদক প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে দুঃখে ভারী হয়ে উঠল সকলের হৃদয়। ভাগ্য বিড়ম্বনার এই সব সকরুণ কাহিনী শুনে অনেকে চোখের জল মুছতে লাগলেন।

একমাত্র মিগননের কথা ভেবেই ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে মার্শেজীর সঙ্গে প্রথমে জার্মানি ও পরে ইতালি যেতে চাইলেন উইলেম। তার ভাইঝি মিগননের প্রতি সদয় ব্যবহার ও স্নেহপ্রীতির জন্য উইলেমকে মোটা রকমের সম্পত্তি দান করতে চান মার্শেজী। ওর ছেলের বাড়িতে গেলে উনি উইলেমকে তা দেবেন। আপাতত কিছু মূল্যবান ধাতু ও রত্ন উপহার দিলেন।

উইলেম ডাক্তারের কাছে লোক পাঠাল বীণাবাদকের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। সে ভালো হয়ে উঠলেও তাকেও নিয়ে যাবে সঙ্গে করে।

উইলেম এদিকে লক্ষ্য করল থেরেসা ক্রমশই কাউন্ট লোথারিওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। তারা হয় তো চাইছে যে সে এখান থেকে চলে গেলেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা।

ডাক্তার লোক মারফৎ কোনও খবর না পাঠিয়ে নিজে এলেন। এসে অদ্ভুত একটা খবর দিলেন। বললেন বীণাবাদক এখন দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে নূতন মানুষ হয়ে উঠেছে। ভাক্তারকে এবার তার আসল পরিচয়ের কথা বলা হলো। বলো হলো তার আসল নাম অগাস্টিন। খ্যাতিসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক।

অগাস্টিনকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তার আসল পরিচয় তাকে বলা হলো না। মার্শেজীকেও বলা হলো না। ওরা সকলে ভাবল বীণাবাদকরূপী অগাস্টিন সত্যিই ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু অগাস্টিন সকলের সঙ্গে ভালোভাবে কথাবার্তা বললেও ফেলিক্সকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তাকাচ্ছিল তার দিকে। ওরা কেউ বুঝতে পারল না তার ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিটা তখনও অবদমিত হয়নি একেবারে।

একদিন সকলে বসে গল্প করছিল। উইলেম কবে রওনা হবে তা নিয়ে কথা হচ্ছিল এমন সময় ব্যস্তভাবে অগাস্টিন উন্মাদের মতো ঘরে ঢুকল। তার মধ্যে হঠাৎ উন্মত্ততা জেগে উঠেছে দেখে সকলে তাকে ধরে ফেলল। সে তখন স্বাভাবিক মানুষের মতো বলে উঠল, আমাকে নয়, ছেলেটাকে পার তো বাঁচাও গে। আমি তাকে বিষ খাইয়েছি।

সকলে ছুটে গেল ফেলিক্সের কাছে। দেখল একটা টেবিলের সামনে ফেলিক্স বসে রয়েছে। তার সামনে টেবিলে রয়েছে একটি গ্লাস ও একটি বোতল। গ্লাসের জলে মাত্রাতিরিক্ত আফিম মিশিয়ে দিয়েছিল অগাস্টিন। ফেলিক্সকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে বলল, গ্লাসের জল খেয়েছি। তখন হতাশ হয়ে উইলেম মাথা চাপড়াতে লাগল। ভাবল ফেলিক্সকে আর বাঁচানো যাবে না।

ডাক্তারকে ডাকা হলো। ডাক্তার বললেন, চেষ্টার কোনও ত্রুটি হবে না। নাটালিয়া ফেলিক্সকে কোলে করে বসে রইল। তার পা দুটো রইল উইলেমের কোলে। ভিড় দেখে কাঁদছিল ফেলিক্স। সারারাত এইভাবে কাটল। নাটালিয়া সামনে বসে রইল। নাটানিয়ার হাতে প্রায়ই হাত ঠেকছিল উইলেমের। নাটালিয়া তার পানে তাকাচ্ছিল শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টিতে।

এদিকে অগাস্টিনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকাল হতেই একজন এসে খবর দিল অগাস্টিন উপরতলার একটি ঘরে রক্তাল্পত অবস্থায় পড়ে আছে। পাশে একটা ধারাল ক্ষুর। সেই ক্ষুর দিয়ে নিজের গলার শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছে অগাস্টিন।

ডাক্তার গিয়ে অতিকষ্টে রক্ত বন্ধ করে গলায় ব্যান্ডেজ করে দিল। কিন্তু কিছু পরে অগাস্টিন বলল, আমি মার্শেজীর লেখাটা এক জায়গায় পড়ে থাকতে দেখে সব জানতে পারি। তখন দেখি এত কাণ্ডের পর আর আমার বেঁচে থাকার কোনও অর্থ হয় না। তাই আত্মহত্যা করলাম।

পরে ফাঁক পেয়ে নিজের হাতের ব্যান্ডেজ সরিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষণের ফলে মারা গেল অগাস্টিন।

এদিকে ফেলিক্সের অবস্থা আগেই মতোই রইল। ডাক্তার নাড়ি টিপে দেখল কোনও বিকার নেই। বিষক্রিয়ার কোনও কুফল দেখা গেল না। অনেকে নিশ্চিন্ত হলো। কিন্তু একা উইলেম বলল, এখনও বিপদ কাটেনি। ফেলিক্স বলেছে ও গ্লাসের জল খেয়েছে।

কিছু পরে নাটালিয়া ফেলিক্সকে কোলে করে অন্যত্র নির্জনে নিয়ে গেল। সেখানে নাটালিয়ার প্রশ্নের উত্তর ফেলিক্স শান্তভাবে সবল সে গ্লাসের জল খেয়েছে। সে কথা নাটালিয়া এসে সকলকে জানাতে নিশ্চিত হলো। সংশয়মুক্ত হলো উইলেম।

এবার যাবার দিন হয়ে গেল। আব্বেও যাবেন। রওনা হতে আর দুদিন বাকি। কাউন্টপত্নী সকলের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যাবার সময় নাটালিয়াকে গোপনে কি বলে গেলেন।

ফ্রেডারিক এসে হঠাৎ একটা খবর দিল সকলের সামনে! উইলেমকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, আমি সব শুনেছি। নাটালিয়ার সঙ্গে তোমার বিয়ের সব ঠিকঠাক। একটি রুদ্ধদার ঘরে আব্বেকে তার মনের কথা বলছিল নাটালিয়া। সে কথা আমি শুনেছি। ফেলিক্সের অসুখের সময় সেই অতন্দ্র রাত্রিতে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে। উইলেমকেই বিয়ে করবে।

এদিকে কাউন্ট লোথারিও উইলেমকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমার বিয়ে না হলে আমার বিয়েও হবে না। থেরেসার সঙ্গে নাটালিয়ার এক চুক্তি হয়েছে। থেরেসার ইচ্ছা দুটি দম্পতি একসঙ্গে উপস্থিত থাকবে বিবাহের বেদীতে। লোথারিও উইলেমকে জড়িয়ে ধরে নাটালিয়ার কাছে নিয়ে গেলেন। ওদিক থেকে থেরেসা সঙ্গে করে নিয়ে এল নাটালিয়াকে।

ফ্রেডারিক ঠাট্টা করে বলল, আমার যত সব পুরনো কথা মনে পড়ছে। লজ্জার কিছু নেই। আজ তোমার সুখ দেখে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে কিশোর পুত্র মলের কথা।

যে তার বাবার গাধা খুঁজতে গিয়ে এক রাজ্য পেয়ে যায়।

উইলেম বলল, রাজ্য লাভ করেছি কিনা জানি না। তবে একটা জিনিস বলতে পারি। আজ যে সুখ আমি লাভ করলাম তার আমি যোগ্য নই এবং এ সুখের বিনিময়ে অন্য কোনও কিছু গ্রহণ করতে পারব না সারা জীবনের মধ্যে।

এ ফেয়ারি টেল (গল্প)

এ ফেয়ারি টেল (গল্প)

সারা দিনের কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে নদীর ধারে তার কুঁড়েঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিল ফেরিঘাটের বৃদ্ধ মাঝি। নদীটা বড়। তার উপর সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে। মাঝরাতে হঠাৎ এক প্রবল চিৎকারে ঘুম থেকে আচমকা জেগে উঠল মাঝি। বুঝল জনকতক পথিক নদী পার হওয়ার জন্য তাকে ডাকছে।

কুঁড়ের দরজা খুলেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে চমকে উঠল মাঝি। অবাক হয়ে দেখল ঘাটের কাছে বাঁধা তার নৌকোর পাশে দুজন পরী নাচছে। বড় সুন্দর সে নাচ। পরী দুটি ছিল পথিকদের সঙ্গে। তারা মানুষের মতো গলায় মাঝিকে বলল, যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি তাদের পর করে দিতে হবে।

মাঝিও দেরি না করে নৌকো ছেড়ে দিল। পথিকরা দুর্বোধ্য ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছিল আর হাসছিল। মাঝে মাঝে নাচানাচি করছিল আর তাতে নৌকোটা দুলছিল। মাঝি বলল, এতে নৌকো উল্টে যেতে পারে। কিন্তু এ কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিয়ে আরও বেশি দাপাদাপি শুরু করে দিল।

যাই হোক, অবশেষে নৌকো নদীর ওপারে গিয়ে ভিড়ল। পথিকরা তখন কতকগুলো সোনার টাকা নৌকোর পাটাতনে ফেলে দিয়ে বলল, এই নাও তোমার পারিশ্রমিক।

মাঝি বলল, তোমাদের সোনার টাকা ফিরিয়ে নাও। এতে তোমাদেরও বিপদ ঘটতে পারে। আমারও বিপদ হতে পারে। একটুকরো সোনা যদি কোনওরকমে নদীর জলে পড়ে যায় তাহলে নদী আমাকে ও আমার নৌকোটাকে গ্রাস করে ফেলবে।

পথিকরা বলল, আমরা যা একবার দিই তা ফিরিয়ে নিই না।

মাঝি তখন সোনার টাকাগুলো কুড়িয়ে তার টুপির মধ্যে ভরে নিয়ে বলল, এগুলো তাহলে আমি নদীর ধারে মাটিতে পুঁতে ফেলব।

এমন সময় পরী দুজন নৌকো থেকে নেমে চলে যাচ্ছিল। মাঝি বলল, তোমরা আমার পারের কড়ি দিয়ে যাও।

পরীরা বলল, যে লোক সোনা নেয় না সে লোকের কোনও মজুরি পাওয়া উচিত নয়।

মাঝি বলল, পৃথিবীর মাটিতে জন্মানো ফল ছাড়া আমি কিছু নিই না। আমাকে তিন রকমের ফল দিতে হবে। আমার পারের কড়ির বদলে।

পরীরা বলল, পরে দেব। এই বলে তারা চলে গেল। মাঝিও নৌকো ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিল, কিন্তু নদী পার না হয়ে সেই দিকের তীর ঘেঁষে নিচে নেমে যেতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর নদীর ধারে একটা পাহাড় দেখতে পেল। আরও দেখল পাহাড়ের মাঝখানে একটা প্রকাণ্ড খাদ। মাঝি সেই খাদের ভিতর সোনার টাকাগুলো সব ছুঁড়ে দিল। তারপর নৌকো ঘুরিয়ে সে চলে গেল।

সেই খাদের ভিতর এক মায়াবী রাক্ষসী থাকত। সোনার প্রতি তার খুব লোভ ছিল। সে সোনার টাকাগুলো একে একে সব গিলে ফেলল। তার সঙ্গে সঙ্গে তার গা দিয়ে এক জ্যোতি বার হতে লাগল। কোথা থেকে এই সোনা এল তা জানার জন্য গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ল রাক্ষসী। যে দিকে যে পথে সে যেতে লাগল, তার গা থেকে বার হওয়া আলোর ছটায় আলোকিত হয়ে উঠল রাত্রির সে অন্ধকার পথ। সে আলোর ছটায় গাছের পাতাগুলো পান্নার মতো সবুজ ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। রাক্ষরী যদিও পাহাড় আর শুকনো প্রান্তর ভালোবাসে, তথাপি সে জলাশয়ের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত যেতে লাগল। অবশেষে সে সেই পরী দুজনের দেখা পেল। সুন্দর পরীদের দেখে তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা হলো।

রাক্ষসী পরীদের জিজ্ঞাসা করল কোথা থেকে সোনার টাকাগুলো এসেছে তার সন্ধান তারা দিতে পারে কি না। সে বলল, আমি যখন আমার পাহাড়ের খাদের ভিতর বসেছিলাম তখন মনে হলো স্বর্গ থেকে একরাশ সোনার টাকা ঝরে পড়ল আমার মুখে।

পরীরা বলল, এই কথা? আচ্ছা এই নাও। এই বলে তারা যতই গা নাড়া দিতে লাগল ততই সোনার টাকা ঝরে পড়তে লাগল। সে টাকা সংখ্যায় এত বেশি যে রাক্ষসী তা খেয়ে শেষ করতে পারছিল না। সেই সব সোনার টাকা খেয়ে আরও বেড়ে গেল রাক্ষসীর দেহগ্রাত্রের উজ্জ্বলতা। এদিকে পরীদের সেই হতে আলোর ছটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল। যাই হোক, রাক্ষসী বলল, তোমরা আমাকে অনেক দিয়েছ, কি বর চাও বলো।

পরীরা বলল, সুন্দরী পদ্ম কোথায় থাকে বলতে পার? তুমি আমাদের তার প্রাসাদে এখনি নিয়ে চলো।

এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাক্ষসী বলল, এ বর তো এত তাড়াতাড়ি দান করতে পারব না। পদ্মা থাকে নদীর ওপারে। এই দুর্যোগপূর্ণ রাত্রিতে নদীর পার হওয়া সম্ভব নয়।

পরীরা বলল, দুষ্ট নদীটা আমাদের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু ও আমাদের মাঝে এক ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু মাঝিকে ডাকো।

রাক্ষসী বলল, মাঝি এপারের লোককে নিয়ে যাবে ওপারে। কিন্তু ওপারের লোককে যাকে একবার পার করেছে তাকে সে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না। তবে আগামী কাল দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে আমি নিজেই তোমাদের পার করে দেব।

পরীরা বলল, কিন্তু দিন দুপুরে তো আমরা পার হই না, বা কোথাও যাওয়া-আসা করি না।

রাক্ষসী বলল, তাহলে কাল সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তাহলে তোমরা এক দৈত্যের ছায়ার উপর ভর করে নদী পার হতে পারবে।

পরীরা বলল, তা কি করে সম্ভব?

রাক্ষসী বলল, নিকটেই এক রাক্ষস বাস করে। তার দেহটা এমনই দুর্বল ও অশক্ত যে সে তার হাত দিয়ে একটা তৃণখণ্ডও তুলতে পারে না। তার ছায়াই সব কাজ করে। তাই সে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সন্ধের সময় দৈত্য নদীর ধারে এলে তার ছায়ার উপর তোমরা চেপে বসলেই সে তোমাদের পার করে দেবে।

তখন পরীরা ও রাক্ষসী আপন আপন জায়গায় চলে গেল। রাক্ষসী তার পাহাড়ের খাদের ভিতরে গিয়ে এক সুড়ঙ্গপথ দিয়ে আরও গভীরে যেতে লাগল। অন্ধকারে তার গায়ের আলোকছটায় পথ চিনে চিনে সম্প্রতি সে এই সুড়ঙ্গটাকে আবিষ্কার করেছে। সেই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে গুঁড়ি মেরে গিয়ে একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছল রাক্ষসী। দেখল মার্বেল পাথরের এক বিরাট মন্দির চত্বরের ওপর এক বিশাল সোনার মূর্তি। দেখল কোনও এক রাজার প্রতিমূর্তি। দেহটা বিশাল হলেও মাথাটা ছোট।

রক্ষসীকে দেখে প্রতিমূর্তিটি জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলতে লাগল।

রাক্ষসীকে বলল, সোনার থেকে দামী কি?

রাক্ষসী উত্তর করল আলো।

রাজা জিজ্ঞাসা করল, আলোর থেকে স্বচ্ছ কি?

রাক্ষসী বলল, কথা।

কথা বলতে বলতে রাক্ষসী আর এক জায়গায় চোখ পড়তে দেখল রূপোর এক প্রতিমূতি। এটিও কোনো এক রাজার। তার মুকুট ও রাজদণ্ড মূল্যবান ধাতু দিয়ে সজ্জিত। মূর্তিটির পিছনের দেওয়ালের ছিদ্র দিয়ে আলো আসছিল। তাতে রাক্ষসী আর একটি পিতলের তৈরি প্রতিমূর্তি দেখতে পেল। কিন্তু পরে আর একটি মূর্তি দেখতে পেল।

রাক্ষসীর কি মনে হলো সে চতুর্থ প্রতিমূর্তিটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু এমন সময় একটি বাতি হাতে এক বৃদ্ধ কৃষক কোথা থেকে সেখানে এসে হাজির হলো। তাকে দেখে সোনার রাজমূর্তিটি বলে উঠল, এখানে আমাদের আলো আছে।

তুমি আবার আলো নিয়ে এলে কেন?

বৃদ্ধ বলল, তুমি তো জান আমি কোনও অন্ধকারকে আলোকিত করতে পারি না।

রূপোর রাজমূর্তিটি বলল, আমার রাজ্য কখন ধ্বংস হবে?

বৃদ্ধ লোকটি বলল, অনেক দেরি আছে।

পিতলের রাজমূর্তি বলল, আমার কখন উত্থান ঘটবে?

বৃদ্ধ বলল, খুব শীঘ্রই।

রূপোর রাজা বলল, আমি কার সঙ্গে মিলিত হব?

বৃদ্ধ বলল, তোমার বড় ভাই-এর সঙ্গে?

রূপোর রাজা বলল, ছোট ভাই-এর কি হবে?

বৃদ্ধ বলল, তার মৃত্যু ঘটবে।

চতুর্থ রাজমূর্তিটি বলল, আমি কিন্তু এখনও ক্লান্ত হয়ে উঠিনি।

ইতিমধ্যে রাক্ষসী গোটা মন্দিরটা ঘুরে চতুর্থ রাজার কাছে গিয়ে দেখল তার সুন্দর মুখে বিষাদ জমে রয়েছে। মূর্তিটি কি ধাতুতে তৈরি তা ঠিক বোঝা গেল না। তবে মনে হলো সোনা, রূপো আর পিতল অর্থাৎ যে তিনটি ধাতু দিয়ে তার তিন ভাই-এর মূর্তিগুলো গঠিত সেই তিন ধাতুর মিশ্রণে ও সমন্বয়ে তার প্রতিমূর্তিটি গড়া। তবে গঠনকার্যে কিছু ত্রুটি থাকায় ধাতুগুলো ঠিকমতো মিশ্রিত হয়নি।

সোনার রাজা বৃদ্ধকে বলল, তুমি কতগুলো ধাঁধা বা রহস্য জান?

বৃদ্ধ বলল, তিনটি।

রাজা বলল, কোনটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

বৃদ্ধ বলল, যেটি আগেই প্রকাশিত হয়েছে?

পিতলের রাজা তখন বলল, তুমি ওটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেবে?

বৃদ্ধ উত্তর করল, চতুর্থ ধাঁধাটি না জানা পর্যন্ত পারব না।

চতুর্থ রাজা বলল, আমি গ্রাহ্য করি না তোমাদের।

রাক্ষসী বলল, আমি চতুর্থ ধাঁধাটি জানি। রাক্ষসী বৃদ্ধের কাছে গিয়ে তার কানে কানে কথাটা বলল।

বৃদ্ধ হঠাৎ চিৎকার করে গম্ভীর গলায় বলল, সময় হয়ে গেছে।

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কথাটার তীব্র প্রতিধ্বনি চারদিকে শোনা যেতে লাগল। প্রতিমূর্তিগুলো কাঁপতে লাগল। তখন বৃদ্ধ লোকটি পশ্চিম দিকে ও রাক্ষসী পূর্ব দিকে চলে গেল।

বৃদ্ধ বাতি হাতে যেদিকেই যেতে লাগল সেদিককার সব পাথর সোনা, সব গাছ রূপো আর সব জীবজন্তু মূল্যবান ধাতুতে পরিণত হয়ে উঠল। কিন্তু তার বাতির আলো অন্য কোনও আলোর কাছে কাজ করে না। শুধু এক নরম আলো বিকীরণ করে। বৃদ্ধ তাঁর কুঁড়েঘরে ফিরে দেখল তার স্ত্রী বসে বাসে কাঁদছে। তার স্ত্রী বলল, তোমাকে আজ বাইরে যেতে দিয়ে কি ভুলই না করেছি।

বৃদ্ধ বলল, কি হয়েছে? বৃড়ি বলল, দুজন পরী এসে আমাদের দেওয়ালে যে সব সোনা ছিল তা সব তুলে নিয়েছে। পরে তারা গা ঝাড়া দিতে কিছু সোনার টুকরো তাদের গা থেকে ঝরে পড়ে আর তাই থেকে একটা টুকরো আমাদের প্রিয় কুকুর খেয়ে ফেলতেই সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। এতে আমার মনে দারুণ দুঃখ হয়। এমন জানলে আমি তাদের ঘাটের মাঝিকে তাদের ঋণ শোধের দায়িত্ব নিতাম না।

বৃদ্ধ বলল, ঋণটা কি?

বুড়ি বলল, তিনটে পিঁয়াজ আর তিনটে করে দুরকমের ফুল।

বৃদ্ধ বলল, তুমি তোমার কথামতো তাদের কাজ দেবে। ওরা সাধ্যমতো আমাদের উপকার করবে।

বুড়ি বলল, আমি কাল সকালেই নদীর ধারে মাঝিকে তা দিয়ে দেব।

বৃদ্ধের ঘরের ভিতর এতক্ষণ যে আগুন জ্বলছিল তা নিবিয়ে যেতে বৃদ্ধ তার বাতিটা আবার জ্বালল। সেই রহস্যময় বাতির আলোয় চারদিকের পাথরের দেওয়ালগুলো সব সোনা হয়ে গেল। আর তাদের মরা কুকুর হয়ে উঠল অতি মূল্যবান এক উজ্জ্বল ধাতু। বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে বলল, একটি ঝুড়িতে এই মূল্যবান পাথরটি আর ফুলগুলো সাজিয়ে তুমি পদ্মের কাছে চলে যাও। রাক্ষসীর পিঠে নদীর ওপারে গিয়ে তুমি চলে যাবে সুন্দরী পদ্মের প্রাসাদে। যে পারথটিকে একবার ছুঁলেই আমাদের কুকুর আবার প্রাণ ফিরে পাবে। পদ্মকে বলবে, তার দুঃখের দিন শেষ হয়ে এসেছে। তার সব বিপদ সব দুঃখ সুখে পরিণত হবে।

বুড়ি তার ঝুড়িতে সব কিছু সাজিয়ে সকাল হতেই বার হয়ে পড়ল তার কুঁড়ে থেকে। এ ঝুড়িতে মরা কোনও জীবজন্তু একেবারে হালকা হয়ে যায়। কিন্তু কোনও টাটকা শাকসজী ভীষণ ভারী হয়ে ওঠে। বুড়ির তাই ঝুড়ি মাথায় পথ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। নদীর কাছাকাছি যেতেই বুড়ি দেখল, সেই দৈত্যটা নদীর জল থেকে উঠে আসছে। সে বুড়ির কাছে এসে তার ঝুড়ি থেকে একটা করে ফুল খেয়ে ফেলল।

বুড়ি একান্তে ভাবল তার বাগানে গিয়ে ফুলগুলো আবার নিয়ে আসবে। কিন্তু ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় কেটে গেল। এদিকে ফেরিঘাটের মাটিও এসে গেল। মাঝির নৌকোতে এক পথিক ছিল। মাঝিকে দেখে বুড়ি বলল, সেই পরীদের ঋণ মেটাতে এসেছি। এই নাও তোমার জিনিস। কিন্তু মাঝি দুটি করে ফুল দেখে রেগে গেল। বুড়ি অনুনয় বিনয় করে বলল, এখন থেকে নয় ঘণ্টার মধ্যে আমি বাড়ি থেকে বাকি ফুলগুলো এনে দেব। কিন্তু মাঝি বলল, নদীর ভাগ না নিয়ে আমি এর থেকে কিছু নিতে পারব না। তুমি তাহলে নদীর জলে তোমার হাত ডুবিয়ে শপথ করো, তুমি বাকি ফুল এনে দেবে যথাসময়ে।

বুড়ি তাই করল। কিন্তু জল থেকে হাতটি বার করে আনতে দেখল তার ফর্সা হাতটা কালো হয়ে গেছে। মাঝি বলল, তুমি ঋণ শোধ করে দিলেই হাতটা আবার সাদা হয়ে উঠবে। না দিলে ঐ রকমই রয়ে যাবে চিরকাল।

বুড়ি বলল, না, আমি ঋণ শোধ করে দেব। এই বলে সে ঝুড়ি নিয়ে চলে গেল। ফুল না থাকায় ঝুড়িটা খুব হালকা বোধ হচ্ছিল। সে নদীর ধার দিয়ে যেতে যেতে দেখল মাঝি যে যুবক পথিককে নদী পার করে এনেছিল সেই যুবকটি নদীর বালুচরের উপর দিয়ে কোথায় হেঁটে চলেছে। যুবকটি দেখতে খুব সুন্দর। তার সঙ্গে কথা বলার অনেক চেষ্টা করল বুড়ি। কিন্তু যুবকটি হেঁটে যেতে লাগল। অবশেষে বুড়ি তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলল, তুমি আমার সঙ্গে হাঁটাতে পেরে উঠবে না। আমি সবুজ রাক্ষসীর সাহায্যে নদী পার হয়ে সুন্দরী পদ্মের কাছে যাব।

এ কথা শুনে যুবক বলল, আমিও যাব সেখানে। কিন্তু কি উপহার নিয়ে যাচ্ছ?

বুড়ি বলল, আমি আমার গোপন কথা কিছুই বলব না যদি তুমি তোমার কথা না বল।

বুড়ি প্রথমে তার সব কাহিনী বলতে যুবকটি ঝুড়ি থেকে পাথরের মপকে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। সে বলল, আমারও একদিন রাজ্য ছিল, ধনদৌলত ছিল। কিন্তু এখন আমার কিছুই নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব।

কিন্তু তার নিজের জীবনকাহিনীর কথা কিছু বলল না। বুড়ির কৌতূহল কিন্তু মিটল না। যুবকটি বরং বুড়ির কাছে জানতে চাইল, বাতি হাতে সেই বৃদ্ধ লোকটি কে, সেই রহস্যময় বাতির আলোর অর্থ কি এবং তার দুঃখের শেষ কি করে হবে।

কথা বলতে বলতে দূরে নদীর উপর এক বিরাট সেতু দেখতে পেল তারা। সেতুটা সূর্যের আলোয় অতিশয় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। এত উজ্জ্বল বস্তু কখনও তারা দেখেনি।

তারা পান্নার মতো সবুজ ও উজ্জ্বল সেতুর উপর দিয়ে নদী পার হয়ে লাগল। কিন্তু ওপারে না পৌঁছুতে সেতুটা সেই সবুজ রাক্ষসীর চেহারায় পরিণত হলো। সে তখন তার পিঠে করে তাদের ওপারে পৌঁছে দিল। তারা ধন্যবাদ দিল রাক্ষসীকে।

এখান থেকে ওরা যাবে পদ্মের প্রাসাদে। তারা সেখানে কোনও লোক চোখে না দেখলেও কাদের ফিসফিস কথা কানে এল তাদের। বুঝল আরও জনকতক লোক পদ্মের কাছে যাবে সন্ধের সময়।

ঝুড়ি নিয়ে বুড়ি সন্ধে হতেই পদ্মের বাগানে চলে গেল একা। সে দেখল পদ্ম বীণা সহযোগে গান গাইছে আর গানের সুরের যাদুতে মাতাল হয়ে উঠছে চারদিকের বাতাস, হ্রদের জলে ঢেউ জাগছে। বুড়ি বলল, তোমাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম তার থেকে তুমি এখন অনেক সুন্দর হয়ে উঠেছ পদ্ম।

পদ্ম নিজের প্রশংসা মোটেই শুনতে চাইল না। সে বলল, আমার একটি ছোট পাখি ছিল। আমার বীণার উপর বসে গান করত। একটু আগে সে মারা যায়। তার কবর থেকে আর একটি গাছ গজিয়ে উঠবে আমার বাগানে। আমি যাদের ভালোবাসি তাদের মৃতদেহ কবর দিয়ে তার উপর একটি গাছের চারা বসাই।

বুড়ি বলল, সে কোনও দুঃখ ও বিপর্যয়ের অবসান হবেই। তারপরেই আবার সুখ। কোনও চিন্তা নেই। আমি তাহলে চলি। নদীকে আমার প্রতিশ্রুত ফুলগুলো এনে না দিলে আমার হাতটা এমনি কালো আর ছোট রয়ে যাবে।

যাবার সময় ঝুড়ি থেকে সেই পাথরটা বার করে বলল, এটা আমার স্বামী উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছে তোমাকে। আমাদের কুকুর মপ পাথর হয়ে গেছে। একে তুমি জীবন দান করে নিজের কাছে রেখে দেবে। এ তোমাবে বড় আনন্দ দেবে। আমরা। তাতেই সুখী হব।

পদ্ম বলল, তুমি তাহলে আমার পাখিটিকে নিয়ে যাও। তোমার স্বামীকে বলে এর মৃতদেহটিকে পাথরে পরিণত করে দেবে। পরে আমি একে জীবন দান করে আবার পাখিতে পরিণত করব। তখন এই পাখি আর তোমাদের মপ আমার কাছে থেকে আমাকে আনন্দ দান করবে।

বুড়ি ঝুড়ি মাথায় করে চলে যেতেই সবুজ রাক্ষসী এসে হাজির হলো। এসে পদ্মকে বলল, মন্দির নির্মিত হয়ে গেছে।

পদ্ম বলল, কিন্তু সে মন্দির নদীর উপরে দাঁড়িয়ে নেই কেন?

রাক্ষসী বলল, আমি রাজাদের সঙ্গে দেখা করেছি ও কথা বলেছি।

পদ্ম বলল, কখন তারা জানাবে?

রাক্ষসী বলল, আমি নিজের কানে এক আকাশবাণী শুনেছি, সময় হয়ে গেছে। আর দেরি নেই।

পদ্মের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এমন সময় তার তিনজন সহচরী এসে প্রস্তুত হয়ে উঠল তার সেবার জন্য। পদ্ম তখন সেই পাথরটার উপরে ঝুঁকে কি করতেই মপ বেঁচে উঠল। মপকে নিয়ে খেলায় মেতে উঠল পদ্ম। চমৎকার দেখতে কুকুরটা। তাকে কোলে নিয়ে মাঝে মাঝে বুকে চেপে ধরে চুম্বন করতে লাগল। মপকে পেয়ে বেশ খুশিমনে খেলা করছিল পদ্ম। কিন্তু হঠাৎ সেই বিষণ্ণ যুবকটি এসে পড়ায় বাধা পেল পদ্ম। যুবকের হাতে ছিল সেই বাজপাখিটা যে পদ্মের ছোট পাখিটাকে আজই হত্যা করে।

যুবকের হাতে বাজপাখিটিকে দেখেই রেগে গেল পদ্ম। বলল, ও পাখি নিয়ে এখানে আসা তোমার উচিত হয়নি।

যুবক বলল, এর জন্য আমার পাখিকে দোষ না দিয়ে তোমার ভাগ্যকে দোষ দেওয়া উচিত।

এদিকে পদ্মের আদর পেয়ে মপের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। সে আরও আদর চাইতে লাগল পদ্মের কাছে। পদ্মও তার ঘাড়ে-মাথায় হাত বোলাতে লাগল। এবার হাততালি দিয়ে মপকে যেতে বলল পদ্ম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছুটে গিয়ে ফিরিয়ে আনল। তারপর তাকে কোলে নিয়ে বসিয়ে বুকের উপর চেপে ধরে ঠোঁট দিয়ে চুম্বন করতে লাগল।

যুবকটি তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল বিস্ময়ে। সে বলল, আমি তোমার জন্য সর্বস্বান্ত হয়েছি। আমাকে কি এই দৃশ্য দেখতে হবে? সামান্য একটা ইতর প্রাণী তোমার ভালোবাসা, তোমার বুকের স্বর্গ আর চুম্বন আলিঙ্গনের মাধুর্য লাভ করেছ তা আমাকে নিজের চোখে দেখতে হবে? আমি কি তাহলে ঐ মাধুর্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়ে নদীতীরের নির্জন পথ ধরে অজানার দিকে চলে যাব? না তা যাব না, তোমার বুকে যদি পাথর থাকে তাহলে আমি সে পাথরে পরিণত হব। তোমার স্পর্শে যদি মৃত্যু থাকে তাহলে আমি সেই মৃত্যু লাভ করব।

এই বলে পদ্মের দিকে এগিয়ে গেল যুবকটি। পদ্ম হাত বাড়িয়ে নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু যুবকটি তা শুনল না। অবশেষে পদ্মকে জোর করে স্পর্শ করতেই যুবকটির প্রাণহীন দেহটি ঢলে পড়ল মাটিতে। শোকে-দুঃখে চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল পদ্মর। তার সহচরীরা তাকে হাতির দাঁতের চেয়ারে বসিয়ে বীণা বাজিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে লাগল। রাক্ষসী বলল, বাতি হাতে সেই বৃদ্ধকে ডেকে পাঠাও। এখনও আশা আছে।

এমন সময় ঝুড়ি মাথায় সেই বুড়ি এসে হাজির হলো। বলল, নদীর কাছে আমি ঋণী বলে মাঝি বা দৈত্য আমাকে নদী পর করতে চাইছে না। এদিকে আমার হাতটা আরও কালো ও ছোট হয়ে যাচ্ছে।

রাক্ষসী বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে, কোনও চিন্তা নেই। তুমি তোমার স্বামীকে পাঠিয়ে দাওগে। তুমি যাও, সেই পরীদের দেখতে পাবে। চোখে না দেখলেও তাদের কথা শুনতে পেয়ে অনুরোধ করবে। তারা অথবা দৈত্য তোমাকে নদী পার করে দেবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশে একটি বাজপাখি দেখতে পেল রাক্ষসী। তার লালচে পাখাগুলো সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। তারপরেই বাতি হাতে সেই বৃদ্ধ এসে হাজির হলো। তাকে দেখে পদ্ম বিশেষ খুশি হলো। বলল, এত তাড়াতাড়ি কেমন করে তুমি এলে?

বৃদ্ধ বলল, আমার হাতের বাতি যখন নিভে আসে তখন আমি বুঝতে পারি কোথাও আমার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর তখনি আমি আকাশে মুখ তুলে তাকাই। দেখি একটি বাজপাখি আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

যাই হোক, বাতি হাতে বৃদ্ধ একটি উঁচু পাথরের উপর বসে রাক্ষসীকে বলল, তুমি সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে মৃতদেহকে ঘিরে থাকো। পদ্মের মৃত পাখিটাকেও ওই কুণ্ডলীর মধ্যে এনে দাও।

ইতোমধ্যে বুড়ি একটি ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিল। বৃদ্ধ তার বাতির আলো কুণ্ডলীপরিবৃত যুবকের মৃতদেহের উপর ফেলতে লাগল। কিন্তু রাত্রি ঘন হয়ে ওঠায় তখন কিছু হলো না। এমন সময় পরীরাও এসে হাজির হলো। রাত্রিতে শুধু পরীরা। ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। বৃদ্ধের বাতির আলো ছাড়াও পদ্ম আর পরীদের গা থেকে জ্যোতি বার হচ্ছিল। সকাল হতে একটি মিছিল করে সার দিয়ে সবাই নদীর দিকে এগিয়ে চলল। প্রথমে পরীরা, পরে ঝুড়ির ভিতর মৃতদেহ ও সেই মৃত পাখিটা ভরে তাই মাথায় করে বৃদ্ধা প্রতিবেশিনী রাক্ষসী, বাতি হাতে বৃদ্ধ, সুন্দরী পদ্ম আর তার সহচরীরা।

রাক্ষসী সেতুর রূপ ধারণ করে ওদের সবাইকে নদী পার দিল। নদীর ওপারে গিয়ে রাক্ষসী বলল, আমি নিজের জীবন দিয়ে ওদের বাঁচাব। তারপর পদ্মকে বল, তোমার দুটি হাতে একটি মৃতদেহের উপর আর একটি হাত আমার উপর রাখো।

পদ্মর একটি হাতের স্পর্শে যুবক ও তার সেই পাখিটি বেঁচে উঠল। যুবক উঠে দাঁড়াল। তবে তার স্মৃতি তখনও ফিরে আসেনি। আর একটি হাতের স্পর্শে রাক্ষসীর অসংখ্য মূল্যবান ধাতুর টুকরো ঝুড়িতে ভরে ভাসিয়ে দেওয়া হলো নদীর জলে।

এরপর বৃদ্ধ পরীদের বলল, আমি তোমাদের সেই মন্দিরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। তোমাদের কাছে আছে মন্দিরের চাবিকাঠি। তোমরা চাবি খুলে দিলে আমরা প্রবেশ করব তার মধ্যে।

ওরা গিয়ে দরজা খুলে মন্দিরের ভিতরে ঢুকতেই সোনার রাজা বলে উঠল, কোথা হতে আসছ তোমরা?

বৃদ্ধ তার বাতি হাতে বলল, পৃথিবী হতে।

রূপের রাজা বলল, কোথায় যাবে তোমরা?

বৃদ্ধ উত্তর করল, পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছি।

পিতলের রাজা বলল, কি চাও তোমরা আমাদের কাছে?

বৃদ্ধ বলল, তোমাদের নিয়ে যেতে এসেছি।

চতুর্থ রাজা কি বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সোনার রাজা বলল, তোমরা চলে যাও। আমার এ সোনা তোমাদের জন্য নয়।

এরপর তারা রূপোর রাজার কাছে গেল। রাজা বলল, আমি তোমাদের খাওয়াতে পারব না। তোমরা অন্য কোথাও যাও।

এরপর তারা চতুর্থ রাজার কাছে যেতে রাজা জিজ্ঞেস করল, কে বিশ্বকে শাসন করবে?

বৃদ্ধ উত্তর করল, যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।

রাজা বলল, তাহলে সে হচ্ছে আমি। বৃদ্ধ বলল, সময়ে হয়ে গেছে। কিন্তু পরেই দেখা যাবে।

পদ্ম তখন চতুর্থ রাজার ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে চুম্বন করল। হে দয়ালু পিতা, তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। এই বলে মূর্তিটাকে জড়িয়ে ধরল পদ্ম। গোটা পৃথিবীটা কেঁপে উঠল। গোটা মন্দিরটা ভয়ঙ্করভাবে দুলতে লাগল। যুবকটি ভরে বুড়িকে জড়িয়ে ধরল।

এবার ওরা বুঝতে পারল মন্দিরটা একটা বিরাট জলজাহাজের মতো এগিয়ে চলেছে। বৃদ্ধ বলল, আমরা নদীর উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা শীঘ্রই আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছব।

মন্দিরের কড়িবরগাগুলা ভেঙে পড়তে লাগল। যুবককে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিতে লাগল বৃদ্ধ। বুড়ির কাছে ছিল পদ্ম। হঠাৎ গুপ্ত পাহাড়ে ধাক্কা লাগা জাহাজের মতো আটকে গেল চলমান মন্দিরটা। ওরা অন্ধকারে বুঝতে পারল এটা কুঁড়েঘরের সামনে এসে পড়েছে ওরা। ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ। একটা বাতি জ্বলছে ঘরের ভিতরে।

দরজা খুলে গেলে দেখা গেল সেখানে ফেরিঘাটের মাঝি রয়েছে। বৃদ্ধ তার বাতির আলো দেখাল। যুবক একটি জায়গায় বসল। পদ্মকে বসাতে হলো অন্য জায়গায়। বৃদ্ধা বলল, আমার হাতটা কালো হয়ে রইল। ছোট হতে হতে এটা এবার উবে যাবে।

বৃদ্ধ বলল, সকালের আলো ফুটে উঠতেই নদীতে স্নান করে আসবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।

বৃদ্ধা ভয়ে ভয়ে বলল, নদীর ঋণ শোধ করা হয়নি। স্নান করলে আমার গোটা দেহ কালো হয়ে যাবে।

বৃদ্ধ বলল, সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে।

সকাল হতে প্রথম সূর্যের আলো ফুটে উঠতেই বৃদ্ধ চিৎকার করে বলল, ‘জ্ঞানবিদ্যা, রূপ আর শক্তি-এই তিনটি জিনিসই পৃথিবীকে চালায়। এই তিনটি শব্দের নাম করার সঙ্গে সঙ্গে সোনার, রূপোর ও পিতলের তিনজন রাজা উঠে একে একে। কিন্তু চতুর্থটি মাটির তলায় ঢুকে গেল।

এরপর বৃদ্ধ লাঠি হাতে যুবককে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। পিতলের রাজার সামনে এসে থামল ওরা। রাজা যুবককে বলল, বাঁ হাতে এই অস্ত্র ধারণ করো। ডান হাতটি মুক্ত রাখো।

পরে ওরা রূপের মূর্তির কাছে গেছে মূর্তিটি তার হাতে রাজদণ্ডটি দিয়ে বলল, তুমি আমার সব ভেড়া অর্থাৎ গবাদি পশুগুলো গ্রহণ করবে ও বেড়াবে।

সোনার রাজা তার গলায় ওক পাতার মালা পরিয়ে দিয়ে বলল, সব সময় মহানকে বরণ করে নেবে।

এবার বৃদ্ধ লক্ষ্য করল, তিন রাজার কাছ থেকে অস্ত্র, রাজদণ্ড আর মালা-এই তিনটি জিনিস পেয়ে যুবকটির দেহমনে একটি বিরাট পরিবর্তন এসেছে। অস্ত্র ও রাজদণ্ড লাভ করে সে দেহে পায় প্রচুর শক্তি। আর মনে পায় দৃঢ়তা। আর ওক পাতার মালাটি গলায় পরার সঙ্গে সঙ্গে মুখখানি হয়ে ওঠে অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। এবার সে হারানো স্মৃতি ফিরে পায়।

যুবকটি তখন আবেগের সঙ্গে বলে ওঠে, হে আমার প্রিয়তমা পদ্ম, তোমার খণ্ড অন্তরের সূচিতা ও ভালোবাসার থেকে পৃথিবীতে অন্য কি আকাক্ষার বস্তু থাকতে পারে?

এরপর বৃদ্ধের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, হে আমার প্রিয় বন্ধু, আর একটি শক্তির কথা ভুলে গেছ তোমরা। তা হলো প্রেমের শক্তি।

এই বলে যে অবগুণ্ঠিত পদ্মকে আলিঙ্গন করল। পদ্মের গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। বৃদ্ধ হাসিমুখে বলল, প্রেম শাসন করে না, তবে নিয়ন্ত্রিত করে।

এতক্ষণ ওরা লক্ষ্য করেনি। এবার ওরা দেখল নদীর ধারে এক বিরাট সেতু নির্মিত হয়েছে। নদীর বুক থেকে স্তম্ভ গড়ে উঠে সে সেতুকে ধারণ করে আছে। তার উপর দিয়ে জলস্রোত এগিয়ে আসছে। অসংখ্য নরনারী এপারের সেই মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের নতুন রাজা ও রানিকে অভিবাদন জানাতে আসছে।

বৃদ্ধ বলল, সেই রাক্ষসীর স্মৃতির প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করো। কারণ সেই তোমাদের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন দান করে। এই নদীর সেতুও গড়ে উঠেছে তারই প্রচেষ্টায়।

রানির মোট তিনজন সহচরী ছিল। একজন তার হাতির দাঁতের চেয়ার, একজন পাখা আর একজন বীণা ধারণ করে থাকত। অবশ্য আর একজন নূতন যুবতী সহচরীকে দেখা গেল।

আর সে হচ্ছে সেই বৃদ্ধা। এখন যুবতীতে পরিণত হয়ে উঠেছে হঠাৎ। বাতি হাতে বৃদ্ধা তা দেখে বলল, তুমি এখন যুবতী হয়েছ, আগে আমার স্ত্রী ছিলে। এখন তুমি যে কোনও যুবককে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে পার আজকের এই শুভদিনে।

যুবতী বলল, তুমি বুঝতে পারছ না তুমি নিজেও তো যুবক হয়ে উঠেছ।

এদিকে সূর্য ক্রমশ আকাশের উপরে উঠতে লাগল। সেই বিরাট আকাশদৈত্যটা সেতুর উপর দিয়ে যেতে যেতে হাত দিয়ে সূর্যটা আড়াল করায় তার বিশাল হাতের কালো ছায়ায় অস্বস্তি অনুভব করছিল চলমান জনতা। অনেকে ভয়ে নদীর জলে পড়ে যাচ্ছিল। তাই দেখে নূতন রাজা দৈত্যকে আক্রমণ করার জন্য তরবারি নিষ্কাশন করতে যাচ্ছিল। কোমর থেকে কিন্তু বৃদ্ধ তাকে নিবৃত্ত করল। বলল, ওর সময় হয়ে এসেছে। এখনি ওর ছায়া চিরতরে অপসারিত হবে।

সত্যিই দৈত্যটি হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল পথের উপর। তার বিপুলকার মৃতদেহটার চারদিকে ভিড় জমে উঠল কৌতূহলী মানুষের।

অবশেষে জনতা নূতন রাজা ও রানিকে দেখার জন্য মন্দিরের দিকে আসতে লাগল। রাজা ও রানিকে দর্শন করে ফিরে যাবার পথে জনতা অবাক চোখে দেখল তাদের পথে সোনার টুকরো ঝরে পড়ছে। শুধু একবার নয়, পথের কয়েক জায়গায় কয়েকবার এই ঘটনা ঘটল।

কবিতাগুচ্ছ

বসন্ত দিনের কবিতা (Mailied)

Wie herlick leucher mir die Natur

দেখ দেখ, প্রকৃতি কেমন নববধুর মতো
নবসাজে সজ্জিত হয়েছে শুধু আমারই জন্য;
দেখ দেখ, কেমন সূর্যের আলো হাসি হয়ে
ঝরে পড়ছে কুয়াশা ভেজা মাঠে মাঠে।
ফুল ফুটে উঠেছে প্রতিটি গাছের ডালে ডালে
হাজার কণ্ঠে ফেটে পড়ছে অরণ্যের নীরব আত্মা।
হে পৃথিবী, হে সূর্য, হে সুখ, তোমরাও
ফুটে ওঠ মানুষের বুকে বুকে;
হে আমার প্রেম, সবুজ পাহাড়ের উপর ঝুলতে থাকা
সোনালী মেঘের মতো ঝুলতে থাকো আমার অন্তরের আকাশে।
ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক আমার জীবনের শূন্য প্রান্তর।
হে আমার প্রিয়তমা, আমার গভীর ভালোবাসা
কত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তোমার মদির চোখের
নীল তারার গভীরে; আমি তোমাকে ভালোবাসি
ঠিক যেমন উড়ন্ত চিল ভালোবাসে নীল আকাশকে,
ঠিক যেমন সকালের ফুল ভালোবাসে আকাশের সোনালী গন্ধকে।
তুমি আমাকে দিয়েছ যৌবনের আনন্দ, তাইতো
আমি তোমাকে ভালোবাসি আমার রক্তের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে।
আমার সুখে আমার ভালোবাসার সুখে চিরসুখী হও প্রিয়তমা।

পথের ধারে গোলাপ (Heidenros lein)

Sah ein knub ein Koslein Stehn

পথের ধারে ফুটে ওঠা এক রক্ত গোলাপ দেখে
একটি ছেলে ছুটে গেল তার দিকে।
আহা কি সুন্দর গোলাপ, তাজা রক্তের মতো টকটকে লাল।
ছেলেটি বলল, ‘গোলাপ, আমি তোমায় তুলব।’
গোলাপ বলল, ‘আমাকে তুললে আমি তোমাকে।
কাঁটা দিয়ে বিধব যাতে আমার কথা চিরকাল মনে থাকে।’
দুষ্টু ছেলেটা সত্যি সত্যিই গোলাপটাকে তুলে ফেলল।
বৃন্ত থেকে আর গোলাপটাও তাকে বিধতে লাগল
কাঁটা দিয়ে; চিৎকার বা অভিযোগ অনুযোগে কোনও ফল হলো না।
অবশেষে গোলাপকে হার মানতে হলো
ছেলেটার দুষ্টুমির কাছে, সহ্য করতে হলো তার অশালীন ঔদ্ধতের রঙিন উচ্ছ্বাসকে।

অভ্যর্থনা ও বিদায়

Es Schling Meain Hez

আমি ঘোড়ায় চাপতেই আমার মনের আগেই
আমার অন্তরটা দ্রুত স্পন্দিত হতে হতে চলে গেল সেখানে।
রাত্রির কোলে প্রথমে ঢুকে গেল পৃথিবী আর তার পাহাড়গুলো।
কুয়াশায় গা ঢেকে বিশাল দেহী ওকগাছগুলো রইল দাঁড়িয়ে
আর ঝোঁপঝাড়ের ভিতর থেকে অন্ধকার
উঁকি মারতে লাগল অসংখ্য ভীরু কালো চোখ মেলে।
এমন সময় মেঘের পাহাড় থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ;
বাতাস আমার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল পাখা মেলে।
রাত্রির পেট থেকে বেরিয়ে আসা দানবগুলো
আমাকে ভয় দেখাতে লাগল বিভিন্নভাবে,
কিন্তু আমার সাহস আর সংকল্পের কাছে হার মানল তারা।
আমার রক্তে ছিল এক ভয়ঙ্কর উত্তাপ, চোখে ছিল দুঃসাহসী আলো।
তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তোমার চোখ থেকে
বেরিয়ে এল এক উদার আলোর ঝলকানি, তোমার মুখের
আনন্দকে ঘিরে ছিল এক উজ্জ্বল বসন্তের সমারোহ।
আমার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল আনন্দে।
হে ঈশ্বর, আমি এতখানি আশা করিনি, আমি এর যোগ্য নই।
কিন্তু হায়, সকলের সূর্য সরে যেতেই বিষাদ নেমে এল অন্তরে;
তোমার চুম্বনে যে আনন্দ পেয়েছিলাম সে আনন্দ
দুরন্ত বেদনা হয়ে নেমে এল তোমায় চোখের কম্পমান পাতায়।
আমি বিদায় নিলাম তোমার কাছ থেকে তুমি তাকিয়ে রইলে
আমার পথপানে তাকিয়ে রইলে সজল চোখে।
তবু ভালোবেসে ও ভালোবাসা পেয়ে যে সুখ পেয়েছি
সে ঈশ্বর, কেন তার কোনও তুলনা নেই? কেন, কেন?

গ্যানিমেড (Ganymed)

Wie in Morgeglanz

হে আমার প্রিয় বসন্ত, সকালের আলোয় কত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তোমায়
তোমার প্রেমের উত্তাপ আমার বুকে নিয়ে আসছে
অফুরন্ত সৌন্দর্য আর আনন্দের রঙিন সমারোহ।
আমি যদি তোমায় বুক ভরে আলিঙ্গন করতে পারতাম!
আমি যখন তোমার বুকে শুয়ে থাকি তোমার ফুল তোমার ঘাস
এসে বাধা বাঁধে আমার বুকের মাঝে।
তোমার দেহগ্রাত্রের বাতাস শীতল করে দেয় আমার বুকের
জলন্ত কামনাকে, কালের বাতাস হাত বুলিয়ে দেয় আমার গায়ে?
কুয়াশাঘেরা উপত্যকার ওপর থেকে নাইটিঙ্গেলরা আমায় ডাকে।
‘যাচ্ছি’ বলে ছুটে যাই আমি, ক্রমাগত উঠতে থাকি ওপরে।
মেঘেরা নেমে আসে। আমি চিৎকার করে বলি, হে পিতা,
তোমার বুকে স্থান দাও, আমাকে আলিঙ্গন করো।

থেলের রাজা (Der koning in Thale)

থেল দেশে এক রাজা ছিলেন।
তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুকালে এক সোনার কাপ দিয়ে যান রাজাকে।
রাজা জীবনে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই কাপটিকে,
যতবার তিনি মদপান করতেন সেই কাপ থেকে,
যতবার ভোজসভায় সেটিকে ব্যবহার করতেন ততবারই
চোখ থেকে জল ঝরে পড়ত তাঁর।
মৃত্যুকালে রাজা গোটা রাজ্যে ও রাজ্যের সব কিছু
নিঃশেষে দিয়ে গেলেন তাঁর উত্তরাধিকারীদের।
কিন্তু সেই কাপটি কাউকে দিলেন না।
তারপর এক শেষ ভোজসভায় শেষবারের মতো সেই কাপ থেকে
মদপান করে জানালা দিয়ে কাপটিকে ফেলে দিলেন।
প্রাসাদের পাশে বয়ে যাওয়া সমুদ্রের জলে।
স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রাজা পতনশীল
সেই কাপটির দিকে, তাকে ডুবে যেতে দেখলেন ধীরে ধীরে
তারপর চক্ষু দুটি মুদ্রিত হয়ে এল আপনা থেকে
জীবনের সব মদ পান করা হয়ে গেছে তার।

প্রমিথিযূস (Promeiheus)

হে জিয়াস, তোমার মেঘাস্ত্র দ্বারা সমস্ত স্বর্গলোক
সমস্ত অন্তরীক্ষ ছেয়ে দাও, পাহাড়ে পর্বতে
কাঁটাগাছ উপড়ে ফেলতে থাকো অর্বাচীন বালকের মতো
তোমার শক্তির পরিচয় করো ইচ্ছামতো।
অনেক কষ্টে গড়ে তোলা আমার পৃথিবী
তুমি ভেঙে দাও, যে ঘর তুমি কোনওদিন নিজে বাঁধনি
যে ঘরের শান্তির আস্বাদ নিজে কখনও পাওনি,
আমার সেই কত সাধের ঘরের শান্তি পুড়িয়ে ছারখার করে দাও।
হে স্বর্গস্থ দেবতাবৃন্দ, এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে
তোমাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া মানুষের উৎসর্গ আর অঞ্জলির উপর
বেঁচে থাকতে হয় তোমাদের; ভিক্ষুক আর শিশুর মতো নির্বোধ
আশাবাদী ঐ সব মর্ত মানুষগুলো না থাকলে অনশন করতে
হতো তোমাদের, শুকিয়ে মরতে হতো স্বর্গের সমস্ত দেবতাদের।
যখন আমি শিশু ছিলাম এবং এবং কোনও ব্যাপারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়তাম,
তখন সূর্যের দিকে বিহ্বল দৃষ্টি তুলে কাতর প্রার্থনা জানাতাম
অলক্ষ্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে, ভাবতাম তারা শুনতে পাবে আমার কথা।
কিন্তু উদ্ধত অত্যাচারী টিটানদের হাত থেকে কে আমায় রক্ষা করেছে?
কে আমায় রক্ষা করেছে নিশ্চিত মৃত্যু আর দাসত্বের নিষ্ঠুর কবল থেকে?
হে আমার উজ্জ্বল অন্তরাত্মা, তুমি কি নিজেকে নিজে উদ্ধার করনি?
অথচ নিজেকে নিজে উদ্ধার করে সে উদ্ধার জন্য শৈশবসূলভ
অজ্ঞতাহেতু ধন্যবাদ দিয়েছ সেই সব উদাসীন দেবতাদের।
কেন আমি তোমার সম্মান করব জিয়াস? কি কারণে?
তুমি কি কখনও আমার ভারাক্রান্ত হৃদয়ের ব্যথাভার দূর করেছ?
তুমি কি কখনও আমার ত্রাসক্লিষ্ট দুচোখের অশ্রু মুছিয়ে দিয়েছ?
সর্বশক্তিমান কাল আর শাশ্বত নিয়তি কি তোমার আমার
দুজনেরই অবিসম্বাদিত প্রভু নয় যারা আমায় সামান্য মানুষের পরিণত করেছে?
তুমি কি মনে ভাব আমার অপুষ্পিত স্বপ্নগুলো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠতে
পারেনি বলেই আমি জীবনকে ঘৃণা করতে থাকব, চলে যাব দূর অরণ্যে?
কিন্তু জেনে রেখো আমি এখানে এই পৃথিবীর বুকেই বসে আছি এবং থাকব,
মানবজাতিকে গড়ে তুলব আমার মনের মতো করে।
তারা হয়ে উঠবে আমারই মতো পৌরুষে অপরাজেয়, সুখে-দুঃখে অবিচলিত
তারা দুঃখ ভোগ করবে, কাঁদবে, আনন্দে উদ্বেল হবে।
আর আমারই মতো তোমার মতো যত সব দেবতাদের উপেক্ষার চোখে দেখবে।

চরকায় চাকায় (Greecheer am Spinnrrade)

Mein Ruh ist hin

আমার জীবনের সব শান্তি চলে গেছে, নীরব ব্যথাভারে
ভারী হয়ে উঠেছে আমার অন্তর, সে শান্তি ফিরে পাব না আর কখনও
না, আর কখনই না।
যে সব জায়গায় সে নেই সে সব জায়গা এক একটা আস্ত কবর
বলে মনে হয় আমার কাছে, সমস্ত জগৎটা হয়ে ওঠে দুঃসহভাবে তিক্ত
আমার মাথা ঘুরে গেছে, মন হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন।
আমার জীবনের সব শান্তি চলে গেছে, অন্তর হয়ে উঠেছে ভারী
এ শান্তি আর কখনও ফিরে পাব না জীবনে।
আমি আমার ঘরের জানালা দিয়ে কখনও তাকালে
শুধু তারই খোঁজ করি, ঘরের বাইরে গেলে যেন এগিয়ে যাই তারই দিকে।
তার সুন্দর চেহারা, মুখের হাসি, চোখের দৃষ্টি, কথা বলার ভঙ্গিমা,
হাতের মৃদু চাপ আর চুম্বন–না না আমি কখনও ভুলব না।
আজ আমার অন্তর একান্তভাবে চাইছে শুধু তার অন্তরকে
আর দেহ চাইছে তার দেহকে প্রাণভরে আলিঙ্গন ও চুম্বন করতে,
চাইছে তার চুম্বনের দুরন্তমধুর চাপে সমস্ত চেতনা হারিয়ে ফেলতে।

হ্রদের ধারে (Auf dem see)

und frische Nahrung, neus blut

আমি এখন এই মুহূর্তে বিরাজ করছি উদার প্রকৃতির বুকের উপর।
সহস্রধারার উৎসারিত বুকে তার বুকের রক্ত পান করছি আমি।
আর অফুরন্ত প্রাণবায়ু শোষণ করে নিচ্ছি আমি
আমার শুষ্ক নিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে।
এইভাবে সজীব ও সতেজ হয়ে উঠছি আমি, ফেটে পড়ছি
অদম্য প্রাণশক্তির অমিত উচ্ছ্বাসে।
ঢেউ-এর তালে তালে আমাদের নৌকোটা দুলছে
অভ্রলেহী পাহাড়গুলো প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পথের দু’পাশে।
হে আমার আয়ত উদার চক্ষু, কিসের ভারে অবনত হচ্ছ তুমি?
সোনালী স্বপ্নগুলো আবার ফিরে এসেছে? কিন্তু আমি তো
বিদায় দিয়েছি তাদের। চলে যাও হে সুবর্ণ স্বপ্নরাজি, কোনও প্রয়োজন নেই
এখানে তোমাদের, কারণ এখানে আছে জীবন, আছে প্রেম।
তরঙ্গায়িত এ হ্রদের জলে সোনার মতো কাঁপতে থাকে
আকাশের অসংখ্য তারার প্রতিফলন, দু পাশের নুয়ে পড়া গাছের
পরিণত ফলেরা প্রতিবিম্বিত হয়ে উঠে সে জলে।
আর ঠিক তখনি পলাতক নরম কুয়াশার দল দিগন্তের বুকে
ঘন হয়ে পান করতে থাকে আশ্চর্য এক আলোর নির্যাস।

শরৎ (Herbstgefule)

Fetter grine, du lamb

আমার জানালার ধারে বেড়ে ওঠা হে আঙ্গুরলতার
পাতাগুলো, তোমরা আরও সবুজ হয়ে ওঠ।
হে জাম ফলের দল, তোমরা বড় হও, পরিণত
ও পূর্ণাবয়ব হয়ে ওঠ আরও তাড়াতাড়ি।
সূর্যমাতার শেষ দৃষ্টির রশ্মি মমতার তাপ দান করেছে তোমাদের
উদার আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে নীল স্নেহের পশরা
চাঁদের মিষ্টি নিশ্বাস শীতল করেছে তোমাদের দেহগাত্রকে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমার সজীব প্রেমের তপ্ত অশ্রুর দ্বারা।
সিক্ত হচ্ছ তোমরা।

নৈশ পথিকের গান-১ (Wandurers Nacthlic)

Der du wib dem Himmel bist

তুমি স্বর্গ থেকে নেমে এসে আমার দুঃখ-বেদনার
সব আবেগকে স্তব্ধ করে দাও। আবার আমাদের মতো
যারা হতভাগ্য তাদের অন্তর পূর্ণ করে দাও দ্বিগুণ সান্ত্বনা দিয়ে।
কিন্তু এই সব আনন্দ-বেদনার অর্থ কি? আমার এসব ভালো লাগে না।
হে মধুর শান্তি, আমার বুকে এস, বুকে এস আমার
আর আমি কিছুই চাই না।

সমস্ত পাহাড় আর গাছের মাথাগুলো শান্ত, আশ্চর্যভাবে শান্ত
চারদিকে এত শান্ত যে কারও নিশ্বাস পর্যন্ত শোনা যায় না।
অনবরত কিচমিচ করতে থাকা ছোট ছোট পাখিগুলো
বনের গভীরে চলে গেছে। একটু থামো,
সব বিক্ষোভের ঢেউ পেরিয়ে শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে উঠবে
তোমারও অন্তরাত্মা।
ওদের মতো তুমিও শান্ত হয়ে উঠবে, নীরব হয়ে উঠবে।

চাঁদের প্রতি (An dev Mond)

Fullest wieder Bisch and Tal

আবার তুমি সমস্ত অরণ্য আর উপত্যকাকে তোমার
কুহেলিকাময় ঐশ্বয়ের প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দিয়েছ।
অবশেষে আমার আত্মাকে মুক্তি দিয়েছ তুমি।
পরম বন্ধুর মতো তুমি তোমার স্নিগ্ধ দৃষ্টির আলো
ছড়িয়ে দিচ্ছ তোমার প্রতিটি ঊষর প্রান্তরে।
অতীতের সুখ-দুঃখের প্রতিটি শব্দ ধ্বনিত
প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছে আমার শূন্য অন্তরে।
একা একা আনমনে পথ হেঁটে চলেছি আমি, আমার পথের দু’ধারে
কত আনন্দ-বেদনার ফুল ফুটে আছে, অথচ তাদের দিকে
আমি ফিরেও তাকাই না, শুধু এগিয়ে চলি আমি এক একা।
হে নদী, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গর্জন করতে করতে
ছুটে চল তুমি, আমি জানি সব হাসি সব চুম্বন মিথ্যা।
আজকের এই মূল্যবান রত্নটি একদিন লাভ করেছিলাম
আমি, একথা আজ ভুলে যেতে চাই আমি।
পাহাড় আর উপত্যকার মধ্য দিয়ে অশান্ত বেগে ছুটে চলো নদী।
শীতের রাতে বা মুক্তোর মতো বসন্তের সকালে
সমানভাবে তুমি বয়ে চলো, গর্জন করতে করতে ছুটে চলো।
কোনও রাগ দুঃখ না করে সে সব আসক্তিকে ঝেড়ে ফেলে
সরে যেতে পারে জগৎ থেকে সেই সুখী। সেই একমাত্র সুখী।
হায়, অন্তহীন রাত্রির অন্ধকারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও অবজ্ঞাত অবস্থায়
এক একা অন্তরের গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়ানো সত্যিই কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

জলের উপর আত্মার গান (Gesung der Geister uber der Wassen

Des menchen Seele

মানুষের আত্মা ঠিক জলের মতন, জল যেমন
আকাশ থেকে পড়ে আকাশেই উঠে যায়; আবার
পৃথিবীতেই ফিরে আসে তেমনি মানুষের আত্মাও
স্বর্গ থেকে আসে, স্বৰ্গকামনায় উন্মুখ থাকে সারাজীবন
অবশেষে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে।
পাহাড়, পর্বত হতে যে স্বচ্ছ জলধারা বেড়ে ঝরে পড়ে
পৃথিবীর সমতলে সেই জল বাষ্পীভূত হয়ে পরিণত হয়
ঘন মেঘে, যে মেঘ বৃষ্টির স্বচ্ছ রূপালি জল
হয়ে ঝরে পড়ে মাটির পৃথিবীতে।
সমতলভূমি এ জলের গতি যেখানে অব্যাহত অপ্রতিহত
সেখানে সে শান্ত স্বচ্ছ, সেখানে সে মাথার আকাশ
দু’পাশের পাহাড় আর গাছপালার প্রতিফলন স্বচ্ছন্দে
ধারণ করে তার শান্ত বুকে।
কিন্তু বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চল যেখানে পদে পদে গতি তার
ব্যাহত ও প্রতিহত সেখানে উচ্ছল প্রতিবাদে সে ফেনায়িত।
বাতাস জলকে দেখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে তার তরঙ্গমালাকে।
তাই জলও বাতাসকে দেখে ফুলে ওঠে আনন্দে, আবেগে উচ্ছ্বাসে।
হে মানবাত্মা, তুমি কত জলের মতো, তোমার ভাগ্য
বাতাসের মতোই কতই না অস্থির, কতই না চঞ্চল।

মানবতার সীমা (Grenzen der Menschlitef)

Wenn der uralte

আমাদের প্রাচীনতম পরম পিতা যখন শান্ত হাতে
কৃষ্ণকুটিল মেঘমালা হতে বিদ্যুদ্দাম বিচ্ছুরিত করেন
তখন সেটাকে তার উজ্জ্বল পোশাকের অংশ ভেবে
চুম্বন করি, সঙ্গে সঙ্গে শিশুসুলভ এক বিকম্পনে
আলোড়িত হয়ে ওঠে আমার বুক।
কোনও মানুষ কখনও দেবতাদের সমান মহত্ত্ব অর্জন
করতে পারে না, কারণ যদি সে কোনও রকমে
তার উদ্ধত অহঙ্কারী মাথাটাকে নক্ষত্রদের রাজ্যে তুলে
নিয়ে যেতে পারে কখনও তাহলে সে কোথাও পাবে না
তার পা রাখার জায়গা, তখন সে হয়ে উঠবে
মেঘ আর বাতাসের হাতে অসহায় এক খেলার পাত্র।
যদি সে এই পৃথিবীর শক্ত মাটির উপর মাথা তুলে দাঁড়ায়
তাহলে তার সে মাথার উদ্ধত উচ্চতা এমন কি কোনও
ওক বা আঙ্গুর গাছের মাথার সমানও হতে পারবে না,
দেবতা তো দূরের কথা।
তাহলে দেবতা ও মানুষের মাঝে পার্থক্য কোথায়?
দুজনের মধ্যে অনন্তকাল থেকে বয়ে চলেছে
অসংখ্য তরঙ্গে তরঙ্গায়িত শাশ্বত এক ব্যবধানের নদী।
সে নদীর তরঙ্গ মাঝে মাঝে আমাদের উপরে তুলে দেয়।
কখনও বা আমাদের গ্রাস করে, আমাদের ভাসিয়ে বা ডুবিয়ে নিয়ে যায়।
এক সঙ্কীর্ণ আংটা দিয়ে ঘেরা আমাদের জীবনের অস্তিত্ব।
এইভাবে পাশাপাশি আমাদের অসংখ্য জীবনাস্তিত্বের
আংটা যুক্ত হয়ে অবিচ্ছিন্ন ও অব্যাহত করে তুলছে
আমাদের জীবনধারা ও বংশপরম্পর্যকে।

মেঘের রাজা (Erl konig)

We reitel so spat durch Neceht and Wind

কে এত রাত্রিতে এই উত্তাল বাতাসের মধ্য দিয়ে
ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছে জনমানবহীন পথের উপর দিয়ে?
কোনও এক শিশুপুত্রসহ পিতা যাচ্ছে, বনের মধ্যে
শিশুপুত্রটিকে চেপে ধরে কনকনে বাতাসের কামড় থেকে
রক্ষা করছে তাকে।
পিতা বলল পুত্রকে, হে আমার পুত্র, কেন তুমি মুখটাকে
ঢেকে রাখছ? পুত্র বলল, পিতা, দেখছ না উজ্জ্বল
পোশাক পরিহিত সোনার মুকুট মাথায় মেঘের রাজাকে?
পিতা বলল, ওটা আসলে রাজা নয়, মেঘের সৃষ্ট এক অলীক অবয়ব।
‘হে আমার প্রিয় শিশু, আমার সঙ্গে এস, আমি তোমার সঙ্গে
কত মজার মজার খেলা খেলব, নদীর ধারে কত ভালো ভালো ফুল আছে।
কত উজ্জ্বল চকচকে জমকালো পোশাক আছে আমার মার কাছে।’
পিতা, পিতা, শুনতে পাচ্ছ না, মেঘের রাজা কি বলছে আমার কানে কানে
‘চুপ করো পুত্র, ও হচ্ছে শুকনো পাতায় লাগা বাতাসের শব্দ।’
‘শোনো শোনো হে শিশু, তুমি আমার কাছে আসবে? আমার মেয়ে
তোমার দেখাশোনা করবে, রোজ রাতে সে নাচবে, তোমায় ঘুম পাড়াবে।’
শোনো, শোনো পিতা, মেঘের রাজার কন্যাকে দেখতে পাচ্ছ না?
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার সুন্দর চেহারা মুগ্ধ করেছে
আমাকে, যদি তুমি আমার কাছে না আস তাহলে জোর করে
তোমায় ধরে আনব আমি, জোর করে টেনে আনব তোমায়।
পিতা পিতা, দেখতে পাচ্ছ না, মেঘের রাজা আমায় ধরে
নিয়ে যাচ্ছে, আমায় আঘাত করেছে। হা হা, মেঘের রাজা–
ভীত সন্ত্রস্ত্র পিতা তাই ঘোড়ায় চেপে তার আহত পুত্রকে নিয়ে
পালিয়ে যাচ্ছে অজানার পথে। কোনও রকমে একটা গ্রাম খামারে
তাকে পৌঁছতে হবে। কিন্তু হায়, ছেলেটা তার পিতার কোলেই মারা গেল।

বীণাবাদকের গান (Herfenspieler)

Wer nie sein Brot mit Trunen

যার কষ্টার্জিত রুটির উপরে চোখের জল ঝরে পড়েনি,
যে কখনও সারারাত বিছানায় বসে কেঁদে কাটায়নি,
সে কখনও ঈশ্বরের মহিমাকে জানতে পারেনি।
হে ঈশ্বর, তুমিই আমাদের জীবন দান করো,
দরিদ্রদের অন্তরকে দোষ দিয়ে কলুষিত করো তুমিই।
তারপর দুঃখের সীমাহীন যন্ত্রণায় তুমিই তাদের ফেলে দাও।

মিগনন (Mignon)

Kennest du das land

তুমি কি জান সে দেশের ঠিকানা যেখানে লেমন ফুল ফোটে
থোকা থোকা, যেখানে সোনারবরণ কমলালেবু চকচক করতে থাকে
ঘন শ্যামল পাতার ফাঁকে ফাঁকে, যেখানে সবুজ বাতাস
ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে নীল আকাশ থেকে আর
মার্বেল গাছগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো?
সে দেশের ঠিকানা তুমি জান কি? আমি তোমাকে নিয়ে যাব সেই দেশেই।
সেখানকার বাড়িটা তোমার জানা আছে যার বিরাট ছাদটা
দাঁড়িয়ে আছে কতকগুলো স্তম্ভের উপর, যার সুসজ্জিত হলঘর
আর উজ্জ্বল প্রকোষ্ঠগুলো নির্জনতায় স্তব্ধ হয়ে আছে আর
মর্মর প্রান্তরের প্রতিমূর্তিগুলো তোমারই পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে?
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি সেখানেই যাব, সেই দেশেই যাব।
সে দেশের পথ তুমি জান কি?
চারদিকের বড় বড় পাহাড়গুলোর মাঝখান দিয়ে কুয়াশাঘেরা পথগুলো
এঁকেবেঁকে চলে গেছে, যেসব পাহাড়ের গুহায় প্রাচীন ড্রাগন
বাস করে, কত ঝর্না ঝাঁপিয়ে পড়ে যাদের মাথা থেকে।
সেই পাহাড়ি পথ দিয়ে আমরা সেখানে সেই দেশেই যাব প্রিয়তমা।

নিয়তির গান (Parzenlied)

Es furchte die Gotter

মানব সন্তানদের অবশ্যই ভয় করে চলতে হবে দেবতাদের।
কারণ দেবতাদের শ্বাশত হাতেই আছে আইনকানুনের
যত সব অনুশাসন যা তারা ইচ্ছামতো প্রয়োগ করতে পারেন।
যে সব মানুষকে দেবতারা তুলে দেন উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে।
সেই সব মানুষরা থাকে আরও ভয়ে ভয়ে, কারণ
সেই শিখরের উপর যেখানে দেবতাদের ভোজসভা বসে সেখানে
আছে বড় বড় মেঘের খাড়াই পাহাড় আর তার মাঝে মাঝে আছে
সীমাহীন শূন্যতা যেখানে একটু কোনও ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটলেই
মানুষকে পড়ে যেতে হবে তলিয়ে যেতে হবে সীমাহীন অন্ধকার
আর শূন্যতার মাঝে।
অথচ দেবতারা অবলীলাক্রমে এক মেঘের পাহাড় থেকে
আর এক পাহাড়ে যাওয়া-আসা করেন, সোনার টেবিলে
অনন্তকাল ধরে চলে তাদের ভোজসভা।
এইসব দেবতারা কোনও মানুষকে ভালোবাসলেও তার
বংশধরদের পরে চিনতে পারেন না, ভালোবাসেন না।
এ কথা নিয়তির, নিয়তির এ গান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত
হয়ে চলেছে পাহাড়ে-পর্বতে আবহমান কাল হতে।

রোমক শোকগাথা-১ (Romische Elegien)

Froh empfind cih mich nun

চিরায়ত সাহিত্যের এই উদার পটভূমিতেই সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করি আমি,
সবচেয়ে আনন্দ পাই, অতীত ও বর্তমান একযোগে কথা কয় যেন।
হোরেসের কথামতো এ গ্রন্থের পাতা উল্টে যাই আমি রোজ,
পাই নূতন নূতন আস্বাদন। কিন্তু সারারাত আমাকে কাটাতে হয়
আমার প্রিয়তমার নিবিড়তম সাহচর্যে, যে সঙ্গসুখে হয়ত কোনও
উপদেশ বা জ্ঞান অর্জন করি না, কিন্তু তাতে দ্বিগুণীকৃত হয়
আমার আনন্দের আবেগ। আমি যখন আমার প্রিয়তমার
মর্মরপ্রস্তুরসন্নিভ সুন্দর বক্ষস্থল আর নিতম্বের উপর হাত বুলিয়ে দেখি
তখনও আমি অনেক কিছু শিক্ষা পাই, অতীতের অসংখ্য সুন্দরী
নারীর সঙ্গে তাকে তুলনা করি, তার অঙ্গলাবণ্যের মেদুর স্পর্শে
আমি পাই এক অগ্রপ্রসারী অনুভবের ব্যাপকতা।
আমি তার আলিঙ্গনের নিবিড়তার মাঝে কবিতা লিখি,
আমার কবিতা সুন্দর হয়ে ওঠে তার দেহসৌন্দর্যের ছোঁয়ায়।
কখনও বা ঘুমিয়ে পড়ি তার বুকের উপর মাথা রেখে।
দিনের বেলায় আমার প্রিয়তমার সময় না হলেও সারাটি রাত
এইভাবে সঙ্গ ও সেবা দান করে চলে আমাকে সে।
দেখতে দেখতে গম্ভীর হয়ে আসে নিশীথ রাত্রি, ম্লান হয়ে আসে
আমার বাতির আলো, আর সেই রহস্যময় নৈশ অবকাশে
আমার মন চলে যায় প্রাচীন রোমের সুদূরে আর তখনি
সহসা মনে হয় আমার এই কালাত্তীর্ণ সুন্দর প্রিয়তমাই হয়ত বা
প্রাচীন রোমের সেই কর্মক্লান্ত ত্রয়ীশাসকদেরও সঙ্গ বা সেবা দান করত ঠিক এইভাবে।

রোমক শোকগাথা-২

Herbstilick lenchtet die Flamame

এই সাক্ষ্য আগুনের কাঠগুলো পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার আগেই
এসে হাজির হবে আমার প্রিয়তমা, বৎসরের অফুরাণ আনন্দের
উত্তাপে উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে আমাদের সেই নৈশ মিলনকাল।
আমাদের সেই মিলনশয্যা ছেড়ে পরদিন সকালেই চলে যাবে।
আমার প্রিয়তমা, কিন্তু তার যাবার সময় নির্বাপিত অগ্নির
ভগ্নস্তূপে জ্বলে উঠবে আবার নতুন এক অগ্নিশিখা,
নির্বাপিতপ্রায় আনন্দাগ্নির প্রায়ান্ধ শীতলতায়
আবার জেগে উঠবে প্রাণমাতানো আনন্দের উত্তাপ আর উজ্জ্বলতা।

রোমক শোকগাথা-৩

Zunde min Eicht an knabe

বাতিটা জ্বালিয়ে দাও হে বালক, অবশ্য এখনও
দিনের আলো আছে, সন্ধে হতে এখনও আধঘণ্টা বাকি আছে,
বাড়িগুলোর ওধারে সূর্য ঢাকা পড়লেও পাহাড়গুলোর মাথা থেকে
এখনও সরে যায়নি সূর্যরশ্মি।
না না, জানালার কপাটগুলো এখনি বন্ধ করো না, শুধু
বাতিটা জ্বালিয়ে দাও, এখনি এই মুহূর্তে বাতি জ্বালাও
আমার প্রিয়তমা সন্ধে হলেই আজ এসে পড়বে।
হ্যাঁ, ঠিক সে আসবে, ইতিমধ্যে সে আমার বাতি,
রাত্রির উজ্জ্বল দূত, সে না আসা পর্যন্ত আমাকে সান্ত্বনা দেবে তুমি।

প্রিয়তমার সান্নিধ্য (Nahe des gellebten)

Ich denke deirm

সূর্যের আলো যখন চকচক করতে থাকে সমুদ্রের ঢেউ-এর উপর
তখন তোমার কথা মনে পড়ে, যখন ঝর্নার জলাধারায়
প্রতিবিম্বিত হয়ে ওঠে চাঁদের আলো, তখনও মনে পড়ে তোমার কথা।
ধূসর ধূলিজালে সমাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে যখন সুদূরের পথরেখা
তখন তার মধ্যে আমি তোমাকেই দেখি, আমি তোমায় দেখি
যখন গভীর নিশীথে সংকীর্ণ কোনও সাঁকোর উপর
কাঁপতে থাকে কোনও চলমান পথিক।
ক্ষুব্ধ গর্জনে যখন ফেটে পড়ে কোনও উত্তাল ঢেউ তখন
যত দূরেই থাকো না তুমি মনে হয় আমি তোমার কাছেই আছি,
মনে হয় আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার কথা।
মাঝে মাঝে আমি চলে যাই নির্জন পথে, আর সুনিবিড় সুপ্রাচীন
স্তব্ধতার মাঝে আমি শুনতে পাই কত না-বলা কথা।
তুমি যত দূরেই থাকো না, আমি তোমার কাছে কাছেই থাকি,
তুমিও আমার কাছে কাছেই থাকো।
এখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, একটু পরে তারা উঠবে আকাশে,
তারারা কিরণ দেবে আমাকে, যদি তুমি এখন এই মুহূর্তে
নেমে আসতে আমার কাছে, থাকতে আমার কাছেই।

পরিবর্তনের মাঝে পরিবর্তনীয় (Dauer in Wechsel)

Hiel ta diesen fruhemn Segen

হায়, মাত্র আর একটা ঘণ্টা যদি বাঁচিয়ে রাখতে
এই সৌন্দর্যের সজীব সমারোহকে। কিন্তু হায়,
নিদাঘের উত্তপ্ত ঝড় মুহূর্তে ঝরিয়ে দেবে সব ফুলগুলোকে।
ফুল ঝরে গেলেও গাছের যে সবুজ পাতাগুলো ছায়া দান
করবে আমার সেই সব পাতাদের দেখেও কিছু আনন্দ পাব আমি।
শরতে যখন এই সব পাতারাও বিবর্ণ হয়ে উঠবে তখন
আবার কোনও ঝড় এসে ঝরিয়ে দেবে ওদের।
যদি তুমি ফল পেতে চাও গাছ থেকে তাহলে দেরি করবে না।
তাড়াতাড়ি করো, কারণ এ ফল বেশিদিন থাকবে না,
পেকে গেলেই ঝরে পড়বে, আবার জন্মাবে নূতন ফল।
এ বন এ বাগান ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে ঋতুতে ঋতুতে।
এই সব গাছ স্নিগ্ধশ্যাম এক নূতন শ্রী নূতন শোভা ধারণ করে প্রতিটি বর্ষায়।
যেমন ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে নদীর জল, একই নদীতে
তুমি কখনই সাঁতার কাটতে পার না দুবার। শুধু নদী কেন,
তুমি নিজেও তো বদলে যাচ্ছ, যে সব সৌধ যে সব প্রাসাদ
একদিন পাহাড়ের মতোই অটল মনে হতো, তাদের রূপ আজ
বদলে যাচ্ছে তোমার পরিবর্তনশীল চোখের দৃষ্টিতে।
তোমার যে ওষ্ঠাধর একদিন চুম্বন স্পর্শে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত,
তোমার যে পা একদিন পাহাড়ের উপর অটল
সাহসে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকত তারা আজ নেই।
যে হাত তোমার একদিন পরের কত উপকার করত।
মঙ্গল সাধন করত অকাতরে তা আজ নেই, এমন কি
তোমার দেহাবয়বও বদলে গেলে অনেকখানি।
এখন যেন তুমি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ, অন্য দেহ, অন্য মন।
এখন তোমার শুরু আর শেষ সব একাকার হয়ে যাক,
তুমি খুব দ্রুত, এইভাবে বদলে যাও, তবে কাব্যকলার
অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে ধন্যবাদ দাও। এই পরিবর্তনমান জগৎ ও জীবনের
মাঝে যা কিছু অপরিবর্তনীয়, যা কিছু অক্ষয় থাকে তুলে ধরে রাখেন তিনি
চিরসুন্দর করে রাখেন তিনি যুগ যুগ ধরে তোমার অন্তরাত্মাকে আনন্দ দান করার জন্য।

পেয়েছি (Gefunden)

Ict ging on walde

নির্জন বনভূমির মাঝে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আমি
অথচ কোনও কারণ ছিল না, বিশেষ কোনও কিছু চাইছিলাম না।
একটা ছায়াঘেরা কুঞ্জে ছোট্ট ফুল দেখছিলাম আমি,
সন্ধ্যাতারার মতো জ্বল জ্বল করছিল ফুলটা, যেন
একজোড়া সুন্দর চোখ চেয়ে আছে আমাদের পানে উজ্জ্বলতম দৃষ্টিতে।
ফুলটা আমি ছিঁড়তে গেলে ফুলটা বলল আমায়,
আমাকে তুমি ছিঁড়ে ফেললেই তো শুকিয়ে যাব আমি।
আমি তখন শিকড় সমেত গোটা ফুল গাছটাকে উপড়ে
আমার সুন্দর বাগানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিতাম।
সে জায়গাটাও বেশ নির্জন এবং গাছটাতে এখন ফুল ফোটে।

উৎস ও রূপান্তর (Selige Schnsucht)

Sagt es niemad, nur dine weisen

একথা একমাত্র বিজ্ঞ ছাড়া আর কাউকে বলো না,
কারণ সাধারণ মানুষ একথা শুনলে বিদ্রূপ করবে,
বিদ্রূপ করবে আমাকে যদি বলি আমি শুধু তাদেরই প্রশংসা করি।
যারা জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরতে চায়।
মিটমিটে বাতিজুলা প্রেমঘন যে নিশীথে তোমার জন্ম হয়
যে নিশীথে তুমি জন্মদান করো তোমার সন্তানকে সেই নিশীথে
স্বল্পায়িত দীপালোকে কত আশঙ্কা ভিড় করে আসে আজ তোমার মনে।
তুমি কিন্তু এই নিশীথ রাত্রির ছায়ান্ধকারে বসে থাকতে চাও না,
তুমি চাও আরও উপরে উঠতে, তুমি চাও আরও উন্নত মিলন।
কোনও দূরত্ব অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে না তোমার পথে,
মোহমুগ্ধ উদভ্রান্তপ্রাণ পতঙ্গের মতো তুমি উড়ে যাও,
উড়ে যাও শুধু জ্বলে পুড়ে মরার জন্য।
আসল সত্যটা শেষ পর্যন্ত না জানা পর্যন্ত তোমার কোনও
রূপান্তর হয় না, কোনও পরিবর্তন হয় না,
এক বাঞ্ছিত অতিথির মতো ঘুরে বেড়াও এই অপরিচিত পৃথিবীতে।

কাব্য ও রূপাবয়ব (Lied and Gebilde)

Mag der Grieche Seinen ton

কোনও এক গ্রীক শিল্পীকে কাদামাটি দিয়ে একটি মূর্তি গড়তে দাও,
তার সেই শিল্পকর্ম থেকে যত খুশি আনন্দ পেতে দাও তাকে।
কিন্তু আমি যে আনন্দ পেতে চাই না, আমি ইউফ্রেতিস নদীতে
হাত ডুবিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে লাভ করব যত সব ক্ষণভঙ্গুর আনন্দ।
এইভাবে যখন শীতল হয়ে উঠবে আমার অন্তরাত্মার উত্তাপ
তখন আপনা থেকে গান বেরিয়ে আসবে আমার কণ্ঠ থেকে
সে গান কোনও কবির হাতে পড়লে নিরাবয়ব জলও হয়ে উঠবে মূর্ত।
ঐ দেখো প্রিয়তমা, ঐ দেখো সবুজ গাছের শাখায় কত ফল ঝুলছে,
ঝুলছে কত দিন ধরে আর যে শাখাগুলো তাদের কোলে আশ্রয় দিয়েছে
ফলগুলোকে সেই সব শাখারা শুধু হাওয়ায় দুলছে।
সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে আমরা বাদামী অন্তরটা ঐ সব ফলের মতোই
ফুলে উঠেছে পেকে উঠেছে ভিতরে ভিতরে
সে অন্তর আমার বাতাসের স্পর্শ চায়, তার স্বর্গের মুখ দেখতে।

প্রাচীন বিজ্ঞদের উক্তি : আর্ষিক (Urworte, Orphich)।

Wie the dem Tag

নিয়তি

যেদিন তুমি প্রথম এই পৃথিবীতে এসেছিলে তখন গ্রহনক্ষত্ররা
যেভাবে দাঁড়িয়ে সূর্যকে অভিবাদন জানিয়েছিল সেইভাবেই জীবন
শুরু হয়েছে তোমার। সেই সব গ্রহনক্ষত্রদের অবস্থানজনিত
আইনের দ্বারা অনুশাসিত হচ্ছে তোমার জীবন।
সিবিন ও প্রাচীন ভবিষ্যদ্বক্তারা বলেছেন নিয়তির এই
অনুশাসন থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই। কোনও কাল কোনও শক্তি
তোমার জন্মদিনে গড়ে ওঠা ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন করতে পারবে না।

দৈব

তথাপি এক পরিবর্তনশীল শক্তি আমাদের কাছে কাছে থেকে
নিয়তির কঠোর বিচার ও অনুশাসনকে আনন্দে পরিণত করে তোলে
আমাদের। হে দৈব, তুমি একা থাকো না, মানুষের সমাজে থেকে
তুমি খাপ খাইয়ে নাও সবার সঙ্গে। জীবনে আমাদের
কোনও কোনও ঘটনা হয় অনুকূল, কোনও কোনও ঘটনা হয় প্রতিকূল।
আমরা কেউ কেউ ঘটনা নিয়ে পুতুলের মতো খেলা করি।
হে দৈব, তুমি হচ্ছ সেই আলোক শিখা যার পথ চেয়ে
বসে আছে আমাদের অসহায় জীবনের বাতিগুলো।

প্রেম

এই প্রেম কখনও মরে না, স্তব্ধ হয় না একেবারে।
মনে হয় এ প্রেম পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যাবে আকাশ থেকে,
সমস্ত বসন্ত দিন জুড়ে আমাদের বুক ও মাথার চারদিকে উড়তে থাকে।
কখনও কখনও সে প্রেম জানিয়ে যায়, আমাদের দুঃখ দেয়,
কিন্তু একেবারে পালায় না, আবার ফিরে আসে আর তখন সকল বেদনার
অবসানে অফুরন্ত আনন্দের চঞ্চল আবেগে নিকম্পিত হয়ে ওঠে
আমাদের অন্তর। অনেক অন্তর অনেককে বিলিয়ে দেয় নিজেদের
কিন্তু যারা মহান তারা হয় এককেন্দ্রিকতায় অবিচল।

প্রয়োজন

আবার কেউ গ্রহনক্ষত্রের বিধান, নিয়তির অনুশাসন আর নিয়ন্ত্রণ।
আমাদের ইচ্ছারাও নিয়তির দাস, তারা যন্ত্রবৎ নিয়ন্ত্রিত হয়
নিয়তিজনিত প্রয়োজনের দ্বারা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছার কোনও মূল্য নেই।
ফলে যা আমাদের অতি আকাক্ষিত, যা আমরা অন্তর দিয়ে
ভালোবাসি তাদের আমাদের অন্তরই প্রত্যাখ্যান
করতে বাধ্য হয় অবস্থার চাপে। তার ফল এই হয় যে
আমরা যারা নিজেদের স্বাধীন বলে মনে করি এবং সেই মতো চলি
তাদের অবস্থা হয়ে ওঠে আরও খারাপ, আরও দুঃখজনক।

আশা

আমাদের চারদিকে ঘিরে থাকা পিতলের নিচ্ছিদ্র দেওয়ালে
যে কঠিন দরজা আছে সে দরজার তালা খোলা যেতে পারে।
সুদুর প্রাচীনকাল হতে পাহাড়ের মতো অচল অটল
হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐ দেওয়াল আর দরজা
তার উপর সচল এক সত্তা অবাধে ঘুরে বেড়ায়।
মেঘ বৃষ্টি আর কুয়াশার মধ্য দিয়ে আমাদের তুলে নেয় অনেক উপরে।
আমাদের উড়ে চলার পাখা দেয়।
শুভ্র সমুজ্জ্বল পদ্মের মতো শান্ত দীপালোক বা দূরাগত
নক্ষত্রালোকের মতো হৃদয় হতে বেরিয়ে আসে প্রেমের আলো।
প্রাচীন নার্সিসাস ফুল ফুটে ওঠে বাগানে। একমাত্র
এই ফুলই হয়ত জানে সে কার জন্য ফুটছে।
ক্রমে ধীরে ধীরে পদক্ষেপে নেমে আসছে সন্ধ্যার অন্ধকারে।
শান্ত আলোকচ্ছটা বিকীরণ করে সন্ধ্যাতারা ফুঠে উঠছে নির্জন আকাশে।
অন্ধকার আর সন্ধ্যা কুয়াশার বিলীন হয়ে যাচ্ছে অথবা
অস্পষ্ট দেখাচ্ছে সব কিছু। লেকের কালো জল অন্ধকারে
কালো হয়ে উঠছে আরও।
এবার দূর আকাশে চাঁদের আলো দেখতে পাচ্ছি
জলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছিপছিপে চেহারার
উইলো গাছের শাখাগুলো উড়ন্ত কুস্তলচূর্ণের মতো বাতাসে উড়ছে।
আর তাতে চাঁদের আলোটা কাঁপছে আর কম্পমান
সেই আলোছায়ায় খেলা দেখতে দেখতে অন্তরে এক
প্রশান্তি নেমে আসছে আবার যা আগে অনুভব করিনি কখনও।

কাইন্ডার্ড বাই চয়েস (উপন্যাস)

কাইন্ডার্ড বাই চয়েস (উপন্যাস)

প্রথম খণ্ড

প্রথম পরিচ্ছেদ

এডওয়ার্ড হচ্ছে জনৈক ব্যারন বা সামন্ত যুবকের নাম। এপ্রিলের কোনও এক বিকেলে সে তার ফুলবাগানে কাজ করছিল একা একা। তার কাজ শেষ হয়ে যেতেই বাগানের মালী তার কাছে এল। তাকে দেখে এডওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করল, আমার স্ত্রী এখন কোথায়, তাকে দেখেছ?

মালী বলল, ওই ওখানে, নতুন বাড়ির মাঠে। প্রাসাদের উল্টোদিকে যে বাড়িটা তিনি করেছিলেন তার কাজ শেষ হয়ে গেছে। বাড়িটা সত্যিই আপনার ভালো লাগবে। কাজেই গাঁ, ওপর থেকে দেখতে পারেন। একটু ডানদিকে চার্চ। উল্টোদিকে এই প্রাসাদ আর বাগান।

এডওয়ার্ড বলল, হ্যাঁ, আমি লোকজনদের কাজ করতে দেখেছি।

মালী উৎসাহিত হয়ে বলল, বাড়িটার ডানদিকে একটা ছায়াঘেরা প্রান্তর উপত্যকায় গিয়ে মিশে গেছে। পাহাড়ে যাবার পথটা বড় চমৎকারভাবে নির্মাণ করা। গিন্নীমার সত্যিই বড় সূক্ষ্ম রুচিবোধ আছে।

এডওয়ার্ড বলল, এখন তাকে গিয়ে বলল, নতুন বাড়িটা আমি নিজে গিয়ে দেখতে চাই।

মালী ব্যস্ত হয়ে চলে গেল। মালী চলে গেলে এডওয়ার্ড একাই বাগান থেকে পুরনো প্রাসাদটাকে ফেলে রেখে নতুন বাড়িটাতে চলে গেল। তার স্ত্রী শার্লোতে তারই জন্য অপেক্ষা করছিল। শার্লোতে তাকে সঙ্গে করে উপরতলায় এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেল যেখান থেকে চারদিকের দৃশ্য সব দেখা যাবে।

সেখান থেকে চারদিকে খুঁটিয়ে দেখে সত্যিই খুশি হলো এডওয়ার্ড। বলল, সত্যি চমৎকার। তবে একটি ত্রুটি আছে। বাড়িটার আয়তন ছোট হয়ে গেছে।

শার্লোতে বলল, কিন্তু আমরা তো মাত্র দুজন প্রাণী। বেশি জায়গার দরকার কি? তাছাড়া এখানে দুজন ছাড়া আরও বেশি কিছু লোক ধরবে।

এডওয়ার্ড শান্ত কণ্ঠে বলল, দেখো, একটা কথা তোমাকে কদিন থেকে বলব ভাবছি, কিন্তু বলতে পারিনি। কিন্তু আজকের ডাকে একটা চিঠি পেয়ে আর না বলে পারছি না।

শার্লোতে বলল, আমিও এই রকম একটা কিছু লক্ষ্য করছি। কিন্তু কথাটা কি?

এডওয়ার্ড বলল, কথাটা আমাদের বন্ধু সেই ক