রঞ্জক বস্তু দ্বারা আবৃত একটি দৃষ্টিগত স্নায়ু বিরাট আর্টিকুলাটা (Articulata) শ্রেণীতে আমরা দেখি। রঞ্জক বস্তুটি অনেক সময় চোখের মণির মতো বস্তু সৃষ্টি করে, কিন্তু লেন্স অথবা দৃষ্টি সংক্রান্ত তান্য কলাকৌশল এতে থাকে না। পতঙ্গদের ক্ষেত্রে এমন জানা গিয়েছে যে এদের বিরাট পুঞ্জাক্ষির কর্ণিয়ার উপর অসংখ্য ফ্যাসেট (facet) প্রকৃত লেন্সের কাজ করে এবং শঙ্কগুলি অদ্ভুতভাবে রূপান্তরিত নার্ভ ফিলামেন্ট দিয়ে তৈরি। কিন্তু আর্টিকুলাটা শ্রেণীতে এইসব অঙ্গ এত বৈচিত্র্যপূর্ণ হয় যে মুলার পুঞ্জীভূত সরল চোখদের একসময় সাতটি উপবিভাগ সমেত তিনটি প্রধান শ্রেণী এবং একটি চতুর্থ প্রধান শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেছিলেন।
নিম্নতর প্রাণীদের ক্ষেত্রে গঠনের ব্যাপক, বিচিত্র ও ক্রমবিন্যাসগত ধাপ সম্পর্কে এখানে সংক্ষেপে প্রদত্ত ঘটনাগুলি, এবং ইতিমধ্যে বিলুপ্তদের তুলনায় যাবতীয় জীবন্ত আকাররা কত অল্প সংখ্যক হয়, এসব যখন আমরা স্মরণ করি তখন বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় না যে রঞ্জক পদার্থ দ্বারা আবৃত এবং স্বচ্ছ ঝিল্লি দ্বারা সজ্জিত একটি দৃষ্টিনার্ভের সরল অঙ্গটিকে প্রাকৃতিক নির্বাচন একটি দৃষ্টিযন্ত্রে রূপান্তরিত করে থাকতে পারে, যা আর্টিকুলাটা শ্রেণীর যে কোন সদস্যের দৃষ্টিযন্ত্রের মতোই নিখুঁত হয়।
কেউ যদি গ্রন্থটি আগাগোড়া পড়ার পর লক্ষ্য করেন যে অনির্ণেয় অসংখ্য ঘটনাকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে রূপান্তরের তত্ত্বের দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তাহলে তিনি আরও একটু পড়বেন এবং আরও পড়তে ইতস্তত করবেন না, এবং তখন তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে ঈগলের চোখের মতো এত নিখুঁত একটি অঙ্গ এভাবে সৃষ্টি হবে, যদিও এক্ষেত্রে সংক্রমণগত ধাপগুলি তার জানা নেই। অনেকে বলেন যে চোখকে রূপান্তরিত করার জন্য এবং একটি নিখুঁত যন্ত্র হিসেবে চোখকে সুংরক্ষণ করার জন্য অনেক পরিবর্তন যুগপৎ ঘটাতে হবে, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন মারফৎ করা যেতে পারে না বলেই মনে হয়। কিন্তু গৃহপালিত প্রাণীদের পরিবৃত্তি সংক্রান্ত আমার গবেষণাকাজে আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি, এটি মনে করা আবশ্যিক নয় যে রূপান্তরগুলি সকলে যুগপৎ ঘটেছিল, যদিও এরা অতিশয় অল্প এবং পর্যায়ক্রমিক ছিল। বিভিন্ন ধরনের রূপান্তরসমূহ একই সাধারণ উদ্দেশ্যও সাধন করবে। যেমন মিঃ ওয়ালেস মন্তব্য করেছেন, “একটি লেন্সের ফোকাস অতি হ্র অথবা অতি দীর্ঘ হলে, বক্রতার পরিবর্তন অথবা ঘনত্বের পরিবর্তন দ্বারা তাকে সংশোধন করা যেতে পারে; যদি বক্রতাটি অনিয়মিত হয় এবং রশ্মিগুলি একটি বিন্দুতে আপতিত না হয়, তাহলে বক্রতার যে কোন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সুষমতার উন্নতি ঘটবে। অতএব কনীনিকাটির সংকোচন এবং চোখটির মাংসপেশীর বিচলনের কোনটিই দৃষ্টিশক্তির জন্য অপরিহার্য নয়, বরং প্রয়োজনীয় হল দৃষ্টিশক্তির উন্নতিসাধন যা যন্ত্রটি সৃষ্টি যে কোন ধাপে যুক্ত হয়ে ও নিখুঁত হয়ে থাকতে পারে।” প্রাণীজগতের সর্বোচ্চ বিভাগ তথা মেরুদণ্ডী শ্রেণীর মধ্যে, আমরা একটি অত্যন্ত সরল চোখ থেকে শুরু করতে পারি যে এটি ল্যান্সলেট মাছের মতো একটি স্নায়ু এবং চারিদিকে রঞ্জক পদার্থ সমেত স্বচ্ছ চামড়ার একটি ছোট থলি দ্বারা তৈরি, কিন্তু এটিতে অন্য কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। মাছ এবং সরীসৃপদের ক্ষেত্রে, ওয়েনের বক্তব্য হচ্ছে, ডায়োপট্রিক (dioptric) অঙ্গগুলির ক্রমবিন্যাসমতো বিস্তার অতিশয় বিরাট হয়। এটি একটি তাৎপর্যমূলক ঘটনা যে ভিরচোউ-এর মতো সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞের মতে, এমনকি মানুষের মধ্যেও চামড়ার একটি থলির মতো ভাজে অবস্থিত বহিঃত্বক কোষগুলির একটি পুঞ্জীভবন দ্বারা সুন্দর স্ফটিকতুল্য লেন্সটি ক্রুণটিতে সৃষ্টি হয়েছে এবং অক্ষিলেন্সের পিছনে তরল পদার্থটি অন্তঃত্বকীয় ভূণকলা থেকে সৃষ্ট। হয়েছে। যাই হোক না কেন, এটির সমস্ত বিস্ময়কর অথচ সম্পূর্ণ নিখুঁত নয় এমন বৈশিষ্ট্যগুলি সমেত চোখটির গঠন সম্পর্কে একটি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এটি অপরিহার্য যে যুক্তির উচিত কল্পনাকে জয় করা। কিন্তু যারা প্রাকৃতিক নির্বাচন সূত্রটিকে পূর্ণাকারে প্রয়োগ করতে ইতস্ততঃ করেছে, তাদের এই মনোভাবে আশ্চর্যান্বিত হয়ে আমি আরও বেশি অসুবিধা অনুভব করেছি।
একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সঙ্গে চোখের তুলনা পরিহার করা মোটেই সম্ভব নয়। আমরা জানি যে এই যন্ত্রটি সর্বোচ্চ মানবগুণের দীর্ঘ প্রচেষ্টার দ্বারা নিখুঁত হয়েছে; এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে চোখও কিছুটা অনুরূপ প্রক্রিয়া দ্বারাই সৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি কি দুঃসাহসিক নয়? আমাদের মনে করার কোন অধিকার আছে কি যে সৃষ্টিকর্তা মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করেন? একটি অপটিক্যাল যন্ত্রের সঙ্গে চোখের তুলনা করতে হলে নিচে অবস্থিত আলো সুবেদী একটি স্নায়ু এবং ফাঁকা জায়গায় তরল পদার্থ পূর্ণ, এমন একটি স্বচ্ছ কলার স্তর কল্পনায় আনতে হবে এবং তারপর মনে করতে হবে যে এই স্তরের প্রতিটি অংশ ঘনত্বে মন্থরভাবে অনবরত পরিবর্তিত হচ্ছে, যাতে করে পরস্পরের থেকে বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত বিভিন্ন ঘনত্বের এবং পুরুত্বের স্তরগুলি পৃথক হয় এবং স্তরের পৃষ্ঠগুলি আকারে মন্থরভাবে পরিবর্তিত হয়। আমাদের আরও মনে করা উচিত যে প্রাকৃতিক নির্বাচন অথবা যোগ্যতমের উদ্বর্তন নামে একটি শক্তি আছে, যা সর্বদা স্বচ্ছ স্তরসমূহের প্রত্যেক অল্প পরিবর্তনকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে এবং প্রত্যেকটিকে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করছে, যা আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে কোন উপায়ে অথবা যে কোন মাত্রায় একটি স্পষ্ট প্রতিবিম্ব সৃষ্টির চেষ্টা করে। আমাদের স্মরণে রাখা উচিত যে যন্ত্রটির প্রত্যেক নূতন অবস্থা লক্ষগুণ বৃদ্ধি পায়; একটি ভাল প্রতিবিম্ব তৈরি হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকে সংরক্ষিত হয় এবং তারপর পুরনোগুলি বিনষ্ট হয়। জীবন্ত শরীরে পরিবৃত্তি অল্প রদবদল ঘটাবে, উৎপাদন প্রায় সাংখ্যাতীতভাবে এদের সংখ্যাবৃদ্ধি করবে এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন অভ্রান্ত দক্ষতার সঙ্গে উন্নতটিকে চয়ন করবে। এই প্রক্রিয়াটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলুক, এবং প্রত্যেক বৎসরে অনেক ধরণের লক্ষ লক্ষ এককদের উপর এই প্রক্রিয়াটি চলুক; এবং আমরা কি বিশ্বাস করতে পারি না যে একটি জীবন্ত অপটিক্যাল যন্ত্র কাঁচের তৈরী ঐরূপ একটি যন্ত্রের তুলনায় উৎকৃষ্টতর হিসেরে এইভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে, যেভাবে সৃষ্টিকর্তার কাজ মানুষের কাজের থেকে উৎকৃষ্টতর হয়?
