পৃথক এবং অসংখ্য সৃষ্টিকার্যে যিনি বিশ্বাস করেন, তিনি বলতে পারেন যে এইসব ঘটনাগুলিতে সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট হয়ে একটি ধরনের জায়গায় অন্য ধরনকে সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আমার মনে হয় এটা স্রেফ সম্ভ্রম-জাগানো ভাষায় একই কথাকে পুনর্বার বলা ছাড়া আর কিছুই নয়। যিনি অস্তিত্বের সংগ্রাম এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের নীতিতে বিশ্বাস। করেন, তিনি স্বীকার করবেন যে, প্রত্যেক জীব সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে অনবরত চেষ্টা করছে, এবং হয় স্বভাবে অথবা দেহগঠনে কোন জীব যদি কখনও খুব অল্পভাবে। পরিবর্তিত হয় এবং এভাবে একই দেশে অন্য অধিবাসীদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তাহলে তাদের নিজস্ব স্থান থেকে যতই পৃথক হোক না কেন, তারা উক্ত অধিবাসীদের জায়গা দখল করবে। অতএব এটি তার বিস্ময় উদ্রেক করবে না যে যারা স্থলে বাস। করে, কদাচিৎ জলে নামে, এমন লিপ্তপদ রাজহাঁস এবং ফ্রিগেট পাখিরা নিশ্চয়ই ছিল; জলাভূমির পরিবর্তে তৃণভূমিতে বসবাসকারী পায়ের লম্বা আঙ্গুলবিশিষ্ট কর্নক্রেকরা নিশ্চয়ই ছিল; যে অঞ্চলে কদাচিৎ গাছ জন্মায় এমন জায়গাতেও কাঠঠোকরারা নিশ্চয়ই ছিল; ডুবুরি গ্লাস পাখি ও ডুবুরি হাইমেনটেরা এবং অকদের স্বভাব সম্বলিত পেট্রেল পাখিরাও নিশ্চয়ই ছিল।
চরম উৎকর্ষতার এবং জটিলতার অঙ্গ
বিভিন্ন দূরত্বের জন্য ফোকাস ঠিক করার, আলোর বিভিন্ন পরিমাণ গ্রহণ করার, গোলকীয় এবং বর্ণালীসংক্রান্ত অপেরণ (aberration) সংশোধন করার জন্য এর সমস্ত অননুকরণীয় কৌশলগুলি সমেত চোখটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের দ্বারা সৃষ্ট হয়ে থাকবে– এটি কল্পনা বা ধারণা করা, আমার মতে, নিতান্তই হাস্যকর। যখন প্রথম বলা হয়েছিল যে সূর্য স্থির এবং পৃথিবী তার চতুর্দিকে পরিক্রমণ করে, তখন মানবজাতির সাধারণ জ্ঞান ঘোষণা করেছিল যে তত্ত্বটি ভুল। কিন্তু প্রত্যেক দার্শনিকই জানেন যে প্রাচীন প্রবাদবাক্য জনগণের মত, ভগবানের মত–একে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা যেতে পারে না। যুক্তি আমায় শেখায় যে, যদি একটি সরল ও অসম্পূর্ণ চোখ থেকে একটি জটিল ও সম্পূর্ণ চোখ পর্যন্ত অসংখ্য ক্রমবিন্যাসগত ধাপ বর্তমান আছে বলে দেখানো যায়, তাহলে প্রত্যেকটি ধাপ তার ধারণকারীর পক্ষে উপকারী হবে এবং বাস্তবেও এটিও সত্য; চোখটি যদি কখনও পরিবর্তিত হয় এবং পরিবর্তনগুলি আনুবংশিক বা বংশগত হয়–বাস্তবে ঠিক তা-ই ঘটে। এবং এরূপ পরিবর্তনগুলি যদি জীবনের পরিবর্তিত পরিবেশে যে কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে উপকারী হয়, একটি সম্পূর্ণ এবং জটিল চোখ প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা সৃষ্টি হতে পারত, যদিও আমাদের কল্পনায় অলঙ্ঘ্য, তখন বিশ্বাস করার অসুবিধাকে তত্ত্বটির পরাভব হিসাবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। কেমন করে একটি নার্ভ (স্নায়ু) আলোয় সুবেদী হয়, কেমন করে জীবন সৃষ্টি হয়েছে, তা এর তুলনায় কদাচিৎ আমাদের আরও বিচলিত করে; কিন্তু আমি উল্লেখ করতে পারি যে, যেহেতু স্নায়ুহীন কতিপয় নিম্নতম জীব আলো অনুভব করতে সমর্থ, তাই এটি অসম্ভব বলে নয় যে এদের সারকোডে (sarcode) কোন সুবেদী উপাদান পুঞ্জীভূত হয়ে থাকবে এবং এই বিশেষ সংবেদনশীলতা গুণ সমেত নার্ভগুলি বিকশিত হয়ে থাকবে।
যে কোন প্রজাতির কোন অঙ্গ যে সব ক্রমবিন্যাসগত ধাপের মাধ্যমে নিখুঁত হয়েছে, তা অনুসন্ধান করার জন্য তার বংশানুক্রমিক পূর্বপুরুষদেরই কেবল লক্ষ্য করা উচিত। কিন্তু এটি মোটেই সম্ভবপর নয় বলে ক্রমবিন্যাসগত ধাপগুলি দেখার জন্য একই গোষ্ঠীর অন্য প্রজাতি এবং গণগুলিকে অর্থাৎ একই পিতামাতা আকার থেকে উদ্ভূত জ্ঞাতিসম্পর্কবিশিষ্ট বংশধরদের লক্ষ্য করতে বাধ্য হই আমরা। তবে ভিন্ন শ্রেণীগুলির একই অঙ্গটির অবস্থা থেকেও কখনও কখনও সেইসব ক্রমবিন্যাসগত ধাপসমূহের কথা জানা যেতে পারে, যেগুলির মাধ্যমে এটি নিখুঁত হয়ে উঠেছে।
সরলতম অঙ্গটি, যাকে একটি চোখ বলা যেতে পারে, তা একটি চক্ষু-স্নায়ু দিয়ে তৈরি, যা রঞ্জক কোষসমূহ দ্বারা বেষ্টিত এবং ঈষদচ্ছ ত্বক দিয়ে ঢাকা, কিন্তু এতে কোন লেন্স অথবা অন্য প্রতিসারক বস্তু নেই। এম. জোর্ডিয়ান-এর মতানুসারে, আমরা এমনকি এক ধাপ নিচে একে রাখতে পারি এবং রঞ্জক কোষগুলির পুঞ্জ দেখতে পারি যা কোন স্নায়ু ছাড়া আপাততঃ দৃষ্টির অঙ্গ হিসাবে কাজ করে এবং শুধুমাত্র একটি সার্কডিক (sarcodic) কলার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। উপরোক্ত সরল প্রকৃতির চোখগুলি স্পষ্ট দৃষ্টিশক্তির অধিকারী হয় না এবং অন্ধকার ও আলোকের মধ্যে পার্থক্য করতেই শুধুমাত্র ব্যবহৃত হয়। কোন কোন তারা মাছে, স্নায়ুটিকে বেষ্টনকারী রঞ্জক পদার্থের স্তরে ছোট ছোট গর্তগুলি ঈষদচ্ছ আঠালো নরম পদার্থ দ্বারা পূর্ণ, যা উচ্চতর প্রাণীদের কর্ণিয়ার মতো একটি উত্তল পৃষ্ঠ সৃষ্টি করে বিষয়টি সম্পর্কে এম. জোর্ডিয়ান বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি প্রতিবিম্ব তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় না, বরং উজ্জ্বল আলোকরশ্মিগুলিকে কেন্দ্রীভূত করতে এবং আরও সহজভাবে অনুভব করতে সাহায্য করে। আলোকরশ্মিদের এই কেন্দ্রীভবন থেকে আমরা একটি প্রকৃত, প্রতিবিম্ব সৃষ্টিকারী চোখ সৃষ্টির দিকে প্রথম এবং সম্ভবতঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ লাভ করি; কারণ কতিপয় নিম্নতর প্রাণীর শরীরের গভীরে অবস্থিত ও কতিপয় প্রাণীর শরীরের উপর পৃষ্ঠে অবস্থিত অপটিক স্নায়ুর উন্মুক্ত প্রান্তটি কেন্দ্রীভবন যন্ত্রের সঠিক দূরত্বে অবস্থিত থাকলে তার ওপর প্রতিবিম্ব তৈরি হবে।
