যেহেতু আমরা নিজস্ব প্রজাতির এবং একই গণের অন্য প্রজাতিদের পক্ষে উপযুক্ত স্বভাবগুলি থেকে ভিন্ন স্বভাব সম্বলিত এককদের কোন কোন সময় লক্ষ্য করি, তাই আমাদের নিশ্চয় আশা করা উচিত যে এরূপ এককগুলি মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রমী স্বভাব সম্বলিত নূতন প্রজাতি সৃষ্টি করবে এবং তাদের দেহগঠন এদের টাইপের থেকে কম বেশি রূপান্তরিত হবে। এরূপ উদাহরণ প্রকৃতিতেও দেখা যাবে। কাঠঠোকরা পাখির। গাছে ওঠা এবং গাছের ছালের ফাটলের পতঙ্গ ধরার তুলনায় অভিযোজনের আরও আকর্ষণীয় উদাহরণ আর কী-ই বা হতে পারে? তথাপি উল্লেখ করা যায় যে উত্তর আমেরিকার অনেক কাঠঠোকরা পাখি ফল খায় এবং প্রসারিত ডানা সম্বলিত অন্য কাঠঠোকরা পাখিরা ডানার সাহায্যে পতঙ্গদের ধাওয়া করে। লা প্লাটার সমতলভূমিতে, যেখানে কদাচিৎ একটি গাছ জন্মায়, একটি কাঠঠোকরা পাখি বাস করে (কোলাপ্টেস ক্যাম্পেসট্রিস), যার সম্মুখে দুটি এবং পিছনে দুটি পায়ের আঙ্গুল, একটি লম্বা সূচাগ্র জিভ, লেজের সূচাগ্র পালক, পাখিটিকে একটি দণ্ডের উপর খাড়াবস্থায় দাঁড় করাতে যথেষ্ট শক্ত, কিন্তু প্রকৃত কাঠঠোকরার মতো এত শক্ত নয় এমন সূচাগ্র পালক এবং একটি শক্ত সোজা ঠোঁট থাকে। তবে ঠোঁটটি প্রকৃত কাঠঠোকরাদের মতো এত সোজা এবং এত শক্ত নয়, কিন্তু কাঠে গর্ত করার পক্ষে যথেষ্ট শক্ত। অতএব দেহগঠনের সমস্ত প্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এই কাঠঠোকরা পাখিটি প্রকৃতই একটি কাঠঠোকরা পাখি। এমনকি রং, কর্কশ স্বর ও তরঙ্গায়িত উড্ডয়ন-এর মত তচ্ছ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলিতেও আমাদের সাধারণ কাঠঠোকরা পাখির সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়; তথাপি শুধু আমার পর্যবেক্ষণ থেকে নয়, আজারার মতো তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ থেকে আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি যে এরা কোন কোন বড় জেলার গাছে উঠতে পারে না, উঁচু জায়গায় গর্তে বাসা তৈরি করে। মিঃ হাডসন-এর পর্যবেক্ষণানুসারে, অন্য কয়েকটি জেলায় এই একই কাঠঠোকরারা প্রায়শই গাছে ওঠে এবং বাসার জন্য গাছের গুঁড়িতে গর্ত করে। এই গণের পরিবর্তিত স্বভাবদের অন্য একটি উদাহরণ হিসাবে আমি উল্লেখ করতে পারি যে মিঃ দে সসার মেক্সিকোর এক ধরনের কাঠঠোকরার বিবরণ দিয়েছেন যারা শস্যদানা সংগ্রহ করে রাখার জন্য শক্ত কাঠে গর্ত তৈরি করে।
পেট্রেল পাখিরা সাধারণতঃ বায়ুচর ও সামুদ্রিক পাখি, কিন্তু তিয়েরা দেল ফুয়েগোর শান্ত পরিবেশে, এদের সাধারণ স্বভাব, ডুব দেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা, সাঁতার কাটা ও উড্ডয়নের সময় ওড়ার পদ্ধতিতে পুফিনুরিয়া বেরার্ডি পাখিটিকে একটি অক অথবা গ্রেব পাখি হিসাবে যে কেউ ভুল করবে, তা সত্ত্বেও আসলে এটি একটি পেট্রেল, কিন্তু এদের দেহের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এদের নূতন জীবন-স্বভাবের জন্য ভীষণভাবে রূপান্তরিত হয়েছে; অন্যদিকে, লা প্লাটার কাঠঠোকরাদের দেহগঠন অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে রূপান্তরিত হয়েছে। জলচর আউজেল-দের মৃত শরীর পরীক্ষা করার পর কোন প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন পর্যবেক্ষক এদের প্রায় জলচর স্বভাব সম্বন্ধে কখনও সন্দেহ করবে না; তথাপি থ্রাস গোত্রের অন্তর্গত এই পাখিরা জলের মধ্যে ডানা ব্যবহার করে এবং পায়ের পাতা দ্বারা পাথর আঁকড়ে ধরে ডুব দিয়ে শিকার ধরার ওপর জীবনধারণ করে। হাইমেনটেরাস পতঙ্গদের বিরাট বর্গের সমস্ত সদস্যরা স্থলচর হয়, কেবল প্রক্টেট্রাপেস গণ ছাড়া। স্যার জন লুবক এদের জলচর স্বভাব আবিষ্কার করেছিলেন। এরা প্রায়শই জলে প্রবেশ করে এবং পা ব্যবহার না করে কেবলমাত্র ডানার সাহায্যে জলে। ডুব দেয় এবং প্রায় চার ঘণ্টা ধরে জলের গভীরে অবস্থান করে, তবুও অস্বাভাবিক ধরনের স্বভাব অনুসারে এদের দেহগঠনের কোন রূপান্তর পরিলক্ষিত হয় না।
যিনি বিশ্বাস করেন যে আমরা এখন যেমন লক্ষ্য করি প্রত্যেক জীবকে তেমনভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে, তিনি সাময়িকভাবে বিস্মিত হবেন যখন তিনি স্বভাব ও দেহগঠনে মিল নেই এমন কোন প্রাণীকে দেখবেন। এর চেয়ে আরও সহজবোধ্য কী হতে পারে যে পাতিহাঁস এবং রাজহাঁসের লিপ্তপদ সাঁতারের জন্য সৃষ্টি হয়েছে? তথাপি উচ্চভূমি অঞ্চলে লিপ্তপদ রাজহাঁস আছে, যারা কদাচিৎ জলের দিকে যায়; এবং একমাত্র অডুবন ছাড়া আর কেউই পায়ের চারটি আঙ্গুলই যুক্ত ফ্রিগেট পাখিকে সমুদ্রে নামতে দেখেনি। পক্ষান্তরে, গ্রেব ও কুট-রা সঠিকভাবেই জলচর, যদিও এদের পায়ের আঙ্গুলের প্রান্তটি কেবল ঝিল্লি দ্বারা যুক্ত। এর চেয়ে আরও সহজ উদাহরণ কী হতে পারে যে এ্যালাটোরদের লম্বা পায়ের ঝিল্লিহীন আঙ্গুলগুলি জলাভূমি এবং ভাসন্ত উদ্ভিদের ওপর চলার জন্য সৃষ্ট হয়েছে? জলমুরগি এবং ল্যানড্রেলরা এই বর্গের সদস্য, তথাপি প্রথমটি কুটের মতো প্রায় জলচর এবং দ্বিতীয়টি কোয়েল অথবা প্যাট্রিজের মতো প্রায় স্থলচর। এসব ক্ষেত্রে এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে দেহগঠনের অনুরূপ পরিবর্তন ব্যতিরেকেই স্বভাবগুলি পরিবর্তিত হয়েছে। উচ্চভূমির রাজহাঁসের লিপ্তপদ ক্রিয়াকলাপে প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে, যদিও গঠনকাঠামোয় নয়। ফ্রিগেট পাখির পায়ের আঙ্গুলগুলির মধ্যে ছাঁকি জালের মতো ঝিল্লি থেকে বোঝা যায় যে দেহগঠনটি পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।
