পাখিদের প্রায় এক ডজন গণ যদি বিলুপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে কে সন্দেহ করবে যে ঐ সব পাখিরা অতীতে অবস্থান করে থাকতে পারে যারা তাদের ডানাগুলিকে মাথামোটা হাঁসেদের মতো চ্যাটালো পাখনা হিসেবে, পেঙ্গুইনদের মতো জলে পাখনা হিসেবে এবং স্থলে মনের পা হিসেবে, উটপাখির মতো পাল হিসেবে এবং অ্যাপটেরিক্স-এর মতো কার্যকরী কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই ব্যবহার করত? তথাপি এইসব পাখিদের প্রত্যেকের দেহগঠন তাদের নিজস্ব জীবন-পরিবেশে সহায়ক, কারণ প্রত্যেককে বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হয়; কিন্তু এটি সম্ভবপর সমস্ত পরিবেশে মোটেই সম্ভবপর সর্বোত্তম নয়। এইসব মন্তব্য থেকে নিশ্চয় এমন সিদ্ধান্ত করা উচিত হবে না যে এখানে উল্লিখিত ডানা গঠনের ধাপগুলি–যেগুলির প্রতিটিই অব্যবহারের ফল হতে পারে–সেই ধাপগুলির ইঙ্গি ত দেয়, যেগুলির দ্বারা পাখিরা তাদের ওড়ার প্রকৃত ক্ষমতা অর্জন করেছিল; কিন্তু এগুলি দেখাতে সাহায্য করে রূপান্তরের কী কী বিচিত্র উপায় অন্ততঃ সম্ভবপর।
ক্রাস্টেসিয়া (খোলকী বা বর্মী) ও মলাস্কার (কম্বোজ) মতো জলে নিশ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণকারী শ্রেণীর কিছু সদস্যদের স্থলভাগে বসবাসে অভ্যস্ত হওয়া এবং উড়ন্ত পাখি ও স্তন্যপায়ীদের, অতি বিচিত্র ধরনের উড়ন্ত পতঙ্গদের এবং অতীতের উড়ন্ত সরীসৃপদের দেহ লক্ষ্য করে কল্পনা করা যায় যে এখন পাখনা ঝাঁপটানোর সাহায্যে বাতাসে উড়তে পারা উড়ন্ত মাছেরা নিখুঁত ডানা-যুক্ত প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়ে থাকবে। এভাবে যদি ঘটে থাকে, তাহলে কেউ কি কখনও কল্পনা করতে পারবে যে প্রথমদিকে উত্তরণগত অবস্থায় খোলা সমুদ্রের অধিবাসী হয়েছিল এরা এবং অন্য মাছেদের দ্বারা গিলে খাওয়ার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য নিজেদের ওড়ার জায়মান অঙ্গগুলি ব্যবহার করেছিল?
উড্ডয়নের জন্য একটি পাখির ডানার মতো, কোন বিশেষ স্বভাবের জন্য উপযুক্ত একটি অতি নিখুঁত দেহগঠন যখন আমরা দেখি, তখন আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে দেহগঠনের প্রথমদিককার উত্তরণগত ধাপসমূহ প্রদশর্নকারী প্রাণীরা বর্তমানকাল পর্যন্ত কদাচিৎ বেঁচে থাকবে, কারণ এরা এদের উত্তরাধিকারীদের দ্বারা স্থানচ্যুত হয়ে থাকবে এবং এজন্য উত্তরাধিকারীরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের দ্বারা ক্রমশ আরও নিখুঁত হয়ে থাকবে। এছাড়াও, আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে জীবনের অতিশয় ভিন্ন স্বভাবগুলির পক্ষে উপযুক্ত দেহগঠনসমূহের মধ্যে সংক্রমণগত ধাপসমূহ বিরাট সংখ্যায় এবং অনেক অধীনস্থ আকারগুলিতে প্রাথমিক পর্যায়ে কদাচিৎ বিকশিত হয়ে থাকবে। এভাবে উড়ন্ত মাছের কল্পিত ব্যাখ্যায় ফিরে আসলে এটি সম্ভবপর বলে মনে হয় না যে প্রকৃত উড্ডয়নে সমর্থ মাছগুলি জলে এবং স্থলে বিভিন্ন উপায়ে অনেক ধরনের শিকার ধরার জন্য অনেক হীনতর আকারে বিকশিত হয়ে থাকবে, যতদিন না এদের ওড়ার অঙ্গগুলি অতি নিখুঁত হয়ে থাকবে, যাতে করে এরা জীবনসংগ্রামে অন্য প্রাণীদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করার জন্য উন্নততর অবস্থান অর্জন করেছে। অতএব জীবাশ্ম অবস্থায় দেহগঠনের সংক্রমণগত ধাপগুলি সমেত প্রজাতিদের আবিষ্কারের সম্ভাবনা সর্বদাই কম হবে, কারণ পূর্ণ বিকশিত দেহগঠন সম্বলিত প্রজাতির তুলনায় এরা সংখ্যায় অল্পতর ছিল।
একই প্রজাতির এককদের বিচিত্র এবং পরিবর্তিত স্বভাবসমূহের উভয়েরই দুটি অথবা তিনটি উদাহরণ আমি এখন উল্লেখ করব। এদের পরিবর্তিত স্বভাবসমূহ অথবা এদের কতিপয় স্বভাবের কেবলমাত্র একটি সম্বলিত প্রাণীটির দেহগঠনকে যে কোন অবস্থায় অভ্যস্ত করানো প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে সহজ হবে। তবে সিদ্ধান্তে আসা কষ্টকর এবং আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় যে স্বভাবসমূহ প্রথমে এবং দেহগঠন পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হয় কিনা; অথবা দেহগঠনের অল্প রূপান্তর স্বভাবের পরিবর্তনে সাহায্য করে কিনা; সম্ভবতঃ উভয়ই প্রায়শঃ যুগপৎ ঘটে। পরিবর্তিত স্বভাবের ঘটনার মধ্যে অনেক ব্রিটিশ পতঙ্গের উদাহরণ দেওয়াই যথেষ্ট যারা এখন বিদেশি গাছগুলি খায় এবং কেবলমাত্র কৃত্রিম পদার্থের ওপর জীবনধারণ করে। বিচিত্র স্বভাবের অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে : দক্ষিণ আমেরিকার টাইর্যান্ট মক্ষিভুককে ( সৌরফ্যাগাস সালফিউর্যাটাস) আমি প্রায়শই লক্ষ্য করি, যা একটি কেস্ট্রেল (এক জাতীয় ছোট বাজপাখি)-এর মতো একটি জায়গায় ইতস্ততঃ ঘুরত এবং তারপর অন্য জায়গায় অগ্রসর হত এবং অন্য সময়ে জলের ধারে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকত, অতঃপর মাছরাঙা পাখির মতো দ্রুতবেগে কোন মাছের দিকে ঝুঁপিয়ে পড়ত। আমার নিজের দেশে, প্রায় একটি বিসর্পীর মতো চামচিকাকে (প্যারাস মেজর) গাছের শাখাপ্রশাখার ওপরের দিকে উঠতে দেখা যায়; এরা অনেক সময় শ্রাইক (চিল জাতীয় পাখি)-এদের মতো মাথায় আঘাত করে ছোট ছোট পাখিদের হত্যা করে; এবং আমি অনেক সময় দেখেছি এবং ইউগাছের একটি শাখার ওপর বীজগুলিকে আঘাত করার শব্দ শুনেছি এবং একটি নুথ্যাচ পাখির মতো এদের বীজগুলিকে ভাঙতে দেখেছি। উত্তর আমেরিকায় মিঃ হিয়ার্নে দেখেছিলেন যে কৃষ্ণভল্লুকরা মুখ বিরাটভাবে খুলে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটতে এবং প্রায় তিমিদের মতোই জলের পতঙ্গদের ধরতে পারে।
