পরিবেশানুগকরণ
ফুল ফোঁটার সময়, নিদ্রার সময়, বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টির পরিমাণ ইত্যাদির ব্যাপারে উদ্ভিদদের ক্ষেত্রে স্বভাব বা প্রবৃত্তি বংশগত হয়, এবং পরিবেশানুগকরণ সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলতে এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। যেহেতু এটি অতি সাধারণ ব্যাপার যে একই গণের ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিরা ঠাণ্ডা ও গরম দেশে বসবাস করে, এবং যদি এটি সত্য হয় যে একই গণের সমস্ত প্রজাতি একই পিতামাতা আকার থেকে উদ্ভূত হয়েছে, তাহলে একটি দীর্ঘ উদ্ভব প্রক্রিয়ার সময় পরিবেশানুগকরণ নিশ্চয় সহজেই কার্যকরী হয়ে থাকবে। এটি সর্বজনবিদিত যে প্রত্যেক প্রজাতি তার নিজস্ব বাসস্থানের জলবায়ুতে অভিযোজিত হয়; মেরু বা এমন কি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের প্রজাতিরা উষ্ণ জলবায়ু সহ্য করতে পারে না, অথবা বিপরীতটিও ঘটে। আবার অনেক রসালো উদ্ভিদ আর্দ্র জলবায়ু সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন জলবায়ুতে বসবাসকারী প্রজাতিদের অভিযোজনের মাত্রাটিকে প্রায়শই অতিরঞ্জিত করা হয়। বিদেশ থেকে আনীত একটি উদ্ভিদ আমাদের জলবায়ু সহ্য করতে পারবে কি বা পারবে না তার ভবিষ্যদ্বাণী করতে আমাদের অক্ষমতা থেকে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আনীত অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদরা খুবই স্বাস্থ্যবান হয় দেখেই আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি। এটা বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ আছে যে বিশেষ জলবায়ুতে অভিযোজনের তুলনায় অন্য জীবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য প্রাকৃতিক অবস্থায় প্রজাতিদের বিস্তার ততখানি বা আরও বেশি সীমিত হয়। কিন্তু এই অভিযোজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘনসন্নিবিষ্ট হোক বা না হোক, আমাদের নিকট প্রমাণ আছে যে অল্প কিছু উদ্ভিদ বিভিন্ন তাপমাত্রায় স্বাভাবিকভাবে অভ্যস্ত হয়েছে, অর্থাৎ এরা পরিবেশানুগ হয়েছে। ডঃ হুঁকার কর্তৃক সংগৃহীত হিমালয়ের বিভিন্ন উচ্চতায় জন্মানো একই প্রজাতির বীজ থেকে উদ্ভূত পাইন ও রোডোডেনড্রনের চারাগাছ একই দেশে ঠাণ্ডা প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন জৈবিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল বলে দেখা গেছে। মিঃ খোয়াইটস আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি সিলোনে একই ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন; অ্যাজার্স থেকে ইংল্যান্ডে আনীত ইউরোপীয় উদ্ভিদদের ক্ষেত্রে মিঃ এইচ. সি. ওয়াটসন একই ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন। অন্য অনেক ঘটনার কথাও উল্লেখ করা যায়। প্রাণীদের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রামাণিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারত যেখানে দেখা যায় ঐতিহাসিক কাল ধরে উষ্ণতর থেকে শীতলতর অক্ষাংশে এদের বিস্তার ঘটেছিল, এবং তার বিপরীতও ঘটেছিল। কিন্তু আমরা সঠিকভাবে জানি না যে এই প্রাণীরা এদের দেশজ জলবায়ুতে সঠিকভাবে অভিযোজিত হয়েছিল কিনা, যদিও যাবতীয় সাধারণ ক্ষেত্রে এটিই হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। অথবা আমরা জানি না প্রাথমিক অবস্থার তুলনায় সঠিকভাবে উপযুক্ত হওয়ার জন্যে এদের নূতন বাসস্থানে পরবর্তী সময়ে এরা বিশেষভাবে পরিবেশানুগ হয়েছে কিনা।
আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি আদিম যুগে অসভ্য মানুষরা আমাদের গৃহপালিত প্রাণীদের নির্বাচন করেছিল এই কারণে যে এরা উপকারী ছিল এবং আটক অবস্থায় এরা সহজেই সন্তান উৎপাদন করত, এবং এই কারণে নয় যে এরা পরবর্তী সময়ে দূরবর্তী পরিবহণের জন্য সমর্থ হয়েছিল, অতিশয় ভিন্ন জলবায়ু কেবল সহ্য করার জন্য নয়, বরং এসব জলবায়ুতে সম্পূর্ণ উর্বর হওয়ার ব্যাপারে আমাদের গৃহপালিত প্রাণীদের সাধারণ ও অসাধারণ ক্ষমতা একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে যে এখন একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে অন্য প্রাণীদের একটা বিরাট সংখ্যাকে ব্যাপকভাবে ভিন্ন জলবায়ু সহ্য করানো যেতে পারত। আমাদের গৃহপালিত কয়েকটি প্রাণীর কতিপয় বন্য কুল থেকে সম্ভবপর উৎপত্তির জন্য আগের যুক্তিটিকে বেশিদূর নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ, গ্রীষ্মপ্রধান ও মেরু অঞ্চলের একটি নেকড়ের রক্ত আমাদের গৃহপালিত জাতগুলির মধ্যে সম্ভবতঃ মিশ্রিত হয়ে থাকতে পারে। নেংটি ও ধেড়ে ইঁদুরদের গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে না, কিন্তু এরা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে মানুষের দ্বারা পরিবাহিত হয়েছে এবং এখন অন্য যে-কোন রোডেন্টদের চেয়ে এদের বিস্তার অনেক বেশি, কারণ এরা উত্তরের ফারো ও দক্ষিণের ফকল্যান্ডের ঠাণ্ডা জলবায়ুতে এবং উষ্ণ অঞ্চলের অনেক দ্বীপে বেঁচে থাকে। অতএব যে-কোন বিশেষ জলবায়ুতে অভিযোজনকে জৈবসংগঠনের একটি সহজাত নমনীয়তার ওপর সহজেই আরোপ করা যেতে পারে, যা অধিকাংশ প্রাণীদের ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। এই মতানুসারে, মানুষের নিজের এবং তার গৃহপালিত প্রাণীদের অতিশয় ভিন্ন জলবায়ু সহ্য করার ক্ষমতা এবং বিলুপ্ত হাতি ও গণ্ডারদের একটি তুষারযুগের জলবায়ু সহ্য করার ঘটনাটি, অন্যদিকে এখন জীবন্ত প্রজাতিদের স্বভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় হওয়াকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা উচিত হবে না, বরং বিশেষ অবস্থায় জৈবসংগঠনের একটি অতি সাধারণ নমনীয়তা কার্যকরী হওয়ার উদাহরণ হিসেবেই দেখা উচিত।
প্রজাতিদের যে-কোন জলবায়ুতে পরিবেশানুগকরণ কেবল স্বভাবের জন্য কতখানি এবং ভিন্ন সহজাত জৈবসংগঠন সম্বলিত ভ্যারাইটিদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের জন্য কতখানি, এবং উভয়ই যুক্তভাবে কতখানি, এইসব প্রশ্ন নিতান্তই দুর্বোধ্য। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় প্রাণীদের পরিবহণে অত্যন্ত সতর্ক হওয়ার জন্য কৃষিসংক্রান্ত গ্রন্থগুলিতে, এমন কি চীনের প্রাচীন বিশ্বকোষে অনবরত উপদেশ ও উপমা থেকেই আমি বিশ্বাস করি যে স্বভাব বা অভ্যাসের কিছু প্রভাব আছেই। এবং যেহেতু এটি বিশ্বাসযোগ্য যে এদের জেলাসমূহে বিশেষভাবে উপযুক্ত দেহগঠনসমূহ সমস্ত জাত ও উপজাতগুলিকে নির্বাচন করতে মানুষ সমর্থ হয়েছে, তাই আমি মনে করি পরিণামটি নিশ্চয় স্বভাবের জন্যই হয়েছে। বিপরীতক্রমে বা অপরদিকে, যে কোন দেশে অতি সুন্দরভাবে অভিযোজিত দেহগঠন সমেত জন্মানেনা ঐ সব এককদের প্রাকৃতিক নির্বাচন অনিবার্যভাবে সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট হবে। চাষযোগ্য উদ্ভিদ সংক্রান্ত অনেক ধরনের গবেষণামূলক গ্রন্থে বলা হয়েছে যে অন্যদের তুলনায় কোন কোন বিশেষ ভ্যারাইটি বিশেষ বিশেষ জলবায়ু সহ্য করতে পারে। ইউনাইটেড স্টেটসে প্রকাশিত ফলের গাছ সংক্রান্ত বইগুলিতে সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে সুপারিশ করা হয়েছে যে কোন কোন ভ্যারাইটি উত্তরের এবং কোন কোন ভ্যারাইটি দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে চাষ করা যাবে; এবং এইসব ভ্যারাইটিদের অধিকাংশই সাম্প্রতিককালে উদ্ভূত হয়েছে বলে এদের জৈবসংগঠনগত পার্থক্য স্বভাবের জন্য হতে পারে না। জেরুজালেম আর্টিচোক বা হাতিচোক প্রজাতিটি ইংল্যান্ডে কখনও বীজ উৎপাদন করেনি এবং ফলে এর কোন ভ্যারাইটির উদ্ভব ঘটেনি–এটি প্রমাণ করার জন্য বলা হয় প্রজাতিটির পরিবেশানুগকরণ করা যেতে পারে না, কারণ চিরকাল যেমন ছিল এটি এখনও সেরকমই কোমল বা নমনীয়! একই উদ্দেশ্যে কিডনি বা ফ্রেঞ্চ বা বাকা বিনের ঘটনাটি প্রায়শই আরও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ বিংশতি বংশ ধরে তার কিডনি বিনগুলি এত অসময়ে বপন করবে যাতে করে বিরাট পরিমাণ বিন তুষারপাতের দ্বারা নষ্ট হয়, এবং তারপর আকস্মিক সংকরণ যত্ন সহকারে প্রতিরোধ করে কতিপয় জীবিতদের থেকে বীজ সংগ্রহ করবে, এবং তারপর পুনরায় একইরকম সতর্কতার সঙ্গে এইসব চারাগাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বলা যেতে পারে না যে পরীক্ষাটি বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। অথবা এমনও মনে করা উচিত নয় যে কিডনি বিনের চারাগাছের দেহগঠনের পার্থক্য কখনও উদ্ভূত হয় না, কারণ অন্যদের তুলনায় এর কয়েকটি চারাগাছ আরও কত বেশি অনমনীয় সে। সম্বন্ধে বিস্তৃত লেখা প্রকাশিত হয়েছে; এবং এ বিষয়ে আমি নিজেও বিস্ময়কর উদাহরণসমূহ লক্ষ্য করেছি।
