সারাংশ
জীবনের পরিবর্তনশীল পরিবেশে জীবেরা তাদের প্রায় প্রতি অঙ্গে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য উপস্থিত করে, এ বিষয়টি খণ্ডন করা যেতে পারে না; বৃদ্ধির গুণোত্তরীয় হারের দরুন যদি কোন বয়সে, ঋতুতে বা বছরে কঠোর জীবন-সংগ্রাম হয়, তাহলে সে বিষয়েও কোন বিতর্ক করা যেতে পারে না; জীবদের দেহকাঠামো, জৈবসংগঠন ও স্বভাবসমূহের পক্ষে লাভজনক বা উপকারী অসংখ্য বৈচিত্র্য ঘটানোর জন্য দায়ী সমস্ত জীবের পরস্পরের সঙ্গে ও নিজেদের জীবন-পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কসমূহের সীমাহীন জটিলতা বিবেচনা করলে, মানুষের পক্ষে উপকারী পরিবর্তন ঘটার মতো প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য উপকারী পরিবৃত্তিগুলি যদি না ঘটে, তবে সেটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হবে। কিন্তু যে কোন জীবের পক্ষে উপকারী পরিবৃত্তিগুলি যদি কখনও ঘটে, তাহলে এভাবে অর্জিত বৈশিষ্ট্য সমেত এককদের জীবন-সংগ্রামে বেঁচে থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে এবং বংশগতির কঠোর নিয়মের জন্য এরা এভাবে অর্জিত বৈশিষ্ট্য সমেত বংশধর উৎপাদন করতে সচেষ্ট হবে। সংরক্ষণের এই পদ্ধতিটিকে বা যোগ্যতমের উদ্বর্তনকে আমি প্রাকৃতিক নির্বাচন বলেছি। জৈব ও অজৈব জীবন-পরিবেশ সম্পর্কে এটি প্রত্যেক জীবের উন্নতি ঘটায় এবং ফলস্বরূপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি সংগঠনের অগ্রগতি হিসাবে নিশ্চয় বিবেচিত হবে। তা সত্ত্বেও, সরলতম জীবন-পরিবেশ মানানসই হলে, নিম্ন ও সরল আকাররা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
অনুরূপ বয়সে চারিত্রিক গুণগুলি আনুবংশিক হওয়ার নীতি বা পদ্ধতি অনুসারে, প্রাকৃতিক নির্বাচন বয়স্কদের মতো সহজেই ডিম, বীজ অথবা তরুণদের রূপান্তরিত করতে পারে। অসংখ্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল ও অভিযোজিত পুরুষদের অধিক সংখ্যক বংশধর উৎপাদন সুনিশ্চিত করে যৌন নির্বাচন প্রাকৃতিক নির্বাচনকে সাহায্য করতে থাকবে। অন্য পুরুষদের সঙ্গে বিরোধ ও সংগ্রামে যৌন নির্বাচন কেবল পুরুষদেরই উপকারী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করবে; এবং প্রচলিত বংশগতির প্রকৃতি অনুযায়ী এ সব বৈশিষ্ট্য একই লিঙ্গে বা উভয় লিঙ্গে বংশগতভাবে প্রেরিত হবে।
বিভিন্ন ধরনের জীবন-পরিবেশে ও অবস্থানস্থলে বিভিন্ন জীবনাকারদের অভিযোজিত করতে প্রাকৃতিক নির্বাচন সত্যসত্যই কাজ করছে কিনা, পরবর্তী অধ্যায়ে প্রদত্ত সাধারণ স্বাভাবিক অর্থে ও সাক্ষ্যপ্রমাণাদি দ্বারা তা বিচার-বিবেচনা করা হবে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি কেমন করে এটি অবলুপ্তির কারণ হয়; এবং পৃথিবীর ইতিহাসে কেমন করে জীবকূলের অবলুপ্তি ঘটেছে ভূতত্ত্ব সাধারণভাবে তা আমাদের দেখিয়েছে; প্রাকৃতিক নির্বাচন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অপসারণ ঘটাতে প্রণোদিত করে, কারণ জীবকূল অবয়বে, স্বভাবে ও জৈব সংগঠনে যত বেশি অপসরণশীল হয়, তত বেশি সংখ্যক অঞ্চলে অবস্থান করতে পারে–যে কোন ছোট অঞ্চলের অধিবাসীদের ও বিদেশভূমিতে অভিযোজিত উৎপাদনসমূহ লক্ষ্য করার মাধ্যমে আমরা যার প্রমাণ দেখি। অতএব যে কোন একটি প্রজাতির বংশধরদের রূপান্তরের ও সমস্ত প্রজাতির সংখ্যায় বৃদ্ধির জন্য অবিরাম সংগ্রামের সময়কালে বংশধররা যত বেশি অপসরণশীল হবে, জীবনসংগ্রামে। তাদের সাফল্যের সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। এভাবে একই প্রজাতির ভ্যারাইটিদের পৃথক করতে পার্থক্য বা প্রভেদসমূহ তত সময় পর্যন্ত নিয়ত বৃদ্ধি পেতে থাকে, যত সময় পর্যন্ত না এরা একই গণের বা এমনকি ভিন্ন গণগুলির প্রজাতিদের মধ্যেকার বড় বড় পার্থক্যগুলির সমান হয়।
প্রত্যেক শ্রেণীর বৃহত্তর গণগুলির ব্যাপকভাবে পরিব্যাপ্ত ও বিস্তৃত প্রজাতিরা যে সবচেয়ে পরিবর্তিত হয়, এই সাধারণ ঘটনাটি আমরা লক্ষ্য করেছি; এবং এই বিপুলতাকে এদের রূপান্তরিত বংশধরে বংশগতভাবে প্রেরণ করতে এরা সচেষ্ট হয় যা এখন নিজ নিজ দেশে প্রাধান্য বিস্তার করতে সাহায্য করে এদের। আগেই বলা হয়েছে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন বৈশিষ্ট্যের অপসৃতি ঘটায় এবং জীবের কম উন্নত ও মধ্যবর্তী আকারগুলির বিলুপ্তি ঘটায়। এই নীতি অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রত্যেক শ্রেণীর অসংখ্য জীবের মধ্যে আত্মীয়তার প্রকৃতি ও সাধারণত সুনির্দিষ্ট পার্থক্যগুলি ব্যাখ্যা করা যেতে পরে। এটি প্রকৃতই একটি বিস্ময়কর বিষয়–যা সাধারণত আমাদের নজর এড়িয়ে যায়–সমস্ত দেশে ও সমস্ত কালে যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদরা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিত্তিতে এবং এই গোষ্ঠীগুলির অধীনে পরস্পরের সঙ্গে তাদের কতটা পরিমাণে সম্পর্কিত হওয়া উচিত তা আমরা সর্বত্র লক্ষ্য করি–যেমন, একই প্রজাতির ভ্যারাইটিরা সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, একই গণের প্রজাতিরা কম ঘনিষ্ঠভাবে ও অসমানভাবে সম্পর্কিত। যারা গোষ্ঠী ও উপগণ সৃষ্টি করে, ন্নি ভিন্ন গণের প্রজাতিরা কম ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, এবং বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্কিত গণগুলি উপ-গোত্র, গোত্র, বর্গ উপশ্রেণী ও শ্ৰেণীদের সৃষ্টি করে। যে কোন শ্রেণীর কতিপয় অধীনস্থ গোষ্ঠীকে পরের পর কেবলমাত্র একটি সারিতে সাজানো যেতে পারে না, বরং মনে হয় এরা বিন্দুদের চারিদিকে গুচ্ছবদ্ধ, এগুলি আবার অন্য বিন্দুদের চারিদিকে গুচ্ছবদ্ধ হয় এবং এভাবে সীমাহীন চক্রে এটি চলতে থাকে। প্রজাতিরা যদি স্বাধীনভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে এই প্রকার শ্রেণীবিভাগের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভবপর হবে না; কিন্তু বৈশিষ্ট্যের অপসৃতি ও বিলুপ্তির জন্য আবশ্যক বংশানুসৃতি ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর ব্যাখ্যা করা যায়, যেমনটা রেখাচিত্রে দেখানো হয়েছে।
