অবশেষে, আমি বিশ্বাস করি যে অনেক নিম্নস্তরের আকার সারা পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন কারণে বেঁচে আছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে, অনুকূল প্রকৃতির পরিবৃত্তিগুলি বা এককীয় পার্থক্যসমূহ প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার এবং সঞ্চয়নের জন্য কখনও উদ্ভূত হতে পারে na, সম্ভবতঃ কোন ক্ষেত্রেই সম্ভবপর সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য সময় যথেষ্ট নয়। যাকে আমাদের বলা উচিত জৈব সংগঠনের অধঃপতন, অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। বরং প্রধান কারণটি এই ঘটনায় নিহিত আছে যে অতি সরল জীবন-পরিবেশে উচ্চ জৈব সংগঠন কোন উপকারে আসবে না, যেহেতু তাদের প্রকৃতি অতি নমনীয় এবং যেহেতু ধ্বংস হওয়া ও আহত হওয়ার সম্ভাবনা তাদের বেশি থাকে, সম্ভবতঃ সেই হেতু এটি কাজে লাগবে না।
জীবনের প্রথম উন্মেষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সমস্ত জীবের দেহগঠন তখন সরলতম আকারের ছিল। তা হলে প্রশ্ন করা যেতে পারে–অঙ্গগুলির উন্নতি ও পৃথকীকরণের প্রথম ধাপগুলি কিভাবে উদ্ভূত হয়েছিল? মিঃ হার্বার্ট স্পেন্সার সম্ভবতঃ উত্তর দেবেন–যে মুহূর্তে এককোষী জীব বৃদ্ধি বা বিভাজনের দ্বারা কোষসমষ্টিতে পরিণত হয়েছিল অথবা কোন অবলম্বনে আসঞ্জিত হয়ছিল, সেই মুহূর্তেই তার নিয়ম অর্থাৎ “প্রাসঙ্গিক শক্তিগুলি যেমন পৃথক হয়, তার সম্পর্কে ও অনুপাতে যে কোন বর্গের অনুরূপ এককগুলিও তেমনি পৃথক হয়”–এই সূত্রটি কাজ করতে আরম্ভ করবে। কিন্তু যেহেতু পথপ্রদর্শক কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই, সেহেতু এ বিষয়ে দূরকল্পনা সবসময়ই অর্থহীন। তবে এটি মনে করা ভুল যে যতক্ষণ পর্যন্ত না অনেক আকার সৃষ্টি হয়, অস্তিত্বের সংগ্রাম ও ফলস্বরূপ প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটবে না : একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী একমাত্র একটি প্রজাতির পরিবৃত্তিসমূহ উপকারী হতে পারত এবং এভাবে সব এককরা রূপান্তরিত হয়ে থাকত অথবা দুটি ভিন্ন আকারের উদ্ভব হতে পারত। কিন্তু যেমন আমি ভূমিকার শেষে বলেছিলাম যে আরও অতীতে ও বর্তমানে সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী সমস্ত এককদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে যদি আমরা আমাদের গভীর অজ্ঞতা স্বীকার করি, তাহলে প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক কিছুর ব্যাখ্যা না পাওয়ার জন্য কারুর আশ্চর্যান্বিত হওয়া উচিত নয়।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অভিসৃতি
মিঃ এইচ. সি. ওয়াটসন মনে করেন যে আমি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অপসৃতির প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি (যাতে তিনি আপাতত বিশ্বাস করেন) এবং বলা। যেতে পারে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অভিসৃতি এভাবে একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। ভিন্ন অথচ সম্পর্কিত দুটি গণের অন্তর্গত প্রজাতি উভয়েই যদি নতুন ও অপসারী বা ভিন্নমুখী অসংখ্য আকার সৃষ্টি করত, তাহলে এরা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে এত কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত হত যে এদের সকলকে একই গণের মধ্যে শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারত; এবং এভাবে দুটি ভিন্ন গণের বংশধররা একটিতে মিলিত হবে। কিন্তু ব্যাপকভাবে ভিন্ন আকারদের রূপান্তরিত বংশধরদের দেহগঠনের একটি ঘনিষ্ট ও সাধারণ সাদৃশ্যকে অভিসৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিশয় হঠকারী। কাজ হবে। একটি কেলাসের আকার কেবলমাত্র আণবিক শক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়, এবং এটি বিস্ময়কর নয় যে অসদৃশ পদার্থরা কোন কোন সময় একই আকার ধারণ করবে। কিন্তু জীবজগতের ক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে প্রত্যেকের আকার অনির্দিষ্ট জটিল সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, যথা উদ্ভূত পরিবৃত্তিসমূহ, এগুলি এত জটিল কারণের জন্য হয় যে একে অনুধাবন করা দুঃসাধ্য-সংরক্ষিত ও নির্বাচিত পরিবৃত্তিদের প্রকৃতি, যা পারিপার্শ্বিক ভৌতিক অবস্থাসমূহের ওপর নির্ভর করে এবং আরও উচ্চ মাত্রায় পারিপার্শ্বিক জীবগুলির উপর, যাদের সঙ্গে এদের প্রতিযোগিতা করতে হয়, এবং অবশেষে অসংখ্য জন্মদাতা পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত বংশানুসৃতির (যা প্রকৃতিগতভাবে একটি অস্থির উপাদান) ওপর এদের সকলের আকার সমভাবে জটিল সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। এটি অবিশ্বাস্য যে প্রথমে স্পষ্টভাবে পৃথক দুটি জীবের বংশধররা। পরবর্তী সময়ে কখনও এমন ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হবে যে সমগ্র জৈবসংগঠন প্রায় একইরূপ হবে। এটি ঘটলে ব্যাপকভাবে ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক গঠন-স্তরগুলিতে জৈবিক সম্পর্ক নিরপেক্ষভাবে একই আকারের সাক্ষাৎ পাওয়া যেত, কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণাদি যা পাওয়া যায় তা এই মতের বিরোধিতা করে।
মিঃ ওয়াটসন আরও আপত্তি করেছেন যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অপসৃতির সঙ্গে প্রাকৃতিক নির্বাচনের অনবরত বিক্রিয়া অনির্দিষ্ট সংখ্যক বিশেষ আকার সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে। যতদূর সম্ভব অজৈব পরিবেশগুলির কথা বিবেচনা করলে মনে হতে পারে যে যথেষ্ট সংখ্যক প্রজাতি তাপ, আদ্রর্তা ইত্যাদির নানাবিধ বৈচিত্র্যে শীঘ্র অতিযোজিত হবে; কিন্তু আমি সম্পূর্ণভবে স্বীকার করি যে সমস্ত জীবের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ; এবং যে কোন দেশে প্রজাতিদের সংখ্যা জীবের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ; এবং যে কোন দেশে প্রজাতিদের সংখ্যা অনবরত বৃদ্ধি পেতে থাকে বলে জীবনের জৈব পরিবেশ আরও বেশি বেশি করে জটিল হবে। ফলস্বরূপ প্রথম দর্শনে মনে হয় যে দেহগঠনের সুবিধাজনক বৈচিত্র্যগুলির কোন সীমা নেই, অতএব উদ্ভূত প্রজাতিদের সংখ্যারও কোন সীমা থাকবে না। এমনকি অতিশয় উর্বর অঞ্চল বিশেষ আকারদের দ্বারা পরিপূর্ণ কিনা তা-ও আমরা জানি না : বিস্ময়কর সংখ্যক প্রজাতিতে পরিপূর্ণ উত্তমাশা অন্তরীপ ও অস্ট্রেলিয়াতে অনেক ইউরোপীয় উদ্ভিদ ভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ভূতত্ত্ব আমাদের দেখায় যে টার্শিয়ারী পর্বের গোড়ার দিকে খোলকী প্রাণীর প্রজাতিদের সংখ্যা এবং ঐ যুগের মধ্যবর্তী সময়ে স্তন্যপায়ীদের সংখ্যা বিরাটভাবে বাড়েনি বা আদৌ বৃদ্ধি পায়নি। প্রজাতিদের সংখ্যার অনির্দিষ্ট সংখ্যার নিয়ন্ত্রণ ব্যাপারটা তাহলে কী? বিশেষভাবে বহুলাংশে ভৌত পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল একটি অঞ্চলের জীবনের মোট পরিমাণ বা সমষ্টির একটা সীমা নিশ্চয়। থাকবে; অতএব, একটি অঞ্চলে অধিক সংখ্যক প্রজাতি বাস করলে, প্রত্যেক বা প্রায়। প্রত্যেক প্রজাতির অল্প সংখ্যক একক থাকবে; এবং হঠাৎ মরশুমের প্রকৃতি পরিবর্তন ও শত্রুদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এভাবে প্রজাতিদের ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এ সব ক্ষেত্রে ধ্বংসের প্রক্রিয়াটি দ্রুতহারে ঘটবে, অথচ নূতন প্রজাতির উদ্ভব ঘটবে মন্থর গতিতে। একটি চরম অবস্থার কথা কল্পনা করুন। ইংল্যান্ডে যত প্রজাতি আছে তত। এককও রয়েছে, এবং প্রথম প্রচণ্ড শীত বা অতি শুষ্ক গ্রীষ্মকাল হাজার হাজার প্রজাতিকে ধ্বংস করবে; বিরল প্রজাতিরা এবং যে কোন দেশে প্রজাতিদের সংখ্যা অনির্দিষ্টভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন বিরল হওয়া প্রত্যেক প্রজাতি প্রায়শই ইতিমধ্যে ব্যাখ্যাত পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অল্প অনুকূল পরিবৃত্তির উদ্ভব ঘটাবে; ফলে নূতন বিশিষ্ট আকারের জন্মদান প্রক্রিয়ার গতি এভাবে হ্রাস পাবে। কোন প্রজাতি বিরল হয়ে এলে, নিকট আত্মীয়দের আন্তঃপ্রজনন তার ধ্বংসসাধনে সাহায্য করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে লিথুয়ানিয়াতে আউরকদের, স্কটল্যান্ডে লাল হরিণদের, নরওয়েতে ভল্লুকদের সংখ্যা কমে যাওয়ার ব্যাপারে এটি একটি ভূমিকা পালন করেছে। অবশেষে আমি মনে করতে বাধ্য হচ্ছি যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হচ্ছে তার নিজের দেশে বহু প্রতিযোগীকে ইতিমধ্যেই পরাজিত করেছে এমন প্রাধান্য বিস্তারকারী প্রজাতি, সে বিস্তার লাভ করার জন্য এবং অনেককে স্থানচ্যুত করার জন্য সচেষ্ট হবে। আলফোনসে ডি ক্যান্ডেলে দেখিয়েছেন যে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত প্রজাতিরা সাধারণতঃ আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হতে সচেষ্ট হয়; ফলে এরা কয়েকটি অঞ্চলের কয়েকটি প্রজাতিকে স্থানচ্যুত ও ধ্বংস করতে চেষ্টা করবে, এবং এভাবে সারা পৃথিবীতে বিশেষ আকারদের অবাধ বৃদ্ধি প্রতিরোধ করবে। ডঃ হুঁকার সম্প্রতি দেখিয়েছেন যে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে স্পষ্টতঃ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী প্রবেশ করেছে, যার ফলে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় প্রজাতিদের সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে। এইসব বিচার বিবেচনাতে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, দুঃসাহসী হয়ে সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারি না; কিন্তু এগুলি একত্রে প্রত্যেক দেশে বিশেষ আকারদের অনির্দিষ্ট বৃদ্ধির প্রবণতাকে নিশ্চয় রোধ করবে।
