প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা সংঘটিত বিলুপ্তি
আমাদের ভূতত্ত্ব সংক্রান্ত অধ্যায়ে এই বিষয়টি আরও বিশদভাবে আলোচিত হবে। তবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের সঙ্গে এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে এ বিষয়ে কিছু কথা এখানে বলা দরকার। কোন-না-কোনভাবে সুবিধাজনক পরিবৃত্তিগুলির সংরক্ষণের মাধ্যমেই প্রাকৃতিক নির্বাচন ক্রিয়া করে, যে সুবিধাগুলি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নেয়। সমস্ত জীবের বৃদ্ধির উচ্চ গুণোত্তরীয় হার থাকার জন্য প্রত্যেক অঞ্চল ইতিমধ্যে অধিবাসীদের দ্বারা পূর্ণ হয়েছে; এবং এর থেকে অনুধাবন করা যায় যে যেহেতু আনুকূল্যপ্রাপ্ত আকাররা সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়, সেহেতু কম আনুকূল্যপ্রাপ্তরা সংখ্যায় হ্রাস। পায় ও বিরল হয়। ভূবিদ্যা আমাদের শেখায় বিরলতা হচ্ছে বিলুপ্তির পূর্বাভাস, কিন্তু। আমরা দেখতে পাই মরশুমের প্রকৃতির বিরাট পরিবর্তনের জন্য অথবা এদের শত্রুদের সাময়িক সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অল্প কয়েকটি একক সম্বলিত আকারের সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আমরা আরও অগ্রসর হতে পারি; কারণ যেহেতু নূতন আকাররা সৃষ্ট হয়েছে, যতক্ষণ না আমরা স্বীকার করছি যে বিশেষ আকাররা অনির্দিষ্ট সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পারে, অনেক বয়স্ক আকার নিশ্চয় বিলুপ্ত হবে। ভূতত্ত্ব আমাদের শেখায় যে বিশেষ আকাররা অনির্দিষ্টভাবে সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় না। এখন আমরা দেখার চেষ্টা করব সমগ্র পৃথিবীতে প্রজাতির সংখ্যা কেন বিলুপ্ত হয় না।
আমরা দেখেছি যে কোন নির্দিষ্ট সময়পর্বে অধিক সংখ্যক একক সম্বলিত প্রজাতিদের অনুকূল/উপযুক্ত পরিবৃত্তি উদ্ভাবনের ভাল সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে উল্লিখিত তথ্যসমূহে এর সাক্ষ্যপ্রমাণাদি আমাদের কাছে আছে, সেখানে দেখানো হয়েছে যে সুলভ ও পরিব্যাপ্ত এবং প্রভাবশালী প্রজাতিরা অধিক সংখ্যক নথিভুক্ত ভ্যারাইটি সৃষ্টি করে। অতএব, যে কোন নির্দিষ্ট সময়পর্বে প্রজাতিরা কম মন্থরভাবে রূপান্তরিত ও উন্নত হবে, পরিণামে তারা জীবনসংগ্রামে সুলভ প্রজাতিদের রূপান্তরিত ও উন্নত বংশধরদের দ্বারা পরাজিত হবে।
এইসব বিচার-বিশ্লেষণ থেকে আমি মনে করি এটি অনিবার্যরূপে ঘটে যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সময়ের ব্যবধানে নূতন প্রজাতিরা সৃষ্ট হয় বলে অন্যরা তখন বিরল থেকে বিরলতর হবে ও অবশেষে বিলুপ্ত হবে। রূপান্তরিত ও উন্নত হচ্ছে এমনগুলির সঙ্গে আকাররা কঠোর প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়, সাধারণতঃ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং অস্তিত্বের সংগ্রাম সংক্রান্ত অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে সবচেয়ে নিকট সম্পর্কীয় আকারদের মধ্যেই এটি ঘটে–একই প্রজাতির ভ্যারাইটি ও একই গণের এবং সম্পর্কিত গণগুলির প্রজাতিরা, যাদের অবয়ব, দেহগঠন ও স্বভাব প্রায় একইরকম, তারাই সাধারণভাবে পরস্পরের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, ফলস্বরূপ উদ্ভব প্রক্রিয়া চলতে থাকার সময় প্রত্যেক নূতন ভ্যারাইটি বা প্রজাতি সাধারণতঃ নিকটতম আত্মীয়কে প্রচণ্ড চাপ দেয় এবং তাদের বিনাশের দিকে চালিত করে। মানুষের দ্বারা উন্নত আকারদের নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গৃহপালিত উৎপাদনগুলির মধ্যে আমরা একইরকম ধ্বংসসাধন প্রক্রিয়া লক্ষ্য করি। অনেক বিচিত্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যা দেখায় কত শীঘ্র গো-মহিষাদি, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণীদের নূতন জাত ও ফুলের ভ্যারাইটিরা প্রবীণতর ও নিকৃষ্টতরদের স্থান গ্রহণ করে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে প্রাচীন কৃষ্ণকায় গো-মহিষাদিরা লম্বা শিংওয়ালাদের দ্বারা স্থানচ্যুত হয়েছিল এবং এরা “ছোট শিংওয়ালাদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত হয়েছিল” (একজন কৃষিবিদের লেখা উল্লেখ করলাম), “যেন কোন ঘাতক মহামারী রোগের দ্বারা।”
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অপসৃতি
যে বিষয়টিকে আমি এই পদটির আখ্যা দিয়েছি, সেই পদ্ধতিটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ও আমার বিশ্বাস মতো কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যা করে। প্রথমে, ভ্যারাইটিরা, এমনকি স্পষ্টচিহ্নিতগুলিও, যদিও প্রজাতির কয়েকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়, তবুও বিশুদ্ধ ও ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিদের তুলনায় পরস্পরের থেকে নিশ্চয় আরও কম ভিন্ন হয়, যেমন অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে দেখানো হয়েছে যে কেমন করে এদের শ্রেণীভুক্ত করা হবে। তা সত্ত্বেও আমার মতানুসারে সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ভ্যারাইটিরা হচ্ছে প্রজাতি, অথবা আমি যেমন বলি–জায়মান প্রজাতি। তা হলে ভ্যারাইটিদের মধ্যে কম পার্থক্য কেমন করে প্রজাতিদের মধ্যে বেশি পার্থক্যকে বর্ধিত করে? সমগ্র প্রকৃতিমণ্ডলে অংসখ্য প্রজাতির অধিকাংশই সুচিহ্নিত পার্থক্যসমূহ উপস্থিত করে। এ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে এটা স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। পক্ষান্তরে, ভবিষ্যতের সুচিহ্নিত প্রজাতিদের অনুমতি আদিরূপ ও পিতামাতা এরূপ ভ্যারাইটিরা অল্প ও সংজ্ঞা নিরূপণের অসাধ্য পার্থক্যসমূহ উপস্থিত করে। আমরা বলতে পারি কেবল অপ্রত্যাশিতভাবে একটি ভ্যারাইটি তার পিতামাতার কিছু বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্ন হতে পারত, কিন্তু একই গণের। প্রজাতিদের মধ্যে স্বাভাবিক ও বিরাট পরিমাণ পার্থক্যের মতো এটি কখনই ঘটবে না।
