এডওয়ার্ডের কথা শুনে মিটলার হাসছিল। তার মুখে মৃদু হাসি দেখে এডওয়ার্ড রেগে গেল, তুমি হাসছ? তুমি আমাকে বোকা ভাবতে পার, কিন্তু আমি আমার এই প্রেমাসক্তিতে মোটেই লজ্জিত নই। আমার কেবলি মনে হচ্ছে জীবনে আজ আমি প্রথম ভালোবাসছি। আগে প্রথম যৌবনে ভালোবাসার ব্যাপারটা আমার কাছে ছিল একটা খেলার মতো। আমোদ-প্রমোদের একটা উপকরণ মাত্র। আগে আমি ভালোবাসা কি তা বুঝিনি। আজ এমন কেউ নেই যে আমাকে এই ভালোবাসার ব্যাপারে হার মানাতে পারে।
জানি আমার এই ভালোবাসা অবৈধ, হয়ত অপরাধ। তবু এটা একটা স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক অনুভূতি যা আমি কোনও কিছুর বিনিময়ে ত্যাগ করতে পারব না।
এই কথা বলতে বলতে আবেগের প্রবলতাটাকে সংযত করতে না পেরে শিশুর মতো কেঁদে ফেলল এডওয়ার্ড।
আবেগ বা ভাবালুতাহীন বাস্তববাদী মিটলার এবার তার তীক্ষ্ণ যুক্তির হাতিয়ার প্রয়োগ না করে পারল না। কারণ সে যে জন্য এখানে এসেছে সেই মূল উদ্দেশ্য হতেই বিচ্যুত হয়ে পড়েছে ক্রমশ। এডওয়ার্ড তার ভাবালুতার দ্বারা তার কঠিন যুক্তি ও নীতিবোধকে বিগলিত করে দেবার চেষ্টা করছে। তাই সে গম্ভীরভাবে এডওয়ার্ডকে বলল, যারা মহান ব্যক্তি তারা বিপদে কখনও আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেয় না। তারা অবিচল, ধৈর্য ও স্থৈর্য সহকারে অটলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে সব বিপদের মাঝে। সব বেদনাকে, দুঃখকে তারা বৃত্তের মাঝে কঠোরভাবে চেপে রাখে, বাইরে প্রকাশ করে না।
এডওয়ার্ড কিন্তু মোটেই শান্ত হলো না এ কথায়। বলল, যারা দুঃখে পড়েনি যারা সুখে-শান্তিতে বাস করছে তারা বিপন্ন বিব্রত মানুষকে ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু জানে না আসলে তা কত কঠিন। প্রাচীনকালে বড় বড় গ্রীকবীরেরাও দুঃখের সময় কেঁদে ফেলতেন। অশ্রুর মাধ্যমে সহজভাবে প্রকাশ করতেন তাঁদের দুঃখ বা শোকের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ। এই জন্যই বলে, যারা সহজে কাঁদে না তারা ভালো মানুষ নয়। সেই সব কঠিনহৃদয় মানুষ দুঃখে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে পারে, বীর গ্যাভিরেটারের মতো সকলের সামনে বীরত্ব সহকারে মরতে পারে, কিন্তু তারা মানুষ হিসাবে মোটেই ভালো নয়। তাই বলি বন্ধু, আমার বাগানটা বরং ঘুরে দেখে এখন চলে যাও। পরে আমি যখন ধৈর্য ধারণ করতে পারব তখন এ বিষয়ে কথা হবে আবার।
একথা বলার পর আর থাকা চলে না। মিটলার চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু এডওয়ার্ডই তাকে বসাল। তার কথাটা টেনে নিয়ে আবার বলল, কোনও কথা মনে চেপে রেখে অথবা কারও কাছে প্রকাশ করে কোনও লাভ হয় না। কাজের কথা ভাবতে হয়। আমিও আমার করণীয় কি তা ভেবে রেখেছি। আমি ওতিলেকেই পেতে চাই। তুমি আমাদের বিবাহবিচ্ছেদের ব্যবস্থা করো। শার্লোতের কাছে গিয়ে তার সম্মতি আদায় করো এ বিষয়ে। এইভাবে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে প্রকৃত বন্ধুর মতো কাজ করো। আমাদের সুখী করো।
মিটলার কোনো কথা বলতে পারল না। এডওয়ার্ড বলে চলল, আমার ও ওতিলের ভাগ্য এক হয়ে জড়িয়ে পড়েছে। নিয়তির কোনও বিধান অথবা কোনো প্রতিকূল অবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না আমাদের সম্পর্ককে।
মিটলার আপন মনে চিৎকার করে উঠল, হা ভগবান! এ আমি কি শুনছি! ভাগ্যে বিশ্বাস একটা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে বিপদ আরো ঘোরাল হয়ে ওঠে।
এডওয়ার্ড শান্তভাবে বলল, মানুষের কোনও বিপন্ন অন্তর যখন কোনও পথ খুঁজে পায় না, তাকে পথ দেখাবার কেউ থাকে না তখন তাকে অনুকূল গ্রহনক্ষত্রের প্রত্যাশায় থাকতে দাও।
মিটলার বলল, নিয়তির উপর বিশ্বাসের মধ্যে যদি একটা সংগতি থাকত তাহলে আমি সে বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে পারতাম। কিন্তু মানুষ সাধারণত গ্রহনক্ষত্রের প্রভাব অনুকূল হলেই তাতে বিশ্বাস করে আর প্রতিকূল হলেই তাতে অবিশ্বাস করে, এই জন্যই আমি এসব বিশ্বাস করি না।
মিটলার দেখল এ অবস্থায় আপাতত কিছু করা সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাই সে এডওয়ার্ডের অনুরোধটা রক্ষা করার জন্য শার্লোতের কাছে যেতে সম্মত হলো। বিবাহবিচ্ছেদের কথাটা না তুলুক তার কাছে গেলে অন্তত ওদের মনের ভাবটা বোঝা যাবে। তাতে ওর কাজের সুবিধা হবে।
শার্লোতের কাছে মিটলার গিয়ে দেখল, আগের মতোই আত্মস্থ আছে শার্লোতে তার স্বভাবসুলভ আত্মসংযম বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ বা বিচলিত হয়নি। মিটলারের কাছ থেকে। সব কথা শুনে শার্লোতে বলল, আমি আশা করি ভবিষ্যতে সব ঠিক হয়ে যাবে। এডওয়ার্ড আবার ফিরে আসবে আমার কাছে।
শার্লোতের এই দুর্মর আশার কথা শুনে খুশি হলো মিটলার। সে বলল, এই দৃঢ় প্রত্যাশা হাজার কথা ও পরামর্শের থেকেও বড়। আমিও তাই বিশ্বাস করি। এই বলিষ্ঠ কিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই জীবন আমি অনেক বিবাহ সংঘটিত করেছি, অনেক ঝগড়া মিটিয়েছি, অনেক বিচ্ছিন্নপ্রায় দাম্পত্য সম্পর্কে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছি।
শার্লোতে মিটলারের হাতে দিয়ে এডওয়ার্ডের একটা চিঠি দিতে চাইল। কিন্তু মিটলার বলল, এ চিঠি অন্য কোনও পত্রবাহককে দিয়ে পাঠাতে পার। এটা আমার কাজ নয়। আমি যাচ্ছি। আবার আসব সুখবর নিয়ে।
শার্লোতের পত্রবাহক যথাসময়ে এসে এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করল। ভয়ে ভয়ে চিঠি খুলে দেখল এডওয়ার্ড। শার্লোতে তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে তাদের অতীত মিলনের কথা। সেই সব নিবিড়তম মিলনের কথা যখন এডওয়ার্ড তাকে পরম আগ্রহভরে প্রেমের নায়ক হিসাবে জড়িয়ে ধরত অতীতে।
