পাইরেট

০১. স্যাম এবং রেমি ফার্গো

পাইরেট – ক্লাইভ কাসলার / রবিন বারসেল। অনুবাদ: রাফায়েত রহমান রাতুল। প্রথম প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০১৮

চরিত্রসমূহ :

১২১৬

নরফোক, ইংল্যান্ড

উইলিয়াম দ্য মার্শাল-পেমব্রুকের আর্ল, কিং জনের অনুগণ।

রবার্ট ডি ব্রুজ কিং জনের সৈনিক, যে পরবর্তীতে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিল।

হিউ ফিটজ হিউবার্ট-উইলিয়াম দ্য মার্শালের বিশ্বস্ত সৈনিক।

জন ডি লেসি-কিং জনের গার্ড।

কিং জন-ইংল্যান্ডের রাজা।

বর্তমান সময়

উইলিয়াম দ্য মার্শালের বংশধর এবং তাদের শত্রুসমূহ

গ্রেস হারবার্ট-স্যার এডওয়ার্ড হারবার্টের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া।

স্যার এডমুন্ড হারবার্ট-(কাল্পনিক) দ্বিতীয় লর্ড মর্টিমার এডমুন্ড মর্টিমারের অবৈধ সন্তান।

হিউ লি ডেসপেন্সর-দ্বিতীয় কিং এডওয়ার্ডের কথিত প্রেমিক, রজার মর্টিমারের বিরোধী।

ক্যাপ্টেন ব্রিজম্যান-পাইরেট হেনরি এভোরির মিত্র, পারিবারিক সূত্রের মাধ্যমে হিউ লি ডেসপেন্সরের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

হেনরি ম্যাকগ্রেগরগ্রেস হিউবার্টের জ্ঞাতি ভাই, নটিংহাম রাজ্যের সম্পদের উত্তরাধিকারি।

পিকারিং-এর ব্যবহৃত এবং বিরল বইসমূহের দোকান

জেরাল্ড পিকারিং-স্যান ফ্রান্সিসকোর বই বিক্রেতা, ব্রি মার্শালের চাচা।

মি. উইকহ্যাম-মি. পিকারিং-এর বিড়াল।

ব্রি মার্শাল-রেমি ফার্গোর কল্যান তহবিলের কর্মী।

ল্যারেইন পিকারিং-স্মিথ-ব্রির জ্ঞাতি বোন, জেরাল্ড পিকারিং-এর মেয়ে।

ডাকাত-পরবর্তীতে নাম জানা গেছে ওর। জ্যাকব জ্যাক স্তানিস্লাভ।

ফার্গো টিম

স্যাম ফার্গো

রেমি (লংস্ট্রিট) ফার্গো।

যোলতান-হাঙেরিতে জন্ম নেওয়া রেমির জার্মান শেফার্ড।

সেলমা ওয়ান্ডার্শ-ফার্গোদের গবেষক সহকারী।

সান্ড্রা-ফার্গো জেটের ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট।

প্রফেসর লাযলো কেম্প-গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক। সেলমার গবেষণায় সহায়তা প্রদানকারী।

পিট জেফকট-সেলমার গবেষক-সহকারী, কোর্ডেনের বয়ফ্রেন্ড।

ওয়েন্ডি কোর্ডেন-সেলমার গবেষক-সহকারী, জেফকটের গার্লফ্রেন্ড।

সাবেক ডারপা (DARPA) সদস্য

রুবেন রুব হেওয়ার্ড-সিআইএর অপারেশন ডিপার্টমেন্টের কেস অফিসার।

নিকোলাস আর্চার-আর্চার ওয়ার্ল্ডওয়াইড সিকিউরিটির মালিক।

এভেরি কোম্পানি

চার্লস এভেরি-কর্পোরেট দুনিয়ার ডাকাত।

কলিন ফিস্ক-এভেরি সিকিউরিটি টিমের প্রধান।

মার্টিন এডওয়ার্ডস-এভেরির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার।

আলেক্সান্দ্রা এভেরি-এভেরির স্ত্রী।

কিপ রজার্স-আলেক্সান্দ্রা এভেরির ব্যক্তিগণ তদন্তকারী।

উইন্টন পেজ-চার্লস এভেরির অ্যাটোর্নি বা আইনজীবী।

জ্যাক স্তানিস্লভ-ফিস্কের পোষা গুণ্ডাদের একজন।

মারলো-ফিস্কের পোষা গুণ্ডা।

ইভান-ফিস্কের পোষা গুণ্ডা।

ভিক্টর-ফিস্কের নতুন গুণ্ডা।

রোজেন-ফিস্কের নতুন গুপ্ত।

স্কলার এবং শিক্ষাবিদগণ

প্রফেসর ইয়ান হপকিন্স-অ্যারিজোনার অধিবাসি। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক।

মেরিল ওয়ালশ, মিস ওয়ালশ-ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিউরেটর।

মেজ ক্রাওলি-কিংস লিনের লাইব্রেরিয়ান।

নাইজেল রিজওয়েল-কিংস লিনের ভ্রমণ প্রদর্শক, পুরোনো যুগের ইংরেজির সাবেক প্রফেসর ও বিশেষজ্ঞ।

পার্সিভাল পার্সি ওয়েন্ড-নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর।

আগাথা ওয়েন্ড-ওয়েন্ডর্ফের স্ত্রী।

রেস্টুরেন্ট ও হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাভেল গাইডগণ

স্যান ফ্রান্সিসকো।

মি. ব্রায়ান্ট-রিটজ-কার্লটন হোটেলের অন-ডিউটি ম্যানেজার।

অ্যারিজোনা

শেফ মার্সেলিনো ভেরিঞ্জো-মার্সেলিনো রিস্টোরান্টে, স্কটসডেলের মালিক।

সিমা-ভেরিঞ্জোর স্ত্রী।

জ্যামাইকা

মেলিয়া-রেস্টুরেন্টের ওয়েইট্রেস।

জে-জে-জ্যামাইকার বাইকার বারের মালিক।

কিমার-কার রেন্টালের কর্মচারী।

আন্তোয়ান-জে-জে বারের বাইকার।

বিলি-জে-জে বারের বাইকার।

ব্রাজিল

অ্যান্তোনিও আলভেজ-ভাড়াটে ড্রাইভার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সাও পাওলোর অধিবাসি।

হেনরিক সালাজার-অ্যান্তোনিও আলভেজের চাচা।

ক্যাপ্টেন দেলগাদো-গলফিনহোর ক্যাপ্টেন।

নুনো-গলফিনহোর সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।

পুলিশ অফিসার

সার্জেন্ট ফথ-ডিটেক্টিভ, স্যান ফ্রান্সিসকো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।

সার্জেন্ট ট্রেভিনো-ফথের পার্টনার, স্যান ফ্রান্সিসকো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।

ডেপুটি ওয়াগনার-কারট্রিট কাউন্টি শেরিফের ডেপুটি।

.

প্রারম্ভ

বিশপস লিন, নরফোক, ইংল্যান্ড
অক্টোবর ৯, ১২

যাত্রার মাঝপথে এসে স্ট্যালিয়ন ঘোড়াটা থামালেন পেমব্রুকের আর্ল উইলিয়াম দ্য মার্শাল। তাকে অনুসরণ করলো পিছনে থাকা নাইট তিনজনও। শীতের প্রথম দমকা হাওয়া এসে লাগছে গায়ে। সন্ধ্যা বাড়ার সাথে প্রকৃতির তাপমাত্রাও কমতে শুরু করেছে। তাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে বিশাল এক ঘন জঙ্গল। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারের জন্য কোনো পথই পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে না।

সন্ধ্যায় ধাওয়া করা ঘোড়সওয়ারিদের না দেখে একমুহূর্তের জন্য উইলিয়াম ভাবলেন তারা হয়তো পথ হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু না, যতদূর মনে আছে আঁকাবাঁকা ওক গাছটা হাতের বাম দিকেই ছিলো।

তিনি এবং তার তিনজন নাইট পথটা নিরাপদ কিনা তা খতিয়ে দেখতে এসেছেন। পরদিন এই পথ দিয়েই রাজার সম্পদ নিয়ে যাওয়া হবে। যদিও এই কাজটায় উইলিয়ামের তেমন সায় নেই, তিনি আরো কিছু সৈনিকের এসে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজার উপদেষ্টা জোর খাঁটিয়ে বলেছেন যে সম্পদগুলোর নিরাপত্তা দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের প্রিন্স লুইস লন্ডন দখল করে নিজেকে ইংল্যান্ডের রাজা বলে ঘোষণা করে দিয়েছে। এই কাজে লুইসকে সহায়তা করেছে কিং জনেরই অনুগণ কয়েকজন। তাই উপদেষ্টা চাচ্ছেন রাজকীয় সম্পদগুলো নিরাপদস্থানে সরিয়ে ফেলতে, যেন এগুলো দখলদারদের হাতে না পড়ে।

রবার্ট ডি ব্রুজ উইলিয়ামের কাছে এসে বলল, আমার লোকদের তো এতক্ষণে এখানে এসে পড়ার কথা।

হয়তো ঠাণ্ডার কারণে আসতে দেরি হচ্ছে, বলে হঠাৎই হাত উঁচিয়ে সবাইকে চুপ করার নির্দেশ দিলেন উইলিয়াম। একটা ক্ষীণ শব্দ কানে আসছে তাঁর, শুনো…।

আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

আবারো শোনা গেলো শব্দটা। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে অন্য একটা শব্দও মিশে আছে।

পাশ থেকে ধাতব খসখসে শব্দ শুনতে পেলেন উইলিয়াম। রবার্ট খোপ তার তলোয়ারটা বের করে এনেছে। সাথে সাথেই বেশ কয়েকজন ঘোড়সওয়ারি হুঙ্কার তুলে বেশ কয়েকজন ঘোড়সওয়ারি বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। তারাও তলোয়ার বের করে রেখেছে। অপ্রত্যাশিত আক্রমণে কিছুটা চমকে গেছে উইলিয়ামের ঘোড়া। পিছিয়ে যেতে চাচ্ছে শুধু। উইলিয়ামে কোনোরকমে ঘোড়ার পিঠে স্থিরভাবে বসে থাকার চেষ্টা করছেন। ঠিক তখনই বাতাস কাটার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি, তাকিয়ে দেখলেন রবার্টের তলোয়ারটা এগিয়ে আসছে তার দিকে।

সাথে সাথে শিল্ডটা উঁচিয়ে ধরলেন উইলিয়াম। কিন্তু বেশি দেরি হয়ে গেছে। রবার্টের ব্লেড ধারালো প্রান্তটা ঠিকই তার বুকে এসে আঘাত করেছে। শক্ত চেইনমেইলটা আঘাতটা প্রতিহত করার পরও, ঠিকই ব্যথা পেয়েছেন তিনি।

রবার্ট কি ভুল করে তাকে শত্রু ভেবে বসেছে নাকি?

অসম্ভব, ভাবতে ভাবতে তিনিও তলোয়ার বের করে আনলেন। হালকা একটা পাক খেয়ে আক্রমণ করলেন তার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা ঘোড়সওয়ারিকে। উইলিয়ামের সবচেয়ে তরুণ নাইট আর্থার ডি ক্লেয়ারের পায়ের কাছে উড়ে গিয়ে পড়লো লাশটা।

ক্রোধে গা জ্বলছে উইলিয়ামের। রবার্টের দিকে ঘুরে বললেন, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? রাজার নিজ হাতে বাছাই করে নেওয়া মানুষটার আক্রমণের শিকার হয়ে রীতিময়ে হতভম্ব হয়ে গেছেন তিনি।

ভালোভাবে বললে, বলে আবারো তলোয়ার ঘুরালো রবার্ট। তবে এবারের আক্রমণটা কোনো চমক ছিলো না, তাই উইলিয়াম খুব সহজেই প্রতিহত করে ফেলেলেন আঘাতটা। দুটো তলোয়ার একত্রিত হওয়ার ধারব শব্দ শোনা গেলো শুধু। অবশেষে আমার মাথায় সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে।

আমাকে আক্রমণ করে তুমি রাজার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কেন?

তোমার রাজা, আমার নয়। আমি এখন ফ্রান্সের লুইসের অনুগণ।

বেঈমানিটা একদমই মেনে নিতে পারছেন না উইলিয়াম। তুমি আমার বন্ধু ছিলে।

ঘোড়ার পেটে লাথি মেরে সামনের দিকে ঝুঁকে গেলো রবার্ট। তলোয়ার বাগিয়ে রেখেছে উইলিয়ামের দিকে। আঘাত হানতে যাবে ঠিক ঐ মুহূর্তেই আবার পিছিয়ে নিলো তলোয়ারটা।

এই নকল আক্রমণটারই আশা করছিলেন উইলিয়াম। রবার্টকে এগুতে দেখেই শিল্ড উঁচিয়ে ধরলেন। শিল্ডের আঘাতে ঘোড়া থেকে উলটে মাটিতে পড়ে গেছে রবার্ট! সওয়ারি পড়ে যেতেই ঘোড়াও দৌড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের পিছনে থাকা হিউ ফিটফ হিউবার্টও ঘোড়াচ্যুত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই বিদ্রোহি নাইটদের একজনকে মেরে ফেলেছে হিউবার্ট। তারপর ঘোড়ায় করে পালিয়ে যেতে থাকা অন্য নাইটকে ধরে ফেলেছে। লড়াইটা এখন দুই বনাম দুই পরিণত হয়েছে। আর এখন উইলিয়ামই একমাত্র ঘোড়সওয়ারি। দৃশ্যপটটা ভালোই লাগছে তার, ঘোড়া নিয়ে রবার্টের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বললেন, আমি তোমাকে তলোয়ার চালানো শিখিয়েছি। তোমার দুর্বলতা জানি আমি।

এবং, আমিও তোমারটা জানি। মেঘ সরে যেতেই চাঁদের আলোয় রবার্টের হাতে থাকা অস্ত্রটা ভালো ভাবে দেখতে পেলেন উইলিয়াম। এক প্রান্ত বিশিষ্ট একটা তলোয়ার, তবে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে ওটাকে একইসাথে কুঠার এবং তলোয়ার দুটো হিসেবেই ব্যবহার করা যাবে। হালকা বাকানো প্রান্তটা আলাদা একটা ভয়ঙ্কর মাত্রা দিয়েছে অস্ত্রটাকে। উইলিয়াম দেখতে পেলেন তলোয়ারটার শেষ প্রান্তে শক্ত করে একটা চেইনমেইল পেঁচিয়ে রাখা আছে।

রবার্টের অস্ত্রটা বেশ ভারী ওজনের। সেই তুলনায় উইলিয়ামের দ্বি-ধার বিশিষ্ট লম্বা তলোয়ারটা অনেকটাই হালকা ওজনের। অস্ত্রের দিক থেকে রবার্টের সুবিধাই বেশি। তবে ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ায় লড়াইয়ে খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে যাবে ও। ভাবনাটা মাথায় আসতেই উইলিয়াম দেখলেন রবার্ট তেড়ে আসছে তার দিকে। অস্ত্রটাকে কুঠারের মতো ধরে রেখেছে। লক্ষ্য ঘোড়ার পা-গুলোর দিকে।

হুমকিটা বুঝতে পেরেই পিছিয়ে গেলেন উইলিয়াম। রবার্টদের পরিকল্পনা হলো-তাদের ঘোড়াগুলো ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে করে লড়াইয়ে বেঁচে গেলেও উইলিয়ামদের কেউ যেন রাজাকে সুর্ক করার জন্য সঠিক সময়ে ফিরে যেতে না পারে।

ঘোড়া থেকে নেমে গেলে লড়াইয়ের সুবিধাটা হারাবেন উইলিয়াম, কিন্তু এছাড়া কোনো উপায়ও নেই। যতদ্রুত সম্ভব শত্রুকে খতম করে রাজার কাছে ফিরে যেতে হলে ঘোড়াটাকে লাগবেই। তাই ঝট করে ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন উইলিয়াম। ঘোড়ার পেটে হালকা চাপড় দিয়ে প্রাণীটাকে দূরে লুকিয়ে যেতে বললেন। ওদিকে হিউবার্ট অবশিষ্ট বিদ্রোহি নাইটের সাথে তলোয়ারযুদ্ধে মেতে আছে।

রবার্টের দিকে তাকালেন উইলিয়াম। একে-অপরের দিকে চোখ রাঙিয়ে বৃত্তাকার পথে ঘুরপাক খাচ্ছেন। সাথে সাথে রবার্টের ধাতব বর্মটার দিকেও তাকিয়ে আছেন উইলিয়াম। বর্মটার খুঁত বের করার চেষ্টা করছেন। কেন? প্রথম আঘাতের সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন উইলিয়াম। তাঁর উত্তর জানা দরকার। তাকে বাঁচতে হবে।

তার দিকে চোখ রাঙাতে রাঙাতে তলোয়ারটা হাতবদল করে নিলো রবার্ট। তোমার রাজার ক্যাম্পে পুরো একটা আর্মি পালার মতো স্বর্ণ আছে। তোমার অযোগ্য রাজার কৃতকর্মের কারণে যেসব সম্পদ হারিয়েছে সেসব ফিরিয়ে নিতে এসেছি আমি।

রাজা তার ইচ্ছেমতোই কাজ করবে, ধাতুর সাথে ধাতুর সংঘর্ষের শব্দ হলো-সেটা তোমার পছন্দ হোক বা না হোক।

আমার পরিবার সব হারিয়েছে তোমার রাজার জন্য, উইলিয়ামের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বলল রবার্ট। আঘাত করার জন্য সুবিধাজনক অবস্থান খুঁজছে। আমাদের স্বর্ণ দিয়ে রাজা তার অর্থ-ভান্ডার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড়ো করেছে। আমাদের রক্ত দিয়ে। আমার সৎভাইকে জেলে পাঠিয়েছে ঐ রাজা। বলে বেশ কয়েকবার তলোয়ার দিয়ে কোপ দিলো রবার্ট। সম্পদগুলো আমাদের, এগুলো যেখানে যাবে, আমরাও সেখানেই থাকবো।

হাত জ্বলতে শুরু করেছে উইলিয়ামের। খুব দ্রুতই তাঁর শরীর ক্লান্ত হয়ে গেছে। তরুণ এবং শক্তিশালী রবার্ট খুবই ভয়ঙ্কর এক শত্রু। একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাচ্ছে তাঁরা, ফোঁসফোঁস করে ক্ষুব্ধ নিঃশ্বাস ছাড়ছে। হিউবার্ট আর অন্য বিদ্রোহী নাইটের ওপর থেকেও মনোযোগ সরে গেছে। উইলিয়ামের। অন্ধকার থেকে তাদের লড়াইয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন শুধু। তুমি হেরে যাবে, উইলিয়াম বললেন।

নাহ। তোমার রাজা ইতিমধ্যেই মৃত্যুশয্যায় আছে।

ভয়ে গা শিউরে উঠলো উইলিয়ামের। ভয়টাকে কাজে লাগিয়ে শেষবারের মতো সর্বশক্তিতে উঁচিয়ে ধরলেন তলোয়ারটা। আঘাতটা প্রতিহত করে ফেলেছে রবার্ট উইলিয়াম এমনটাই আশা করেছিলেন। তলোয়ারটা আস্তে আস্তে ওপরের দিকে হুট করে সর্বশক্তিতে ঠেলে দিলেন চেইনমেইলের আড়ালে থাকা রবার্টের হাতের ভিতর। সাথে সাথে দুই হাত ঠেলা দিয়ে রবার্টকেও মাটিতে ফেলে দিয়েছেন।

রবার্টের ওপর গিয়ে দাঁড়ালেন উইলিয়াম। একই সাথে ভয় এবং ঘৃণা দুটোই মিশে আছে তার অভিব্যক্তিতে। রবার্টের তলোয়ার ব্যবহার করা হাতটা অকেজো করে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই। তারপর নিজের অস্ত্রটা ঠেকালেন রবার্টের কণ্ঠনালীতে। এখন কী বলবে তুমি?

লড়াই কিন্তু আমরাই জিতেছি।

কিভাবে? তোমার আসন্ন মরণ দিয়ে? মুহূর্তটা উইলিয়ামের জন্য বিজয়ের সমতুল্য। বিশ্বাসঘাতককে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলার পথ থেকে মাত্র এক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

কিন্তু তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে উইলিয়ামের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো রবার্ট। তোমার কি মনে হয় রাজাকে তার সম্পদ নিরাপদে সরিয়ে ফেলতে বলার বুদ্ধিটা কার? কিংবা তোমাদেরকে অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনাটা? পুরোটাই একমাত্র বৈধ রাজা প্রিন্স লুইসের চাল। লন্ডনে আসন গেড়ে এখন তিনি তোমার নকল রাজার লোভের সুবিধা ভোগ করবেন… সম্পদগুলো হবে আমাদের। বলে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিলো। প্রতিটা জায়গাতেই আমাদের গুপ্তচর রয়েছে। তোমার রাজার সম্পদের পুরোটাই ছিনিয়ে নিব আমরা, শেষ বিন্দু পর্যন্ত সব। আর সেগুলো দিয়ে লুইসের ক্যাম্পেইনের অর্থায়ন করা হবে। ইংল্যান্ড হবে তার। এই সপ্তাহ পেরুনোর আগেই তুমি এবং তোমার মতো লোকেরা কিং লুইসের সামনে মাথা নত করে তার আনুগণ্য মেনে নিতে বাধ্য হবে।

হয়তো আমার লাশ মেনে নিবে, আমি না।

বলে রবার্টের তলোয়ারটা ঢুকিয়ে দিলেন উইলিয়াম। জোরে একটা মোচড়া দিতেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে বাধ্য হলো রবার্ট। লাশটা ওভাবেই ফেলে রেখে ফিট হিউবার্টের দিকে তাকালেন। আহত হয়েছে?

বুকের পাঁজর ভেঙেছে, মনে হয়।

কিছু শুনেছো?

হ্যাঁ।

কোনোরকমে শুধু একটা ঘোড়াই যোগাড় করতে পারলো ওরা। উইলিয়ামের ঘোড়াটা। যেহেতু হিউবার্ট আহত হয়ে আছে, তাই দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলো যে, উইলিয়ামই ঘোড়ায় চড়ে রাজাকে সুর্ক করতে যাবেন।

ঘোড়ায় করে বিশপ লিনের ক্যাম্পে যেতেই অনেকগুলো মুখ দেখতে পেলেন উইলিয়াম। তাদের মধ্যে জন ডি লেসি দাঁড়িয়ে আছে রাজার তাঁবুর সামনে। কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছে না ভিতরে। এমনকি উইলিয়ামকেও না। রাজা অসুস্থ। আমাশয় হয়েছে। কারো সাথে দেখা করার ইচ্ছা নেই উনার।

আমার সাথে ঠিকই দেখা করবে। সরে দাঁড়াও নয়তো প্রাণ খোয়াও।

কী

জন ডি লেসিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ধাক্কা দিয়ে তাঁবুতে ঢুকে গেলেন উইলিয়াম। ভিতরের বিকট গন্ধে নাক কুঁচকে গেছে তার। রাজার চিকিৎসক এবং দুই স্টুয়ার্ড রয়েছে শুধু তাঁবুতে। রাজার শয্যার সাথে রাখা মোমবাতির আলোগুলো তাদের নড়নে টিমটিম করছে। মোমের অনুজ্জ্বল আলোয় রাজার নিস্তেজ দেহটা দেখতে পেলেন উইলিয়াম। খুব বেশি নিস্তেজ। রাজা মরে গেছে ভেবে কিছুটা ভয় পেয়ে গেছেন উইলিয়াম। তবে কাছে এগুতেই দেখলেন যে রাজার বুক খুব ধীরে ধীরে উঠা-নামা করছে। তারমানে শ্বাস-প্রশ্বাস এখনো সচল আছে রাজারমহামান্য রাজা। বলে রাজার বিছানার পাশে হাটু গেড়ে বসলেন উইলিয়াম। মাথা নত করে বললেন, আমি ব্যর্থ হয়েছি।

রাজার চোখের পাপড়িটা আলতো করে নড়ে উঠলো। জলপট্টির কাপড়টা উনার ভ্রূগুলোকে ঢেকে রেখেছে। কিভাবে?

কথাগুলো আপনাকে একান্তে বলতে চাই, মহামান্য।

কিং জন প্রথমে কিছু বললেন না, শুধু উইলিয়ামের দিকে তাকিয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে। তারপর হালকা কব্জির ইশারায় বললেন, বের হয়ে যাও। সবাই।

তবুটা পুরোপুরি খালি হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন উইলিয়াম। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পরও খবরটা জানাতে অস্বস্তি লাগছে তার। আপনার দরবারে থাকা বিশ্বাসঘাতককে চিনতে পারিনি আমি। অন্তত পক্ষে ঐ লোককে কখনোই সন্দেহ করিনি। রবার্ট ডি ব্রুজ। সে বলেছে আপনি মারা যাচ্ছেন। কিন্তু আপনার শারীরিক অসুস্থতার খবরটা তার জানারও কথা না।

আমাশয়।

আমার তা মনে হয় না।

কথাটা শুনে চোখ বুজলেন কিং জন। দৃশ্যটা দেখে একমুহূর্তের জন্য উইলিয়ামের মনে হলো যে রাজা হয়তো আর কখনো চোখ খুলবে না। কে আমাকে মারার পরিকল্পনা করেছে?

এটা আমি জানি না। তবে যে বিশ্বাসঘাতক হারামি এই কাজটা করেছে, সে জানে আপনি আপনার সাথে করে রাজসম্পদগুলো নিয়ে যাচ্ছেন। এই সম্পদ দিয়ে তারা প্রিন্স লুইসকে ইংল্যান্ডের সিংহাসন দখল করতে সহায়তা করবে। তারা জানে এটাকে লুকানো হচ্ছে। এজন্যই আপনার অসুস্থতার সৃষ্টি করেছে, যাতে সকলেই আপনার শোকে কাতর থাকার সময় তারা সম্পদগুলো চুরি করতে পারে।

আমার ছেলে… কোনোরকমে কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে উইলিয়ামের কবজি আঁকড়ে ধরলেন কিং জন। জ্বরে হাত পুড়ে যাচ্ছে তাঁর। হেনরির কী হবে?

সে নিরাপদেই আছে, এবং তাই থাকবে। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাকে রক্ষা করবো আমি। রাজার বড়ো ছেলে হেনরির বয়স মাত্র নয় বছর। ছেলেটার ভিতরে তার বাবা বা অন্যান্য আত্মীয়দের মতো অসুতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার সৃষ্টি হয়নি এখনো। ইংল্যান্ড যদি কোনো আশা রাখতে চায়, তাহলে সেটা রাখতে হবে এমন এক সম্রাটের ওপর যার মধ্যে লোভ বা খুনে লালসা নেই। আমরা মনে হয়, সম্পদের প্রলোভনে আমাদের তরুণ যুবরাজ এই বয়সেই বখে যেতে পারে। প্রলোভন সামলানোর মতো সামর্থ্য এখনো এতোটা দৃঢ় হয়নি তাঁর।

পুনর্গঠনের জন্য হলেও তার সম্পদের দরকার রয়েছে। আমাদের ভূমিগুলো আবার লুটতরাজদের দখলমুক্ত করতে হবে তার।

মহামান্য, আমাকে যদি স্পষ্টভাবে স্যুটা বলার অনুমতি দেন, তাহলে বলি-যতদিন সম্পদগুলোর অস্তিত্ব থাকবে, তততদিনই এর পিছনে চরেরা লেগে থাকবে। ফ্রান্সের লুইস এদের মাত্র একজন। এছাড়াও তো আরো অনেকেই আসবে। আর ভুলে যেয়েন না, গণ কয়েকমাসে লড়াই করা বিদ্রোহী সেনাদেরও কিন্তু কোনো ভরসা নেই, তারা বিশ্বাসের যোগ্য না। অন্ততপক্ষে হাতের নাগালে এতো সম্পদের প্রলোভন থাকার পর তো নয়ই। বলে থামলেন উইলিয়াম। চাচ্ছেন রাজা যেন তার কথাগুলো শুনে ভালোভাবে বুঝতে পারেন। কিন্তু একটা গরীব রাজ্যের প্রতি কিন্তু কারো এতোটা আগ্রহ থাকবে না। সবচেয়ে বড়ো কথা, কোনো তরুণ বালকের শাসন করা একটা গরীব রাজ্যকে কিন্তু কেউ হুমকিও মনে করবে না…

কী বলতে চাচ্ছো তুমি?

কেমন হয় যদি রাতে আপনার সম্পদগুলো স্থানান্তরের সময় কোনো এক ফাঁকে হারিয়ে যায়? আপনি যদি অর্থের ভান্ডার হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কিন্তু আপনার ছেলের কোনো শত্রু থাকবে না।

কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন রাজা। গভীরভাবে শ্বাস ছাড়ছেন শুধু।

আপনি অর্ধমৃত, মহারাজ, যদিও কথাটা উইলিয়ামের নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, তারপরও এটাই স্যু। রাজা কোনো রোগে আক্রান্ত নন। আমাশয় রোগী তিনি আগেও দেখেছেন। একটা মন্থরগতির বিষ ভিতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তার রাজাকে। রাজা হয়তো আর এক সপ্তাহ বা এর থেকে কয়েকদিন বেশি বাঁচতে পারেন। মৃত্যুর অপেক্ষা করার সময় অবর্ণনীয় একটা যন্ত্রণা সইতে হবে তাকে। অপেক্ষা না, মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা হবে শব্দটা। একমাত্র এই কাজের মাধ্যমেই তরুণ হেনরিকে নিরাপদে রাখা যাবে।

আর যদি আমার ছেলের অর্থভাণ্ডারের প্রয়োজন হয়? বয়স বাড়লে তখন?

তাঁর এটা লাগবে না। সম্পদটা যতদিন হারানো অবস্থায় থাকবে, ততদিন সে নিরাপদেই থাকবে।

চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার আগে আবারো কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন রাজা। তারপর বললেন, আচ্ছা। কাজটা তুমি নিজ দায়িত্বে উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করবে।

.

০১.

স্যান ফ্রান্সিসকো, ক্যালিফোর্নিয়া
বর্তমান সময়

সাইডওয়াক ধরে ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে স্যাম এবং রেমি ফার্গো। চায়নাটাউনের প্যাগোড়া-স্টাইলের সবুজ রঙের গেটে ওপারে গিয়ে ভিড় কিছুটা কমেছে। গেট পেরুনোর পর রেমি তার সেল ফোনের ম্যাপ চেক করতে করতে বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা কোথাও একটা ভুল করেছি।

হ্যাঁ, রেস্টুরেন্টটা, মাথা থেকে পানামা হ্যাটটা খুলতে খুলতে বলল স্যাম। পর্যটকদের জন্য একটা ফাঁদ ওটা। দেখলেই বুঝা যায়।

স্বামীর দিকে তাকালো রেমি। স্যাম এখন তার বাদামি চুলগুলোর ভিতর দিয়ে হাত বুলাচ্ছে। রেমির থেকে হালকা কিছুটা লম্বা ও, চওড়া কাঁধ, অ্যাথলেটিক শরীর। মু শু পোর্ক নেওয়ার সময় তো তোমাকে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখিনি আমি।

কোথায় ভুল করেছি আমরা?

মঙ্গোলিয়ান বিফ অর্ডার করাটা। নিশ্চিতভাবেই বড়ো একটা ভুল ছিলো ওটা।

আরে বাবা, ম্যাপের কথা বলছি আমি।

ম্যাপটা জুম করে নিলো রেমি, রাস্তাগুলো দেখছে। সম্ভবত চায়নাটাউনের ভিতর দিয়ে যাওয়া শর্টকাটটা আসলে খুব একটা ছোটো না।

তুমি যদি আমাকে অন্ততপক্ষে জানাতে যে আমরা কোথায় যাচ্ছি, তাহলে হয়তো আমি সাহায্য করতে পারতাম।

ট্রিপের এই অংশটা আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ, রেমি বলল। তুমি নিজেও কিন্তু এখনো তোমার প্ল্যানের ব্যাপারে কিছুই বলোনি আমাকে।

এটার কারণও আছে, বলে মাথায় আবার টুপিটা লাগিয়ে নিলো স্যাম। রেমির হাতের সাথে হাত পেঁচিয়ে হেঁটে সামনের দিকে এগুচ্ছে এখন। সলোমন আইল্যাণ্ডে তাদের সর্বশেষ ভ্রমণে ছুটিটা খুব একটা উপভোগ করতে পারেনি বলেই এই ট্রিপটার আয়োজন করেছে ও। একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই ছিলো ঐ ট্রিপে। তাই ওসব থেকে মুক্তির জন্য এই ভ্রমণের আয়োজন। আমি তোমাকে কোনো কিছুরই কথা দিতে পারবো না, তবে এই ট্রিপ তুমি শুধু বিশ্রাম আর আরাম করবে। অন্তত এই একটা সপ্তাহ কেউ আমাদেরকে খুন করার জন্য তেড়ে আসবে না।

পুরো এক সপ্তাহ ছুটি, স্যামের আরো কাছে ঘেষে বলল রেমি। ওদিকে মেঘপুঞ্জটাও সূর্যের আরো কাছে ঘেষে গেছে, সাথে সেপ্টেম্বর বিকালের উষ্ণতাও নেমে গেছে কিছুটা। সবশেষ এরকম নির্ঝঞ্ঝাট ছুটি কবে কাটিয়েছিলাম আমরা? মনে নেই আমার।

আমারও মনে পড়ছে না।

ঠিক তখনই রেমি বলে উঠলো, ঐ তো, পেয়ে গেছি। একটা বইয়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে রেমি। দোকানের জানালায় সোনালি হরফে লেখা আছে পিকারিংর ব্যবহৃত ও বিরল বইসমূহ। আমার সাথে এতোটা পথ ক্লান্তভাবে হাঁটার জন্য ধন্যবাদ তোমাকে দিতে পারবো না, তাই অন্যভাবে প্রতিদান দিলাম, কৌতুক করে বলল রেমি। স্যামের স্বর্গবাসী বাবা ছিলেন নাসার ইঞ্জিনিয়ার, পুরোনো বিরল বই সংগ্রহ করার শখ ছিলো লোকটার। স্যামও একজন ইঞ্জিনিয়ার, এবং তারও বই সংগ্রহের নেশা আছে।

বইয়ের দোকানটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার রেমির দিকে তাকালো স্যাম। ওখানে গেলে যদি তোমার সাথে খারাপ কিছু ঘটে?

ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারে, যেহেতু ওখানে শুধু বইই আছে।

বলে হেসে উঠলো তারা। তারপর রাস্তা ক্রস করে এগিয়ে গেলো দোকানটার দিকে। রেমির প্রবেশের জন্য দরজাটা ঠেলা দিয়ে ধরে রেখেছে স্যাম। দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজার ওপরে থাকা বেলগুলো টুংটাং করে উঠলো। তাদের ঢোকার শব্দ পেয়ে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালো একটা সিয়ামিজ বিড়াল। জানালার কাছে থাকা এক গাদা বইয়ের স্তূপের ওপর বসে আছে বিড়ালটা। দোকানের ভিতরটা পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরে আছে।

বইয়ের তাকগুলোর দিকে তাকালো রেমি। ব্যবহৃত কিছু হার্ডকভার ও পেপারব্যাক বই ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখতে পেলো না। মনে মনে হতাশ হলেও সেটা প্রকাশ করলো না ও। শুধু প্রার্থনা করছে তাদের এখানে আসাটা যেন বৃথা না যায়।

তখনই দোকানের পিছনের অংশ থেকে হাত মুছতে মুছতে একটা লোক বেরিয়ে এলো। লোকটার চুলগুলো ধূসর, চোখের ওপর সোনালি চশমা পরে আছে। তাদেরকে চোখে পড়তেই মুচকি হেসে উঠলো লোকটা। কোনো বই খোঁজায় আপনাদের সাহায্য করতে পারি কি?

রেমি কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই স্যামের ফোন বেজে উঠলো। স্যাম ফোনটা পকেট থেকে বের করে বলল, বাইরে গিয়ে ফোনে কথা সেরে আসছি আমি।

অবশ্যই। তুমি বাইরে গেলেই ভালো। যেহেতু এখানে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতেই নিয়ে এসেছি।

ফোনটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো স্যাম। স্যাম পুরোপুরি বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো রেমি, দরজাটা পুরোপুরি লেগে যেতেই দোকানিকে বলল, মি. পিকারিং?

মাথা ঝাঁকালো লোকটা।

আমি শুনেছি আপনার কাছে দ্য হিস্ট্রি অফ পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ারসর কপি আছে?

রেমির কথা শুনে মুহূর্তের জন্য মি. পিকারিংর হাসি মিলিয়ে গেলো, তবে পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। এদিকে আসুন।

বলে পিকারিং রেমিকে নিয়ে একটা শেলফের দিকে এগিয়ে গেলেন। শেলফে পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ারসর আরো বেশ কিছু কপি দেখতে পেলো রেমি। সে জানে বইগুলো পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে, তবে তারপরও ওগুলোকে দেখে শতাব্দী বছর আগের বইয়ের কপির মতই দেখাচ্ছে। নিপুণ দক্ষতায় সোনালি চামড়ার বাইন্ডিং-এর কারণেই এমনটা লাগছে।

পিকারিং শেলফ থেকে একটা বই বের করে তা টুকরোটা দিয়ে বইয়ের ওপর থেকে ধুলো মুছে বাড়িয়ে দিলেন রেমির দিকে। আপনি কিভাবে জানলেন যে আমাদের এখানে এই বিশেষ বইটি আছে?

আমার সাথে কাজ করা এক মহিলা বলেছে। আমার স্বামীর হারানো আর্টিফ্যাক্ট ও বিরল বই সংগ্রহের শখটার ব্যাপারে জানে ও। সে ই জানিয়েছে। বলল রেমি। তবে বইটা যে পুনর্মুদ্রিত সেটা বুঝতে পারলেও এটা নিয়ে পিকারিংকে কিছু বলল না। বললে হয়তো লোকটার খারাপ লাগতে পারে। অবশ্য মলাট উল্টাতেই দেখতে পেলো বইটাতে খুব দক্ষতার সাথে অ্যান্টিক ছাপ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। মনে মনে কাজটার প্রশংসা করতে বাধ্য হলো রেমি। বইটা খুবই সুন্দর… কিন্তু আমি আসলে এটা চাচ্ছিলাম না।

পিকারিং চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এনে বললেন, এটা এর ভিতরের সাজসজ্জার জন্যই জনপ্রিয়। বিরল বইয়ের বদলে কফি টেবিলে সাজিয়ে রাখার মতো করে করা হয়েছে এই বইটা। অবশ্য মাঝেমধ্যে আমিও ঐতিহাসিক গুণাবলী সমৃদ্ধ বইগুলোর পুরোনো কপির খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। আপনার বন্ধু মনে হয় চার্লস জনসনের এ জেনারাল হিস্ট্রি অফ পাইরেটস বইটার কথা বলেছিলো। ওটার অরিজিনাল কপি আছে আমার কাছে।

আমাদেরও আছে। আমি পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ারস বইটা আমাদের সংগ্রহশালায় যুক্ত করতে চাচ্ছিলাম। আমার বন্ধু নামটাই ভুল বলেছিলো, কোনো সন্দেহ নেই তাতে।

কে আপনাকে এখানে আসার কথা বলেছিলো?

ব্রি মার্শাল।

ওহ, তাহলে বলতে যাবে ঠিক তখনই দরজার বেলটা টুংটাং শব্দ করে উঠলো। শব্দটা শুনে বলতে গেলে পিকারিং কিছুটা চমকেই গেছেন। দুজনই একই সাথে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো দরজার দিকে, আশা করছিলো স্যাম ফিরে এসেছে হয়তো। কিন্তু না। স্যামের থেকে খানিকটা খাটো, চওড়া কাঁধের এক লোক এসেছে। দোকানের জানালার আলোর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকায় চেহারাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

লোকটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে আবার রেমির দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন দোকানি। মুচকি হেসে বললেন, দিন, বইটার ওপর থেকে ধুলো মুছে আপনাকে প্যাক করে দিই। রেমি বাধা দিয়ে বলতে যাবে যে, পুনর্মুদ্রিত বই নেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার-কিন্তু এর আগেই তার হাতে বইটা ছো মেরে নিয়ে নিলেন পিকারিং। এখনই ফিরে আসছি।

ব্রি নিশ্চিতভাবেই তার চাচার দোকানে থাকা বইটার ব্যাপারে ভুল করেছে। যাই হোক, ব্যাপার না। এই কপিটাতেও ভালো অ্যান্টিক ছাপ আছে। স্যামের অফিসে দেখতেও ভালো লাগবে। স্যাম তো নিশ্চিতভাবেই উপহারের আবেগটা বুঝতে পারবে। ওটা নিয়ে আর না ভেবে শেলফের অন্যান্য বইগুলোর দিকে তাকালো রেমি। গালিয়াজির অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি বইয়ের দিকে চোখ পড়েছে ওর। বইটা দেখে প্রথম এডিশনের বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু সে বুঝতে পারছে না এতো বিরল একটা বইকে কেন এইভাবে ফ্রন্ট কাউন্টারে ফেলে রাখা হয়েছে!

আপনি কি এখানে কাজ করেন? নতুন আগুন্তুকলোকটা জিজ্ঞেস করলো।

কথাটা শুনে ঘুরে তাকালো রেমি। জানালার আলোর সামনে থেকে সরে আসায় লোকটাকে ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছে এখন। লোকটার চুলগুলো কালো, চোখ বাদামি, মুখ হালকা বর্গাকৃতির। দুঃখিত। না, আমি এখানের কেউ নই। দোকানি পিছনের দিকে গেছে। আমার জন্য একটা গিফট র‍্যাপ করছে।

মাথা ঝাঁকিয়ে আবার চলে গেলো লোকটা। ওদিকে পিছনের রুম থেকে মি. পিকারিংও বেরিয়ে এসেছেন। কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এরপর? আর আগন্তুক লোকটা তার কালো চামড়ার কোটের পকেটে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে কাউন্টারের ঠিক পাশেই। লোকটার উপস্থিতিতে কিছুটা বিরক্ত হচ্ছে রেমি। যদিও লোকটা এখনো তাদের দিকে খুঁতখুঁতে নজরে তাকিয়ে থাকা ছাড়া বিরক্ত লাগার মতো তেমন কিছু করেনি। তবে লোকটা একবারো পকেট থেকে হাত বের করছে না। এই ব্যাপারটাই অস্বস্তি লাগছে রেমির কাছে। কারো হাত নজরের আড়ালে থাকাটা রেমি ঠিক পছন্দ করতে পারে না।

কাউন্টারের ওপর বাদামি কাগজে মোড়ানোর পারসেলটা রাখলেন মি. পিকারিং। রেমি তাকিয়ে দেখলো লোকটার কুঁচকে যাওয়া আঙুলগুলো কিছুটা কাঁপছে। ভয়ে কাঁপছে নাকি বয়সের জন্য কাঁপছে? নিজেকেই জিজ্ঞেস করলো।

তবে মুখে বলল, ধন্যবাদ। এটার জন্য কত দিতে হবে আমাকে।

উনপঞ্চাশ ডলার পঁচানব্বই সেন্ট। সাথে ট্যাক্স। আর গিফট র‍্যাপিং-এর জন্য কিছু দেওয়া লাগবে না। ওটা ফ্রি।

যদিও র‍্যাপিংটা রেমির খুব একটা ভালো লাগেনি। তবে এটা না বলে বলল, যাই হোক, খুব একটা বেশি না। আমি ভেবেছিলাম আরো বেশি লাগবে হয়তো।

চীনে ছাপা হয়েছে তো, তাই একটু কমই দামটা, হেসে বললেন পিকারিং। যদিও তার হাসিটা দুর্বল দেখাচ্ছে।

বিল পরিশোধ করে বইটা নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো রেমি। বেরিয়ে পড়তে যাবে তখনই জানালার উচ্চাসনে থাকা সিয়ামিজ বিড়ালটাকে চোখে পড়লো ওর। লেজ নাড়ছে প্রাণীটা। বিড়ালটার কাছে গিয়ে আলতোভাবে হাত বুলাতে শুরু করলো রেমি, সেই সাথে একফাঁকে আগন্তুক লোকটার দিকেও তাকালো। লোকটা এখনো আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, তবে হাতটা এখন আর পকেটে নেই।

বরং হাতে একটা পিস্তল দেখা যাচ্ছে এখন। অস্ত্রটা তাদের দিকে তাক করে লোকটা বলে উঠলো, লেডি, সময় থাকতে থাকতে চলে যাওয়া উচিৎ ছিলো আপনার। যাই হোক, এখন হাত দুটো শূন্যে তুলে ধরুন।

.

০২.

মাত্রই হোটেল ম্যানেজারের সাথে ফোনে কথা বলে শেষ করেছে স্যাম। রেমির জন্য তাদের সুইটে আইস শ্যাম্পেইন এবং গিফট ঠিকঠাক মতো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে লোকটা। তাই এখন শুধু রেমির অপেক্ষা করছে। হাতের ঘড়িটা চেক করতে করতে বইয়ের দোকানটার দিকে তাকালো একবার। ভাবছে রেমি এতো দেরি করছে কেন! আন্দাজ করছে রেমি হয়তো এখন বই বিক্রেতার সাথে কোনো বিষয় গভীর আলোচনায় মত্ত হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো সে বের হয়ে আসার একটু পর পরই ঢাকা ক্রেতার সাথে কথা বলছে। এই রহস্যময় বইটা খুঁজে পাওয়া নিয়ে গণ কয়েকটা দিন বেশ উত্তেজনায় ছিলো রেমি। সে পুরোপুরি নিশ্চিত যে এই বইটাকে স্যাম তার সংগ্রহে রাখতে চাইবে। তবে আসল কথা হলো, একটা বই খুঁজে ওটার টাকার দিতে তো এতোটা সময় লাগার কথা না।

জলদি কেনাকাটা শেষ করার জন্য রেমিকে তাড়া দেওয়া দরকার। নয়তো তারা হোটেল রুমের ফিরতে ফিরতে রুমের তাপমাত্রায় শ্যাম্পেইনটা নষ্ট হয়ে যাবে। দোকানের কাছে গিয়ে জানালা দিয়ে তাকালো স্যাম। কাউকেই দেখা যাচ্ছে না ভিতরে। এমনকি, বইয়ের ওপর বসে থাকা বিড়ালটাকেও না। শুধু দেখতে পেলো কাউন্টারে একটা ব্যাপ করা পার্সেলের ওপর রেমির পার্সটা পড়ে আছে।

রেমি তো তার পার্স ফেলে যাওয়ার মতো মেয়ে না, ভেবে দরজায় ধাক্কা দিলো স্যাম। আবারো টুংটাং শব্দ করে উঠলো দরজার বেলটা। রেমি?

দোকানটা পুরোপুরি শূন্য হয়ে আছে।

রেমি?

আবারো ডাকলো স্যাম। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। কাউন্টারে পড়ে থাকা পার্সটার দিকে আরো একবার তাকিয়ে প্রতিটা অংশেই খুঁজতে শুরু করলো স্যাম। শেষমেষ খুঁজে পেলো দোকানের পিছনের অংশে থাকা একটা দরজার সামনে। খুব সম্ভবত কোনো অফিস বা স্টোরেজ রুম হবে ওটা। অবশেষে পেলাম তাহলে।

তোমার কিন্তু বাইরে অপেক্ষা করার কথা। মনে আছে?

সব ঠিক আছে, রেমি?

ঐ রান্নার বইটা খুঁজে পেয়েছি আমি। অনেকদিন ধরেই খুঁজছিলাম ওটা। দোকানি এখন ওটাই র‍্যাপ করছে আমার জন্য। এখন যাও ভাগো, নাহলে তোমার চমক নষ্ট হয়ে যাবে।

কয়েকসেকেন্ড হতভম্ভ হয়ে রেমির দিকে তাকিয়ে রইলো স্যাম। রেমির চেহারা দেখে ঠিক কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সবুজ চোখগুলোতে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি লেগে আছে, কিন্তু স্যাম তা ধরতে পারছে না। তাই শেষমেশ বলল, আচ্ছা, আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি। বেশি দেরি করো না।

তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টিহাসি উপহার দিলো রেমি। দরজার মুখ থেকে এক পাও নড়ছে না। দেরি করবো না।

জায়গাটা থেকে সরে গেলো স্যাম। দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজায় টান দিতেই আবারো টুংটাং করে উঠলো ওপরে থাকা ঘন্টিটা। তবে কী মনে করে যেন দরজাটা বন্ধ করে দোকানেই রয়ে গেলো স্যাম।

রেমির জন্য রান্নাঘর অপরিচিত কিছু না, সে মাঝে মাঝেই কৌতুক করে বলে রান্না করা কোনো ক্রিয়াপদ না, বরং এটা নাকি বিশেষ্যপদ।

কথাটা মাথায় আসতেই হুট করে স্যামের মনে পড়লো রেমিকে তো সে। আগে কখনো রান্নার বই কিনতে দেখেনি। কেনা তো পরের কথা, তাকে এসব নিয়ে ঘাটাঘাটিও করতে দেখেনি। অন্তত তাদের বিয়ের পর থেকে একবারো দেখেনি।

এর মানে রেমি তাকে সংকেত দিচ্ছিলো কিছুর। কোনো একটা বিপদের মধ্যে আছে ও।

এই মুহূর্তে পিস্তলটাও স্যামের সাথে নেই। সাধারণত স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসনের ৩৫৭ ম্যাগনামের একটা পিস্তল সাথে রাখে স্যাম। কিন্তু সান ফ্রান্সিস্কোতে কোনো কাজে আসেনি ওরা, এসেছে ছুটি কাটাতে। তাই পিস্তলটাও প্লেনেই রেখে এসেছে।

তাহলে এখন কী করবে? নাইন-ওয়ান-ওয়ানে ফোন করবে? পুলিশ কি সময় মতো এসে পৌঁছাতে পারবে?

নাহ, স্ত্রীর জীবন নিয়ে এতো বড়ো ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব না ওর পক্ষে। তাই ফোনটা সাইলেন্ট করে নিলো ও। তারপর হ্যাট খুলে রাখলো কাউন্টারের ওপর। নিঃশব্দে কাউন্টারের ড্রয়ারগুলোতে খুঁজে দেখছে কোনো অস্ত্র আছে কিনা। অন্তত তার কাছে থাকা ছোটো পকেটনাইফটার থেকে একটু শক্তিশালী কোনো অস্ত্র দরকার এখন। হালকা একটা খোঁজাখুঁজি করতেই চার ইঞ্চি ফলার একটি ফোল্ডিং নাইফ পাওয়া গেলো ড্রয়ারের ভিতর। খোপ থেকে ফলাটা বের করে আনলো স্যাম। চাকুটার ওজন বেশ ভালোই, একদম ব্যালেন্সড, ফলার মাথা একদম সূঁচালো। ধারালো প্রান্তে আঠা আঠা লেগে থাকায় স্যাম ধারণা করলো এটা হয়তো বাক্স-টাক্স খোলার কাজে ব্যবহার করা হয়। যাই হোক, এখন কাজ হলো কারো নজরে না পড়ে পিছনের ঐ রুমটাতে আবার ফিরে যাওয়া।

রেমির পার্সে হাত দিতেই একটা ছোটো মেকাপে ব্যাগ খুঁজে পেলো স্যাম। ওটাতে থাকা আয়নাটা বের করে প্যান্টে ঘষা দিয়ে পাউডারগুলো মুছে নিয়ে আস্তে আস্তে সামনের এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো এরপর। সাথে সাথে স্টোররুম থেকে তাকে যেন কেউ দেখতে না পায় সেই ব্যাপারেও সুর্ক রয়েছে।

তুমি! গমগম স্বরে খেঁকিয়ে উঠলো কেউ।

সাথে সাথেই জমে গেলো স্যাম।

কম্বিনেশনটা আরেকবার ভুল করলে, তোমাকে মরতে হবে।

মাফ করবেন, বলল আরেকটা কণ্ঠস্বর। স্যাম ধারণা করল এটা হয়তো পিকারিং-এর গলা। আমি নার্ভাস।

প্লিজ, রেমি বলল। এখানে পিস্তল ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন দেখছি না।

চোপ! অই, বুড়ো, সেফটা খুলো, দ্রুত।

আ-আমি চেষ্টা করছি।

শ্বাস নিতে গিয়ে রীতিমতো খাবি খাচ্ছে স্যাম। তার স্ত্রী রয়েছে ঐ রুমটাতে, বিপদের মধ্যে। সে শুধু এখন চাচ্ছে দৌড়ে গিয়ে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু এখন তাড়াহুড়ো করার মানে রেমির মৃত্যু ডেকে আনা। ফোল্ডিং নাইফ দিয়ে বন্দুকধারীর বিপক্ষে লড়াই! অসম্ভব ব্যাপার প্রায়। ডারপায় কাজ করার সুবাদে অস্ত্র ও নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নেওয়া আছে স্যামের। এইসব মুহূর্তগুলোয় প্রশিক্ষণ নেওয়াটা প্রচণ্ড কাজে দেয় ওকে।

শেলফের সারির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আয়নার সাহায্যে কোনার দিকে তাকালো স্যাম। স্টোররুমের দরজার মুখ থেকে আলো ঠিকরে আসছে আয়নাতে। স্যাম সুর্ক রয়েছে যেন তার কোনো ছায়া না পড়ে। আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রুমের চারপাশটাও দেখে নিচ্ছে।

আয়নায় রেমির লালচে বাদামি চুলের প্রতিবিম্ব দেখে স্বস্তি পেলো। রেমি এখন একটা এলোমেলো ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারে বসে আছে। যদিও তার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না স্যাম, আয়নাটা হালকা একটু ঘুরাতেই দেখতে পেলো যে ষণ্ডামার্কা একটা লোক দোকানির পিঠে একটা সেমিঅটো পিস্তল ধরে রেখেছে। তারা দুইজনই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটা ফ্লোর সেফের সামনে। দোকানি সেফের ডায়ালটা ঘুরাচ্ছে। স্যাম যদি এখন আড়াল থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে রেমি বন্দুকধারী এবং তার মধ্যে আটকা পড়ে যাবে।

প্রতিকূলতাটা পছন্দ করতে পারছে না স্যাম। কিন্তু এই মুহূর্তে এছাড়া আরো কোনো উপায়ও নেই।

কাম অন, রেমি। ঘুরো একবার, তাকাও আমার দিকে…

ভাবতে ভাবতে হাতের ছোটো আয়নাটা নাড়াচ্ছে, যাতে আয়নায় প্রতিফলিত আলোটা রেমির মুখে পড়ে। দুর্ভাগ্যই বলতে হয়, সেফের লক খোলার খুট শব্দটা শুনে রেমির নজর এখন ওদিকেই ঘুরে গেছে। টেবিলের ওপর ঝুঁকে একদৃষ্টিতেই ওদিকেই তাকিয়ে আছে ও। সেফের দরজাটা খুলতেই দেখা গেলো মসৃণ কাঠের বড়ো বাক্স রয়েছে ওখানে। দুইটা ওয়াইনের বোতল রাখার মতো বড়ো হবে বাক্সটা।

বন্ধুকধারী সেফের আরো কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, বাক্সে কী আছে?

একটা পুরোনো বই। অ্যান্টিক।

ডেস্কে রাখো ওটা।

পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে রাখায় বাধা দেওয়ার কোনো উপায় নেই পিকারিং এর। বাক্সটা বের করে এনে টেবিলের ওপর রাখতেই বাধ্য হলেন তিনি।

অন্যমনস্কতার সুযোগটা নিতে কোনো দ্বিধাই করলো না স্যাম। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চাকুটা বন্দুকধারীর দিকে তাক করে ছুঁড়ে মারলো।

টাইমিংটা বোধহয় এর থেকে ভালো আর হতে পারবে না। কারণ ঠিক মুহূর্তেই রেমিও তার আসন থেকে উঠে পিতলের টেবিলল্যাম্পটা ছুঁড়ে মেরেছে। বন্দুকধারীর হাত লক্ষ্য করে।

বন্দুকধারীর কাঁধে এসে বিঁধেছে স্যামের ছোঁড়া চাকুটা। সেই সাথে ল্যাম্পের আঘাতে পিস্তলটাও ছিটকে পড়ে গেছে হাত থেকে।

পরিস্থিতির সুবিধা কাজে লাগাতে স্টোররুমের দিকে ছুট লাগালো স্যাম। তবে বন্দুকধারীও ঐদিকে থেমে নেই। বিপদ থেকে বাঁচার জন্য বাক্সটা খাবলে নিয়ে পিকারিংকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো রেমির দিকে। তারপর বাক্সটা দিয়ে স্যামের মাথায় আঘাত করে দৌড় লাগালো সদরদরজার দিকে।

স্যাম নিশ্চিত না আঘাত পাওয়ার কারণেই মাথায় টুংটাং শব্দ বাজছে কিনা! নাকি আসলেই দরজার বেলটা শব্দ করছে।

স্যাম…?

সাড়া দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি লাগলো স্যামের। মাথায় আঘাতের প্রভাবটা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি এখনো। কোনোরকমে বলল, সবাই ঠিক আছ তো?

তুমি ঠিক আছো? পালটা প্রশ্ন করলো রেমি।

হ্যা…. বলে মাথায় হাত দিতেই চটচটে তরলের স্পর্শ পেলো স্যাম। হাত দুটো সামনে আনতেই দেখে রক্তে ভরে আছে আঙুলগুলো। মনে হচ্ছে। আগেরবার একদম সময় মতোই এসেছিলাম আমি।

পিস্তলটা তুলে ডেস্কে রাখলো রেমি। তারপর স্যামকেও টেনে নিয়ে বসালো চেয়ারে। তারপর দুই হাত দিয়ে স্যামের দুই গালে ধরে তাকালো তার চোখের দিকে। স্যাম আসলেই ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত হতে চাচ্ছে। আমার কাছে তোমার গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। অ্যাম্বুলেন্স ডাকবো?

দরকার নেই।

মাথা ঝাঁকিয়ে স্যামের কাটা ক্ষতটা একবার দেখে নিলো রেমি। তারপর তাকালো বই বিক্রেতার দিকে। টেবিল ধরে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে শুধু লোকটা। মি. পিকারিং, লেট মি হেল্প ইউ।

আমি ঠিক আছি, বললেন বৃদ্ধ লোকটা। মি. উইকহ্যাম কোথায়?

মি. উইকহ্যাম? রেমি জিজ্ঞেস করলো।

আমার বিড়াল। উইকহ্যাম…? কিটি, কিটি, কিটি… ডাক শোনার কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে এসে হাজির হলো সিয়ামিজ বিড়ালটা। তড়িঘড়ি করে বিড়ালটাকে কোলে তুলে নিলেন পিকারিং।

আচ্ছা, তাহলে, রেমি বলল, কেউই নিখোঁজ হয়নি। পুলিশকে জানানোর সময় হয়েছে।

রেমিকে ফোনের রিসিভার তুলে নিতে দেখে পিকারিং বললেন, এটার কি কোনো দরকার আছে?

অবশ্যই দরকার আছে, বলে কিপ্যাডে ৯১১ চাপলো রেমি।

পাঁচ মিনিটের মধেই পুলিশ এসে হাজির হলো দোকানটাতে। সাইরেনের শব্দ আসছে পুলিশের গাড়ি থেকে। যদিও রেমি তাদেরকে জানিয়েছে ডাকাত অনেক আগেই পালিয়ে গেছে।

অফিসারদের একজন স্যামকে পাশে ডেকে নিলো তার স্টেটমেন্ট নেওয়ার জন্য। বেশ কয়েকটা প্রশ্নের পর অস্ত্র পড়ে যাওয়ার সময় ডাকাত লোকটা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো তা জানতে চাইলো অফিসার। ডেস্কের পাশে ডাকাতের দাঁড়ানো জায়গাটায় দাঁড়িয়ে অফিসারকে পুরো ব্যাপারটাই বর্ণনা করে বলল স্যাম। রেমির ছুঁড়ে দেওয়া ল্যাম্পের আঘাতে লোকটার নড়নচড়নও বাদ রাখলো না। আর অফিসার দাঁড়িয়ে আছে স্যামের পূর্বে দাঁড়ানো অবস্থানটায়। আশেপাশে দেখছে। আর চাকু ছুঁড়ে মারার সময় আপনি ঠিক কোথায় ছিলেন?

দরজার মুখে।

ওখানে গিয়ে একটু দাঁড়ান, প্লিজ।

তাই করলো স্যাম।

অফিসার তার কাছে এগিয়ে এসে দরজার চৌকাঠে আঙুল বুলিয়ে দেখছে। এইতো পেয়েছি। বুলেটটা এখানেই লেগেছে।

স্যাম তাকিয়ে দেখলো তার মাথা থেকে মাত্র অল্প কয়েক ইঞ্চি দূরে গেঁথে আছে বুলেটটা। ভাগ্য ভালো ছিলো দেখছি। আরেকটু হলেই তো…

মি, ফার্গো। আপনার কাজটা প্রশংসনীয় হলেও আমি বলবো বোকামি করেছেন। ভবিষ্যতে এমন কিছু হলে অবশ্যই পুলিশকে জানাবেন।

যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে অবশ্যই আগে পুলিশকে জানাবো।

সে জানে অন্যান্য অনেকবারের মতো এবারও রেমি নেতৃত্বের ভারটা নিয়ে নিবে। রেমির অনেকগুলো গুণাবলির মধ্যে এটাকেও অনেক ভালোবাসে স্যাম। কথাটা ভেবেই রেমির দিকে তাকালো ও। মেয়েটা অনেক আগেই তার স্টেটমেন্ট দিয়ে ফেলেছে, এখন দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে।

ঐদিকে মি. পিকারিংকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সাদা পোশাকে থাকারবারি ইউনিটের ডিটেক্টিভ সার্জেন্ট ফথ। মি. পিকারিংকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। বয়স এবং পরিস্থিতির বিবেচেনায় অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। লোকটা এখনো খুলে রাখা সেফটার দিকেই তাকিয়ে আছে। আর কিছু কি নিয়ে গেছে? জিজ্ঞেস করলো সার্জেন্ট ফথ।

না। শুধু বাক্সটা। ওটার ভিতরে একটা বই ছিলো। মূল্যবান কিছুই ছিলো না বাক্সটাতে। সেফে তো কয়েকটা পুরোনো মুদ্রাও ছিলো, স্প্যানিশ স্বর্ণমুদ্রা। ওগুলো দেখেন, এখনো আগের জায়গাতেই পড়ে আছে।

কী ধরনের বই ওটা?

শ্রাগ করলো পিকারিং। জলদস্যুদের নিয়ে লেখা পুরোনো একটা বইয়ের পুনর্মুদ্রিত কপি। বইটার খুব একটা বেশি দাম নেই। আমার দোকানে এরকম বই আরো বেশ কয়েকটা কপিই আছে। চাইলে দেখাতেও পারি আপনাকে। বলে এগিয়ে গিয়ে বুকশেলফ থেকে ঐ বইয়েরই একটা কপি বের করে এনে রাখলেন ডেস্কের ওপর।

তাহলে যে বাক্সে রেখেছিলেন, ওই বাক্সটার কি কোনো আলাদা মূল্য ছিলো?

না, তেমন একটা না।

তাহলে ওটাকে এভাবে সেফে রেখে দিয়েছিলেন কেন?

কেউ যদি ওটাকে মূল্যবান ভেবে ওটা আসলে কী সেটা না ভেবেই নিতে চায়, সেই আশায় রেখেছিলাম।

মি. পিকারিং, বলে একবার নিজের নোটবুকের দিকে তাকালো সার্জেন্ট ফথ। তারপর আবার বই বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার কী মনে হচ্ছে, লোকটা কেন আপনার দোকানকে টার্গেট করেছিলো?

চোখের ওপর থেকে ঘাম মুছছে লোকটা। হাত কাঁপছে তার। ডাকাতির ফলে নিশ্চিতভাবেই ভালো একটা প্রভাব পড়েছে লোকটার ওপর। মনে হয় আমার এখানে একটা পুরোনো বইয়ের অরিজিনাল কপি আছে এই গুজবটা ছড়ানোর কারণেই এটা হয়েছে। কেন বা কে এটা ছড়িয়েছে, তা আমি জানি না। তবে ডাকাত যেটা নিয়ে গেছে সেই কপিটার সাথে টেবিলের কপিটার কোনো পার্থক্যই নেই। সেম টু সেম। পুনর্মুদ্রিত একটা কপি মাত্র। বলে টেবিলে রাখা দ্য হিস্ট্রি অফ পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ারস বইটার দিকে ইশারা করে দেখালেন মি. পিকারিং।

তথ্যটা টুকে নিয়ে নোটবুকটা বুক পকেটে রেখে দিলো সার্জেন্ট ফথ, তারপর ধন্যবাদ জানালো পিকারিংকে। ওদিকে সিএসআই দলও চলে এসেছে। আঙুলের ছাপ এবং ছবি তোলার জন্য। তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সার্জেন্ট ফথ স্যাম এবং পিকারিংকে তার বিজনেস কার্ড দিয়ে বলল, যদি কোনো কিছু মনে পড়ে আপনাদের বা কোনো সন্দেহ জাগে-তাহলে আমাকে ফোন করতে দ্বিধা করবেন না। বলে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছিলো, তারপর আবার পিকারিং-এর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার কাউকে কি খবর দিবো? পরিবারের কেউ বা বন্ধুদের, যাতে আপনাকে এসে সাহায্য করতে পারে?

না, কেউ নেই তেমন। আর আমি ঠিকই আছি।

এরপর আর কোনো কথা না বলে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলো সার্জেন্ট ফথ।

লোকটা চলে যাওয়ার পর সিএসআইর লোকদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো স্যাম। তারপর তাকালো মি. পিকারিং-এর দিকে। লোকটা একা একা থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার। আপনি নিশ্চিত যে আমাদের সাহায্য লাগবে না?

না। ধন্যবাদ, মি. ফার্গো। ভাবছি সিএসআইর কাজ হয়ে গেলে ওপরতলায় গিয়ে লম্বা একটা ঘুম দিবো।

রেমি এগিয়ে এসে পিকারিংকে জড়িয়ে ধরে বলল, যা ঘটেছে তার জন্য সমবেদনা জানানোর ভাষা জানা নেই আমার।

পিকারিং একটা গভীর শ্বাস নিয়ে রেমির দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও জানা নেই আমার। আপনার সাহসীকতাই আমার জীবন বাঁচিয়েছে।

তাহলে চলে, যাওয়া যাক? পার্সটা রেমির দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল স্যাম। আর বেশি দেরি করতে চাচ্ছে না।

হ্যাঁ, চলো।

দাঁড়ান, মি. পিকারিং পিছন থেকে ডেকে উঠে বললেন, আপনার পার্সেলটা নেননি। এতো কিছুর পরও এটাকে এখানে ফেলে গেলে সময়টাই বৃথা যাবে শুধু।

ধন্যবাদ, বলে পিকারিং-এর হাত থেকে পার্সেলটা তুলে নিলো রেমি। তারপর বাইরে বেরিয়ে সেটা বাড়িয়ে দিলো স্যামের দিকে।

আমাকে দিচ্ছো, তারমানে তো ধরা যায় এটা রান্নার বই না? স্যাম জিজ্ঞেস করলো।

আমি যেটার জন্য এসেছিলাম সেই বইও না। এটা আসলে খালি-হাতে বাসায় ফিরতে-চাই-না টাইপের একটা বই মাত্র। তবে মনে হয় তোমার অফিসের টেবিলের জন্য খারাপ হবে না বইটা।

অসুবিধা নেই। অন্তত বই কেনার ইতিহাসটা তো মনে থাকবে এতে।

রাস্তা পার হয়ে রিটজ-কার্লটন হোটেলের দিকে পা বাড়ালো ওরা। দোকানের ঘটনার থেকে বাজে অবস্থারও মুখোমুখি হয়েছে ওরা আগে। ভবিষ্যতেও যে পড়বে না সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নাই। যদিও স্যামের তার স্ত্রীর সামর্থ্যের প্রতি পুরোপুরিই আস্থা রয়েছে, তারপরও সে কখনো তার জন্য দুঃচিন্তা করা থামাতে পারে না।

সবসময়ই সব জায়গাতেই রেমির চিন্তাটাই ওর মাথায় আসে আগে। এসব ভাবতে ভাবতেই কাছে ঘেঁষে রেমির হাতটা চেপে ধরলো ও। রেমিও তার স্পর্শে সাড়া দিয়ে মাথা এলিয়ে দিলো তার কাঁধে। তুমি ঠিক আছো? কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

আমি? একদম ঠিক। আর রক্ত কিন্তু আমার মাথা থেকে পড়ছে না।

ছোটোখাটো ক্ষত ওটা। রক্ত পড়াও বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে।

স্যামের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে রেমি বলল, হোটেলে ফিরে গেলেই বুঝা যাবে তা।

আচ্ছা, বুঝা যাবে। যাই হোক, পিকারিংর সেফে থাকা স্বর্ণমুদ্রাগুলো দেখেছো?

অদ্ভুত, তাই না? ডাকাত স্বর্ণগুলো ফেলে বাক্সে থাকা একটা বই নিয়ে গেলো। এমনকি ওটা খুলেও দেখেনি একবারো।

আর বইটারও তেমন কোনো মূল্য নেই। শুধুই একটা পুনর্মুদ্রণ মাত্র।

নিশ্চিতভাবেই অদ্ভুত ব্যাপারটা, হোটেলের স্টোকস্টন স্ট্রিটের দিকে যেতে যেতে বলল রেমি। মনে হচ্ছে যেন মি, পিকারিং ইচ্ছা করেই চুরি যাওয়া বইটার মূল্য কমিয়ে বলছিলেন। এটারও কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছি না। আমি নিজেও পুনর্মুদ্রিত বইয়ের জন্য হুমকির মুখে পড়তে ঘৃণা করবো। যাই হোক, এটা বলতে গিয়ে মনে পড়লো, তোমার প্রমিজের কী হলো? বলেছিলে তো আগামী এক সপ্তাহ কেউ খুন করতে আসবে না আমাদের।

তুমি নিশ্চয় ভেবে বসোনি যে আমি আজকের কথা বলেছি? কাল থেকে সপ্তাহ শুরু হবে।

আচ্ছা, আচ্ছা। ভেঙে বলায় খুশি হলাম।

লবিতে পৌঁছে স্টাফ ডেস্কে থামলো ওরা। রেমি ওখানের কর্মরত মহিলাকে বই এবং সকালে এক অ্যান্টিক শপ থেকে কিনা বড়া সিরামিক রোস্টারটা তাদের বাসায় পাঠিয়ে দিতে পারবে কিনা সেটার কথা জিজ্ঞেস করছে। সিরামিক রোস্টারটা কিনেছে তাদের গবেষক সেলমা ওয়ান্ডার্শকে উপহার দেওয়ার জন্য। সেলমা অনেকদিন ধরেই তার রান্নাঘরের জন্য একটা রোস্টার খুঁজছিলো।

ইনস্যুরেন্স করা লাগবে? মহিলা জিজ্ঞেস করলো। নাকি স্পেশাল প্যাকের নির্দেশ দিবো?

না, এতো ঝামেলায় যেতে হবে না, রেমি বলল। শুধু একটা বইই তো এটা।

রোস্টারের অ্যাড্রেসটাতেই?

হ্যাঁ, একই ঠিকানা।

আচ্ছা, মিসে ফার্গো, চিন্তা করবেন না। আমি পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

ধন্যবাদ।

স্যুইটের সামনে পৌঁছে কী-কার্ড দিয়ে দরজাটা খুলে নিলো স্যাম। রেমিকে ভিতরে ঢুকতে বলার আগে নিজে একবার দেখে নিচ্ছে সব ঠিকঠাক আছে কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে দরজাটা খুলে ধরে রেমিকে বলল, সব ঠিক আছে, আসতে পারো ভিতরে।

রেমি রুমে ঢুকতেই দেখলো সোফার সামনের টেবিলে প্লেটে ফালি করে কাটা সবুজ আপেলের টুকরো, পনির ও আইস বাকেটের ভিতর বিলেকার্ট স্যামন ব্রুট রোজ শ্যাম্পেইনের একটা বোতল রাখা আছে। তাদের আসতে দেরি হওয়ার কারণে রুম সার্ভিসের কেউ একজন আইস বাকেটটা বদলে দিয়ে গেছে। ব্যাপারটা দেখে কিছুটা খুশি হলো স্যাম। বদলে না দিলে শ্যাম্পেইনের নিখুঁত স্বাদটা পাওয়া যেতো না, রেমিকে দিতে চাওয়া তার গিফটটাও ভেস্তে যেতো। শ্যাম্পেইনের বোতলের পাশে কাঁচের দুটো স্বচ্ছ গ্লাসও রয়েছে। রেমি বিমোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুমটার দিকে। এরই ফাঁকে স্যাম নীল বর্ণের ছোটো একটি টিফানি বক্স গছিয়ে দিলো রেমির হাতে।

তুমি এতো কিছু করলে, আর আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি।

আমাকে একটা বই দিয়েছো তো তুমি।

হু, তাও আবার পুনর্মুদ্রিত একটা কপি।

স্যাম শ্যাম্পেইনের ছিপিটা খুলতে খুলতে বলল, আমি জানি পরে কোনো একসময় ওটা পুষিয়ে দিবে তুমি।

হয়তো, বলে বাক্সের ফিতেটায় টান দিলো রেমি। ওপরের ঢাকনাটা উঠাতেই হীরকখচিত চাবি আকৃতির আকর্ষণীয় গড়নের একটা নেকলেস বেরিয়ে এলো বাক্সটা থেকে। তোমার অন্তরের চাবি?

ওটার জন্য কোনো চাবিই লাগে না। এমনিতেই খোলা থাকে তোমার জন্য।

আশা করছি এটা হয়তো আমার নতুন সদরদরজার চাবি না? বলে মাথা গলিয়ে নেকলেসটা গলায় ঝুলিয়ে দিলো রেমি। যদি হয়, তাহলে ভাবো প্রতিবার তালা বদলানোর সময় চাবি বানাতে কেমন খরচ যাবে।

নতুন করে যেই পরিমাণ নিরাপত্তার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে এবার, সেই সবের তুলনায় এই হীরার চাবির খরচ খুব একটা বেশিও না। তাদের বাড়িটাকে প্রকাণ্ড এক দুর্গে পরিণত করতে গিয়ে বলতে গেলে বিশাল অর্থই ব্যয় করতে হয়েছে তাদেরকে। অবশ্য শখে করেনি কাজটা। ভয়ঙ্কর এক আক্রমণের শিকার হয়ে আগের বাড়িটা পুরোপুরিই গুঁড়িয়ে গিয়েছিলো প্রায়। তাই নতুন করে সাজানো ছাড়া গতি ছিলো না।

যাই হোক, ওসব নিয়ে না ভেবে এখন মন শান্ত করা দরকার, ভেবে রেমির হাতে শ্যাম্পেইনের গ্লাস বাড়িয়ে দিলো স্যাম। তারপর নিজেরটা উঁচিয়ে টোস্ট করে বলল, নতুন প্রমিজ। কাল থেকে বিশ্রাম এবং আরাম ছাড়া আর কিছুই করা হবে না। এবং এই এক সপ্তাহ কেউ আমাদের মারতে আসবে না। আর, হা… আমার মনোযোগের পুরোটাই থাকবে শুধু তোমার জন্য।

তোমার প্রমিজের শেষ অংশটার বিশেষ নজর থাকবে আমার, ফার্গো।

কোনটা? কেউ মারতে আসবে না? নাকি আমার পূর্ণ মনোযাগ?

দুটোর দিকেই, বলল রেমি।

*****

সকালে বেশ আগেভাগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে স্যাম। রেমি এখনো ঘুমাচ্ছে। নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে রুম সার্ভিসকে নাস্তা পাঠিয়ে দিতে বলল স্যাম। নাস্তা আসতে আসতে রেমিও বিছানা থেকে উঠে পড়েছে। ক্রিম সিল্ক একটা রোব পরে আছে ও। শাওয়ার নেওয়ায় তার লালচে বাদামি চুলগুলো এখনো ভিজে আছে। স্যামকে একটা চুমু খেয়ে টেবিলে বসলো এরপর।

রেমি আসার আগ পর্যন্ত পত্রিকা পড়ছিলো স্যাম। সে টেবিলে বসতেই তার দিকে কফির মগটা বাড়িয়ে দিলো। তারপর আবার পত্রিকায় চোখ বুলাতে বুলাতে বলল, ঘুম হয়েছে ঠিকমতো?

হ্যাঁ, ভালোভাবেই ঘুমিয়েছি, বলতে বলতে মুখে এক চামচ গ্রিক ইয়োগার্ট পুরে নিলো রেমি। তো, আজ কোথায় যাচ্ছি আমরা?

এটা বলে চমক নষ্ট করে দিবো? এখনই বলছি না। ক্রনিক্যালর আর্টিকেলগুলো দেখতে দেখতে জবাব দিলো স্যাম। ঠিক তখনই তার নজর পড়লো ডাকাতির শিকার হওয়া ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে শিরোনামের একটি আর্টিকেলের ওপর। এটা তো সব কিছুরই অর্থ পালটে দিচ্ছে…

কী?

পত্রিকা নিচে নামিয়ে রেমির দিকে তাকালো স্যাম। বইবিক্রেতা জেরাল্ড পিকারিং। মারা গেছে লোকটা।

.

০৩.

চেয়ারে বসে কফি খেতে খেতে স্যান ফ্রান্সিসকো ক্রনিক্যালর পাতা উলটে দেখছে চার্লস এভেরি। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কোঠার প্রায় শেষ দিকে। কপালের দিকের কালচে চুলগুলো হালকা হালকা ধূসর বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। অবশ্য তার মতে নাকি বয়সের তুলনায় সে যথেষ্ট ফিট আছে। এমনকি গতরাতে ব্যক্তিগত জেটে করে ইস্ট কোস্ট থেকে স্যান ফ্রান্সিসকো আসার পরও ক্লান্তিবোধ করছে না। সকালে দুই কাপ কফি খেয়ে জেট লেগের ক্লান্তি একেবারেই দূর হয়ে গেছে বলা যায়।

পত্রিকায় বই বিক্রেতা জেরাল্ড পিকারিংর মৃত্যুর খবরটা দেখে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। খবরটা তার জন্য চমকে যাবার মতো কিছু না। অন্তত গতকাল যা ঘটেছে তারপর তো নয়ই।

যদি তার লোকেরা বইটা খুঁজে বের না করতে পারে এবং খুঁজে পাওয়ার পরও যদি এটাই সেই নির্দিষ্ট বইটা কিনা তার নিশ্চয়তা না দিতে পারে, তাহলে এই বইবিক্রেতার মৃত্যু বা দোকানে হানা দেওয়ার কোনোটারই কোনো মূল্য থাকবে না।

গুড রিডেন্স, পিকারিং, ভাবতে ভাবতেই দেখলেন তার সিকিউরিটি টিমের প্রধান কলিন ফিস্ক হাতে করে একটা বড়ো, পলিশ করা কাঠের বাক্স নিয়ে আসছে তার দিকে। অবশেষে পেয়েছো তাহলে, বলল এভেরি।

বইয়ের দোকানটা? হ্যাঁ, পেয়েছি। বইটা? না, পাইনি।

লম্বা করে একটা শ্বাস নিলেন এভেরি, কোনোরকমে রাগটা আটকে রেখেছেন। পাওনি বলতে কী বলতে চাচ্ছো?

বাক্সটা টেবিলের ওপর রেখে ডালাটা উঁচিয়ে ধরলো ফিস্ক। বাক্সের ভিতরে একটা মোটা বই দেখা যাচ্ছে। এটা নকল। পুলিশ চলে যাওয়া পর আমরা আবার গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার লোকেরা পৌঁছানোর আগেই পিকারিং বইটা অন্য আরেক সংগ্রাহকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো।

তোমার লোকেরা কি তাকে আমার পরিচয় বলেছে?

হ্যাঁ।

আর বইটা না দিলে আমি তার কী অবস্থা করতে পারি সেটা?

হ্যাঁ।

অন্ততপক্ষে কার কাছে বিক্রি করেছে সেটা তো জানতে পেরেছো?

না। এই তথ্যটা বের করার সুযোগ পাইনি। এর আগেই মরে গিয়েছিলো বুড়োটা।

কাপটা নামিয়ে মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর রাখলেন এভেরি। তারপর আরো একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন ফিস্কের দিকে। ভাবছেন ফিস্কের সুপারিশ করা দলটাকে ভাড়া করে কি তিনি কোনো ভুলই করেছেন কিনা। দলটার তো সেরাদের সেরা হওয়ার কথা, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা আসলেই সেরাদের সেরা। কোনোরকম প্রশ্ন তোলা ছাড়াই নির্দেশ পালন করে যায় ওরা। পিকারিংকেও খুব সহজেই খুঁজে বের করে ফেলেছিলো। এমনকি এভেরির নিজের লোকেরাও এই কাজটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পিকারিং কি এভেরির মতলবটা বুঝে ফেলেছিলো? কোনোভাবে কি বুঝে ফেলেছিলো যে অরিজিনাল বইটা তার দোকানে থাকা মানে তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসা?

বিশ বছর ধরে এভেরি বইটা খুঁজছেন…

কিভাবে বইটা হাতের এতো কাছে চলে এসেও আবার ফসকে গেলো?

বাক্স থেকে বইটা বের করে মলাট উল্টালেন এভেরি।

প্রথম পৃষ্ঠা দেখেই বুঝতে পারছেন যে বইটা নকল। প্রথম সংস্করণ থেকে নকল করা হয়েছে। খুব সম্ভবত দুইশো বছর আগে তার পরিবার থেকে হারিয়ে যাওয়া বইটারই কপি এটা। কিভাবে এতো নিখুঁতভাবে মানচিত্র ও শব্দগুলো পুনর্মুদ্রণ করা সম্ভব? ভেবে কোনো কুল পাচ্ছেন না এভেরি। সবদিক দিয়েই এই কপিটা একদম অরিজিনালটার মতোই। এই কপিতে শুধু একটা জিনিসই নেই এবং এভেরি নিশ্চিত পিকারিং যে বইটা লুকিয়ে রেখেছে ওটাতেই জিনিসটা আছে। জিনিসটা হলো বইয়ের ভিতরের মানচিত্রে থাকা সংকেতগুলোর অর্থ বের করার সূত্র। অর্থ বের করার উপায়ই যদি না থাকে, তাহলে এই মানচিত্রেরই বা কী মূল্য আছে?

তুমি নিশ্চিত জায়গাটায় ভালোভাবে তল্লাশি করে দেখা হয়েছে? এভেরি জানতে চাইলো।

একদম নিশ্চিত। যদিও একটা সূত্র পাওয়া গেছে। পুলিশের রিপোর্টে ভিক্টিম ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দুজনের নাম রয়েছে। আমি তাদের ব্যাপারে কিছুটা খতিয়ে দেখেছি। তারা আসলে গুপ্তধন শিকারি।

গুপ্তধন শিকারি? তাদের অভিযানের পিছনে অর্থায়ন করে কে? ঐ লোকের পিছনে লাগে, তাহলেই শিকারিদের দৌড় থেমে যাবে।

তারা নিজেরাই নিজেদের অর্থায়ন করে, ফিস্ক বলল। আর যতোটা জেনেছি, অন্য কেউও তাদের পিছনে লেগে সুবিধা করতে পারেনি। ফার্গোরা আসলে সাধারণ কোনো টাকার পিছনে ছুটে বেড়ানো দম্পতি না। তারা নিজগুণেই মাল্টিমিলিয়নিয়রে পরিণত হয়েছে। আর অভিযানে প্রাপ্ত সম্পদগুলোর অর্থ। তারা দাঁতব্য কাজে ব্যয় করে।

রবিনহুড নাকি? তাদেরকে তো সহজেই ধরে ফেলা যাবে।

উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রবিনহুড ওরা।

কফির দিকে হাত বাড়ালো এভেরি। তারা তো এখনো আমার সাথে লাগেনি, তাই না?

না, স্যার লাগেনি। তবে তাদেরকে আগে থেকেই সতর্ক করে দিলে সেটা তাদেরকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবানের মতো হয়ে যাবে।

.

০৪.

এখনো পাওনি? জিজ্ঞেস করলো স্যাম। আবারো ব্রি মার্শালকে কল করেছে রেমি। মাত্রই তারা মিসন বের ধারে অবস্থিত স্যান ফ্রান্সিসকো পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সামনে এসে পৌঁছেছে। সার্জেন্ট ফথ কিছু প্রশ্ন করার জন্য আরো একবার ওদেরকে ডেকে পাঠিয়েছে।

ওর ফোন হয়তো বন্ধ, ফোন কাটতে কাটতে বলল রেমি। কোনো ভয়েস মেইল দেওয়ার ইচ্ছা নেই ওর। ডাকাতির পর গতরাতে একবার দিয়েছিলো, সেই সাথে সকালেও-বলেছিলো যে ব্রি যেন যত দ্রুত সম্ভব রিটজ কার্লটন হোটেলে বা সরাসরি রেমির সেলফোনে কল করে। ফোন মেসেজের মাধ্যমে বন্ধুকে তার চাচার খবরটা জানাতে চাচ্ছে না ও। খুবই খারাপ লাগছে আমার। একে তো ডাকাতি, আর তারওপর এখন এটা

আমি নিশ্চিত ও ফোন করবে। এখন চলো দেখি ইনভেস্টিগেটররা কী কী জানতে পেরেছে।

ভালো কিছুর আশাই করছি, বলে জ্যাকেটটা আরো শক্ত করে শরীরে জড়িয়ে নিলো রেমি। শীতল বাতাস বইছে শরীরে কাপ ধরে যাচ্ছে প্রায়। ব্রি কল করলে তাকে কী বলবো?

হয়তো ও ইতিমধ্যেই জেনে গেছে। এজন্যেই হয়তো ফোন ধরছে না।

বলে কাঁচের দরজাটা টেনে ধরলো স্যাম। দরজা দিয়ে ঢুকে বামের লবির দিকে পা বাড়ালো ফার্গো দম্পতি। লবিতে থাকা সিকিউরিটি গার্ডরা তাকিয়ে আছে তাদেরকে।

গার্ডদেরকে পেরিয়ে আসার পর কাঁচের জানালার অন্যপাশে থাকা অফিসারের কাছে গিয়ে স্যাম বলল, মি, অ্যান্ড মিসেস ফার্গো। সার্জেন্ট ফথের সাথে দেখা করতে এসেছি।

স্যার কি আপনাদের আগমনের ব্যাপারে জানেন?

হ্যাঁ। সার্জেন্ট নিজেই ডেকেছেন আমাদের। গতকালের ডাকাতির ব্যাপারে কথা বলার জন্য।

ফোন তুলে নিয়ে রিসিভিং প্রান্তে থাকা মানুষটাকে স্যামের কথাগুলোই জানালো জানালার ওপাশে থাকা মহিলা অফিসার। তারপর স্যামের দিকে ফিরে বলল, সার্জেন্ট ফথ এখন উপস্থিত নেই। তবে তার পার্টনার সার্জেন্ট ট্রেভিনো আছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন।

মিনিট দুয়েক পর কালো চুলের এক লোক বেরিয়ে এলো এলিভেটরের ভেতর দিকে। তাদের দিকে এগিয়ে এসে পরিচয় দিয়ে বলল, আমার পার্টনারের অনুপস্থিতির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। একটা কাজে বেরিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। ইন্টারভিউ রুমে নিয়ে যেতে যেতে তাদেরকে জানালো ট্রেভিনো। আর এমনিতেও, আপনাদেরকে এখন পর্যন্ত ডেকে আনার জন্যও যথেষ্ট দুঃখিত আমরা। তবে জেরাল্ড পিকারিংর মৃত্যুর কারণে কেসটা এখন হোমিসাইড কেসে পরিণত হয়েছে।

চেয়ারে বসতে বসতে স্যাম বলল, পত্রিকার খবর পড়ে আমরা যতটা জেনেছি হার্ট অ্যাটাকের কারণে লোকটার মৃত্যু হয়েছে।

হ্যাঁ, এবং এটা ভালোভাবে সাজানোও যেতে পারে কিন্তু। অবশ্যই, অটোন্সি রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে মৃত্যুর সময়টাই আসলে সন্দেহের উদ্রেক করছে। সবগুলো দৃষ্টিকোন থেকেই ভেবে দেখেছি আমার। যাই হোক, ডাকাতিটা বেশ হিংস্র ছিলো মি. পিকারিংর জন্য। অপরাধীকে দ্রুত সময়ের ভিতর ধরার চেষ্টা করছি। বলে নোটবুকটা খুললো ট্রেভিনো। কয়েক পাতা উলটে দেখার পর আবার বলল, আমার পার্টনারকে বলেছিলেন গতকাল একটা নির্দিষ্ট বই কেনার জন্য চায়নাটাউনে গিয়েছিলেন আপনারা। আমাকে জানাবেন কেন ঐ নির্দিষ্ট দোকানটাতেই গিয়েছিলেন?

আমাদের এক বন্ধু সুপারিশ করেছিলো, রেমি বলছে। আমার স্বামীকে উপহার দেওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট বই খুঁজছিলাম আমি। দোকানটার ব্যাপারে আমি জেনেছি মি. পিকারিংর ভাতিজি ব্রি মার্শালের কাছ থেকে।

মহিলার সাথে আপনার পরিচয়ের সূত্রতা?

ব্রি আমাদের ফার্গো ফাউন্ডেশনে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে।

পারিবারিক ব্যবসা?

পারিবারিক দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান, বলল রেমি। ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস অ্যাজেন্সী ডারপা ছেড়ে নিজস্ব ব্যবসা শুরুর পরই রেমির সাথে পরিচয় হয় স্যামের। এরপর বিয়ে। রেমির উৎসাহেই স্যাম আর্গন লেজার স্ক্যানার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। এটা একটা ডিভাইস যেটা কিনা অনেক দূর থেকেও খাদ মেশানো ধাতু শনাক্ত করতে পারে। খুব দ্রুতই মার্কেট দখল করে নিয়েছিলো ডিভাইসটা। এর চার বছর পর ফার্গো গ্রুপটা হায়েস্ট বিডারের কাছে বিক্রি করে দেয় ওরা। ওটার প্রাপ্য অর্থ তাদের সারাজীবন চলে যাওয়ার থেকেও অনেক বেশি ছিলো। সেখান থেকেই সূচনা হয় ফার্গো ফাউন্ডেশনের।

লা জোলা লাইব্রেরিতে আমাদের সর্বশেষ দাঁতব্য শাখা খোলার ব্যাপারে ব্রি আমাদের প্রচুর সাহায্য করেছে। তখনই সে আমাকে তার চাচার ব্যাপারে বলেছিলো, লোকটা নাকি আঠারশো শতাব্দীর শুরুর দিকের জলদস্যু ও উপকূলবর্তী মানচিত্র সমেত একটা বই তুলে দেওয়ার জন্য ভালো কোনো সংগ্রাহক খুঁজছেন।

ট্রেভিনো নোটবুকের ওপর থেকে চোখ তুলে বলল, আর এই বইটাই তো সেফ থেকে চুরি গেছে?

আমি আসলে সেফ থেকে বইটা বের করতে দেখিনি ঠিক। শুধু বাক্সটাই দেখেছি। তবে ব্রি যেভাবে বলেছিলো, তাতে আমি নিশ্চিত যে সে প্রথম মুদ্রণের কপির ব্যাপারেই নির্দেশ করছিলো।

কারণ…?

সে বারবারই বলছিলো তার চাচা বইটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝবে এমন কোনো সংগ্রাহকের হাতে তুলে দিতে পারলেই খুশি হবেন।

নোটবুকে লেখা থেমে গেছে সার্জেন্ট ট্রেভিনোর। ফার্গো দম্পতির দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, আমার শুনেছি আপনারা পেশাদার গুপ্তধন শিকারি?

হ্যাঁ, বলল স্যাম। ওখান থেকে যা পাই সেসব ফার্গো ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দাঁতব্য কাজে ব্যবহার করা হয়।

আগেই বলে নিচ্ছি বিরল বইয়ের ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই কম। তবে যেহেতু বইটা জলদস্যু ও ম্যাপ নিয়ে ছিলো, তাহলে কি এটা সম্ভব যে কেউ জলদস্যুদের হারিয়ে যাওয়া গুপ্তধনের সন্ধানে এই বইটা চুরি করেছে?

হেসে উঠলো রেমি। আমার মনে হয় না এমন কিছু আদৌ সম্ভব কিনা। যদি মি. পিকারিংর ভাতিজি প্রথম এডিশনের কপি বিক্রির কথা না বলতে এবং একই সময়ে আমরাও এখানে ঘুরতে না আসতাম, তাহলে আমার মনে হয় না আমিও আর ওটা নিয়ে খুব একটা ভাবতাম।

আচ্ছা, ধরে নিলাম চুরি যাওয়া বইটা প্রথম এডিশনেরই। ওটার দাম কেমন হতে পারে?

বইয়ের কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করে…. স্যামের জন্য বইটা কিনতে আসার আগে মূল্য নিয়ে কিছুটা ঘাটাঘাটি করে এসেছে রেমি। এসব কপির দাম কয়েকশো থেকে শুরু করে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে সাধারণত। এমনটাই দেখে ছিলাম। অবশ্য এই বইটা খুব একটা মূল্যবানও না, একটা সময় যথেষ্টই জনপ্রিয় ছিল, এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া প্রথম এডিশনের কয়েকটা কপিও এখনো অবশিষ্ট আছে। আমরা শুধু বইয়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে কিনতে চেয়েছিলাম, বলে স্যামের হাতে হাত রাখলো রেমি।

হ্যাঁ, বলল স্যাম। উপকূলীয় ইতিহাস পড়তে ভালো লাগে আমাদের।

নোটবুকটা বন্ধ করলো সার্জেন্ট ট্রেভিনো। আপাতত এটুকুই জানার দরকার ছিলো আমার। এছাড়া কি আর কোনো তথ্য আছে আপনাদের কাছে যেটা আমাদের কাজে আসতে পারে?

এই মুহূর্তে কিছুই নেই, জবাব দিলো স্যাম।

সাথে রেমি যোগ করলো, কিছু মনে পড়লে সাথে সাথেই কল করবো আমরা।

অবশ্যই। কষ্ট করে এখানে আসার জন্য আবারো ধন্যবাদ আপনাদেরকে।

লবি পর্যন্ত তাদেরকে এগিয়ে দিলো ট্রেভিনো।

স্যাম ঐদিকে দরজা পর্যন্ত চলে গেছে, রেমিও তাকে অনুসরণ করছে। কিন্তু তখনই পিছনে ঘুরে জিজ্ঞাস করলো, মি. উইকহ্যামের কী হবে?

প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে তাকালো সার্জেন্ট ট্রেভিনো।

মি. পিকারিংর বিড়াল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। খুবসম্ভবত পিকারিংর প্রতিবেশি নিয়ে গেছে প্রাণীটাকে। পিকারিংর ভাতিজি বা মেয়ে আসার আগ পর্যন্ত ওখানে থাকবে উইকহ্যাম। তারাই এসে প্রাণীটার সাথে কী করবে সেটার সিদ্ধান্ত নিবে।

ওদের কারো সাথে যোগাযোগ হয়েছে আপনাদের? রেমি জিজ্ঞেস করলো।

এখনো না। আমার মনে উনার মেয়ে ইস্ট কোস্টে থাকে। আর আপনার থেকে নেওয়া নাম্বারটাতেই তার ভাতিজির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, বলে আবারো তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলিভেটরের দিকে পা বাড়ালো সার্জেন্ট ট্রেভিনো।

হোটেলে ফিরে দরজা দিয়ে ঢোকার সময় স্যাম বলল, স্যান ফ্রান্সিসকোয় ছুটি কাটানোর আশায় এলেও, বিশ্রামে কিন্তু থাকা হচ্ছে না।

দীর্ঘশ্বাস ফেললো রেমি। আমার মনে হয় দোষটা আমারই। শুরুতেই বইয়ের দোকানটায় যাওয়া ঠিক হয়নি। আমি ভেবেছিলাম বইটা হয়তো তোমার নতুন অফিসে নাবিক জাতীয় একটা আবহ যোগ করতে পারে।

পুনর্মুদ্রণটা নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। প্রথম এডিশনের মতোই উপভোগ করবো ওটা। বিশেষ এটার পিছনে জড়িয়ে থাকা স্মরণীয় ইতিহাসের জন্য।

আর এখন আমরা কোথায় যাবো? লবির দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো রেমি।

প্রথমে আমাদের লাগেজগুলো নিয়ে নিই। তারপর উপকূল ধরে মনটেরিতে যাবো।

তাহলে রয়এ ডিনার সাড়বো আমরা?

উত্তরটা দেওয়ার আগেই অন-ডিউটি ম্যানেজারের সাথে দেখা হলো তাদের। উদ্বেগে মুখ কুঁচকে আছে লোকটার। মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো। আপনাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা জানা নেই আমার। আপনাদের জন্য যদি কিছু করতে পারি… আসলে আমাদের এখানে আগে কখনোই এমন কিছু ঘটেনি। অন্তত আমি যতদিন ধরে আছি ততদিন ধরে না।

কী ঘটেনি আগে? জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

পুলিশ এসেছিলো। ওয়ারেন্ট দেখিয়ে আপনাদের জিনিসপত্র সার্চ করে গেছে।

ওয়ারেন্ট? রেমি বলল। কোনোভাবেই ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না তার। জীবনে সে কখনো এটা ভাবেনি যে তাদের করা কোনো কিছু একসময় পুলিশের তদন্তের অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

আমরা আপনাদের কল করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সরাসরি ভয়েস মেইলে চলে গিয়েছে কলগুলো।

সার্জেন্ট ট্রেভিনোর সাথে সাক্ষাতের সময় ফার্গো দম্পতির দুইজনই তাদের ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছিলো।

স্যাম জিজ্ঞেস করলো, আপনি তাকে তাদের ওয়ারেন্টের কোনো কপি রেখেছেন?

কপি?

ওয়ারেন্টের একটা কপি রেখে যাওয়ার কথা পুলিশদের।

এটা মনে হয় আপনি নিজে জিজ্ঞেস করলেই ভালো হয়। তারা এখন আপনাদের রুমেই আছে।

ঠিক বলেছেন, বলে রেমিকে নিয়ে সরাসরি এলিভেটরের দিকে পা বাড়ালো স্যাম। ম্যানেজারও আসছে তাদের পিছে পিছে। এখন বুঝেছি সার্জেন্ট ফথ সকালে কেন ওখানে ছিলো না। রেমিকে বলছে স্যাম। লোকটা আমাদের রুম সার্চ করার জন্য ইন্টারভিউয়ের নাম করে তার পার্টনারকে দিয়ে আমাদের আটকে রেখেছিলো পুলিশি স্টেশনে।

সার্চই বা করছে কেন? রেমি বলছে। আমরাও তো মি. পিকারিংর মতোই ডাকাতির শিকার। আর সত্যি বলতে, আমাদেরকে ভালোভাবে জিজ্ঞেস করলেই হতো। ওটা তো আর এতো লজ্জার হতো না। বলে অস্ফুট হেসে ম্যানেজারের দিকে তাকালো রেমি। লোকটা তাদের প্রতিটা কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। সত্যি বলতে স্যাম লোকটাকে নিচেই অপেক্ষা করতে বলেনি দেখে কিছুটা অবাক হয়েছে ও। তবে একটু পরই বুঝতে পারলো যেহেতু পুলিশ তাদের রুম তল্লাশি করে দেখছে (যেটা সে এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না, ব্যাপারটা প্রচণ্ড অপমানজনক লাগছে তার কাছে), তাই একজন সাক্ষী থাকা খারাপ কিছু হবে না।

এলিভেটরে ম্যানেজার তার চাবিটা লাগালো যাতে করে এটা দিয়ে উচ্চপ্রহরায় থাকা ফ্লোরটায় যাওয়া যায়। গন্তব্যে পৌঁছেই পা বাড়ালো তাদের স্যুইটের দিকে। কালো স্যুট পরে রাখা দুইজন লোককে দেখতে পেলো রেমি। দুইজনের হাতেই ল্যাটেক্স গ্লাভস লাগানো। একজন বিছানায় থাকা তার স্যুটকেসটা ঘেটে দেখছে। স্যুটকেসের প্রান্তগুলোর দিকেই বেশি মনোযোগ লোকটার। ভাবছে ওখানে হয়তো কিছু লুকানো আছে। আর অন্যজন বারের ক্যাবিনেটগুলো খুলে খুলে দেখছে।

সার্জেন্ট ফথকে দেখতে পাচ্ছি না আমি, স্যামকে ফিসফিসিয়ে বলল রেমি।

বারের দিকে লোকটার চোখ পড়েছে তাদের ওপর। তীর্যক ও কঠিন দৃষ্টিতে তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, এটা পুলিশের কাজ। আপনারা বাইরে যান।

রেমির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো স্যাম। সম্মুখ বিপদ থেকে রেমিকে আড়াল করে রাখতে চাইছে। এটা তো সম্ভব হচ্ছে না। আপনাদের আইডি দেখালে ভালো হয়, দাবি করে বলল স্যাম। আর আপনাদের ওয়ারেন্টের একটা কপি।

এই যে আপনার ওয়ারেন্ট। বলে বুক পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা একটা কাগজে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলো লোকটা। তার সঙ্গীও এগিয়ে আসছে।

কাগজটা স্যামের গিয়ে ঠেসে ধরে তাকে ধাক্কা দিয়ে টেবিলের দিকে ঠেলে দিলো। অবশ্য স্যাম অতো সহজে ছেড়ে দেয়নি লোকটাকে। কাঁধ খাবলে ধরে চরকির মতো একটা পাক খেয়ে লোকটাকে দেয়ালে আছড়ে মেরেছে। দরজার মুখে লড়াইয়ের মতো সৃষ্টি হয়ে গেছে এতে করে। হঠাৎ করে লোকটার সঙ্গীও এসে জড়ো হলো হট্টগোলের মধ্যে। পেছন থেকে এসে স্যামকে ঝাঁপটে ধরেছে লোকটা। মুষ্টি পাকিয়ে প্রথম লোকটার চোয়ালে জোরালো ঘুষি হানলো স্যাম, তারপর ঝট করে ঘুরে লাথি মারলো দ্বিতীয় লোকটার গায়ে। উড়ে ম্যানেজারের গায়ের ওপর গিয়ে পড়লো লোকটা, দুজনেই মাটিতে আছড়ে পড়েছে। ওদিকে রেমি অস্ত্রের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। টেবিলের কাছেই থাকা ফুলদানিটা দেখে ওটাই তুলে নিলো হাতে আঘাত করার ভঙ্গিতে ফুলদানিটা ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় লোকটা রেমির হাতের অস্ত্রটা দেখতে পেয়েছে। অবস্থা বেগতিক বুঝে স্যাম ও তার সঙ্গীর দিকে একবার তাকিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

ওদিকে এখনো প্রথম লোকটার সাথে লড়াই করছে স্যাম। লোকটা পাক খেয়ে ঘুরে আঘাত করতে চাইলো স্যামকে, কিন্তু স্যাম তার বাম হাত দিয়ে আঘাতটা ঠেকিয়ে ডান মুষ্টি দিয়ে সজোরে ঘুষি মারলো লোকটার পেটে। ঘুষি খেয়েই হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়েছে লোকটা। তবে বেশিক্ষণ পড়ে রইলো না। স্যামকে আবারো এগিয়ে আসতে দেখে সেও উঠে দৌড়ে লাগালো তার সঙ্গীর পিছে পিছে। স্যাম তাদেরকে তাড়া করতে শুরু করেছিল, তবে বেশিদূর এগুলো না। এর বদলে রুমে ফিরে এসে দরজার তালা লাগিয়ে তাকালো। রেমির দিকে। রেমি এখনো হাতে দানিটা ধরে রেখেছে। ওটা কি আমার জন্য নাকি তাদের জন্য?

এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি আমি। বলে মেঝেতে পড়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে ইশারা করলো রেমি।

স্যাম এগিয়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো লোকটাকে। আপনি ঠিক আছেন?

অনেক বেশি হতভম্ব হয়ে আছি, গায়ের পোশাকটা ঝেড়ে নিতে নিতে বলল ম্যানেজার। এটা তো দেখি রীতিমতো আক্রমণ ছিলো আপনাদের ওপর। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে এটা নিয়ে অভিযোগ জানাবো আমরা।

তারা কিন্তু পুলিশ ছিলো না, বলল স্যাম।

কিন্তু আমি যে ওয়ারেন্টটা দেখলাম।

মেঝে থেকে ওয়ারেন্ট নামের কাগজটা হাতে তুলে নিয়ে স্যাম বলল, নকল। কোনো সাক্ষর নেই এটায়। খুব সম্ভবত ইন্টারনেট থেকে পুরোনো কোনো কেসের ওয়ারেন্ট প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছিলো। বলে রেমির দিকে বাড়িয়ে দিলো কাগজগুলো।

চটজলদি কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিলো রেমি। স্যামের কথাই ঠিক। তোমার কি মনে হয় তারা কী খুঁজছিলো?

খুব সম্ভবত মি. পিকারিংর সেফে তারা যেটা খুঁজে পাওয়ার আশা করছিলো, সেটাই।

পুলিশের কাছে কল করে জানা গেলো যে ঐ লোকদুটো পুলিশের কেউ নয়। সত্যি বলতে তাদেরকে ধরার আশায় কয়েকমিনিটের মধ্যেই পুলিশ অফিসার এবং আইন প্রণয়নকারী অফিসারে ভরে গেলো জায়গাটা।

হাসপাতালের মর্গ থেকে সরাসরি হোটেলেই চলে এসেছে সার্জেন্ট ফথ। পিকারিংর অটোন্সির জন্যই ওখানে চলে যেতে হয়েছিলো বলে সকালে ইন্টারভিউয়ের সময় লোকটা থাকতে পারেনি। ফার্গো দম্পতির কাছে এটার জন্য ক্ষমা চেয়ে বলল, আপনাদের কোনো ধারণাও নেই তারা কী খুঁজছিলো?

না, বলল স্যাম। সত্যি বলতে, সার্চের কথা শুনে ভেবেছিলাম আপনিই হয়তো আমাদেরকে আপনার পার্টনারের সাথে আটকে রেখে এখানে তল্লাশি চালাতে এসেছেন।

অবৈধ তল্লাশির কথা বাদ দিলেও, আমরা আসলে কিন্তু নকল ওয়ারেন্ট নিয়ে আসতাম না। খুব সম্ভবত তারা আপনাদের ওপর নজর রাখছিলো। আপনারা হোটেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলো হয়তো। এরমানে হলো, তারা ভাবছে মি. পিকারিংর কাছে থাকা জিনিসটা এখন আপনাদের কাছে আছে।

রেমি তার স্যুটকেস থেকে কিছু খোয়া গেছে কিনা তা চেক করতে করতে বলল, জিনিসটা যেটাই হয়ে থাকুক না কেন, খুব একটা বড়ো না সম্ভবত। তারা স্যুটকেসের লাইনিংয়েও খুঁজে দেখেছে। এমনকি ছোটো কম্পার্টমেন্টেও। আমি যে বইটা কিনেছি সেটা ওখানে ফিট হবে না।

বইটা কোথায়?

কুরিয়ার লোকেরা যদি ঠিকঠাক মতো তাদের দায়িত্ব পালন করে থেকে থাকে, তাহলে এটা খুব সম্ভবত আজ বিকালের মধ্যেই আমার বাড়িতে পৌঁছে যাবে বইটা।

ওখানে ওটা রিসিভ কে করবে?

আমাদের গবেষক, সেলমা। আমি তাকে কল করে জানিয়ে দিচ্ছি।

ধন্যবাদ বুঝতে পারার জন্য।

রেমি তার পার্স থেকে ফোনটা বের করে সেলমার অফিসের নম্বরে ফোন করলো। কোনো সাড়া না পেয়ে একটা ভয়েস মেইল রেখে দিলো শুধু।

ফোনটা কান থেকে নামাতেই সার্জেন্ট ফথ বলল, তো সহজ করে বললে-আপনার পুলিশ স্টেশন থেকে হোটেলে ফিরে আসতেই ম্যানেজারের থেকে শুনলেন যে পুলিশ আপনাদের রুমে তল্লাশি করছে?

হ্যাঁ, ঠিক, স্যাম বলল। আমাদের বেরিয়ে যাওয়ার পরেই এসে ঢুকেছে।

ম্যানেজার এখনো আতঙ্কে কাঁপছে কিছুটা। মাথা ঝাঁকিয়ে স্যামের কথায় সায় দিয়ে বলল, ওয়ারেন্ট দেখাতেই আমি ফার্গো দম্পতিকে কল করার চেষ্টা করেছি। তবে তাদের কেউ ফোন ধরেননি। আর আমিই বা কী করবো বলেন? অফিসিয়াল কাগজ আর পিস্তল দেখে তো আমার…

পিস্তল? সার্জেন্ট ফথ বলে উঠলো।

মাথা ঝকালো ম্যানেজার। আমার মনে হয় তাদেরকে আইডি দেখানোর কথা বলা উচিৎ ছিলো আমার, কিন্তু…

মি….?

ব্রায়ান্ট।

মি, ব্রায়ান্ট, সার্জেন্ট ফথ বলল। লোকদুটোর কেউ কি বলেছিলো তারা কী খুঁজছে?

হ্যাঁ। তারা জানতে চাইছিলো ফার্গোরা কি কোনো চাবির ব্যাপারে কিছু বলেছে কিনা। অথবা আমাদের সেফে এই জাতীয় কিছু রেখেছে কিনা। আরো কী কী যেন… আমার এতোটা মনে নেই। তবে তারা একটা চাবির কথা বলেছিলো, এটুকু স্পষ্ট মনে আছে আমার।

চাবি?

হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো মিসেস ফার্গোর গলায় ঝুলানো নেকলেসের ব্যাপারে বলাবলি করছে।

কথাটা শুনেই হীরার নেকলেসটার ওপর হাত চলে গেলো রেমি। স্যামকে জিজ্ঞেস করলো, এটার ব্যাপারে কি কিছু লুকিয়েছো আমার কাছে?

এটা অবশ্যই দামি একটা অলংকার। তবে শুধু একটা অলংকারই মাত্র।

সার্জেন্টের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো রেমি। গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলল, আমার মনে হয়, আমরা এটা ধরে নিতে পারি যে ঐ লোকগুলো যেটা খুঁজছে সেটা আমাদের কাছে নেই। তো যদি আর কিছু না থেকে থাকে…, তাহলে আমরা আসলে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। নাহলে…

সার্জেন্ট তাদের স্যুটকেসের দিকে তাকালো একবার। লবিতে থাকা ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ দেখা দরকার আমার। মনে হয় মি. ব্রায়ান্ট আমাকে সাহায্য করতে পারবেন।

নিজের স্যুটকেসের দিকে হাত বাড়ালো স্যাম। বলল, আপনার কাছে আমাদের সেল নম্বর তো আছেই, যদি দরকার লাগে কল করবেন। সার্জেন্টের জবাবের অপেক্ষা না করেই রেমিকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করলো স্যাম। ম্যানেজার তাদের পিছে আসতে চাইছিলো, তবে স্যাম থামিয়ে দিলো লোকটাকে। আমরা নিজেরাই বেরিয়ে যেতে পারবো।

অবশ্যই, বলে পিছিয়ে গেলো ম্যানেজার।

লাগেজগুলো নিয়ে এলিভেটরে ঢুকলো ফার্গো দম্পতি। এলিভেটরের দরজাটা বন্ধ হতেই রেমি বলল, আমাদের বিশ্রামের ছুটিটা আসলে কোনদিন থেকে শুরু হবে?

আমি কি আজকের কথা বলেছিলাম? আসলে আগামীকাল হবে ওটা।

হুমম…

আর সত্যি বলতে, কেউ কিন্তু আমাদেরকে মারা চেষ্টা করছে না।

কিন্তু তাদের সাথে তো পিস্তল ছিলো, স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল রেমি। আর আমরা আমাদেরগুলো প্লেনেই রেখে এসেছি।

এটা বলার উপযুক্ত সময় হয়েছে কি যে ঐ বইয়ের দোকানে যাওয়ার আইডিয়াটা তোমারই ছিলো?

মোটামুটি নিশ্চিত যে এই কথাটা বলার মতো উপযুক্ত সময় তুমি কখনোই পাবে না।

.

০৫.

স্যাম সিদ্ধান্ত নিলো রাতে তাদের স্প্যানিশ বের হোটেলে যাওয়া এবং মনটেরি পেনিনসুলার রয়-এ ডিনারটা একদিন পিছিয়ে দিলেও চলবে। তার ফ্লাইট ক্রুদেরকে বলল যেন মনটেরি এয়ারপোর্ট থেকে স্যান ডিয়েগোতে নিয়ে যায় ওদের। রেমি ওদিকে এখনো ব্রির সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে বেশ দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। এটার সাথে সকালের ঘটনাগুলো একত্রিত হয়ে স্যামের সপ্তাহব্যাপি পরিকল্পনাটায় পানি ঢেলে দিয়েছে যেন। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জি ৬৫০ বিমানে করে আকাশে উডডয়ন করলো ওরা। বিমানের ভিতরে বসে বিথোবিয়ানের রিলাক্সিং মিউজিক শুনছে। ওদিকে সেলমা রেমিকে মেসেজ দিয়ে জানিয়েছে যে বইটা আজ সকালেই তাদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছে। কন্ডিশনও বেশ ভালোই আছে। কুরিয়ার করার সময় ঝাঁকি খেয়ে ওপরের পরতে একটু চাপ পড়েছে শুধু। এছাড়া ভিতরে কিছুই হয়নি, এবং এটার সাথে কোনো চাবি বা অতিরিক্ত কিছুও যায়নি।

সেলমার মেসেজ পাওয়ার পরও দুঃশ্চিন্তা দূর হলো না রেমির। স্যাম রেমিকে ফোন চেক করে আবার টেবিলে রেখে দিতে দেখেছে। স্ত্রীর চেহারার হতাশাটা ভালোভাবেই চোখে পড়ছে তার। কোনো সন্দেহ নেই যে বন্ধুর জন্য অনেক বেশি দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে মেয়েটা। রেমিকে স্বস্তি দিতে না পারার আক্ষেপ হচ্ছে তার মনে। স্যাম ব্রি মার্শালকে অতোটা ভালো করে চিনে না। তবে মেয়েটার সাথে গত কয়েকসপ্তাহ ধরে কাজ করছে রেমি এবং কাজের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে ভালো একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।

****

স্যান ডিয়েগো এয়ারপোর্টে পৌঁছেই সরাসরি লা জোলায় ব্রির অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা করলো ওরা।

এয়ারপোর্ট থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের দোতলায় থাকে ব্রি। ওখানে পৌঁছুতেই দেখলো পার্কিং লটের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো পাম গাছে। উপকূলীয় বাতাসের গাছের পত্ররাজিগুলো দুলছে যেন।

কমপ্লেক্সে পৌঁছেই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল ওরা। ডোরবেল চাপলো রেমি। কয়েকমিনিট অপেক্ষা করে আবারো চাপলো। কোনো সাড়া আসছে না ভিতর থেকে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দরজায় করাঘাত করতে শুরু করলো স্যাম।

কিছুক্ষণ পর পিছনের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো। এক মহিলা দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে বলল, কেউ নেই ওখানে।

ব্রির সাথে যোগাযোগ করার অন্য কোনো উপায় জানা আছে আপনার? রেমি জানতে চাইলো।

আপনারা…?

আমি রেমি ফার্গো। ও আমার স্বামী, স্যাম। আমরা

ফাউন্ডেশনের। ব্রিকে ওখানে কাজ করতে শুনেছি, বলে তাদের দুজনকে একবার দেখে দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিলো মহিলা। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম যে আপনারা সাধারণ কোনো আগন্তুক কিনা। যাই হোক, ব্রি হুট করেই চলে গেছে।

কখন? রেমি বলল।

কাল রাতে। আমি বাসায় আসছিলাম তখন। দেখি ব্রি সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে আসছে। বলেছিলো তার চাচাকে দেখতে যাচ্ছে।

স্যাম তার ওয়ালেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিলো মহিলার হাতে। যদি তার সাথে আপনার যোগাযোগ হয়, তাহলে কি ওকে বলতে পারবেন আমাদেরকে কল করতে? জরুরি দরকার ছিলো।

অবশ্যই। আপনাদেরকে এর বেশি সাহায্য করতে পারলাম না বলে দুঃখিত।

গাড়িতে ফিরে স্যাম তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, ব্রি মনে হয় খুব সম্ভবত স্যান ফ্রান্সিসকোয় আছে এখন।

আমি নিশ্চিত যে তোমার কথাই ঠিক। মেয়েটার মনের অবস্থা চিন্তা করতেই খুব খারাপ লাগছে আমার।

তার কাছে আমাদের নম্বর আছে। আমাদেরকে কল করতে পারবে। আর এর ফাঁকে চলো বাসায় ফিরে যাই। সেলমাকে সাথে নিয়ে মি. পিকারিংর বইটা একটু ঘেটে দেখা দরকার।

লা জোলা গোল্ডফিশ পয়েন্ট থেকে তাদের সমুদ্র তীরবর্তী বাসার দূরত্ব খুব বেশি না। মাত্র কয়েক মাইলের পথ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গ্যারেজের সামনে গিয়ে পৌঁছুলো ওরা। গ্যারেজে ঢুকতেই দেখতে পেলো যে তাদের বিশাল জার্মান শেফার্ড কুকুর যোলতান দৌড়ে আসছে তাদের দিকে।

যোলতান কাছে আসতেই উবু হয়ে কুকুরটা কান চুলকে দিলো রেমি। আদর পেয়েই রেমির কোলে লুটিয়ে পড়লো কুকুরটা। আট্টিলা দা হানের সমাধি অনুসন্ধানের সময় হাঙ্গেরিতে কুকুরটাকে খুঁজে পেয়েছিলো রেমি। কুকুরটাকে ভালো লেগে যাওয়ায় ওটাকে বাড়িতেই নিয়ে আসে। তবে সমস্যা একটাই, যযালতান শুধু হাঙ্গেরিয়ান ভাষাতেই সাড়া দিতে পারে। কপাল আলো, তাদের গবেষক সেলমাও হাঙ্গেরির নাগরিক। এখনো তার গলার স্বরে কিছুটা হাঙ্গেরিয়ান টান মিশে আছে। সে ই যোলতানকে হাঙেরিয়ানের পাশাপাশি ইংরেজি শব্দেও সাড়া দেওয়ার ট্রেইনিংটা দিচ্ছে। সেলমার মতে, যোলতানই একমাত্র ইস্টার্ন ইউরোপিয়ান কুকুর যেটা দুটো ভাষাতে সাড়া দিতে পারে।

গুড বয়, রেমি বলল যোলতানকে। চল, তোকে একটা ট্রিট দেই।

ইংরেজি শব্দগুলোর মধ্যে ট্রিট শব্দটাতেই সবার আগে সাড়া দিয়েছিলো যোলতান। এখন রেমির মুখে শব্দটা শুনেই লেজ নাড়তে শুরু করলো প্রাণীটা। রেমি আরো একবার তার কানের পিছনে চুলকে দিয়ে পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। যোলতানও লেগে আছে তার সাথে সাথে। গিয়ে বসলো কুকুরের বিস্কুট রাখা ক্যাবিনেটটার সামনে গিয়ে। বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রেমির দিকে।

কয়েক মুহূর্ত পর সেলমাও পা ফেললো রান্নাঘরে। কালো একটা ইয়োগা প্যান্ট এবং সচারচের মতোই বহুরঙা একটা শার্ট পরে রেখেছে ও। এখনের শার্টটা সবুজাভ নীল এবং উজ্জ্বল গোলাপি রঙের। ছোটো করে ছাটা তার বাদামি চুলগুলোকে বরাবরের থেকে একটু বেশি খাড়া দেখাচ্ছে। এমনকি চেইন লাগানো চশমাটাও নেই তার চোখে। এর বদলে মোটা ফ্রেমের একটা সানগ্লাস লাগিয়ে রেখেছে এখন।

মি, অ্যান্ড মিসেস ফার্গো। ওয়েলকাম হোম।

আর স্যাম ভেবেছিলো মেয়েটাকে হয়তো অবশেষে তার প্রথম নাম ধরে ডাকার ব্যাপারে রাজি করাতে পেরেছে। ফর্মালিটিতেই ফিরে গেলে? বলল ও। স্যাম ও রেমি বলে ডাকা কই গেলো?

অনেক চেষ্টা করেছি, মি. ফার্গো। অস্বস্তি লাগে। আমি আপনাদের হয়ে কাজ করি। ফর্মালিটিতে ডাকতেই ভালো লাগে আমার।

তাহলে আমাদেরও তাই ভালো লাগবে, রেমি বলল।

রেমির দিকে তাকালো সেলমা। যোলতানকে দ্বিতীয় আরেকটা বিস্কুট খাওয়াতে দেখে বলল, আপনি তো দেখি কুকুরটাকে মোটা বানানোর তালে আছেন, মিসেস ফাগো।

কই? সে পারফেক্টলি ফিট আছে।

এর কারণ, আপনারা বাড়িতে থাকার সময় আমি ওকে দ্বিগুণ সময় ধরে বাইরে হাঁটাই। আপনারা তো ওকে খাওয়ানোয় কোনো কার্পণ্যই করেন না। তাই কারো একজনের তো বেচারার স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে বলে হলওয়ের কাছে থাকা ক্যাবিনেটটা খুলে শিকল বের করে আনলো সেলমা ষোলন শিকলের শব্দ পেয়েই উত্তেজিত হয়ে দৌড়ে চলে এসেছে সেলমার কাছে। সেলমা উবু হয়ে প্রাণীটার কলারে শিকল লাগাতে লাগাতে বলল, বিচের দিকে যাচ্ছি আমরা। দরকার লাগলে ওখানেই পাবেন।

বইটার ব্যাপারে বলো। রেমি জানতে চাইলো। ওটাতে অদ্ভুত কিছু চোখে পড়েনি?

সাথে সাথেই কিছু পড়েনি। তবে লাযলো বেশ মুগ্ধ হয়েছে, বলল সেলমা। সে আসলে লায়লো কেম্পের কথা বলছে। সেলমাকে গবেষণার কাজে সাহায্য করার জন্য তাকে নিয়োগ করেছে ওরা। সাথে সাথে নিজেও অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছে। মেক্সিকোয় কেটজালকোয়াটলের সমাধি অন্বেষণের সময় গুরুতর সাথে আহত হয়েছিলো লাযলো। লোকটাকে সেলমার সাথে মিশে যেতে দেখে বেশ অবাকই হয়েছে ওরা। সেলমার স্বামী ছিলো একজন পাইলট, লোকটা মারা গেছে প্রায় দশ বছরের মতো। তারা অবশ্য এটা নিশ্চিতভাবে জানে না যে লাযলোর ব্যাপারে সেলমার অনুভূতি কী। তবে তাদের সম্পর্কটা এভাবে আপনগতিতে এগিয়ে যেতে দেখে বেশ খুশি ওরা। যদিও সম্পর্কের ব্যাপারটা আন্দাজে ধরে নিয়েছে ওরা।

কুকুরের বিস্কুটের বাক্সটা ক্যাবিনেটে রাখতে রাখতে রেমি সেলমার কাছে জানতে চাইলো, তো, লাযলোর মন্তব্য কী বইটার ব্যাপারে?

বলেছে– সে বইয়ের ব্যাপারে এতো ভালো করে কিছু জানে না। তাই বলতে পারছে না এটার জন্য আসলেই কাউকে খুন করা সম্ভব কিনা। এটা তার ফিল্ডের কিছু নয়। তবে বইয়ের ব্যাপারে আলোচনার জন্য ইয়ান। হপকিন্সের সাথে আপনাদের মিটিংর ব্যবস্থা করেছে ও। লাযলোর মতে এই বিষয়ে আলোচনা করার মতো হপকিন্সই দক্ষ ব্যক্তি। আর এছাড়া অন্য কাউকে এতো স্বল্প সময়ে পাওয়াও সম্ভব না। হয়তো রিটায়ার্ড প্রফেসর হওয়াতেই পাওয়া গেছে তাকে। তবে কপাল খারাপ, তিনি এখন অ্যারিজোনার ফিনিক্সে আছেন।

সমস্যা নেই, রেমি বলল। শরতের অ্যারিজোনা ভালো লাগে আমার। বলে স্যামের দিকে তাকালো। আশা করছি এতে তোমার পরিকল্পনার খুব একটা ব্যাঘাত ঘটছে না?

আমার পরিকল্পনার সৌন্দর্যতাই হলো এর পরিবর্তনশীলতা, বলল স্যাম।

তোমার আসলে কোনো প্ল্যানই নেই, তাই না?

এই তো কথার ফাঁকফোকর ধরা শুরু করলে। বলে সেলমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তো, এই রহস্যময় বইটা কই আছে এখন?

আপনার সেফে রেখে দিয়েছি।

যাই, গিয়ে দেখে আসি একটু।

নিয়েই আসো সাথে করে, রেমি বলল। একসাথেই দেখবো।

সেফ থেকে বইটা বের করলো স্যাম। এখনো ফেডএক্সের বাক্সেই মোড়ানো আছে বইটা। সে নিশ্চিত না সেলমা কেন এই বইটাকে সেফে রেখে দিয়েছে। হয়তো এটা কিনতে গিয়ে ডাকাতের শিকার হওয়া এবং বিক্রেতা মি, পিকারিংর আকস্মিক হার্টঅ্যাটাকের কারণেই এমনটা করেছে।

বইটা নিয়ে পুনরায় ফিরে আসতেই দেখতে পেলো রেমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সত্যি বলতে সে আসলে ড্রাইভওয়ে ধরে হেঁটে যাওয়া সেলমা ও ঘোলতানকে দেখছে। সূর্যের আলোয় যেতেই মনে হচ্ছে, তার চুলগুলো আসলেই তার শার্টের সাথে ম্যাচ করেছে। গোলাপি এবং নীলচে আভা।

স্যামও তাকালো বাইরের দিকে। রেমির কথাই ঠিক। চমৎকার একটা মিল দেখা যাচ্ছে সেলমার চুলের সাথে তার পোশাকের। আগে এই ঝলকানিটা ছিলো না। ভাবতেই অবাক লাগে, আমাদের সেলমা আগে তার অস্তিত্বও দেখাতে চাইতো না। তোমার কী মনে হয়—

লাযলো? রেমি শেষ করে দিলো বাক্যটা।

চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেলমা আর কুকুরটার দিকেই তাকিয়ে রইলো ওরা। তারপর মনোযোগ ফিরালো বইটার ওপর। ফেডএক্সের খাম থেকে বের করে কিচেন টেবিলের ওপর বইটা রাখলো স্যাম। তারপর ওপরের বাদামি কাগজের প্রলেপটা খুলতেই চামড়ার প্রচ্ছদের ওপর সোনালি হরফে লেখা শিরোনামের বইটা উন্মোচিত হলো তার চোখের সামনে। সে এখন বুঝতে পারছে রেমি কেন এটার প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলো। কালেকশনের রাখার মতো খুবই ভালো একটা বই খুঁজে বের করেছে।

ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করতে করতে রেমি বলল, এটায় অ্যান্টিক ভাব ফুটানোর জন্য বেশ কষ্ট করেছে ওরা। খরচ কম রাখার জন্য চীন থেকে ছাপিয়ে এনেছে।

মি. পিকারিং বলেছে এটা কপি?

দুই গ্লাস পানি ঢেলে নিলো রেমি। হ্যাঁ, অনেকগুলো কপির একটি। কেন?

স্যাম তার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার মনে হয় তোমার আরো একবার ভেবে দেখা উচিৎ।

খুবই তৃষ্ণার্ত আমি।

আমি বইটার ব্যাপারে বলছি। রেমিকে বইটা দেখানোর জন্য পাশে সরে গেলো স্যাম। এটা কোনোভাবেই চীন থেকে আনা নকল কপি না, রেমি। এটা একদম অরিজিনাল।

০৬. ক্ষয়ে যাওয়া চামড়ার বাইন্ডিং

০৬.

বেশ কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রেমি। আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাওয়া চামড়ার বাইন্ডিং, সোনালি হরফের শিরোনাম, লালচে-সোনালি কাগজগুলো চোখে পড়ছে তার। মলাট উল্টিয়ে দেখলো পাতার অক্ষরগুলো কেমন যেন ভাঙা ভাঙা। এটা দেখেই বুঝা যায় যে এটা বর্তমান যুগের লেজার প্রিন্টারে ছাপানো হয়নি। মি, পিকারিং কিন্তু আমাকে এই বইটা দেখায়নি।

তাহলে এটা তোমার কাছে আসলো কিভাবে?

আমি জানি না। এটার জন্য আমি ঊনপঞ্চাশ ডলার আর ট্যাক্সই দিয়েছি শুধু। আমি হাত বাড়িয়ে বইটা স্পর্শ করতে গিয়েও থেমে গেলো রেমি। আমাদের গ্লাভস লাগিয়ে নেওয়া উচিৎ।

থামো, থামো। এটার জন্য তুমি মাত্র ঊনপঞ্চাশ ডলার খরচ করেছো মাত্র? নাকি তুমি দশমিকের আগে কয়েকটা শূন্য বসাতে ভুলে গিয়েছিলে?

না। তবে বন্দুকওয়ালা দোকানে আসতেই মি. পিকারিং আমার হাত থেকে পুনর্মুদ্রিত বইটা কেড়ে নিয়ে বলেছিলো, বইটা র‍্যাপ করতে নিয়ে যাচ্ছে। এই বইটা কিন্তু আমার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া ঐ বইটা না।

তোমার কি মনে হয় মি. পিকারিং প্যাক করে দেওয়ার নাম করে সেফ থেকে বইটা বদলে দিয়ে

খুব সম্ভবত তাই ঘটেছে। তিনি হয়তো ডাকাতটাকে দোকানে দেখেই তার মতলব বুঝে ফেলেছিলেন, এখনো টেবিলের ওপর রাখা মোটা বইটার দিকেই তাকিয়ে আছে ও। বইটাকে দেখে এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না যে ওটা অরিজিনাল কপি। পুলিশকে ফোন করে এটা জানানো উচিৎ আমাদের।

অবশ্যই জানানো উচিৎ। তবে আমরা যদি তা করি, তাহলে কিন্তু তারা এটা দেখতে চাইবে। আর এই মুহূর্তে আমি এই বইয়ের বিশেষত্ব জানার ব্যাপারেই বেশি উদগ্রীব হয়ে আছি।

তাহলে কি এটা প্রথমে ফিনিক্সের বিশেষজ্ঞের কাছেই নিয়ে যাবো?

হ্যাঁ, আগে আমরা জানি এটার ব্যাপারে। তারপর পুলিশকে জানাবো।

****

পরদিন সকালেই প্রফেসর ইয়ান হপকিন্সের সাথে দেখা করার জন্য ফিনিক্সে যাত্রা করলো ওরা। প্রফেসর বর্তমানে মোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দী ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছেন। এছাড়া অবসরের পর থেকে শখ হিসেবে পুরোনো অ্যান্টিক বই মেরামতের কাজও হাতে নিয়েছেন।

ফার্গোরা যখন ওখানে পৌঁছুলো তখনও তিনি এই কাজই করছিলেন। তাদেরকে হেঁটে আসতে দেখে চোখ তুলে তাকালেন তাদের দিকে। চোখে কালো-ফ্রেমের একটা রিমড গ্লাস পড়ে রেখেছেন উনি। আপনারাই নিশ্চয় মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো?

হ্যাঁ, স্যাম বলল। তবে আমাদেরকে তুমি করেই ডাকুন। স্যাম ও রেমি বলে ডাকলেই খুশি হবো।

আচ্ছা, আমি ইয়ান, বলে উঠে দাঁড়িয়ে তাদের দুজনের সাথেই হাত মেলালেন প্রফেসর। তো, আমার বন্ধু লাযলো বলল তোমাদের কাছে নাকি দ্য হিস্ট্রি অফ পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ার্সর অরিজিনাল কপি আছে?

খুব সাবধানে তার ব্যাগ থেকে বইটা বের করে টেবিলের ওপর রাখলো রেমি। আমরা জানতাম না যে এটা আসলেই অনেক মূল্যবান কিনা, তবে মনে হচ্ছে কারো কাছে এটা খুবই মহামূল্যবান কিছু।

আগে একবার দেখে নেওয়া যাক। বলে সাদা গ্লাভস বইটা টেবিল থেকে হাতে তুলে নিলেন প্রফেসর। নেড়েচেড়ে দেখছেন। চামড়ার বাইন্ডিং ও স্পাইনের পুরোটাই এখনো ঠিকঠাক আছে। সামনে-পিছনের স্বর্ণখচিত প্যাটার্নগুলোও এখনো চকচক করেছে… পাতার ধারের অংশটা একটা মসৃণ হয়ে গেছে, তবে ক্ষয়ে যায়নি…। বইটা টেবিলের ওপর রেখে মলাটটা উল্টালেন। এটা…, বলে প্রথম পাতায় থাকা ম্যাপটার ওপর আঙুল বুলিয়ে নিলেন কিছুক্ষণ, তারপর বইটা উলটে শেষ পাতায় থাকা ম্যাপটাও একই কাজ করলেন। এই দুই পাতাই বইয়ের এই নির্দিষ্ট কপিটাকে মূল্যবান কিছুতে পরিণত করেছে। আমি যতগুলো কপি দেখেছি সেগুলোর বেশিরভাগেরই এই এন্ডপেপারগুলো নেই। তোমরা কি খেয়াল করে দেখেছো যে ম্যাপ দুটো এক না? সামনেরটা কিন্তু পিছনেরটা থেকে আলাদা। প্রথম দেখায় কিন্তু কেউই এটা ধরতে পারবে না।

কেন ওগুলো খুলে নিবে কেউ? রেমি জানতে চাইলো।

আমার মনে হয় ম্যাপগুলো আসলেই বইয়ে বর্ণনা করা জলদস্যুদের ম্যাপ। তবে যেহেতু বর্তমানটাসহ পরবর্তী সংস্করণগুলোতে এই এন্ডপেপারগুলো নেই, তাই মনে হচ্ছে কেউ ভাবছে এই পুরোনো এন্ডপেপারগুলো হয়তো বইটাকে সুন্দর একটা সাজ দিবে। গতবছর ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে একটা কপির এন্ডপেপার চুরি যাওয়ার পর এক লেখক এই মন্তব্যই করেছে। ক্যামেরা থাকার পরও শুধু এন্ডপেপার চুরিটাকে বেশ সাহসিক কাজই বলা যায়। বলে হাতে থাকা বইটার এন্ডপেপারের প্রান্ত ধরে একটু টান দিতেই হালকা একটু সরে গেলো কাগজটা। তবে এমন না যে পাতাটা ছোটানো খুব কঠিন একটা কাজ। নিজেরাই দেখো এই কপির আঠাও কিন্তু ছুটে গেছে।

সেলমা ও লায়লোর বলা ছোটোখাটো ত্রুটিটা দেখতে পেলো স্যাম। বলল, এই পাতাগুলো যদি অক্ষতও থাকতো তাহলে কি আপনার মনে হয় এটার মূল্য কিছুটা বাড়তো? মানুষ খুন করার মতো মূল্য হতো কি?

এক মুহূর্তের জন্য স্যামের দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রফেসর। কিছুটা চমকিত দেখাচ্ছে তাকে। আমার দৃষ্টিতে না। এই কপিটা নিশ্চিতভাবেই বেশ চমৎকার একটা কপি, এর থেকেও অনেক অনেক মূল্যবান বই রয়েছে। আমার মনে হয় কেউ হয়তো বইটা তার সংগ্রহে যুক্ত করতে চাচ্ছে।

কতো দাম হতে পারে? রেমি জানতে চাইলো। যেহেতু আপনি একজন সংগ্রাহক এবং এটা চাইছিলেন।

যদি ধরে নিই বইয়ের অন্যান্য অংশও অক্ষত আছে এবং কোনো কিছুই মিসিং নেই… তাহলে কত? চার, পাঁচ হাজার ডলারের মতো হবে।

মাত্র? স্যাম বলে উঠলো।

এটা আসলে খুব একটা বিরল বইও না। শুধু পুরোনো বই। আর বিষয়বস্তুর জন্য এটা শুধু সমুদ্র ও জলদস্যুপ্রেমী সংগ্রাহকদের কাছেই আগ্রহের কিছু হতে পারে। তাই, হ্যাঁ, পাঁচ হাজারের থেকে বেশি হবে না। আর এটাও হতো যদি এন্ডপেপারগুলো অক্ষত থাকতো।

তারপরও, রেমি তার ভ্রু কুঁচকে বলল, দামটা কম না। যেখানে আমার এটা কিনতে পঞ্চাশ ডলারও খরচ করতে হয়নি। তবে কপাল খারাপ। আমার মনে হয় বইটা পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।

কিসের জন্য? প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন। তুমি যদি দাম দিয়ে থাকো, তাহলে তো আইনত বইটা তোমারই।

বইটা কিভাবে তার হাতে এসেছে সেটা প্রফেসরকে ভেঙে বলল রেমি।

সব শুনে বইটার ওপর গ্লাভস পরা আঙুল বুলাতে বুলাতে প্রফেসর বললেন, বইটা কেনার পিছনে দেখি বেশ ভালোই ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

হ্যাঁ, এর জন্যই মনে হচ্ছে যে আমরা হয়তো কিছু এড়িয়ে যাচ্ছি, রেমি বলল।

আসলেই এড়িয়ে যাচ্ছি, স্যাম যোগ করলো। আমাদের হোটেল রুমে দুই ডাকাত আক্রমণ করেছিলো। তারা কী যেন একটা চাবির কথা বলাবলি করছিলো।

ঝট করে তার দিকে চোখ তুলে তাকালেন প্রফেসর। চাবি? কিসের চাবি?

আমরা আশা করছি, স্যাম বলল, আপনি হয়তো ওটা বের করতে পারবেন। অন্য বইগুলোর থেকে কি এই বইটায় আলাদা কিছু আছে? অদৃশ্য লেখা? অথবা অন্যান্য কপির থেকে ভিন্ন কাগজ?

আরো ভালো ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে তাহলে। বিভিন্ন আলোর নিচে নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। প্রতিটা পৃষ্ঠারই ছবি তুলতে হবে যাতে পরবর্তীতে তোমরা পার্থক্যটা ধরতে পারো। অবশ্যই, এই কাজটার জন্য একটা ফি দিতে হবে তোমাদের। খরচের পরিমাণ বাড়লো আর কী তোমাদের।

স্যাম তার ওয়ালেটটা বের করে বলল, আপনার স্ট্যান্ডার্ড ফি কত?

ঘন্টায় একশো পঁচিশ ডলার। অবশ্য বইটা বেশি বড়ো না। এর জন্য মনে হয় না খুব বেশি একটা সময় লাগবে। বড়োজোর ঘণ্টাদুইয়েক।

ওয়ালেট থেকে পাঁচশো ডলারের নোট বের করে স্যাম বলল, এটা দিয়ে কি কাজটাকে তালিকার প্রথমে নিয়ে আসা যায়?

আমার ক্লায়েন্টকে একটা কল করি তাহলে। বলি যে তার কাজটা শেষ হতে কিছুটা সময় বেশি লাগবে।

ধন্যবাদ সেটার জন্য। ঘড়ি দেখলো স্যাম। প্রায় সাড়ে এগারোটার মতো বাজে। রেমিকে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে চলো প্রফেসরের কাজ করার ফাঁকে লাঞ্চটা সেরে আসি?

অবশ্যই, বলল রেমি। তারপর প্রফেসর হপকিন্সের দিকে তাকিয়ে বলল, কোনো রিকেমেন্ডেশন, প্রফেসর?

এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে একটা চমৎকার ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। মার্সেলিনো রিস্টুরান্টে নাম। খুবই নামকরা জায়গা। সত্যি বলতে, তোমরা চাইলে কাজ শেষে বইটা নিয়ে ওখানেও যেতে পারবো আমি। আমার যে ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করার কথা তিনিও ওদিকেই থাকেন।

চমৎকার, রেমি বলল। তাহলে ওখানেই দেখা হচ্ছে।

****

ওল্ড টাউন স্কটসডেলের জলপ্রপাতের ধারেই অবস্থিত রেস্টুরেন্টটা। পরিবেশটা চমৎকার। স্যাম আগে আগে গিয়ে পেটা লোহার গেটটা ধরে রাখলো রেমির জন্য। তারপর কাঁচের দরজাটা। ভাজা রসুন এবং তাজা উদ্ভিদের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে জায়গাটা। তারা ভিতরে ঢুকতেই সিমা নামের এক মহিলা অভ্যর্থনা জানালো ওদের। তাদেরকে টেবিলে বসার জন্য অনুরোধ করে বলল, বুন অ্যাপেতিতো।

জানালার ধারে থাকা দুটো খালি টেবিল দেখতে পেলো ওরা। জানালাটা দিয়ে বাইরের প্রাঙ্গণটা দেখা যায়। বাম পাশের টেবিলটার ওপরে ছোটো একটা প্ল্যাকার্ডে রেখা রয়েছে লেখক ও গুণী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত আসন। তাই এগিয়ে গিয়ে ডান পাশের টেবিলটায় বসলো রেমি। মেনু দেখে তাজা পনির, বাগানে ফলানো টমেটো, লাল মরিচ এবং পুদিনা পাতায় তৈরি ইসালাতা কাপ্রিজি এবং সাদা ওয়াইন কোজি ই বিয়াঙ্কো অর্ডার করলে রেমি। স্যাম খাওয়ার জন্য বেছে নিলো আরুগুলার ওপরে বিছানো কাছা অহ্য টুনা মাছ, ঝলসানো স্যামনে তৈরি কারপাচ্চিও নামের একটা ডিশ এবং টেবিলের জন্য অর্ডার করলো ধবধবে সাদা ওয়াইন ফালানঘিনা নুদো এরোইকো।

ওয়াইন এসে পৌঁছাতেই রেমি তার গ্লাসটা স্যামের উদ্দেশ্যে উঁচিয়ে ধরে টোস্ট করলো, আশা করছি প্রফেসর হপকিন্স রহস্যময় চাবিটা খুঁজে বের করতে পারবে।

আমিও।

তাদের খাওয়া শেষ শেফ মার্সেলিনো এগিয়ে এলো তাদের দিকে। তাদেরকে স্বাগতম জানালো। লোকটায় গলায় কড়া ইতালিয়ান টান লেগে আছে। আপনারা হয়তো আমার সুন্দরী বধূর সাথে ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়েছেন, বলে সিমার দিকে ইশারা করলো শেফ। আশা করছি আপনারা হয়তো লাঞ্চটা উপভোগ করেছেন। তো, খাওয়া শেষে ডেজার্ট নেওয়ার ইচ্ছা। আছে কি?

খাবারটা চমৎকার ছিলো, রেমি জানালো৷ ডেজার্ট…? কথা শেষ না স্যামের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু।

আমি সবসময়ই সুন্দরী রমনীর সাথে টিরামিসু শেয়ার করায় রাজি থাকি। (টিরামিসু-ইটালিয়ান ডেজার্ট।)

আচ্ছা, তাহলে, শেফের দিকে ঘুরে বলল রেমি। একটা ডেজার্টের অর্ডার দিচ্ছি আমরা।

এক্ষুণি নিয়ে আসছি, হালকা মাথা নত করে টেবিলের কাছ থেকে সরে গেলো মার্সেলিনো। তার গাঢ় চোখগুলো চকচক করছে যেন। কিছুক্ষণ পরই আবার ফিরে এলো টিরামিস নিয়ে। তাদেরকে উপভোগ করতে বলে আবারো টেবিল ত্যাগ করলো লোকটা।

চামচ দিয়ে ডেজার্টের প্রথম টুকরোটা মুখে তুলে নিলো রেমি। নিখুঁত স্বাদে মুগ্ধ ও। ইতালির পর এটাই দেশটার সবচেয়ে বড়ো সম্পদ।

এটা নিশ্চিতভাবেই গত মাসে রোমের ডোমাস মাগ্লানিমিতে তে খাওয়া টিরামিসুটার মতো অতোটা ভালো নয়, তবে… বলতে বলতে চামচভর্তি করে মুখে তুলে নিলো স্যাম। ওয়াইনের সাথে সাথে তৃপ্তির সাথে গিলে নিচ্ছে খাবারটা। চোখ বন্ধ করে উপভোগ করার পর বাক্যটা শেষ করলো, তবে আমার মনে হয় আমাদের দুটো প্লেট নেওয়া উচিৎ ছিলো।

দ্বিতীয় আরেকটা টুকরো নিতে চাচ্ছিলো রেমি, ঠিক তখনই দেখতে পেলো প্রফেসর হপকিন্স মোড়কাবৃত বইটা নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকছেন। ঢুকে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিকে তাকালেন প্রফেসর। তারপর তাদেরকে চোখে পড়তেই হেঁটে আসলেন তাদের দিকে। তোমাদের খাবারের সময় বিরক্ত করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

বসুন, প্লিজ, স্যাম বলল। আমাদের খাওয়া শেষ অনেক আগেই। তবে টিরামিসুকে আসলে ঠিক মানা করতে পারছিলাম না।

মনোয়োম পরিবেশ, তাই না? চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন প্রফেসর।

খুবই চমৎকার, বলে প্রফেসরের হাতে থাকা প্যাকেজটার দিকে তাকালো স্যাম। বলল, কিছু পেয়েছেন ওটাতে?

প্রথমে কিছুই পাইনি। বইটার অবস্থা এখনো চমৎকার। অবশ্যই আমি প্রতিটা পৃষ্ঠা পরীক্ষা করে দেখেছি। তীর্যক আলো, কৃষ্ণ আলোসহ বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর নিচে নিয়ে দেখেছি। কোনো পৃষ্ঠার কোনো কিছুতেই চাবি আছে বলে কিছু মনে হয়নি। এটাই তো খুঁজছিলে তোমরা?

মাথা ঝাঁকালো রেমি ও স্যাম।

আমার এক ফ্রেন্ডের মেটাল ডিটেক্টর ছিলো। তাকে নিয়ে এসে ডিটেক্টরের নিচেও বইটা পরীক্ষা করিয়েছি। আমার ধারণা ছিলো চাবিটা হয়তো বাইন্ডিংয়ের মধ্যে আছে, ডিটেক্টরের নিচে নিলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু কিছুই পাইনি। তখনই বুঝতে পারলাম যে চাবিটা আসলে ধাতব কোনো বস্তুই নয়। বইটা আসলে জলদস্যু এবং তাদের ম্যাপ নিয়ে লেখা। তাহলে ম্যাপেই চাবি কেন থাকবে না?

মাথা ঝাঁকালো রেমি। হ্যাঁ, এটার সম্ভাবনা আছে।

তাই আমি আবার প্রতিটা পৃষ্ঠা ঘেটে দেখছি। তোমরা যেমনটা চেয়েছিলে, অন্য কপির সাথে তুলনা করার জন্য ছবিও তুলে নিয়েছি সবগুলোর। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমার কাছে বর্তমানে অন্য কোনো কপি নেই। ভাবলাম তোমরা হয়তো পরে আমার বানানো ডিজিটাল কপিটা দিয়ে তুলনা করে নিতে পারবে। হয়তো দেখতে পাবে এই এডিশনে এমন কিছু লেখা আছে যেটা অন্য কোনোটায় নেই। বিশেষ করে যে পৃষ্ঠাগুলোতে ম্যাপের ছবি আছে সেগুলো। বইয়ে পরবর্তীতে কিছু যোগ করা হয়েছে কিনা তার জন্য বইয়ের কালিও পরীক্ষা করে দেখেছি… বলে বাক্সটায় একটা চাপড় দিয়ে গভীর শ্বাস নিলেন প্রফেসর। যাই হোক, চাবি অন্বেষণের ব্যাপারে ফিরে যাই আবার। যখন আমি বুঝলাম যে জিনিসটা আমার সামনেই আছে, তখন মনে হলো যে আমি কেন এটা আগে ধরতে পারিনি। বলে প্রথমে রেমি এবং পরে রেমির দিকে তাকালেন তিনি। কিন্তু আর কিছু বললেন না।

প্রফেসরের হুট করে থেমে যাওয়ায় মনে মনে ছটফট করতে শুরু করেছে রেমি। কোনোরকমে স্বাভাবিক স্বরে বলল, আসলে কোন ব্যাপারটা আপনি আগে ধরতে পারেননি?

অন্যান্য কপিগুলোতে কেন এন্ডপেপারগুলো নেই। আমি জানি তারা কিসের খোঁজ করছে।

.

০৭.

প্রফেসর হপকিন্স একটা ম্যানিলা খাম খুলে বললেন, এটা লুকানো ছিলো এন্ডপেপারের পিছনে।

আমি কি দেখতে পারি? হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

অবশ্যই।

হাতে নিয়ে কাগজটা মেলিয়ে ধরলো স্যাম, যাতে রেমি ও সে একসাথেই দেখতে পারে। একটা হলুদ পার্চমেন্ট রয়েছে খামের ভিতরে। পার্চমেন্টট বইয়ের মলাটের সমানই বড়ো, কালো কালি দিয়ে কিছু একটা আঁকা রয়েছে কাগজটায়। চিত্রটা একটা দ্বীপের মানচিত্র। এর পাশেই রয়েছে চিহ্ন সম্বলিত একটা বৃত্ত, এবং ওপরে আছে একটা বর্গাকার চিহ্ন, কিছু একটা লেখা আছে। চিহ্নটার নিচে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই স্যাম বুঝতে পারলো যে ওটা একটা পূর্ণাঙ্গ বর্ণ। সাইফার হুইল? প্রফেসরের কাছে জানতে চাইলো।

ওটারই একটা চিত্র, প্রফেসর জানালেন। এটার পিছনেই ছুটছে ডাকাতেরা। যদি আগে চুরি এবং এন্ডপেপার ধ্বংসের খবরগুলো প্রকাশ না হলে-এটা কারো নজরেই আসতো না। সত্যি বলতে, আমি তোমাদেরকে জিজ্ঞেসই করতে যাচ্ছিলাম যে ছুটে যাওয়া এন্ডপেপারটা আবার আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিবো কিনা। ঠিক তখনই জিনিসটা চোখে পড়লো।

সামনে ঝুঁকে বইটাকে আরো কাছ থেকে দেখে রেমি বলল, আমি ভাবছি মি. পিকারিং বইটা আমাকে দেওয়ার সময় এর ভিতরে থাকা কাগজটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন কিনা!

ভালো একটা প্রশ্ন, ভাবলো স্যাম। তবে সে এখনই ওটা নিয়ে কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছি না, প্রফেসর হপকিন্সের দিকে তাকিয়ে বলল শুধু।

যেহেতু তোমরা আমাকে সাধারণের থেকে দ্বিগুণ ফি দিয়েছে, তাই ধরা যায় ওটাতেই ধন্যবাদ বলা হয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই চমৎকার একটা রহস্য পেয়ে গেছে তোমরা।

হঠাৎই রেমির ফোনে আলো জ্বলে উঠলো। একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ফোনটা উলটে রাখলো শুধু। মূল্যবান সময় ব্যয় করে আমাদের কাজটা করে দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

প্রফেসর মুচকি হেসে বললেন, আর আমারও পরবর্তী অ্যাপোয়েন্টমেন্টের সময় হয়ে গেছে প্রায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে হাত মেলানো শেষে আবার বললেন, তাহলে লাঞ্চ উপভোগ করতে থাকো। উঠলাম আজ।

প্রফেসর চলে যেতেই রেমি তার ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো। ব্রি মেসেজ দিয়েছে।

কী লিখেছে? স্যাম জিজ্ঞেস করলো।

যত দ্রুত সম্ভব তাকে কল করতে।

বিলের চেক দিতে বলে তাড়াতাড়ি করে ডেজার্টটা শেষ করে নিলো দুজন। বিল আসতেই মোটা অঙ্কের টিপসহ বিল পরিশোধ করে তাড়াতাড়ি করে দৌড় লাগালো ভাড়া করা গাড়িটার দিকে।

গাড়িতে উঠে রেমি ফোন দিলো ব্রিকে। লাউডস্পিকার অন করে কথা বলছে ও। ব্রি? ঠিক আছে তুমি? তোমাকে না পেয়ে বেশ দুঃশ্চিন্তায় আছি আমরা।

আমি ঠিক আছি। এখন। আ-আমি নর্থ ক্যারোলিনায় আছি।

নর্থ ক্যারোলিনা?

কাজিনের কাছে এসেছি। তার বাবার ব্যাপারে খবরটা জানাতে।

আমরা খুবই খুবই দুঃখিত, ব্রি।

আমি জানি। এখন শুনুন। আমি শুধু ভাবছি-আমার আঙ্কেল কি আপনাকে ঐ বইটা দিয়েছিলো? যখন আপনি ওখানে গিয়েছিলেন? পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ার্স?

স্যামের তাকালো রেমি। বলতে কিছুটা দ্বিধা লাগছে ওর। কোনোরকমে বলল, আমি তার থেকে একটা কপি কিনেছি। কেন?

আমার কাজিন… মানে মেয়েটা খুবই ভেঙে পড়েছে। আসলে আঙ্কেল নাকি বইটা তাকে দেওয়ার প্রমিজ করেছিলো। আর আমিও আশা করছি বইটা হয়তো তার হাতে তুলে দিতে পারবো। বাবাকে মনে রাখার স্মৃতিস্মারক বলতে পারো।

তোমার চাচার সাথে যা হয়েছে, তাই আমরা ভাবছিলাম বইটা পুলিশের হাতে তুলে দিবো।

না! প্লিজ…

ব্রি? তুমি নিশ্চিত যে তুমি ঠিক আছো?

আ… হ্যাঁ। শুধু ভেবে দেখুন ঘটনাটা আমাদের জন্য কতটা ভয়ানক। আর বইটা আমার কাজিনের জন্য অনেক বড়ো কিছু এখন। আপনি যদি এটা পুলিশের হাতে তুলে দেন, তাহলে এটার জন্য আদালতেও যেতে হতে পারে। সে এখন এতো ভ্রমণের জন্য আসলে প্রস্তুত না। আর… কথা শেষের আগেই কান্না ভেঙে পড়লো ব্রি। কয়েকসেকেন্ড কাঁদার পর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, স্যরি। ঘটনাটা খুবই ভয়ানক আমাদের জন্য।

তোমাকে সাহায্য করার জন্য কী করতে পারি আমরা? রেমি জিজ্ঞেস করলো।

আমি আশা করছি বইটা মেইল করে পাঠিয়ে দিতে বললে ক্ষুব্ধ হবেন না আপনারা। বাবার স্মৃতিস্মারক হিসেবে বইটা রাখতে চাচ্ছে ও।

অবশ্যই। ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো কিছু বলোনি তুমি। বুঝেছি ব্যাপারটা। তবে মেইল না, স্যাম আর আমি নিজ হাতেই নিয়ে আসবো বইটা।

না। আপনাদের এটা করতে বলতে পারি না আমি। এটা অনেক বেশি হয়ে যায়।

আমরাই জোর করছি, স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল রেমি। স্যামও ওদিকে সাড়া দিয়েছে রেমির প্রস্তাবে। এই বইটা আসলে অনেক মুল্যবান। পোস্ট অফিসে করে পাঠানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি না আমরা। তোমার ঠিকানাটা মেসেজ করে দাও। কালকের ভিতরেই পৌঁছে যাবো আমরা।

অবশ্যই, পাঠাচ্ছি। ধন্যবাদ…

কথা শেষের আগেই আবারো ফুপাতে শুরু করলো ব্রি। রেমি তাকে আশ্বস্ত করে বলল, কালই আসছি আমরা। আর তোমার বোনকে আমাদের সমবেদনা জানিও।

পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করে রাস্তায় নিয়ে এলো স্যাম। ব্যস্ত রাস্তার ওপর দিয়ে ড্রাইভ করে যাচ্ছে। ব্রির সাথে রেমির কথা শেষ হওয়ার পর মন্ত ব্য করলো, খুব ভেঙে পড়েছে ও।

স্বাভাবিক, রেমি বলল। প্রথমে হল ডাকাতি, তারপর হার্ট অ্যাটাক। মি. পিকারিংর মেয়ের কী অবস্থা তা ভাবতেও পারছি না এখন। দেখতে আসার মতো অবস্থাটাও নেই। যাক, অন্ততপক্ষে ব্রি তো আছে এখন ওর সাথে।

বইটার ব্যাপারে…?

ওটা নিয়ে আমিও ভাবছি। আমার মনে হয় পিকারিংর মেয়েকে বইটা অন্তত দেখানো উচিৎ আমাদের। তারপর নাহয় সিদ্ধান্তটা ও ই নিবে। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তো তার সিদ্ধান্তের মূল্যটাই অগ্রাধিকার পাবে। অন্ত তপক্ষে এতে করে তো আমরা বুঝাতে পারবো বইটা কেন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া উচিৎ আমাদের।

সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে থাকায় গাড়ি থামালো স্যাম। স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়ে আবারো চোখ ফিরিয়ে আনলো রাস্তার ওপর। আমার মনে হয় নর্থ ক্যারোলিনা ভ্রমণের জন্য আমাদের ফ্লাইটের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে।

****

ব্যক্তিগত জেট বিমান থাকার সুবিধা এটাই যে যখন খুশি তখন পরিকল্পনা বদল করা যায়। সেলমা ওদের জন্য ওখানে হোটেল ও রেন্টাল কারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রাতে ভালো একটা ঘুম এবং সকালে হালকা নাস্তা খেয়ে গাড়িতে করে ব্রির মেসেজ পাঠানো ঠিকানাটায় রওনা করলো ওরা। রেমি অবশ্যই সেলমার মাধ্যমে অবস্থানটা আসলেই সঠিক কিনা সেটা খতিয়ে দেখেছে। এটা জেনে স্বস্তি পেয়েছে যে ওখানে বসবাসকারী ল্যারেইন পিকারিং-স্মিথ সত্যিই জেরাল্ড পিকারিংর মেয়ে।

ল্যারেইন হারলো নামের একটা পল্লী এলাকায় থাকে। টোবাকো ফার্মে ঘেরা পূর্বের পথ ধরে মাইলের পর মাইল এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। গন্তব্যে যখন পৌঁছালো তখন তাদের মাথার ওপরের আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। সামনে এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা পার্ক করে পুরো এরিয়াটার ওপর চোখ বুলাযলো স্যাম। সাদা ক্ল্যাপবোর্ডের ফার্মহাউজ এটা। নুড়ি পাথরের তৈরি ড্রাইভওয়েতে একটা কালো এসইউভি দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে ওপরের জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে কেউ একজন দেখছে তাদের। পর্দার হালকা নাড়াচাড়াটা স্যামের নজরেও পড়েছে।

রেমি তার কোলের ওপরে থাকা বইটার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, চলো, জিনিসটা পৌঁছে দিয়ে আসি তাহলে।

তুমি নিশ্চিত এটা তুমি দিয়ে দিতে চাও?

হ্যাঁ। এটাকে প্রমাণ হিসেবে তুলে দেওয়া বা আদালতের কেস বানিয়ে দেওয়ার চেয়ে পিকারিংর মেয়ের হাতে তুলে দেওয়া ভালো। হয়তো বইটা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ সেটা জানাতে পারবে ও।

গাড়ি থেকে নেমে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করলো স্যাম। রেমিও দাঁড়িয়ে আছে তার সাথে। কয়েক মুহূর্ত দরজা খুলে তাদের সামনে উপস্থিত হলো ব্রি। তার চোখগুলো হালকা লাল এবং ফুলে আছে। কোনো সন্দেহ নেই যে সে এতোক্ষণ কাঁদছিলো। মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো… মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলার চেষ্টা করছে ব্রি। বইটা এনেছেন?

বাদামি কাগজে মোড়ানো পার্সেলটা ব্রির হাতে তুলে দিলো রেমি। তোমার কাজিনের কী অবস্থা?

ও… ওর অবস্থা আসলে অতোটা ভালো না। বলে বইটা বুকে জড়িয়ে ধরলো বি। আপনাদেরকে ভিতরে আসতে বলতাম, কিন্তু…

ব্যাপার না, রেমি বলল। আমরা আশা করছিলাম, বইটা কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তুমি জেনে থাকলে যদি আমাদেরকে জানাতে। কেন কেউ একজন এই বইটা খুঁজছে?

আমি জানি না আসলে, হালকা শ্রাগ করে বলল ব্রি। তবে বইটা এত পথ বেয়ে এখানে নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ আপনাদের।

তুমি নিশ্চিত তুমি ঠিক আছো?

মাথা ঝাঁকালো ব্রি।

কেউই আর কোনো কথা বলছে না। নীরবতায় পরিবেশটা কেমন যেন অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। পুরোপুরি অস্বস্তিকর হয়ে উঠার আগেই রেমি এক পা পিছিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে বলল, কোনো কিছুর দরকার লাগলে নির্দ্বিধায় জানিও আমাদেরকে।

সত্যি বলতে একটা কথা জানার ছিলো আসলে। মি, উইকহ্যামের কী অবস্থা? ডাকাতিতে তার তো কোনো ক্ষতি হয়নি?

না।

কিছু বলার আগে একবার বইটার দিকে তাকালো ব্রি। তারপর রেমির দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, তাকে বলবেন আমি তাকে মিস করছি এবং সুযোগ পেলেই তাকে চিঠি লিখব। জানাবেন তো?

অবশ্যই, স্যামের বাহুতে হাত প্যাচিয়ে নিতে নিতে বলল রেমি। আমাদেরও যাওয়া দরকার। লম্বা ফ্লাইট।

স্যামও আলতোভাবে মাথা নেড়ে বলল, বাই।

গুডবাই, বলে দরজাটা লাগিয়ে দিলো ব্রি।

ওদিকে স্যামকে নিয়ে গাড়িতে ফিরেই রেমি বলল, ও বিপদের মধ্যে আছে। শুনানি সে কী বলেছে? আমাকে বলেছে মি. উইকহ্যামকে মেসেজ দিতে। পিকারিংর বিড়ালকে। সংকেত এটা। আমাদের ওখানে গিয়ে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা উচিৎ এখন।

আইডিয়াটা ভালো না, রেমি।

কিন্তু তোমার সাথে তো এখন পিস্তলটা আছে।

আর শত্ৰু কয়জন? আমরা এটাও জানি না যে ওখানে কে আছে এখন। তোমারটাও যদি সাথে থাকতো, তাহলে একটা ঝুঁকি নিতে পারতাম।

ভ্রূ কুঁচকে স্যামের দিকে তাকালো রেমি। তারপর সেলফোনটা বের করে বলল, তাহলে পুলিশকে ফোন করে আমাদের দল ভারি করা উচিৎ।

হ্যাঁ, তবে এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই ফোন করো না, স্যাম বলল। ব্রি যদি কারো জিম্মি হয়ে থাকে, তারমানে হলো ঐ লোকটা আমাদের ওপরও নজর রাখছে। বলে আর দেরি না করে ফার্মহাউজের সামনে থেকে গাড়িটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলো স্যাম।

ফার্মহাউজটা চোখের আড়াল হতেই পুলিশকে ফোন করলো রেমি। পুলিশের লোকেরা তাদেরকে জানালো তারা যেন বাড়িটা থেকে মাইলখানেক দূরে হাইওয়ের ধারে অবস্থিত মার্কেটটায় অপেক্ষা করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মার্কেটে পৌঁছে গেলো ওরা। পার্কিং লটে গাড়িটা পার্ক করতেই হঠাৎ বেজে উঠলো রেমি ফোন। বের করে দেখলো, সেলমা অতিদ্রুত যোগাযোগ করার অনুরোধ করে মেসেজ পাঠিয়েছে।

দেরি না করে স্পিকার অন করে ফোন করলো রেমি। তুমি কি আমাদের পাঠানো ডিজিটাল ছবিগুলো থেকে কিছু খুঁজে পেয়েছো? জিজ্ঞেস করলো ও।

এখনো না, মিসেস ফার্গো। তবে এজন্যে ফোন করতে বলিনি আমি। আপনার খোঁজে একজন পুলিশ এসেছিলো একটু আগে। ব্রি মার্শালের গাড়িটা খুঁজে পেয়েছে ওরা। এয়ারপোর্টের কাছে একটা রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিলো গাড়িটা। গাড়িতে কয়েক বাক্স ফান্ড-রেইজার টিকেট আর ফার্গো ফাউন্ডেশনের নামে চেকভর্তি একটা খাম পেয়েছে। অফিসার জানতে চাইছিলো গাড়িটা আমরা টো ইয়ার্ড থেকে ওগুলো তুলে নিয়ে আসবো কিনা।

স্যামের তাকালো রেমি। স্যাম বলল, ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন ছিলো কি গাড়িতে।

অফিসার পরিষ্কার করে কিছু বলেনি, মি. ফার্গো। তবে আমার মনে হয় ছিলো, লোকটা হয়তো একবার হালকা একটু বলেছিলো।

ধন্যবাদ, সেলমা, স্যাম বলল। আমরা এখানের ডেপুটিকে বলেছি ব্রির খোঁজ নিতে। তাকে এই ব্যাপারটাও জানিয়ে দিবো আমরা।

প্রায় দশ মিনিট পরই কার্টরেট কাউন্টি শেরিফের ডেপুটি এসে পৌঁছালো মার্কেটে। গাড়ি থেকে বেরুতেই উপত্যকার দমকা বাতাস সজোরে চপেটাঘাত করলো যেন লোকটাকে। আরেকটু হলেই মাথার ওপরের হ্যাটটা উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলো প্রায়। ফার্গোদের দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে তাদেরকে একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতে বলল ডেপুটি। ওখানে তারা মোটামুটি আড়াল হয়ে থাকতে পারবে।

একত্র হতেই ডেপুটিকে পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে বলল রেমি। সব শুনে দ্বিধাগ্রস্ত দৃষ্টি ফুটে উঠলো ডেপুটির মুখে। এটা কি সম্ভব না যে এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে মহিলার গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো? তারপর হয়তো কোনো ক্যাব বা কিছুতে করে বাড়িতে ফিরে গিয়েছে।

হয়তো, বলল রেমি। তবে তার সদ্যমৃত চাচার বিড়ালের কাছে মেসেজ পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু কিছুটা অদ্ভুতই।

অনেক মানুষই তাদের পোষাপ্রাণীদের সাথে কথা বলে।

স্যাম বুঝতে পারছে যে প্রমাণের অভাবে ডেপুটি তাদের কথা বিশ্বাস করছে না। এক পা সামনে এগিয়ে অফিসারের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, এটা কি সম্ভব না যে আমরা ভাবছি আমাদের বন্ধু কোনো বিপদে আছে, এবং এর জন্য তার ওখানে গিয়ে একবার চেক করে দেখা দরকার কিনা? সে ঠিক আছে কিনা সেটা দেখার জন্যও কি একবার যাওয়া যাবে না?

অবশ্যই। তবে এমন না যে আমি আপনাদের বিশ্বাস করিনি, বলল ডেপুটি। যদিও গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে লোকটা পুরোপুরি বিশ্বাসও করেনি। আমি শুধু যুক্তি মেলাচ্ছি। আমি শুধু এই এরিয়ার একজন ডেপুটি মাত্র, তো আমার হ্যান্ডেল করার মতো কিছু হলে আমি অবশ্যই তা করব। নাহলে, ব্যাকআপ টিমের জন্য বিশ মিনিটের মতো অপেক্ষা করার অপশনও আছে।

অবশ্যই, বলল স্যাম। তারপর ওয়ালেট থেকে তার কার্ড বের করে ডেপুটির হাতে দিয়ে বলল, এখানে আমাদের সেল নাম্বারগুলো আছে। যদি ওখানে গিয়ে কিছু জানতে পারেন, তাহলে অবশ্যই জানাবেন আমাদের।

কার্ডটা হাতে নিয়ে গাড়ির দিকে রওনা করলো ডেপুটি, তারপর গাড়িতে করে ছুট লাগালো ফার্মহাউজের রাস্তার দিকে।

তারাও ডেপুটির গাড়িটা অনুসরণ করতে চাচ্ছিলো, তখনই রেমি দেখলো যে ডেপুটির সম্মুখ রাস্তা থেকে একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। এটা ফার্মহাউজে পার্ক করে রাখা ঐ এসইউভিটাই।

তুমি নিশ্চিত?

একদম।

গাড়ি চালু করলো স্যাম। তুমি দেখেছো ভিতরে কে আছে?

দুইজন পুরুষ। যদিও আমি নিশ্চিত না। তবে প্যাসেঞ্জারের সিটে থাকা লোকটাকে পিকারিংর দোকানে ডাকাতি করতে আসা বন্দুকধারী বলেই মনে হচ্ছে আমার, বলল রেমি। ওদিকে স্যাম ইতিমধ্যেই এসইউভিটা অনুসরণ করতে শুরু করেছে। ব্রির কী হবে?

বিশ মিনিটের ব্যাসার্ধে থাকা একমাত্র ডেপুটি চেক করতে গেছে তাকে। আর লোকটা তোমার বলা বিড়ালের গল্পে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে আমার মনে হয় না যে সে সব কাজ ফেলে আমাদের কথায় একটা গাড়িকে অনুসরণ করা শুরু করবে। যদি তাকে রাজিও করাই তারপরও কিন্তু প্রমাণ নেই যে ঐ গাড়িটা অবৈধ কিছু করছিলো।

ভালো বলেছো।

তবে দুই লেনের গ্রাম্য রাস্তায় নজরে না পড়ে কাউকে অনুসরণ করা একদমই অসম্ভব কাজ। স্যাম যদিও চেষ্টা করছে এসইউভি থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে এগুতে। ধারণা করছে এই রুটটা হয়তো বুফোর্টের দিকে চলে গেছে। যদিও এটা চলে গেছে পানির ধারে অবস্থিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার দিকে। অনুসরণ করতে করতে দেখলো এসইউভিটা রাস্তার ডান দিকে মোড় নিয়ে চলে গেছে। স্যামও মোড় ঘুরালো। তবে ওদিক দিয়ে এগুনোর মতো আর কোনো রাস্তা নেই। বরং রাস্তার এক পাশে বড়ো একটা ডকে বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো ওয়্যারহাউজ দাঁড়িয়ে আছে। গতি কমালো স্যাম, তবে গাড়ি থামালো না। ওদিকে এসইউভি গাড়িটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। গাড়িটার খোঁজে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো, কিন্তু কোনো চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে কিছু? রেমিকে জিজ্ঞেস করলো।

না। খুব সম্ভবত ডকে চলে গেছে গাড়িটা, নয়তো ওয়্যারহাউজগুলোর কোনোটার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

তখনই হঠাৎ স্যামের ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে রেমির হাতে তুলে দিলো, যাতে করে ফোন রিসিভের স্পিকারফোনে কথা বলতে পারে ও।

ডেপুটি ওয়াগনার বলছি, অন্য প্রান্ত ভেসে এলো স্বরটা। আপনাকে শুধু জানাতে চাচ্ছি যে আমি বাড়িটা চেক করে দেখেছি। কেউই সাড়া দেয়নি।

স্যাম… ফিসফিসিয়ে বলল রেমি।

শুনেই স্ত্রীর দিকে তাকালো স্যাম, তারপর চোখ পড়লো রাস্তার পিছনের দিকে। চেক করে দেখার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। আমরা বাসার সামনে থাকা ঐ গাড়িটার পিছে অনুসরণ করছিলাম। আমার স্ত্রীর ধারণা গাড়ির লোকগুলোর একজন নাকি দেখতে স্যান ফ্রান্সিসকোতে ডাকাতি করা ঐ লোকটার মতোই।

আপনাদের বন্ধু কি ঐ গাড়িতে ছিলো?

তাকে দেখিনি আমরা।

আপনারা কোথায় এখন?

পানির ধারে। বুফোর্টের দশ-পনেরো মিনিটের মতো দক্ষিণে খুব সম্ভবত

একটা উপকার করুন শুধু। দয়া করে উল্টোপাল্টা কিছু করে বসবেন না। আমি বুফোর্ট থেকে ব্যাকআপ পাঠানোর চেষ্টা করছি ওখানে? বলে ফোন কেটে দিলো ডেপুটি।

ডেপুটির সাথে কথা বলা শেষে রাস্তার পাশে নিয়ে গাড়িটা দাঁড় করালো স্যাম। খুব সম্ভবত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই আমার।

দরজার হাতলের দিকে হাত বাড়ালো রেমি। আমাদের হাতে হয়তো পনেরো মিনিট সময় নেই।

রেমি, বলেই খপ করে তার হাত আঁকড়ে ধরলো স্যাম।

রেমিও হাত থামিয়ে চোখ তুলে তাকালো স্যামের দিকে।

স্যাম তার দিকে ঝুঁকে চুমু খেয়ে বলল, তুমি নিশ্চয় ভেবে বসোনি যে আমি তোমাকে ওখানে একা যেতে দিবো?

অবশ্যই না। মুচকি হেসে দরজাটা খুললো রেমি। এখন চলো, আমাদের বন্ধুকে খুঁজে বের করি।

.

০৮.

বেল্ট থেকে রিভলভারটা বের করে এনে ট্রাঙ্কটা উঁচিয়ে ধরলো স্যাম। আর রেমি সামনের দিকে নজর রেখে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ধরনের নড়াচড়া চোখে পড়লেই স্যামকে সতর্ক করে দিবে ও। যদিও স্যাম ঐদিকে আশা করছে যেন কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন না পড়ে, কিন্তু তার ইন্দ্রিয় আবার অন্য কথা বলছে। রাস্তায় শুধু একটা গাড়িই দেখা গিয়েছিলো। যদি ব্রি ঐ বিচহাউজটাতে না থেকে থাকে, তাহলে অবশ্যই সে এসইউভিটাতে ছিলো। যেহেতু তারা ওকে দেখতে পায়নি, তারমানে মেয়েটার আহত বা মৃত হওয়ারও ভালো সম্ভাবনা আছে।

দুজনই তাদের সেলফোনগুলো সাইলেন্ট করে নিয়েছে। রেমিরটা যদিও তার হাতেই রয়েছে, স্যাম তারটা ভরে রেখেছে পকেটে। ট্রাঙ্ক থেকে নিজের জন্য একটা টায়ার আয়রন তুলে নিয়ে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের রিভলভারটা রেমির হাতে তুলে দিলো স্যাম। রেডি? জিজ্ঞেস করলো ও।

হ্যাঁ, রেডি।

কোনার দিকে একবার নজর ফেলে স্যাম বলল, ওকে ক্লিয়ার।

দমকা বাতাস বইছে চারপাশে। বাতাসের ভিতরেই ঘাটের ওপর দিয়ে হেঁটে প্রথম ওয়্যারহাউজটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। কাঠের তক্তার ওপর তাদের পদশব্দ এবং পানিতে লাফাতে থাকা সিগালের চিৎকার ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।

ঘাটে কোনো নৌকা বা কর্মরত কাউকেই চোখে পড়লো না ওদের। আরেকটু ভালো করে দেখার পরই বুঝতে পারলো যে ওয়্যারহাউজগুলো আসলে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জানালাগুলো ভাঙ্গা, দরজাগুলোও বাইরে থেকে তালা দিয়ে আটকানো। কাউকে কিডন্যাপ করে আটকে রাখার জন্য নিখুঁত জায়গা এটা।

রেমিকে সাথে নিয়ে ওয়্যারহাউজের পাশ ঘেষে এগিয়ে যাচ্ছে স্যাম। হঠাৎই একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো তার কানে। সাথে সাথেই থেমে গেলো। রেমিকেও থেমে যাওয়ার জন্য ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলল, শুনো।

জং ধরা কিছুর আওয়াজ মনে হচ্ছে। কড়কড়ে শব্দ।

মাথা ঝাঁকিয়ে ওয়্যারহাউজের শেষ প্রান্তের দিকে ইশারা করলো স্যাম। হঠাৎই সিগ্যালের চিৎকারের শব্দ তাদের মাথার ওপর থেকে। চিৎকার শুনে এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেলো রেমি। তাকিয়ে দেখলো তাদের থেকে কয়েক ফুট দূরেই সিগ্যাল লাফিয়ে পড়েছে পানিতে।

স্যাম ওদিকে সব ঠিকঠাক আছে হাত উঁচিয়ে সংকেত দিলো তাকে।

মাথা ঝাঁকিয়ে আবারো স্যামকে অনুসরণ করতে শুরু করলো রেমি। ওয়্যারহাউজে থাকা কারো নজরে না পড়ার জন্য একটা জানালার পাশে গিয়ে লুকিয়েছে স্যাম। যদিও কপাল খারাপ, ডকটা বেশ লম্বা এবং তারা কেউই জানে না এসইউভির লোকগুলো এতগুলো ওয়্যারহাউজের কোনটায় গিয়ে লুকিয়েছে।

বিল্ডিংয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছেই কোনার দিকে তাকালো স্যাম। দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানে একটা এসইউভি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটার উল্টোপাশে থাকা ওয়্যারহাউজের একটা দরজা কিছুটা ফাঁক হয়ে আছে। থেমে গেলো ও। গাড়িটা ওখানে।

ভিতরে কেউ আছে?

দেখে তো মনে হচ্ছে নেই, বলল স্যাম। অবশ্য পরের বিল্ডিংয়ের দরজাটা খোলা। আমি নিশ্চিত তারা এখন ওই বিল্ডিংটাতেই আছে।

মাথা ঝাঁকালো রেমি। তারপর ফিরে তাকালো পিছনের রাস্তার দিকে। ডেপুটির গাড়িটা দেখার আশা করছে। স্যাম অবশ্য তাকে এটা বলল না যে ডেপুটি এখন তাদের থেকে কমপক্ষে হলেও দশ মিনিটের দূরত্বে রয়েছে। এখন যা করার তাদের নিজেদেরই করতে হবে।

ওয়্যারহাউজটার দিকে আরো কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে রইলো স্যাম। আক্ষেপ করছে, হাতে যদি টায়ার আয়রনের চেয়ে আরো ভালো কিছু থাকতো।

এসইউভিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই মনে পড়লো, তারা তো সামনের সিটে বসা দুজনকেই দেখেছিলো মাত্র। পিছনের সিটের ব্যাপারে তো কিছুই জানে না।

রেমিকে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলে উবু হয়ে গাড়িটার দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো স্যাম। গাড়িটার কাছে পৌঁছে উঁকি দিতেই কালো কাঁচের আড়ালে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলো।

ব্রি পড়ে আছে গাড়ির ফ্লোরবোর্ডে। তার হাতগুলো পিছমোড়া করে বাধা। মুখে একটা কাপড়ের টুকরো ঢুকানো, পাগুলোও বেধে রাখা।

ব্রির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জানালায় আলতো টোকা দিলো স্যাম। শব্দ। শুনেই তার দিকে চোখ তুলে তাকালো ব্রি। স্যাম তার ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ইশারা করে জানালো যে ওরা তাকে এখানে ফেলে রেখে যাবে না।

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো ব্রি। গাড়ির দরজাটা খোলার চেষ্টা করলো স্যাম। অবশ্যই, দরজাটা লক করা। ব্রির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আশেপাশে একবার তাকালো। তারপর আবার রেমির কাছে ফিরে গিয়ে বলল, ব্রি আছে গাড়িতে।

ঠিক আছে ও?

বেঁধে ফেলে রেখেছে, তবে সুস্থই আছে, স্যাম জানালো। ওয়্যারহাউজটা একবার চেক করে দেখা দরকার। আমাদের বিরুদ্ধে কারা আছে সেটা জেনে লড়াইয়ে নামা উচিৎ।

একমত হয়ে ওয়্যারহাউজের খোলা দরজাটার দিকে এগিয়ে গেলো ওরা।

শোনার জন্য দেয়ালে কান পাতলো স্যাম, তবে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তোমার পার্সে নিশ্চয় এখন ঐ আয়নাটা নেই?

কিসের জন্য লাগবে ওটা?

কিভার থেকে না সরে ভিতরে কী আছে তা দেখার জন্য।

রেমি তার ফোনটা উঁচিয়ে ধরে বলল, ক্যামেরা লেন্সে কাজ চলবে?

অবশ্যই চলবে। তোমার মতোই চমৎকার, বুদ্ধিদীপ্ত একটা আইডিয়া দিয়েছে।

তোষামোদ করে কিন্তু…

সব জায়গায় সুবিধা করা যায় না?

সেলফোন পাওয়া যায় না, ফিসফিসিয়ে বলে ক্যামেরা অপশনটা চালু করে ফোনটা স্যামের দিকে বাড়িয়ে দিলো রেমি।

টায়ার আয়রনটা মাটিতে রেখে দরজার দিকে ঝুঁকে ক্যামেরাটা বাড়িয়ে ধরলো স্যাম। মিনিটখানেক ধরে ভিডিও করার পর সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর পিছিয়ে গিয়ে প্লে করলো ভিডিওটা।

দেখো, ভিডিওয়ের দিকে ইশারা করে বলল স্যাম। একটা বেঞ্চের ওপর তিনজন লোক ঝুঁকে বসে কিছু একটার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব সম্ভবত রেমির ফিরিয়ে দেওয়া বইটাই দেখছে। স্ক্রিনটা বেশ ছোটো হলেও দৃশ্যটা পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে। তিনজনের মধ্যে দুইজনের হাতে থাকা পিস্তলও দেখতে পাচ্ছে ওরা।

হোটেল রুমে আসা নকল পুলিশ দুইজন, রেমি বলল।

এবং সাথে বইয়ের দোকানের ডাকাতও আছে।

কী করবে এখন ওরা? অপেক্ষা করবে নাকি আক্রমণ করবে? ঝুঁকিটার ব্যাপারে একবার ভেবে নিলো স্যাম। একটা পিস্তল এবং টায়ার আয়রনের বিপক্ষে তিনজন সশস্ত্র শত্রু। ঝকিটা অনেক বেশিই। তবে জুটি হিসেবে স্যাম এবং রেমিও বেশ ভয়ঙ্কর। ঘিলুহীন কিডন্যাপারদের ঘায়েল করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না তাদের। টায়ার আয়রনটা মাটি থেকে তুলে, রেমিকে নিয়ে দরজার মুখ থেকে গাড়ির অন্য পাশে সরে গেলো স্যাম। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, আমাদের প্রথম কাজ হলো ব্রিকে ঐ গাড়ি থেকে বের করে আনা।

সে ভেবেছিলো গাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙে দরজাটা খুলবে। তবে ঠিক তখনই তার চোখ পড়লো ঝিকমিক করতে থাকা লাল অ্যালার্ম বাতিটার ওপর।

কোনো প্ল্যান বি? রেমি জিজ্ঞেস করলো।

আসলে স্যামের প্রথম প্ল্যানটা দিয়ে কিন্তু এখনো কাজ সাড়া যাবে। যানটা দেখে অনেকটা পুরোনো মডেলের গাড়ির মতো মনে হচ্ছে। স্যাম আশা করছে এটায় হয়তো আধুনিক মোশন অ্যালার্ম সিস্টেমটা এখনো যুক্ত করা হয়নি। ছোটো চাকুটা বের করে এনে রেমির হাতে দিয়ে বলল, কাঁচ ভাঙার সময় আমাকে কভার দিবে তুমি। যদি অ্যালার্ম না বাজে, তাহলে আমি এসইউভির পিছনে সরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। আর যদি বেজে উঠে, তাহলে আমাদের দিকে তেড়ে আসবে গুণ্ডাগুলো। তখন হয়তো বির বাধন কাটার জন্য কয়েক সেকেন্ডের মতো সময় পাবে। ঐ সময়ের ভিতরেই চেষ্টা করবে তাকে নিয়ে দূরে সরে যেতে। তখন আমি গুলি করে তাদের গতি কমানোর চেষ্টা করবো।

স্যামের কথাগুলো মেনে নিয়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রেমি। পিস্ত লটা তাক করে রেখেছে ওয়্যারহাউজের দরজার দিকে।

স্যাম ওদিকে টায়ার আয়রনটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাইভারের জানালাটার সামনে। গাড়ির সেফটি গ্লাসগুলো ভাঙার মতো করেই ডিজাইন করে থাকে। যদিও তারপরও কাঁচটা যথেষ্টই শক্ত। এর মানে হলো ভাঙার জন্য স্যামকে এখন শুধু সঠিক জায়গাটাতেই আঘাত করতে হবে। একটার বেশি আঘাতের সুযোগ নেই। নাহলে অ্যালার্ম বেজে উঠার সম্ভাবনাই বেশি। হালকা একটা পিছিয়ে গিয়ে লোহার মাথাটা দিয়ে ডান দিকের নিচের কোনায় আঘাত করলো স্যাম। কাঁচ ফেটে হীরার টুকরোর মতো গুড়ো গুড়ো হয়ে পড়তে শুরু করেছে। ড্রাইভারের সিটের ওপর।

তবে অ্যালার্ম বেজে উঠেনি। তার মানে অবস্থা এখন পর্যন্ত তাদের অনুকুলেই আছে। টায়ার আয়রনটা ফেলে পিস্তলটা নিয়ে এসইউভির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রেমির দিকে দৌড়ে গেলো স্যাম। দরজার দিকে পিস্তলটা তাক করে দাঁড়ানোর পর রেমিকে ইশারা করলো তার কাজ করার জন্য।

গাড়ির কাছে পৌঁছে লকটা খুলে নিলো রেমি। পিছনের দরজাটা খুলতে যাবে ঠিক তখনই তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠলো গাড়িটা। অ্যালার্ম সিস্টেম তার কাজ করতে শুরু করেছে। এরমানে এখনই গুণ্ডাগুলো তেড়ে আসবে তাদের দিকে। চোখের কোণ দিয়ে রেমির দিকে তাকালো স্যাম। রেমি এখন উবু হয়ে ব্রির বাঁধন কাটার চেষ্টা করছে।

ওয়্যারহাউজের দরজাটা খুলে যেতেই মনে মনে গালি দিয়ে উঠলো স্যাম। গাড়িটার দিকে বন্দুক তাক করে কেউ বেরিয়ে এলো বিল্ডিংটা থেকে।

হেই! চেঁচিয়ে উঠলো স্যাম। সাথে সাথে গর্জে উঠলো তার ৩৫৭ এর রিভলভারটাও। বুলেটটা মুখে গিয়ে আঘাত করার সাথে সাথেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো লোকটা। পড়ার সময় লোকটার হাত থেকেও কিছু একটা ছিটকে পড়েছে। গাড়ির চাবি!

সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে চাবিটা তুলে নিয়ে রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, রেমি, চাবি!

বলে গাড়ির ওপর দিয়ে চাবিটা রেমির দিকে ছুঁড়ে দিলো স্যাম।

শূন্য থেকে চাবিটা লুফে নিয়ে ড্রাইভার সিটে চড়ে বসলো রেমি। চাবিটা ইগনিশনে লাগিয়ে ঘুরাতেই ইঞ্জিনটা আবার প্রাণ ফিরে পেলো যেন। দৌড়ে এসে তাড়াতাড়ি প্যাসেঞ্জার সিটে চড়ে বসলো স্যাম। ঠিক তখনই বিল্ডিং থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো অন্য দুই কিডন্যাপারও। গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে ওরা।

.

গ্যাস প্যাডাল চেপে ধরলো রেমি। সাথে সাথেই বিপজ্জনকভাবে ঘাটের প্রান্তের দিকে দৌড় লাগালো গাড়িটা।

রেমি, কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো স্যাম।

আমি দেখেছি ওটা, বলে স্টিয়ারিং হুইল ঘুরানো শুরু করলো রেমি। আবারো ড্রাইভওয়েতে ফিরে এসেছে গাড়িটা।

পিছনে ফিরে তাকালো স্যাম। দ্বিতীয় লোকটা পিস্তল তাক করে রেখেছে তাদের দিকে। তবে গুলি করতে দেরি করছে। সুযোগটা হাতছাড়া করলো না স্যাম। তারা গুলি করার আগেই ট্রিগারে চাপ দিলো। সাথে সাথেই দেখলো যে তৃতীয় লোকটা তার বাম হাঁটু আঁকড়ে ধরে নুয়ে পড়েছে সামনের দিকে। অর্থাৎ, স্যামের টার্গেট মিস যায়নি।

গুলিবর্ষণ হচ্ছে অন্যপাশ থেকেও। গোলাগুলির শব্দে তাদের কানে প্রায় তালা লেগে যাওয়ার দশা। দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এসইউভির গ্যাস প্যাডালে পা চেপে ধরে রেখেছে রেমি। কাম অন, স্পিড আপ!

ওদিকে বুলেটের আঘাতে গাড়ির পিছনের কাঁচটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। বিপদ বুঝতে পেরে স্যাম সতর্ক করলো, মাথা নুইয়ে রাখো। শুধু সতর্ক করেই থেমে যায়নি, সাথে সাথে ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে গুলিও ছুড়ছে অনবরত।

যতটা সম্ভব মাথা নুইয়ে রেখেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে রেমি। রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত গতি কমানোর কোনো ইচ্ছা নেই তার। দ্রুত গতিতে মোড়টা পেরিয়ে আবারো উঠে এলো রাস্তায়। একটু আগে এই পথটা দিয়েই এসেছিলো ওরা। অবশ্য বৃষ্টির মধ্যে গতি অব্যাহত রেখে গাড়ি চালানোটা বেশ কঠিন হয়ে গেছে এখন।

বেশ কিছুটা এগুনোর পর ডেপুটির পেট্রোলকারের টিমটিমে হেডলাইটগুলো চোখে পড়লো ওদের। গাড়িটা আরো কাছে পৌঁছাতেই মৃদু সাইরেনের শব্দও শুনতে পেলো ওরা।

ডেপুটিকে দেখে রাস্তার কিনারে নিয়ে গাড়িটা থামালো রেমি। ডেপুটিও তার গাড়িটা এনে দাঁড়ালো তাদের ঠিক পাশেই। সাইরেনের শব্দটা থামিয়ে দিয়েছে এখন।

আমাদের বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি, প্যাসেঞ্জার দরজাটা খুলতে খুলতে বলল রেমি।

ব্রিকে হাত-পা বাধা অবস্থায় পিছনের সিটে পড়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য বাকশূন্য হয়ে গেছে ডেপুটি। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কেউ আহত হননি তো?

ব্রির মুখ থেকে কাপড়ের টুকরোটা খুলে এনে রেমি জিজ্ঞেস করলো, কী অবস্থা তোমার?

আ- বলতে গিয়েও থেমে গেলো ব্রি। তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, আমি ঠিকই আছি। আমার কাজিন? ও কোথায়? ও ঠিক আছে তো?

আমি জানি না, স্যাম জানালো।

রেমিকে ব্রির বাঁধন কেটে দেওয়ার জন্য বলে স্যামকে নিয়ে গাড়ির পিছনের দিকে চলে গেলো ডেপুটি। আসলে কী ঘটছে সেটা জানতে চাইলো স্যামের কাছে।

রেমির ফোনে ভোলা ভিডিওটা দেখিয়ে ডেপুটিকে পুরো ব্যাপারটাই সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে জানালো স্যাম।

কোথায় ঘটেছে এটা? সব শুনে জানতে চাইলো ডেপুটি।

স্যাম উত্তরের দিকে নির্দেশ করে বলল, এই তো প্রায় পাঁচ মাইলের মতো দূরে হবে জায়গাটা। রাস্তার পাশের ডকে কতগুলো পুরাতন ওয়্যারহাউজ আছে। ওগুলোর দ্বিতীয়টার সামনে।

সব শুনে ডেপুটি এসইভির ডান বাম্পারে লেগে থাকা বুলেটের দাগ এবং গুঁড়িয়ে যাওয়া পিছনের জানালাটার দিকে তাকালো একবার। তারপর রেডিওটা বের ডিস্প্যাচারকে বুফোর্টের বাইরে অবস্থিত পরিত্যাক্ত ওয়্যারহাউজের গোলাগুলির ব্যাপারে রিপোর্ট করে নিলো। তিনজন সন্দেহভাজনঃ তিনজন পুরুষ, ফর্সা শরীর, কালো পোশাক।

ডিস্প্যাচারকে তথ্যগুলো জানানো শেষে গাড়ির দিকেই রওনা করছিলো ডেপুটি, ঠিক তখনই ব্রি ডেকে থামালো তাকে। আমার কাজিনের ব্যাপারে বলুন।

কী বলবো তার ব্যাপারে? জবাবে বলল ডেপুটি।

আপনার কি তার সাথে কথা হয়েছে?

ফার্মহাউজে?

মাথা দুলিয়ে সায় দিলো ব্রি।

স্যরি, ম্যাম। ওখানে কারোরই সাড়া পাইনি আমি। দরজাও লক করা ছিলো।

জবাব শুনে রেমির দিকে ফিরে তাকালো ব্রি। চেহারায় উদ্বেগের ছাপ লেগে আছে। আমাদের ওখানে গিয়ে চেক করা দরকার। কে জানে ওর সাথে বাজে কিছু ঘটেছে কিনা?

.

০৯.

রেমির হাত খামচে ধরলো ব্রি। প্লিজ, ল্যারেইন হয়তো কোনো বিপদের মধ্যে আছে।

ওর কথা কিন্তু ঠিক, স্যাম বলল। আমাদের খোঁজ নেওয়া উচিৎ একবার।

স্যার, স্যামকে উদ্দেশ্য করে বলল ডেপুটি ওয়াগনার। আপনার ওপর বিশ্বাস রাখছি আমি। আপনি বুঝে শুনেই কাজ করবেন। বুফোর্ট থেকে ওরা কখন ব্যাকআপ পাঠাবে তা আমি জানি না। আর ঐ তিনজন সশস্ত্র ডাকাতগুলোর ওপর নজর রাখতে আমরা মাত্র একজন ডেপুটিকেই পাঠিয়েছি। ব্যাকআপ ছাড়া ওকে আর এগুতে দিতে পারছি না।

বুঝতে পেরেছি আমরা।

ডেপুটি এরপর ব্রির দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আপনাদের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আপনারা তিনজন-যদি আপনার কাজিনকে খুঁজে পান, তাহলে চারজন-শেরিফের অফিসে এসে স্টেটমেন্ট দিয়ে যাবেন।

মাথা ঝাঁকিয়ে ব্রি সায় দিতেই তাদের থেকে বিদায় নিয়ে পেট্রোল কারে ফিরে গেলো ডেপুটি লোকটা।

চলো তাহলে, ডেপুটি চলে যেতেই বলল স্যাম। ড্রাইভারের দরজাটা খুলে গাড়িতে ঢুকছে ও।

আমাদের গাড়িটা কী করব? সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো রেমি।

ফিরে যাওয়ার সময় ওটা নিয়ে যেতে পারবো, বলল স্যাম।

ব্রিও উঠে বসলো রেমির পিছনের সিটে। স্যামকে বলল, প্লিজ একটু জলদি করুন।

শক্ত হয়ে বসে থাকো, বলে গাড়ি নিয়ে হারলোর দিকে ছুট লাগালো স্যাম। উইন্ডশিল্ডের ওয়াইপারগুলো চালু করে দিয়েছে যাতে বৃষ্টির কারণে সামনের দিকে দেখতে অসুবিধা না হয়। পিছনের ভাঙা জানালাটা দিয়ে শো শোঁ করে বাতাস ঢুকছে গাড়ির ভিতরে। ড্রাইভারের জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানির ছিটা আসছে অনবরত। স্যামের মুখ, কাঁধ সব প্রায় ভিজেই গেছে পানিতে। এমনকি প্যাসেঞ্জার সিটে বসে থাকা রেমির শরীরেও পানির ছিটা লাগছে। ব্রির কী অবস্থা দেখার জন্য পিছনের দিকে তাকালো একবার। তরুণ মেয়েটা পুরোপুরিই হতভম্ব হয়ে আছে এখন? তোমার চাচার ব্যাপারটায় খুবই মর্মাহত আমরা, বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাপিয়ে বলল রেমি।

আমি জানি। কিন্তু আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি এটা। কয়েকমুহূর্ত পর ব্রি সামনের দিকে ঝুঁকে রেমির কাঁধে হাত রেখে বলল, আসার জন্য ধন্যবাদ আপনাদের।

বৃষ্টির ছিটা থেকে বাঁচতে ড্রাইভিং সিটের কিছুটা পাশ দিকে সরে গেছে স্যাম। গাড়ি চালাতে চালাতেই ব্রির দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা এতেই খুশি যে তুমি ঠিকঠাক আছে।

রেমি জানালো, শুনেছি তুমি নাকি এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিলে। স্যান ফ্রান্সিসকোই যাচ্ছিলে নিশ্চয়?

হ্যাঁ, যেতে চেয়েছিলাম। তারা আমার গাড়িটা রাস্তা থেকে ফেলে দেওয়ায় আর যেতে পারিনি।

সেলমা কল করেছিলো আমাদের, রেমি বলছে। পুলিশ তোমার গাড়িটা খুঁজে পেয়েছে। তোমার ফোন পাওয়ার আগ পর্যন্ত বেশ দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম আমি।

তারা আমার দিকে বন্দুক ধরে রেখেছিলো। আমি তো কখনোই আপনাদের এরকম বিপদে ফেলতে চাইনি।

ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ও দমকা বৃষ্টির ছিটা আসায় কথা চালিয়ে যাওয়া বেশ অসম্ভব হয়ে উঠেছে ওদের জন্য। তাই বলল, আগে গিয়ে তোমার বোনকে দেখে আসি, তারপর কথা বলবো আমরা।

ফার্মহাউজে পৌঁছাতে প্রায় দশ মিনিটের মতো লাগলো ওদের। থামানোর সাথে সাথেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগালো ব্রি। দরজা খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। জোরে জোরে করাঘাত করছে এখন। কোনো সাড়া নেই তবুও। ল্যারেইন! ল্যারেইন! কাঁদতে শুরু করলো ও।

রেমি ও স্যামও এগিয়ে এলো দরজার কাছে। ব্রিকে কাঁদতে দেখে স্যাম বলল, আমি দেখি অন্যভাবে ঢোকার কোনো পথ আছে কিনা!

বলে পা বাড়ালো বাড়ির পিছনের দিকে। রেমি এবং ব্রিও অনুসরণ করছে তাকে।

বাড়ির পিছন দিকেও একটা দরজা আছে। স্যাম খোলার চেষ্টা করলো দরজাটা। এটাও তালা লাগানো দেখে ব্রি বলল, লাথি দিয়ে খুলতে পারবেন না?

ওটার হয়তো প্রয়োজন পড়বে না, তালাটার দিকে তাকিয়ে বলল স্যাম। ওয়ালেট থেকে ক্রেডিট কার্ডটা বের এনে দরজার ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে হালকা নাড়া দিতেই খুট করে খুলে গেলো তালাটা। তোমার কাজিনের উচিৎ দরজার জন্য ডেডবোল্ট জাতীয় কিছু ব্যবহার করা, দরজাটা খুলতে খুলতে বলল স্যাম।

কোনো জবাব না দিয়ে দৌড়ে রান্নাঘর পেরিয়ে ব্রি ডাকতে শুরু করলো, ল্যারেইন! কোথায় তুমি?

ডাকতে ডাকতে হলওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ব্রি। রেমি ও স্যামও দৌড়ে আসছে তার পিছু পিছু।

দৌড়ে আসতে আসতেই মুখের ওপর থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে নিচ্ছে রেমি। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই শুনতে পেলো তাদের নিচ থেকে কিছু একটার শব্দ ভেসে আসছে। ঝট করে থেমে শব্দটার দিকে লক্ষ্য করে তাকালো ও। সে নিশ্চিত যে তাদের নিচ থেকে থাবার শব্দ আসছে। এখানে দেখো! সিঁড়ির নিচে থাকা স্টোরেজ ক্যাবিনেটের দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুললো ও।

বোনকে বের করার জন্য প্রায় উড়ে এসে ক্যাবিনেটের দরজার সামনে এসে পৌঁছালো ব্রি। ল্যারেইন!

ব্রির মতো ল্যারেইনকেও হাত-মুখ বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিলো। ব্রি তার মুখ থেকে কাপড়ের টুকরোটা সরিয়ে জানতে চাইলো, তুমি ঠিক আছে?

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো ল্যারেইন।

হাত-পায়ের বাধন কেটে ল্যারেইনকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো স্যাম ও রেমি।

এরপর তাকে জড়িয়ে ধরে কাউচে নিয়ে বসানোর পর ব্রি বলল, তোমাকে নিয়ে অনেক দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম আমি।

তুমি এখানে আসলে কিভাবে? ল্যারেইন জানতে চাইলো।

ব্রি ফার্গো দম্পতিকে দেখিয়ে বলল, ফার্গো দম্পতি। আমার বন্ধু। তারাই ঐ বইটা নিয়ে এসেছে এখানে।

ল্যারেইন তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আ- দূর থেকে বজ্রপাতের শব্দ ভেসে আসায় বাক্যটা বলে শেষ করতে পারলো না। তারপর হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কিছু ড্রিঙ্ক করা দরকার আমার। হাত কাঁপছে ওর।

বসুন, বলল রেমি। আমি নিয়ে আসছি। পানি চলবে?

ধন্যবাদ, তবে আমার মনে হয় আরো কড়া কিছু দরকার এখন।

বলে রান্নাঘরে দিকে পা বাড়ালো ল্যারেইন। অন্যরাও আসছে তার পিছু পিছু। ডিশওয়াশার র‍্যাক থেকে গ্লাস তুলে নিয়ে ফ্রিজ থেকে ভদকার বোতল বের করে আনলো ল্যারেইন। গ্লাসে ঢেলে চুমুক দিতে যাবে ঠিক তখনই বি বলে উঠলো। তোমার কি মনে হয় ওটা খাওয়া ঠিক হবে এখন? আমাদের কিন্তু পুলিশের কাছে যেতে হবে।

ঠিকই করছি আমি। তোমার কি কোনো ধারণা আছে ক্যাবিনেটের ভিতর থাকতে কেমন লাগে, বিশেষ করে যখন এটাও অজানা যে কেউ তোমাকে খুঁজতে আসবে কিনা?

জবাবে ব্রি কিছু বলল না। ব্রির অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে রেমি তার কাঁধে হাত রেখে বলল, তোমরা দুজন কী অবস্থায় ছিলে সেটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। এমনকি তোমরা কেউই কারো ব্যাপারে কিছুই জানতে না। নিশ্চয়ই অবস্থাটা খুব খারাপ ছিলো তোমাদের জন্য।

হ্যাঁ, খুবই খারাপ ছিলো, ল্যারেইনের চোখের দিকে তাকিয়ে জবাবটা দিল ব্রি।

ব্রির মন্তব্যে কিছুটা চমকে গেছে ল্যারেইন। গ্লাসটা নামিয়ে বলল, ওহ, ব্রি… আমি দুঃখিত। আমাকে কি ক্ষমা করতে পারবে তুমি?

কিসের জন্য?

তারা তো তোমাকেই কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিলো। নিশ্চিতভাবেই আমার থেকেও বাজে অবস্থায় ছিলে তুমি।

এর জন্য দুঃখিত হবার কিছু নেই। মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো যে আমাকে খুঁজে বের করতে পেরেছে এতেই খুশি আমি।

হা। ভাগ্য ভালো ছিলো তোমার।

ফোনটা কোথায়? ল্যারেইনকে জিজ্ঞেস করলো রেমি। শেরিফের অফিসে ফোন করা উচিৎ আমাদের। তারা হয়তো আপনি ঠিক আছেন কিনা সেটা জানার অপেক্ষায় আছে।

পুরো বাড়ি জুড়েই বেশ কয়েকটা পোর্টেবল হ্যান্ডসেট আছে। সিঁড়ির কাছের হলওয়েতেও আছে একটা।

কথাটা শুনেই হলওয়ের দিকে পা বাড়ালো স্যাম। কিছুক্ষণ পরই ফোনে কথা বলতে বলতে রান্নাঘরে ফিরে এলো আবার। হ্যাঁ, হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি। আমরা এখানেই থাকবো।

তারপর ফোন কেটে রিসিভারটা কাউন্টারের ওপর রেখে বলল, তারা গোয়েন্দা বিভাগের একজনকে পাঠাবে এখানে।

মাথা ঝাঁকালো ব্রি। তবে রেমি বলল, সন্দেহভাজনদের ব্যাপারে কী বলল? কাউকে কি ধরতে পেরেছে?

ইনভেস্টিগেটর এখানে এলেই হয়তো ওটার ব্যাপারে জানা যাবে।

ভদকার বোতলটার দিকে একবার তাকালো ল্যারেইন। তারপর আবার স্যামের দিকে ফিরে বলল, এখানে কেন লোক পাঠাচ্ছে ওরা?

ওরা বলতে পুলিশ? আমাদের স্টেটমেন্ট এবং প্রমাণ সংগ্রহের জন্য।

উত্তরটায় ল্যারেইন কিছুটা চমকে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কী ধরনের প্রমাণ?

আঙ্গুলের ছাপ-টাপ, খুব সম্ভবত।

ভদকার গ্লাসটা কাউন্টারে নামিয়ে রাখলো ল্যারেইন। কী একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা ঘটছে।

ব্রি এগিয়ে এসে তার বোনের হাতে ধরে বলল, পুলিশ অপরাধীকে খুঁজে বের করবে। কে জানে, হয়তো এতোক্ষণে ধরেও ফেলেছে।

গ্লাসে আরো কিছু ভদকা ঢালার মাধ্যমে নিঃশব্দে জবাব দিলো ল্যারেইন। রেমি অবশ্য এটার জন্য তাকে দোষ দিতে পারছে না। হাজার হোক, সদ্যই বাবাকে হারিয়েছে, আর কিছুক্ষণ আগে নিজেও বন্দী ছিলো ছোটো একটা চাপা জায়গায়। কিচেন টেবিলের সামনে থেকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ওটাতে বসে শুধু বলল, মনে হয় আমাদের সবারই একটু বসে রিল্যাক্স করা উচিৎ। বেশি দুঃশ্চিন্তিত বা আতঙ্কিত হওয়াটা কোনো উপকারে আসবে না।

ভালো বলেছেন, বোতলটা হাতে নিয়ে টেবিলের দিকে আসতে আসতে বলল ল্যারেইন। ব্রি, তুমিও একটা গ্লাস নিয়ে এসে জয়েন করো আমার সাথে।

আমি ঠিক আছি।

না, তুমি ঠিক নেই। তারা তোমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো। এক ঢোক গিলো তুমিও।

ব্রি অবশ্য তা করলো না। ভদকার পরিবর্তে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলো শুধু। তারপর কাজিনের পাশে বসে বলল, আমি জানি না তুমি কিভাবে কড়া জিনিসটা গিলতে পারো।

এটা শক্তি যোগায় শরীরে, বলে গ্লাসে লম্বা চুমুক দিলো ল্যারেইন।

ল্যারেইনকে নিয়ে কিছুটা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছে রেমি। মহিলা যেভাবে ঢোক গিলছে তাতে তার আশঙ্কা হচ্ছে মানুষটা হয়তো পুলিশ এসে পৌঁছানোর পর কিছু বলার মতো অবস্থায় থাকবে না। তাই নিজে থেকেই কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার সিদ্ধান্ত নিলো ও। অল্প কয়েকটা প্রশ্নে হয়তো তেমন কোন ক্ষতি হবে না কারো। আশা করছি প্রশ্নটায় হয়তো কিছু মনে করবেন না, কিন্তু আসলে কী ঘটছে এসব?

ল্যারেইন মাথা নাড়তে নাড়তে আক্ষেপের স্বরে বলল, যদি জানতাম!

আপনার বাবার ম্যাপ বইটার সাথে কি এসবের কোনো সম্পর্ক আছে?

প্রশ্নটা শুনে ব্রির দিকে একবার তাকালো ল্যারেইন। বলল, বাবা যদি আমার বলা ক্রেতার কাছে বইটা বিক্রি করতো, তাহলে হয়তো এসবের কিছুই ঘটতো না এখন।

আপনি উনার জন্য ক্রেতা খুঁজে দিয়েছিলেন? জানতে চাইলো রেমি।

হ্যাঁ, বলল ল্যারেইন। একজনকে পেয়েছিলাম। বইটার জন্য অনেক বড়ো অঙ্কের টাকা দিতে চেয়েছিলো লোকটা। বইটার দামের থেকেও কয়েকগুণ বেশি।

ওদিকে স্যাম শুধু এক জানালা থেকে আরেক জানালায় পায়চারি করছে। বাড়ির সামনের দিকটায় তাকাচ্ছে একটু পরপর। রেমি অবশ্য স্যামের দিকে মনোযোগ না দিয়ে ল্যারেইনকে জিজ্ঞেস করলো, কে?

নামটা মনে নেই আমার।

আমার আছে, বলল ব্রি। লোকটার নাম চার্লস এভেরি।

যে নামই হোক, ল্যারেইন তার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলছে, আমি শুধু এটাই জানি যে, বাবা হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলো বইটা বিক্রি করবে না। কেন করবে না সেটাও বলেনি।

আঙ্কেল উদ্বিগ্ন ছিলো, ব্রি বলল। বইয়ের কপির ব্যাপারে অনেকগুলো ফোন এসেছিলো তার কাছে। আর এরপর হঠাৎই এক আগন্তুক এলো বইয়ের ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে। খুব সম্ভবত ঘটনাগুলোর টাইমিং-এর কারণেই আঙ্কেল পিছিয়ে গিয়েছিলো।

স্যাম আবার রান্নাঘরে ফিরে এসেছে। জানালা দিয়ে ড্রাইভওয়েতে একবার নজর ফেলে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, টাইমিং?

মাথা ঝাঁকালো ব্রি। বইয়ের প্রথম মুদ্রণের অন্যান্য কপিগুলো থেকে এন্ডপেপার চুরির ব্যাপারটা সম্পর্কে জানতো আঙ্কেল। আমার মনে হয় আঙ্কেল হয়তো ভেবেছিলো একই কারণে তাকেও কেউ টার্গেট করেছে।

যুক্তি আছে তোমার কথায়, স্যাম বলল। কিন্তু আমরা এটার সাথে জড়ালাম কিভাবে?

মিসেস ফার্গোর সাথে কাজ শুরু পরই আমি আঙ্কেলকে আপনাদের ব্যাপারে বলেছিলাম। বলেছিলাম, আপনারা গুপ্তধন শিকার থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ফার্গো ফাউন্ডেশন এবং দাঁতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তখনই আঙ্কেল বলল যে বইটা কি আপনাদের কারো কাছে দেওয়া যায় কিনা। আপনাদের দিতে পারলে নাকি তার কাঁধ থেকে বোঝা নেমে যাবে।

হুম, এখন বুঝতে পারছি, খুব একটা সন্তুষ্ট শোনাচ্ছে না ল্যারেইনকে। বাবা কোনো সংগ্রাহকের কাছে বিক্রি করেনি, কারণ বাবা আপনাদের কাছে বিক্রি করবে ভেবে ঠিক করে রেখেছিলো।

দোকানে যাওয়ার মুহূর্তটার কথা স্মরণ করে ব্রিকে বলল, দোকানে গিয়ে কিন্তু আমার মনে হয়নি যে উনি আমাদের আশা করছিলেন।

ওটার জন্য দুঃখিত, ব্রি বলল। ঐদিন সকালেই আমি আঙ্কেলকে ফোন করে বলেছিলাম যে আপনারা দোকানে যাবেন। আঙ্কেল তখন অন্য একটা ফোন কলে পাওয়া হুমকি একটু দুঃশ্চিন্তিত ছিলো, তাই আমার কথাটা ভালোভাবে খেয়াল করতে পারেনি। ক্ষমাসুলভ হাসি ফুটে রয়েছে তার মুখে। আমি ভেবেছিলাম বইটা দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেই আঙ্কেল আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে।

হুম, ল্যারেইন বলল। আর এখন বাবা মরেই গেছে।

ব্রি তার বোনের কাঁধে হাত রেখে স্বান্তনার সুরে বলল, ডাকাতির কথা শুনে আমি রাতেই তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ চোখ চকচক করে উঠলো ব্রির, পানি পড়ছে তার গাল বেয়ে। আমি খুবই দুঃখিত। আমি যেতে পারিনি। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথেই আমাকে ধরে ফেলেছিলো ওরা। এরপর শুধু জানি, আমি ল্যারেইনের এখানে আছি। গাল থেকে চোখের অশ্রু মুছে রেমির দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো ও। তারা বলছিলো, বইটা না পেলে নাকি তারা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো সত্যিই তা করে বসবে। নাহলে আমি কখনো…।

ব্রি, বলল রেমি। তুমি ওটাই করেছো তোমার যেটা করা দরকার ছিলো। আমি তোমাকে একমুহূর্তের জন্যও সন্দেহ করিনি।

স্যাম আবারো জানালার দিকে তাকিয়ে দ্রুত গতিতে পায়চারি করতে শুরু করেছে। প্রতিবারই যখন জানালা থেকে সে তাদের দিকে ফিরে আসে, ততবারই ব্রি আর ল্যারেইন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকায় ওরে দিকে। দুইজনের উদ্বেগ দেখে রেমি মুচকি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, পানি খাওয়া দরকার আমার। পানি খেয়ে আসছি।

বলে ক্যাবিনেট থেকে একটা গ্লাসে পানি ঢেলে স্যামের দিকে এগিয়ে গেলো রেমি। স্যামের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, কী করছো তুমি? এভাবে তো তাদেরকে আরো নার্ভাস করে তুলছে।

রেমির দিকে তাকিয়ে স্যাম নিচুস্বরে বলল, আমাদের হাতে মাত্র একটা পিস্তলই আছে। আর আছিও এখন নির্জন এক জায়গায়। এখন আমরা খুবই ইজি টার্গেট। তাই চোখ রাখতে হচ্ছে।

ঠিক তখনই বিজলি চমকালো আকাশে। এতো উজ্জ্বল আলো যে রান্নাঘরও আলোকিত হয়ে গেছে বিজলির কারণে। এরপরই ভেসে এল বজ্রপাতের বিকট এক শব্দ। ব্রি ও ল্যারেইন দুইজনই চমকে গেছে শব্দে। ঠিক তখনই বেজে উঠলো টেবিলের ওপর রাখা হ্যান্ডসেটটাও! চমকে উঠে ওটার দিকে তাকালো ল্যারেইন।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে উঠে গিয়ে ফোনটা ধরলো ও। হ্যালো?… হ্যালো? কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসছে না। আরো কিছুক্ষণ হ্যালো হ্যালো করে ফোনটা কেটে ল্যারেইন বলল, হয়তো কোনো রং নাম্বার ছিলো।

একে-অপরের দিকে তাকালো রেমি ও স্যাম। সত্যি বলতে দুইজন একই কথা ভাবছে এখন। ডাকাতগুলো কল করে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছে তারা আবার বাড়িতে ফিরে এসেছে কিনা।

পিছনের দরজাটা ঠিকঠাকমতো লাগানো আছে কিনা তা চেক করে দেখছে রেমি। আর স্যাম পিস্তলটা বের করে ল্যারেইনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বাসায় কি আরো কোনো অস্ত্র আছে?

.

১০.

ফোন আসার পর থেকে প্রতিটা শব্দই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে ওদেরকে। জানালায় বৃষ্টির পানির ফোঁটার শব্দ, মেঘের গুড়গুড়, বজ্রপাতের শব্দে প্রতিবারই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে ব্রি ও ল্যারেইন।

পুলিশেরা আর মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে আছে। তবে তাদের এখানে এসে পৌঁছার আগ পর্যন্ত একেবারেই স্বস্তি পাচ্ছে না স্যাম। অদ্ভুত ফোন কলটা দুই মহিলাকেই ভয় পাইয়ে দিয়েছে। যদিও ফোন আসাটা কাকতালীয় হতে পারে, তারপরও টাইমিংয়ের কারণে কেউই স্বাভাবিক থাকতে পারছে না।

স্যাম তার হাতের রিভলভারটা রেমিকে দিয়ে দিয়েছে। এর পরিবর্তে ল্যারেইনের মৃত স্বামীর জং ধরা শটগানটা তুলে নিয়েছে ও। মহিলাদের সবাই এখন ফ্রন্ট রুমে বসে আছে। তবে সে দাঁড়িয়ে আছে জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তাটার ওপর নজর রাখার জন্য।

ল্যারেইন বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত। স্যামের এই আইডিয়াটা ভালো লাগেনি। তবে এই মুহূর্তে ল্যারেইনের মাথা থেকে আইডিয়াটা সরানোও বেশ কঠিন কাজ। আর এই কঠিন কাজটাই বেশ ভালোভাবে করছে রেমি। অন্য দুইজনকে বইটার ব্যাপারে নানান প্রশ্ন করে মনোযোগটা অন্য দিকে সরিয়ে রাখছে ও। সবাই কেন এই বইটার পিছনে লেগেছে?

উত্তরটা বলার আগে একবার ব্রির দিকে তাকালো ল্যারেইন। তারপর বলল, আ-আমি তাদেরকে এটার ব্যাপারে বলতে শুনেছিলাম। মানে ঐ লোকগুলোর থেকে যারা আমার বাসায় এসেছিলো। ঠিক তখনই ব্রিকেও নিয়ে আসা হয় এখানে।

তারা কী বলেছিলো আসলে?

বলেছিলো যে তারা বইটা থেকে ম্যাপটা পেলেই চাবির জন্য সবকিছু পেয়ে যাবে। যদি ওটা ওখানে থাকে, তাহলে তারা তাদের টাকাটা পাবে এবং আমাদেরকে ছেড়ে দিবে।

মাথা ঝাঁকালো ব্রি। হ্যাঁ, আমাকেও এটা বলেছে ওরা। তারা আমাদেরকে তখনই ছাড়বে যখন তারা বই এবং তাদের টাকা হাতে পাবে। তবে তারা কোথায় যেন চাবি খুঁজতে যাচ্ছিলো। সত্যি বলতে আমি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো ভুল বুঝেছি।

বইটা, রেমি বলল ল্যারেইন, কি কারণে তারা ভাবলো যে এটাই ঐ বইটা?

এই ব্যাপারে ব্রি আমার থেকে ভালো বলতে পারবে।

স্যাম ভাবছে, নিশ্চিত ভাবেই বইয়ের ইতিহাসের ব্যাপারে ওরা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ধরতে পারছে না। আর একমাত্র যে ব্যক্তিটা এসবের ব্যাপারে জানতো সে এখন মৃত। তোমার আঙ্কেল এটার ব্যাপারে কী বলেছিলো?

আঙ্কেল বলেছিলো, বইটা নিয়ে আরো রিসার্চ করা নাকি বাকি আছে। আঙ্কেল এই কাজটাই করছিলো, তখনই ল্যারেইন চার্লস এভেরি নামের একজনের কাছে বইটা বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলে।

চার্লস এভেরি… স্যামের কাছে নামটা বেশ পরিচিত লাগছে। তবে কেন লাগছে সেটা বুঝতে পারছে না। আরো কিছু বিষয়ও বেশ খোঁচাচ্ছে ওকে। কিডন্যাপের টাইমিং এবং স্থানটাও বেশ অদ্ভুত ছিলো। বইটার জন্য তারা কেন ব্রিকে এতো দূর থেকে ধরে এনেছে? হয়তো ল্যারেইনের নির্জন বাড়ির কোনো সম্পর্ক আছে এর সাথে। তবে এটা ছাড়াও আরো একটা কারণ বেশ খোঁচাচ্ছে ওকে। ল্যারেইন, বলল ও, আপনাকে টার্গেট করার কোনো কারণ বলতে পারবেন?

অবশ্যই। বইটার মালিক ছিলো আমার বাবা।

এটা ছাড়াও কোনো কারণ? যাই হোক, এই চার্লস এভেরি লোকটার সাথে কি আপনি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন?

লোকটাকে কখনো দেখিনি আমি। অন্য একজনকে বাড়িতে পাঠিয়েছিলো।

এছাড়া অন্য কেউ কি বইটার ব্যাপারে জানতে বাসায় এসেছিলো অথবা যোগাযোগ করেছিলো?

মাথা নাড়লো ল্যারেইন। না। কেন?

আমার কাছে একটা ব্যাপার অদ্ভুত লাগছে। সবগুলো ঘটনাই ঘটছে এখানে। অন্য কোথাও না।

আপনার কি মনে হচ্ছে চার্লস এভেরি আছে এটার পিছনে।

সত্যি বলতে এই ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই।

চেয়ারে হেলান দিয়ে ব্রির দিকে তাকালো ল্যারেইন। এমন কি হতে পারে না যে বাবা এটার ব্যাপারে অন্য কারোর সাথেও কথা বলেছিলো? ব্রি, তুমি বাবার খুব কাছের ছিলে। তোমাকে কি কিছু বলেছিলো?

নির্দিষ্ট কারো ব্যাপারে কিছুই বলেনি। শুধু একবার বলেছিলো সে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। তবে এটাও বলেছিলো যে আঙ্কেল এই বইটা নিয়ে আরো কিছু গবেষণা করতে চায়।

জানালার দিকে তাকালো স্যাম। দূর থেকে হেডলাইটের আলো ভেসে আসছে। ব্রির দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে আবারো দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো জানালার দিকে। কখনকার ঘটনা এটা?

ফাস্ট এডিশনের অন্যান্য কপিগুলো থেকে এন্ডপেপার চুরির ব্যাপারগুলো নিয়ে আর্টিকেল বের হওয়ার পরপরই বলেছিলো, বলে পানির গ্লাসটার দিকে হাত বাড়ালো ও। এরপরই ঘটলো ডাকাতির ব্যাপারটা, আর… বলতে বলতে রেমির দিকে ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে হাসলো। আমি এরকম কিছু হতে দিতে চাইনি। অন্তত আপনার সাথে না। যদি আমি বইটার ব্যাপারে ভালো করে জানতাম, তাহলে কখনোই বলতাম না ওটার কথা।

যা ঘটেছে ওটার জন্য নিজেকে দোষারোপ করো না, ব্রি, বলল রেমি।

ঠিক তখনই বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো ইনভেস্টিগেটর। তাদের সবার স্টেটমেন্ট। স্যামের গুলি করা ডাকাতটাকে নিয়েই বেশি আগ্রহ লোকটার। কারণ খুব সম্ভবত পুলিশ ওয়্যারহাউজে গিয়ে কাউকেই খুঁজে পায়নি। আপনি নিশ্চিত আপনি কাউকে গুলি করেছিলেন? স্যামকে জিজ্ঞেস করলো গোয়েন্দা লোকটা।

পুরোপুরি নিশ্চিত।

আচ্ছা। তাহলে মনে হয় এটার সাথে যে জড়িয়ে আছে সে নিজের পরিচয় দিতে চাচ্ছে না।

এরই মধ্যে সিএসআই টিমও এসে উপস্থিত হলো ঘটনাস্থলে। পাউডার ছিটিয়ে ছিটিয়ে আঙুল ও অন্যান্য ছাপ সংগ্রহ করছে এক মহিলা। সব দেখে আগের থেকেও আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে ল্যারেইন। ভদকার গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে শুধু। রেমির ধারণা, ল্যারেইনের হয়তো আরো অনেক অনেক বেশি ড্রিংক করা বাকি আছে। অবশ্য এটার জন্য কেউ দোষ দিবে না তাকে।

ডিটেক্টিভের তদন্ত শেষ হতে হতে প্রায় বিকাল পাঁচটার মতো বেজে গেছে। সব শেষ হওয়ার স্যাম ও রেমিকে জানালো যে প্রমাণের জন্য এসইউভিটা নিয়ে যেতে চাচ্ছে, তারা যদি তাদের রেন্টাল কারটা আনতে যেতে চায় তাহলে ডিটেক্টিভের সাথেই যেতে পারবে।

প্রস্তাবটা মেনে নিতে দ্বিধা করলো না স্যাম। রেমি শুধু ব্রির দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, তুমি কি আমাদের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে যেতে চাও?

ব্রিকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। ল্যারেইনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ল্যারেইনকে একা রেখে যেতে চাই না।

আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, ল্যারেইন বলল। আমাকে দেখার জন্য এক বন্ধু আসবে। যাও। আমি ঠিকই থাকবো।

তুমি নিশ্চিত?

আমি একা নই, ছাপ নিতে থাকা মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল ল্যারেইন। আর রাস্তাতে মাত্র এক মাইল দূরেরই। যদি আমার বন্ধু। সময়মতো এখানে এসে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সিএসআইয়ের সাথে করে তার ওখানেই চলে যাবে। যদি ওটা সম্ভব হয় আর কী!

সিএসআইয়ের মহিলা অমত করলো না এতে। বলল যে এতে কোনো সমস্যা হবে না।

তাহলে, হ্যাঁ, রেমির দিকে তাকিয়ে বলল ব্রি। আপনাদের সাথেই যাব আমি।

****

দুই ঘন্টা পর এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখে জেটটা তাদের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

স্যাম ও রেমি দুজনই তাদের ভেজা পোশাকগুলো বদলে নিয়েছে। পোশাকগুলো এসইউভির ভাঙা জানালার কাছে ভরেছিলো। জেটে চড়েই স্যাম চলে গেছে ককপিটে তার ক্রুদের সাথে যাত্রার ব্যাপারে আলোচনা করতে। আর রেমি ওদিকে ব্রিকে নিয়ে মেইন কেবিনের একটা টেবিলের পাশে বসে আছে।

ব্রি অবশ্য ফোনে কথা বলছে এখন। তুমি কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছো না কেন? আমি বাসায় পৌঁছেই ফোন দিবো তোমাকে… আচ্ছা, পৌঁছার পর কথা বলবো তোমার সাথে।

ফোনটা কাটার পর রেমি জানতে চাইলো, সব কিছু ঠিক আছে?

ল্যারেইনকে ফোন করেছিলাম তার বন্ধু এসে তাকে নিয়ে গেছে কিনা জানার জন্য। নিয়ে গেছে। আমরা ওখান থেকে চলে আসার পর বেশ ভালো পরিমাণেই ড্রিংক করেছে ও।

ওটা তখনই বুঝেছিলাম। ড্রিংকের কথায় মনে পড়লো, ডিনারের আগে কি তুমিও কিছু ড্রিংক করবে?

হ্যাঁ, বলল ব্রি। যদি বেশি ঝামেলা না হয় আর কী!

কী নিবে তুমি? চা, কফি নাকি কড়া কিছু?

আপনি জানেনই… বলতে গিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিলো ও। আমার মনে হয় কড়া কিছুই ভালো হবে। তবে ভদকা না হলেই ভালো। হালকা শেরি হলেই চলবে।

ঠিক তখনই ট্রেতে করে পনির ও চিপস নিয়ে এসে উপস্থিত হলো তাদের ফ্লাইট এটেন্ডেন্ড স্যান্ড্রা। রেমি ওসবের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, দুই গ্লাস শেরি হলে ভালো হয়। সত্যি বলতে, স্কচও নিয়ে এসো। কোনো সন্দেহ নেই যে স্যামও আমাদের সাথে জয়েন করবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শেরি ও স্কচ নিয়ে আবার ফিরে এলো স্যা। তারপর আবার চলে গেলো তার নির্দিষ্ট জায়গায়। রেমি তার গ্লাসটা তুলে একটা চুমুক দিয়ে বলল, তোমাকে ফিরে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে আমার।

ধন্যবাদ, ক্লান্তি হাসি হেসে বলল ব্রি। তারপর গ্লাসটা তুলে নিয়ে চুমুক দিলো। অ্যালকোহলের স্বাদে মুখ কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে ওর। আমি যতটায় অভ্যস্ত, তার থেকেও কিছুটা বেশি কড়া এটা।

মুচকি হেসে উঠলো রেমি। তখনই স্যামও এসে যুক্ত হলো তাদের সাথে। রেমির পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো, ল্যারেইনের অবস্থা কী এখন?

ভালোই, মনে হয়। খুব আপসেট হয়ে আছে ও। সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাচ্ছে বারবার। বলছে এটা নাকি তারই দোষ, সে ই চার্লস এভেরিকে এটাতে টেনে এনেছে।

ট্রেতে কয়েকটা চিপসের টুকরো তুলে নিয়ে স্যাম বলল, আমরা কিন্তু এখনো জানি না আসলেই এর পিছনে ঐ লোকটা আছে কিনা।

ল্যারেইন ভাবছে ঐ লোকটার হাত আছে। ও বলছে ডাকাতদের একজন নাকি ফোনে চার্লি নামের একজনের সাথে মার্কারের ব্যাপারে কিছু বলাবলি করছিলো।

মার্কার? স্যাম বলল।

বইটার সাথে হয়তো কোনো সম্পর্ক আছে ওটার। আমি ধরে নিচ্ছি। এটার সাথে হয়তো ঐ চাবিটার সাথে জড়িত কিছু হবে।

ও কি কোনো জায়গার কথা বলেছে? জানতে চাইলে স্যাম।

কোনো আইল্যান্ডের কোনো পিট বা ওকের ব্যাপারে যেন কী বলছিলো ও। ল্যারেইন অবশ্য প্রচুর মদ্যপ হয়ে আছে এখন, বলল ব্রি।

ঠিক তখনই ককপিট থেকে আবারো মেইন কেবিনে ফিরে এলো স্যা। এসে স্যামের দিকে হেসে তাকিয়ে বলল, বাধা দেওয়ার জন্য ক্ষমা করবেন, মি, ফার্গো। টেকঅফের জন্য ক্লিয়ারেন্স পেয়েছি আমরা।

একটু অপেক্ষা করো, বলে ব্রির দিকে তাকিয়ে বলল, ল্যারেইন কি ওক আইল্যান্ডের মানি পিটের কথা বলছিলো?

হতে পারে। তার কথা আসলে স্পষ্ট বুঝতেও পারিনি অতোটা।

তোমার কী মনে হয়, রেমি? জানতে চাইলো স্যাম।

নোভা স্কশিয়া? রহস্যটার শেষ বিন্দু পর্যন্ত দেখার ইচ্ছা আছে ওর, তবে সে এখন ব্রির সুস্থতা নিয়েই বেশি দুঃশ্চিন্তিত হয়ে আছে। যদি ব্রি এই যাত্রার জন্য রাজি থাকে, তাহলে ওখানে যাওয়া উচিৎ আমাদের।

আমি ঠিকই থাকবো। আমাকে নিয়ে ভাববেন না।

সম্ভষ্ট হয়ে স্যাম স্যান্ডাকে জানালো, পাইলটকে জানাও যে ফ্লাইট প্ল্যানে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন গন্তব্য হ্যাঁলিফ্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল। ব্রিকে ওখান থেকেই বাসায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবো আমরা।

ওকে, মি. ফার্গো।

স্যান্ড্রো চলে যেতেই ব্রি বলল, ডাকাতগুলো যদি এখনো ওখানে থেকে থাকে? আমি নিজেও বাসায় যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না।

তার দিকে তাকিয়ে সহানুভূতিশীল হাসি হাসলো রেমি। বলল, সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিন্তু তুমি চাইলে লা জোলায় আমাদের ওখানে থাকতে পারো।

ঐ বাড়িটাকে আসলে একটা দুর্গ বলা যায়। তুমি নিরাপদেই থাকবে আমাদের এখানে। সাথে সায় দিলো স্যাম।

মাথা নাড়লো ব্রি। না, আমি কোনোভাবেই আপনাদের বোঝা…

তুমি তা হবেও না, রেমি জানলো। তুমি আর সেলমা একসাথে থাকলে আমরা দ্রুতই এই রহস্যের সমাধান করতে পারবো। বলতে গিয়ে মনে পড়লো, ল্যারেইন বলছিলো বইয়ের ইতিহাসের ব্যাপারে নাকি তুমিই বেশি জানো…?

অল্প কিছুটা। আমি এট জানি যে আঙ্কেল জেরাল্ড বইটা কিনেছিলো আমার বাবার দিকের এক দূরবর্তী আত্মীয়ের এস্টেট সেলের সময়। কিং জনের সময়ের পর থেকেই মার্শাল ফ্যামিলির পুরুষরা তাদের এই স্বগোষিত পাবিরারিক ইতিহাসকে পাহারা দিয়ে আসছিলো। বলতে গিয়ে হালকা হেসে উঠলো ব্রি। অবশ্যই, এটা কোনোভাবেই সম্ভব না, কারণ এই বইটা লেখাই হয়েছিলো সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকের সময়ে। আর, আপনারাই বলুন, জলদস্যু ও প্রাইভেটিয়ারদের নিয়ে লেখা একটা বই কেউ কি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণ করে যাবে?

করবে না। তবে যদি মূল্যটা সবার আগ্রহের চাবিটার মতো কিছুর সাথে। সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে কিন্তু আলাদা কথা। তাই না? রেমি বলল।

এমনকি এই বইটার ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বইয়ের ম্যাপগুলোর জন্য একটা চাবি আছে, আর এই ম্যাপটা হলো জলদস্যু ও প্রাইভেটিয়ারদের নিয়ে-যাদের আগমনই ঘটেছে কিং জনের শাসনকালের আরো কয়েক শতাব্দী পর। তো, বুঝতেই পারছেন আপনারা। আমি জানি না কিভাবে এই বইটা আমাদের কোনো সাহায্যে আসতে পারে।

ব্রির দিকে তাকিয়ে রেমি মুচকি হেসে বলল, তেমন কিছু না হলেও, আগ্রহ জাগানিয়া ইতিহাস বলাই যায়।

আপনারা দুইজনই আমার সাথে অনেক ভালো আচরণ করেছেন। এতো কিছু ঘটার পরও- কথা থামিয়ে দিয়ে হাসার চেষ্টা করলো ব্রি, কিন্তু পারলো না। বরংচ আরো কান্নায় ভেঙে পড়েছে।

স্যামকে সরার ইশারা করে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালো রেমি। তারপর গিয়ে বসলো ব্রির পাশে। মেয়েটাকে ভালো করে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে। হয়তো হাত-মুখ দিয়ে একটু ঘুমানো উচিৎ তোমার। একটা ভালো ঘুম দিলেই কিছুটা ভালো বোধ করবে। আর এসব নিয়ে কথা বলার জন্য পরেও অনেক সময় পাওয়া যাবে।

মাথা ঝাঁকালো ব্রি। হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।

ব্রিকে সাথে নিয়ে বিমানের পিছনের অংশে থাকা স্লিপিং কোয়ার্টারগুলোর দিকে নিয়ে গেলো রেমি। কয়েকমিনিট পরেই ফিরে এলো আবার। বেচারী, স্যামকে বলছে, খুবই খারাপ লাগছে ওর জন্য।

তার কিন্তু দুঃখবোধ করার অধিকার আছে। শুধু ভাবো তোমার আঙ্কেল মারা গেছে, এবং এরপর তোমাকে কিডন্যাপ করেছে কেউ।

ও এখন নিরাপদ আছে। এবং এটাই সবচেয়ে মুখ্য বিষয়। বলে গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরে একটা চুমুক দিতে গিয়ে থেমে গেলো রেমি। স্যামের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু। তো, এখন কী বলবে? তোমার বলা আরাম ও বিশ্রামের সপ্তাহটা শুরু হচ্ছে কবে থেকে?

আহা, রেমি! ভালো একটা মুহূর্তকে নষ্ট করছো কেন? প্রতিদিন তো আর নিশ্চয় নর্থ ক্যারোলিনার টারমাকে বসে পঁচিশ বছরের পুরোনো স্কচ খাওয়া হয় না।

নষ্ট করার কোনো চেষ্টাই করছি না আমি। বলে ড্রিংকে চুমুক লাগালো রেমি। মুহূর্তটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছে। স্যামের অন্যান্য গুণগুলোর মধ্যে এটাকেও বেশ পছন্দ করে রেমি। সবসময়ই হাসিখুশি মুডে থাকতে পারে মানুষটা। শুধু ভাবছি আমার ক্যালেন্ডারের আরো কয়েকটা দিন এভাবে আটকে রাখা উচিৎ হবে কিনা!

তাহলে, কালদিন পর থেকেই শুরু হবে সপ্তাহটা।

কাল থেকে না? রেমি বলল।

প্রশ্নটার কোনো জবাব না দিয়ে স্যাম প্রসঙ্গ পালটে বলল, ওক আইল্যান্ডে পৌঁছার আগেও কিন্তু আরো অনেক কিছু করা বাকি আছে আমাদের। ধরেই নিচ্ছি ব্রি হয়তো তার কাজিনের মদ্যপ কথাগুলো স্পষ্টভাবেই শুনতে পেয়েছে। তারমানে ওখানে যাওয়ার পর হয়তো দুই তিনজন ক্ষিপ্ত গডফাদারের টার্গেট প্র্যাক্টিসেও পরিণত হতে পারি আমরা।

ট্রিপ ইনস্যুরেন্স করা আছে তো আমাদের?

আমি জানতাম আমি কিছু একটা ভুলে গেছি, আঙুলে চুটকি বাজিয়ে বলে উঠলো স্যাম।

হুম। তা এই চার্লস এভেরি নামের লোকটাকে নিয়ে ধারণা কী তোমার?

কথাটা শুনে স্কচের গ্লাসটা হাতে তুলে নিলো স্যাম। হাতে নিয়ে গ্লাস নাড়তে নাড়তে গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহগুলো নিয়ে ভাবছে। একটা-দুটো ঘটনা না, বরং সবগুলো ফ্যাক্টস নিয়েই বিবেচনা করছে! টাইমিংই তো সবকিছু, তাই না?

আমিও এই একই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলাম। লোকটা হুট করেই জানতে পারলো যে সে বইটা পাবে না। আর এরপরপরই ঘটলো ডাকাতি ও কিডন্যাপিংর ঘটনাগুলো।

এক ঢোকে গ্লাসটা খালি করে নিলো স্যাম। টেবিলের পাশে থাকা প্যাড এবং কলম হাতে তুলে নিয়ে বলল, এই নামটা আমি সেলমার গবেষণার তালিকায় যুক্ত করলাম। এতে করে শুধু আমরা চার্লস এভেরি সম্পর্কেই না, সাথে সাথে সে কেন এই বইটার ওপর আগ্রহী সেটাও জানতে পারবো।

১১. চার্লস এভেরি

১১.

চার্লস এভেরি তাঁর হতে যাওয়া নতুন সম্পদের তালিকাটা পরীক্ষা করে দেখছেন। রাগে গা জ্বলছে তার। যখন কোনো পুরোনো ও বিরল কোনো গুপ্তধন তিনি নিজের আয়ত্তে আনতে না পারেন, তখন মেজাজ ঠাণ্ডা করেন দেউলিয়া অবস্থার ধারে থাকা কোম্পানিগুলোর খোঁজ নিয়ে। যৎসামান্য বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোম্পানিটা কিনে নিবেন উনি, তারপর একটু একটু করে ধ্বংস করে দিবেন ওটাকে। এবং সাথে সাথে বেশ ভালো অংকের একটা লাভও তুলে আনবেন। অবশ্য এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বেকার কর্মচারীদের হতাহতের ঘটনাও শোনা যায়। কিন্তু সাফল্য পেতে হলে তো কিছু জীবনকে উৎসর্গ করতেই হয়। এটাই ভাবতে পৃষ্ঠাগুলো উলটে উলটে দেখছেন তিনি। ডেস্কের উল্টোপাশে বসে তার মতামতের অপেক্ষা করছে তার প্রধান অর্থনির্বাহী অফিসার।

সংখ্যাগুলোতে বেশ সন্তুষ্ট এভেরি। ফাইলটা বন্ধ করে বললেন, অন্য কেউ কি এগুলোর ওপর আগ্রহ দেখিয়েছে?

না, স্যার। এখনো না।

কোম্পানির সূচনালগ্ন থেকে মার্টিন এডওয়ার্ডস তার প্রধান অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। অর্থায়নের ব্যাপারে মার্টিনের ওপর অগাথ বিশ্বাস রয়েছে তার। তোমার কোনো রিকমেন্ডেশন?

সবকিছু বিবেচনা করলে- কলিন ফিস্ককে রুমের দিকে আসতে দেখে কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলো মার্টিন।

বাধা দেওয়ার জন্য দুঃখিত, মুখে বললেও তার গলার স্বরে দুঃখের ছিটেফোঁটাও নেই, তবে আমার কাছে এমন একটা খবর আছে, যেটা প্রকাশ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারছে না।

ফিস্কের দিকে তাকালেন এভেরি। লোকটার হাবভাব দেখে খবরটা ভালো না খারাপ তা বুঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফিস্কের মুখে কোনো অভিব্যক্তিই নেই। তাই মার্টিনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, সংখ্যাগুলোই তো তাদের হয়ে কথা বলছে। অবশ্য যদি আমার চোখের আড়ালে কিছু থেকে থাকে, তাহলে আলাদা কথা।

না, স্যার। আমার মত হলো, আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিৎ।

তাই করো। আর এখন যদি পারো, আমাদেরকে একটু একা ছেড়ে দাও। ব্যবসাবিষয়ক কিছু কথা আছে আমাদের।

দেরি না করে কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়িই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো মার্টিন।

মার্টিন পুরোপুরি চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করচলেন এভেরি। তারপর ফিস্কের দিকে ফিরে বললেন, কাজটা কি সম্পন্ন হয়েছে?

আমরা বই আর চাবিটা পেয়ে গেছি। রাস্তায় আছে এখন, স্বল্প সময়ের ভিতরেই আপনার হাতে চলে আসবে।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন এভেরি। ফলাফলে বেশ সন্তুষ্ট তিনি। আর ফার্গোরা? তারা কি গল্পটা বিশ্বাস করেছে?

সত্যি বলতে, ঠিক ওভাবে করেনি। তারা আমার লোকদের অনুসরণ করে ওয়্যারহাউজ পর্যন্ত চলে এসেছিলো।

আমাকে জানাও যে তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পালিয়ে গেছে ওরা। আমার দুজন লোকও তাই করেছে। তবে তারা এখন কোনো বড়ো সমস্যার কারণ হবে না।

চেয়ারের হাতলে খাবলে ধরলেন এভেরি। রাগে কোনো কিছু ভেঙে চুরমার করতে ইচ্ছা করছে তার। ফার্গোরা ইতিমধ্যেই তার যথেষ্ট পরিমাণ সময় ও টাকা নষ্ট করেছে। আমি এই গুপ্তধন শিকারীদের ব্যবস্থা হওয়া দেখতে চাই।

এই মুহূর্তে তারা আমাদের জন্য গোলাপের কাটা ছাড়া আর কিছুই না।

কাটাগুলোর বিষাক্ত হয়ে উঠার ক্ষমতা আছে। যদি পরবর্তীতে আমার কোনো অপারেশনে তাদের ছায়া দেখা যায়, তাহলে সরাসরি মেরে ফেলবে।

বস, ইতিমধ্যেই আমার পরিকল্পনাটা কাজ করতে শুরু করেছে।

কী রকমের প্ল্যান?

দুই মহিলাকে জড়িয়ে। পিকারিংর মেয়ে এবং ভাতিজি। এতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের জন্য ওরা বেশ উপকারী দিকই ছিলো। যদি সবকিছু প্রত্যাশামতো এগিয়ে যায়, তাহলে হয়তো এক-দুই দিনের ভিতরেই ভালো কোনো সংবাদ শোনার সম্ভাবনা আছে আমাদের।

.

১২.

জেটের কেবিনে একে-অপরের সামনাসামনি অবস্থানে আছে স্যাম ও রেমি। দুইজনই তাদের সঙ্গ উপভোগ করছে। ওক আইল্যান্ডের ইতিহাস এবং বিখ্যাত মানি পিটের ব্যাপারে জানা তথ্যগুলো স্মরণ করে দেখছে রেমি। আর স্যাম ওদিকে চার্লস এভেরির ব্যাপারে সেলমার পাঠানো রিপোর্টটা পড়ে দেখছে।

বেশ কিছুটা পড়ার পর স্যাম রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কেন যেন লোকটাকে পরিচিত লাগছিলো। এখন মনে পড়েছে, নামটা ফোর্বসে পড়েছিলাম। কর্পোরেশন রেইডিংর মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কামিয়েছে লোকটা। আর যখন রেইডিংর কোনো কাজ না থাকে, তখন উপকূলীয় অ্যান্টিক সংগ্রহ করে। এই ব্যাপারে লোকটা নিজেকে বেশ দক্ষও ভাবে বটে।

তাহলে আমরা কেন আগে লোকটার ব্যাপারে কিছু শুনিনি।

কারণ আগে কখনো আমাদের পথ ক্রস করেনি। আর লোকটা এখন পর্যন্ত যে সংখ্যক মানুষের ব্যবসা অকেজো করে দিয়েছে, তাতে আশা করছি লোকটার সাথে যেন আমাদের কখনোই কোনো দ্বন্দ্ব না হয়।

স্যামের কথা শুনে হেসে উঠলো রেমি। ঠিক তখনই ব্রিও এসে উপস্থিত হলো কেবিনে। ঘুমানোর কারণে বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে এখন তাকে। কিছুটা ভালো লাগছে এখন? রেমি জিজ্ঞেস করলো।

অনেকটাই।

সাইডবোর্ডে থাকা ডিনার দেখিয়ে স্যাম বলল, খেয়ে নাও তাহলে। সেলমা ওদিকে আগামীকাল বিকালের দিকে তোমার বাসায় ফিরে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।

ধন্যবাদ। তারপর টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ওক আইল্যান্ড? আপনারা নিশ্চিত যে ল্যারেইন এই জায়গার কথাই বলেছিলো?

এখন পর্যন্ত পাওয়া সমস্ত তথ্য বিবেচনা করার পর এটাকেই একমাত্র যৌক্তিক উপসংহার বলা যায়। আর বইয়ের এন্ডপেপারে যে ম্যাপটা ছিলো সেটার সাথেও ওক আইল্যান্ডের বেশ মিল আছে। আইল্যান্ডের ব্যাপারে কিছু জানো তুমি?

অল্প কিছুটা। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে দুই কিশোর ওখানে খুঁড়ে কিছু পাথর এবং ওক গাছের গুঁড়ি খুঁজে পেয়েছিলো। এরপর থেকেই অবাস্তব গুপ্তধনের আশায় শিকারিদের খোঁড়াখুঁড়ি চলছে ওখানে।

হ্যাঁ, সতেরোশো পঁচানব্বই সালের কথা ওটা, বলল রেমি। সত্যি বলতে, পাইরেটস অ্যাণ্ড প্রাইভেটিয়ার্সও তখনই এসেছিলো বাজারে।

কাকতালীয় ঘটনা? ব্রি জিজ্ঞেস করলো।

রিপোর্টের কাগজটা থেকে চোখে তুলে তাদের দিকে তাকালো স্যাম। আমার মত জানতে চাও? হ্যাঁ, কাকতালীয় ব্যাপারই। সত্যি বলতে, আমার কখনো মনে হয়নি যে ওক আইল্যান্ডে কোনো গুপ্তসম্পদ আছে। আর বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের গবেষণার প্রতিবেদনও আমার ধারণার স্বপক্ষেই কথা বলছে।

টেবিল থেকে দ্বীপের ব্যাপারে লেখা কাগজগুলোর একটা হাতে তুলে নিলো ব্রি। বলল, তাহলে এভেরির লোকেরা ওখানে যাচ্ছে কেন? ধরে নিলাম চার্লস এভেরিই রয়েছে এসবের পিছনে।

এগুলো পড়ে যা বুঝলাম, সেলমার পাঠানো কাগজগুলো দেখিয়ে বলছে স্যাম, তাতে আমি নিশ্চিত এসব এভেরিরই কাজ। আর যদি তাদের ওখানে গিয়ে গুপ্তধন খোঁজার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে থাকো-তাহলে বলবো, সবাইই কিন্তু প্রমাণের ওপর বিশ্বাস করে না।

ট্যাবে ডাউনলোড করা পাইরেটস বইয়ের ছবিগুলো থেকে কিছু একটা খুঁজছে স্যাম। এন্ডপেপারের আড়ালে থাকা ম্যাপের ছবিটা খুঁজে বের করে বাড়িয়ে দিলো বির দিকে। তারপর ও আইল্যান্ডের আসল ম্যাপটা দেখিয়ে বলল, আমার মতটা অবশ্য বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করা না। তবে ম্যাপদুটো দেখো। বইয়ের ম্যাপটার সাথে অদ্ভুত মিল রয়েছে ওক আইল্যান্ডের। তারপর স্যামের দিকে ফিরে বলল, এমনকি, তোমাকেও মানতে হবে যে ম্যাপদুটো আসলে দেখতে প্রায় একই রকম।

ম্যাপটার সাথে কিন্তু আটলান্টিকে থাকা অন্যান্য ছোটোখাটো দ্বীপেরও মিল আছে। ঐসময় স্যাটেলাইট ছবি তোলার ব্যবস্থা থাকলে ভালোই হতো।

রেমি অবশ্য এতে ক্ষেপে যায়নি। ওক আইল্যান্ডে পাওয়া ঐ সাইফার স্টোনটার ব্যাপারে কী বলবে যেটায় লেখা ছিলো দ্বীপের মাটির চল্লিশ ফুট গভীরে দুই মিলিয়ন পাউন্ড লুকিয়ে আছে?

তুমি কি ঐ রহস্যময় পাথরটার কথা বলছে যেটা হুট করেই পিটে পাওয়া গিয়েছিলো? যেটা কেউ কখনো দেখিনি-হুঁট করেই হাজির হয়ে গেলো। ওটার তো মিথ্যা গুজব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ওক আইল্যান্ডের গুপ্তধনের ব্যাপারে স্যামের অনাগ্রহের ব্যাপারটা ভালো করেই জানে রেমি। দেখে হয়তো ওরকমই মনে হবে। তবে যাই হোক, আমাদের কিডন্যাপাররা তো নিশ্চয় কোনো কারণ ছাড়া ঐদিকে যায়নি। তাই আমাদেরও ঐ দ্বীপটার ব্যাপারে সব গল্পই জেনে রাখা উচিৎ। আর এটাও যদি তোমার আগ্রহ বাড়ানোর মতো যথেষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে ওখানে থাকা শিপরেকগুলো হয়তো তা বাড়াতে পারবে। আমরা যেটা খুঁজছি সেটাও হয়তো কপাল ভালো হলে ওখানেই থাকতে পারে।

টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে রেমির দিকে ফিরে বলল, আপনাদের সাহায্য করতে পারলে আমি খুশি হব।

এবং আমরাও তোমার সাহায্য পেলে খুশি হব। স্যাম?

হ্যাঁ, অবশ্যই। বির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল স্যাম। রেমি ঠিকই বলেছে। আমরা কী ভাবছি সেটা আসলে কোনো বিষয়ই না। তারা যদি ওদিকে গিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই কোনো কারণেই গেছে। আর গত কয়েকদিনে তারা আমাদের যতটা বিপদের মধ্যে ফেলেছে-বিশেষ করে তোমাকে-এরপর আমি এখন শুধু কারণটাই বের করতে চাচ্ছি।

অবশ্য অল্প সময়ের ভিতরেই নোভা স্কশিয়ায় পৌঁছে যাওয়ায় দ্বীপের রহস্যের ব্যাপারে খুব একটা বেশি কিছু জানতে পারলো না ওরা। এটুকুই জেনেছে যে গত কয়েক শতাব্দী ধরে অনেকেই মানি পিট খোঁড়ার কাজে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তাদের বিশ্বাস মানি পিটের মাটির নিচে নাকি গুপ্তধন লুকানো আছে। রেমি আশা করছে স্বশরীরের দ্বীপে গেলেই হয়তো ওরা আরো বেশি কিছু জানতে পারবে।

পরদিন সকালে হ্যাঁলিফ্যাক্স থেকে ভাড়া করা গাড়িতে করে ম্যাহোন বের পশ্চিমা উপকূলে অবস্থিত ওক আইল্যান্ডের দিকে যাত্রা করলো স্যাম ও রেমি। ব্রি আসেনি তাদের সাথে। জেট ক্রুদের সাথেই রয়ে গেছে ও। বলেছে, ওখানেই নাকি ও বেশি নিরাপদবোধ করছে।

সেলমার মাধ্যমে বিখ্যাত মানি পিট টুরের দুটো স্পট রিজার্ভ করে নিয়েছে ওরা। গন্তব্যে পৌঁছুতে বেশিক্ষণ লাগলো না। গাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রেমি স্যামকে জিজ্ঞেস করলো, পর্যটকদের ভিড়ে থাকাটা কি ঠিক হবে বলে মনে হয় তোমার?

রেমির উদ্বেগ বুঝতে পেরে তাকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো স্যাম। তারপর নিশ্চয়তা দিয়ে বলল, ব্রি আর ল্যারেইনকে আক্রমণ করা মানুষগুলো কিন্তু চাক্ষুস সাক্ষী না রাখার ব্যাপারে বেশ সতর্ক ছিলো। একটু ভেবে দেখো তুমি। তারা যদি এখন এই ট্যুরে থেকেও থাকে, তাহলেও কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যে কিছু করতে পারবে না। যদিও আমার মনে হয় না যে তারা এখানে আসবে। তারপরও যদি আসে, তাহলে এই ভিড়ই আমাদের নিরাপদে রাখবে।

হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। আর জায়গাটায় আসলেই প্রচুর প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতি রয়েছে। রেমি জানতে দ্বীপটা বেশ জনপ্রিয়, কিন্তু কখনো ভাবেনি যে দুইঘণ্টা ওয়াকিং টুরের জন্য এতো মানুষ জড়ো হবে। আবহাওয়াটা খুবই চমৎকার। আকাশ পুরোপুরি নীল, মেঘমুক্ত। সাথে বইছে মৃদু বাতাস।

পুরুষ, মহিলা ও বাচ্চা সবাই জড়ো হয়েছে এখানে। কারো হাক শুনে সবাইই ফিরে তাকালো শব্দের দিকে। হাকটা তাদের টুরিস্ট গাইডের। গাইডের বয়স অল্প, বিশের কোঠায় হবে খুব সম্ভবত। তার ডাক শুনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পর্যটকরা এসে এক জায়গায় জড়ো হতে শুরু করেছে। রেমি আর স্যামও এসে দাঁড়ালো ভিড়ের পিছন থেকে। প্রায় ত্রিশ জনের মতো পর্যটক আছে এখানে। ভিড়ের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো রেমি। বলল, বেশ ভালোই জনপ্রিয় দেখছি জায়গাটা।

আসলেই। তবে এর মধ্যে পরিচিত কোনো মুখ দেখতে পেয়েছো?

পরিচিত মুখ বলতে এভেরির লোকদের বুঝিয়েছে স্যাম। রেমি এটা ধরতে পেরে বলল, না। আর আমরা আসলে কী খুঁজছি এখানে?

ভালো একটা প্রশ্ন। সময় গড়ালেই হয়তো জানা যাবে।

আগ্রহের ভান ধরে গাইডের কথা শুনছে ওরা। গাইড এখন দ্বীপের ইতিহাসের ইতিবৃত্তান্ত শোনাতে শোনাতে দ্বীপের দক্ষিণ দিকে থাকা একমাত্র ওক গাছটার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দলটাকে। যদি ইতিহাসের বক্তব্যগুলো সঠিক হয়ে থাকে, গাইড বলছে, পিটে সর্বপ্রথম খুঁড়া ছেলেরা মাটির নিচে কয়েকস্তর বিশিষ্ট বিদেশী পাথর এবং প্রতি দশ ফুট দূরে দূরে বেশ কিছু ওক গাছ আবিষ্কার করেছিলো। প্রায় ত্রিশ ফুট পর্যন্ত খুঁড়ার পর হাল ছেড়ে দিয়েছিলো ওরা। তারপর উনিশ শতকের শুরুর দিকে তাদের একজনের পুনরায় মনে পড়ার আগ পর্যন্ত গর্তটা ওভাবেই পড়েছিলো। এর আগ পর্যন্ত কেউ আর স্পর্শও করেনি। এরপর থেকেই শুরু হলো হাজার হাজার মানুষের টাকা খরচ করে এখানে খুঁড়ার কাজ। ঐ দুই ছেলের কেউ ধারণাও করতে পারেনি যে ভবিষ্যতে জায়গাটায় খননের জন্য প্রচুর পরিমাণ অর্থের খরচ করবে মানবজাতি। আর খনন করে কী খুঁজছে সবাই? কী রহস্য লুকিয়ে আছে এখানের মাটির নিচে? টেম্পলারদের গুপ্তধন? নাকি ভুলে যাওয়া কোনো যাজকের সমাধিকক্ষ? নাটকীয়ভাবে বলে থেমে গেলোলোকটার। তারপর ধীরে ধীরে বলল, কেউ জানে না তা। তবে ওক আইল্যান্ডের নতুন মালিকেরা সেটা বের করার জন্য বেশ তৎপর হয়েই নেছে। আর আপনারা কী করবেন সেটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারও আমরা আপনাদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি। এখন আপাতত উপভোগ করুন জায়গাটা। আসুন আমার সাথে…।

বলে সবাইকে নিয়ে পিটের ভিতরের দিক বরারব এগিয়ে যাচ্ছে এখন। হাঁটতে হাঁটতে জায়গাটার ব্যাপারে আরো ইতিহাস বলছে গাইড লোকটা। তবে অজানা কোনো ইতিহাস জানা গেলো না গাইডের থেকে। ইন্টারনেট ঘেটে যতটুকু জানা গেছে, গাইডও সেগুলোই বলছে। পিট, চিহ্ন সম্বলিত কিছু পাথর, কেউ বেশি খুঁড়ে ফেললে সুড়ঙ্গের মাধ্যমের গর্তের পানিতে ভরে যাওয়া… সবই আগে থেকে জেনে এসেছে ওরা।

সত্যি বলতে, দুইঘন্টার ভ্রমণটাকে পুরোপুরি সময়ের অপচয় বলে মনে হচ্ছে তাদের। হাঁটতে হাঁটতে এখন বাইরের উপকূলে এসে উপস্থিত হয়েছে পর্যটকের ভিড়টা। এখানেও রহস্যময় চিহ্নসম্বলিত একটা পাথর রয়েছে। মানি পিটের দিকে নির্দেশ করে আছে পাথরের মুখটা। পাথরের উপস্থিতিটা মানি পিটের কিংবদন্তিকে আরো জোরালো একটা মাত্রা দিচ্ছে। ঠিক তখনই স্যাম রেমি বলে উঠলো, শুনেছো?

পানির ওপর থেকে মোটরবোটের জোরালো শব্দ ভেসে আসছে।

ওখান থেকে আসছে, বলে তাদের থেকে পূর্ব দিকে থাকা একটা ছোটো দ্বীপের দিকে নির্দেশ করলো স্যাম। রেমি ওদিকে তাকিয়ে দেখলো একটা মোটরবোটে করে দুইজন পুরুষ দ্বীপটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ঐ ডাকাতগুলোই কি? জিজ্ঞেস করলো ও। স্যাম ওদিকে বাইনোকুলার দিয়ে তাকিয়ে আছে লোকগুলোর দিকে।

দেখে তো তাই মনে হচ্ছে, বলে বাইনোকুলারটা রেমির দিকে বাড়িয়ে দিলো স্যাম।

বাইনোকুলারের ফোকাসটা ঠিক করে ওদিকে তাকালো রেমি। দেখলো দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের ধারের পানিতে একটা বোটে ভেসে আছে। বোট থেকে ব্যাকপ্যাক ও কোদাল নিয়ে একজনকে নামতে দেখলো ও। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কিছু একটা খুঁজছে লোকটা। লোকদুটোকে চিনতে কোনো সমস্যা হলো না তার। আমাদের বই ডাকাত এবং নকল পুলিশদের একজন।

স্পষ্টতই তারা এমন কিছু একটা জানে যেটা আমরা জানি না।

আরো কিছুটা হেঁটে গিয়ে হঠাৎ করেই রেমিকে ভিড় থেকে সরিয়ে আনলো স্যাম। পিটের দিকে না গিয়ে বরং এখন গাছের সারির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে তাকিয়ে আছে অন্য দ্বীপে থাকা লোকদুটোর দিকে।

কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে ওরা, বলল ও। বড়ো পাথরটার পিছনে খুঁড়ছে এখন।

এক্সকিউজ মি, হঠাৎই কেউ একজন বলে উঠলো তাদের পিছন থেকে। আপনাদের তো এখানে থাকার কথা না।

তাকিয়ে দেখে ট্যুর গাইডদের একজন দাঁড়িয়ে আছে তাদের থেকে কয়েক ফুট দূরে।

দুঃখিত, স্যাম বলল, আমরা বুঝিনি যে…

অন্যদের সাথে জড়ো হওয়া উচিৎ আপনাদের।

গাইডকে অনুসরণ করে আবারো দলটার সাথে এসে একত্রিত হলো ওরা।

স্যাম গাইডের কাছে জানতে চাইলো, ওখানে একটা দ্বীপ দেখলাম। নাম কী ওটার?

গাইড স্যামের নির্দেশ করা দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে বলল, ওটা? ওটা ফ্রগ আইল্যান্ড।

রেমি জানতে চাইলো, ওক আইল্যান্ডের রহস্যের কোনো অংশ ওটা?

এখানের কোন অংশটা রহস্য না?

নির্দিষ্ট কোনো রহস্য আছে ওটাকে ঘিরে?

রেমির দিকে ভালো করে তাকালো লোকটা। তারপর বলল, সত্যি বলতে এমন কিছু গুজব চালু আছে। একটা সময় নাকি ফ্রগ আইল্যান্ডের সাথে এক আইল্যান্ডের কানেকশন ছিলো। পানির নিচের কোনো সুড়ঙ্গের মাধ্যমে। যদিও আমি ভেবে পাই না কোনো ধরনের ফ্লাডিং ঘটানো ছাড়াই কিভাবে সম্ভব এটা। হয়তো কেউ গুপ্তধনের আশা খুঁড়ছিলো, আর তখনই নতুন গুজবটা চালু হয়েছে। বলতে বলতে তটরেখার দিকে নির্দেশ করলো লোকটা। বোট দাঁড়িয়ে থাকা ঐ উপসাগরটা দেখতে পাচ্ছেন? গুজব অনুযায়ী ওখানেই নাকি সুড়ঙ্গটা বানানো হয়েছিলো।

স্যাম ও রেমি তাকালো ওদিকে। দেখলো যে লোকদুটো এখন আবার বোটের কাছে ফিরে গেছে। তাদের ব্যাগ ও কোদালগুলো ছুঁড়ে রাখছে বোটে। আপনার কি এই গুজবটা সত্য বলে মনে হয়? রেমি জানতে চাইলো।

হেসে উঠলো লোকটা। অবশ্যই আশা করি আমি। যদিও মানুষকে টাকা অপচয় করে এখানে খুঁড়াখুঁড়ি করতে দেখে খারাপই লাগে। একই জায়গায় জায়গায় বছরের পর বছর ধরে একই জিনিস খুঁজে যাচ্ছে ওরা। কে জানে হয়তো জিনিসটা এখানে নেইও।

ভালো বলেছেন, বলল রেমি। এরপর আরো কিছুক্ষণ কথা বলে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে আবারো দলটার সাথে গিয়ে যুক্ত হলো লোকটা। গাইড চলে যেতেই গাছের ফাঁক দিয়ে আবারো দ্বীপটার দিকে তাকালো রেমি। বোটটা চোখের আড়াল হয়ে যেতে শুরু করেছে। দৃশ্যটা দেখে স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, তো, এখন কী?

রাতে আবার আসবো এখানে এবং খুঁজে দেখবো ঐ দ্বীপটাতে তাদের আগ্রহ জাগানোর মতো এমন কী আছে!

.

১৩.

হোটেলে ফিরে রেমির ট্যাবলেটে করে সেলমাকে স্কাইপ করলো স্যাম।

শুভ সকাল, মি, ফার্গো, তার ডেস্ক থেকে বলল সেলমা। আপনি জেনে হয়তো খুশি হবেন, ব্রি নিরাপদেই তার ফ্লাইটে চড়তে পেরেছে। আর কয়েকঘন্টার মধ্যেই এখানে এসে ল্যান্ড করবে।

চমৎকার, বলল স্যাম।

রেমিও সোফায় স্যামের পাশে বসে বলল, তো, এখন পর্যন্ত কী কী থিউরি আবিষ্কার করেছো তুমি?

লাযলো বলছে সাইফার হুইলটা নাকি খুবই সহজ একটা সাবস্টিটিউশন কোড।

ঠিক তখনই পর্দায় সেলমার পিছনে দাঁড়ানো লাযলোর মুখটা দেখতে পেলো ওরা। চমৎকার দেখিয়েছেন আপনারা দুইজন, বলল লাযলো, কণ্ঠে কড়া ব্রিটিশ টান মিশে আছে। মিস মার্শাল আমাকে আপনাদের সময়মতো ছুটে আসার ব্যাপারে জানিয়েছে। নিশ্চয় খুব ভয়ঙ্কর ছিলো ঘটনাটা।

হ্যাঁ, ওরকমই বলা যায়, স্যাম বলল। এখন সাইফারটার ব্যাপারে…?

ওহ হ্যাঁ। গুপ্ত ম্যাপটা অনুযায়ী আমার যেটা মনে হয়, আপনারা যে শিপরেকটা খুঁজছেন সেটা দ্বীপের দক্ষিণ দিকে রয়েছে। বলে কয়েকটা কাগজের ভিতর থেকে এন্ডপেপারের পিছনে লুকিয়ে রাখা ম্যাপের ছবিটা তুলে দেখালো। লেখার কিছু অংশের অর্থ বের করেছি আমি, তবে পুরোটা করতে পারিনি। পুরোটা করতে হলে চাবি মানে সূত্রটা লাগবে আমার। দুঃখের বিষয় প্রফেসর ম্যাপে থাকা সাইফার হুইলের যে ড্রয়িংটা খুঁজে পেয়েছে ওটা শুধুই একটা ছবি মাত্র। যতটুক জেনেছি সত্যিকারের একটা সাইফার হুইলের অস্তিত্বও আছে। ধারণা করা হয় জাহাজডুবিতে হারিয়ে গেছে ওটা।

দীর্ঘশ্বাস ফেললল রেমি। কখনোই সহজ কিছু না, তাই না?

স্যাম জিজ্ঞেস করলো, জাহাজ ডুবার জায়গাটা কি বের করতে পেরেছো?

দ্বীপের ম্যাপ দেখে আমি বের করার চেষ্টা করছি এটা কোথায় পড়ে আছে বা এটা কোথায় ডুবেছিলো। ধরে নিচ্ছি, আমি অর্থটা ঠিকমতোই ধরতে পেরেছি। লেখাটায় একটা শব্দ দুইবার এসেছে, সারপেন্স। ল্যাটিন শব্দ। এটার মানে হতে পারে সাপ, ড্রাগন বা নাগ।

এটার তো কোনো নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার কথা, স্যাম বলল।

অনেকটাই, বলে সেলমার ট্যাবলেটটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো লায়লো। আরো একটা শব্দও এসেছে, যেটাতে মনে হয়েছে এটা হয়তো দ্বীপের দক্ষিণ বা এর আশেপাশের কোনো অংশে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

কথাটা শুনেই একে অপরের দিকে তাকালো স্যাম ও রেমি। এজন্যেই হয়তো তারা ওখানে খুঁড়াখুঁড়ি করছিলো, বলল রেমি।

কারা? লাযলো জানতে চাইলো।

এভেরি লোকেরা। ওক আইল্যান্ডের পাশের দ্বীপে দেখেছিলাম ওদেরকে। তারপর তারা কী কী দেখেছে সেটা লাযলো ও সেলমাকে ভেঙে বলল রেমি।

আহ, তারা দেখছি সাইফারের অর্থ বের করার দিক দিয়ে আমাদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছে। আশা করছি তারা এখনও আসল সাইফার হুইলটা খুঁজে পায়নি। আমি নিশ্চিত কোনো অবস্থান জানি না। তবে তারা যদি ওখানে খুঁড়ে থাকে, অন্ততপক্ষে এটুক নিশ্চিত যে আমরা ঠিক পথেই আছি, লাযলো বলল।

তখন পর্দায় আবার সেলমার মুখ ভেসে উঠলো। বলল, আমরা আরো কিছু জানতে পারলে সাথে সাথেই জানিয়ে দিবো আপনাদের।

রেমি বলল, তোমাদের ওপর সেই বিশ্বাস আছে আমার।

আর এই ফাঁকে, সেলমাকে বলছে স্যাম, আমাদের জন্য একটা মোটরবোটের ব্যবস্থা করে দেও। খুব বড়ো কিছু না, আমরা দুইজন নড়াচড়া করতে পারবো এমন আকৃতির হলেই চলবে।

ওকে, ব্যবস্থা করছি, সেলমা জানালো। আরো কোনো সরঞ্জাম?

আমার মনে হয় না আর কিছু লাগবে, স্যাম বলছে। আমাদের কাছে ওয়েটস্যুট এবং ডাইভ গিয়ার আছে। আমার মনে হয় এটাই জানতে চাইছিলে তুমি।

বলে স্যাম কলটা কেটে দিতে যাবে, ঠিক তখনই রেমি বলে উঠলো, ইনস্যুরেন্সের কথা ভুলো না।

কথাটা সেলমার ভ্রু কুঁচকে গেছে কিছুটা। ইকুইপমেন্টগুলো আপনারা যেভাবে ব্যবহার করেন, এরপরও কি এটা আর বলা লাগে? সাথে পুরো পরিকল্পনাটাও জানিয়ে দেন, যাতে করে কোনো বিপদ ঘটলে আপনাদের খুঁজে বের করতে পারি।

সেলমার কথা শুনে অপমানিত হওয়ার ভান করে স্যাম বলল, আমাদের ওপর তোমার এতো কম ভরসা জেনে দুঃখ পেলাম।

আপনাদের ওপর না, মি, ফার্গো। আপনারা যেই ধরনের মানুষের সাথে লেগেছেন তাদের ওপর ভরসা নেই। লোভী লোক সবাই। আর লোভই তাদের মনে শয়তানের সৃষ্টি করেছে।

****

সূর্যোদয়ের দুই ঘন্টা পূর্বে ওয়েটস্যুট পরে সতেরো ফুট দৈর্ঘ্যের বোস্টন ওয়ালারে চড়ে বসলো স্যাম ও রেমি। ম্যাহোন বের উত্তর প্রান্তের গোল্ড রিভার ম্যারিনা থেকে ফ্রগ আইল্যান্ডের দিকে যাত্রা করেছে ওরা। যদিও তাদের যানটা খুব দ্রুতগতির না, তারপরও সূর্যোদয়ের পূর্বেই গন্তব্যে পৌঁছে অন্যান্য বোটদের সাথে মিশে যেতে পারবে।

যদিও ওক আইল্যান্ডের গাইড বলেছিলো যে দুটো দ্বীপের মধ্যে একটা আন্ডারওয়াটার প্যাসেজ আছে, তবে স্যাম বা রেমি কেউই এটা বিশ্বাস করতে পারেনি। সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর কারো ওরকম দক্ষতা ছিলো বলে মনে হয় না ওদের।

তবে এটা ছাড়াও ফ্রগ আইল্যান্ডের প্রতি স্যামের আকর্ষণ জাগার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কারণ রয়েছে। বিগত শতাব্দীগুলোতে নোভা স্কশিয়ার অঞ্চলজুড়ে নাবিকদের বেশ আনাগোনা ছিলো। ফ্রেঞ্চ, ইংরেজদের থেকে শুরু করে জলদস্যুদের সবাই ই চলাফেরা করতো এদিক দিয়ে। গুজব আছে এদিকের কোথাও নাকি গুপ্তধন লুকানো আছে। এজন্যেই ওক আইল্যান্ডটা এদিককার খুবই জনপ্রিয় একটা জায়গা।

কিন্তু ফ্রগ আইল্যান্ড? এখানকার অন্যান্য অসংখ্য ছোটো দ্বীপগুলোর মতো এটাও ব্যক্তি মালিকানার অধীনে রয়েছে। দ্বীপের দক্ষিণ পাশেই একটা বোসর বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। খুব সম্ভবত কারো ভ্যাকেশন হাউজ ওটা। স্যাম আশা করছে, এখন হয়তো ঐ বাড়িটায় কেউ নেই। যদিও তারা ওখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করবে না, তারপরও অন্য কারো উপস্থিতি না থাকলেই ভালো।

বোটটা দ্বীপের একদম দক্ষিণ কোণ ঘেষে থাকা উপসাগরটার দিকে দিক ঘুরিয়ে নিলো স্যাম। এভেরির লোকদের দেখা জায়গাটা ভালো করে দেখতে চাচ্ছে ওরা। লোকগুলো ওখানে কী করছিলো তা হয়তো যে কেউই আন্দাজ করতে পারবে, কিন্তু তারা যেভাবে খুঁড়ছিলো তাতে স্যামের সন্দেহ তারা আসলেই লাযলোর বলা সাইফার হুইলটা খুঁজছিলো কিনা।

দেখো, আকাশের দিকে নির্দেশ করে বলল রেমি। আবোরা বোরাইলিস।

ওপরে তাকালো স্যাম। যদিও আকাশটা ছাড়া ছাড়া মেঘে ঢেকে আছে, তারপরও একটা ক্ষীণ সবুজাভ আভা দেখা যাচ্ছে আকাশে। ধীরে ধীরে স্পন্দিত হচ্ছে আভাটা। কপাল খারাপ যে আকাশটা পরিষ্কার না।

নাই মামার চেয়ে তো কানা মামা ভালো। এই মুহূর্তে মেঘটা আমাদের ভালোই উপকারে দিবে। চাঁদের আলোয় কারো চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই আপাতত।

যুক্তি আছে তোমার কথায়। উপসাগরের কাছে পৌঁছেই বোটের গতি কমিয়ে দিলো স্যাম।

আরেকটু কাছে পৌঁছে উপকূলের ধারের দিকে আলো ফেললো রেমি। দেখে মনে হচ্ছে ওরা এই জায়গাটাতেই খুঁড়াখুঁড়ি করছিলো। ঐ হার্ট-শেপড় পাথরটার কথা মনে আছে আমার।

ওটা হার্ট? পানির ধারে থাকা প্রকাণ্ড পাথরটার দিকে তাকিয়ে বলল স্যাম। গ্রুটলের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে। বোটটা এখন ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে এগুচ্ছে শুধু। ওটাকে দেখতে তো দুই কুঁজওয়ালা উটের পিঠের মতো মনে হচ্ছে আমার কাছে।

তোমার রোমান্সের কোনো সেন্সই নেই, ফার্গো।

যদি বলি আরোরা বোরাইলিসটা আমি তোমার জন্য অর্ডার করে এনেছি?

দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার লাইন হারিয়ে ফেলেছে।

আমার তো মনে হয় এটা বেশ ভালো একটা লাইন।

আরে তোমাকে বলিনি। দেখো একটা ফিশিং লাইন। কেউ তার মাছধরা বঁড়শি ফেলে গেছে। বলে স্যামকে দেখানোর জন্য পাথরের গোড়ায় আলো ফেলল রেমি।

কিন্তু কিছু পাথর ও ঢেউয়ের আছড়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না স্যাম। কই?

ঐ হার্ট… মানে উটের কুঁজের মতো পাথরটা থেকে এক ফুট দূরে। গোড়ার বাম দিকে দেখো। হালকা শেওলা বা এমন কিছু লেগে আছে ওটার সাথে।

এবার দেখতে পেয়েছে স্যাম। পানির ধারা থেকে ছয় ইঞ্চি ওপরে একটা নাইলনের সুতোতে হালকা শেওলা বা অন্য কোনো সামুদ্রিক উদ্ভিদের অংশ লেগে আছে। সুতোটা খুব সম্ভবত পাথরটার আড়ালের কোনো কিছুতে বেঁধে রাখা হয়েছে। আলো পড়ায় চকচক করছে সুতোটা। সুতোটা অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালো স্যাম। বাম দিকে গিয়ে গায়েব হয়ে গেছে ওটা। ডানে তাকালো, এদিকেও একই অবস্থা।

সুতোটা নিশ্চিতভাবেই শক্ত কিছুতে বেঁধে রাখা হয়েছে। স্রোতের প্রভাবে তাদের বোটটা দোল খেলেও, সুতোটা একদম স্থির হয়ে আছে।

পাগল বা প্যারানয়েড যাই বলো আমাকে, বলতে বলতে ভালো করে দেখার জন্য বোটটা পাথরের একপাশে সরিয়ে নিচ্ছে স্যাম, আবার বেশি কাছে যেন চলে না যায় সেদিকেও সতর্ক রয়েছে, ওটাকে দেখে আমার ট্রিপওয়্যার জাতীয় কিছুই মনে হচ্ছে।

তোমার কি মনে হয় তারা কোনো বোমা পেতে রেখেছে?

নিশ্চিতভাবেই কাজটা করার মতো যথেষ্ট সময় পেয়েছে ওরা। তবে এর থেকেও বড়ো প্রশ্ন হলো, তারা কি জানতো যে আমরা এখানে এসে খোঁজার চেষ্টা করবো? নাহলে এরকমটা করার কারণ কী?

তোমার ধারণা তারা আমাদের জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে? বলে আলোটা বড়ো পাথর এবং এর পিছনে পড়ে থাকা ছোটো ছোটো পাথরের স্তূপটার ওপর তাক করে ধরলো রেমি।

স্যাম দেখতে পেলো নাইলনের সুতোর মতো তারটা পাথরের স্তূপের মধ্যে গিয়ে গায়েব হয়ে গেছে।

আমরা আসলেই গাধা, হঠাৎ বলে উঠলো রেমি। অবশ্যই তারা ফাঁদ পেতে রেখেছে। নাহলে এমনটা করবে কেন? তাদের বোটের ইঞ্জিনের শব্দটা প্রচুর জোরালো ছিলো। আমরা যেন শব্দটা শুনে তাদেরকে দেখতে পারি, তাই এমনটা করেছিলো। তারা জানতোই যে আমরা এখানে খুঁজতে আসবো…

তোমার আলো আর কতোটা দূরে যেতে পারবে? আলোকরশ্মিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

উপসাগরের বাম দিকে আলোটা সরিয়ে নিলো রেমি। একটা মরা দেবদারু গাছ পড়ে আছে পানিতে। দূর থেকেও গাছের শাখা প্রশাখায় পেঁচিয়ে রাখা তারটা হালকা হালকা দেখতে পাচ্ছে ওরা। যতদূর মনে পড়ে তাদেরকে ওদিকটায় একবার যেতে দেখেছিলাম আমি।

পাথরটাকে ডান দিক থেকে পাশ কাটিয়ে বোটটা দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে নিলো স্যাম। নাইলনের সুতোর মতো তারটা গাছ পেরিয়ে তীরের কাছে থাকা পানি পর্যন্ত চলে গেছে। এর মানে হলো কেউ যদি তীরের কাছে ঘেষার চেষ্টা করে, তাহলেই…আমাদের তদন্ত বাদ দেওয়া উচিৎ এখন। ফিরে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো দরকার। দক্ষরাই বোমাগুলো সামলাক।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছো, বলে লাইটটা বন্ধ করে দিলো রেমি।

বোটটা ঘুরিয়ে নিলো স্যাম। উত্তর-পশ্চিম দিক বরাবার এগিয়ে যাচ্ছে। ওক আইল্যান্ডের উত্তর প্রান্তের কাছাকাছি যেতেই দেখতে পেলো, অন্য একটা যান এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।

স্যাম…।

আমিও দেখতে পাচ্ছি, বলে থ্রটল টেনে দক্ষিণ দিকে ঘুরাতেই দেখালো ওক আইল্যান্ডের দক্ষিণ দিক থেকেও দ্বিতীয় আরেকটা নৌযান ধেয়ে আসছে তাদের দিকে।

কী করবে বুঝতে না পেরে মানি পিটের কেন্দ্রে জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল আলোটার দিকে তাকালো স্যাম। তারপর ফিরে তাকালে দুই পাশ থেকে ধেয়ে আসতে থাকা বোটদুটোর দিকে। বুঝতে পারছে না মানিপিটের দিকেই যাত্রা করবে কিনা।

অবশ্য অটোমেটিক অস্ত্রের মাজলের ঝলকানি দেখেই দুঃশ্চিন্তাটা তার মাথা থেকে দূর হয়ে গেছে।

সময়মতো মানিপিটে গিয়ে পৌঁছুতে পারবে না তারা। অন্তত এই আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে এগুনো সম্ভব না। আর তাছাড়া এই ফিশিং বোটের গতিও তাদেরকে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার মতো যথেষ্ট না।

শক্ত করে বোটের ধার আঁকড়ে ধরে রেখেছে রেমি। এই মুহূর্তে আশা করছি তুমি কোনো চমৎকার ও কার্যকরী প্ল্যানের কথা বলবে আমাকে।

স্যরি।

না, আমি এটা শুনতে চাইনি।

বোটদুটোকে আরেকবার দেখে ফগ আইল্যান্ডের দিকে ফিরে তাকালো স্যাম। বুঝতে পারছে যে শত্রুরা তাদেরকে ধাওয়া করে বোমাগুলোর দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। আচ্ছা, এটাই হবে তাহলে, মনে মনে বলে বোটটা ফ্রগ আইল্যান্ডের দিকে ঘুরিয়ে নিল স্যাম।

রেমি, বোটের হুকটা নিয়ে আসো, স্টেয়ারিং হুইল ঘুরাতে ঘুরাতে বলল স্যাম। বড়ো পাথরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ও।

স্যাম

আমি বোটটা সরাসরি ঐ ট্রিপওয়্যারের দিকেই নিয়ে যাচ্ছি।

পানির চাপ

যদি পানিতে সুতোটার সাথে কোনো বোমা বেঁধে রাখা থাকে, তাহলে পানিতে চাপ পড়লেই মরতে হবে তাদেরকে। এই ক্ষেত্রে অবশ্য স্যাম আশা করছে বোমাটা পানিতে নেই। বড়ো পাথরে আড়ালে রয়েছে বোমাটা, যেহেতু সুতোর লাইনটা ওখান পর্যন্ত গিয়েই গায়েব হয়ে গেছে। একটা ঝুঁকি! যদিও জায়গাটাতে একের অধিক বোমা থাকারও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আছে কিনা সেটা জানার উপায় একটাই। এমন না যে এগুলো নিয়ে সে রেমিকে জিজ্ঞেস করবে। তাদের যদি মরতেই হয়, তাহলে সেটা অজানা থাকলেই বেশি ভালো। তোমার কি মনে হয় মরা গাছটা পর্যন্ত পৌঁছার আগ পর্যন্ত তুমি শ্বাস আটকে রাখতে পারবে?

গাছটার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো রেমি।

হুক দিয়ে বোটের স্টেয়ারিং হুইলটা আটকে দিলো স্যাম, যাতে করে বোটের গতিপথ পরিবর্তিত না হয়।

আচ্ছা, তাহলে প্রস্তুত হও লাফ দেওয়ার জন্য।

.

১৪.

ধেয়ে আসতে থাকা বোর্টগুলোর দিকে একবার তাকালো স্যাম। বন্দুকের মাজলের আরো আলোক ঝলকানো দেখা যাচ্ছে। সে আশা করছে এগিয়ে আসা লোকগুলো হয়তো তাদেরকে বোটের পাশ দিয়ে নেমে যেতে দেখবে না। রেডি?

রেডি।

তারপর বোটের ধার পেরিয়ে টুপ করে পানিতে নেমে পড়লো দুইজনই। ওদিকে বোটটা ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।

ঠাণ্ডা পানিতে পড়েই সাঁতরাতে শুরু করলো স্যাম। রেমিও যে তার পাশে। পাশে সাঁতরে আসছে সেটাও টের পাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পরই বিকট শব্দের সাথে পানিকে জ্বলে উঠতে দেখলো ওরা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় পানিতে কম্পন অনুভব করতে পারছে। বিস্ফোরণের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে পানিতে। আগের থেকেও আরো দ্রুত হাত-পা চালানো শুরু করেছে ওরা। স্যাম শুধু আশা করছে বোটের গলুইটা যেন এখনই বিস্ফোরিত না হয়। সাঁতরে কতটুক দূরত্ব পেরিয়েছে এই ব্যাপারেও কোনো ধারণা নেই ওদের। ওদের একমাত্র লক্ষ্য এখন গাছের গুঁড়িটার কাছে পৌঁছানো। আরো কিছুক্ষণ সঁতরানোর পর অবশেষে হাতে গাছের গুঁড়ির স্পর্শ পেতেই গুঁড়িটা আগলে ধরলো স্যাম।

তারপর হালকা ঘুরে পিছনে থাকা রেমির হাত খাবলে ধরে তাকেও নিয়ে এলো গাছের গুঁড়িটার কাছে। দুইজনই পানি থেকে মাথা ওপরে তুলে হাঁপাচ্ছে এখন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরো একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এলো গুঁড়ির অন্যপাশ থেকে বোটের ইঞ্জিনের শব্দটা আরো কাছে এগিয়ে এসেছে এখন।

গাছের একটা শাখা ধরে একটু ওপরে উঠে দৃশ্যটার দিকে তাকালো স্যাম।

বিস্ফোরণের তীব্রতায় তাদের ছোটোখাটো ফিশিং বোটটা গুঁড়িয়ে গেছে। বোটের খোলসে আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে এখন।

বন্দুকধারীদের বোটদুটোও এখন আরো কাছে এগিয়ে এসেছে। এদের মধ্যে আগুন জ্বলতে থাকা নৌযানটার একটু বেশিই কাছে চলে এসেছে। কাছে। এসেই অনবরত গুলিবর্ষণ করতে শুরু করলো বোটের লোকদের একজন। বোটের খোলস এবং পানিতে এখন বুলেট বর্ষণ চলছে শুধু। ঝাঁঝরা হয়ে গেছে নৌকার খোলসটা।

.

বেশ কিছুক্ষণ গোলাবর্ষণ করার পর অবশেষে থামলো লোকটা। আশেপাশটা একবার দেখে নিয়ে ড্রাইভারকে ইশারা করলো বোটটা নিয়ে সামনে এগুনোর। যানটাকে তাদের দিকে আসতে দেখেই আবারো টুপ করে পানিতে নেমে গেলো স্যাম। বোটদুটোকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখা ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই ওদের। উত্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যানদুটো।

বোটদুটো চলে যাওয়ার পরও জায়গাটা থেকে নড়ার সাহস পাচ্ছে না স্যাম ও রেমি। ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত ওভাবেই চুপ করে পড়ে রইলো ওরা। শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি অনুকুলে আছে ভেবে জায়গাটা থেকে বেরিয়ে এলো স্যাম। তারপর রেমিকে নিয়ে সাঁতরে এগিয়ে গেলো দ্বীপের অন্যপাশটার দিকে।

বিস্ফোরণের তীব্রতায় তাদের ভাড়া করা বোটটা এখন উপসাগরের তলায় ডুবে গেছে। ওপরে থাকা বড়ো পাথরটাও এখন আর অতোটা বড়ো নেই। মাঝখান থেকে দুই ভাগ হয়ে গেছে পাথরটা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় একটা অংশ পুরোপুরিই গুঁড়িয়ে গেছে, আর অন্য অংশটা ছিটকে গেছে উপকূলের ধারের দিকে।

বোটটটার দিকে নজর ফিরালো স্যাম। যানটার অবস্থা দেখে আঁৎকে গেছে। রেমি ওই ট্রিপওয়্যারটা না দেখলে তাদের কী অবস্থা হতো, অথবা খুঁড়ার ধরণ দেখে তার যদি সন্দেহ না জাগতো-তাহলে কী হতো সেটা নিয়ে ভাবতেও চাচ্ছে না ও।

এমনকি দৃশ্যটা দেখে রেমির চোখ থেকে অশ্রু ঝড়তে শুরু করেছে।

চলো যাই এখন, স্যাম বলে উঠলো।

কোথায়?

ওক আইল্যান্ড পর্যন্ত সাঁতরে যেতে পারবো আমরা। পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্রে অবশ্যই ফোন রয়েছে। না থাকলেও অসুবিধা নেই। ওখান থেকে তো বাইরের রাস্তাটা পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যাবে।

সাঁতরে প্রায় অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়েছে ওরা, ঠিক তখনই পানিতে কোনো বড়ো সামুদ্রিক যানের এগিয়ে আসার কম্পন টের পেলো স্যাম। প্রায় হাজার ফুটের মতো দূরে রয়েছে যানটা। দক্ষিণের দিক থেকে এগিয়ে আসছে।

ভয়ে ভয়ে জাহাজটার দিকে তাকালো স্যাম। সে ভাবছে হয়তো এভেরির লোকেরাই আবার ফিরে আসছে। তবে বোটটা আরো কাছে আসতেই বোটের ওপরে জ্বলতে থাকা টিমটিমে ইমার্জেন্সি লাইট ও পানির ওপর ভেসে বেড়ানো স্পটলাইট দেখে বুঝতে পারলো যে সাহায্য এগিয়ে আসছে তাদের জন্য।

দুজনেই চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করলো বোটটার উদ্দেশ্যে। হাত নেড়ে নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। জাহাজের স্পটলাইটটা তাদের ওপর পড়তে দেখে অবশেষে কিছুটা স্বস্তি পেলো ওরা। যদিও স্পটলাইটের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য অন্ধ হয়ে গেলেও, সাহায্য আসছে দেখে অনেকটা শান্তি পাচ্ছে খন।

রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের যান এটা। কাছে এসে দুজনকেই জাহাজে টেনে তুললো জাহাজের কর্তৃপক্ষ। জাহাজে উঠে শরীর মুছতে মুছতে ক্যাপ্টেনের কাছে কী কী ঘটেছে তার সবই খুলে বলল স্যাম। সব শুনে ক্যাপ্টেন মন্তব্য করলেন, তো আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনারা আন্ডারওয়াটার একটা বিস্ফোরণ থেকে সারভাইভ করেছেন?

না। আমি বলছি, বিস্ফোরণ ঘটেছিলো পানির ওপরে। আর আমরা পানির নিচে ডুব দিয়ে সেটা থেকে সারভাইভ করেছি। ঐ পাথরটা- বলতে বলতে পাথরটার দিকে নির্দেশ করলো স্যাম, বা ওটার যতটুক অংশ এখন অবশিষ্ট আছে, ওটাই বিস্ফোরণের ধাক্কার বেশির ভাগটা সামলে নিয়েছে। নাহলে কপালে খারাপিই ছিলো।

কপাল দেখছি খুবই ভালো আপনাদের, ক্যাপ্টেন বললেন।

বলতে গেলে তাইই।

তো কেন মনে করছেন যে তারা আপনাদেরকেই টার্গেট করেছিলো?

রেমির দিকে এক পলক তাকালো স্যাম। রেমি এখন তাদের সামনের টেবিলে একটা মোটা কম্বল গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। অনেক লম্বা একটা গল্প।

আমাকে তো ঘণ্টা হিসেবেই বেতন দেওয়া হয়, তাই না? তো বলে ফেলুন।

সংক্ষেপে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ঘটা সবকিছুই ক্যাপ্টেনকে খুলে বলল স্যাম। স্যান ফ্রান্সিসকো ভ্রমণ, ব্রির অন্তর্ধান, তারপর কিডন্যাপারদের মুখে তাদের আলোচনার অংশ শোনাসহ সবই।

বেশ একটা গল্প, মি, ফার্গো, ক্যাপ্টেন বললেন। এই গল্পের সত্যতা পাওয়া যাবে কি?

খুব সহজেই পাবেন। স্যান ফ্রান্সিসকো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এবং নর্থ ক্যারোলিনার কারটিট কাউন্টির কাছে খোঁজ করলেই হবে।

আচ্ছা, ওটা খতিয়ে দেখবো আমরা। তা, আপনাদের এই কর্মী মানে ব্রি মার্শাল, আপনি কি নিশ্চিত মানুষটা বিশ্বাসযোগ্য? আপনার কি মনে হয় না মহিলাই এসব কিছুর সৃষ্টি করেছে?

কী বলতে চাচ্ছেন আপনি? স্যাম জানতে চাইলো।

বলতে চাচ্ছি একমাত্র ঐ মহিলাই কিন্তু ওক আইল্যান্ডের ব্যাপারে আলোচনাটা শুনেছিলো।

কথাটা শুনেই কিছুটা খেঁকিয়ে উঠলো রেমি। আমি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি।

আর, আমিও, আমার স্ত্রীর বিচার-বিবেচনাকে বিশ্বাস করি, সাথে যোগ করলো স্যাম।

আমি শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি। ভিতরের কারোর বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা কিন্তু এটাই প্রথম না। বলে নোটগুলোতে একবার দেখলেন ক্যাপ্টেন, তারপর আবার স্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে হয় এখনের জন্য এই প্রশ্নগুলোই ছিলো আমার।

আমার একটা প্রশ্ন আছে, স্যাম বলল, আপনি আমাদের খুঁজে পেয়েছেনে এই কথাটা পাবলিকলি না জানানোর কি কোনো উপায় আছে?

ঠিক বুঝতে পারিনি প্রশ্নটা।

আপনি যদি আমাদেরকে খুঁজে না পেতেন, তাহলে ক্রাইম সিনের ব্যাপারের কী রিপোর্ট দিতেন?

প্রথম দর্শনের ওপর ভিত্তি করে? বলতাম যে বিস্ফোরণের কারণে একটা বোটে আগুন ধরে গেছে। রিকভারি অপরাশেন। কেউ বেঁচে আছে কিনা তার খোঁজ চলছে।

তো প্রেস কনফারেন্সে গিয়ে আপনি কি এখন এই কথাটা বলতে পারবেন না?

কথাটা শুনে কিছুক্ষণ স্যামের দিকে তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন। আইডিয়াটার খুঁটিনাটি সুবিধা-অসুবিধাগুলো ভেবে দেখছেন। এক মুহূর্ত ভাবার পর মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, অবশ্যই। আপনার বলা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যদি আপনাদের গল্পের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে খুব সম্ভবত এটা করতে পারবো আমরা।

করলে আমাদের জন্য ভালো হয়, রেমির অগ্নিদৃষ্টি উপেক্ষা করেই ক্যাপ্টেনকে কৃতজ্ঞতা জানালো স্যাম।

****

হোটেলে ফিরে যাওয়ার পথে রেমির দিকে তাকালো স্যাম। যদিও সদ্য উদিত সূর্যের মৃদু আলোয় সে রেমির মুখের হাবভাবটা দেখতে পাচ্ছে না, তবে তার মধ্যে থাকা উদ্বেগটা ঠিকই বুঝতে পারছে। কী?

তুমি কি সত্যিই এটা চাচ্ছো যে অন্য সবাই আমাদেরকে মৃত ভাবুক?

এটা খুবই চমৎকার একটা প্ল্যান, রেমি।

না, খুবই বাজে একটা প্ল্যান। গত কয়েকদিন ব্রি যেসবের ভিতর দিয়ে গেছে, তারপরও কি তুমি ভাবছো সে আমাদের মৃত্যুর ধাক্কাটা ঠিকমতো সামলাতে পারবে? সে কি নিজেকে দোষী ভাববে না?

এটা তো মাত্র এক কি দুই দিনের জন্য।

আর সেলমার ব্যাপারে কী? আমাদের অন্যান্য স্টাফদের ব্যাপারে?

অবশ্যই, তাদেরকে সব খুলে বলবো আমরা।

তাহলে ব্রিকে কেন নয়?

তুমি তো ক্যাপ্টেনের কথা শুনলেই। ভিতরের কারো কাজও হতে পারে।

এটা তো শুধুই একটা সাজেশন মাত্র, স্যাম। উনি তো কথাটা সিরিয়াসলি বলেননি।

এখন পর্যন্ত আমাদের সাথে যা যা ঘটেছে, তার সবগুলোর সাথেই কিন্তু ব্রির সংযোগ আছে।

সে নিজেও কিন্তু ঘটনাগুলোর শিকার, স্যাম।

রেমির দিকে ভালো করে চোখ তুলে তাকালো স্যাম। একমুহূর্ত ওভাবেই তাকিয়ে থাকার পর আবারো রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে আনতে বলল, তুমি কি নিশ্চিত?

তুমি কিভাবে উল্টোটা ভাবতে পারলে?

তুমি বলেছিলে ব্রির চাচা তোমার আগমনের কোনো আশা করছিলো না। আর এর কিছুক্ষণ পরেই তোমার দিকে বন্দুক তাক করে ডাকাতি ঘটলো জায়গাটায়। তুমি মেসেজ দিলে আমরা রিট-কার্লটন হোটেলে আছি এবং অল্প সময়ের ভিতরেই বন্দুকধারী হাজির হলো ওখানে। এরপর ঘটলো তার কল্পিত অপহরণ

কল্পিত?

-অপহরণের ঘটনা। আর সে তোমাকে ফোনে করে বইটা তার কাজিনের কাছে নিয়ে যেতে বলল। এবং বইটা দেওয়ার পর তাকে বাঁচাতে গিয়ে কিন্তু আমরা রীতিমতো মরতেই বসেছিলাম। আর, সবশেষে সে আমাদের ওক আইল্যান্ডের গল্প বলল এবং আমরা আবারো প্রায় মারা পড়তে বসেছিলাম।

আমি বিশ্বাস করছি না তোমার কথাগুলো।

রেমি… অফিসারের কথাগুলো কিন্তু তুমি নিজ কানেই শুনেছো।

কাকতালীয় ঘটনা। পুরোটাই কাকতালীয় ঘটনা। এবং বলতেই হয় যে সাথে কপালও খারাপ। দেখো, তুমিই কিন্তু আমাকে অনেকবার বলেছে যে গুপ্তধনের লোভে মানুষের ভিতর থেকে তার সবচেয়ে খারাপটাও বাইরে বেরিয়ে আসে। বলোনি?

হ্যাঁ, বলেছি। আর তোমার কি মনে হয় না এমনই কোনো কিছুর লোভে ব্রির ভিতর থেকেও তার সবচেয়ে নিকৃষ্টটা বেরিয়ে আসতে পারে?

না, হাত ভাঁজ করে বলল রেমি। এবং আমি তোমাকেও ওরকম কিছু ভাবা থেকে বিরত থাকতে বলছি। তো, ভিন্ন কোনো পরিকল্পনার চিন্তা করো এখন।

আমার মনে হয় আমরা কোথাও একটা ভুল করছি।

হোক ভুল, চাঁছাছোলা কণ্ঠে বলল রেমি। এটাই নিশ্চয় আমাদের প্রথম ভুল না। এর আগেও অনেক ভুল করেছি আমরা।

রিয়ারভিউ মিররে তাকালো স্যাম। বেশ কয়েকমাইল ধরেই দেখছে একটা হেডলাইটকে তাদের পিছন পিছন আসছে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো কেউ হয়তো তাদেরকে অনুসরণ করছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে দিলো স্যাম। সাথে সাথেই শো করে তাদের পাশ কেটে চলে গেলো গাড়িটা। না, তাদেরকে অনুসরণ করছে না কেউ।

হয়তো সে আসলেই আতঙ্কিত হয়ে আছে। অবশ্য একটু আগেই মরতে মরতে বেঁচে আসার পর এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। এই মুহূর্তে, কিছু ব্যাপার পছন্দ না হলেও তাকে মেনে নিতে। এমনকি রেমিকেও এটা বুঝতে দিতে হবে যে স্যামের সাথে তর্কযুদ্ধে সে ই জিতেছে। আর যেহেতু ব্যাপারটার সাথে রেমির নিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে, তাই সে কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। হোটেলে গিয়ে প্ল্যান বি তৈরি করবো আমরা।

অবশ্যই রেমির প্ল্যান বি এর সাথে স্যামের প্ল্যান বির অনেক পার্থক্য রয়েছে। রেমি চাচ্ছে হোটেলে পৌঁছেই সেলমাকে ফোন করে জানাতে যে তারা ঠিকঠাকই আছে, আর স্যাম চাচ্ছে এখনই কাউকে তেমন কিছু খুলে না বলতে।

তোমার আগের প্ল্যানের সাথে এটার পার্থক্য কই রইলো?

কেউ তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলবে না যে আমরা মৃত, আবার এটাও বলবে না যে আমাদের বোটটা খুঁজে পাওয়া গেছে।

সুইটে পৌঁছেই সরাসরি বেডরুমে চলে গেলো রেমি। স্যামও আসছে তার পিছে পিছে। রুমে ঢুকতে যাবে ঠিক তখনই রেমি দরজার মুখে থামিয়ে দিলো তাকে। প্ল্যানের ব্যাপারে একমত না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে পারবো না আমি।

আর কী একমত হব?

এটাই যে আমি ঠিক আর তুমি ভুল।

এই মেয়েটা দেখছি তার রূপের মতোই প্রচণ্ড জেদী, মনে মনে ভেবে রেমিকে জড়িয়ে ধরে তাকে চুমু খেলো স্যাম। বলল, তুমি তো জানোই, আমি সবসময়ই সঠিক।

তাই নাকি? তাহলে চলো রক-পেপার-সিজর্সের এক রাউন্ড হয়ে যাক?

এভাবে সিদ্ধান্ত নিবে তুমি? বাচ্চাদের খেলার মাধ্যমে?

এটা আগেও কাজ করেছে।

ক্লান্তিতে বিছানায় ঢলে পড়লো স্যাম। আচ্ছা, ঠিক আছে, চোখ বন্ধ করে বলছে ও, তার আগে এক মিনিট বিশ্রাম করে নেওয়া দরকার আমার…

এক মিনিটের কথা বলে বেশ গভীরভাবেই কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলো স্যাম। তার সেই ঘুম ভাঙলো ফোনের রিংয়ের শব্দে। এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আছে ও। কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঘুম ঘুম চোখে উঠে নাইটস্ট্যান্ডের ওপর থাকা ফোনের এক্সটেনশন রিসিভারটা কানে লাগালো। কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেললো, হ্যালো?

মি. ফার্গো। ফোনের ওপাশ থেকে সেলমার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনেই আচ্ছন্নতা কেটে গেছে স্যামের। আপনাদের কোনো খবর না পেয়ে বেশ দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম আমি।

আমরা ঠিক আছি, বলল স্যাম। ঠিক তখনই বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলো। তাকিয়ে দেখে রেমি দাঁড়িয়ে আছে দরজার মুখে। সাদা সিল্কের একটা রোব পরে আছে মেয়েটা। সেলমার ফোন, স্যাম বলল তাকে।

এক্সটেনশন ডেস্কের কাছে গিয়ে ওখানের রিসিভারটা কানে লাগালো রেমি। বলল, হ্যালো, সেলমা।

মিসেস ফার্গো। আপনাদের কথা শুনে দুঃশ্চিন্তা কাটলো আমার। শুধু এটাই জানতে চাচ্ছি গতরাত কেমন কাটলো আপনাদের?

দরজার মুখ দিয়ে স্যামের দিকে তাকিয়ে রেমি বলল, হয়তো উত্তরটা তুমি দিলেই ভালো হবে।

সত্যি বলতে রেমি এখনো তাদের পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার ব্যাপারটা এখনো ভুলেনি। বোট বিস্ফোরিত হয়ে যাওয়ায় কিছুটা বিপদে পড়তে হয়েছিলো আমাদের।

আমি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করছি।

সত্যি বলতে, স্যাম বলছে, যদি পারো, আপাতত এই ব্যাপারটা একটু চেপে রাখো।

আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।

রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ বলেছে তারা আমাদের উদ্ধারের ব্যাপারটা আপাতত কিছু সময়ের জন্য গোপন রাখবে। এতে করে হাতে কিছুটা সময় পাবো আমরা।

কিসের জন্য সময়? সেলমা জিজ্ঞেস করলো।

আমারও একই প্রশ্ন, রেমিও যোগ করলো সাথে।

যদি গতরাতে কেউ আমাদের ফাঁদে ফেলে থাকে, সে এখন ভাবছে আমরা মৃত। আমি নিশ্চিত আবার খুব দ্রুতই লোকটা আমাদের পিছে লাগতে চাইবে না। আর এটাও আশা করছি, এই সময়ের ভিতরে আমরা ম্যাপের অর্থ ও সাইফার হুইল খোঁজার ব্যাপারে তথ্য যোগাড় করে কাজ কিছুটা এগিয়ে নিতে পারবো।

সমস্যা শুধু একটাই, রেমি বলছে, আমরা এই হোটেলে আমাদের আসল নাম ব্যবহার করে চেক ইন করেছি।

ভালো পয়েন্ট, ভাবলো স্যাম। আশা করো যেন তারা ঐ বিস্ফোরণটাতেই শান্ত থাকে। মনে হয় না, আমরা বেঁচে আছি কিনা সেটা জানার জন্য এরিয়ার সব হোটেলে হোটেলে খুঁজে দেখবে ওরা। এখন ঐ সাইফার হুইলটার ব্যাপারে বলো।

এটার জন্যই আমি আসলে আপনাদেরকে ফোন করেছি, সেলমা বলছে। ব্রি আপনার আইডিয়াটার ব্যাপারে বলেছে। আপনি নাকি ম্যাপের আউটলাইনের সাথে অন্যান্য দ্বীপগুলোর মিল সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন।

আমার আইডিয়া?

ও বলেছে আপনি নাকি প্লেনে থাকাকালীন সময়ে এটা নিয়ে কথা তুলেছিলেন। বলেছিলেন আটলান্টিকের তীরে আরো বেশ কিছু দ্বীপের সাথে মিল আছে ম্যাপটার। ও সাজেশন দিয়েছে যে অঞ্চগুলোতে পাইরেটদের আনাগোনা ছিলো না সেগুলো বাদ দিয়ে দিতে এবং ওক আইল্যান্ডের মতো যে দ্বীপগুলোতে গুপ্তধন আছে বলে গুজব আছে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখতে।

ওটাতে অবশ্য পরিণতি ভালো হয়নি আমাদের।

সেলমা তার গলা খাকরে পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, যাই হোক গত রাতে সাইফার কোডটা নিয়ে বেশ কিছুটা কাজ করেছি আমরা। যদিও খুব একটা এগুতে পারিনি। ব্রি তখন পাইরেটস বইটার ম্যাপটা নিয়ে-যেটাকে আমরা ওক আইল্যান্ড বলে ভেবেছিলাম-আটলান্টিকের দ্বীপগুলোর আকৃতির সাথে মিলিয়ে দেখেছে। আমার মনে হয় ব্রাজিলের উপকূলের কাছাকাছি থাকা দ্বীপ খুঁজে পেয়েছে ও। দ্বীপটার সাথে ম্যাপটার অনেক মিল রয়েছে। ইলআ দা কাইমাদা গ্রান্দে নাম ওটার, মানে কাইমাদা গ্রান্দে আইল্যান্ড। ঐ দ্বীপটার সাথে লায়লোর খুঁজে পাওয়া ল্যাটিন সারপেনস শব্দটারও মিল রয়েছে।

স্যাম খেয়াল করে দেখলো রেমির মুখ থেকে আত্মবিশ্বাসী ভাবটা উবে গেছে এখন। যদিও তারা কেউ কখনো স্বশরীরে ঐ দ্বীপটাতে যায়নি, তবে তারা ঐ অঞ্চলটার সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। দ্বীপটার ডাকনাম স্নেক আইল্যান্ড, মানে সাপের দ্বীপ। সোনালি ল্যান্সহেডের বাসস্থল দ্বীপটা। ভাইপারের একটা প্রজাতি ওটা। সাপটা এতোই বিষাক্ত ও ক্ষীপ্র যে ব্রাজিলিয়ান নেভিরাও ঐ এলাকাটা এড়িয়ে চলে। দ্বীপটার ভৌগলিক ইতিহাস ঘেটে জানা গেছে যে, প্রায় এগারো হাজার বছরের মতো আগে সমুদ্রের উচ্চতার কারণে দ্বীপটা মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। এই পৃথকীকরণের ফলেই সেখানকার ভাইপারগুলো কীভাবে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। সামুদ্রিক কিছু পাখি ছাড়া ঐ দ্বীপে অন্য কোনো শিকার ছিলো না। তাই সাপগুলোর তড়িৎ কাজ করে এমন একধরনের বিষের প্রয়োজন পড়েছিল, যাতে করে পাখিগুলো উড়ে যাওয়ার আগেই তারা ওগুলোকে শিকার করতে পারে। সাপ ছাড়াও ঐ দ্বীপটার আশেপাশে বেশ কিছু জাহাজডুবির ঘটনাও ঘটেছে বলে শোনা যায়।

আর আমরা ওখানে আসলে কী খুঁজব?

যদি ম্যাপটা সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে দ্বীপের দক্ষিণ মাথার দিকে একটা শিপরেক রয়েছে।

এমনকি যদি আমরা কয়েকবছর ধরেও ওখানে খোঁজাখুঁজি করি, তারপরও কিন্তু সাইফার হুইল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাটা খুবই ক্ষীণ।

যদি, সেলমা বলছে, আমরা আসলেই সাইফার হুইলটা খুঁজি আর কী! তবে আমি এখন আশা করছি অন্য একটা কাজের ওপর। কাজটা হলো, জাহাজটা খুঁজে বের করা।

কথাটা শুনে রেমির ভ্রু কুঁচকে গেছে। আমি কি কিছু মিস করছি এখানে?

এমনকি স্যামও হতভম্ব হয়ে গেছে সেলমার কথায়। এটা আমাদেরকে কিভাবে সাহায্য করবে?

লাযলোর ধারণা চোরাইকত সাইফার হুইলটা আসলে নকল একটা কপি। আর এটা জাহাজের ক্যাপ্টেন বানিয়েছিলো আসল হুইলটা কারো কবলে পড়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। এরমানে হলো আসল সাইফার হুইলটা এখনো ওখানেই আছে। জাহাজটা কোথায় এবং কবে তৈরি করা হয়েছিলো সেটা জানতে পারলেই ঘোষণাপত্রের সূত্রধরে এর মালিককে চিহ্নিত করতে পারবো আমরা। আর মালিককে খুঁজে পেলেই

-আমরা আসল সাইফার হুইলটাও খুঁজে পাবো, বাক্যটা শেষ করে দিলো স্যাম। তোমার কাছে যা যা তথ্য আছে পাঠাও আমাদের।

আপনার ইনবক্সে পৌঁছে যাবে তা। সাথে সাথে আপনার ফ্লাইট কুকে ব্রাজিল ভ্রমণের ব্যাপারেও কিছু তথ্য পাঠিয়ে দিবো।

কথা শেষে রিসিভারটা ক্রেড়ালে রেখে বিছানা থেকে নামলো স্যাম। তারপর এগিয়ে গেলো অন্যরুমে থাকা রেমির কাছে। ভ্রমণটাকে বেশ উৎসাহব্যাঞ্জক শোনাচ্ছে।

এটা কি কোনো ধরনের ক্ষমা চাওয়া? স্যামের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল রেমি।

তোমাকে নিরাপদে রাখতে চাওয়ার জন্য তো আমি ক্ষমা চাইতে পারি না।

ব্রির ব্যাপারে তোমার ধারণা ভুল। সে চার্লস এভেরির কোনো চর না। আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপই এভেরিকে জানাচ্ছে না ও।

তবে কিছু একটা অবশ্যই চলছে আড়ালে আড়ালে। তবে কী চলছে সেটা ধরতে পারছে না স্যাম। অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করে রেমির সাথে এই সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করারও কোনো ইচ্ছা নেই তার। তাই বলল, আমার আচরণে হয়তো তুমি ভেবেছো আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি না। এটার জন্য ক্ষমা চাইছি আমি। কখনোই এরকম কিছু বুঝানোর ইচ্ছা ছিলো না আমার।

রেমি তার হাত দুটো স্যামের কাঁধে ঠেকিয়ে বলল, তোমার ক্ষমা গ্রহণ করা হলো।

তো, তাহলে এখন ব্রাজিল ভ্রমণ? স্যাম জানতে চাইলো।

অবশ্যই। বছরের এই সময়ের ব্রাজিলকে ভালোবাসি আমি।

.

১৫.

জেটে করে প্রথমে মিয়ামিতে গিয়ে পৌঁছালো স্যাম ও রেমি। সেখান থেকে তাদের জন্য সেলমার পাঠানো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলো তুলে নিয়ে আবারো ছুট লাগালো ব্রাজিলের সাও পাওলোর উদ্দেশ্যে। মিয়ামি থেকে ওখানকার গরম আবহাওয়ার উপযোগী কিছু কাপড়চোপড়ও নিয়ে নিয়েছে। সাও পাওলোতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় সন্ধ্যা সাতটার মতো লেগে গেলো তাদের।

রাতটা বিশ্রামে কাটিয়ে পরদিন সকালে স্যাম বেরিয়ে পড়লো স্নেক আইল্যান্ডে খোঁজাখুঁজির জন্য সরকারি অফিসিয়ালদের কাছ থেকে অনুমতি ও জরুরি কাগজপত্র নিয়ে আসার জন্য। রেমি অবশ্য হোটেলেই রয়ে গেছে। ট্যাবলেটে করে সেলমার সাথে সান্তোস বন্দরের বোট এবং ক্রুদের নিয়ে কথা বলছে।

সব বিবেচনা করলে, সেলমা বলছে, তারাই এই কাজের জন্য যোগ্য।

শুনে বেশ ভীতিজনক মনে হচ্ছে।

ওখানে হয়তো কিছু হচ্ছে এখন। হয়তো উইকএন্ড বলেই হচ্ছে। সব চার্টারই আগে থেকে বুক রেখেছে অন্যরা। তবে লোকগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি আমি। আর সত্যি বলতে, আপনাদের দাবিদাওয়া অনুযায়ী ওটাই ছিলো ঐ অঞ্চলে অ্যাভেইলেভল থাকা শেষ বোট। একরাত পানিতেও থাকতেও কোনো আপত্তি নেই তাদের।

স্ট্যান্ডে রাখা ট্যাবলেটের পর্দার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো রেমি। সে জানে সেলমা তার সর্বোচ্চটা দিয়েই চেষ্টা করেছে। সেলমার সাথে কথা বলতে আরো একবার যন্ত্রপাতির লিস্টটা চেক করে দেখছে ও। মেটাল ডিটেক্টর, পোর্টেবল সাইড-স্ক্যান সোনার সিস্টেম, আন্ডারওয়াটার ক্যামেরা ও লাইটসহ আরো অনেক কিছু রয়েছে তালিকাটায়। দেখে মনে হচ্ছে আমাদের দরকারি সবকিছুই পাঠিয়ে দিছো তুমি।

হ্যাঁ। এখন তাহলে বোট মালিককে বলে দেই যে আপনারা তার সাথে আজ সন্ধ্যায় বা আগামীকাল যোগাযোগ করবেন। আমার মনে হয় গতরাতে লাযলোর পাঠানো কাগজগুলো আপনারা দুইজনই পড়েছেন?

শুনে টেবিলের দিকে তাকালো রেমি। বলল, হ্যাঁ, দেখেছি। খুঁজে পাওয়া দুটো শিপরেকদুটোর অবস্থান দেখলাম দ্বীপের একদম দক্ষিণ মাথায়। রহস্যময় ম্যাপটা কয়েক শতাব্দী ধরে পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ার্স বইয়ের এন্ডপেপারে আড়ালে লুকানো থাকলেও, এই শিপরেকগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক আগেই। খুব সম্ভবত লুট করে নিঃশেষও করে ফেলা হয়েছে। প্রথম জাহাজ থেকে প্রাপ্ত সম্পদগুলো থেকে ধারণা করা যায় যে ওটা স্প্যানিশ মালিকানার অধীনে ছিলো। অবশ্য সেলমা নিশ্চিত, তারা ইংরেজদের জাহাজটাই খুঁজছে। মূলত এই কারণেই স্নেক আইল্যান্ডের একদম দক্ষিণ মাথায় থাকা দ্বিতীয় শিপরেকে খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্যাম। এছাড়া রেকর্ডবইয়ে ঐ শিপরেকটার ব্যাপারে খুব বেশি কিছুর উল্লেখও করা নেই। লাযলো কি ম্যাপের চাবির অনুবাদ নিয়ে নিশ্চিত?

ওখানে সে সমুদ্র ও সারপেন্স শব্দগুলো দেখেছে-এটার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও

কপাল খারাপ যে সে ওখানে সমুদ্র ও ডলফিন শব্দগুলো দেখেনি। ভাইপারের থেকে ডলফিন ভালো।

আসলেই। তবে যাই হোক, ব্রি না বললে হয়তো স্নেক আইল্যান্ডের কথা জানা যেতো না। এটা শুধু সম্ভাব্য একটা লোকেশন মাত্র। সকালে আমি আবার ম্যাপটা দেখছিলাম, আর… বলতে বলতে স্নেক আইল্যান্ডের ম্যাপের একটা স্কেচ পর্দার সামনে তুলে ধরলো সেলমা। হুম, এটার সাথে আসলেই অনেক মিল আছে দ্বীপটার। তবে এটাই কি সঠিক জায়গা কিনা তার কিন্তু নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। আপনাদেরকে ওখানে গিয়েই নিশ্চিত হতে হবে।

ব্রির কী অবস্থা? জানতে চাইলে রেমি। কপাল ভালো যে স্যাম এখন তার সাথে নেই। রেমি খুব ভালো করেই জানে ব্রি কখনো তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তবে পরিস্থিতির বিবেচনায় স্যামের ধারণাটাও অযৌক্তিক না।

ঠিকঠাকই আছে ও, সেলমা বলল। এই মুহূর্তে সে মানচিত্রের পাশে থাকা সাইফার হুইলের অর্থ বের করায় লায়লাকে সাহায্য করছে। ঐ সময়কার ইতিহাস নিয়ে বেশ ভালোই জ্ঞান আছে ওর।

শুনে ভালো লাগলো। স্যাম কি ওর ব্যাপারে কিছু বলেছে তোমাকে?

না। শুধু কেমন আছে, কী করছে এসবই জানতে চেয়েছিলো একবার।

আর কিছু না?

জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেলো সেলমা। কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকার পর বলল, মিসেস ফার্গো, আমার জানা প্রয়োজন এমন কোনো কিছু ঘটেছে কি?

না। তবে একটা উপকার করো আমার। ব্রির ওপর চোখ রেখো। ওকে? স্যাম… তাকে নিয়ে কিছুটা সন্দেহে আছে।

ওকে, মিসেস ফার্গো। নজর রাখবো ওর ওপর।

কথা বলা শেষে কানেকশন কেটে দিলো রেমি। স্যামকে সে কখনোই উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কারো ওপর অভিযোগ আনতে দেখেনি। এমন না যে সে ব্রিকে অপরাধী বলেছে। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের ক্যাপ্টেন বলার পরই ধারণাটার দিকে ইঙ্গিত করেছে শুধু। যদিও রেমি প্রায় নিশ্চিত যে শত্রুদের সাথে তার বন্ধু চক্রান্তের নকশা আঁকছে না, কিন্তু সন্দেহের বীজ একবার বপন হয়ে যাওয়ায় সেটা সহজে দূরও করতে পারছে না মন থেকে। আসলেই তো বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে আসতে হয়েছে তাদের।

ব্রির ব্যাপারে যদি তার ধারণাটা ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এতে করে সে এবং স্যাম দুজনই বিপদে পড়বে। এই ঝুঁকিটা নেওয়ার সুযোগ নেই তার হাতে। তাই সেলফোনটা তুলে আবারো সেলমাকে কল করে বলল, কোথায় আছো তুমি? প্রাইভেট কথা ছিলো কিছু।

অফিসেই আছি। হ্যাঁ, বলুন। দাঁড়ান, দরজাটা আটকে দিয়ে আসি। তারপর এক মুহূর্ত পর সেলমা ফিরে এসে বলল, কোনো ঝামেলা?

কথাটা বির ব্যাপারে, বলে ব্রিকে নিয়ে স্যামের সন্দেহের কারণটা খুলে বলল রেমি। ব্যক্তিগতভাবে, আমি এটাকে সত্য মনে করছি না। তবে স্যামের ধারণাও কিন্তু অযৌক্তিক না। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই। স্যামের ধারণা ভুল হয়ে থাকলে, আমি চাই না ব্রি তা জেনে দুঃখ পাক। আর যদি সত্যি হয়ে থাকে…।

বুঝেছি, মিসেস ফার্গো। ব্রি এখন পর্যন্ত অস্বাভাবিক কিছু করেনি, তবে এখন থেকে নিশ্চিতভাবেই তার ওপর ভালো করে নজর রাখবো আমি।

সেলমাকে স্যামের সন্দেহের ব্যাপারে সব খুলে বলার পর নিজেকে এখন অনেকটা চাপমুক্ত মনে হচ্ছে রেমির। কাঁধে বিশাল বোঝা হয়ে চেপেছিলো ব্যাপারটা। এখন খুব সহজেই যাত্রার পরবর্তী অংশ নিয়ে পরিকল্পনায় মনস্থির করতে পারছে ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো যাত্রার ব্যাপারে একটা খসড়াও সাজিয়ে ফেলেছে। এরই মধ্যে স্যাম তাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে, হোটেলে ফিরে আসছে ও।

আরো প্রায় ঘণ্টাখানেক পর হোটেলে ফিরে এলো স্যাম। হাতে করে উজ্জ্বল সূর্যমুখী ফুলের একটা তোড়া নিয়ে এসেছে। শুনেছি হলুদ ফুলের সাথে যাত্রা শুরু করলে নাকি যাত্রা বেশ ভালো হয়।

তাই?

তাই তো মনে হচ্ছে। এটা হয় এই হলুদ ফুল নয়তো বেগুনি মণিটার কারণে ভালো হবে। আর সত্যি বলতে চমৎকার একটা মেয়ের জন্য একমাত্র এটাই খুঁজে পেয়েছি আমি। যে মেয়েটা কিনা নিজে থেকেই সব কাজ করে, সাথে সাথে এক স্বামীকেও সামলায় যে কিনা যখন-তখন নির্বোধ কিছু বুদ্ধি দিয়ে বসে।

ফুলগুলো হাতে নিয়ে টেবিলে রেখে দিলো রেমি। তারপর হাত দিয়ে স্যামকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, নির্বোধ না, তুমি সবসময়ই বুদ্ধিমান, ফার্গো।

এরমানে আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে?

জবাবে শুধু তাকে চুমু খেলো রেমি। তারপর পিছিয়ে গিয়ে স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন কি এটা বলার মতো সঠিক সময় যে, ব্রির ব্যাপারে তোমার সন্দেহের ব্যাপারটা আমি সেলমাকে জানিয়ে রেখেছি?

তারমানে তুমি বলছো আমি সঠিক ছিলাম?

আমি শুধু বলছি, তোমার সন্দেহটায় যথেষ্ট যুক্তি আছে। যুক্তি আছে বলেই তাকে জানিয়ে রেখেছি। তবে এরমানে কিন্তু এই না যে সবাই আমাদেরকে মৃত ভাবুক জাতীয় কিছু চাচ্ছি আমি।

মানে দাঁড়ালো, পুরোপুরি সঠিক না হলেও প্রায় সঠিক ছিলাম আমি? দ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো স্যাম। তার ঠোঁটের কোণে মদ হাসি ফুটে আছে।

ফার্গো, বেশি চাপাচাপি করো না।

****

সান্তোস বন্দরে যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নিলো রেমি। ওখানে গিয়েই গলফিনহোর ক্যাপ্টেন এবং ক্রুদের সাথে দেখা করবে ওরা। যাত্রার জন্য ভোর সকালেই হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লো। আকাশটা সিঁদুরের মতো লালচে হয়ে আছে, সাথে মিশে আছে একধরনের নীলচে-সবুজাভ আভা।

সকালের লাল আকাশ। মানে নাবিকদের সতর্ক হওয়া উচিৎ।

আকাশটা দেখেই পুরোনো এই প্রবাদটা মনে পড়ে গেলো রেমির। যদিও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বেশ কয়েকবার চেক করে দেখেছে ও। পূর্বাভাসে বলছে পরেরদিন সন্ধ্যার দিকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে পারে। এর আগ পর্যন্ত দুঃশ্চিন্তা করার মতো কিছু নেই।

গাড়িটা তাদের হোটেলের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। নিচে নেমে দেখে ড্রাইভার গাড়ির ফ্রন্ট ফেডারে ঠেস দিয়ে তার ফোনে কিছু একটা দেখছে। ড্রাইভারের বয়স খুব বেশি না। কৈশোর পেরুনো এক যুবক মাত্র। কালো চুলের ছেলেটা বেশ লম্বা ও হ্যাংলা পাতলা। তাদেরকে গাড়ির এগিয়ে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি করে ফোনটা পকেটে ঠেলে দিলো ছেলেটা। বলল, মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো?

হ্যাঁ, বলল রেমি। ধারণা করলো ছেলেটার বয়স খুব সম্ভবত আঠারো উনিশের মতো। তুমি নিশ্চয় এন্টোনিও আলভেজ?

চওড়া হাসি ফুটে উঠলো ছেলেটার মুখে। আমাকে ভাড়া করার জন্য ধন্যবাদ। আপনারাই আমার প্রথম বড়ো ক্লায়েন্ট। আপনাদের হতাশ করবো না আমি, গাঢ় কণ্ঠস্বরে বলল ছেলেটা। প্রতিটা শব্দই বেশ সতর্কভাবে উচ্চারণ করছে।

স্যাম ওদিকে কার্টে করে তাদের লাগেজ বহন করে আনা হোটেলে বেয়ারাকে টিপ দিচ্ছে। এন্টোনিওর শেষ কথাটা শুনে চোখ তুলে তাকালো ছেলেটার দিকে। আমি তো শুনেছিলাম যে তুমি একজন অভিজ্ঞ ড্রাইভার।

হ্যাঁ, ভালো ড্রাইভার, কার্ট থেকে লাগেজগুলো গাড়ির ট্রাঙ্কে উঠাতে উঠাতে বলল এন্টোনিও। আমি সবসময়ই ড্রাইভ করি। যদিও এর আগে সান্তোস পর্যন্ত কেউ ভাড়া করেনি আমাকে। আপনারাই আমার প্রথম বড়ো ক্লায়েন্ট। আমার কাজিন, হোটেলের প্রহরী আমার ব্যাপারে গ্যারান্টি দিতে পারবে।

এর জন্যই ছেলেটাকে রিকমেন্ড করা হয়েছে, মনে মনে ভাবলো রেমি।

এন্টোনিও এগিয়ে গিয়ে রেমির জন্য প্যাসেঞ্জার ডোরটা খুলে বলল, প্লিজ, ভিতরে বসে সিট বেল্ট বেঁধে নিন।

স্যাম অবশ্য তরুণ ছেলেটার গাড়ি চালানোর দক্ষতা নিয়ে এতোটা নিশ্চিত হতে পারছে না। তুমি কি নিশ্চিত এতো লম্বা দূরত্ব ড্রাইভ করতে পারবে তুমি?

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো এন্টোনিও। স্কুলের খরচ মেটানোর জন্য আমি আমার চাচার ফিশিং বোটে কাজ করতাম আগে। এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। তাই শহরে কাজ করাটা সহজ হয়ে গেছে আমার জন্য। তবে, আজ কোনো ক্লাস নেই। তাই আপনাদের নিয়ে যেতে পারছি।

রেমি বলল, তোমার কাজিন নিশ্চয় এটাও বলেছে যে আমাদেরকে আবার ফিরতি নিয়ে আসার জন্য তোমাকে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে? একদিনের বেশি হতেও পারে সময়টা।

হ্যাঁ। যেতে যেতে আমার ইংরেজির প্র্যাক্টিসটাও হয়ে যাবে, আর আপনারা ডাইভিং করার সময় অন্য পড়াও পড়ে ফেলা যাবে। এইভাবে আমাদের সবারই কাজ হয়ে যাবে, তাই না?

ছেলেটার কথা শুনে বেশ ভালো লাগলে রেমির। ছেলেটাকে পছন্দ করে ফেলেছে ও। ভালো উদ্যম আছে ছেলেটার। অবশ্যই।

এমনকি স্যামেরও ছেলেটাকে বেশ ভালো লেগে গেছে। উষ্ণসুরে কথা বলছে এখন। তো, কিসের ওপর পড়াশোনা করছো তুমি?

এখন তো ফার্স্ট ইয়ারে, তাই মোটামুটি সবই পড়া লাগছে। গণিত, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পলিটিক্স-সবই। আমার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা আছে। তবে ঐ পর্যন্ত যেতে এখনো অনেক দেরি আছে। এভাবেই আলাপ করতে করতে পার্বত্য পথটা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। যাত্রার পথে মোহনীয় দৃশ্যগুলো দেখছে, ওগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করছে। এন্টোনিওও তার স্কুলের কথা বলছে, তার সাত ভাই ও এক বোন, তার জেলে চাচা, হোটেলের প্রহরী কাজিনের ব্যাপারে বলছে। তার কাজিনও নাকি তারমতো করেই স্কুলে পড়ছে। পুরো পরিবারের মধ্যে তাদের দুজনেরই আসলে পানিতে বিচরণের তেমন একটা আগ্রহ নেই। এভাবেই আলাপ করতে করতে কিছু বুঝে উঠার আগেই সান্তোস বন্দরে পৌঁছে গেলো ওরা। যাত্রায় বিরক্ত হওয়ার সুযোগও পায়নি কেউ।

এন্টোনিও গাড়ির ট্রাংক থেকে তাদের মালপত্রগুলো নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় ডাইভিং করবেন আপনারা?

স্নেক আইল্যান্ডের দক্ষিণ মাথায়।

শুনেই হাসিটা মুছে গেলো ছেলেটার মুখ থেকে। সতর্ক থাকবেন তাহলে। আমার চাচা ওদিককার পাইরেটের ব্যাপারে অনেক গল্প বলেছে। কী ধরনের বোট ভাড়া করেছেন আপনারা?

এটা আসলেই একটা ভালো প্রশ্ন করেছে, স্যাম বলছে। আমরা অতোটা জানি না। শুধু গলফিনহো নমটাই শুনেছি।

নামটা শুনেই আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো এন্টোনিওর চেহারা। ক্যাপ্টেন ডেলগাড়ো। আমার চাচা লোকটার অনেক প্রশংসা করে।

শুনে ভালো লাগলো, বলল স্যাম। তো, বন্দরে ফিরে তোমার সাথে যোগাযোগ করবো কিভাবে?

এন্টোনিও শহরের দিকে ইশারা করে বলল, আমার চাচার বাসা এখান থেকে খুব একটা দূরে না। ওখান থেকে ডকগুলো এমনিই দেখা যায়। উইকেন্ড হয়ে ভালো হয়েছে, এক রাত থাকতেও কোনো অসুবিধা হবে না আমার। কাল রাতের দিকে গলফিনহোকে ফিরতে দেখলেই চলে আসবো আমি। বলে আকাশের দিকে তাকালো ও। যদিও আকাশের এক বিন্দু মেঘের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে, তারপরও বলল, আশা করছি ঝড় আসার আগেই ফিরে আসবেন আপনারা।

****

ক্যাপ্টেন ডেলগাডো দেখতে এন্টোনিওর ঠিক উলটো যেন। লোকটার বয়স চল্লিশের কোঠায়, শরীরের উচ্চতা খর্বাকৃতির, মোটা, এবং সেই কপালে স্থায়ী বিরক্তির ভাজ লেগে আছে যেন। সে এবং তার দুজন লোক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে রেমিদের জন্য। এন্টোনিও চলে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেন এগিয়ে গিয়ে বলল, ফার্গো?

স্যাম ও রেমি, জবাব দিলো স্যাম। আপনাদের বোটটা কোথায়?

ঐ তো, ওখানে, বলে সবচেয়ে কাছের ডকের শেষপ্রান্তের দিকে ইশারা করে দেখালো ডেলগাড়ো।

পানিতে থাকা একদম নতুন কাটামারান রিসার্চ ভেসেলটা দেখে বেশ আনন্দিত হলো রেমি। এটাকে দেখে তো চমৎকার লাগছে। কিন্তু ক্যাপ্টেন এই বোটটার সামনে থামলো না। বরং আটচল্লিশ ফুট দৈর্ঘ্যের চকচকে বোটটা পেরিয়ে গিয়ে থামলো শেষপ্রান্তে থাকা বিয়াল্লিশ ফুট দৈর্ঘ্যের একটা ভাঙাচোরা জেলে নৌকার সামনে। ফ্যাকাসে সবুজ বর্ণের যানটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে আরো কয়েক দশক আগেই নৌকাটা তার শেষ দেখে ফেলেছে। এ… এটাই গলফিনহো?

দাঁত বের করে হাসলো ডেলগাড়ো। তামাক পাতা চিবুতে চিবুতে দাঁতগুলো হলুদ হয়ে লোকটার। ধারের দিকে কিছুটা জং ধরে গেছে। তবে এখনো সমুদ্রে চলার মতো শক্তি আছে এটার।

স্যাম নৌকাটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি নিশ্চিত?

খুবই ভালো বোট এটা। দ্রুত গতির। আর তাছাড়া পাইরেটরাও এটাতে আক্রমণ করবে না। ভাববে হয়তো কোনো পয়সা নেই আমাদের কাছে। তাই না? বলে হেসে উঠলো ডেলগাডো।

রেমি আর স্যামও হাসছে লোকটার সাথে, তবে তাদের হাসিতে প্রাণ নেই অতোটা। জলদস্যুদের ব্যাপারে এন্টোনিওর সতর্কবাণীটা বাজছে রেমির কানে। এদিকের পানিতে পাইরেটের সংখ্যা কি অনেক বেশি?

আছে বেশ কিছু। তবে আমাদের কাছে বন্দুক আছে। আমরাই রক্ষা করবো আপনাদের। বলে তার লোকদেরকে ফার্গোদের মালপত্রগুলো বোটের উঠানোর নির্দেশ দিলো ক্যাপ্টেন ডেলগাডো। আপনারা প্রস্তুত থাকলে রওনা করে দেওয়াই ভালো। আমাদের আবার আগামীকাল বৃষ্টি শুরুর আগেই ফিরে আসতে হবে।

আবহাওয়ার সতর্কবাণী শুনে ফোন বের করে আরো একবার পূর্বাভাসটা দেখে নিলো রেমি। হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির চিহ্নটার সাথে এখন বজ্রপাতের চিহ্ন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পরেরদিন সন্ধ্যার আগে এই বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। এর আগ পর্যন্ত আবহাওয়ার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। যদি আগামীকালের ভিতর তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটা খুঁজে না পায়, তাহলে হয়তো বৃষ্টি থামার পর আরেকবার আসতে হতে পারে।

পানিতে চলতে শুরু করার পরই আবহাওয়া ও বোট নিয়ে রেমি সমস্ত দুঃশ্চিন্তাই উবে গেছে। যানটার খোলসের হালকা ক্যাচক্যাচ শব্দ ছাড়া একদম মসৃণভাবেই স্নেক আইল্যান্ডের এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে করে প্রায় নতুন একটা যোডিয়াকও একটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে বোটটা। লক্ষ্যভ্রষ্ট বলেও মনে হচ্ছে না। সেলমা ক্যাপ্টেন এবং তার কুর বেশ প্রশংসা করে রেমিকে বলেছিলো যে লোকগুলো বেশ নির্ভরযোগ্য। আর তাছাড়া এন্টোনিওও বলেছিলো যে তার চাচাও নাকি গলফিনহোর ক্যাপ্টেনকে বেশ সম্মানের চোখে দেখে। এতগুলো প্রশংসা বাক্যের তো অবশ্যই কোনো কারণ আছে। যদিও ক্যাপ্টেন ডেলগাডো এবং তার চার ক্রুর তিনজনকে দেখতে জেলের মতো লাগছে না। বরং অনেকটা জলদস্যুদের মতো দেখাচ্ছে লোকগুলোকে। তাদের চতুর্থ ও সবচেয়ে তরুণ সদস্য নুনোকে দেখতে এন্টোনিওর মতো লাগছে রেমির কাছে। দুজনেরই বয়স ও শারীরিক গড়ন প্রায় একই রকমের। যদিও এই ছেলেটাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই রেমির দিকে তাকাচ্ছে ছেলেটা, কিন্তু রেমি তার দিকে তাকালেই আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।

রেমি বুঝতে পারছে না তার উপস্থিতির কারণেই ছেলেটা এতো অস্বস্তি বোধ করছে, নাকি অন্য কোনো কারণে করছে। যাই হোক, ছেলেটার দিকে আর না তাকানোর সিদ্ধান্ত নিলো ও।

স্যামও লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা। রেমির পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, কুর সদস্যরা বেশ অদ্ভুত, তাই না?

ওরকমই লাগছে। তবে গলফিনহো যদি আমাদেরকে গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে এবং ওখান থেকে অক্ষত অবস্থায় আবার বন্দরে ফিরিয়ে আসতে পারে, তাহলে এটা নিয়ে কোনো অভিযোগ করবো না আমি।

সন্ধ্যার দিকে দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে পুরোনো ক্রু মেম্বারদের একজনের হাতে হাল ছেড়ে দিয়ে স্যাম ও রেমির দিকে এগিয়ে গেলো ক্যাপ্টেন ডেলগাডো। স্যামের পাশে গিয়ে বোটের দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল, তো, আপনারা ঐ দ্বীপে যাচ্ছেন কী মনে করে?

জাহাজডুবির প্রমাণ খোঁজার জন্য, বলল স্যাম।

গুপ্তধন? মুচকি হেসে বলল ক্যাপ্টেন। আমি শুনেছিলাম এটাই আপনাদের বিশেষত্ব।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। তবে এবার গুপ্তধন খুঁজতে যাচ্ছি না। ধ্বংসাবশেষে কী কী আর্টিফ্যাক্ট আছে সেটার বিবরণ আনতে যাচ্ছি।

আপনাদের সাহস আছে বলতে হবে। আমার থেকেও বেশি, ক্যাপ্টেন বলছে দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে। অনেক বেশি সাপ ওখানে।

আমাদেরও কপাল ভালো বলতে পারেন, স্যাম বলল। আমাদের কাজ শুধু পানিতে।

ভালো। তবে ঐ পাথরটার নিচে কয়েক পুরুষ ধরে বসে বসে খাওয়ার মতো ধনসম্পদ থাকলেও আমি কখনো ওদিকে যাবো না। সাপের কামড় খাওয়া ধনীর থেকে কাঙাল হয়ে মরা অনেক ভালো।

বলে হেসে উঠলো ডেলগাডো। লোকটার হাসি শুনে রেমির মেরুদণ্ড বরাবর শিহরণ বয়ে যাচ্ছে যেন। ঐ মুহূর্তেই রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ায় বেশ খুশিই হলো ও। ডিনারের সময় নুনোর পাশেই বসলো ওরা। তবে ছেলেটার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হয়েছে রেমিকে। ভদ্রভাবেই রেমিকে এড়িয়ে গেছে ছেলেটা।

যাই হোক, আবহাওয়ার অবস্থা এখনো আগের মতোই আছে। খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। খাওয়ার পর রাতে ঘুমটাও বেশ ভালোই হয়েছে তাদের।

পরদিন একদম ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়লো ওরা। ঘুম থেকে উঠেই স্যাম জানালো যন্ত্রপাতিগুলো একবার চেক করে দেখে ডাইভিং স্যুট পরে তাদের তৈরি হয়ে যাওয়া উচিৎ। হাল ধরার আগে ক্যাপ্টেন ডেলগাড়োও এসে দেখে গেছে তাদের। জানতে চেয়েছে তাদের কোনো সাহায্য লাগবে কিনা। সাহায্য লাগবে না জেনে তারপর আবার ফিরে গেছে হাল ধরতে।

দ্বীপের দক্ষিণ মাথা থেকে বেশ কিছুটা দূরে থাকা অবস্থাতেই নোঙ্গর ফেলে থামলো গলফিনহো। আগের দিন ক্যাপ্টেন ডেলগাড়ো একটা পাথরের কথা বলাবলি করেছিলো। ঐ পাথরটা থেকে বেশ দূরেই রয়েছে ওরা। গত কয়েক শতাব্দী ধরে অনেকগুলো জাহাজকে পানির নিচে ডুবিয়ে দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে ঐ অভিশপ্ত পাথরটার। তারা যে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজতে এসেছে সেটাও এই পাথরের খোঁচাতেই তলিয়ে গিয়েছিলো। এটা ভাবতেই ভাবতেই পনেরো ফুট দৈর্ঘ্যের যোডিয়াক সি-রাইডারটারকে প্রস্তুত করতে দেখছে রেমি।

নুনো মই ধরে নেমে গিয়ে তাদের মালামালগুলো রাখছে যোডিয়াকে। এগুলোর মধ্যে পোর্টেবল সাইড-স্ক্যান সোনার ইউনিটের বিশাল একটা বাক্সও আছে। সব যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখার পর স্যামকে নামতে সাহায্য করলো ছেলেটা। তারপর স্যাম নামতে সাহায্য করলো রেমিকে। তরুণ ছেলেটা এখনো সরাসরি তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না, তবে এখন বেশ ভদ্র আচরণ করছে তাদের সাথে। সাহায্য করতেও বেশ উদ্যমি হয়ে আছে। সব যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক ভাবে দেখে নেওয়ার পর দ্রুতই তারা রওনা করল ইলআ দা কাইমাদা গ্রান্দের অভিমুখে। কাছাকাছি পৌঁছুতেই দ্বীপের সৌন্দর্যটা রেমির ধরা চোখে পড়লোর। অভিশপ্ত পাথুরে উপকূলটা জঙ্গলটাকে খাড়াভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এটা যদি অন্য কোনো জায়গায় হতো, তাহলে হয়তো রেমি পাথর বেয়ে চূড়ায় উঠে যেতো ওপর দিকে পানির দৃশ্য দেখার জন্য। তবে দ্বীপে থাকা সাপগুলোর কথাও মনে আছে ওর। তার এবং সাপগুলোর মাঝখানে পানির স্তর আছে ভেবে কিছুটা স্বস্তিই পাচ্ছে এখন।

স্যাম ওদিকে সাইড-স্ক্যান সোনার ইউনিটটা সেট-আপ করছে। নুনোকে যোডিয়াকের গতি ও দিক ঠিক রাখতে বলে স্ক্যানারটা পানির পৃষ্ঠের সমতলে ধরে রেখেছে। সাথে সাথে চোখ রাখছে স্ক্যানারের মনিটরেও। এই মুহূর্তে পানি বেশ শান্তই আছে। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যা বলছে, পরবর্তীতে পানির আচরণ উত্তালও হয়ে উঠতে পারে। ডোবার জায়গাটা খুঁজে বের করাটা আসলে যন্ত্রগুলোর নির্ভুলতা এবং ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। সাথে এটাও আশা করছে যেন সঠিক জাহাজটাই খুঁজে পাওয়া যায়। নাহলে আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার পর আবারো একই কাজটার পুনরাবৃত্তি করতে হবে ওদেরকে।

যদি ভাগ্য ভালো হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিও পেয়ে যেতে পারে। অবশ্য রেমি এমনটাও আশা করছে না যে প্রথম ধাক্কাতেই তারা আসল সাইফার হুইলটা পেয়ে যাবে। জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে বস্তু খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। বেশির ভাগ সময়ই জাহাজ যেখানে ডুবে সেখানেই সব কিছু পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে, নাহলে ডুবে যায় আরো গভীরে। আর তাছাড়া আসন সাইফার হুইলটা যে এখনো পানির নিচেই আছে এটারও নিশ্চয়তা নেই। হয়তো অনেক আগেই ওটা উদ্ধার করা হয়ে গেছে। কে জানে এখন হয়তো ওটা কোনো সংগ্রাহকের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় পড়ে আছে। হয়তো ওটার মালিক এটার আসল গুরুত্বটাও পর্যন্ত জানে না।

অবশ্য, এই মুহূর্তে তাদের কাজ হলো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করে জাহাজটা কোন প্রকৃতির ছিলো সেটা নির্ধারণ করা। এটা ভেবেই আবারো বিষাক্ত দ্বীপটার চোখ চলে গেলো ওর। ভাবছে, ডুবন্ত জাহাজের বেঁচে থাকা মানুষগুলো হয়তো নিরাপত্তার আশায় তীরের দিকেই সাঁতরে গিয়েছিলো। কল্পনা করছে, মানুষগুলোর অনেকেই হয়তো পাথরের সাথে সংঘর্ষ ঘটার আগেই লাফিয়ে নেমে পড়েছিলো উত্তাল পানিতে, তারপর কোনোরকমে সঁতরে গিয়েছিলো ঐ দ্বীপটায়…

রেমির উদ্বেগটা ধরতে পারছে স্যাম। সোনারের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোনো সমস্যা?

জাহাজডুবি নিয়ে ভাবছিলাম। ভেবে দেখো, এতো কাছেই একটা তীর, হয়তো ভাববে, ওখানে গেলেই নিরাপত্তা পাওয়া যাবে…

রেমির সাথে সাথে স্যামও তাকালো দ্বীপটার দিকে। আমার মনে হয় ভাইপারের কামড় খেয়ে মরার চেয়ে ডুবে মরাকেই বেছে নিবো আমি।

আমি কোনোটাই বেছে নিবো না।

রেমির গালে ধরে মুখটা তার দিকে ঘুরিয়ে নিলো স্যাম। তোমার তীক্ষ্ণ দষ্টির সাহায্য কাজে লাগাতে পারতাম আমি।

এরপর আর দ্বীপের কথা না ভেবে স্যামের পাশে বসে সোনারের রিডিংর দিকেই মনোযোগ দিলো রেমি। পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় মনে হলো অযথাই পুরোটা দিন নষ্ট করেছে ওরা। একটা সময় বাতাসের আচরণও পালটে গেলে কিছুটা, পানিও ফোঁসফোঁস করতে শুরু করেছে। সব দেখে স্যামকে আজকের দিনের মতো ক্ষান্ত হতে বলতে যাবে, ঠিক তখনই স্যাম সোনারের পর্দার দিকে নির্দেশ করে বলল, মনে হয়, আমরা আমাদের জাহাজটা পেয়ে গেছি।

 ১৬. পাথরধ্বসের অবশিষ্টাংশ

১৬.

স্যাম যে জায়গাটার দিকে নির্দেশ করেছে ওটাকে দেখতে অনেকটা পাথরধ্বসের অবশিষ্টাংশ বলে মনে হচ্ছে। যদিও বহুকাল আগের এক ভূমিকম্পে পাথুরে দ্বীপের দক্ষিণ অংশ গুঁড়িয়ে মহাসাগরে তলিয়ে গিয়েছে। এটার থেকে কয়েক ফুট দূরেই আরেকটা লম্বা ও সরু পাথরের ধারা দেখা যাচ্ছে। অবশ্য ওটা এতো মসৃণ যে ওটাকে পাথরধ্বসের সৃষ্টি বলে মনে হচ্ছে না। নিশ্চিতভাবেই ওটা কোনো জাহাজের খোলসের ধ্বংসাবশেষ। জাহাজটা সরাসরি পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় ওটা এখনো ছড়িয়েছিটিয়ে যায়নি। খুবসম্ভবত বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাহাজটা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, নয়তো কারো হাতে পড়ার কবল থেকে রক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তলিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

আরো ভালোভাবে দেখার জন্য কাছে ঝুঁকলো রেমি। তোমার কি মনে হয় জাহাজ ডোবার পর পাথরধ্বস ঘটেছিলো?

হয়তো, স্যাম জবাব দিলো। যেটাই হোক, জাহাজটা নিরাপদে ঘুরিয়ে নেওয়ার মতো তেমন সুযোগ ছিলো না। ঝড়ের মধ্যে পড়লে পানির নিচের অসংখ্য পাথরের যে কোনোটাই জাহাজের ক্ষতি করতে পারে।

হয়তো ইচ্ছাকরেই জাহাজটা ডুবিয়ে দিয়েছিলো ওরা। হয়তো ভুল হাতে পড়ার কবল থেকে বাঁচানোর জন্য।

নুনোকে শেষমেশ আরো কিছু নির্দেশনা দিয়ে দুজনই তাদের ডাইভিং গিয়ারগুলো পরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো পানিতে।

পানির গভীরে নেমে যাচ্ছে ওরা। প্রতিবারের মতো এবারও সমুদ্রের নিচের শান্ত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছে রেমি। এর আগেও প তারা। তারপরও প্রতিবারই পানির নিচে নামলে যেন নতুন কিছু মনে হয় তার কাছে। পানির নিচের মাছগুলো তাদেরকে দেখে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করেছে। যতোই গভীরে নামছে পানির উপরিভাগের উজ্জ্বল আলোগুলোও নীল-সবুজাভ বর্ণে পরিণত হতে শুরু করেছে যেন।

পানির পঁচিশফুট গভীর নামার পর পর্দায় দেখা ধ্বংসাবশেষের স্তূপটা দেখতে পেলো রেমি। স্তূপটা প্রমাণ করছে যে এখানে এককালে একটা জাহাজ দাঁড়িয়েছিলো। সময়ের বিবর্তনে এর অনেক অংশই এখন পানির সাথে মিশে গেছে।

জাহাজের অবশিষ্টাংশে খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে তাদের চারপাশের পানির পরিবেশটা দেখে নিচ্ছে ওরা। ব্রাজিলের উপকুলগুলো ভয়ংকর শার্কদের আক্রমণের জন্য বেশ বিখ্যাত বলা যায়। যদিও এগুলোর বেশির ভাগই ঘটে থেকে রেসিফের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উপকূলগুলোতে। তবে তারপরও পশ্চিমে থাকা সাও পাওলো আছে এই তালিকার দুই নম্বরে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সৈকত ও মোহনার অগভীর পানিতে থাকা বদমেজাজী বুল শার্কের আক্রমণের শিকার হয় সাঁতারু এবং সাফাররা। আর উষ্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে বিচরণ করে টাইগার শার্ক। এরা বুল শার্কের মতোই বিপজ্জনক, কিন্তু ওগুলো আকৃতিতে বেশি বড়ো। তবে রেমি আশা করছে স্নেক আইল্যান্ডের এই অগভীর পানিতে হয়তো ওগুলো থাকবে না।

আশেপাশের পানিতে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে দেখলো ওরা। এখানকার পানিতে বেশ কিছু বারাকুড়া মাছ থাকলেও কোনো শার্ক নেই। নিশ্চিত হয়ে ধ্বংসস্তূপের ওপরের প্রান্ত থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলো ওরা। খুঁজতে খুঁজতে একটু একটু করে পাথরধ্বসের গভীর দিকে এগিয়ে আসছে। সাথে সমুদ্রের তলেও তাদের মেটাল ডিটেক্টরগুলো দিয়ে খুঁজে দেখছে। যদিও তারা কেউই কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করছে না-তারপরও সবসময়ই কিছু না কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। অবশ্য ডিটেক্টরের নিরবতা তাদের সন্দেহেরই প্রতিধ্বনি করছে যেন। জাহাজডুবির এই অবস্থান অনেক আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই যে আগেও অসংখ্যবার খোঁজাখুঁজি চালানো হয়েছে এখানে। তারপরও সমুদ্রের তলদেশ প্রতিনিয়তই পানির স্রোতে পরিবর্তিত হচ্ছে। এক সম্রাতে দেখা যায় আড়ালে থাকা কোনো কিছু উন্মোচিত হয়ে গেছে, পরের স্রোতেই দেখা যায় সেটা আবার আড়াল হয়ে গেছে।

ধ্বসে পড়া নুড়িপাথরগুলো পরীক্ষা করে দেখছে ওরা। পরীক্ষা শেষে পাশে ছুঁড়ে রাখছে পাথরগুলো। বেশ কয়েকটা পরীক্ষার পর একটা অন্যরকম পাথর তুলে ধরলো স্যাম। এটা দেখতে ত্রিকোণাকার ও হলুদ এবং কোনার দিকে বেশ ধারালো। পাথরটার দিকে আলো ফেলতেই এরকম আরো কয়েকটা পাথর দেখতে পেলো রেমি। এগুলো সাধারণ কোনো নুড়িপাথর নয়, হলুদ ইটের ভাঙা টুকরো এগুলো। পরবর্তীতে আরো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখার জন্য টুকরোটা তুলে রেমির ধরে রাখা ডাইভিং ব্যাগে ভরে রাখলো স্যাম।

আরো কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করার পর রেমির কাঁধে টোকা দিয়ে ডান দিকে দেখার ইশারা করলো স্যাম। একটা ইল ঘুরাঘুরি করছে ওদিকে। পাথরের স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে হয়তো। এক মুহূর্তের জন্য রেমি মনে করেছিলো, স্যাম হয়তো তাকে পানিতে ভাইপারের বিচরণে আতঙ্কিত হওয়া নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। তবে পর মুহূর্তেই বুঝতে পারলো স্যাম অন্য কিছু বুঝতে চাচ্ছে। সামুদ্রিক সাপটার বেরিয়ে আসার কারণে সৃষ্ট হওয়া মেঘের মতো কাদার পটার দিকে আলো ধরে রেখেছে স্যাম। কাদাটা স্থির হয়ে যেতেই স্যামের মনোযোগর কারণটা দেখতে পেলো রেমি। হয় তাদের পাথর ছুঁড়ে ফেলার কারণে অথবা ইলটার বেরিয়ে আসার কারণে সমুদ্রের তলদেশে একটা ফাঁপা গর্তের মতো সৃষ্টি হয়েছে। গর্তটার দিকে সাঁতরে গেলো স্যাম। হাত দিয়ে কাদার ঘোলাটে ভাবটা দূর করতেই সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা জাহাজের খোলসের একটা অংশ দেখতে পেলো ওরা। ইলটা বের হয়ে আসার আগ পর্যন্ত দেখা যায়নি এটা।

এতে বুঝাই যায় যে পাথরের ধ্বস হয়তো জাহাজ ডোবার পরেই হয়েছিলো। খুব সম্ভবত জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে আড়াল করে দিয়েছিলো।

এরমানে হলো পাথরগুলোর আড়ালে কিছু লুকিয়ে থাকলে থাকতেও পারে। রেমিকে চেক করে দেখার ইশারা দিলো স্যাম। ফাঁকা জায়গাটার ওপর মেটাল ডিটেক্টর ধরলো রেমি। প্রবেশমুখের দিকে কোনো সংকেতই পাওয়া গেলোনা যন্ত্রটা থেকে। তবে একটু ভিতরের দিকে ঢোকাতেই মৃদু একটা শব্দ শোনা গেলো। ডিটেক্টরটা স্যামের হাতে দিয়ে ফাঁকাটার দিকে আলো ফেললো ও। সমুদ্রের তলদেশে হাতড়ে দেখছে এখন। তার হাতের আলোড়নের কারণে আবারো বালিতে ঘোলাটে হয়ে গেছে পানি।

ঘোলাটে ভাবটা স্থির হওয়ার আগ মুহূর্তে কালো কিছু একটা চোখে পড়লো ওর। হাত বাড়িয়ে বালি থেকে খাবলে বের করে নিয়ে এলো বস্তুটা। জিনিসটাকে প্রথমে একটা ভারী কয়েন মনে করেছিলো ও। জিনিসটার একপাশ থেকে বেরিয়ে আসা হুকের মতো অংশটা দেখে এটাকে অনেকটা নেকলেসের লকেটের মতোও লাগছে। আরেকটু ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারলো যে এটা সীসার সীলমোহর। বণিক জাহাজের মালামাল রক্ষা করার জন্য প্রায়ই এটা ব্যবহার করা হতো।

উল্টেপাল্টে সীলমোহরটার ছবি তুলে নিলো স্যাম। এরপর রেখে দিলো রেমির ডাইভিং ব্যাগে। সাথে সাথে ডাইভিং ঘড়িটাও দেখে নিলো রেমি। না, খোঁজাখুঁজি করতে করতে সময়ের খেই হারিয়ে ফেলেনি ওরা। কমপক্ষে হলেও আরো বিশ মিনিটের মতো সময় আছে তাদের হাতে। তাই সময় নষ্ট না করে খোঁজাখুঁজিতেই আবার মন দিলো ওরা। হঠাৎ করেই রেমিকে তাদের ভাইভ জোনের বাইরে দেখার ইশারা করলো স্যাম। তাকিয়ে দেখে একটা শার্ক ঘুরাঘুরি করছে তাদের ডাইভ জোনের ঠিক বাইরেই। সমতল শরীর, ভোতা শুড় আর ডোরাকাটা দাগগুলো দেখে রেমি বুঝতে পারলো যে ওটা অল্পবয়সী একটা টাইগার শার্ক। প্রায় সাতফুটের মতো লম্বা প্রাণীটা। কিছুক্ষণ প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে থেকে স্যামকে ইশারা করে জানালো যে সে দেখতে পেয়েছে প্রাণীটাকে। তবে শার্কটার খুব সম্ভবত তাদের ওপর কোনো আগ্রহ নেই। শান্ত ভাবে সাঁতার কাটছে। খুব সম্ভবত অন্য কোনো জায়গা থেকে পেট ভরে এসেছে প্রাণীটা।

স্যাম ওদিকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পাথরের স্তূপের রিডিং নিচ্ছে। ভ্রুপের ভিতর দিকে সিগন্যাল আসায় তূপের চূড়ার দিকে সাঁতরে গেলো ও। ভেবেছিলো হয়তো ভালো কিছু পাবে, কিন্তু পাওয়া গেলো একটা মাছ ধরার বঁড়শি। হতাশ হয়ে দিক পরিবর্তন করলো স্যাম। পাথরের ধারগুলো বরাবর সাঁতার কাটছে এখন।

ওদিকে রেমির এখনো পাথরের ফাপা গর্তটা পরীক্ষা করা শেষ হয়নি। ইলটাও এখনো ফিরে আসেনি। সিদ্ধান্ত নিলো ইলটা না থাকার সুবিধাটা কাজে লাগাবে। তাই আবার মেটাল ডিটেক্টরটা দিয়ে রিডিং নেওয়া শুরু করলো। গর্তটার বামপ্রান্ত থেকে একটা সিগন্যাল আসছে ডিটেক্টরে। পিছনের দিক থেকে। সাঁতরে ওদিকে গেলো রেমি। বালিতে হাতড়ে দেখলো কিছুক্ষণ, কিন্তু কিছুই পেলো না। তবে নিশ্চিতভাবেই বালির নিচে কিছু একটা আছে। হয়তো একটু গভীরে, তবে খুব বেশিও না। তাহলে ডিটেক্টরে সিগন্যাল আসতো না।

কিছুক্ষণ পর স্যাম ইশারা করে জানালো যে তাদের ডাইভিং শেষ করার সময় হয়ে গেছে। ইশারায় জানাচ্ছে, ওটাও হয়তো কোনো বঁড়শিরই সিগন্যাল, রেমি যেন ওটা নিয়ে আর মাথা না ঘামায়। তবে রেমি সরে এলো না ওখান থেকে। আলো ফেলে গর্তের মুখের বালিতে হাতড়ে হাতড়ে দেখছে। বালির আড়ালে থাকা বস্তুটা হাতে ঠেকলো তার। বস্তুটার পৃষ্ঠ কিছুটা মসৃণ লাগছে ওর কাছে।

স্যামের দিকে তাকিয়ে পাথরের স্তূপের নিচ দিকে ইশারা করলো রেমি। ওদিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কিন্তু স্যাম থামিয়ে দিলো তাকে। স্তূপের দিকে নির্দেশ করে বুঝালো যে তারা যদি সতর্ক না থাকে তাহলে হয়তো নাড়াচাড়ায় তারাও ছোটোখাটো পাথর ধ্বসের নিচে আটকা পড়তে পারে। স্যামের শঙ্কাটা বুঝতে পেরে মাথা ঝাঁকালো রেমি। ও সতর্কই থাকবে। কয়েকটা পাথর সরাতে পারলেই বস্তুটা তার হাতে চলে আসবে। আস্তে আস্তে একটা পাথর সরিয়ে পাশে রাখলো রেমি। তারপর আরেকটা। এভাবে বেশ কয়েকটা সরানোর পর সৃষ্ট ফাঁকটার দিকে আলো ফেললো রেমি। সাথে নিশ্চিত থাকছে যেন ওপরের পাথরগুলো খসে না পড়ে যায়। আলো ধরে কিছুক্ষণ থাকার পর জিনিসটা দেখতে পেলো ও। একটা কামানের গোলা। দেখে হতাশ হলো কিছুটা। হাত বাড়িয়ে দিলো গোলাটা বের করে আনার জন্য।

ঠিক তখনই পায়ের পিছন থেকে হালকা খোঁচা টের পেলো রেমি। সে ভাবছে, হয়তো স্যাম তার বিখ্যাত আবিষ্কার নিয়ে ক্ষেপানোর জন্য খোঁচা দিয়েছে। ঝট করে মাথা ঘুরালো রেমি।

না, ওটা স্যাম না।

একটা বড়ো টাইগার শার্ক ঘুরছে তাকে ঘিরে। এটার দৈর্ঘ্য প্রায় আট ফুটের মতো। এতক্ষণ শান্তভাবে সমুদ্রের তলদেশে সাঁতার কাটছিলো প্রাণীটা। আর এখন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ছুটে আসছে রেমির দিকে।

ঝট করে পাথরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে ঘুরে গেলো রেমি। দ্রুততার সাথে পায়ের পাখনা নাড়ছে শুধু। সাথে সাথে মেটাল ডিটেক্টরটা দিয়ে আঘাত করছে। শার্কের ভেঁতা শুড়ে। বাড়ি খেয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেলো শার্কটা, পরমুহূর্তেই আবার তেড়ে এলো তার দিকে। কামানের গোলাটা হাতে তুলে নিলো রেমি। তারপর ছুঁড়ে মারলো প্রাণীটার মুখের দিকে। তবে খুব একটা লাভ হলো না এতে। উপায় না পেয়ে পাথরের স্তূপটায় লাথি দিতে শুরু করেছে রেমি। লাথি খেয়েই হুড়মুড় করে খসে পড়তে শুরু করেছে পাথরগুলো। মুহূর্তের মধ্যেই ঘোলাটে হয়ে গেছে পরিষ্কার পানিটা।

কাদামাটির ঘোলাটে মেঘের ভিতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে রেমি। কোনো রকমে সাঁতার কেটে ঘোলাটে জায়গাটা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে শুধু।

আতঙ্কে আত্মা ধুকপুক করছে তার। হাতের মেটাল ডিটেক্টরটা নিয়ে ঘুরতে যাবে ঠিক তখনই দেখলো একটা কালো মূর্তি সতরে আসছে তার দিকে। মেটাল ডিটেক্টরটা উঠিয়ে মূর্তিটাকে মারতে যাবে ঠিক তখনই স্যাম বেরিয়ে এলো কাদার ঘোলাটে মেঘের ভিতর থেকে।

স্যাম ইশারা করে কিছু একটা দেখাচ্ছে তাকে। ওদিকে তাকালো রেমি। দৃশ্যটা দেখে আবারো তার আত্মায় পানি ফিরে এসেছে যেন। শার্কটা এখন গতিপথ পরিবর্তন করে অন্য দিকে ছুটে যাচ্ছে। সহজ কোনো শিকার খুঁজতে যাচ্ছে খুব সম্ভবত। আজকের দিনের জন্য তাদেরকেও মিশন এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আগামীকাল ফিরে এসে আবারো চেষ্টা করতে হবে তাদের।

পাথরের ধ্বসে জাহাজের ধ্বংসস্তূপের কতোটা ক্ষতি হয়েছে দেখার জন্য পিছনে ফিরে তাকালো রেমি। পানি এখন আবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। মাথা ঘুরিয়ে আনতে যাবে ঠিক তখনই পিরিচ আকৃতির একটা গোলাকার বস্তু চোখে পড়লো তার। একটা পাথরের কাছে বালিতে পড়ে আছে বস্তুটা। চাকতির মতো বস্তুর অর্ধেকটা লুকিয়ে আছে বালির আড়ালে।

স্যামও দেখেছে ওটা। পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে। পাথরটায় হালকা একটু টোকা লাগলেই চাকতিটা বালির আরো ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। রেমিকে স্তূপটার দিকে নজর রাখার ইশারা করে চাকতিটার দিকে এগিয়ে গেলো স্যাম। তারপর পাথরটায় না ছুঁয়েই চাকতির চারপাশের বালি সরাতে শুরু করলো। কিছুটা বালি সরাতেই হাতে চলে এলো চাকতিটা।

চাকতিটা রেমির হাতে তুলে দিলো স্যাম। রেমি ভেবেছিলো এটাই হয়তো ঐ মিসিং সাইফার হুইলটা। তবে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখার পর আবারো হতাশ হতে হলো ওকে। ছোটো একটা টিনের পাত এটা।

পাতটার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে ডাইভিং ব্যাগে ভরে নিলো ও। তারপর তাকালো ঘড়ির দিকে। আর অল্প কয়েকমিনিটের অক্সিজেন বাকি আছে তাদের। এখনই ওপরে উঠে যাওয়া দরকার। নাহলে পরে বিপদে পড়তে হবে। তাই আর দেরি না করে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলো ওরা।

পানির ওপরে মাথা উঠিয়েই মাউথপিসটা খুলে আনলো রেমি। স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, নট ব্যাড, ফার্গো।

তবে স্যামকে এতোটা আনন্দিত দেখাচ্ছে না।

কী সমস্যা আবার? জিজ্ঞেস করলো রেমি।

আমার পিছনে থাকো শুধু, বোটের দিকে ইশারা করে বলল স্যাম।

বোটের দিকে তাকাতেই দেখলো, একটা পিস্তল হাতে বোটের একপাশে ঝুলে আছে নুনো। আর পিস্তলটা তাক করে ধরে রেখেছে ঠিক তাদের দিকে।

.

১৭.

ব্যাগটা দিয়ে দিন। বোটের দিকে ভেসে যেতে থাকা স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল তরুণ ছেলেটা। এখনই।

নুনো, স্যাম বলল। তোমার এটা করার দরকার নেই।

হ্যাঁ, দরকার আছে।

কেন?

ওটা আপনার জানার প্রয়োজন নেই। ব্যাগ হাতে তুলে দিন।

দিয়ে দিলে?

দিয়ে দিলে ধীরগতির যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর বদলে দ্রুত মৃত্যু পাবেন।

তারা তোমাকে যতো দিচ্ছে, আমরা তার থেকে দ্বিগুণ দিবো।

দ্বিধা ফুটে উঠেছে নুনোর চেহারায়। বারবার রেমি ও স্যামের দিকে তাকাচ্ছে শুধু। তারপর বলল, আপনারা বুঝতে পারছেন না। তারা ইতিমধ্যেই ক্যাপ্টেন ডেলগাডোকে মেরে ফেলেছে। আমি যদি কাজটা না করি তাহলে তারা আমার পরিবারকেও মেরে ফেলবে।

স্যামের উপদেশ উপেক্ষা করে বোটের দিকে সাঁতরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো রেমি। তবে স্যাম তার হাত খাবলে ধরে আটকালো তাকে। তারপর নুনের দিকে তাকিয়ে বলল, তারা তোমাকেও মেরে ফেলবে। ঠাণ্ডা মাথার খুনি ওরা।

আমার পরিবারকে আটকে রেখেছে ওরা। প্লিজ… ক্ষমা করুন আমাকে। পিস্তলটা স্যামের দিকে তাক করে পর্তুগিজ ভাষার কিছু একটা বিড়বিড় করতে শুরু করলো ছেলেটা। খুব সম্ভবত কোনো প্রার্থনা পড়ছে।

এটা ভালো কোনো চিহ্ন না।

তারা এখনো আমার ওপর নজর রাখছে, নুনো বলল। আমি আপনারকে গুলি করেছি কিনা সেটা দেখছে। প্লিজ। আমি আমার পরিবারকে মারতে চাই না।

রেমি, স্যাম বলল। ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে তুমি চলে যাও এখান থেকে।

আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না, স্যাম।

না, যাবে তুমি। নুনো, রেমি নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার পরই আমি ব্যাগটা তোমাকে দিয়ে দিবো।

পিস্তলটা আরো সামনে বাড়িয়ে ধরলো নুনো। না! আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আর আপনি, রেমির দিকে পিস্তলটা তাক করে বলল, ব্যাগটা আমার হাতে দিন, উনার হাতে না।

রেমি… এখনো রেমিকে আটকে রেখেছে ও।

এখনই! মরিয়া কণ্ঠে বলে উঠলো নুনো।

কণ্ঠস্বর বুঝাচ্ছে ছেলেটা এখন অনেকবেশি বিপজ্জনক হয়ে আছে। এই মুহূর্তে ছেলেটার রাগ আরো বাড়ানো খুবই বোকামি হয়ে যাবে। তাই অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও রেমির হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো স্যাম।

বোটটার দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা ওপরে তুলে ধরলো রেমি। সাথে সাথেই ব্যাগটা খাবলে ধরলো নুনো। তবে রেমি সাথে সাথেই ব্যাগটা ছেড়ে না দিয়ে বলল, নুনো, তোমার পরিবার যেন নিরাপদে থাকে এই প্রার্থনাই করবো আমি। আর তুমিও যাতে সঠিক কাজটাই করো, সেই প্রার্থনাও করবো।

বলে ব্যাগটা ছেড়ে দিলো রেমি।

সাথে সাথেই আত্মা চমকে উঠলো স্যামের। ব্যাগটা পেয়ে গেলে তাকে মারতে আর কোনো দ্বিধা থাকবে না নুনোর। বন্দুকের নলের এতো সামনে থাকা রেমির বাঁচারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

ব্যাগটা হাতে নিয়ে খুলে ভিতরে একবার দেখে নিলো নুনো। তারপর যযাডিয়াকের মেঝেতে ব্যাগটা রেখে দিয়ে রেমির দিকে পিস্তলটা তাক করে বলল, আমি স্যরি। বলে ট্রিগার চেপে দিলো।

সাথে সাথেই পানিতে লাফিয়ে উঠে স্যামের দিকে ঘুরে গেলো রেমি। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার। কোনোরকমে সাঁতরে স্যামের দিকে ছুটে আসছে।

রেমি কাছে আসতেই তাকে টেনে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিলো স্যাম। তখনই দ্বিতীয় আরেকটা গুলির শব্দ শোনা গেলো। রেমিকে পুরোপুরি নিজের পিছনে লুকিয়ে নিয়ে নুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালো স্যাম। তবে তৃতীয় কোনো শব্দ আর শোনা গেলো না। যোডিয়াকের ইঞ্জিনের ভোঁ ভোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে শুধু এখন। তাদেরকে পানিতে ফেলেই চলে যাচ্ছে যোডিয়াকটা।

রেমি?

আমি ঠিক আছি।

রেমির চোখের দিকে তাকালো স্যাম। বিশ্বাসই করতে পারছে না যেন। কিভাবে? আমি তো দেখলাম…।

পানিতে গুলি করেছিলো ও। আমাকে ভরকে দেওয়ার জন্য।

কেন?

আমার মনে হয়, আমাদেরকে না মেরেই ওদেরকে বুঝাতে চাচ্ছে যে আমরা মরে গেছি। যদি…

আর কিছু বলতে না দিয়ে রেমিকে ধরে চুমু খেলো স্যাম। তারপর ফিরে তাকালো গলফিনহোর দিকে। কুয়াশার কারণে অতোটা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছে না ওরা। যদি তাদের কপাল ভালো হয়ে থাকে, তাহলে গলফিনহো থেকেও হয়তো ওদেরজে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। যোডিয়াকটা প্রায় অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে গেছে। স্যাম আশা করছে নুনোর ধোকাটা যেন কাজে আসে। যদি কাজে না আসে, তাহলে… যাক অন্ততপক্ষে একটা সতর্কচিহ্ন তো তারা পাওয়া গেছে। যদি কেউ তাদেরকে মারার জন্য ফিরে আসতে চায়, তাহলে যোডিয়াকে করেই আসতে হবে। আর যযাডিয়াকটা দেখলে কিছুটা সতর্ক হতে পারবে ওরা।

বাঁচতে হলে এখন তাদেরকে পাথরটার কাছাকাছিই থাকতে হবে। গলফিনহো এখানে আসতে পারবে না কখনো।

অনন্তকাল ধরে চলার পর অবশেষে গলফিনহোর কাছে গিয়ে পৌঁছালো যোডিয়াক। নোঙ্গর ফেলে বোটটাকে ওপরে উঠাতে দেখছে স্যাম ও রেমি। তারপর, জাহাজের ধার থেকে একজনকে অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে নিচের দিকে ঝুঁকতে দেখা গেলো। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো স্যাম ও রেমি। দৃশ্যটা তারা জানে। রাইফেলের গুলিতে যোডিয়াককে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে।

কাজ শেষে আবারো যাত্রা শুরু করলো গলফিনহো। আস্তে আস্তে তাদের চোখের সামনে থেকে।

ভালো দিকটা হলো, বাতাস ও উত্তাল সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে চেঁচিয়ে বলল রেমি, আমরা তো বেঁচে আছি।

হ্যাঁ, এটাই আসল ব্যাপার! পানিতে ভেসে রেমির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল স্যাম। পানিতে ভেসে থাকতে হলে শক্তি বাঁচিয়ে রাখতে হবে তাদেরকে অক্সিজেনের খালি ট্যাঙ্কগুলো আর বহন করার প্রয়োজন করছে না ওরা। তাই ট্যাঙ্কটা খুলে পানিতে ফেলে দিলো স্যাম। রেমিকেও একই কাজ করতে বলল।

তারপর তাকালো চারপাশের পানির দিকে। ডাইভিংর অবস্থানটা থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে ওরা। দ্বীপটাও আস্তে আস্তে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো গিয়ে আছড়ে পড়ছে অভিশপ্ত পাথরটার গায়ে। সাথে সাথে তীব্র স্রোতের অক্লান্ত টান তো আছেই। এর মধ্যেই সাঁতার কেটে বিপদ থেকে দূরে থাকতে হবে ওদেরকে।

আকাশের দিকে তাকালো স্যাম। আকাশের গাঢ়মেঘগুলো ভারী বর্ষণের হুমকি দিচ্ছে যেন। আমাদের হাতে এখন আসলে দুটো উপায় আছে। এক, মেইনল্যান্ডের দিকে সাঁতরে যাওয়া, নয়তো দুই, এখানেই অপেক্ষা করা।

এই পানিতে?

হয় পানিতে, নয়তো ঐ দ্বীপে, বলল স্যাম। শার্ক নাকি ভাইপার কোনটা বেছে নিবে?

দ্বীপটার দিকে তাকালো রেমি। চোখ আটকালো পাথুরে তীরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলোর দিকে। যদি বলি দুটোর একটাও পছন্দ না আমার?

স্যরি রেমি, বলল স্যাম। এছাড়া কোনো উপায় তো আর নেই। যদি না। তুমি কোনো প্ল্যান বি বের করে থাকো?

সেলমার সাহায্য পাঠানোর অপেক্ষা করবো আমরা?

কুয়াশার পরিমাণ আগের থেকে আরো বেড়েছে এখন। বাতাসের গর্জনও বাড়ছে। ঝড় খুব সন্নিকটে এসে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি ফোঁটা পড়তে শুরু করলো পানিতে। এই ঝড়-বাদলের ভিতরে মেইনল্যান্ডের দিকে সাতরে এখন প্রায় অসম্ভব। এমনকি, বিশ্বসেরা সাঁতারুদের পক্ষেও সম্ভব না এটা। শুধু ঝড়-বাদলই না, এগুলোর সাথে পানির স্রোতের তীব্র টানের ব্যাপারও আছে। সাতরে এগুতে গেলে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

দ্বীপেই চলো, বলল স্যাম। পানিতে ডুবে মরার চেয়ে ওখানে গিয়ে সাহায্যের অপেক্ষা করাই ভালো। সেলমা অবশ্যই সাহায্য পাঠাবে। আর স্যাম আশা করছে সাপগুলোও হয়তো বৃষ্টির পানি অতোটা পছন্দ করে না। তাই দ্বীপটাই আপাতত নিরাপদ হবে তাদের জন্য।

রেমিও মাথা ঝাঁকালো। বুঝতে পারছে এই পরিস্থিতিতে দ্বীপটাই তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। এই ভেবে দ্বীপের দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করলো ওরা। তবে কপাল খারাপ। স্রোতটা চলছে তাদের বিপরীত দিকে। কয়েক মিনিট সাঁতরানোর পর স্যাম বুঝতে পারলো যে এভাবেও কোনো লাভ হবে না। বেশি দূর এগুতে পারবে না।

নতুন কোনো পরিকল্পনা করতে হবে তাদেরকে।

ঠিক তখনই রেমি তার পাশে ভেসে এসে বলল, স্যাম…

এক মিনিট ভাবতে দাও আমাকে, বলল স্যাম।

ওদিকে দেখো! বলে দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করলো রেমি।

মাথা ঘুরালো স্যাম। ভাবছে গলফিনহোই তাদেরকে খোঁজার জন্য ফিরে আসছে আবার। কী?

ঐ যে দেখো। প্ল্যান বি।

কিন্তু ধূসর ও উত্তাল পানির ফেনা ছাড়া স্যাম আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।

ডানের কোনার দিকে দেখ। আমার মনে হয় ওটা যোডিয়াক।

এবার দেখতে পেয়েছে স্যাম! ঢেউয়ের তালে উজ্জ্বল লাল কিছু একটা ভাসছে পানির ওপর। একবার ওপরে উঠছে, আরেকবার নিচে নামছে। এটা যোডিয়াক না হলেও, উজ্জ্বল রঙের কিছু একটা হবে। তবে যেটাই হয়ে থাকুক না কেন, এই মুহূর্তে তাদের আর হারানোর কিছু নেই। তাই স্যাম বলল, চলো।

সুবিধা এটাই যে তারা এখন স্রোতের সাথে সাথে এগিয়ে যেতে পারছে। তাই কষ্টটা কম হচ্ছে। তবে অসুবিধাও এটাই যে উজ্জ্বল রঙের বস্তুটাও ভেসে যাচ্ছে স্রোতের সাথে সাথে। তবে তারপরও দ্রুতই ওটার দিকে এগিয়ে যেতে পারছে ওরা।

ওটা আসলেই যযাডিয়াক। তবে কিছুটা পানিতে ডুবে আছে বোটটা। আরেকটু কাছে যেতেই স্যাম বুঝতে পারলো যে বোটের বাইরের মোটরটা পানির নিচে ডুবে আছে। শুধু গলুইটাই এখন ভেসে আছে পানির ওপরে।

এটাকে আসলে বোট না বলে লাইফ প্রিজার্ভার বলা যায় এখন। এটা দিয়ে তারা কোথাও যেতে পারবে না। তবে কোনো সার্চ পার্টি এলে কালো ওয়েটস্যুটের থেকে এই লাল বোটটাই ভালো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।

অবশ্য তাদের কপাল খারাপ। বোটের সামনের মাথাটা খাবলে ধরতেই দেখলো যে এটা বেশিক্ষণ পানিতে ভেসে থাকতে পারবে না। তাদের ওজনের ভারে পুরোপুরিই পানিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখানেই থাকো, রেমিকে বলল স্যাম। আমি গিয়ে চেক করে দেখি।

মাথা ঝাঁকালো রেমি। নৌকার গলুই আঁকড়ে ধরে রেখেছে ও। স্যাম ওদিকে তার বেল্ট থেকে ফ্ল্যাশলাইটটা বের করে এবং মাস্কটা লাগিয়ে ডুব লাগালো পানিতে ভাসমান একটা বোটকে পানির নিচে ডুবানো বেশ কঠিন একটা কাজ। গুলি করার সময় ডেলগাডোর লোকেরা বেশ কয়েকটা এয়ারটিউব মিস করেছিলো। ওগুলোর কারণেই যযাডিয়াকটা এখনো পানির ওপরে ভেসে থাকতে পারছে। তবে মোটরটা আটকে নেই বোটের সাথে। বুলেট বর্ষণে নৌকা পড়ে যাওয়ার সময় তরুণ মুনো কোনোভাবে মোটরটা বোট থেকে আলগা করে ফেলতে পেরেছিলো।

স্যাম আশা করলো এতে করে হয়তো তারা আরো বেশ কিছুটা সময় ধরে ভেসে থাকতে পারবে। মাথা উঁচিয়ে রেমির কাছে এগিয়ে এসে বলল, বুলেটের ছিদ্র আছে অনেকগুলো। তবে ভেসে থাকার মতো যথেষ্ট বাতাস আছে এখনো। আশা করছি সার্চ পার্টি আসা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারবো আমরা।

এক মুহূর্তের জন্য কিছুই বলল না রেমি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, ছেলেটা আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে।

সাময়িক সময়ের জন্য।

ঠিক তখনই কাছে পিঠেই কোথাও থেকে বজ্রাঘাতের বিকট শব্দ ভেসে আসতে শুনলো ওরা। স্যাম ধারণা করছে বজ্রটা খুব সম্ভবত দ্বীপে আঘাত করেছে। আশা করছে বজ্রপাত ঘটলে ঐ দ্বীপেই ঘটবে, পানিতে না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো পানিতে। সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। কোনো রকমে যোডিয়াকের এক প্রান্তে আঁকড়ে ধরে রেখেছে ওরা। উত্তাল ঝড়ো বাতাস তাদেরকে প্রায় ছিটকে দিতে চাচ্ছে যেন। হুট করেই পানির নিচে মোকাবেলা করা টাইগার শার্কগুলোর কথা মনে পড়লো স্যামের। ওগুলো নিশাচর প্রাণী। রেমিকে কথাটা বলতে যাবে, তখন রেমিই বলে উঠলো, আমি ভাবছিলাম…।

রেমিকে শান্ত ও সতর্ক থাকতে দেখে স্বস্তি পেলো স্যাম। বলল, কী নিয়ে ভাবছিলে?

তোমার বলা আরামদায়ক সপ্তাহটার ব্যাপারে।

আচ্ছা?

ওটা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া উচিৎ আমাদের। কী বলো তুমি?

এই মুহূর্তগুলোতেই রেমির প্রতি স্যামের ভালোবাসার পরিমাণ বিবর্ধিত হয়। তারা এখন একটা ডুবন্ত ভেলায় ধরে ঝুলছে, আর রেমি এর মধ্যেও হাস্যরস করার মতো কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। এই মুহূর্তে উদ্বেগ কমানোর জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী থাকতে পারে? ভালো বলেছো। তাহলে… কাল দিন পর থেকে শুরু করা যাক সপ্তাহটা?

কাল থেকে না?

অন্ততপক্ষে মেইনল্যান্ডে ফেরা পর্যন্ত তো অপেক্ষা করা উচিৎ আমাদের। পরবর্তীতে আমরা কোথায় যাচ্ছি সেটাও জানা দরকার।

বলে দুইজনই দুইজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো কিছুক্ষণের জন্য। উদ্বেগের মাত্রাটা এখন কিছুটা হলেও কমে গেছে।

কিভাবে তারা এই বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে তা নিয়ে ভাবছে স্যাম। তাদের অবস্থান ফাঁস হওয়ার আসলে একটা উপায়ই আছে। ব্রি। যদিও এই মুহূর্তে রেমির বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারটা উঠিয়ে আবারো নিজেদের মধ্যে উদ্বেগ ফিরিয়ে আনার কোনো ইচ্ছা নেই স্যাম। কিভাবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে সেটা নিয়েই ভাবা উচিৎ। তবে রেমি মনে হয় স্যামের চিন্তা ধরে ফেলতে পেরেছে। তাই বলল, আমি স্যরি।

স্যরির কিছু নেই, রেমি। আমরা একসাথেই আছি এতে, তুমি আর আমি, সবসময়ই থাকবো।

শুনে মুচকি হাসলো রেমি। অন্ধকারের কারণে স্যাম অতোটা নিশ্চিত না, তবু এটুক বুঝতে পারছে রেমির হাসিতে হালকা বেদনার ছাপ মিশে আছে। সে জানে রেমি যখন কাউকে বিশ্বাস করে, তখন ঐ মানুষটাকে মনপ্রাণ দিয়েই বিশ্বাস করে। রেমিকে এই বেদনাগ্রস্ত অবস্থায় দেখে প্রচণ্ড খারাপ লাগছে স্যামের। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলানোর মতো কিছু করা বা বলারও কোনো উপায় নেই তার।

বেঁচে থাকাটাই এখন মুখ্য বিষয়।

পরের কয়েক ঘণ্টা ধরেও এই কাজটাই করে গেলো তারা। যোডিয়াকটা এখন আরো ডুবে গেছে। স্যামের আশঙ্কা হচ্ছে কেউ এসে তাদের বাঁচানোর আগেই হয়তো সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যেতে হবে তাদেরকে।

তারা দুজনই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হয়ে আছে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে স্যামের। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেছে, তখনই তার মনে হলো যে পানিতে সে কিছু একটা দেখছে। পানির মরীচিকা খুব সম্ভবত। একটা আলো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে তার। নিশ্চিত হবার জন্য চোখ কচলাযলো স্যাম। না, ওটা কোনো মরীচিকা না। আসলেই একটা আলো জ্বলছে, এবং আস্তে আস্তে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে আলোটা।

.

১৮.

রেমি…

দেখেছি ওটা।

স্নেক আইল্যান্ডের দিকে একটা বোট এগিয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য দ্বীপ অভিমুখে চলতে থাকলে বোটটা মিস করবে তাদেরকে। তারা ভাসতে ভাসতে এখন অনেক দূর চলে এসেছে।

হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বোটটাকে ডাকতে শুরু করলো স্যাম ও রেমি। তবে বাতাসের গর্জনে তাদের কণ্ঠস্বর অতোটা দূরে যেতে পারছে না।

অসহায়ভাবে ওভাবেই কয়েকমিনিট বোটটার দিকে তাকিয়ে রইলো ওরা। তারপর দেখলো হুট করেই বোটটা দ্বীপ অভিমুখ থেকে সরে গেছে। দ্বীপের দিক থেকে ঘুরে এখন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।

আবারো ডাকতে শুরু করলো স্যাম ও রেমি। গলার স্বর ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ডেকেই গেলো। অনন্তকাল ধরে ডাকার পরে যেন অবশেষে তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছে বোটটা। চোখ ধাঁধানো আলোতে প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা ওদের। আলো সইতেই দেখলো যে প্রাচীন, জং ধরা, পেট মোটা একটা বোট এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পাশে থামলো বোটটা। ওপর থেকে তাদের দিকে দড়িতে বাধা লাইফ প্রিজার্ভার ছুঁড়ে দিলো কেউ। কে ছুঁড়েছে সেটা নিয়ে না ভেবে প্রথম লাইফ প্রিজার্ভারটা খাবলে ধরে রেমিকে দিয়ে দিলো। রেমি নিরাপদভাবে ওপরে উঠেছে দেখার পর নিজে খাবলে ধরলো অন্য প্রিজার্ভারটা। কেউ একজন টেনে তুলছে তাকে।

ওপরে উঠতেই দেখলো এন্টোনিও তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই টেনে তুলেছে তাদেরকে।

ধন্যবাদ, স্যাম বলল।

তরুণ ছেলেটা মুচকি হেসে বলল, ধন্যবাদ আমাকে না, আমার চাচাকে দিন। বলে হাল ধরে রাখা ধূসর চুলের লোকটার দিকে ইশারা করলো এন্টোনিও। ভিতরে চলুন।

পথ দেখিয়ে তাদেরকে কেবিনে নিয়ে গেলো স্যাম। তাদেরকে দেখে তরুণ একটা লোকের হাতে হাল ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে এলো এন্টোনিওর চাচা।

এন্টোনিও লোকটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ইনি আমার চাচা। হেনরিকে সালাযার।

লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্যাম বলল, আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও জানা নেই আমাদের।

হেনরিকেও হাত মিলাযলো তাদের সাথে। তারপর পর্তুগিজ ভাষায় কিছু বলে মৃদু ধাক্কা দিলো এন্টোনিওকে।

লোকটার কথা শুনেই হাসি ফুটে উঠলো এন্টোনিওর মুখে। স্যাম ও রেমিকে কম্বল দিতে দিতে বলল, চাচা বলছেন, যদি তিনি না এখানে না আসতেন, তাহলে আমাকে আমার প্রথম বড়ো ভাড়াটা হারাতে হতো। তারপর আমাকে সাহায্য করা লাগতো তাঁর। তখন আরো মহাবিপদে পড়া লাগতো চাচাকে। হাহাহা।

এন্টোনিওর হাস্যরসপূর্ণ কথা শুনে মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে ওরা। রেমি তো প্রায় জড়িয়েই ধরতে চেয়েছিলো ছেলেটাকে। তখনই টের পেলো যে এখনো শরীর ভিজে আছে তার। তাই বলল, তোমার কো আজীবন ঋণী হয়ে থাকবো আমরা।

কিভাবে বুঝলে যে আমাদের খোঁজা লাগবে? স্যাম জানতে চাইলো। দ্বীপের এতো কাছে থাকবো তাই বা বুঝলে কিভাবে? আমাদের তো আগামীকালের আগে ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো না।

সকালে আপনারা যাদের সাথে করে গলফিনহোতে উঠেছিলেন, তাদেরকে চিনতাম না আমি। ক্যাপ্টেন ডেলগাড়োকেও চোখে পড়েনি। তাই চাচাকে গিয়ে জানাই এটা। তখন চাচা বলল, ক্যাপ্টেনের কখনোই ঝড়ের আগে আগে আপনাদেরকে নিয়ে বেরুনোর কথা না। সন্দেহ জাগলো চাচার। তাই খুঁজতে বের হওয়া। আর চাচা এদিকের পানিতেই মাছ ধরে। এখানের সব কিছুই হাতের উল্টোপিঠের মতো চিনেন তিনি। স্নেক আইল্যান্ডে পৌঁছুতেই পানির স্রোত দেখে চাচা বুঝে ফেলে যে আপনারা কোথায় আছেন।

****

পরদিন ভোর সকালে এসে বন্দরে পৌঁছালো ওরা। রাতে বোটে তারা দুজনই খুব ভালোভাবে ঘুমিয়েছে। বন্দরে পৌঁছেই চলে গেলো হেনরিকের বাড়িতে। আটলান্টিকের তীরবর্তী দুই বেডরুমের বাংলোতে বসে পুলিশের কাজ শেষের অপেক্ষা করছে এখন। বিকালের দিকে তাদের ডাইভিংর সরঞ্জামগুলো নিয়ে ফিরে এলো পুলিশের লোকেরা। আপাতত এগুলোই খুঁজে বের করতে পেরেছে ওরা। সাথে জানালো যে তারাগলফিনহোকেও খুঁজে পেয়েছে, পানিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিলো বোটটা। এরপর পুলিশকে স্টেটমেন্ট দিয়ে সব কাজ শেষ হতে হতে প্রায় সন্ধ্যার মতো লেগে গেলো ওদের। সন্ধ্যায় এন্টোনিওকে ছেড়ে দিতে চাইলেও, এন্টোনিওই জোরাজুরি করলো যে সে ই তাদেরকে সাও পাওলোর হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। সন্ধ্যায় ড্রাইভ করতে কোনো সমস্যা হবে না তার।

তুমি আর তোমার চাচা আমাদের জীবন বাঁচিয়েছো, সাও পাওলোর দিকে যাওয়ার পথে এন্টোনিওকে বলল স্যাম। ছেলেটা আসলেই ভালো গাড়ি চালাতে জানে। তোমাদের এই ঋণ আসলেই কখনোই আমাদের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব না। তবে তোমার চাচা কোথায় থাকে তা এখন জানি আমরা। বাসায় ফিরেই তোমাদের দুজনের জন্য কিছু পাঠানোর চেষ্টা করবো আমরা।

আগের রাতেই এটা নিয়ে রেমির সাথে আলোচনা করেছে স্যাম। এন্টোনিওকে একটা বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার চিন্তা করেছে ও। এতে করে ছেলেটার বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল স্কুলের খরচটা মিটে যাবে। আর তার চাচাকে দিবে একটা নতুন বোট, সাথে সাথে তার কাজিনের জন্যও একটা শিক্ষাবৃত্তি দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গাড়ি থেকে নেমে রেমি ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমরা কখনোই ভুলবো না তোমাকে, এন্টোনিও। শীঘ্রই আবার যোগাযোগ করবো তোমার সাথে।

****

হোটেল রুমে টেবিলের সামনে বসে আছে স্যাম ও রেমি। কেউই কোনো কথা বলছে না। স্যাম জানে এখন তাদের আলোচনা করা উচিৎ, বিশেষ করে তাদের দলে থাকা কেউ একজনের পরিকল্পনা ফাঁস করার ব্যাপারটা নিয়ে। তবে এটা নিয়ে রেমিকে চাপ দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার।

রেমি চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। স্যামের দিকে তাকিয়ে দুর্বলভাবে হেসে বলল, এটা ব্রির কাজ, তাই না?

এছাড়া তো আর কোনোভাবেই আমরা কোথায় আছি সেটা কারো জানার কথা না। যদি না এভেরির লোকেরাও হুট করেই আমাদের মতো করে ভেবে একই সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়। কিন্তু খুবই কাকতালীয় ব্যাপার এটা। আর আমরা যে বোট ভাড়া করেছিলাম, সেই বোটের ক্রুদের কিডন্যাপ হওয়া, আমাদেরকে দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁজে বের করানো, আর এরপর আমাদেরকে মারতে চাওয়া। এগুলোকে তো কাকতালীয় বলা যায় না।

আমি এখনো ব্যাপারটা মানতে পারছি না। তাকে বিশ্বাস করি আমি। আমি- বলতে গিয়ে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। আমার মনে হয় সেলমার সাথে কথা বলা উচিৎ আমাদের। যাত্রার পরবর্তী প্ল্যান সাজানো দরকার।

ঘড়ির দিকে তাকালো স্যাম। সেলমা খুব সম্ভবত ঘুম থেকে উঠে পড়েছে এতোক্ষণে। অবশ্যই।

তাকে কী বলবো আমরা?

ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ অপশনটা ওপেন করলো স্যাম। একান্ত নিরিবিলি সময়ে আমাদেরকে কল করতে বলবো। ও বুদ্ধিমতি। মেসেজ দেখলেই ও ব্যাপারটা বুঝে যাবে।

চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো রেমি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছে, ওহ, স্যাম…

আমরা এই রহস্যের সমাধান বের করেই ছাড়বো।

হুম। তবে আমার মনে হয় পুলিশের সাথে কথা বলা উচিৎ আমাদের।

যৌক্তিক প্রমাণ ছাড়া কথা বলে লাভ হবে না। বলে মেসেজটা পাঠালো স্যাম।

পাঁচ মিনিট পরেই কলব্যাক করলো সেলমা।

স্যাম কল রিসিভ করে বলল, দাঁড়াও, স্পিকারফোনটা চালু করে নিই। রেমিও আছে আমার সাথে।

শুভ সকাল, সেলমা বলল, গতকালের ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করবেন নিশ্চয়?

তুমি কি একা আছে এখন?

হ্যাঁ, অফিসে আছি। ব্রি আর লাযলো ওপরতলায় নাস্তা করছে।

বেশ, বলল স্যাম। তাহলে ব্যাপারটা নিয়ে তুমিও ভাবছো?

হ্যাঁ, মিস্টার ফার্গো। হতভম্ব হয়ে গেছি বলা যায়। আমি তাকে বাইরের কারো সাথেই কথা বলতে দেখিনি। আর সেও কিন্তু সত্যিই সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে আপনাদের জন্য।

স্যাম বুঝতে পারছে যে রেমি তাকিয়ে আছে তার দিকে। এছাড়া আর কোনো ভাবেই তাদের অবস্থান ফাস হওয়ার উপায় নেই, যদি না সেলমা বা লাযলো কারো কাছে তথ্য ফাঁস করে থাকে। এবং তারা দুজনই ভালো করে জানে যে এটা কখনোই সম্ভব না। জানার একটা উপায়ই আছে, স্যাম বলছে। আমাদেরকে ভুল কিছু তথ্য ছড়াতে হবে। এতেই বুঝা যাবে ফাসটা কোথা থেকে হচ্ছে। বলে রেমির দিকে তাকালো স্যাম।

টেবিলের মাঝখানে রাখা স্যামের ফোনের দিকে তাকিয়ে রেমি বলল, আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

যদি না তোমার কাছে কোনো ভালো আইডিয়া থেকে থাকে? স্যাম বলল সেলমাকে।

ভাবার মতো কিছুক্ষণ সময় দিন আমাকে। লাযলো আপনাদের ভোলা ছবিগুলো আগে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখুক। এরপর দুজনে মিলে যৌক্তিক কোনো একটা উপায় বের করার চেষ্টা করবো। উপায় পাওয়ার সাথে সাথেই আপনাদেরকে কল করবো আমি।

আচ্ছা। তোমার কলের অপেক্ষায় রইলাম।

ফোন কেটে দিলো স্যাম। যদিও সেলমাই সব কাজ করবে, তারপরও নিজেরা অলস বসে রইলো না। টুকিটাকি তথ্যগুলো খতিয়ে দেখেছে ওরা। অবশ্য দরকারে আসার মতো কিছুই বের করতে পারেনি। সারাদিন ধরে আলোচনার পর সন্ধ্যায় ডিনার খেতে বেরুলো রেমি ও স্যাম। একটু আগেভাগেই ডিনার করতে বেরিয়েছে আজ। এস্কুইনা মোকোতোতে ডিনার করবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ব্রাজিলিয়ান খাবারের জন্য বিখ্যাত এই রেস্টুরেন্টটা। ভারী খাবারের বদলে হালকা খাবারই খেলো অবশ্য। খাওয়া শেষে ওয়াইনের বদলে পান করলে আর্টিসান বিয়ার।

খাবার-দাবার পর্ব শেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরুনোর সময়ই সেলমা ফোন করলো তাদেরকে।

বলল, জাহাজের ধ্বংসস্তূপ থেকে আপনাদের পাওয়া বস্তুগুলোর ব্যাপারে কিছু তথ্য বের করতে পেরেছি আমরা। লায়লো আছে আমার সাথে। ওই সব বলবে আপনাদের।

লাযলো ফোন লাইনে আসার পর স্যাম বলল, হোটেলে ফিরার সাথে সাথেই তোমাদেরকে কলব্যাক করবো আমি। এখন বাইরে আছি। কথা বলার মতো অবস্থা নেই।

আচ্ছা, ঠিক আছে, লাযলো বলল। তবে খবর কিন্তু খুব ভালো বা খারাপ কোনোটাই না। ভালো-খারাপ দুটো মিলিয়েই বলা যায়।

.

১৯.

ওয়াশিংটন ডিসি

চার্লস এভেরি অফিসের দরজা দিয়ে বেরুতে যাবেন, ঠিক তখনই সেক্রেটারি তাকে ডেকে থামিয়ে বলল, তাঁর জন্য একটা কল এসেছে। বিরক্ত হয়ে এভেরি বললেন, বাদ দেওয়ার উপায় নেই? এখন একটা ডিনার মিটিং-এ যাওয়ার কথা আমার।

ইতিমধ্যেই সদস্যদের অনেকে চলে এসেছে মিটিং-এ যোগ দেওয়ার জন্য। বাইরের লবিতে বসে তার জন্যই অপেক্ষা করছে সবাই।

তবে তার বিশ বছর বয়স্কা সুন্দরী সেক্রেটারী সুযেট তার দিকে তাকিয়ে কামুকে ভাবে হেসে বলল, মি. ফিস্কের ফোন এটা।

শুনে সুযেটের দিকে তাকালেন এভেরি। ফিস্কের কল হলেও ধরার এতোটা শখ নেই তার। তবে ফার্গোরা এখন সমুদ্রের নিচে মাছের খাবারে পরিণত হয়েছে কিনা সেটার ব্যাপারে জানার ইচ্ছা আছে তার। আমার ফোনে কল ট্রান্সফার করে দাও, বলে আবার অফিসের ভিতরে পা দিলেন এভেরি। ডেস্কে বসে ফোনের রিসিভারটা তুলে বললেন, ডিনারে যাচ্ছিলাম আমি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে?

মাত্রই সাও পাওলোর ক্রুদের সাথে দেখা হয়েছে আমার।

এবং?

উত্তরটা দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ থেমে রইলো ফিস্ক, তারপর বলল, সাইফার হুইল পাওয়ার একটা সূত্র পাওয়া গেছে।

অবশেষে, বিজয়ের উল্লাসে ভরে উঠেছে তার মন। গর্বিত দৃষ্টিতে তাকালেন ডেস্কের ওপরে রাখা পাইরেটস অ্যান্ড প্রাইভেটিয়ার্স বইটার দিকে। কয়েক শতাব্দী ধরেই তাঁর পরিবার তাদের থেকে চুরি যাওয়া বস্তুটা উদ্ধারের চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু কেউই উদ্ধার করতে পারেনি। অবশেষে তিনি উদ্ধারের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। আর শুধু অল্প কিছুটা মুহূর্ত…

কই আছে ওটা?।

ব্রাজিলের সাও পাওলোর কাছাকাছি কোথাও। আমি এখন এয়ারপোর্টের দিকেই যাচ্ছি।

এভেরির নিজেরও ইচ্ছা করছে সাও পাওলো উড়ে যাওয়ার। তবে এমনটা করতে গেলে সবাই তার দুর্বলতা দেখে ফেলবে, অথবা সাইফার হুইলের আসল গুরুটা বুঝে যাবে। তিনি কাউকেই এটার ব্যাপারে সত্যটা বলেননি। এমনকি ফিস্ককেও না। ফিস্ক শুধু জানে– এটা এভেরিদের পারিবারিক সম্পদ, অনেককাল আগে হারিয়ে গিয়েছিলো। এটার আসল গুরুত্বটা জানে না ও। সঠিক সময়ের আগ পর্যন্ত এটার ব্যাপারে তিনি কাউকে বলবেনও না কিছু।

আর ফার্গোরা? তাদের কি অবস্থা?

যতোটা মনে হচ্ছে তারা হয় ঝড়ে ডুবে গেছে নয়তো সাঁতরে দ্বীপে গিয়ে সাপের কামড় খেয়ে মরেছে। যেটাই হোক, এটা নিশ্চিত যে-ফার্গোরা আর পথে বাধা দিতে পারবে না।

অবশেষে, ভেবে আরামে চেয়ারে হেলান দিলেন এভেরি। সপ্তাহে এই প্রথমবারের শান্তি অনুভব করতে পারছেন তিনি। ফার্গোদের জন্য বেশ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। ফার্গোরা সান্তোস বন্দরে যাচ্ছে শুনে ওখানকার সবগুলো নৌযানই ভাড়া করতে হয়েছিলো তাকে। কাজটা মোটেও সহজ ছিলো না। এছাড়া কোনো উপায়ও ছিলো না তার হাতে। সাইফার হুইলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো ফার্গোরা। তবে যতো কাছেই যাক, এখন আর ওতে কিছু যায়-আসে না। তবে, ঝুঁকি এখনো একটা আছে। ঝুঁকিটা মাথায় আসতেই বললেন, ট্রেস করে কি আমার কাছে পৌঁছার মতো কোনো সম্ভাবনা আছে?

একদমই না। ক্রুদের সাথে ভালোভাবেই হিসাব নিকাশ চুকানো হয়েছে। কোনো দলিল নেই। ভাড়া করা সবাইকেই গুপ্ত অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে। ফার্গোদের মত নিয়ে তদন্ত করলে কেউই কিছু খুঁজে পাবে না। অন্তত এখন পর্যন্ত আপনাকে সন্দেহ করার মতো কোনো সূত্রই নেই।

গুড। নজর রাখো যেন পরিস্থিতিটা এরকমই থাকে।

ফিস্কের থেকে ইতিবাচক জবাব শুনে ফোন নামিয়ে রাখলেন এভেরি। নিরবে বসে বইটার দিকে তাকিয়ে আছেন শুধু। মনে মনে বলছেন, দ্রুতই এই টাকা খরচ এবং ঝামেলা পোহানোর পুরষ্কারটা পাবেন। খুব শীঘ্রই! ভাবতে ভাবতে প্রায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন, ঠিক তখনই অফিসের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো কেউ।

চোখ তুলে আগন্তুকের দিকে তাকালেন এভেরি। হঠাৎ তার স্ত্রী আলেক্সান্দ্রাকে অফিসে আসতে দেখে বেশ চমকে গেছেন।

আলেক্সান্দ্রার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। এই বয়সেও মহিলার সৌন্দর্য হারিয়ে যায়নি। অফিসে ঢুকেই পার্সটা কাউচের ওপর ছুঁড়ে ফেললো মহিলা। তারপর বসে বলল, লবিতে থাকা ঐ তরুণীটা কে?

ক্লায়েন্ট।

ওহ, ওদেরকে তাহলে এখন তুমি এই নামে ডাকো? ক্লায়েন্ট? কে কার সার্ভিসের জন্য টাকা দিচ্ছে এখানে?

কী চাও তুমি?

আমার অ্যাকাউন্টে দেখলাম বেশ কিছু পরিমাণ টাকা নেই। ওগুলো আমি কখন খরচ করেছি তা নিয়েই আলাপ করতে এসেছি।

ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।

টাকাগুলোর সাথে কি ঐ ম্যাপটার কোনো সম্পর্ক আছে? যেটাকে তুমি হন্যে হয়ে খুঁজছে, ঐ ম্যাপটা? যদি তাই হয়, তাহলে তো টাকাগুলো তোমার অ্যাকাউন্ট থেকে খরচ করা উচিৎ। তাই না?

বলে কাউচ থেকে উঠে লিকার ক্যাবিনেটের দিকে এগিয়ে গেলো আলেক্সান্দ্রা। ক্যাবিনেটে বোতলগুলো লেবেল চেক করে দেখছে। তারপর নিজের জন্য রেখে দেওয়া ব্র্যান্ডির বোতলটা বের করে এনে এক চুমুক গিলে এগিয়ে গেলো এভেরি ডেস্কের দিকে। ডেস্কে রাখা প্রাইভেট অ্যাণ্ড প্রাইভেটিয়ার্স বইটার ওপর কিছুক্ষণ হাত বুলানোর পর বলল, যে লোক কিনা আমাদের আসন্ন ডিভোর্সের কারণে নিজের সম্পদ লুকিয়ে রাখায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, আমার তো মনে হয় টাকা খরচের ব্যাপারেও তাকে আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিলো।

চেয়ার থেকে উঠে লিকার ক্যাবিনেটের দিকে পা বাড়ালেন এভেরি। স্ত্রীর ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছেন না। আলেক্সান্দ্রার অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া টাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা খাতে ব্যায় করেছেন তিনি। অন্য কিছু প্রজেক্টের জন্য নগদ টাকার প্রয়োজন পড়েছিলো, তাই নিয়েছিলেন। কারণ তাঁর নিজের অ্যাকাউন্টের টাকাগুলো ফিস্ক তার মিশনের পিছনে ব্যয় করছে। তোমার কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।

আমার সাথে বোকার অভিনয় করো না, চার্লস। তুমি হয়তো ভাবছো তোমার এই মোহের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না? ভুল ভাবছো। যাই হোক দুটো কথা শুনে নাও। এক, আমি একজন ফরেন্সিক অ্যাকাউন্টেন্ট নিয়োগ করেছি। তো তুমি যদি তোমার টাকা কোথাও লুকিয়েও রাখো, তাহলে সেটা বের করতে কোনো সমস্যা হবে না আমার। আবার ভেবে বসো না যে ডিভোর্সে তোমাকে লুট করে নিতে চাইছি আমি। আর দুই, তোমার এই গুপ্তধনের যদি আসলেও কোনো অস্তিত্ব থেকে থাকে এবং যেহেতু তুমি আমাদের টাকা ব্যবহার করে এটা খুঁজছো, তাই যা পাবে তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে। আমরা যে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিয়ে করেছিলাম, তা কি তুমি ভুলে গেছো? একদম ফিফটি-ফিফটি হবে কিন্তু, ডার্লিং। ঠিক অর্ধেক অংশ।

বলে বিদ্রুপাত্মকভাবে গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরলো আলেক্সান্দ্রা।

বোতল খুলে গ্লাসে ড্রিংক ঢাললেন এভেরি। এক ঢোকে পুরোটা গিলে নিয়ে আরেকবার গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বললেন, ওটা আমার পারিবারিক সম্পত্তি। এটায় তোমার কোনো অধিকার নেই।

পারিবারিক সম্পত্তি? বলে বইয়ের মলাট উল্টালো আলেক্সান্দ্রা। পৃষ্ঠাগুলো দেখতে দেখতে বলল, আমার যতদূর মনে পড়ে, তোমার আগ্রহের এই ম্যাপ বা কোডটা খুব সম্ভবত তোমার পূর্বপুরুষেরাই কয়েকশো বছর আগে আসল মালিকের থেকে চুরি করেছিলো। তুমিই তো আমাকে বলেছিলে এটা, তাই না? এককালে তো আমরা দুজনেই দুজনের সাথে মন খুলে কথা বলতাম। বলে বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। তার নীল চোখগুলোতে প্রচুর ঘৃণা লেগে আছে এখন। জলদস্যু। তারা তো জলদস্যু ছিলো? তোমার পূর্বপুরুষেরা? দেখা যাচ্ছে, গাছ থেকে আপেল খুব বেশি দূরে পড়েনি। তুমিও তো তাইই।

আলেক্সান্দ্রার হাত থেকে বইটা ছিনিয়ে নিয়ে এভেরি বললেন, এটা আমার পরিবারের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো?

চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো নাকি উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলো? হাজার হোক, চুরির এই ধারাটা তো প্রথমে তোমার পূর্বপুরুষেরাই শুরু করেছিলো। নাকি আমিই গল্পটা বলতে ভুল করছি?

তুমি কি আসলেই কোনো কারণে এসেছো? নাকি আমাকে জ্বালাতে এসেছো শুধু?

বাহ! আমার দক্ষতা দেখি দিন দিন ভালোই উন্নতি করছে। আগে তো শুধু বিরক্ত করতাম। বলে গ্লাসটা টেবিলে রেখে দিলো আলেক্সান্দ্রা। তারপর কাউচ থেকে পার্সটা তুলে নিয়ে বলল, আমি শুধু আমার অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া টাকাগুলোর কথা ভাবছি। ওগুলো কখন পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে, এটাই মূল চিন্তা এখন। আমারো খরচপাতি আছে। আর এটার জন্য কাউকে কোর্ট পর্যন্তও টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছি না।

আচ্ছা, আচ্ছা। সকালের মধ্যেই ওটা জায়গামতো পৌঁছে যাবে।

সেটাই ভালো। বলে দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখলো আলেক্সান্দ্রা। মনে হচ্ছে তোমার ক্লায়েন্ট চলে গেছে। ঢোকার সময় কিছু কথা বলেছিলাম মানুষটাকে। আশা করছি সে হয়তো আমার কথায় রাগ করে চলে যায়নি।

কোনো রকমে রাগ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন এভেরি। ইচ্ছা করছে স্কচ ভর্তি গ্লাসটা আলেক্সান্দ্রার দিকে ছুঁড়ে মারতে। আলেক্সান্দ্রাও এটাই চাচ্ছিলো, গ্লাসটা ছুঁড়ে মারলেই খুশি হতো ও। তবে তাকে খুশি হওয়ার সুযোগ দেওয়ারও কোনো ইচ্ছা নেই এভেরির।

আলেক্সান্দ্রার এখন যা আছে, এর সবই হয়েছে এভেরির কল্যাণে। এক সময় মানুষটাকে ভালোবাসতেন তিনি। আর এখন? এখন ঐ মহিলা তার কাছে সমাজের অভিজাত শ্রেণিতে উঠতে চাওয়া একজন মহিলা ছাড়া আর কিছুই নয়। আলেক্সান্দ্রা সবই করছে লোক দেখানোর জন্য। নিজের নাম বাড়ানোর জন্য। এমনকি, লোক দেখানোর জন্য ইদানিং দাঁতব্য কাজও করা। শুরু করেছে।

একদম ঐ ফার্গো মহিলাটার মতোই, মনে মনে বললেন। রেমি ফার্গোর সাথে দেখা না হওয়ায় খুব একটা আফসোস নেই তার। তিনি জানেন ঐ মহিলাও তার স্ত্রীর মতোই।

ফার্গোদের কথা মনে পড়তেই আবারো রাগ চড়ে গেছে এভেরি। যতো যাই ঘটুক না কেন, তাকে এটাই দেখাতে হবে যে গুপ্তধনটা তিনিই খুঁজে বের করেছেন। ঐ সম্পদগুলো তার নিজের। তাঁর স্ত্রীর বা অন্য কারোর না। শুধুই তার নিজের।

আর এটার জন্য কাউকে খুন করতেও কোনো দ্বিধা নেই তার।

.

২০.

ভালোটা দিয়েই শুরু করো, রেমির পাশে বসতে বসতে লাযলোকে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

আপনাদের পানির নিচে তোলা ছবিগুলো খুবই উন্নতমানের, লাল বলছে। আমরা ওগুলো ভালোভাবে জুম করে দেখতে পেরেছি-অবশ্য এটার জন্য পিট ও ওয়েন্ডিকেই কৃতিত্ব দিতে হবে, সে আসলে সেলমা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পিট জেফকোট এবং ওয়েন্ডি করডেনের কথা বলছে। ফটোশপ বা কিছু দিয়ে কাজ করেছে বোধহয়। যাই হোক, আপনাদের তুলে আনা ছবিগুলো দিয়ে ওগুলোর নির্মাণকারী দেশগুলোর নাম বের করতে পেরেছি।

এটা তো চমৎকার সংবাদ।

হ্যাঁ। তবে আমি কিন্তু দেশগুলো বলেছি। বহুবচনে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। সবসময়ই কাজগুলো এমন কঠিন হয়ে যায়। কী আর করা!

হ্যাঁ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন হয়, লাযলো বলল। তবে এটার কিন্তু একটা উপকারী দিকও আছে। ঐ সীসার সিলটা এক ইংরেজ টেক্সটাইল কোম্পানির। ১৬৯১ থেকে ১৬৯৬ পর্যন্ত ব্যবসায় টিকে ছিলো ওরা। আর ধ্বংসস্তূপে খুঁজে পাওয়া ঐ হলুদ পাথরগুলো ডাচদের।

আর খারাপ সংবাদটা কী তাহলে? রেমি জানতে চাইলো।

এটাই যে তথ্যগুলো কোথা থেকে ফাস হচ্ছে সেটা বের করার মতো কোনো ভালো প্ল্যান তৈরি করতে পারিনি আমরা।

আসলে, স্যাম বলে উঠলো, আমার মনে হয় আমি একটা আইডিয়া পেয়েছি। কাজে লাগতে পারে এটা। আমরা এমন ভান ধরবো যে আমরা আগে ভুল শিপরেকে খুঁজতে গিয়েছিলাম, তবে এখন সঠিকটা জায়গাটা খুঁজে পেয়েছি। আর এরপর অপেক্ষা করবো ফলাফলের। এরপর পুরো প্ল্যানটাই সবাইকে ভেঙ্গে বলল স্যাম।

লাযলো বলল, এটায় কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে আপনার?

যদি তথ্যগুলো ব্রির থেকে ফাঁস হয়ে থাকে, তাহলে এটা কাজে না লাগার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না। যে লোক গলফিনহো ছিনতাই করেছিলো সে সাইফার হুইলটাই চায়। জাহাজের পরিচয় দিতে পারবে এমন কোনো বস্তুতে তার কোনো আগ্রহ থাকার কথা না। আমরা বলবো আমরা সাইফার হুইলের আসল জায়গাটা খুঁজে পেয়েছি, অথবা সাইফার হুইলটা তুলে আনতে যাচ্ছি। তাদেরকে লোভ দেখানোর জন্য তো নিশ্চয় এর থেকে ভালো কোনো টোপ ফেলা সম্ভব না। যদি এতে কারো আপত্তি থেকে না থাকে, তাহলে আমার মনে হয় আমাদের এখন রুবেন হেওয়ার্ডের সাথে যোগাযোগ করা উচিৎ।

ভালো বলেছেন, লাযলো বলল। কাজে নেমে পড়ছি আমরা।

কল কেটে দিয়ে রেমির দিকে তাকালো স্যাম। বলল, তোমার মত আছে এই প্ল্যানের সাথে?

তার মত থাকবে না কেন? এই লোকগুলো ঠাণ্ডামাথার খুনি, এদেরকে অবশ্যই থামাতে হবে। আর তাছাড়া হেওয়ার্ডের নামটা শুনেও এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে রেমি। স্যামের সাথেই কোর্ট অপারেশনের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলো হেওয়ার্ড। স্যাম ডারপায় চলে গেলেও, হেওয়ার্ড এখন কাজ করছে সিআইএর ডিরেক্টোরেট অফ অপারেশন্স কেস অফিসার হিসেবে। সেই প্রশিক্ষণের দিনগুলো থেকেই স্যামের খুব ভালো বন্ধু হেওয়ার্ড। আর হেওয়ার্ড কখনোই সে নিজে যেটায় জড়াতে পারবে না সেখানে স্যামকেও জড়াতে মানা করবে। যদি খুব প্রয়োজনীয় কিছু হয়, তাহলে এরজন্য বাইরের সাহায্য নিতেও কোনো দ্বিধা নেই তার।

সব ভেবে মাথা ঝাঁকালো রেমি। এটাই তো একমাত্র উপায়।

হ্যাঁ। তাহলে এখন আমাদেরকে শুধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

অবশ্য খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা লাগলো না ওদের। পরদিন সকালেই সেলমা ফোন করে জানালো, আমরা ব্রিকে ভুল শিপরেকের ব্যাপারে জানিয়েছি। সাথে এটাও বলেছি যে, আমরা আসল শিপরেকটাও খুঁজে পেয়েছি এবং খুব শীঘ্রই ওখানে খুঁজতে যাবেন আপনারা। এভেরির লোকদের তৈরি হওয়ার জন্যও সময় দিতে হবে। ধরেই নিচ্ছি যে লোকটা ওখানে বা ঘাটে আপনাদের ওপর হামলা করতে পারে। তথ্যগুলো যেন ফাঁস হয়, সেজন্য এবার তারা ব্রিকেও মিশনের পরিকল্পনার দলে টেনে নিয়েছে। তারা কোন বোট ভাড়া করছে, কখন ওখানে যাবে, এমনকি ডাইভিংর জায়গাটাও বলে দিয়েছে ব্রিকে। জায়গাটা স্নেক আইল্যান্ডেই, তবে আসল শিপরেকের অবস্থান থেকে কিছুটা উত্তরে। আর নিরাপত্তার জন্য মি. হেওয়ার্ড আর্চার ওয়ার্ল্ডওয়াইড সিকিউরিটির নামের এক ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছেন। বলেছেন, আপনি নাকি লোকটাকে চিনবেন এবং আপনাকে কল করতে পারে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

হ্যাঁ, চিনি ওকে। নিকোলাস আর্চার। আমাদের সাথেই ডারপায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলো, স্যাম জানালো সেলমাকে।

তাহলে তো দেখছি সব ঠিকঠাকই আছে। শুভকামনা রইলো আপনাদের জন্য।

তোমার জন্যও, স্যাম বলল। আর ব্রির থেকে কিছু জানতে পারলে সাথে সাথেই আমাদেরকে জানাবে তা।

বলে কল কেটে দিলো স্যাম। সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক এগুচ্ছে। রেমি ভাবলো এখন হয়তো সে একটু আরাম করতে পারবে। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গিয়ে আরামের ছিটেফোঁটাও অনুভব করতে পারলো না। সারারাতই বিছানায় ছটফট করেছে শুধু। বারবারই শুধু বন্ধুর কথা ভেবেছে। ব্রির সম্পর্কে সে খুব ভালোভাবেই জানে বলে ধারণা ওর। তার আচরণের এরকম বিশ্বাসঘাতকতাটা মিলছে না। এটা ভাবতে গিয়েই মাথায় এলো, কেউ কি ব্রির কাছ থেকে জোর করে তথ্যগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কিনা। হয়তো ব্রিকে ভয় দেখিয়ে ওর থেকে সব তথ্য জানছে কেউ।

কিছুক্ষণ ভাবার পর সিদ্ধান্ত নিলো এমনটার সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে। এটা মাথায় আসার পরই অবশেষে কিছুটা স্বস্তি পেলো রেমি। ঘুমাতেও পারলো অবশেষে।

****

পরদিন সকালে ড্রাইভারের সাথে করে গাড়িতে যাত্রা করলো ওরা। যদিও ড্রাইভার আসলে কোনো ড্রাইভার না। আর্চার সিকিউরিটির একজন ড্রাইভারের ছদ্মবেশে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে।

নিকোলাস আর্চারের সাথে রেমির আগেও দেখা হয়েছে। যদিও সে তাদের ডারপার প্রশিক্ষণের কথাটা জানে, তারপরও তারা ওখানে কী কাজ করতো এই ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। এই ব্যাপারটা নিয়ে স্যামও কখনো খোলাসাভাবে কিছু বলেনি। রেমি ধারণা করে নিয়েছে স্যাম হয়তো সরকারের জন্য কিছু একটা তৈরি করেছিলো। ওটার জন্য সম্ভবত বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করা লাগতো, এর জন্যেই অস্ত্র ও আত্মরক্ষায় তাদেরকে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিলো তাকে। অবশ্যই, এই প্রশিক্ষণটা তাদেরকে এখনো উপকৃত করে যাচ্ছে। গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই বড়ো বড়ো বিপদে পড়তে হয় ওদের। বিপদ থেকে মুক্তির জন্য প্রতিবারই স্যামের প্রশিক্ষণ বা ডারপায় কাজ করার অভিজ্ঞতাটা কাজে দেয় তাদের।

তবে স্যাম ডারপা ছেড়ে ব্যক্তিগত ব্যবসায় নেমে পড়লেও আর্চার আরো অনেকগুলো বছর সরকারের সাথেই রয়ে গিয়েছিলো। ডারপা থেকে এফবিআইএ গেছে, তারপর অবশেষে সব ছেড়ে তৈরি করেছে নিজের ব্যক্তিগত এক আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি ফার্ম।

ব্যক্তিগত কাজে নেমে পড়লেও সাবেক সরকারী ও আইনপ্রণয়ণকারী দপ্তরগুলোর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করেনি আর্চার। এই কারণেই রুব হেওয়ার্ডের মতো সেও প্রয়োজনের সময় যে কোনো মূল্যবান তথ্যই বের করে ফেলতে পারে। বলা যায় তথ্য জানার ক্ষেত্রে প্রায় সবদিকেই এক্সেস রয়েছে তার। আর তাছাড়া, লোকটা এক মুহূর্তের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মিশনের জন্যও দল তৈরি করে ফেলতে পারে। এবং তার দলের প্রতিটি সদস্যই থাকে উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং অতিমাত্রায় বিশ্বস্ত। স্যামের ভাষ্যমতে, আর্চারের টিমগুলোর সাথে তুলনা করলে নাকি তাদের গড়া টিমগুলোকে হাই-স্কুলের জুনিয়র টিম বলে মনে হবে।

যদিও রেমি এই কথাটা এখনো বিশ্বাস করতে পারেনি, তারপরও তারা ভালো নিরাপত্তার মধ্যে আছে ভেবে বেশ স্বস্তি পাচ্ছে ও। প্রত্যাশামতোই, এই অপারেশনের প্রতিটি অংশই বেশ ভালোভাবে সাজিয়ে নিয়েছে ওরা। এমনকি লা জোলাতের তাদের বাসার সামনেও আর্চারের একটা দল পাহারায় থাকবে। ব্রির তথ্য ফাঁস করার ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেলেই, আটক করে শিকের আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওকে।

তাহলে কেন স্নেক আইল্যান্ডের দিকে স্যাম ও আর্চারকে বোট ঘুরাতে দেখে তার আত্মা এতো ধুকপুক করছে?

ঐ মুহূর্তেই স্যাম তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি ঠিক আছো?

রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি আমার।

দেখেছি। সারারাত শুধু ছটফট করেছে।

আমরা কি কোনো বড় ভুল করছি?

না, আমরা করছি না, বলল স্যাম, ঠিক তখনই আর্চারও এসে যুক্ত হলো তাদের সাথে। আমরা এখানে আছি এটা জানার আসলে একটা উপায়ই আছে। আশা করছি টোপটা গিলবে ও, এবং এভেরির লোকেরাও হামলা করবে আমাদের ওপর।

স্যামের কথা শান্ত হয়ে বোটটার দিকে তাকালো রেমি। ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা ইয়টকে সাজিয়ে এই রিসার্চ ভেসেলে পরিণত করা হয়েছে। আর্চার ভাষ্য অনুযায়ী, এই যানের ইঞ্জিনটা বেশ শক্তিশালী এবং এর আড়ালে অনেক ক্রু লুকিয়ে আছে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে। প্রয়োজন পড়লে একটা ক্রুজ শিপকেও ডুবিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য আছে এই বোটটার। স্যামকেও একটা ফিশিং জ্যাকেট দিয়েছে আর্চার। ওটাকে বাইরে থেকে দেখে নির্দোষ মনে হলেও, ওটার ফোলা পকেটের নিচে খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই স্যাম তার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের পিস্তলটা লুকিয়ে রেখেছে।

এবার স্যাম ও রেমিকে পানিতে ডাইভও দিতে হবে না। তাদের হয়ে করবে আর্চার দলের দুই সদস্য।

সব দেখে আর্চারের দিকে তাকিয়ে হাসলো রেমি। মানতেই হচ্ছে যে আপনার কুটা আমাদের সর্বশেষ ক্রু থেকে অনেক বেশি বিশ্বস্ত।

সবাইকেই এক-এক করে বেছে নেওয়া হয়েছে, মিসেস ফার্গো।

প্লিজ-রেমি ডাকুন শুধু, জোর করলো রেমি। যদিও আগে মাত্র কয়েকবারই আর্চারের সাথে দেখা হয়েছে তার, তারপরও লোকটাকে বেশ পছন্দ করে ও। দেখতে শুনতে অনেকটা স্যামের মতোই লম্বা চওড়া আর্চার, এবং স্যামের মতোই তার আচরণও কিছুটা বিভ্রান্তিকর। গায়ের রঙ কিছুটা তামাটে, থুতনীতে হালকা সোনালি দাড়ি। তাকে দেখলে সাধারণ কোনো অফিসারের বদলে উচ্চ প্রশিক্ষিত অপারেটিভ বলেই মনে হয়। আমি জানি আপনি স্যামের সাথে পুরো ব্যাপারটা নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তারপরও আমার দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। যদি কোনো কিছু ভুল হয়ে থাকে?

আমরা প্রতিটা দৃশ্যই কল্পনা করে দেখেছি। আমরা আপনাদের পুরোপুরি নিরাপদে রেখেছি, মিসে… আ- রেমি। আপনি এখানে নিরাপদেই থাকবেন। ডাইভ দেওয়া এবং নকল আর্টিফ্যাক্ট তুলে আনা থেকে শুরু করে সবকিছুই যদি পরিকল্পনামাফিক এগোয়, তাহলে আশা করছি দুষ্কৃতিকারীদের স্থানীয় আইন প্রণয়নকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে খুব একটা অসুবিধা হবে না।

আমিও তাই আশা করছি। বলে দিগন্তের দিকে তাকালো রেমি। দূরত্ব কমার সাথে সাথে স্নেক আইল্যান্ডের আকৃতিও আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছে। সবই ঠিক আছে, তবে একটা ব্যাপারে খটকা লাগলো রেমির। স্নেক আইল্যান্ডের দিকে তাদেরটা ছাড়া আর কোনো যান এগিয়ে যাচ্ছে না। ব্যাপারটা আর্চারকে জানালো ও।

আর্চার তার হাতের বাইনোকুলারটা রেমির হাতে দিয়ে বলল, খুব সম্ভবত তারা আমাদের বন্দরে ফেরার অপেক্ষা করছে এখন। আগামীকাল আমরা ফিরে যাওয়ার সাথে সাথেই হয়তো আক্রমণ করবে। তারপরও যদি আপনি কোনো নৌকা বা বোট দেখতে পান, তাহলে সাথে সাথেই জানিয়ে দিবেন আমাদের।

বাইনোকুলারটা গলায় ঝুলিয়ে নিলো রেমি। আচ্ছা, আমি নজর রাখবো পানিতে।

অপারেশনের বাকি দিকগুলো কেমন ভাবে এগুচ্ছে সেটা দেখার জন্য স্যাম ও রেমিকে ওখানে রেখেই ভিতরের দিকে চলে গেলো আর্চার। আর্চার চলে যাওয়ার পর রেমি স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, যাও তুমিও।

আমি এখানেই ঠিক আছি। তোমার সাথে দাঁড়িয়ে থাকার আনন্দই অন্যরকম।

আমি জানি তা। সাথে এটাও জানি যে তুমি ডারপা এবং আর্চারের সাথে ওখানের মিশনের দিনগুলো অনেক মিস করো।

মুচকি হাসলো স্যাম। তারা এখন কী নিয়ে পরিকল্পনা করছে সেটার আপডেট জানতে পারলে খারাপ হতো না।

রেমি বাইনোকুলারটা উঁচিয়ে ধরে বলল, আমি আছি এখানে। সন্দেহজনক কোনো কিছু চোখে পড়লে ডাকবো তোমাকে।

তোমার এই চিন্তাভাবনাগুলো খুবই ভালো লাগে আমার, রেমি। তোমাকে ভালোবাসার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটাও একটা, বলে আর্চারের পিছু পিছু কেবিনের দিকে ছুট লাগালো স্যাম।

****

রাতে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে গিয়ে স্নেক আইল্যান্ডে পৌঁছালো ওরা। সকালের দিকে স্যাম ও রেমির ছদ্মবেশ নিয়ে ডাইভ দিলো দুজন অফিসার। তবে যেরকম ভেবে রেখেছিলো সেরকম কিছুই ঘটলো না। পানিতে বেশ কয়েকটা বোট চললেও কোনোটাই তাদের ধারে-কাছে দিয়েও আসছে না। এমনকি, কোনোটাকে দেখে হুমকির মতোও মনে হচ্ছে না।

আট ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে অপারেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করলো আর্চার। জানালো যে যদি কোনো কিছু ঘটার থাকতো, তাহলে তা এতোক্ষণে ঘটে যেতো। নোঙর তুলতে যাবে, ঠিক তখনই দেখা গেলো স্নেক আইল্যান্ডের দক্ষিণ মাথা থেকে একটা ট্রলার এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।

ট্রলারটা দেখেই সবাই সতর্ক হয়ে গেছে। নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে পড়েছে আর্চারের লোকেরা। তবে আশঙ্কামূলক কিছুই ঘটলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পাশ কেটে চলে গেলো ট্রলারটা। পাশ কেটে যাওয়ার সময় ট্রলারের কেউ তাদের দিকে তাকানোর মতোও আগ্রহ দেখায়নি।

ট্রলারটাকে পশ্চিমাভিমুখে চলে যেতে দেখে রেমি টের পেলো যে ক্রুরা বেশ হতাশ হয়েছে এতে।

ঘড়ির দিকে তাকালো আর্চার। তারপর নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল, ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। সবাই চোখ খোলা রাখবে। যেহেতু পানিতে কেউ দেখা দেয়নি, তারমানে বন্দরে শত্রুদের দেখা মেলার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি।

তবে শঙ্কাটা শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবে পরিণত হয়নি। বন্দরেও শত্রুদের কেউ নেই। এমনকি পার্বত্য রাস্তা ধরে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময়ও কেউ অনুসরণ করেনি তাদের।

****

আমি বুঝলাম না কিছুই, সন্ধ্যায় তাদের প্লেনের টেবিলে বসে বলল স্যাম। এটার তো কাজে আসার কথা ছিলো।

আর্চারও তাদের সাথে আছে। ফার্গোরা যেন নিরাপদে মাটিতে ল্যান্ড করতে পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যই সাথে এসেছে ও। এটা বেশ ভালো

একটা প্ল্যান ছিলো। খুব সম্ভবত গুপ্তচরদের কেউ আমরা যতোটা ভেবেছিলাম ঠিক ততোটা কাজের না।

মাথা নাড়তে নাড়তে টেবিল থেকে উঠে বারের দিকে এগিয়ে গেলো স্যাম 1 ড্রিংক চলবে?

না, এখন না, আর্চার জানালো। ক্রুদের ব্রিফিং দিতে হবে আমার।

রেমি? গ্লেনফিডিচের একটা বোতল উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

হ্যাঁ। এখন এক গ্লাস পোর্ট দরকার আমার।

গ্লেনফিডিচের বোতলটা টেবিলে রেখে নিচের ওয়ান ক্যাবিনেট থেকে পোটের বোতল বের করে আনলো স্যাম। তো, পঞ্চান্ন বছরের পুরোনো ওয়াইনের বোতলটা বের করে গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলছে স্যাম, কী মনে হয়, ভুলটা কোথায়? এটা যে ফাঁদ তারা কি বুঝে ফেলেছিলো? এমন সম্ভাবনা আছে?

যে কোনো কিছুরই সম্ভাবনা আছে। আমি যা দেখেছি, আমাদের যাওয়ার আগে বা পরে কখনোই ডকে আর কোনো বোট ছিলো না। পুরোপুরিই একটা ব্যর্থ মিশন এটা।

গ্লাসটা রেমির হাতে দিয়ে স্যাম বলল, সেলমাকে কল করা দরকার আমাদের। হয়তো আমাদের থেকে আপডেট জানার অপেক্ষায় আছে ও।

পোর্টের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তাদের পরিকল্পনা করা মিশনটা নিয়ে। ভাবছে রেমি। এতো ভালোভাবে প্ল্যান করা একটা মিশন কিনা শেষমেশ ব্যর্থ হলো! ব্রি কি কোনোভাবে ফাঁদের ব্যাপারে জেনে এভেরি বা তার লোকদের জানিয়ে দিয়েছিলো? কল দাও।

পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে বাসায় ফোন দিলো স্যাম। স্পিকার অন করে বলল, কী অবস্থা, সেলমা?

মি, ফার্গো, সেলমা বলছে, আমার ধারণা অপারেশনটা হয়তো ব্যর্থ হয়েছে।

এটা কোনো প্রশ্ন না, বরং সেলমা নিজে থেকেই বলছে। কথাটা শুনেই একে-অপরের দিকে তাকালো তারা তিনজন। তারপর স্যাম জিজ্ঞেস করলো, এমনটা কেন বলছো তুমি?

কারণ-একটা বাজে সংবাদ আছে আমার কাছে।

২১. স্কাইপেতে কল করলো সেলমা

২১.

স্যামের অনুরোধে স্কাইপেতে কল করলো সেলমা। স্যাম চাচ্ছিলো তার চেহারা দেখে খারাপ সংবাদের মাত্রাটা নির্ণয় করতে। আর্চারেরও আইডিয়াটা ভালো লেগেছে। তবে সে উঠে দাঁড়িয়ে একটু পাশে সরে গেলো যাতে পর্দার ওপাশে থাকা কেউ তাকে দেখতে না পায়। কিছুক্ষণ পরই বেজে উঠলো রেমির ট্যাবলেটটা। তবে কলটা ধরতেই সেলমার বদলে ব্রিকে দেখতে পেলো ওরা। স্যাম ও রেমিকে দেখেই স্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো যেন তার চেহারায়। তাদেরকে দেখেই পর্দার দিকে উবু হয়ে বলল, থ্যাংকস গড, আমি খুবই দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম।

দুঃশ্চিন্তা? স্যাম বলল, তার কণ্ঠে সতর্কতা মিশে আছে। অবশ্য সেলমার থেকে মিশন ব্যর্থ হওয়ার কথাটা শোনার পর সতর্ক না হয়েই বা উপায় কী? ব্রির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেলমা ও লায়লোর দিকে তাকালো স্যাম। তাদের দুজনের মুখভঙ্গী দেখে আসলেই কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। তাই আবারো ব্রির দিকে চোখে নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিলে?

আপনাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে ভেবে।

ব্রি, রেমি বলছে, তোমার কেন মনে হলো যে আমাদের কোনো ক্ষতি হতে পারে?

আগেরবার আপনাদের ডাইভিংর সময় ঘটা ঘটনাটার কারণে। আমরা ধারণা ওটা আমার জন্যই ঘটেছে।

স্যাম এমন কিছু আশা করেনি। অস্বীকার করলে, হ্যাঁ, তা স্বাভাবিকভাবে নেওয়া যায়। কিন্তু এটা? প্লিজ, খুলে বলো সব।

আ-আমার মনে হয় আমি আমার কাজিনকে আপনাদের অনেক তথ্য জানিয়ে দিয়েছি।

ল্যারেইন? রেমি বলে উঠলো।

হ্যাঁ। আমি প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। তারা আমাদের দুজনকেই হুমকি দিয়েছিলো, দুজনকেই বেঁধে রেখেছিলো। আমার মতোই সেও একজন ভিক্টিম। অন্ততপক্ষে আমি এটাই ভেবেছিলাম। তাই যখন সে আপনাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলো, তখন এটা ভাবিনি যে তাকে কিছু বলে আপনাদেরকে বিপদে ফেলে দিচ্ছি আমি। আ- বলতে বলতে তার গাল বেয়ে অশ্রু পড়তে শুরু করেছে। কোনো রকমে নিজেকে শান্ত করে বলল, আমি খুবই দুঃখিত, মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো। আমি জানলে কখনোই তাকে কিছু বলতাম না।

ব্রির চেহারাটা পরীক্ষা করে দেখছে স্যাম। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে মিথ্যা অভিনয় করছে। তারপরও নিজের সতর্কতা ফেলে দিয়ে এখনই তাকে মাফ করে দেওয়ারও কোনো ইচ্ছা নেই। তোমার কেন মনে হলো যে আড়ালে কিছু একটা ঘটছে? জিজ্ঞেস করলো শুধু।

আপনাদের প্রথম ডাইভে ঘটা ঘটনার পর এটা মাথায় এসেছে আমার। আর ল্যারেইনও বারবার জিজ্ঞেস করছিলো আপনাদের সাথে আমার আর কথা হয়েছে কিনা। এ-এতে… বলতে বলতে পর্দার বাইরের দিকে ঝুঁকে গেলো ব্রি। একটা টিস্যু নিয়ে আবারো পর্দায় উদয় হয়ে বলল, এতে করে সন্দেহ বেড়ে যায় আমার। তাই সেলমা ও লাযলো যখন আমাকে বলল আপনারা সাইফার হুইলটা খোঁজার আরেকটা চেষ্টা করবেন, তখন ল্যারেইনকে মিথ্যা বলি আমি। তাকে বলেছি যে আপনারা কোথায় আছেন বা কী করছেন সেই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। এজন্যই দুঃশ্চিন্তা বাড়ছিলো আমার। বলতে দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করলো। আপনাদের যদি কিছু হয়ে যেতো…

আর বলতে পারলো না কিছুই। কান্নায় ভেঙে পড়েছে ব্রি। ট্যাবলেটটা ব্রির সামনে থেকে তুলে নিয়ে রুমের অন্য পাশে সরে এলো সেলমা। পিছনে দেখা যাচ্ছে লাযলো ব্রিকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

নিজেই তো শুনলেন সংবাদটা, সেলমা বলল।

স্যাম রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, কোনো মন্তব্য?

আমি বিশ্বাস করি তাকে, বলল রেমি।

সেলমা? স্যাম জিজ্ঞেস করলো।

হয়তো সে বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী হলেও হতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে আমিও মিসেস ফার্গোর সাথে একমত। ওকে বিশ্বাস করছি আমি। তার কথায় যুক্তি আছে। আর সে যখন আমাদের কাছে ছুটে আসলো, তখন কিন্তু আপনারা কেউ ছিলেন না। তাকে শান্তও করা যাচ্ছিলো না তখন। অনেকক্ষণ লেগেছে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করার জন্য।

চমৎকার, স্যাম বলল। এই একটাবারই আমরা চাচ্ছিলাম যেন সে তথ্যটা পাচার করে, এইবারই সে হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে গেলো-

অথবা, কঠিন দৃষ্টিতে স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল রেমি, ব্রি যেমনটা বলল, সে আমাদেরকে কোনো বিপদে ফেলতে চায়নি।

যাই হোক, অন্তত পক্ষে তথ্য ফাসের উৎসটা তো জানা গেলো এবার।

দুর্ভাগ্যবশত, সেলমা বলছে, এতে করে চার্লস এভেরি বা তার লোকদের কাউকেই ধরা যাচ্ছে না।

সঠিক সময়ে সবই হবে।

সেলমা তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল, ধরে নিচ্ছি ব্রি সত্য বলছে, তার মানে এখন আমাদেরকে এটাও ধরে নিতে হবে যে চার্লস এভেরির লোকেরাও জাহাজের পরিচিতিটা আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। এখন যেহেতু তারা আরো আমাদের থেকে দুদিন সময় বেশি পেয়েছে।

তাহলে আমরা কোন অবস্থানে আছি এখন?

তথ্যাদি ঘাটাঘাটি করা অবস্থায়।

তাহলে এখন তুমি কাজে লেগে গেলেই ভালো হবে, স্যাম বলল। ম্যাপটা কিসের দিক নির্দেশ করছে জানতে পারলে ভালোই হতো। আশা করছি, খুব সম্ভবত গুপ্তধনই হবে। | গুপ্তধন, নাকি সমাধিকে জানে? যেটাই হোক না কেন, কেউ একজন এটাকে লুকানোর জন্য বেশ ভালোই পরিশ্রম করেছে। বলে থেমে পিছনে থাকা লাযলো ও ব্রিকে একবার দেখে নিলো সেলমা। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে নিচুস্বরে বলল, আশা করছি এখন আর ওরা কিছু শুনতে পাবে না। যাই হোক, আমি আপনাদের জন্য সাউথ বিচ একটা রুম বুক করে রেখেছি। আপনাদের ভ্যাকেশনের স্টার্ট হিসেবে ধরে নিতে পারেন এটাকে। এতে করে আমরাও রিসার্চের কিছু সময় পাবো আর মিসেস ফার্গোও গত কয়েকদিনের অবসাদটা দূর করতে পারবেন।

ঠিক কাজই করেছে, সেলমা। আমাদেরকে খবর জানিয়ো তাহলে।

বলে কল কেটে দিয়ে ট্যাবলেটের কাভারটা বন্ধ করে দিলো স্যাম। এমন কিছু শোনার আশা করিনি আমি।

এখন বুঝা গেলো যে কেন আমাদের ভালো একটা টোপে কেউ ধরা পড়েনি, বলে রেমির দিকে তাকালো আর্চার। মনে হয় নিয়োগের আগে মেয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড অতোটা ভালো করে খতিয়ে দেখেননি?

সাধারণ যা যা দেখার সেসব দেখেছি, রেমি বলল। সে তো শুধু ফান্ড রেইজিংর কাজই করে।

এই মুহূর্তে কী করা উচিৎ বলে মনে হয় তোমার? স্যাম জিজ্ঞেস করলো আর্চারকে।

পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড জানা লাগবে। শুধু ব্রি মার্শালেরই না। তার কাজিন ল্যারেইনেরটাও। দেখি ঘেটে কী পাওয়া যায়। যদি কিছু নাও পাওয়া যায়, তাহলেও হয়তো মিস মার্শালের গল্পের সত্যতাটা পাওয়া যেতে পেরে। এতে করে তোমরা একটু স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারবে আর কী!

রেমি? স্যাম জানতে চাইলো।

আমি ব্রিকে সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে মুছে ফেলতে চাই। তো, হ্যাঁ, অবশ্যই খতিয়ে দেখার পক্ষে সায় আছে আমার।

মাথা ঝাঁকালো আর্চার। আমি গিয়ে কাজ শুরু করে দেই তাহলে। বলে রেমির সাথে হাত মিলিয়ে বলল, আপনার সাথে আরেকবার দেখা হয়ে বেশ ভালো লাগলো। তবে অপারেশনটা ব্যর্থ হওয়ায় দুঃখিত আমি।

আরে, আপনার দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই।

স্যামও উঠে দাঁড়ালো সাথে সাথে। বলল, চলো, এগিয়ে দিয়ে আসি তোমাকে।

আর্চারকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে স্যাম বলল, মেয়েটাকে রেমি খুবই বিশ্বাস করে।

বুঝেছি ওটা। দুই মহিলার ব্যাপারেই ঘেটে দেখবো আমি। চিন্তা করো না তুমি।

****

পরদিন সাউথ বিচ হোটেলের পুলের পাশে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো স্যাম। ঠিক তখনই আর্চার তাকে ফোন করলো প্রাথমিক রিপোর্ট জানানোর জন্য।

রেমি এখনো পুলে সাঁতার কাটছে। তার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই স্যাম আর্চারকে ফোনে বলল, আমাদের দুঃশ্চিন্তা করার মতো কোনো কিছু পেয়েছো?

রেমির ধারণা সঠিক ছিলো বলেই মনে হচ্ছে। ব্রি মার্শালকে সন্দেহ করার মতো কিছু পাইনি। তার কাজের ইতিহাসও একদম নিখুঁত। বলার মতো যেটা পেয়েছি, সেটা হলো মেয়েটা তার চাচার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলো।

এই শেষ বাক্যটা কিভাবে বের করলে?

স্যান ফ্রান্সিসকো অফিস থেকে দুজনকে ঐ বইয়ের দোকানের দিকে পাঠিয়েছিলাম আমি। মি. পিকারিংর মৃত্যুর পর তার বিড়ালের ভার নেওয়া লোকটা বলল, ব্রি নাকি প্রায়ই দেখতে যেতো লোকটা। তবে, তাঁর নিজের মেয়ে ল্যারেইন নাকি অতোটা যেতো না।

খুব সম্ভবত ইস্ট কোস্টে থাকতো বলে অতোটা যেতে পারতো না।

সম্ভবত। তবে আমার এজেন্টরা জানতে পেরেছে যে লোকটা তার ভাতিজির সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলো।

এতে করে কিন্তু তার মেয়েকে দোষী ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।

না। তবে তার আর্থিক অবস্থা অবশ্য বলছে চাইলে কিছু সুযোগ নিতেও পারে। তার স্বামী তাকে অনেক ঋণের ভিতরে রেখে গেছে। তার ফার্মের মর্টগেজও পরিশোধ করা না।

ক্রিমিনাল রেকর্ড? জিজ্ঞেস করলো স্যাম। ওদিকে পুলের অপর প্রান্তে থাকা রেমিও স্যামকে ফোনে কথা বলতে দেখে তার দিকে সরে আসতে শুরু করেছে।

কোনো কিছুই নেই।

এখন কী করলে ভালো হবে বলে মনে হয় তোমার?

এটা নির্ভর করছে তুমি কতোটা গভীরে জড়াতে চাও এবং কতটা খরচ করতে চাও তার ওপর।

খরচ নিয়ে ভেবো না একটুও, বলে সামনে তাকিয়ে দেখলো রেমি পুল থেকে উঠে এসেছে। মুক্তোর দানার মতো পানি ঝড়ে পড়ছে তার শরীর থেকে। লালচে বাদামি কেশের আফ্রোদিতি যেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনে আর্চারকে স্যাম বলল, যা যা দরকার লাগে করতে থাকো তুমি।

আচ্ছে, ঠিক আছে। তাহলে ল্যারেইনের বাড়িতে দুইজন এজেন্ট পাঠিয়ে দিচ্ছি। বর্তমানে সে কী করছে সেটার ওপর নজর রাখবো আমরা। দেখি খুঁজতে গিয়ে অন্য কাউকেও পাওয়া যায় কিনা। যাই হোক, তোমাদেরকে এখন স্বাভাবিক আচরণই করতে হবে। বিশেষ করে ব্রি ও তার কাজিনের ব্যাপারে আলোচনাগুলোর সময়। আমরা তথ্য ফাঁস হওয়ার ব্যাপারটা জেনে গেছি, এটা কাউকে বুঝতে দিতে চাচ্ছি না। এতে করে কেউ বুঝতে পারবে না যে আমরা এভেরির লোকদের অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি।

আমরা ওটা দেখবো। আর কিছু?

স্যান ফ্রান্সিসকো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে রিপোর্টের কপি নিয়ে নিয়েছি আমি। তোমাদের হোটেল রুমে হানা দেওয়া নকল পুলিশদের কোনো আঙুলের ছাপের সাথে কারো মিল পাইনি। তবে বইয়ের দোকানের ডাকাতের সাথে একজনের ছাপের মিল পেয়েছি। জ্যাকব জ্যাক স্তানিস্লাভ নামের কেউ।

তার মানে লোকটার অপরাধ তালিকা বেশ লম্বা?

হ্যাঁ, আসলেই লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এক ক্রিমিনাল পরিবারের সদস্য। অনেকগুলো নিখোঁজ ব্যক্তির কেসের সাথে নাম জড়িয়ে আছে ওর। ঐসব নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি এখনো।

আচ্ছা।

যদি আমি কিছু জানতে পারি, তাহলে জানাবো তোমাকে।

ধন্যবাদ, বলে ফোন কেটে দিলো স্যাম।

রেমি তোয়ালে দিয়ে শরীর পেঁচিয়ে তার পাশে এসে লাউঞ্জে বসে বলল, কার সাথে কথা বলছিলে?

আর্চার। ব্রির ব্যাপারে খতিয়ে দেখেছে। তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি ওর বিরুদ্ধে।

হুমম, বলল রেমি। তার কণ্ঠস্বরে আত্মগৌরবের ছাপ মিশে আছে।

ল্যারেইনের ব্যাপারে আরো ঘাটাঘাটি করছে এখন। জানা গেছে আর্থিকভাবে বেশ সমস্যার মধ্যে আছে ল্যারেইন। ফার্মটাও হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে।

এর জন্য নিজের বাবার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে?

মানুষ আরো ছোটো কারণে আরো খারাপ কিছু করে। তবে ভালো খবর এটা যে, আর্চারের তদন্ত এবং সেলমার গবেষণা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কোনো কাজ নেই। এর মানে তোমাকে বলা ছুটির সূচনাটা কিন্তু এখন করা যায়।

ভালো বলেছো, ফার্গো, কিন্তু তোমার মাকে তো কথা দিয়েছিলাম আমরা যে বিকালে তাকে দেখতে যাবো।

স্যামের মা ইউনিস। সত্তর বছর বয়সেও মহিলা বেশ শক্ত-সামর্থ্য আছে। থাকে কী-ওয়েস্টে। মা বুঝবে ব্যাপারটা।

শুনে তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো রেমি। না যাওয়ার কারণ হিসেবে তাহলে কী বলবে তাঁকে?।

স্যাম যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নিয়ে ভাবতে যাবে, ঠিক তখনই দিনে দ্বিতীয়বারের মতো বেজে উঠলো ফোনটা। সেলমা কল করেছে। স্যাম স্পিকার অন করে রিসিভ করলো ফোনটা। আপনাদের ছুটিতে ব্যাঘাত ঘটানোয় দুঃখিত, মি, ফার্গো। তবে লাযলো ভাবছে সে নাকি সাইফার হুইলটা খুঁজে বের করার উপায় পেয়ে গেছে।

.

২২.

বলো কী জানতে পেরেছো তোমরা? বলল স্যাম।

সেলমা স্নেক আইল্যান্ডের কাছে ডুবে যাওয়া জাহাজটার ইতিহাস বিকৃত করছে ওদের কাছে। জামাইকা থেকে যাত্রা করা কয়েকটা জাহাজের একটা ছিলো এটা। ইন্টারনেটে অন্য জাহাজগুলোর ব্যাপারেও বেশ কিছু তথ্য জানতে পেরেছি আমরা, তবে উপকারী কিছু পাইনি। আমাদের ধারণা আপনারা যেটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেটা হয়তো জামাইকাতে খুঁজে পাবেন।

জামাইকা? রেমি বলল। বছরের এই সময়ের জামাইকাকে বেশ ভালো লাগে আমার।

দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে, সেলমা বলছে, আপনাদের যেতে হবে কিংস্টনে, সৈকতে না। নিশ্চিতভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো কয়েকটা অঞ্চলের একটা ওটা।

কিংস্টনেই যাওয়া হচ্ছে তাহলে, স্যাম বলল। তো, ওখানে আমরা আসলে কী খুঁজতে যাবো, সেলমা?

জাহাজের মালিকানার ব্যাপারে থাকা রেকর্ডগুলো। কোথা থেকে এসে জামাইকাতে থেমেছিলো সেটা। এতে করে সেকেন্ড হুইলের জন্য কোথায় খোঁজা লাগবে সেটার ব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তবে সাবধানে থাকবেন। যেহেতু আমরা খুব সহজেই তথ্যগুলো পেয়ে গেছি, তারমানে এভেরির লোকদেরও এই তথ্যগুলো বের করতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। তারাও হয়তো একই পথে এগুচ্ছে এখন।

****

নরম্যান ম্যানলি ইন্টারন্যাশনালে ল্যান্ড করার আগেই তাদের জন্য দরকারি সবকিছুর ব্যবস্থা করে রেখেছে সেলমা। কাস্টম থেকে ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার পর বেরুতেই এক রেন্টাল কার কোম্পানির কর্মী প্রশস্ত হাসি হেসে স্বাগত জানালো ওদেরকে। জামাইকায় স্বাগতম, মি, অ্যান্ড মিসেস ফার্গো। কিছুটা ছান্দসিক টান মিশে আছে তার সুরের সাথে। স্বাগত জানিয়ে গাড়ি ভাড়ার কাগজপত্র, গাড়ির চাবি এবং একটা ম্যাপ বাড়িয়ে দিলো লোকটা।

স্যাম ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়িতে জিপিএস আছে?

অবশ্যই। নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, খুবই কার্যকরী একটা জিপিএস আছে। তারপরও একটা ম্যাপ দিয়ে দিলাম নিরাপত্তার জন্য। তাছাড়া অতিরিক্ত গরমের সময় ম্যাপটাকে হাতপাখা হিসেবেও কাজে লাগাতে পারবেন।

ধন্যবাদ, বলে কাগজগুলো স্বাক্ষর করে দিলো স্যাম।

সব কাজ সম্পন্ন করার পর লোকটা তাদেরকে গাড়ির কাছে নিয়ে গেলো। একটা নীল বিএমডব্লিউ ৫২৮আই সেডান দাঁড়িয়ে আছে এয়ারপোর্টের বাইরে। ফার্গোরা গাড়িটা ভালোভাবে চেক করে দেখার পর লোকটা বলল, এই চমৎকার বিকালে কি আপনাদের আরো কোনো সাহায্য করতে পারি আমি? আর কিছু লাগবে আপনাদের?

হ্যাঁ, একটা ভালো রেস্টুরেন্টের খোঁজ দিলে ভালো হতো, স্যাম জানালো। কিংস্টনের দিকে যাচ্ছি আমরা।

মূল্যের দিক দিয়ে ভালো নাকি মানের দিক দিয়ে?

মানের দিক দিয়ে ভালোটা।

অবশ্যই, এমন একটা জায়গা চিনি আমি। বলে কলম বের করে একটা কাগজে রেস্টুরেন্টের নাম এবং ঠিকানা লিখে দিলোলোকটা। কিংস্টনে অনেক ভয়ঙ্কর কিছু এলাকা আছে। এসব জায়গায় আমি সাধারণত পর্যটকদের পাঠাই না। তবে এই জায়গাটা এতোটা বিপজ্জনক না। এখানের মানুষেরা বেশ ভালো। আপনি ওখানে গিয়ে মেলিয়া নামের একজনের খোঁজ করবেন। তাকে গিয়ে বলবেন আপনাদেরকে কেমার পাঠিয়েছে। জামাইকার সবচেয়ে সেরা খাবারটাই পাবেন ওখানে। শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি।

ধন্যবাদ, বলে ঠিকানা লেখা কাগজটা পকেটে পুরে নিলো স্যাম।

ওহ, জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। আপনাদের কি এখানে কোনো বন্ধুর সাথে দেখা করার কথা?

না, স্যাম বলল। প্রশ্নটা বেশ অদ্ভুত লাগলো তার কাছে। কেন?

আপনারা আপনাদের গাড়ি রিসিভ করেছেন কিনা সেটার ব্যাপার দুইজন লোক খোঁজ নিতে এসেছিলো।

আর আপনি কী বলেছেন তাদেরকে? স্যাম জানতে চাইলো।

অন্যান্য কাস্টোমারদের যা বলি সেটাই বলেছি। আমরা আমাদের কাস্টোমারদের তথ্য অপরিচিতদের সাথে শেয়ার করি না।

তারা কী গাড়ি ড্রাইভ করছিলো সেটা বলতে পারবেন?

দুঃখিত! ওটা খেয়াল করিনি। তারা সরাসরিই ভিতরে চলে এসেছিলো, আর আমিও তখন অন্য একজনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।

ধন্যবাদ, বলে লোকটার হাতে মোটা অঙ্কের বখশিস ধরিয়ে দিলো স্যাম। তারপর রেমিকে নিয়ে গিয়ে চড়ে বসলো গাড়িতে।

চমৎকার, সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বলছে রেমি। আমরা এসে নেমেছি মাত্র, আর এখনই পিছে চর লেগে গেলো?

লাগুক, এবার তাদেরকে উষ্ণভাবেই স্বাগত জানাবো, বলে ফিশিং ভেস্টের গোপন পকেটে রাখা স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসন পিস্তলটার ওপর হাত বুলাযলো স্যাম। তবে এতে বুঝা যাচ্ছে যে আমরা ঠিক পথেই এগুচ্ছি।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তারাও কিন্তু সঠিক পথেই রয়েছে।

অন্তত পক্ষে এবার আমাদেরকে আগে থেকেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, বলল স্যাম।

ব্রিটিশ রীতি মেনে চলার কারণে এখানের গাড়িগুলোর ড্রাইভিং সিট গাড়ির ডানপাশে। গাড়ি চালাতে হচ্ছে তার রীতি অনুযায়ী রাস্তার বেঠিক পাশ দিয়ে। এভাবে প্রথম কয়েকটা মোড় ঘুরাতে বেশ সমস্যা হলেও ধীরে ধীরে স্বচ্ছন্দ হয়ে গেছে। এয়ারপোর্ট ছেড়ে আসার পর থেকেই রিয়ারভিউ মিররে চোখ রাখছে স্যাম। কয়েক মাইল এগুনোর পর একটা সাদা এসইউভি চোখে পড়লো তার। যেহেতু এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনোর রাস্তা একটাই, তাই গাড়িগুলো বেশ কিছুক্ষণ নজরে থাকাই স্বাভাবিক। এসইউভিটা অবশ্য এখন গতি বাড়িয়ে অন্য গাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। তবে কিছুক্ষণ পরই গাড়িটাকে আবার গতি থামিয়ে পিছনে চলে যেতে দেখলো। স্যাম সামনে তাকিয়ে দেখলো যে রাস্তার বিপরীত লেনটা প্রায় খালিই বলা যায়। চাইলে খুব সহজেই অন্য গাড়িগুলোকে ওভারটেক করে দ্রুতগতিতে চলে যেতে পারতো এসইউভিটা।

স্যামের ধারণা-হয় গাড়িতে থাকা পর্যটকেরা লেন বদল করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না, নয়তো গাড়িতে আসলেই সে এবং রেমি আছে কিনা এটা নিশ্চিত হতে চাচ্ছে এভেরির লোকেরা। আর এসইউভিটাও এতো দূরে রয়েছে যে স্যামও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না ঐ গাড়িতে আসলে কারা আছে। শুধু রেমিকে বলল, আমাদের পিছে হয়তো ফেউ লেগেছে।

এখনই? গাড়ির সাইড মিরর দিয়ে পিছনের দিকে তাকালো রেমি। কোন গাড়িটা?

সাদা এসইউভি। পিছনের গাড়িগুলো পাশ কাটিয়ে আসছিলো, তবে পরে আবার মতলব পালটে পিছনে চলে গেছে।

আমরা গাড়িতে আছি কিনা নিশ্চিত হতে চাচ্ছে?

সম্ভবত।

এখন কী করব তাহলে?

রেস্টুরেন্টের পথ ধরে এগিয়ে যাব। দেখি তারা আমাদের অনুসরণ করে কিনা।

শহরে পৌঁছেই বামে মোড় নিলো স্যাম। তবে এসইউভিটা চলে গেছে সোজা পথে। দৃশ্যটা দেখে হালকা স্বস্তি পেলো স্যাম। গাড়িটা কে চালাচ্ছিলো দেখেছো? রেমিকে জিজ্ঞেস করলো।

না। টিন্টেড গ্লাস।

আরো একবার বামে বাঁক নিয়ে একটা বড়ো ট্রাকের সামনে গিয়ে গাড়ি থামালো স্যাম। আশা করছে ট্রাকের কারণে তাদেরকে দেখতে পারবে না কেউ। কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সাইড মিরর দিয়ে রাস্তার মোড়টার দিকে তাকালো। সাদা এসইউভিটাকে আর দেখা যাচ্ছে না এখন। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার আবারো গাড়ির ইঞ্জিন চালু করলো স্যাম। রাস্তার পাশ ঘেষে রেস্টুরেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবার। কেমার যেমনটা বলেছিলো, শহরের এই অংশে পর্যটকদের কোনো ভিড় নেই। ছোটোখাটো খুপড়ি এবং টিনের ঘরের পাশ দিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। পর্যটকের সংখ্যা কম থাকলেও পথচারীর সংখ্যার কমতি নেই। খোলা রাস্তার ওপর দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে তারা। এমনকি গাড়ি আসলেও সরে যাওয়ার তেমন কোনো লক্ষণ নেই তাদের মধ্যে। তাদের ধারণা গাড়িচালকই একসময় গাড়ির গতি কমিয়ে দিবে বা থামিয়ে দিবে। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর একটা সময় রাস্তার পাশের ছোটোখাটো খুপড়িগুলো হারিয়ে গেলো। ওগুলোর বদলে এখন রাস্তার পাশে বড়ো বড়ো দালান দেখতে পাচ্ছে ওরা। সঠিক ঠিকানায় চলে আসার পর রেস্টুরেন্টের দিকে ছুটলো স্যাম। উজ্জ্বল বেগুনি রঙ করা একটা দালানেই রয়েছে রেস্টুরেন্টটা। এর আশেপাশে আরো অনেকগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সবগুলো দালানই রংধনুর ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে রঙ করা। জামাইকার আসল প্রতিচ্ছবিই যেন ফুটে উঠেছে।

পিছনের লোকগুলোকে খসাতে পেরেছো? রেমি জানতে চাইলো।

দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। তবে তারপরও রেস্টুরেন্ট থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি পার্ক করবো আমরা। এখানে পার্ক করে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার কোনো মানেই হয় না।

বলে গাড়িটা নিয়ে কোনার দিকে সরে গেলো স্যাম। এই এলাকাটায় প্রায় ডজন খানেকের মতো রেস্টুরেন্ট আছে। কেউ যদি প্রতিটাতেই গিয়ে গিয়ে তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে যায়, তাহলেও যথেষ্ট পরিমাণ সময় ব্যয় হবে। এতে করে আর কিছু না হলেও অন্ততপক্ষে শান্তিতে খাবার খাওয়ার মতো সময় পাবে ওরা।

.

হেঁটে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় তিন মিনিটের মতো লাগলো ওদের। ভাড়া করা গাড়ি থেকে বেরুতেই মনে হচ্ছে যেন জ্বলন্ত কড়াইয়ে এসে নেমেছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতাটা সহ্য করতে পারছে না।

একটু পরপরই কপালের ওপর জমা ঘাম মুছছে রেমি। চুলে আঙুল ঢুকিয়ে চুলগুলোকেও পনিটেইল করে নিয়েছে। রেস্টুরেন্টে এয়ার-কন্ডিশনার থাকার সম্ভাবনা আছে?

শহরের এই অংশে এয়ার-কন্ডিশন খুঁজছো? ভালো একটা সিলিং ফ্যান থাকলেই সন্তুষ্ট আমি। তবে উজ্জ্বল বেগুনি রঙের দালানটায় ঢুকে হতাশই হতে হলো তাদের। একটা সিলিং ফ্যানই রয়েছে পুরো রেস্টুরেন্টে, তবে ওটা থেকে খুব একটা বাতাস আসছে না।

হোটেলে ঢুকতেই একজন মহিলা স্বাগত জানালো ওদের। মহিলা দেখতে বেশ লম্বা, চুলগুলো কোঁকড়া, ছোটো ছোটো করে ছাঁটা, প্রায় মাথার খুলির সাথে লেগে রয়েছে যেন। তাদেরকে দেখে সাথে করে কাউন্টার থেকে দুটো মেন্যু কার্ডও তুলে নিয়ে এসেছে মহিলা।

কেমারের কথামতোই মেলিয়ার খোঁজ করলো স্যাম।

আমিই মেলিয়া, জবাবে জানালো মহিলা।

এরপর স্যাম কেমারের কথা জানাতেই প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠলো মহিলার মুখে।

কেমার? কেমারের মতোই মহিলার কণ্ঠস্বরেও ছান্দসিক টান মিশে আছে। খুবই ভালো একজন মানুষ এখানে পাঠিয়ে আপনাদের। প্লিজ, এইদিকে আসুন। আপনারা আমাদের বিশেষ অতিথি। আর আমাদের বিশেষ অতিথিরা বাইরের প্রাঙ্গণে বসে। ওখানকার জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা। সমুদ্র অভিমুখী হওয়ায় বাতাসের প্রবাহও পাওয়া যায়।

বলে ডাইনিং রুমের ভিতর দিয়ে তাদেরকে একটা দরজার দিকে নিয়ে গেলো মেলিয়া। তারপর দরজা খুলে ক্যাচক্যাচ করতে থাকা এক সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ছাদের ওপরে থাকা বহিঃপ্রাঙ্গণে। ছাদটা থেকে নিচের রাস্তাও দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে মেলিয়ার কথামতোই বাতাসের ঝাঁপটাও ভেসে আসছে দক্ষিণ দিক থেকে।

মেন্যু দুটো টেবিলে রেখে তাদেরকে বসতে বলল মেলিয়া। তাদের টেবিলটা পাশের দালানের ছাদের দিকে মুখ করে স্থাপন করা হয়েছে। ওপরে রয়েছে একটা বড়ো ছাতা। ছাতার নিচে ঠাণ্ডাটা একটু বেশি থাকে।

চমৎকার, বলে চেয়ার টেনে টেবিলে বসলো রেমি।

বসার আগে ছাদের ধারে গিয়ে নিচের দৃশ্যটা একবার দেখে নিলো স্যাম। দোতলা-দালানের ছাদ থেকে তাদের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছে। তবে সাদা এসইউভি বা কোনো সন্দেহজনক পথচারী চোখে না পড়ায় বেশ সন্তুষ্টই হলো ও। এরমানে তাদেরকে কেউ অনুসরণ করেনি। সন্তুষ্ট হয়ে টেবিলে ফিরে এলো আবার। টেবিলের অবস্থানটা ছাদের একেবারে মাঝের দিকে খুশিই হলো স্যাম। এতে করে নিচ থেকে কেউ তাদেরকে দেখতে পারবে না।

অবশ্য তারপরও এভেরির লোকেরা থেমে থাকবে না। নিচে রাখা ভাড়া করা গাড়িটা তাদের চোখে পড়লেই এলাকার প্রতিটা রেস্টুরেন্টেই খুঁজে দেখবে ওরা। এটা ভেবেই পকেট থেকে একশো ডলারের একটা নোট বের করে মেলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, মেলিয়া, কেউ এখানে এসে আমাদের খোঁজ করলে কি আপনি আমাদেরকে এসে একটু সতর্ক করে দিতে পারবেন?

ঝট করে হাত পিছিয়ে নিলো মেলিয়া। এই ছোটো কাজের জন্য এই টাকাটা অনেক বেশি হয়ে যায়। টাকা রেখে দিন, কেউ এসে খোঁজ করলে আমি এমনিতেই এসে জানিয়ে যাব আপনাদের। এখন বলুন, কী খেতে চান আপনারা?

স্যাম মেনুটা হাতে তুলে নিয়ে বলল, আপনিই রিকমেন্ড করুন।

মেলিয়া মুচকি হেসে বলল, মেনু থেকে বলবো নাকি মেনুর বাইরের কিছু? আপনারাই বলুন কী খেতে চান, যেটা বলবেন সেটারই ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে।

সত্যি বলতে তারা এই ধরনের রেস্টুরেন্টই বেশি পছন্দ করে। সংক্ষেপে বললে, স্কচ বনেট পেপার মেরিয়ান্ডে সস দিয়ে ঝলসানো মুরগি অর্ডার করলো ওরা।

তাদের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই আবার ফিরে এলো মেলিয়া। তার কালো মুখটায় কিছুটা দুঃশ্চিন্তার ছাপ মিশে রয়েছে এখন। কেউ এসে আপনাদের খোঁজ করলে আপনাদেরকে সতর্ক করে দেওয়ার কথাই তো বলেছিলেন আমাকে?

হ্যাঁ, বলে দরজার মুখের দিকে তাকালো স্যাম। কী হয়েছে?

আপনি যেটা বলেছিলেন সেটাই। একজন শ্বেতাঙ্গ এসে জিজ্ঞেস করলো আমরা কি একজন পুরুষের সাথে লালচুলো এক সুন্দরী মহিলাকে কোথাও দেখেছি কিনা। বলে রেমির দিকে তাকিয়ে ক্ষমাসুলভভাবে হাসলো মেলিয়া। আমরা তাদেরকে মানা করে দিয়েছি। লোকটাকে দেখতে চাইলে দেখতে পারেন। বলে স্যামকে ছাদের ধারের দিকে যাওয়ার নির্দেশ করলো মেলিয়া। ধারের কাছে যেতেই বলল, ঐ যে, কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐ লোকটাই এসেছিলো।

সামনের দিকে তাকাতেই ছোটোখাটো দৈর্ঘ্য ও গাট্টাগোট্টা শরীরের একটা লোককে দেখতে পেলো স্যাম। তাদের দিকে থেকে উলটো দিকে ঘুরে ফোনে কথা বলছে লোকটার চেহারটা দেখতে পাচ্ছে না যদিও। এলাকার অন্যরা যেখানে খাকি বা শর্ট প্যান্ট এবং হাফ-হাতা শার্ট পরে রেখেছে, সেখানে এই লোকটা কালো লেদার কোট এবং গাঢ় রঙের স্ন্যাকস পরে আছে। চেহারা না দেখলেও লোকটাকে চিনতে কোনো ভুল হলো না স্যামের। এটা জ্যাক পিকারিংর দোকানে ডাকাতির সময়ও এই পোশাকেই ছিলো লোকটা। ঠিক তখনই রাস্তার অন্যপাশের একটা রেস্টুরেন্ট বেরিয়ে এলো দ্বিতীয় আরেকজন। বেরিয়ে রাস্তার এপাশ-ওপাশে একবার দেখে তাকালো জ্যাকের দিকে।

তাড়াতাড়ি করে ছাদের ধার থেকে সরে এলো স্যাম। বিপদটা বুঝতে একটুও কষ্ট হচ্ছে না তার। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কি অন্য কোনো রাস্তা আছে?

হ্যাঁ, ফায়ার এস্কেপ আছে, বলে ছাদের অন্যপ্রান্তের দিকে নির্দেশ করলো মেলিয়া। ওটা থেকে একটা মই নেমে গেছে সরু গলিতে।

এতেই কাজ হয়ে যাবে আমার, স্যাম বলল। রেমি?

হ্যাঁ। আমারও।

রেমির মত পেয়েই স্যাম তার পকেট থেকে বেশ কয়েকটা একশো ডলারের নোট বের করে রাখলো টেবিলের ওপর। মেলিয়া আপত্তি করতে শুরু করেছিলো, তবে স্যাম তাকে থামিয়ে বলল, বেশি দিচ্ছি না, ঠিকই দিচ্ছি। রাখুন।

বলে মইয়ের দিকে পা বাড়ালো স্যাম। রেমি তার ঠিক পিছে পিছেই আসছে। ওপর থেকে গলিটাকে খালি বলেই মনে হচ্ছে তার কাছে। মইয়ের দুই পাশে দুইটা বড়ো বড়ো ময়লার ঝুড়িও আছে। এতে বেশ ভালোই হয়েছে, প্রয়োজনে ওগুলোকে কাজে লাগানো যাবে।

মইয়ের ধাপে পা দিয়ে রেমির জন্য অপেক্ষা করছে ও। রেমিও মইয়ের ধাপে চড়ে বসতেই নামতে শুরু করলো স্যাম। লাঞ্চের জন্য দুঃখিত, নিচে নামতে নামতে বলল স্যাম।

তুমি কি জানো যে ঐ মুরগীটাকে আমাদের জন্যই মারা হয়েছিলো?

মেরে খুব একটা লাভ হয়নি।

আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে ওখানে।

আগে পিছন থেকে ঝামেলা খসাই, তারপর নাহয় প্ল্যান সাজাব।

মাটি থেকে চার ফুট উঁচুতেই শেষ হয়ে গেছে মইটা। এইটুক দূরত্ব লাফিয়ে নামা স্যামের জন্য তেমন কোনো বিষয় না। নিচে নেমে রেমির জন্য অপেক্ষা করছে এখন। রেমিকে মই বেয়ে নামতে দেখার দৃশ্যটা উপভোগ করছে।

রেমি দৃশ্যটা দেখে বলল, আমরা দৌড়াচ্ছি আমাদের জীবন নিয়ে, আর তুমি তাকিয়ে আছে আমার দিকে?

মৃদু হেসে রেমির কোমড় ধরে তাকে মই থেকে নামিয়ে স্যাম বলল, অন্ততপক্ষে এতে তো আমি শান্তি নিয়েই মরতে পারবো।

ময়লার ঝুড়ির আড়াল থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো ওরা। রেমি গলির এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছে এভেরির লোকেরা আছে কিনা। কোন দিকে যাবো এখন?

ভালো প্রশ্ন। যদি এভেরির লোকেরা তাদের পার্ক করা গাড়িটা থেকে খোঁজ শুরু করে, তাহলে তারা এখন তাদের বাম দিকে আছে। তাই স্যাম বলল, ডানে যাও।

গলির শেষ প্রান্তে পৌঁছে উঁকি দিয়ে রাস্তাটা একবার দেখে আবার মাথা ফিরিয়ে আনলো স্যাম। ঠিক ঐ মুহূর্তেই সাদা গাড়িটা এসে উপস্থিত হলো রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধরে পড়ে যাবে ওরা। তাই গলির অন্য প্রান্তের দিকে তাকালো স্যাম। বেশ কয়েকটা দরজা রয়েছে ঐদিকে। এগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় দরজাটা আবার জালিকাময়। নিশ্চিতভাবেই দোকানে বাতাস চলাচলের জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এইদিকে আসো, রেমিকে বলেই গলি ধরে দরজাটার দিকে দৌড় লাগালো স্যাম। সাথে আশা করছে জালিকা লাগানো কপাটটা যেন তালা দেওয়া না থাকে।

.

২৩.

স্যামের পিছু পিছু বিল্ডিংটায় ঢুকলো রেমি। তারা ঢুকতেই আবার খুট করে লেগে গেলো দরজাটা। দালানের অনুজ্জ্বল আলোটা চোখে সইতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগছে। দালানের ছোটো হলওয়ে ধরে দৌড়ে যাচ্ছে তারা। ময়লাটে সাদা দেয়ালগুলোতে অনেক ধরনের গ্রাফিতি এবং পূর্বে ঘুরতে আসা অনেক পর্যটক ও শহরের নাম লেখা রয়েছে। দৌড়ে বাররুমে গিয়ে ঢুকলো ওরা। জোরালো রেগা মিউজিক চলছে রুমটাতে। রুমের রুক্ষ জনমন্ডলি দেখে রেমি ধারণা করলো এটা হয়তো বাইকার বারের জামাইকান সংস্করণ। সাধারণত তারা এরকম কোনো জায়গায় যায় না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা ঢোকার পর থেকেই রুমের আট-দশজন মানুষ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই। মানুষগুলোর বেশির ভাগই হাফ-হাতা টি শার্টের ওপর চামড়ার ভেস্ট পরে রেখেছে। বেশির ভাগের হাতেই ট্যাটু এঁকে রাখা। যদিও তাদের কালো চামড়ার কারণে ট্যাটুগুলো ঠিকমতো নজরে পড়ছে না। এটাকে সমস্যা বলেই মনে হচ্ছে রেমির কাছে। এই ধরনের মানুষের ভিতর থাকলে তাদেরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে কোনো কষ্টই করতে হবে না।

স্যাম তার পকেট থেকে কিছু নোট বের করে বারের ওপর রেখে বলল, আমার তরফ থেকে সবার জন্যই ড্রিংকস, মি. …? বলে প্রশ্ন তাকালো বারটেন্ডারের দিকে।

বন্ধুদের কাছে জে-জে নামে পরিচিত আমি, ছান্দসিক সুরে বলল লোকটা। বন্ধু, আপনি যে পরিমাণ টাকা দিলেন, তাতে আপনাদেরকে নিজেদের লোক করে নিতেও কোনো সমস্যা নেই আমার।

এরপর স্যাম তার পরিচয় দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো লোকটার দিকে। জে জের সাথে হাত মিলিয়ে বলল, আমার ওয়াইফ নিরাপদে থাকবে এখানে? আমার ফিরতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

একদম নিরাপদে থাকবে। কথা দিলাম আমি।

সন্তুষ্ট হয়ে স্যাম রেমির দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, আমি গিয়ে দেখি আমাদের গাড়িটা আনতে পারি কিনা। একমুহূর্তের মধ্যেই ফিরে আসব। বলে সামনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলো স্যাম। দরজার ফাঁক দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে তারপর বেরিয়ে গেলো বাইরের রাস্তায়

স্যাম বেরিয়ে যেতেই বারটেন্ডারের দিকে তাকালো রেমি। তারপর তাকালো আশেপাশের মানুষগুলোর দিকে। অবশ্য মানুষগুলোর কেউই তাকে উত্যক্ত করছে না। বরং ড্রিংকস খেতে খেতে উলটো আরো কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। স্যামের মানুষ যাচাই করায় ভুল হয় না কখনো। জায়গাটাকে নিরাপদ না ভাবলে সে কখনোই রেমিকে এখানে একা রেখে যেতো না।

তারপরও রেমির কাছে এখানে বসে অপেক্ষা করাটাকে বেশ কঠিনই লাগছে।

জে-জে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো একবার। তারপর বলল, কার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সুন্দরী রমনী?

টুলটা ঘুরিয়ে বারটেন্ডারের দিকে তাকালো রেমি। হার্লে-ডেভিডসনের লোগোওয়ালা একটা কালো টিশার্ট পরে রেখেছে লোকটা। জটলা চুলগুলো পনিটেইল করে বাধা, তবে তার গাঢ় চোখগুলোয় কোনো আক্রোশ বা অনিষ্টকারী কোনো ছাপ নেই। খুব সম্ভবত স্যাম এই কারণেই লোকটাকে বিশ্বাস করেছে। কয়েকজন ডাকাত। তারা আমাদেরকে মেরে ফেলার পণ করে পিছু লেগেছে।

নিশ্চয়ই ঐ সাদা চামড়ার মানুষগুলো? কিছুক্ষণ আগে দুই লোক এসেছিলো এক লাল-চুলো মহিলা ও এক আমেরিকানের খোঁজ করতে।

কথাটা শুনেই নিজের দুর্বলতাটা বুঝতে পারলো রেমি। চুলে স্কার্ফ পরার ফ্যাশনটা এখন নেই বলে আক্ষেপ হচ্ছে তার। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তারা এখানে এসেছিলো?

হ্যাঁ। মিনিট বিশেক আগে এসেছিলো। তবে আপনি কোনো দুঃশ্চিন্তা করবেন না। আপনি এখানে নিরাপদই থাকবেন। ড্রিংকসের জন্য কিছু দিবো আপনাকে?

শুধু পানি দিন, প্লিজ, বলল রেমি। এখনই কড়া অ্যালকোহল খাওয়ার সময় হয়নি।

এরপর আর কিছু না বলে গ্লাসে পানি ঢেলে রেমির দিকে বাড়িয়ে দিলো জে-জে। তারপর নিজের কাজ করতে শুরু করলো। একটা ছোটো কাপড় নিয়ে বারের টেবিলটা মুছছে এখন।

পানিতে চুমুক দিলো রেমি। চুমুক দিতে দিতে বারবারই ফিরে তাকাচ্ছে দরজার দিকে। বেশ কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেছে, তবু স্যাম এখনো ফিরে আসেনি। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দরজার দিকেই এগিয়ে গেলো ও। দরজা দিয়ে মাথা বের করতেই বাইরে পার্ক করে রাখা অনেকগুলো মোটরসাইকেল দেখতে পেলেও স্যামের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জে-জেও যুক্ত হলো তার সাথে। আপনার বদলে আমি উঁকি দিয়ে দেখলেই ভালো হবে। আমাকে এখানে কেউ আলাদাভাবে খেয়াল করতে আসবে না। কিন্তু আপনার ব্যাপার আলাদা। বলে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো জে-জে। ভাবটা এমন যেন কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ব্রেক নিতে বেরিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এলো। এসে রেমিকে তার আসনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল, আপনার স্বামী ফিরে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। লোকটা লুকানোয় দক্ষ, তবে আমি আবার খুঁজে বের করায় দক্ষ।

সত্যিই মিনিট খানেকের ভিতরেই ফিরে এলো স্যাম। প্রায় দৌড়ে এসেছে বলা যায়। রেমির কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, বড়ো সমস্যায় পড়ে গেছি।

জে-জে স্যামের দিকে এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কী সমস্যা, বন্ধু?

স্যাম এক ঢোকে পানি গিলে দরজার দিকে ইশারা করে বলল, এভেরির লোকেরা… রাস্তার মধ্যেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম… তাদের একজন অন্য প্রান্তের রেস্টুরেন্টগুলোতে আমাদের খোঁজ করছে।

স্যামের কথা শুনে পাশের টেবিলেই থাকা বাইকারদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো জে-জে। ইশারা পেয়েই উঠে দাঁড়ালো তারা। দুইজন এগিয়ে গেলো সামনের দরজার দিকে, আর দুইজন গেলো পিছনের হলওয়ের দিকে। দ্বিতীয়বারের মতো এই রাস্তায় দেখা দিয়েছে ওরা, জে-জে বলল। এটা এখন আমারও মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাউন্টারের ওপর থেকে রেমি তার ব্যাগটা খাবলে নিয়ে বলল, আমরাও কি পিছনের পথটা দিয়ে বেরিয়ে যাবো?

মাথা নাড়লো স্যাম। তাদের নজরে না পড়ে গাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বলে বারে অবশিষ্ট থাকা মানুষগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো একবার। যদিও সত্যি বলতে একটা উপায় কিন্তু এখনো আছে… বলে বারটেন্ডারের দিকে ঝুঁকে উপায়টার ব্যাপারে জানালো স্যাম। এতো নিচু স্বরে বলছে যে জোরালো মিউজিকের শব্দ ছাপিয়ে স্যামের কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না রেমি।

.

২৪.

স্যামের কাছ থেকে পরিকল্পনাটা শুনে মাথা ঝাঁকালো জে-জে। সাথে সাথে কয়েকটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করলো। সবশেষে গভীর স্বরে হেসে স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, প্ল্যানটা খুবই ভালো, বন্ধু। চোখের সামনে থেকেও লুকিয়ে থাকার মতো। অবশ্য এই কাজের জন্য কিছু ভলান্টিয়ার লাগবে আমাদের। বলে তাকালো মিউজিক বক্সের পাশে বসে থাকা এক কাপলের দিকে। অ্যান্টোয়ান, তোমরা দুইজন এদিকে আসো।

দম্পতি বারের কাছে এসে পৌঁছাতেই জে-জে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কি এক সপ্তাহের জন্য ফ্রিতে ড্রিংকস করতে চাও?

কিসের বিনিময়ে? অ্যান্টোয়ান জানতে চাইলো।

স্যাম বলল, বিনিময়ে শুধু কয়েক মিনিটের জন্য আপনাদের বাইকিং গিয়ারগুলো ধার দিতে আমাদেরকে।

দ্রুতই তাদের সাথে চুক্তি করে নিয়ে তাদের থেকে চামড়ার ভেস্ট এবং হেলমেটগুলো নিয়ে নিলো ওরা। সাথে সাথে জে-জেও তার বাইকের চাবিটা বাড়িয়ে দিয়েছে স্যামের দিকে। আশা করছি, বাইকটার প্রতি যত্ন রাখবেন আপনি।

ওটাকে একদম নিজেরটার মতো করেই ভাববো।

বাইক চালানোর ব্যাপারে নিশ্চিত তো আপনি?

স্যাম চাবিটা হাতে নিতে নিতে বলল, ওটার যদি কিছু হয়, তাহলে দিন গড়ানোর আগেই নতুন একটা বাইক পেয়ে যাবেন আপনি।

পুরোনোটাই ভালো চলছে। নতুন লাগবে না। এটা কালো হার্লে বাইক। লাইসেন্স প্লেটে আমার বারের অ্যাডভার্টাইজিং ফ্রেমও লাগানো আছে।

জে-জের থেকে সব বুঝে নিয়ে রেমির অতি-উচ্চমূল্যের পার্সটার দিকে তাকালো স্যাম। তাদের উপস্থিতি ফাঁস করে দেওয়ার জন্য ঐ একটা জিনিসই যথেষ্ট। অবশ্য সমস্যাটা দূর করতে বেশি সময় লাগলো না জে-জের। একটা ব্যাক-প্যাক দিয়ে দিয়েছে যাতে ওটাতে পার্সটা লুকিয়ে রাখতে পারে রেমি। ঠিক তখনই সামনের দরজায় দাঁড়ানো বাইকার দুজন জানালো যে এভেরির লোকেরা অন্য দোকানগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছে, এবং এখন এই বারের দিকেই তাকিয়ে আছে।

শুনে মাথা ঝাঁকালো জে-জে। তারপর জোরালো কণ্ঠে বলল, কে কে বাইক রাইডে যেতে চাও?

তার কথাটা শুনে উঠে দাঁড়ালো বারের সবাই। হই-হুল্লোড়ের রব উঠে গেছে যেন ভিতরে।

দেখেছেন? জে-জে বলল স্যামকে। কোনো সমস্যা হবে না। আমার বন্ধুরাই এখন আপনাদেরও বন্ধু।

একটা সমস্যা আছে তবুও, স্যাম বলে উঠলো। ঐ লোকগুলোর সাথে অস্ত্র আছে।

তাতে দুঃশ্চিন্তা করবেন না, জে-জে জানালো। আপনাদের নিরাপত্তার ভার বিলির ওপরে। ও ই নিরাপদে পৌঁছে দিবে আপনাদেরকে।

সাথে সাথেই সুউচ্চ লম্বা একজন বাইকার এসে যুক্ত হলো তাদের সাথে। এসে ভেস্টের দুই পাশ প্রসারিত করে দেখালো স্যামকে। স্যাম দেখতে পেলো, ভেস্টের বামপাশের শোল্ডার হোলস্টারে একটা হ্যান্ডগান রয়েছে এবং ডানপাশে রয়েছে হাতলওয়ালা একটা ট্রেঞ্চ নাইফ, যেটাকে টেনে বড়ো করে ধাতব নাকলস হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। ধারণা করলো রুমে বিলিই হয়তো একমাত্র অস্ত্রধারী না, অন্যদের কাছেও হয়তো কিছু না কিছু আছে। রুমের প্রতিটা মানুষই তাদের পক্ষে আছে ভেবেও বেশ স্বস্তি পাচ্ছে ও।

বারটেন্ডারের দিকে ফিরে শেষবারের মতো হাত মিলিয়ে নিলো স্যাম। সবাইকেই তাদের প্রাপ্যটা দিয়ে দিবো আমরা।

খুবই প্রশংসনীয় ভাবনা। তবে এটার দরকার পড়বে না। আপনারা নিরাপদে থাকলেই চলবে।

এরপর আর কোনো কথা না বলে হেলমেটগুলো মাথায় লাগিয়ে নিলো ওরা। সাথে সাথে বাইরে বেরিয়ে থাকা চুলগুলোও হেলমেটের আড়ালে লুকিয়ে নিলো রেমি। তারপর অন্য বাইকারদের সাথে করে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। এগিয়ে গেলো তাদের মোটরসাইকেলগুলোর দিকে। জে-জের বাইকটা খুঁজে বের করে ওটাতে চড়ে বসলো স্যাম। রেমি বসেছে তার পিছনে। স্যামের কোমড়ে হাত পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে ও।

বাইকে চাবি ঘুরাতেই গর্জন করে উঠলো হার্লের ইঞ্জিনটা। বাইকটা চালু করেই রিয়ারভিউ মিরর দিয়ে পিছনের দিকে তাকালো স্যাম। এভেরির লোকেরা এখন রাস্তা ক্রস করে বারের দিকেই এগিয়ে আসছে। এদের একজন আবার তাকিয়ে আছে স্যামদের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই আবার পিছনের দিকে দৌড় লাগালো এভেরির লোকেরা।

তারা ঠিকই স্যামদেরকে চিনে ফেলেছে। ছদ্মবেশ নিয়েও ধোকা দেওয়া গেলো না। এভেরির লোকেরা গাড়িতে চড়ে বসতে পারলে সুবিধাটাও তাদেরই বেশি থাকবে। মোটর সাইকেলে করে তাদেরকে খসানোটা স্যামের পরিকল্পনারও অংশ ছিলো না।

তাই লোকগুলো পৌঁছানোর আগেই বাইক নিয়ে সাদা এসইউভিটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো স্যাম। বিলিও এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে! বিলি আসতে স্যাম তাকে বলল, আপনার ট্রেঞ্চ নাইফটা কি একটু ধার দেওয়া যাবে?

ভেস্টের আড়াল থেকে চাকুটা বের করে স্যামের দিকে বাড়িয়ে দিলো বিলি। স্যাম যেমনটা ভেবেছিলো, ঠিক তেমনই। দুই-ফলা বিশিষ্ট চাকুটা আসলেই প্রচণ্ড ধারালো।

ওদিকে রেমি উদ্বিগ্ন হয়ে স্যামের কোমড় চেপে ধরে বলল, তারা কিন্তু এদিকেই এগিয়ে আসছে। চাকুর জায়গায় পিস্তল ভালো হতো না?

ওটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করো না তুমি, বলে নিচে ঝুঁকে গাড়ির সামনের ডান চাকায় চাকুটা গেঁথে দিলো স্যাম। বের করে আরো বেশ কয়েকবার একই কাজ করলো।

হাওয়া বেরিয়ে যেতেই রাস্তার সাথে মিশে গেলো টায়ারটা।

এতে করে কিছুটা সময় পাবো আমরা, বলে চাকুটা আবার বিলির কাছে ফিরিয়ে দিলো স্যাম।

আবারো চলতে শুরু করেছে তারা।

রাস্তার কোনার দিকে গিয়েই পিছনের দিকে ফিরে তাকালো স্যাম। দেখলো যে এভেরির লোকের থমকে দাঁড়িয়ে আছে এসইউভিটার পাশে। এদের একজন আবার রাগে গজ গজ করে সমানে লাথি দিচ্ছে গাড়ির নষ্ট চাকাটায়।

দৃশ্যটা দেখে হেসে উঠলো স্যাম। অবশেষে কিছু একটা তাদের পক্ষে এসেছে। এভেরির লোকেরা পিছ থেকে খসে যাওয়ায় বেশ স্বস্তিও পাচ্ছে ও।

****

আমাদেরকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো, বাইকারদের বিদায় জানিয়ে ভাড়া করা গাড়ির সিটে বসতে বসতে বলল রেমি।

গাড়ি চালু করে রাস্তায় বেরিয়ে এলো স্যাম। ঘটনাপ্রবাহে প্রচণ্ড রেগে আছে ও। অনেক বেশি কাছে চলে এসেছিলো। জানি না কী ভেবে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম।

ফোন বের করে মাত্রই হোটেলে যাওয়ার রুটটা দেখতে শুরু করেছিলো রেমি। স্যামের কথাটা শুনে তার দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, কথাটা দিয়ে কী বুঝালে তুমি?

আমরা জানতাম যে তারা এখানে আছে। তারপরও এখানে লাঞ্চ করতে আসাটা বোকামি ছিলো।

এটার সমান দোষ কিন্তু আমারও। আমিও কিন্তু মানা করিনি।

হ্যাঁ। তবে আমার আর ভালোভাবে বুঝা উচিৎ ছিলো।

তোমার ধারণা, আমার উচিৎ ছিলো না? দীর্ঘশ্বাস ফেললো রেমি। প্রথমত, তারা যে প্রতি দরজায় দরজায় গিয়ে খুঁজবে তা ভাবার মতো কোনো কারণ ছিলো না আমাদের। গোপনে থেকে গাড়ির ওপর নজর রাখাটাই ছিলো সবচেয়ে কার্যকর ও উপযুক্ত কাজ। আমরা হলেও এটাই করতাম। আর দ্বিতীয়ত, এতে কিন্তু খুব একটা অসুবিধা হয়নি আমাদের। তো নিজের ওপর দোষারোপ করা বন্ধ করো।

দরজায় দরজায় খোঁজার ব্যাপারে রেমি ঠিকই বলেছে। এভেরির লোকগুলো আসলেই যথেষ্ট বুদ্ধিমান। এর মানে তারা যথেষ্টর থেকেও বেশি বিপজ্জনক শত্ৰু। তাই রিয়ারভিউ এবং সাইড মিররগুলোতেই চোখ লেগে রয়েছে তাদের। সাদা এসইউভি বা অন্য কোনো গাড়ি দেখা যাচ্ছে না তাদের পিছনে। তারপরও ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা নেই স্যামের। হোটেলে পৌঁছেই হোটেল থেকে চেক আউট করে নিলো। তারপর ভিন্ন নামে চেক ইন করলো অন্য একটা হোটেলে গিয়ে। রেন্টাল কার কোম্পানিতে ফোন করে গাড়িটাও বদলে দিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে স্যাম। সে চাচ্ছে, এভেরির লোকেরা যেন কোনোভাবেই তাদের অবস্থান এবং গাড়ি চিহ্নিত করতে না পারে।

****

নতুন হোটেল রুমের কাঁচের কফি টেবিলের ওপর স্পিকার অন করে ফোন রেখে আরাম করে কাউচে বসলো স্যাম।

ফোন ধরতে বেশি দেরি করলো না সেলমা। একবার রিং হওয়ার পরই সেলমার গলার স্বর শোনা গেলো স্পিকারে। আপনাদের কলের আশাই করছিলাম। আমার ধারণা আপনারা হয়তো ডিনার করছেন, তাই কল করে বিরক্ত করতে চাইনি।

রুম সার্ভিসকে বলে দিয়েছি, স্যাম বলল। আমরা আসলে এখন ছদ্মবেশে আছি। দুপুরে লাঞ্চের সময় আক্রমণ হয়েছিলো আমাদের ওপর।

তাই?

এভেরির লোকেরা আমাদের আগেই এখানে পৌঁছে গেছে। বিমান থেকে নামার পর থেকেই আমাদের ফলো করছিলো। আমার ধারণা, তারা এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা খুঁজে পায়নি।

আপনার কেন মনে হলো এটা? জিজ্ঞেস করলো সেলমা।

আসলে এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা। এছাড়া তো আমাদের পিছনে সময় নষ্ট করার কোনো কারণ দেখি না। তারা সারাটা দিনই আমাদের খোঁজে পুরো শহর জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারা যদি জিনিসটা পেয়ে যেতো, তাহলে অনেক আগেই চলে যেতো।

হয়তো, স্যামের পাশে বসতে বসতে বলল রেমি, এভেরির লোকেরা আমাদের ওপর ক্ষেপে আছে।

সন্দেহাতীতভাবেই ক্ষেপে আছে, বলে কাউচে গা এলিয়ে দিলো স্যাম। তারপর সেলমার কাছে জানতে চাইলো, যাই হোক, আমরা আসলে কিসের খোঁজ করছি?

জাহাজের ঘোষণাপত্র এবং কোর্টের রেকর্ডসমূহ। আমরা এখন ম্যাপের কোডের অর্থ বের করার চেষ্টা করছি। আর, পিট এবং ওয়েন্ডি স্নেক আইল্যান্ডের কাছে ডোবা ঐ জাহাজটার তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করছে। আগেও বলেছিলাম, কোডের যেটুকু অর্থ বের করা গেছে তাতে আমাদের ধারণা-জাহাজটা জামাইকা থেকে ছেড়ে আসা অনেকগুলো যানের একটা ছিলো। আরো স্পষ্ট কিছু তথ্য বের করেছি আমরা। ১৬৯৪ থেকে ১৬৯৬ এর মধ্যকার ঘোষণাপত্র ঘেটে দেখলেই চলবে আপনাদের। আমরা যদি জাহাজের মালিককে খুঁজে বের করতে পারি, তাহলে আমরা আসল সাইফার হুইলের খুঁজে বের করার খুব কাছে চলে যেতে পারবো। আর আমাদের ভাগ্য যদি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো জিনিসটা এই জামাইকাতেই আছে।

আমরা এই তথ্যগুলো আসলে পাবো কোথা থেকে? জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

কিংস্টনের জামাইকা আর্কাইভস এবং রেকর্ডস ডিপার্টমেন্টে পাবেন। আমি আপনাকে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ধন্যবাদ, সেলমা। আর বাসার সবাইকে আমাদের শুভেচ্ছা জানাবে। খুবই পরিশ্রম করছে তোমরা।

বলে ফোন কেটে দিয়ে ওয়াইনগ্লাসটা হাতে তুলে নিলো স্যাম। তাহলে সকাল থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের খোঁজাখুঁজির কাজ।

রেমি তার গ্লাস দিয়ে স্যামের গ্লাসে হালকা টোকা দিয়ে বলল, অন্ত তপক্ষে ওটা একটা সরকারি দালান। ওখানে অনেক নিরাপত্তা থাকবে বলেই আশা করছি।

ঠিক তখনই বিজলি চমকালো। ঝড় জমতে শুরু করেছে আকাশে। পুরো আকাশই চকমক করছে বিজলিতে। সাথে বিকট শব্দের বজ্রপাত তো আছেই।

এটা কি কোনো সতর্কতা নাকি অশুভ কিছুর পূর্বাভাস? আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকেই জিজ্ঞেস করলো রেমি।

.

২৫.

ব্যক্তিগত অ্যাটোনি উইন্টন পেজের দেওয়া কাগজগুলো পড়ে দেখছেন চার্লস এভেরি। যদিও অনেক রাত হয়ে গেছে, কিন্তু সারাদিন ব্যস্ত থাকায় এর আগে লোকটার সাথে বসতে পারেননি। দ্রুতই ডিভোর্সের কাজটা শেষ করে ফেলতে চাচ্ছেন। কাগজগুলো দেখার পর বললেন, তো, মূল বক্তব্য কী?

মূল বক্তব্যটা হলো, উইন্টন বলছে, আপনার স্ত্রী যা চাচ্ছে, তাঁকে সেটা দিয়ে দেওয়াই ভালো। নয়তো সারাজীবন এটা ভোগাবে আপনাকে।

আমার একটা পয়সাও আমি তাকে দিচ্ছি না। শূন্য থেকে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি আমি। আর সে সারাজীবন শুধু আমার টাকাই উড়িয়েছে।

তিনি কিন্তু আপনার দুই সন্তানের জননী।

ওরাও তার মায়ের পদাঙ্কই অনুসরণ করছে। দুটোই বখে গেছে।

এজন্যেই তো উইলগুলো তৈরি করা। তবে আপনার স্ত্রী এখন অনেক বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনার জন্য।

আসলেই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আলেক্সান্দ্রা। যদি কোনোভাবে নিজের ওপর সন্দেহ না এনে মহিলাকে সরিয়ে দেওয়ার উপায় থাকতো, তাহলে তিনি এতোক্ষণে তাই করতেন। নিশ্চিতভাবেই এই পথটা খোলা আছে তার জন্য। তবে এখন মহিলার তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নাক গলানোটা রীতিমতো হুমকির মতো হয়ে উঠেছে। তার ভাড়া করা ঐ ফরেনসিক অ্যাকাউন্টেন্টের ব্যাপারটা কী আসলে?

আসলে অনেকগুলো যদি জড়িয়ে আছে এখানে। আপনার স্ত্রী যদি কোনোভাবে আপনার রেকর্ডগুলো হাতিয়ে নিতে পারে, তাহলে উনার পক্ষে আপনার গোপন কাজগুলোর সম্পর্কে তথ্য জেনে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটা আসলে অনেকটা জুয়ার মতো।

এই জুয়া খেলতে এভেরির কোনো আপত্তি নেই। তিনি তাঁর কাজের ব্যাপারে এমনিতেই খুব সতর্ক, আর তাছাড়া তিনি জানেন যে আলেক্সান্দ্রা অনেক আগে থেকেই তার গোপন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অবগত আছে। তারপরও খুব বেশি কিছু জানে না মহিলা। এই তো, সাম্প্রতিককালের ফার্গোদের ব্যাপারেই তো কিছু জানে না। ম্যাপ খোঁজার মাঝপথেই উদয় হয়েছে এই ফার্গোদের। তাদের জন্যই তাড়াহুড়ো করে অনেক বড়ো বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যার জন্যই তাঁকে তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টেও নাক গলাতে হয়েছে।

ফার্গোদের কথা মনে পড়তেই ঘড়ির দিকে তাকালেন এভেরি। ফিস্কের এতোক্ষণে তাঁকে জামাইকায় অনুসন্ধানের ব্যাপারে রিপোর্ট করার কথা। জামাইকাতেই নাকি সাইফার হুইলের কাছে পৌঁছার মতো সূত্র আছে বলে জানিয়েছিলো ফিস্ক। এতোক্ষণে অবশ্যই ওটার ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পেয়ে যাওয়ার কথা তার। তাই সামনে বসা উইন্টন তাঁকে বৈধতা-অবৈধতার ব্যাপারে অনেক কিছু বললেও, তিনি তাকিয়ে আছেন তার ফোনটার দিকেই।

অবশেষে আলো জ্বলে উঠলো ফোনের পর্দায়। তাড়াতাড়ি করে রিসিভারটা কানে লাগাতেই সেক্রেটারির গলায় শুনতে পেলেন, আপনার স্ত্রী…

ঠিক তখনই ঝট করে অফিসের দরজা খুলে কেউ বাক্যটা শেষ করে দিয়ে বলল, … এসেছেন অফিসে। আলেক্সান্দ্রার স্বর ভেসে এলো দরজার মুখ থেকে। আমি জানিনা সে কেন তোমার কাছে ফোন করে আগাম জানাতে চায়। ভাবটা এমন যেন আমার এখানে ঢুকতে কোনো অনুমতি লাগবে। যেখানে এই দালানের অর্ধেক মালিক আমি।

অর্ধেক-মালিক…

আ-আ, সোনা। ডাক্তার তোমার ব্লাড প্রেশারের ব্যাপারে কী বলেছিলো মনে আছে? বলে পার্স থেকে একটা খাম বের করে পার্সটা কাউচে ছুঁড়ে রাখলো। উইন্টন, তোমাকে এতো পরিশ্রমের সাথে কাজ করতে দেখে খুব ভালো লাগছে আমার। অ্যাকাউন্টিং রেকর্ডের নোটিশটা পেয়েছো তো তুমি?

কিসের নোটিশ?

ওহ, খোদা। আমারই ভুল। এই যে এটা, বলে খামটা অ্যাটোনির দিকে বাড়িয়ে দিলো আলেক্সান্দ্রা। অবশ্যই, এটা নোটিশের একটা কপি মাত্র। তবে সব কাজ ঠিকমতো চললে খুব দ্রুতই অরিজিনালটা পেয়ে যাবে। আমি শুধু তোমাদেরকে আগাম জানিয়ে দিতে এসেছি।

খামটা হাতে নিয়ে কাগজটা বের করে একবার দেখলো উইন্টন, তারপর ডেস্কের ওপর দিয়ে বাড়িয়ে দিলো এভেরির দিকে। এভেরি কাগজটা ভালো করে চোখ বুলিয়েও দেখলেন না। জানেন কাগজটা দেখলেই তিনি ক্ষেপে যাবেন। আর তিনি ক্ষেপলেই তার স্ত্রী চরম শান্তি পাবেন। স্ত্রীকে চরম শান্তি উপহার দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই তার। এটা কি তোমার প্রতি রাতের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে? অফিসে এসে আমাকে খোঁচানো? নাকি ইদানিং তোমার সামাজিক কর্মকাণ্ডের শিডিউল খালি হয়ে আছে?

সত্যি বলতে, ডিভোর্সের সংবাদটা জানাজানি হওয়ার পর থেকে কাজের পরিমাণ আরো বেশি বেড়ে গেছে। বলে দুই হাত দিয়ে ডেস্কে ভর করে এভেরির দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো আলেক্সান্দ্রা। মুখে শীতল হাসি ফুটে আছে তার। আমি যদি আগে একবার জানতাম যে তুমি আমার সামাজিক কাজগুলো এতো ঘৃণা করো, তাহলে অনেক আগে থেকেই শুরু করতাম এটা।

আহারে! আগে শুরু করতে পারেনি বলে সমবেদনা জানাচ্ছি।

কিছু না বলে টেবিলে রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকালো আলেক্সান্দ্রা। এভেরি যদিও তড়িঘড়ি কাগজগুলো লুকানোর চেষ্টা করছেন, তবে আলেক্সান্দ্রার নজর আটকে আছে হলদেটে কাগজের একটা প্যাডের ওপর। এই প্যাডটাতেই সারাদিনের কাজের হিসাব, ফোন কলের রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় মানুষগুলোর নাম লিখে রাখেন এভেরি। হাত বাড়িয়ে প্যাডটা নিজের দিকে নিয়ে এলো আলেক্সান্দ্রা। ফার্গো? কাগজে লিখে রাখা নামটা দেখে বলল ও। নামটার নিচে দাগ দিয়ে রাখা আছে। নর্থ ডাকোটায় নতুন ব্যাবসা শাখা? এগুলো কি আমার উকিলকে জানানো উচিৎ?

সাথে সাথেই প্যাডটা আলেক্সান্দ্রার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে এভেরি বললেন, তুমি তোমার নোটিশ দিয়েছে। এখন যাও।

আরে, আমি ওটা দিতে আসিনি। আইন অনুযায়ী, ওটা আমার দেওয়ার কথা না। আমি শুধু তোমাকে আগে থেকে জানিয়ে দিতে এসেছিলাম যে আমার উকিল তোমার অ্যাকাউন্টগুলো আটকে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারে। হয়তো দেখবে এটিএমে তোমার কার্ডটা আর কাজ করছে না। তখন তো ক্ষেপে যাবে। বলে তিক্তভাবে হাসলো আলেক্সান্দ্রা। তারপর এভেরির হাতে ধরে রাখা প্যাডে একবার হাত বুলিয়ে এগিয়ে গেলো কাউচের দিকে। কাউচ থেকে পার্সটা তুলে নিয়ে বলল, নিজের খেয়াল রেখো, চার্লস। আর উইন্টন, তুমিও ভালো থেকো।

কোনো রকমে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দমন করার চেষ্টা করছেন এভেরি। আলেক্সান্দ্রা বেরিয়ে যেতেই বলে উঠলেন, দেখেছো? এতোগুলো বছর আমাকে কী সহ্য করে থাকতে হয়েছে তা ভেবে দেখো একবার।

তিনি আপনাকে রাগানোর চেষ্টা করছেন শুধু।

হ্যাঁ, এবং এতে সে সফলও হচ্ছে। উঠে গ্লাসে ড্রিংকস ঢেলে তাতে চুমুক দিলেন প্রথমে। তারপর আরো কয়েকটা চুমুক দিয়ে শান্ত হওয়ার পর বললেন, সে কি ওটা করতে পারবে? মানে আমার অ্যাকাউন্ট আটকে দিতে পারবে?

এটা আসলে সকালে ব্যাংক খুললেই বুঝা যাবে। তবে যদি তার অ্যাটোর্নি যুক্তি দিয়ে বিচারককে সন্তুষ্ট করতে পারে, তাহলে অবশ্যই তিনি কাজটা করতে পারবেন। আমার ধারণা, উনার ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট তাঁকে এই আইডিয়াটা দিয়েছে। আপনার ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে আপনার থেকে টাকা খরচের বিবরণ বের করতে চাচ্ছে আর কী।

গ্লাস এবং হুইস্কির বোতল নিয়ে আবারো ডেস্কে এসে বসলেন এভেরি। সে যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছে? আচ্ছা, করুক। আমিও দেখতে চাই কতোটা গভীরে এসে জড়াতে পারে ও।

অথবা, আপনি কিন্তু উনার দাবিটা মেনে নিয়ে ব্যাপারটা এখানেই শেষ করে দিতে পারেন।

না, কখনোই করবো না তা, বলে গ্লাসে চুমুক দিলেন এভেরি। তিনি এই কাজ করলে ঐদিন নরকও শীতল হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা উনার।

আরো কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠলো। ফিস্কের কল। অবশেষে।

জামাইকার ব্যাপারে সংবাদ আছে একটা, ফিস্ক বলছে। অবশ্য আপনি হয়তো এটা পছন্দ করতে পারবেন না, তবে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে এবার কাজ হবে।

রাগে হাত দিয়ে গ্লাসটা চেপে ধরলেন এভেরি। কাজ হবে? তুমি কি বলতে চাচ্ছো তুমি এখনো ঐ ডকুমেন্টগুলো যোগার করতে পারোনি?

ওটার ব্যাপারে আসলে… আসলে সত্যি বলতে, ফার্গোরা এখনো কিভাবে যেন বেঁচে আছে।

কথাটা শুনেই রাগে খেঁকিয়ে উঠলেন এভেরি। কী বললে? কিভাবে দুটো মানুষ বারবার তোমাদের হাতের তলা থেকে ছুটে যাচ্ছে?

আমি তো আগেই বলেছিলাম, বস, তারা সাধারণ কোনো দম্পতি না। স্যাম ফার্গো ডারপায় উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা ছিলো, সম্ভবত সিআইএর সাথেও জড়িত ছিলো। তার স্ত্রী বোস্টন কলেজ থেকে… ফোনে ফিস্ককে কাগজ উল্টানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছেন এভেরি, …অ্যানথ্রোপোলজি এবং প্রাচীন ব্যবসায়ীক ইতিহাসের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়া মহিলা।

এজন্যই তো গুপ্তধনের প্রতি আগ্রহ তার। তবে এতে কিন্তু মহিলা কিভাবে বেঁচে আছে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

মহিলা প্রচণ্ড বুদ্ধিমতি। এবং হাতের নিশানাও প্রচণ্ড দক্ষ।

তাতে কী? গলফিনহোর কেউ কি ঐ মহিলার হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছিলো? আমি তোমার থেকে ব্যর্থতার আর কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। নিশ্চিত ফলাফলের জন্যই টাকা দেওয়া হয় তোমাকে।

ভুল তো হয়ই, বস। তবে তাদেরকে খোঁজা হচ্ছে।

আমি তো শুনেছিলাম যে তোমার ভাড়া করাগলফিনহোর ক্রুরা খুব সহজেই সমুদ্রে ডাইভ করতে যাওয়া মানুষ দুটোকে সরিয়ে দিতে পারবে। অতিরিক্ত নাক গলানো মানুষদের সরিয়ে দেওয়ার মতো নাকি যথেষ্ট দক্ষ ওরা!

আগেও যেমনটা বলেছিলাম, বস, তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হবে। মাঝে একসময় ফার্গোদেরকে হাতের নাগালেও পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার লোকেরা তাদেরকে কার রেন্টাল কোম্পানি থেকে কিংস্টন পর্যন্ত অনুসরণ করে গিয়েছিলো। তবে, দুর্ভাগ্যবশতঃ ফার্গোরা এবারো কিভাবে যেন পালিয়ে গেছে। তবে বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে না আর।

আমি তো ভেবেছিলাম তোমার লোকেদের কাজটা করার মতো দক্ষতা আছে।

তারা অবশ্যই দক্ষ লোক, বস।

তাহলে কিভাবে বারবার দুজন সমাজকর্মী তোমাদের হাত থেকে খসে যাচ্ছে? তোমার লোকগুলোর দক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ হচ্ছে আমার।

আমি আগেই বলেছিলাম, ফার্গোদের হাত অনেক লম্বা।

কথাটা শুনেই ঝট করে গ্লাসটা টেবিলে আছড়ে রাখলেন এভেরি। তুমি বলেছিলে কাজটা তুমি সামলাতে পারবে। তোমার লোকদের এই কাজ করা দক্ষতা আছে।

হ্যাঁ, বস, তাদের দক্ষতা আছে, এবং তারা ঠিকই কাজটা করবে।

অবশ্যই করা উচিৎ তাদের। আমি ঐ ডকুমেন্ট এবং ফার্গোদের মৃত্যুর খবর শুনতে চাই। এটাই শেষ কথা আমার। তোমার লোকদের ওপর ভরসা না থাকলে, তুমি নিজেই স্বশরীরে করো। আমি ফলাফল চাই, ব্যর্থতা না।

বুঝেছি, বস। একটা পরিকল্পনা করে রেখেছি। সব কিছু ঠিকঠাক করে আপনাকে জানাবো আমি।

সাথে সাথেই কল কেটে রিসিভারটা ক্রেড়ালে আছড়ে রাখলেন এভেরি। তারপর আবার গ্লাসটা তুলে নিয়ে লম্বা চুমুক দিলেন তাতে।

ধরে নিচ্ছি, সংবাদটা নিশ্চয় ভালো ছিলো না? বলল উইন্টন।

এসব নিয়ে না ভেবে আমার স্ত্রীর ওপরে মনোযোগ দিলেই ভালো হবে তোমার জন্য। আর আমার অন্যান্য কাজ নিয়ে আমাকেই ভাবতে দাও।

আপনি নিশ্চয় এটায় অবগত আছেন যে ওগুলোর কোনোটায় টাকা খরচ করলে তা আপনার স্ত্রীর কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে?

হ্যাঁ! ঝুঁকির ব্যাপারে খুব ভালোভাবেই জানা আছে আমার।

শুনে মাথা ঝাঁকালো উইন্টন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যেহেতু আমার কাজ শেষ, তাই আজকের মতো উঠছি এখন।

উইন্টন চলে যেতেই গ্লাসে আরেকবার হুইস্কি ঢাললেন এভেরি। তার চোখ ঘুরছে হলদেটে কাগজের প্যাডটার ওপর। ফার্গোদের নামটা যেন তার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাচ্ছে। ঝট করে প্যাড থেকে কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন এভেরি। প্রচণ্ড রেগে আছেন এখন। যদিও এটা বুঝতে পারছেন না যে তিনি আসলে কোন কারণে রেগে আছেন। ফার্গোদের তার কাজে নাক গলানোর কারণে, নাকি আলেক্সান্দ্রার তার সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার কারণে?

যেটাই হোক। সবগুলো মানুষকেই তিনি মৃত লাশ হিসেবে দেখতে চান।

এটা মাথায় আসতেই তার মনে হলো, তিনি কি আসলেই আলেক্সান্দ্রাকে মারতে চান?

সত্যি বলতে, হা, তিনি তাই চান। মহিলা হয়তো তাঁর দুই সন্তানের মা, কিন্তু সন্তানদের কেউই তার মতো হয়নি। নিশ্চিতভাবেই মায়ের গোলাম হয়েছে ওরা। তিনি শুধু দক্ষভাবে আলেক্সান্দ্রাকে সরিয়ে দিতে চান, যাতে করে। তাকে কেউ সন্দেহ না করে। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, তিনি কিভাবে তা করবেন? কিভাবে খুনটাকে সাধারণ মৃত্যু হিসেবে ফুটিয়ে তুলবেন।

তবে, আগের কাজ আগে। প্রথমে ফার্গোদেরকে সরাতে হবে।

এক ঘণ্টা পর, আবারো ফিস্ক ফোন করলো তাকে। বলল, ভালো সংবাদ আছে আমার কাছে…

২৬. আর্কাইভস ডিপার্টমেন্টের দিকে

২৬.

পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আর্কাইভস ডিপার্টমেন্টের দিকে যাত্রা করলো স্যাম ও রেমি। ডিপার্টমেন্টে পৌঁছে রেমি ভিতরে ঢুকলেও স্যাম রয়ে গেলো বাইরেই। ভিতরে ঢোকার আগে চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিতে চাচ্ছে।

বিল্ডিংর ভিতরে ঢুকে ডিরেক্টরি থেকে রেকর্ড ডিপার্টমেন্টটা বের করে নিলো রেমি। হলওয়েতে অনেক কর্মচারীর আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। অবশ্য কর্মচারীদের সবাই কাজে এতোই ব্যস্ত যে কেউই তার দিকে তাকাঁচ্ছে না। হলুদ জামা ও ফিরোজা রঙের স্কার্ফ পরা এক মহিলাকে কাউন্টারে ম্যানিলা কাগজের স্তূপ রাখতে দেখে এগিয়ে গেলো তার দিকে। গিয়ে বলল, এক্সকিউজ মি, আপনি রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন?

ডাক শুনে তার দিকে ফিরে তাকালো মহিলা। হ্যাঁ। আপনাকে কি এখনো সাহায্য করা হয়নি?

রেমি মুচকি হেসে বলল, এখনো না।

ক্ষমা করবেন। গত রাতের অপ্রত্যাশিত ঝড়ে একটু এলোমেলো হয়ে গেছে সব। রাতে অ্যালার্মও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। দালানের ভিতরেও পানি ঢুকে গেছে। এজন্যই আসলে ব্যস্ত হয়ে আছে সবাই। তবে, যাই হোক, কিভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে?

আমরা আসলে কিছু পুরোনো জাহাজের ঘোষণাপত্র দেখতে এসেছিলাম।

আমরা?

আমার হাজব্যান্ডও আছে সাথে। একটু বাইরে আছে ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবে।

মহিলা কাউন্টার থেকে একটা ফর্ম বের করে রেমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আপনারা গবেষক?

আচ্ছা, তাহলে এই ফর্মটা পূরণ করে দিন। আমি ফিরে আসছি এখনই।

ধন্যবাদ।

ফর্ম পূরণ করতে করতে স্যামও এসে গেছে ভিতরে।

এসে রেমিকে বলল, বাইরে সব ঠিকঠাকই আছে বলে মনে হচ্ছে। ভিতরের কী অবস্থা?

অতটা ভালো না। ঝড়ে এলোমেলো হয়ে আছে সব।

অন্ততপক্ষে এয়ার কন্ডিশনারটা তো ঠিক আছে। গতরাতের বৃষ্টির পর দ্বীপটা স্টিম বাথে পরিণত হয়ে গেছে।

মহিলা আবার ফিরে আসতেই ফর্মটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো রেমি। কাগজটা ভালো করে দেখে মহিলা বলল, জাহাজের ঘোষণাপত্রই তো?

হ্যাঁ, জবাব দিল রেমি। একটা প্রশ্ন ছিলো। গত কিছুদিনে কি আমরা ছাড়াও অন্য কেউ এই সময়কালের রেকর্ড দেখার জন্য এসেছিলো এখানে?

না। আপনারাই শুধু, বলে তাদেরকে নিয়ে আর্কাইভের দিকে পা বাড়ালো মহিলা। আর্কাইভে গিয়ে তাদেরকে কোন সারিতে খুঁজতে হবে সেটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, এখানের সবকিছু বছরের ক্রমানুযায়ী সাজানো আছে। নির্দিষ্ট জিনিসটা খুঁজতে খুব একটা কষ্ট হওয়ার কথা না। তবে মাঝেমধ্যে কিছু ফাইল উলটপালটও হয়ে যায়। আপনারাই খুঁজে দেখুন। | ধন্যবাদ, বলল রেমি। মহিলার শেষ আশঙ্কাটা সত্য না হওয়ার প্রার্থনাই করছে। শত শত ফাইল আছে এখানে। এরমানে একটা ফাইল উলটপালট হয়ে গেলে, সেটা খুঁজে বের করাও বেশ কষ্টকর হবে।

সারির দুই প্রান্ত থেকে খোঁজা শুরু করলো দুইজন। স্যাম চলে গেছে সারির শেষ প্রান্তে। আর রেমি খুঁজছে শুরুর প্রান্ত থেকে। এক এক করে ফাইলগুলো দেখতে দেখতে কাছাকাছি এগিয়ে আসছে ওরা। দেখতে দেখতেই একটা সময় সারির মাঝ বরাবর দেখা হলো তাদের। সাথে সাথেই স্যাম বলে উঠলো, প্রায়ই আসা হয় এখানে?

কপাল ভালো যে লাইটহাউজে আমাদের প্রথম দেখায় এটা বলোনি তুমি।

তাই? আমার তো মনে হয় আমি এটাই বলেছিলাম।

না। ভালো করেছিলে না বলে। তাহলে আর কখনো সেকেন্ড ডেট হতো না আমাদের। তারপর তাকের সারির দিকে নির্দেশ করে বলল, আমি খুঁজে পাইনি এখনো।

স্যামও তাকের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, খুব সম্ভবত বইটা আমাদের চোখে পড়েনি এখনো। আমার মনে হয় আমাদের…

আমিও এটাই ভাবছিলাম।

এখন আমি তোমার অংশে খুঁজে দেখি, আর তুমি আমার অংশে দেখো।

তাই করলো তারা। কিন্তু ফলাফল সেই আগেরটাই।

এখন পাশের তাকে খুঁজতে শুরু করেছে স্যাম। যদিও তারা যে বছরেরটা খুঁজছে সেটার সাথে এটার বছরের কোনো মিল নেই। রেমিও আরেকবার সারিগুলো চেক করে দেখছে। একটা একটা করে বই বের করে দেখছে ও। ভাবছে হয়তো ভুল করে কেউ অন্য কোনো সালের সাথে বইগুলো উলট-পালট করে রেখেছে।

কিছুই পাইনি, বলল স্যাম। অবাক ব্যাপার, তাই না?

অবশ্যই। বলে তাক থেকে আরেকটা বই বের করে আনলো রেমি। যদিও সে কয়েক শতাব্দী পরের রেকর্ডও পেয়ে গেছে, কিন্তু কোনোভাবেই কাক্ষিতটা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রায় এক ঘন্টা ধরে খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎ রেমি বলে উঠলো, স্যাম… এভেরির পোষা কুকুরগুলো এখনো এখানে আসেনি কেন?

আমাদের অপেক্ষা করছে ওরা। আমরা তথ্য পেলে সেটা আমাদের থেকে চুরি করবে। এতেই তো কষ্ট কম।

কিন্তু যদি…

এক মহিলার আগমনের কারণে বলতে গিয়েও থেমে গেলো রেমি। এই মহিলাই তাদেরকে এখানে ঢুকতে সাহায্য করেছিলো। তাদেরকে এখনো এখানে দেখে মহিলা চমকে উঠে বলল, এখনো এখানে?

বইটা এখানে নেই, রেমি জানালো।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কোন বছরেরটা খুঁজছেন আপনারা?

ষোলশ চুরানব্বই থেকে ষোলশ ছিয়ানব্বইয়েরগুলো।

এগিয়ে গিয়ে তাকের সারিতে খুঁজতে শুরু করলো মহিলা। এই তাকগুলোতেই একটু আগে খুঁজে দেখেছে রেমিরা। আশা করছি বইগুলো হয়তো এলোমেলো করা হয়নি… তারপর কয়েক মুহূর্ত পরেই বলে উঠলো, দাঁড়ান। মনে পড়েছে। রিসার্চ টেবিলে অনেকগুলো বইয়ের একটা স্তূপ দেখেছিলাম। প্রজেক্টের কাজে কিছু বই ব্যবহার করছিলো একজন। খুব সম্ভবত এখনো ওখানেই রয়েছে।

বলে তাদেরকে টেবিলের কাছে নিয়ে গেলো মহিলা। আসলেই টেবিলের ওপর বেশ কতগুলো মোটা মোটা বই রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে একটা বই অন্যগুলোর থেকে একটু দূরে পড়ে আছে।

স্যাম এগিয়ে গিয়ে বইটা তুলে নিলো হাতে। ভালো করে মলাট এবং বাইন্ডিংর লেখাটা পরীক্ষা করে জানালো, দেখে মনে হচ্ছে এটাই খুঁজছিলাম আমরা।

অবশেষে পাওয়া গেলো তাহলে। বলে স্যামের দিকে এগিয়ে গেলো রেমি। বইটা কেন অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে সরিয়ে রাখা হয়েছে সেটা ভাবার মতো সাহসও করতে পারছে না। স্যাম ওদিকে মলাট উল্টিয়ে বইয়ের পাতাগুলো দেখছে। কয়েক পাতা উল্টাতেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পেয়ে গেলো।

একটা তদন্ত জারি করা হয়েছিলো তখন।

কিসের তদন্ত?

১৬৯৬ সালের জুনে মিরাবেল চুরি গিয়েছে বলে দাবি উঠেছিলো। ওটার ব্যাপারেই তদন্ত জারি করা হয়েছিল।

বেশ। তাহলে তো এর মাধ্যমে আসল মালিকের নাম জানা যাবে।

যদি সাক্ষ্যগুলো পড়তে পারি আর কী! বলে রেমির দিকে বইটা কাত করে ধরলো স্যাম।

রেমি তাকিয়ে দেখলো ফুলেল স্ক্রিপ্টের লেখাটা পড়া আসলেও বেশ কঠিন একটা কাজ। টাইপিংর আধুনিকতার প্রশংসা করাই লাগছে এখন।

যাই হোক, এখানে দেখো, বলে পাতার নিচের দিকের একটা অনুচ্ছেদের দিকে নির্দেশ করলো স্যাম। এক ক্রু মেম্বার সাক্ষ্য শুনো, তাকে মাদাগাস্কারে আটক করে ক্যাপ্টেন হেনরি ব্রিজম্যানের ফ্যান্সিতে করে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। ওটাতে করে প্রথমে জামাইকাতেই এসেছিলো ওরা। তারপর যাত্রা করেছিলো নিউ প্রভিডেন্সের দিকে। এরপর নাসাউতে পৌঁছে তারা নিজেদেরকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধাওয়াকৃত ইন্টারলুপার বলে দাবি করে বন্দরে নেমেছিলো।

ইন্টারলুপার?

আমার জানা ইতিহাস যদি সঠিক হয়ে থাকে, লাইসেন্সবিহীন দাসব্যবসায়ীদেরকে ইন্টারলুপার বলা হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাসনীতি এড়িয়ে যাওয়ার একটা উপায় ছিলো এটা।

ব্রিজম্যান দাসব্যবসায়ী ছিলো?

সাথে একজন জলদস্যুও।

তো এই লোকই কি আমাদের আগ্রহের জাহাজের মালিক ছিলো?

না, লেখাগুলো দেখতে দেখতে বলছে স্যাম। নিরাপদে বন্দরে নামতে দেওয়ার জন্য ব্রিজম্যান গভর্নর ট্রটকে ঘুষ হিসেবে ফ্যান্সি উপহার দিয়েছিলো। যদিও ট্রট ঐ জাহাজ এবং ব্রিজম্যানের কথা অস্বীকার করেছিলো, তবে ক্রু মেম্বারদের দাবি ট্রট উপহারটা নিজের করে নেওয়ার আগেই ওটার কার্গোর একটা অংশ চুরি গিয়েছিলো। আর চোর মিরাবেল নিয়ে পালানোর সময় ডুবে গিয়েছিলো স্নেক আইল্যান্ডে। বলতে বলতে হুট করেই থেমে গেলো স্যাম। অনুচ্ছেদের পরের অংশটা পড়তে পড়তে বলল, এটা বেশ ইন্টারেস্টিং…

কী?

রয়েল নেভি ধাওয়া করছিলো ব্রিজম্যানকে… নেভির কমান্ডার… বলে পাতা উল্টালো স্যাম। নেই…, কিছুক্ষণ পাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল স্যাম।

নেই মানে? কমান্ডার নেই? নাকি এখানে কমান্ডারের কথা উল্লেখ নেই? তারপর কাছে বইটা ভালো করে দেখার জন্য কাছে ঝুঁকে বলল, এটাই তো সঠিক বইটা?

কয়েকটা পৃষ্ঠা নেই এখানে।

বলে বইয়ের বাধাইয়ের সাথে আটকে থাকা খাজকাটা ছেঁড়া কাগজের কোনাগুলো দেখালো স্যাম। কাগজের কোনাগুলো প্রমাণ করছে যে একসময় কিছু পৃষ্ঠা ছিলো এখানে।

স্যামের দিকে চোখ তুলে তাকালো রেমি। চোখে সন্দেহের দৃষ্টি ফুটে আছে ওর। ঐ মহিলা বলেছিলো গতরাতে অ্যালার্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলো না?

সন্দেহাতীতভাবেই, অ্যালার্ম নষ্টের সাথে ঝড়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

অযথাই সময় নষ্ট হলো তাহলে আমাদের।

বইটা নিয়ে কাউন্টারে দেখানো দরকার। দেখি বইয়ের ব্যাপারে কারো কিছু মনে আছে কিনা অথবা কারা কারা আগে এই বইটা পড়েছে।

অফিসে পৌঁছুতেই কাউন্টারের মহিলা তার হাতের কাগজগুলো রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোনো সমস্যা?

স্যাম বইটা বাড়িয়ে দিলো মহিলার দিকে। আমরা এই বইটাই খুঁজছিলাম। তবে এখানে কিছু পৃষ্ঠা নেই। ওগুলোই দরকার ছিলো আমাদের।

নেই মানে? বইটার দিকে তাকিয়ে বলল মহিলা। আমি বুঝতে পারছি না কিছুই।

কেউ একজন ওগুলো ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।

এমন কাজ কেন করবে কেউ? তারা তো চাইলেই এগুলো ফটোকপি করে নিতে পারে।

আপনি নিশ্চিত যে আমাদের আগে কেউ এই বইটার খোঁজ করতে আসেনি?

ইদানিংকালে কেউ আসেনি। রয়েল নেভাল ডকইয়ার্ডের মিউজিয়ামের ঘোষণাপত্রের জন্য এক ইতিহাসবীদ খোঁজ করেছিলো এটার। তবে এটা আরো বেশ কয়েকবছর আগের কথা। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠলো মহিলার। এক মিনিট, প্লিজ, বলে ফোনের পর্দার দিকে একবার দেখে বলল, আপনাদের কি আরো কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি? আমাকে আসলে এই ফোনটা পিক করতে হবে।

না, যতোটা করেছেন, তাই যথেষ্ট। ধন্যবাদ।

বলে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। তারপর সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে, ঠিক তখনই হুট করে থমকে দাঁড়ালো স্যাম। এমনভাবে থেমে গেছে যে রেমি প্রায় হোঁচটই খেতে নিয়েছিলো তার শরীরে।

ফেউ হাজির হয়ে গেছে, বলে পার্কিং লটের দিকে নির্দেশ করলো স্যাম। পার্কিং লটের দিকে তাকাতেই সাদা এসইউভিটা দেখতে পেলো রেমি। গাড়িটার সাথে ওয়্যারহাউজের ডাকাতদের একজনও দাঁড়িয়ে আছে। যদিও লোকটা তাদেরকে দেখতে পায়নি। ফোনের পর্দায় কী যেন একটা দেখছে লোকটা।

তাড়াতাড়ি করে রেমিকে টান দিয়ে লবির একপাশে সরে গেলো স্যাম। ডাকাতের নজর থেকে দূরে সরে থাকতে চাচ্ছে।

কী করবো এখন? রেমি জানতে চাইলো।

অন্য কোনো এক্সিট আছে কিনা খুঁজে দেখা দরকার।

অন্য এক্সিটটা পেতে বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না তাদের। দালানের পাশেই একটা এক্সিট রয়েছে। স্যাম দরজা খুলে বাইরের দৃশ্যটা দেখে জানালো, সবকিছু ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে।

দরজা দিয়ে বেরিয়ে পার্কিং লটের উলটো দিকে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওরা। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। একটু এগিয়ে কোনা ঘুরতেই ডাকাতটার সাথে সরাসরি দেখা হলো তাদের। জ্যাক স্তানিস্লভ। এই লোকটাই বইয়ের দোকানে ডাকাতি করতে এসেছিলো। চামড়ার কোটের পকেটে হাত রেখে সরাসরি তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে জ্যাক। মুখে ফুটে আছে কুৎসিত এক হাসি।

সাথে সাথেই থমকে গেলো স্যাম। রেমিকে তার পিছনে আড়াল করে নিয়ে সরাসরি চোখ তুলে তাকালো জ্যাকের দিকে। হুট করেই দেখি তোমার দেখা পেয়ে গেলাম এখানে।

হুট করে? বলে জ্যাক তার ডান পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে তাক করে ধরলো স্যামের দিকে। দেখা যখন হলোই, তাহলে ভালো মানুষের মতো উলটো ঘুরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাও। আমার বন্ধুরা তোমাদের অপেক্ষা করছে ওখানে।

যদি না যাই?

হাত ওপরে তুলো, নয়তো তোমাদেরকে এখানেই মরতে হবে।

কিছু না বলে ধীরে ধীরে হাত ওপরে উঠিয়ে নিলো স্যাম। তারপর হুট করেই ডান হাত দিয়ে ঘুষি মারলো জ্যাকের মুখে এবং বাম হাত দিয়ে আটকে ফেললো জ্যাকের পিস্তল ধরা হাতটা। মুহূর্তের মধ্যেই জ্যাককে দালানের দেয়ালে আছড়ে ধরে পিস্তলটা কেড়ে নিলো, তারপর নল ঠেকিয়ে ধরলো জ্যাকের মাথায়।

অবশ্য রেমি প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো সুযোগ পায়নি। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই পিঠে বন্দুকের নলের ছোঁয়া টের পেলো ও। পিছনের দিকে মাথা ঘুরাতেই দেখলো লম্বা এক লোক তার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাচ্ছে। তোমার স্বামীকে থামতে বলল।

ভালোভাবেই প্রস্তুত হয়ে এসেছে লোকগুলো।

স্যাম…

ডাক শুনে মাথা ঘুরাতেই রেমির পিঠে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে রাখা লোকটাকে দেখতে পেলো স্যাম। এখন আর কিছুই করার নেই তার। আস্তে আস্তে অস্ত্রটা নিচে নামিয়ে আবার তা ফেরত দিয়ে দিলো জ্যাককে।

ছাড়া পেয়েই তার ওপর খেঁকিয়ে উঠলো জ্যাক। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমার দিকটাও দেখবে। যাই হোক, বোকামি করো না, নাহলে ইভানের ট্রিগারের খুশি হতে সময় লাগবে না।

আর কিছু না করে হাত মাথার পিছনে উঁচিয়ে ধরলো স্যাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা এসইউভিটা এসে থামলো তাদের পাশে। জ্যাক গাড়িটার দিকে ইশারা করে বলল, গাড়িতে চড়ে বসো।

জ্যাক তাদের বিপদটা আঁচ করতে পারছে ঠিকই, তবু জায়গা থেকে নড়ছে না।

ইভান বলল, তোমাদেরকে জনসম্মুখে গুলি করে মারতে কোনো সমস্যাই হবে না আমার। তোমার সুন্দরী স্ত্রীকে দিয়েই শুরু করছি তাহলে। রেমির দিকে তাক করা বন্দুকটা দেখিয়ে আস্ফালন ছড়িলো ইভান। তারপর বলল, ফার্গো, বোকামি না করে এখনই ব্যাকসিটে উঠে বসে।

একদম ভিতরের কোনায় গিয়ে বসবে, বলে স্যামকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে ঢুকালো জ্যাক। তারপর রেমির দিকে বন্দুক তাক করে বলল, এখন তুমি উঠো। মাঝের সিটে বসবে তুমি। | তাই করলো রেমি। জ্যাক উঠে বসলো তার পাশে। তার পেটে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে রেখেছে লোকটা। সিট বেল্ট বেঁধে নাও সবাই।

তাই করলো রেমি। স্যামও একই কাজ করতে করতে বলল, আমাদের কিছু হলে তোমাদের ইনস্যুরেন্সের মূল্য বেড়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করছো?

সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে থাকা নতুন লোকটা পিছনে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কিসের ইনস্যুরেন্স?

কোথায় নিয়ে যাচেচ্ছা আমাদেরকে? জানতে চাইলো স্যাম।

এইতো ছোট একটা ভ্রমণে।

বলে গাড়ি চালু করলো ড্রাইভার মোড় থেকে বেশ কয়েকটা রাস্তা চলে গেছে সামনের। তারা এগিয়ে যাচ্ছে বামের রাস্তাটা দিয়ে। স্পষ্টতই এই রাস্তায় মানুষের আনাগোনা খুব কম। অবশ্য সরু রাস্তাটা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে ড্রাইভারকে। তাছাড়া সর্পিলাকার রাস্তার মোড়গুলোর জন্য গতিও ঠিকমতো বাড়াতে পারছে না।

এভাবেই বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর জ্যাক বলল, যথেষ্ট দূরে এসেছি। এখানেই থামাও।

সরু আরেকটা মোড় পেরিয়ে রাস্তার পাশে নিয়ে গাড়িটা থামালো ড্রাইভার। গাড়ি থেকে নেমে স্যামের দরজা খুলে রেমিকে নিয়ে বেরিয়ে ইশারা করলো লোকটা।

কোনো প্রতিবাদ না করে গাড়ি থেকে নেমে গেলো স্যাম। স্যামের পর রেমিও বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। বাইরে পা রাখতেই জঙ্গলের আটকে রাখা গরমের উত্তাপটা টের পেলো ও। জঙ্গলের সবুজ পাতাগুলো থেকে এখনো গতরাতের বৃষ্টির পানি টুপটুপ করে পড়ছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় এতোক্ষণে বাম্পায়িত হয়ে যাওয়ার কথা পানির। তবে এর পরিবর্তে ঝর্নার মতো করে পাহাড়ের পাশ দিয়ে পড়ছে ওগুলো।

জ্যাক তাদের দিকে পিস্তল তাক করে ধরে বলল, রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়াও, দুজনই।

আরে ভাই, একটু তো অপেক্ষা করো, বলে উঠলো স্যাম। মারবেই যখন, তখন মরার আগে তো বউটাকে বিদায়ী একটা চুমু খেয়ে নিতে দিবে।

আচ্ছা, আচ্ছা, তাড়াতাড়ি করো।

রেমির আরো কাছে গিয়ে দাঁড়ালো স্যাম। রেমির দিকে গভীরভাবে ঝুঁকে ফিশিং ভেস্টে হাত ঢুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, মনে হয় আমাদের ছুটিটা

আরো কয়েকদিন পর থেকে শুরু করতে হবে।

কথাটায় শুনে হাসার চেষ্টা করলো রেমি।

সাথে সাথেই পাক খেয়ে ঘুর গেলো স্যাম। তারপর দুই হাত দিয়ে রিভলভার ধরে বুলেট ছুঁড়ে দিলো ড্রাইভারের কপাল বরাবর।

.

২৭.

ধুপ! ধুপ!

আরো দুইবার গুলি করলো স্যাম। তবে এবার গুলিগুলো ডাকাতদের কারো গায়েই লাগেনি। কেন লাগেনি সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখলো যে তার পায়ের নিচের মাটি ক্ষয় পড়তে শুরু করেছে।

পিছিয়ে যেতে যেতে অসতর্কভাবে তারা পাহাড়ি রাস্তার বেশি কিনারের দিকে চলে গেছে। তাদের শরীর ভার নিতে পারেনি কর্দমাক্ত মাটির রাস্তাটা। ঝট করেই ব্যালেন্স হারিয়ে দুজনই পড়ে গেলো পাহাড়ের ধার দিয়ে।

স্যাম গিয়ে আছড়ে পড়েছে সবুজ ও বাদামি জালিকাময় জঙ্গলের পাতাবহরের মধ্যে। তবে তার পতন থেমে যায়নি এতে। পিঠ ঘেষে ঠিকই পিছলে পড়ছে সে।

পড়তে পড়তে রেমির হাতও একসময় ছুটে গেছে তার হাত থেকে। আরো কিছুটা পিছলে পড়ার পর পতন থামানোর জন্য গাছের ডাল আঁকড়ে ধরলো স্যাম। রেমিকে এখন আর দেখতে পাচ্ছে না। পাতার ঝোঁপের আড়ালে হারিয়ে গেছে রেমি।

ধুপ! ধুপ! ধুপ!

ফিরতিগুলির আওয়াজে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উড়ে যেতে শুরু করেছে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাখিগুলো। শব্দ শুনে স্যাম ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলো একটা গাছের গুঁড়ি গড়িয়ে আসছে তার দিকে। সরে গিয়ে পাশের দিকে আছড়ে যেতেই স্যাম দেখলো মাশরুমের একগুচ্ছ ঝাঁক তার পতন ঠেকিয়ে রেখেছে। দৃশ্যটায় চমকে গিয়ে ওপরের দিকে তাকাতেই গাছের উপড়ে যাওয়ার গুঁড়িটা এসে আঘাত করলো তার শরীরে। মিনিট খানেকের ভিতরেই ব্যথায় ভরে উঠলো তার শরীর। তবে কপাল ভালো যে পঁচে যাওয়ার কারণে গুঁড়ির আঘাতের তীব্রতা অতোটা বেশি ছিলো না। নাহলে শরীরের হাড়গোড় ভেঙে যেতো এতক্ষণে।

গর্ধভ! ইভানের গলার স্বর ভেসে আসছে ওপর থেকে। তাদেরকে এভাবে পালিয়ে যেতে দিলে?

যতটুক ওপর থেকে পড়েছে, এরপর আর কোনোভাবেই বাঁচার কথা না তাদের, জ্যাক বলল। আর যদি পতন থেকে বেঁচেও যায়, তবু এটা থেকে বাঁচতে পারবে না।

বলেই ধুপ ধুপ করে গুলি করতে শুরু করলো দুজনে। গুলির শব্দ শুনেই আত্মা কেঁপে উঠলো স্যামের।

রেমি…

বুলেট শেষ হয়ে যাওয়ায় অবশেষে গুলি থামালো ওরা।

কিছু দেখছো তুমি? ইভান জিজ্ঞেস করলো।

না। নিচে নামো। নেমে দেখো ওরা আসলেই মরেছে কিনা।

হ্যাঁ, নেমে ঘাড়টা ভাঙ্গি আর কী! খেঁকিয়ে উঠে বলল ইভান। এরচেয়ে গাড়ি নিয়ে ঢালু পথ ধরে নেমে যাওয়াই ভালো। পাহাড়ের নিচের রাস্তাটায় গিয়ে চেক করলেই হবে।

লরেঞ্জোর কী করবো? জ্যাক বলল। এখানেই ফেলে যাবো ওকে?

পাহাড়ের ধার দিয়ে ফেলে দাও। ফার্গোদের সাথে পঁচুক।

বলে রাস্তার পাশ দিয়ে লাশটা ফেলে দিলো ওরা। ঝোঁপঝাড় ভেঙ্গে লাশ গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলো স্যাম। কিছুক্ষণ পর এসইউভির ইঞ্জিনের গর্জনও শুনতে পেলো। গাড়িটা পাহাড়ের ওপরের দিকে রাস্তা বরাবর এগিয়ে যাচ্ছে, নিচের দিকে না। প্রশস্ত জায়গা না থাকায় গাড়ির মোড় ঘুরানোর জন্য কিছুটা পথ পিছিয়েই যেতে হচ্ছে তাদেরকে।

রেমি? ডাকাতগুলো চলে যাওয়ার পর মৃদুস্বরে ডাকলো স্যাম।

আমি নিচে আছি।

তার প্রায় পনেরো ফুটের মতো নিচ থেকে এসেছে শব্দটা! রেমির সাড়া পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো স্যাম। তখনই বুঝতে পারলো যে এতোক্ষণ ধরে উৎকণ্ঠায় শ্বাস আটকে রেখেছিল ও। ঠিক আছো তুমি?

চামড়া ছিলে গেছে, তবে হাড়গোড় ভাঙেনি।

ডাকাতগুলো মোড় ঘুরানোর মতো জায়গা খুঁজছে। নিচের দিকে যাওয়ার প্ল্যান তাদের।

নিচের রাস্তাটা দেখতে পাচ্ছি আমি। আমার থেকে দূরত্বটা খুব বেশি না।

আমি আসছি তোমার কাছে। তারা পৌঁছার আগেই নিচে নেমে যাওয়া দরকার আমাদের। তারা ওখানে থেকে ওপরের দিকে খুঁজবে, নিচের দিকে না।

বলে আস্তে আস্তে তাকে আটকে রাখা গাছের গুঁড়ির কাছ থেকে সরে আসতে শুরু করলো স্যাম। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের বন্দুকটা খুঁজছে ও। তার থেকে আটফুট ওপরে পাহাড়ের কর্দমাক্ত দেয়ালে গেঁথে আছে বন্দুকটা। বন্দুকটা হাতে নেওয়ার জন্য আবারো ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলো। পিচ্ছিল মাটির কারণে আরোহণটা আরো কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ের গায়ে পা ঢুকিয়ে সিঁড়ির মতো ধাপ করে ওপরের দিকে উঠতে হচ্ছে তাকে। বন্দুকটা তুলে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো স্যাম। নিচে নামাটা ওপরে উঠার থেকেও বেশি কষ্টকর লাগছে। তবু আস্তে আস্তে একটু একটু করে রেমির দিকে নেমে যাচ্ছে। পুরো শরীর কাঁদা এবং গাছগাছাড়ির পাতায় ভরে গেছে তার। রেমির পাশে পৌঁছে দেখলো, রেমির অবস্থাও তার মতোই হয়ে আছে।

তারপর আরো কিছুটা নেমে ওপরের দিকে তাকালো স্যাম। লম্বা একটা দাগের ধারা দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে। তাদের নেমে আসার চিহ্ন নির্দেশ করছে দাগটা। কেউ দাগটা দেখলেই তাদের গতিপথ বুঝে যাবে। আমাদের সাবধানে নামতে হবে। ছাপ রেখে যাওয়া যাবে না।

শুনেই স্যামের দিকে তাকালো রেমি। কোনো প্ল্যান?

অন্ততপক্ষে রাস্তার বিশফুট নিচে নেমে যেতে হবে তাদেরকে। আমি আগে আগে নামছি। আমাকে অনুসরণ করো। আমি যেখানে যেখানে পা ফেলবো তুমি সেখানে সেখানেই ফেলবে।

পাঁচ ফুট নিচে থাকা গাছের গুঁড়িটার দিকে তাকালো স্যাম। নিচের দিকের ঢালটা ওপরেরটার মতো অতোটা খাড়া না। লাফ দিয়ে খুঁড়ির ওপর নেমে দাঁড়ালো স্যাম। তারপর রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, রেডি?

হ্যাঁ, বলে লাফ দিলো রেমি।

রেমির কোমড়ে ধরে তাকে নিচে নামিয়ে আনলো স্যাম। তারপর একইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেলো আরো কিছুটা পথ। লাফিয়ে নামার ফলে তাদের নেমে যাওয়ার ছাপটা আর এখন দেখা যাচ্ছে না। রাস্তা থেকে পাঁচফুট ওপরে থাকতেই হুট করে থেমে গেলো স্যাম। এসইউভির ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে আসছে ওপর থেকে।

তারা আসছে, বলল রেমি।

তাড়াতাড়ি করে নিচের রাস্তায় লাফিয়ে নামলো স্যাম ও রেমি। রাস্তার ওপর দিয়ে কিছুটা দৌড়ে গিয়ে নিচের পর্বতটার দিকে তাকালো স্যাম। একটু আগে তারা যে ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে ওটার মতোই খাড়া এই পর্বতটাও। নামার সময় ছাপ না রেখে যাওয়ার ব্যাপারেও সতর্কভাবে থাকতে হবে ওদের। দশ ফুট নিচে ফার্নের একটা ঝোঁপ দেখতে পেলো স্যাম। আপাতত ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারবে ওরা। এক গাছের গুঁড়ি থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নেমে গেলো। গিয়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়েছে মাত্র, ঠিক ওইসময়ই ওপর থেকে এসইউভির থেমে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসতে শুনলো স্যাম।

দরজা খুলে গাড়ি থেকে দুই ডাকাতের বেরিয়ে আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছে এখন। রাস্তার ধার পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে ওরা।

তাদেরকে দেখতে পাচ্ছো? ইভান জিজ্ঞেস করলো।

ঐ যে ওখানে, জ্যাক বলল।

আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

রাস্তার পাশের পাহাড়ের গায়ে দেখো। পিছলে পড়ার দাগ দেখা যাচ্ছে। ওখান দিয়েই পড়েছে ওরা।

ওহ, হ্যাঁ, এখন দেখতে পাচ্ছি আমি। তবে দাগটা তো একটু গিয়ে আর নেই। তোমার কি মনে হয় তারা ওখানে কোথাও লুকিয়ে আছে?

মরেও যেতে পারে। হয়তো আমার গুলিগুলো তাদের শরীরে আঘাত করতে পেরেছে কোনোভাবে।

ফার্নের পত্রবহ ফাঁক করে ওপরের দিকে তাকাতেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকদুটোকে দেখতে পেলো স্যাম। দুজনের হাতেই বন্দুক রয়েছে। অবশ্য তারা তাদের থেকে উলটো দিকে ফিরে আছে। এসইউভিটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর, গাড়ির সম্মুখ দরজাটা হাঁ হয়ে আছে একদম।

দৃশ্যটা দেখে লোভ লাগছে স্যামের।

অবশ্য পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেই। হয়তো কোনোরূপ শব্দ না করেই রাস্তা পর্যন্ত উঠে যেতে পারবে, কিন্তু কভার নেওয়ার মতো কোনো উপায় নেই তাদের। ডাকাতগুলো সশস্ত্র না থাকলে স্যাম হয়তো সুযোগটা কাজে লাগাতো। ভাবনাটা মাথায় আসার সাথে সাথেই জ্যাক তার পিস্তল নিয়ে তাদের দিকে ঘুরে দেখলো স্যাম। লোকটা এখন তাদের লুকানো জায়গাটার দিকেই পিস্তল তাক করে রেখেছে।

রেমিকে জমে যেতে দেখে ওদিকে ফিরে তাকালো স্যাম। রেমির পায়ের ফাঁক দিয়ে একটা মোটা অজগর সাপ গড়িয়ে যাচ্ছে। নড়ো না, একদম নড়বে না, সাপটাকে গড়িয়ে যেতে দেখে ফিসফিসিয়ে বলল স্যাম।

নেই এখানে, ঘুরে ওপরের দিকে তাকাতেই জ্যাক বলতে শুনলো স্যাম। নিচের দিকেই তাকিয়ে আছে লোকটা। তারপর হঠাৎ করেই আবার গুলি করতে শুরু করলো জ্যাক। স্যামের ঠিক পাশ কেটে গেলো যেন বুলেটগুলো। কিছু একটা আছে নিচে। চোখে পড়েছে আমার।

কী দেখেছো? বলল ইভান। কিছু একটার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি।

স্যামও শুনতে পাচ্ছে শব্দটা। টুপ-টুপ একটা শব্দ। প্রথমে শব্দটা আসছিলো তার পিছন থেকে, এখন চতুর্দিক থেকেই আসছে। একমুহূর্ত পর বুঝতে পারলো যে এটা বৃষ্টি পড়ার শব্দ। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।

কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আমি, কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর জবাব দিলো জ্যাক। চলো, এখন ভাগি এই জায়গা থেকে।

ফার্গোদের ব্যাপারে কী করবো?

তারা যদি এখনো বেঁচে থাকে, তাহলেও তাদের ফিরে আসতে বেশ কয়েকদিন লাগবে। এই রাস্তা দিয়ে খুব একটা গাড়ি চলাচল করে না।

স্যাম এখনো রেমিকে হাত দিয়ে আটকে রেখেছে। ওপর থেকে এসইউভির ইঞ্জিনের গর্জনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে এখন। কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিনের শব্দটা দূরে মিলিয়ে যেতেই রেমি স্যামের পাশে সরে এসে বলল, তোমাকে কি আগে বলেছিলাম যে আমি সাপ ঘৃণা করি?

শোকর থাকো যে ওটা ক্ষুধার্ত ছিলো না। বলে নিচের পর্বতের দিকে তাকালো স্যাম। পর্বতটা একদম খাড়াভাবে নেমে গেছে নিচের দিকে। এসইউভিটার পুরোপুরি চলে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো স্যাম। এভেরির লোকেরা চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আশ্রয় থেকে বেরুনোর কোনো ইচ্ছা নেই তার।

গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির পানির ছিটা আসছে তার মুখে। পানির ছিটা উপভোগ করতে করতে রেমিকে বলল, আমি ভাবিনি যে আমরা এবার বাঁচতে পারবো।

পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রেমি বলল, অবশ্যই ভাবছিলাম। আমার কখনো বেঁচে যাওয়া নিয়ে সন্দেহ ছিলো না।

যখন ঐ সাপটা দেখা দিলো তখনও না?

ঝট করে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো রেমি। ভয় পাচ্ছে যেন আরো সাপের সাথে দেখা হবে তাদের। এটা নিয়ে মজা করবে না।

কাঁপতে শুরু করেছে রেমি। বৃষ্টির পানির ঠাণ্ডায় না, খুব সম্ভবত উত্তেজনার তীব্রতায় কাঁপছে। স্যাম জানে এখন তাদেরকে শরীর চালু রাখতে হবে। এভাবে এক জায়গায় আটকে থাকলে কোনো উপকার হবে না। আমাদের যাওয়া দরকার এখন, বলে রেমিকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো স্যাম।

এরপর আস্তে আস্তে আবারো রাস্তায় উঠে এলো ওরা। ওপরে উঠেই পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে আনলো স্যাম। এখানে সিগন্যাল পাওয়ার আশা করাটা হয়তো বোকামি হবে, তাই না?

বোকামি? একবার ভাবো তো, লুকিয়ে থাকার সময় কেউ ফোন করলে কী অবস্থা হতো?

ভালো বলেছে।

স্যামের হাতের সাথে হাত পেঁচিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলো রেমি। ফিরে যেতে কতক্ষণ সময় লাগবে বলে ধারণা তোমার?

নিশ্চিত না আমি, বলল স্যাম। তবে কপাল ভালো যে, এটা পাহাড়ের একটা ঢাল মাত্র।

তোমার এই দিকটা আমার ভালো লাগে, ফার্গো। সবসময়ই ভালো দিকটা দেখো তুমি। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সফলতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম প্রায়… এতো দূর এসেও কোনো লাভ হলো না। অহেতুক একটা ভ্রমণ…

তবে, দুজন তো একসাথে আছি।

শুনে মুচকি হেসে স্যামের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো রেমি। এভাবেই হেঁটে এগুচ্ছে ওরা।

****

প্রায় এক ঘন্টা ধরে হাঁটছে ওরা। বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে এখন। তবে এতে তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। বৃষ্টির পানিতে ভিজে পুরোপুরি চুপচুপে হয়ে গেছে ওরা। ঠাণ্ডায় হাঁটাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রায় তিন-চার মাইলের মতো এগিয়ে এসেছে, তারপরও ঢালু পথে নেমে যাওয়া রাস্তাটা এখনো অতিক্রম করতে পারেনি।

আরো বেশ কিছুক্ষণ ধরে হেঁটে এগুনোর পর মূল রাস্তার মোড়টা চোখে পড়লো ওদের! মোড়ে পৌঁছেই ঝট করে থেমে গেলো স্যাম। তার আশঙ্কা হচ্ছে, এভেরির লোকেরা হয়তো কাছে পিঠেই কোথাও দাঁড়িয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

রেমিকেও থামতে বলে আশেপাশের দৃশ্যটা একবার ভালো করে দেখে নিলো স্যাম। কাউকে বা সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখতে না পেয়ে রেমিকে বলল, রাস্তার একদম ধার ঘেষে হাঁটা উচিৎ আমাদের। এভেরির লোকেরা আমাদের অপেক্ষায় থাকলে থাকতেও পারে।

এভাবেই আরো কয়েক মিনিট হেঁটে যাওয়ার পর আবারো মোবাইলটা চেক করলো স্যাম। এখনো কোনো সিগন্যাল নেই ফোনে। হতাশ হয়ে আবারো পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো মোবাইলটা। ঠিক তখনই একটা ক্ষীণ শব্দ কানে এলো তার। পাহাড়ের দিক থেকে একটা শব্দ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। শব্দটা শুনো, ভেজা রাস্তায় চাকার ঘর্ষণের শব্দও শুনতে পাচ্ছে এখন। নিউট্রাল গিয়ারে কোনো গাড়ি আসছে।

গাড়িটা কেন নিউট্রাল গিয়ারে চলছে সেটা ভাবতে গিয়ে দুটো কারণ মাথায় এলো স্যামের। এক, হয়তো গাড়িটার কোনো সমস্যা হয়েছে, নয়তো দুই, কেউ একজন তাদের যানের ইঞ্জিনের আওয়াজের শব্দটা গোপন রাখতে চাচ্ছে।

দ্বিতীয় কারণটা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে স্যামকে। শব্দটা কাছিয়ে আসার সাথে সাথেই রেমির হাত খাবলে ধরে লুকিয়ে পড়লো রাস্তার পাশের ঝোঁপটায়।

.

২৮.

স্যাম আশা করছে তাদেরকে হয়তো কেউ দেখেনি। একটু আগে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় খুশি হলেও, এখন আরেকবার মুষলধারে বৃষ্টির আশা করছে। এতে করে তাদেরকে দেখে ফেলার সম্ভাবনা আরো কমে যাবে।

কিন্তু বৃষ্টির বদলে শুধু গাছের পাতা থেকে টুপটুপ পানিই পড়ছে শুধু। কয়েক সেকেন্ডের ভিতরেই তাদের দৃষ্টিসীমায় এসে উপস্থিত হলো গাড়িটা। পাতার আড়াল থেকে ১৯৭০ দশকে হলুদ সিজে৫ জিপটা দেখতে পেলো স্যাম। কাদামাটিতে ভরে আছে গাড়িটা। এখনো নিউট্রাল গিয়ারেই আছে। অবশ্য গাড়িটা কে চালাচ্ছে সেটা না দেখা পর্যন্ত নড়ার কোনো ইচ্ছা নেই স্যামের। আরো একবার এভেরির লোকদের হাতে বন্দি হওয়ার কোনো শখ নেই তার। তাদের সামনে এসেই হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠলো জিপটা। ইঞ্জিন চালু হয়ে গেছে।

নাহ, এভেরির লোকদের কেউ নেই গাড়িতে।

তাড়াতাড়ি করে ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে গাড়ির উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে ডাকতে শুরু করেলো স্যাম। হেল্প! চেঁচিয়ে বলছে ও। এখানে আসুন!

রেমিও দৌড়ে আসছে তার সাথে সাথে। সেও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকছে। জিপটাকে। কিন্তু জিপটা এতক্ষণে রাস্তার মোড় পর্যন্ত চলে গেছে। বেশি দেরি করে ফেলেছে তারা। স্যাম ভাবছে জিপের লোকটা হয়তো তাদেরকে দেখেওনি, হয়তো তাদের ডাকও শুনেনি। হতাশ হয়ে এগুতে যাবে, ঠিক তখনই থেমে গেলো জিপটা। পিছিয়ে আসছে তাদের দিকে।

জিপের ড্রাইভার লোকটা বেশ লম্বা, শরীরের চুলগুলো সাদা, থুতনীতে হালকা দাড়ি, চোখগুলো সবুজ। স্যামদের কাছে পৌঁছে কৌতূহল মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, লিফট চাই?

হ্যাঁ, খুবই উপকার হতো এতে, স্যাম জানালো।

সাথে রেমি যোগ করলো, যদি কাদামাটিতে আপনি কিছু মনে না করেন। আরকী!

শুনে হেসে উঠলো লোকটা, এটা খুব একটা ক্লাসিক গাড়ি না। হালকা একটু কাদায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না এটার। তবে তাড়াতাড়ি উঠুন। আরেকদফা বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।

তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠে বসলো ওরা। রেমি বসেছে গাড়ির পিছনের সিটে। আর স্যাম সামনের সিটে। ধন্যাবাদ। খুবই উপকার করলেন আমাদের।

আরে এসব কিছু না। ব্রেক চাপতে গিয়ে ইঞ্জিন থেমে গিয়েছিলো আমার। রাস্তার মধ্যে থাকা ঐ অজগরটাই যত সমস্যা করেছে। কপাল ভালো যে পাহাড়ি ঢাল দিয়ে যাচ্ছিলাম। বলে একবার স্যামের দিকে তাকালো লোকটা। এদিকের রাস্তায় তো পর্যটকদের দেখা যায় না সাধারণত।

আমরাও স্ব-ইচ্ছায় আসিনি এখানে। কিংস্টন থেকে কয়েকজন বন্দুকধারী ধরে এনেছিলো আমাদেরকে।

ছিনতাই করেছে? কিংস্টনের কোথায় ছিলেন আপনারা?

রেকর্ডস ডিপার্টমেন্টে। আমাদের গাড়িটাও ওখানেই আছে।

শুনে চোখ বড়ো বড়ো করে স্যামের দিকে তাকালো লোকটা। পাবলিক প্লেসের সামনে থেকে তো সাধারণত পর্যটকদের কিডন্যাপ করা হয় না।

এখন আর ওসব বলে কী হবে! তারা তাদের জিনিস পেয়ে গেছে। আর… যাই হোক, আমরা তো বেঁচে আছি। এটাই আসল কথা।

হ্যাঁ, এটাই আসল কথা, বলে পিছন থেকে স্যামের কাঁধে হাত রাখলো রেমি।

তো, আলোচনার বিষয় পাল্টানোর জন্য বলল স্যাম, আপনি কি জামাইকাতেই থাকেন? নাকি ভ্রমণে এসেছেন?

ভ্রমণে এসেছি। আমার এক বন্ধু কফির চাষ করে এখানে। তার ওখানে যাওয়ার জন্যই এই জিপটা চালাই আমি। বর্ষার মৌসুমে এসব রাস্তায় কাদার পরিমাণ বেড়ে যায় অনেক।

যাত্রার বাকিটা সময় কফি চাষের জটিলতা নিয়েই বেশি কথা বলল ওরা। সাথে সাথে দ্বীপের মাছ ধরার উপযুক্ত জায়গাগুলো নিয়েও।

রেকর্ড ডিপার্টমেন্টের পার্কিং লটে পৌঁছেই প্রথমে আশেপাশের দিকে তাকালো স্যাম। এভেরির লোকেরা নেই দেখে নিশ্চিত হয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। বেরিয়েই আবারো ধন্যবাদ জানালো জিপের ড্রাইভারকে। সাথে সাথে এটাও জানালো গ্যাস বা সমস্যার জন্য লোকটা কিছু চায় কিনা।

ওসবের দরকার নেই। নতুন অল্টারনেটরের জন্য এমনিতেও এদিকে আসা লাগতো আমার। অবশ্য একটা প্রশ্ন জানার আগ্রহ আছে আমার। আপনারা এখানে আসলে কী তথ্য জানার জন্য এসেছিলেন?

জাহাজের ঘোষণাপত্র দেখতে, স্যাম বলল, সতেরশো শতকের। আমরা যেটার জন্য এসেছিলাম ওটাই নেই এখানে।

ওহ, আচ্ছা, শুভকামনা তাহলে, বলে ইঞ্জিন চালু করে গাড়ি এগিয়ে যেতে শুরু করলো লোকটা। তারপর হঠাৎ করেই গাড়ি থামিয়ে জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলল, জানি না এটা আপনাদের কাজে লাগবে কিনা। হঠাৎই মনে পড়লো আমার। পোর্ট রয়েলের ফোর্ট চার্লস মেরিটাইম মিউজিয়ামে খুঁজে দেখতে পারেন একবার। শুনেছি ওখানের সংগ্রহশালা নাকি বেশ সমৃদ্ধ।

তথ্যটার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে, বলে আবারো ধন্যবাদ জানিয়ে লোকটা বিদায় জানালো ওরা। লোকটা চলে যেতেই মনে পড়লো যে কথা বলার ফাঁকে লোকটার নামই জিজ্ঞেস করা হয়নি তাদের।

পোর্ট রয়েল যাত্রাটা আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে। এই মুহূর্তে তাদের একটা লম্বা শাওয়ার, উষ্ণ খাবার এবং ভালো একটা ঘুমের দরকার। পুনরায় অনুসরিত না হওয়ার জন্য চালাকি করে গাড়ি চালালেও, হোটেল রুমে পৌঁছানো না পর্যন্ত পুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছে না স্যাম।

কপাল ভালো যে হোটেলের মিনি বারে আর্জেন্টাইন মারলটের একটা বোতল ছিলো। গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে রেমির দিকে বাড়িয়ে দিলো স্যাম। তারপর নিজের গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরে টোস্ট করলো, মরতে মরতে কোনো রকমে বেঁচে যাওয়া এবং আমাদের লিফট দেওয়া ঐ ড্রাইভারের প্রতি…

সাথে রেমিও তার গ্লাসের সাথে আলতো টোকা দিয়ে যোগ করলো, ..এবং আগামিকাল পোর্ট রয়েলে আমাদের কাঙিক্ষত অনুসন্ধানটার প্রতিও।

****

পোর্ট রয়াল। জেলেদের এক নিরিবিলি শহর। একসময় জায়গাটা পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত শহর নামে পরিচিত ছিলো। স্প্যানিশদের হাতে গোড়াপত্তন হয়েছিলো শহরটার। ১৬৫৫ সালে ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ার পর, এককালের সবচাইতে কুখ্যাত শহরটাই এখন পরিণত হয়েছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলোর একটায়। এর পিছনে জলদস্যুদের সাথে সম্পৃক্ততার অবদানও আছে। অবশ্য ১৬৯২ সালের ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প না ঘটলে হয়তো শহরটা আগের মতোই কুখ্যাত থাকতো। ভূমিকম্পের কারণে শহরের অর্ধেকটাই ডুবে গিয়েছিলো সমুদ্রের তলায়। গত তিন শতক ধরে এখনো সমুদ্রের পানি ও বালির নিচে ডুবে আছে শহরের অর্ধেকটা।

ভূমিকম্পের পর টিকে থাকা কাঠামোগুলোর মধ্যে ফোর্ট চার্লস একটা। যেটাকে এখন ম্যারিটাইম মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহার করায়। ফি দিয়ে ইটের দুর্গের ভিতরে ঢুকতেই উপকূলীয় বাতাসের ঝাঁপটা টের পেলো স্যাম ও রেমি। পেটালোহার গোলাগুলো এখনো সারিবদ্ধভাবে আটকে রয়েটু দেয়ালের প্রাচীরে। একসময় এগুলো দিয়েই শহরটাকে সুরক্ষা দেওয়া হতো। প্রশস্ত চতুরের ওপর দিয়ে পুরোনো নাবিকদের হাসপাতালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। ওখানেই গড়ে উঠেছে মিউজিয়ামটা।

ভিতরে দস্তার তৈরি বিশেষ বাক্সে প্রদর্শন করিয়ে রাখা হয়েছে জিনিসগুলো। প্রাত্যাহিক জীবনে ব্যবহৃত প্রায় সবকিছুই রাখা আছে। প্রদর্শনীতে। এগুলোর মাঝে চীনের জেড খোদাইকৃত অলঙ্কারও রয়েছে। এগুলোই পোর্ট রয়েলের ধন-সম্পদের প্রমাণ দিচ্ছে।

এটা দেখো, স্যাম, পকেট ওয়াচের একটা ছবির দিকে নির্দেশ করে বলল রেমি। এই ঘড়িটা পানি থেকে উদ্ধার করে আনা হয়েছিলো। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে এগারোটা তেতাল্লিশ। ধারণা করা হয়, ঐ সময়টাতেই ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিলো শহরে, এবং ভূমিকম্পের পরপরই থেমে গিয়েছিলো ঘড়ির সময়।

চমৎকার আর্টিফ্যাক্ট। নিচে হয়তো এখনো এগুলোর অনেক কিছু পড়ে আছে।

আক্ষেপ এটাই যে জামাইকান সরকার আমাদেরকে এখানে ডাইভ দেওয়ার অনুমতি দিবে না।

একবারে বেশি কিছু করতে চেয়ো না, রেমি। এখন সাহায্য করার মতো কাউকে খুঁজে বের করা উচিৎ আমাদের।

সত্যি বলতে সাহায্যই খুঁজে নিলো তাদেরকে। দুই মহিলাকে রুমে ঢুকতে দেখলো ওরা। তাদের মধ্যে লম্বাজন তাদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, শুভ সকাল। মেরিটাইম মিউজিয়ামে স্বাগতম।

শুভ সকাল, রেমি বলল। আমরা আশা করছি আপনারা হয়তো গবেষণার কাজে আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবেন।

শুনে মুচকি হাসলো মহিলা।

আমাদেরকে বলা হয়েছিলো যে আপনাদের কাছে পুরোনো জাহাজের ঘোষণাপত্রের কপিগুলো আছে। বিশেষ করে বললে ১৬৯৪ থেকে ১৬৯৬ এর গুলো।

না। আমরা খুবই দুঃখিত। আপনারা কি কিংস্টনের আর্কাইভে খুঁজে দেখেছেন?

দুর্ভাগ্যবশতঃ ঐ বইটা সম্পূর্ণ ছিলো না। আমাদেরকে একজন জানালো আপনাদের কাছে হয়তো ওটার কপি থাকতে পারে।

আমার জানামতে নেই। এর জন্য আবারো ক্ষমা চাইছি আমি।

আচ্ছা, ধন্যবাদ, বলে মহিলাকে বিদায় জানালো ওরা।

মহিলা চলে যেতেই স্যাম বলল, ভালো চেষ্টা করেছে। হয়তো সেলমা এতক্ষণে কিছু বের করে ফেলেছে।

দুজনই জানে এটা শুধুই একটা সান্ত্বনাবাণী মাত্র। সেলমা কিছু পেয়ে থাকলে এতক্ষণে তাদেরকে জানিয়ে দিতো।

নাই মামার চেয়ে তো কানা মামা ভালো, স্যাম বলল।

কানা মামা আছে কোনো?

আমরা তো এখন চাইলে আমাদের ছুটিটা নিতে পারি।

শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসলো রেমি। হাসলেও চোখ থেকে হতাশার ছাপটা দূর করতে পারছে না। চলো, বাসায় ফিরে যাই।

বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক তখনই দ্বিতীয় মহিলা তাদের দিকে এগিয়ে এসে নিচু কণ্ঠে বলল, আপনার কথাগুলো শুনতে পেয়েছি আমি। পুরোনো জাহাজগুলো ঘোষণাপত্র খুঁজছেন আপনারা?

হ্যাঁ, স্যাম জবাব দিলো।

কিংস্টনের আর্কাইভ ডিপার্টমেন্ট পুরোনো সব রেকর্ডকে ডিজিটাল কপিতে পরিণত করতে চেয়েছিলো, কিন্তু বাজেটের কারণে সম্ভব হয়নি। আমাদের কপাল ভালো যে টাকা ফুরিয়ে যাবার আগেই কিছু কপি স্ক্যান করে ফেলতে পেরেছিলাম। ডিরেক্টদের একজন মিউজিয়ামের জন্য ওগুলোর রিপ্রিন্ট করার আশা করছে। তবে ভূমিকম্পের ঠিক পরের কয়েকবছরের কপি ছাড়া আর কিছুই নেই।

ভূমিকম্পের পরের কয়েক বছরের কপি? আশাবাদী কণ্ঠে বলে উঠলো রেমি। কোন কোন বছরের?

ষোলশো তিরানব্বই থেকে ষোলশো ছিয়ানব্বইয়েরগুলোই আছে শুধু।

প্লিজ, ওগুলোই দেখান আমাদের, বলল রেমি।

.

২৯.

রাস্তার অপর পাশ থেকে স্বামীর গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছে আলেক্সান্দ্রা এভেরি এবং ভাড়াটে পার্সোনাল ইনভেস্টিগেটর কিপ রজার্স। চার্লসের বেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে প্রায়, ভাবতেই চার্লস এভিরেকে অফিস বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলো আলেক্সান্দ্রা। লোকটার সাথে তার স্বঘোষিত ক্লায়েন্টও আছে।

দ্রুততার সাথে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলো কপি। দেখতে তো বেশ, ঐ মেয়েটা।

ওরা সবাই দেখতে বেশ, বলল আলেক্সান্দ্রা। চার্লস কিভাবে তার মেয়ের বয়েসী কারো সাথে ডেট করতে সেটা কখনো ভেবে পায় না সে। অবশ্য চার্লস কখনোই তার সন্তানদের সাথে অতোটা ঘনিষ্ঠও ছিলো না। বাচ্চাকালে নিজের কাছে রাখার চেয়ে বেবিসিটারের কাছেই রাখতো বেশি। তারপর বয়স বাড়তেই পাঠিয়ে দিয়েছিলো বোর্ডিং স্কুলে। আলেক্সান্দ্রা সবসময়ই সপ্তাহান্তে গিয়ে দেখা করতো তাদের সাথে, ফোনে খোঁজ নিতো। আর চার্লস দূরত্বটাকেই বেশি পছন্দ করতো, বলতো এতে নাকি বাচ্চাদের চরিত্র বিকশিত হবে।

আর এখন, চার্লসই অবাক হয়, কেন তার সন্তানরা কখনো তার সাথে কথা বলে না ভেবে।

আপনার কাজে লেগে যাওয়া উচিৎ, চার্লসের গাড়ি রাস্তার মোড় ঘুরে হারিয়ে যেতে দেখে বলল কিপ।

মাথা ঝাঁকালো আলেক্সান্দ্রা। অফিসে পৌঁছে তোমাকে ফোন দিবো আমি।

আমি আছি এখানেই।

বলে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে অফিসের দিকে পা বাড়ালো আলেক্সান্দ্রা। সে কী করতে যাচ্ছে সেই ব্যাপারে যদি চার্লসের বিন্দুমাত্রও ধারণা থাকতো, তাহলে সে কখনোই অফিসে ঢোকার সুযোগ পেতো না। আর তাছাড়া আগের সপ্তাহে বেশ কয়েকবার এখানে আসার কারণে গার্ডরাও তাকে চিনে ফেলেছে ভালোভাবে।

সবাই তাকে বিরক্তিকর, যন্ত্রণাদায়ক এবং শীঘ্রই সাবেকে পরিণত হতে যাওয়া এক মহিলা ভাবে। শেষ অংশটা সত্য। শীঘ্রই চার্লসের সাবেক পত্নীতে পরিণত হয়ে যাবে সে। যাই হোক, এতে করে এই মুহূর্তে তার এখানে অনবরত আসাটাকে অদ্ভুতভাবে দেখবে না কেউ। যদিও সে নিশ্চিত না, তারপরও এটা বুঝতে পারছে যে তার স্বামী এখন সচারচর কোম্পানি কিনে ফতুর করার ব্যবসা থেকে অন্য কিছু নিয়ে মেতে আছে। নিশ্চিতভাবেই কোম্পানি ফতুর করার ব্যবসা দিয়েই নিজের সাম্রাজ্য দাঁড় করিয়েছে চার্লস। তবে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সে খেয়াল করছে তার স্বামী শুধু টাকা বাড়ানোর জন্যই এটা করে না, বরং মানুষের জীবন ধ্বংস করাটাও বেশ উপভোগ করে লোকটা।

এমন না যে সে তার স্বামীর চেয়ে খুব ভালো কেউ। মানুষটাকে তো সে তার টাকার জন্যই বিয়ে করেছিলো। অবশ্য পরবর্তীতে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে তার আচরণেরও পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে ন্যায়বোধ, বিবেকের জন্ম নেয় ওর মাঝে। খুব সম্ভবত সন্তানদের ওপর এই ধরনের জীবনযাপনের প্রভাব দেখেই কিছুটা বদলে যায় ও।

সন্তানদের জন্য বদলে যাওয়ার ভাবনাটা বেশ ভালো লাগলেও বদলানোর কারণটা ঠিকই ভালোভাবে জানে আলেক্সান্দ্রা। স্বামীর সম্পদ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও আছে তার মনে। তাদের বিবাহিত সময়কালে স্বামীর অর্জন করা সম্পদের ওপর থেকে অধিকার ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার। এজন্যেই আইনজীবীদের দলে কিপকেও ভাড়া করেছে ও।

যতক্ষণ পর্যন্ত তার শরীরে এক রত্তি শ্বাস টিকে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত চার্লসকে তার অধিকারের সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যেতে দিবে না।

অবশ্য শ্বাস টিকিয়ে রাখাটা বেশ কঠিন একটা কাজ তার জন্য। গত কিছুদিন ধরে চার্লস যেভাবে আচরণ করছে তাতে চার্লসের কবল থেকে তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নিশ্চিতভাবেই চার্লস তার সাম্রাজ্যকে নিজের কাছে। রাখার জন্য কোনো না কোনো উপায় খুঁজছে।

যাই হোক, এখন তাকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে চার্লস কিছু একটা লুকিয়ে রাখছে অন্যদের কাছ থেকে। এবং সে এতে পুরোপুরি নিশ্চিত যে প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটা একমাত্র চার্লসের অফিসেই পাওয়া যাবে।

ভাবতে ভাবতেই লবিতে এসে দাঁড়ালো আলেক্সান্দ্রা। সে এসে দাঁড়াতেই ডেস্কে কাজ করা সিকিউরিটি গার্ড তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, একটু আগেই আপনার স্বামী বেরিয়ে গেছে, মিসেস এভেরি।

আমার সেলফোনটা নিশ্চয় ডেস্কে রেখে যায়নি, তাই না?

না, ম্যাম।

মনে হয় তার অফিসেই ফোনটা ফেলে রেখে এসেছি। আমিই গিয়ে নিয়ে আসছি। আর আমার ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কয়েকটা ফোন কল করতে হবে আমার।

কিছু না বলে আস্তে করে মাথা ঝাঁকালো গার্ড লোকটা। তারপর আবারো ফিরে গেলো তার মনিটরে চোখ রাখার কাজে।

যাক, এতে অন্তত দেরি হলেও সে কিছু সন্দেহ করবে না, ভেবে পেন্টহাউজে যাওয়ার এলিভেটরের দিকে পা বাড়ালো আলেক্সান্দ্রা।

চার্লসের সেক্রেটারিও চলে গেছেন। তাই অফিসের সামনের লবিটাও পুরোপুরি খালি হয়ে আছে। পারফেক্ট। অবশ্য চার্লসের অফিসের দরজাটায় ঠিকই তালা দেওয়া। চাবির সেট বের করে আনলো আলেক্সান্দ্রা। সবগুলোই ডুপ্লিকেট চাবি। যেসব রুমকে গুরুত্বপূর্ণ চার্লস তার থেকে আড়াল করে রাখতে চায় সেসব রুমের চাবিই এগুলো।

লোকটা কত চেষ্টাই করছে, কিন্তু লাভ হচ্ছে না…যদি খালি সে এই চাবির সেটের কথাটা জানতো….

চাবি দিয়ে দরজাটা খুলে অফিসে ঢুকলো আলেক্সান্দ্রাতখনই গুপ্ত ক্যামেরার বিষয়টা মাথায় এলো ওর।

তবে এটা কোনো কাজে দিবে না। সে যতোটা জানে, কোম্পানির অর্ধেক মালিকের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে মামলা করাটা প্রায় অসম্ভব কাজ।

ভিতরে ঢুকেই কাজে লেগে গেলো আলেক্সান্দ্রা। প্রথমেই ডেস্ক ড্রয়ারগুলো খুলে খুলে দেখছে। লোকটা খুবই পরিপাটি মানুষ। সবকিছুই একদম নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখে। নিশ্চিতভাবেই লুকিয়ে রাখার মতো কোনো কিছু একদম সরাসরি নজরে পড়ার মতো কোনো সাধারণ জায়গায় রাখবে না। এটা ভেবেই চার্লসের চেয়ারটায় বসে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো আলেক্সান্দ্রা। অফিসের কোনার টেবিলের ওপর থাকা ম্যাপ বইটাই শুধু চোখে পড়লো তার। এই বইটা নিয়ে খুবই মোহাগ্রস্ত হয়ে আছে চার্লস।

উঠে গিয়ে বইটা হাতে নিলো ও বইটার মধ্যে কী এমন আছে যার জন্য লোকটা এতো পাগল হয়ে গেছে? দেখে বইটাকে খুব একটা বিশেষ কিছু মনে হলো না আলেক্সান্দ্রার কাছে। দেখতে তাদের লাইব্রেরিতে থাকা পুনর্মুদ্রিত বইটার মতোই দেখাচ্ছে। মলাট উল্টে বইয়ের ভঙ্গুর পাতাগুলো দেখেই পার্থক্যটা বুঝতে পারলো। তবে আকর্ষণ পাওয়ার মতো কিছুই নেই বইটাতে। এই ভেবে বইটা বন্ধ করতে যাবে, তখনই দেখলো যে কেউ একজন পেন্সিল দিয়ে বর্ডারের দিকে কিছু চিহ্নের ওপর গোল দাগ দিয়ে রেখেছে। চিহ্নগুলোকে দেখতে একটু অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে যেন…

ওগুলো কি কোনো বর্ণ?

আসলেই ওগুলো বর্ণ। প্রাচীন-ধাচের বর্ণগুলোকে দেখতে অনেকটা দক্ষ হাতে থাকা চিত্রের মতো দেখাচ্ছে।

তো, এগুলোর ওপর গোল দাগ দেওয়া কেন?

ভেবে ভালো করে দেখার জন্য আরো কাছে কুঁকলো আলেক্সান্দ্রা। ঠিক তখনই বেজে উঠলো তার ফোন।

কাউচে রাখা পার্সটার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা বের করে আনলো আলেক্সান্দ্রা। কিপ কল করেছে। কল রিসিভ করে বলল, কপাল ভালো নিচে থাকার সময় ফোন দাওনি তুমি।

ফোন সাইলেন্ট করা না আপনার? ওসবের কথা মনে থাকে কার?

আপনার অন্তত থাকা উচিৎ। যেহেতু আপনি আপনার স্বামীর অফিসে চুরি করে ঢুকেছেন, তাই সতর্ক থাকা জরুরি। অফিসে পৌঁছে তো আপনার আমাকে ফোন করার কথা ছিল।

তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে-আসলে তোমাকে এই কাজের জন্যই ভাড়া করেছি আমি-তাহলে এটা নিয়ে এতো দুঃশ্চিন্তা করার সুযোগ পেতে না।

ঠিক বলেছেন। তবে আপনার স্বামীর অফিসে আপনি খোঁজাখুঁজি করলে সেটা নিয়ে কেউ সন্দেহ করবে না। আমার মতো অপরিচিত কেউ করতে গেলেই সন্দেহের উদ্রেক হবে। আর তাছাড়া কোনটা মানানসই আর কোনটা বেমানান সেটাই বা আপনার থেকে ভালোকরে জানে কে? তো, যাই হোক, খুঁজে পেয়েছেন কিছু?

এখনো না। শুধু একটা জলদস্যুর বই পেয়েছি মাত্র। তার দাবি এটা নাকি পূর্বপুরুষদের থেকে চুরি গিয়েছিলো।

অরিজিনাল বইটা পেয়েছেন?

হা। অবশ্য বইটায় কৌতূহল জাগানোর মতো কিছুও আছে, বলে টেবিলে রাখা হলুদেটে কাগজগুলোর দিকে তাকালো আলেক্সান্দ্রা। কেউ একজন বইয়ের বর্ণগুলোর ওপর গোল দাগ দিয়ে রেখেছে। বর্ণগুলোও দেখতে কিছুটা অন্যরকম। অনেকটা গুপ্তসংকেতের মতো।

তার মোহের কারণটা বুঝা যাচ্ছে। আপনি ওগুলোর ছবি তুলে নিয়ে আসুন। আমি চেক করে দেখবো। আপনি কি উনার কম্পিউটারটা দেখেছেন?

না। এখনো না।

দ্রুত করুন তাহলে। এমনিতেই অনেক সময় পেরিয়ে গেছে।

তার সাথে থাকা আইটেমটাকে তো দেখেছো? আমার মনে হয় না খুব শীঘ্রই তার ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে।

যাই হোক, ঝুঁকি নেওয়া উচিৎ হবে না তবুও। জলদি করুন।

কল কেটে দ্রুত বইয়ের প্রতিটা পাতার ছবি তুলতে শুরু করলো আলেক্সান্দ্রা। তার মন বলছে, চার্লসের গোপনীয় কাজটার সাথে এগুলোর অবশ্যই কোনো সম্পর্ক আছে।

ছবি তোলা শেষে ল্যাপটপটা চালু করলো। ল্যাপটপ পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড থাকলেও, পাসওয়ার্ডটা জানে ও। চার্লস প্রায় সবকিছুতেই এই পাসওয়ার্ডটা ব্যাবহার করে। পাসওয়ার্ডের ঘরে Pirate লিখতেই লকটা খুলে গেছে। লকটা খুলে যেতেই কম্পিউটারের ফোল্ডারগুলো ঘেটে দেখতে শুরু করছে ও।

আগ্রহ জাগানোর মতো কিছুই নেই ফোল্ডারগুলোতে।

আলেক্সান্দ্রা জানে সে কিছু একটা মিস করছে। কী মিস করছে ভাবতে ভাবতে চেয়ারে হেলান দিয়ে আবার তাকালো অফিসের চারপাশে।

ঠিক তখনই তার নজর পড়লো টেবিলে থাকা নোটপ্যাডটার দিকে। প্যাডের ওপরের কাগজটা অবশ্য ছিঁড়ে নেওয়া, তারপরও কাগজে লেখা ফার্গো শহরের নামটা এখনো মনে আছে তার। কথাটা মনে পড়তেই ইন্টারনেটে ফার্গো লিখে সার্চ দিলো। নর্থ ডাকোটায় চার্লস কী করছে সেটা সে কোনোভাবেই ভেবে বের করতে পারছে না।

তবে ইন্টারনেট সার্চ হিস্টোরিতে নর্থ ডাকোটার ব্যাপারে কিছুই নেই।

তার বদলে রয়েছে ফার্গো গ্রুপ, স্যাম ফার্গো, রেমি ফার্গো জাতীয় কিছু নাম।

হোয়াট দ্য…?

আরো কিছুটা ঘাটাঘাটি করতেই ফার্গো দম্পতিদের ওপর চার্লসের আগ্রহের কারণটা ধরতে পারলো ও।

ফার্গোরা আসলে গুপ্তধন শিকারী।

ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠলো তার। অবশ্যই, কিপের কল এটা। ফোন ধরেই সে বলল, তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না এটা। চার্লস কিসের পিছে লেগেছে তা জেনে গেছি আমি।

দ্রুত বেরিয়ে আসুন ওখান থেকে। আপনার স্বামী ফিরে এসেছে।

.

৩০.

পরদিন সকালে সেলমার কল পেয়ে স্যাম জিজ্ঞেস বলল, আশা করছি ভালো কোনো সংবাদ দিতে পারবে।

আগের দিন পোর্ট রয়েল থেকে ডিজিটাল কপিটা নিয়েই পাতাগুলো সেলমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো স্যাম। সেলমা আসলে এইগুলোরই আশা করছিলো। এতে জামাইকা থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলো নিয়ে গবেষণা করতে সুবিধা হয়েছে ওর।

আমিও, সেলমা বলল, স্নেক আইল্যান্ডে ডোবা জাহাজ এবং জামাইকায় ক্যাপ্টেন ব্রিজম্যানের কার্গো থেকে চুরি যাওয়া জাহাজ দুটোর মধ্যে সংযোগসূত্র পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হলো, ডুবে যাওয়া জাহাজের নামটা আসলে অনেকগুলো শূন্যস্থানই পূরণ করে দিয়েছে। বিশেষ করে এখন আমরা নিশ্চিত জানি যে সাইফার হুইলটা ঐ জাহাজের সাথে করেই ডুবেছিলো।

কিভাবে জানলে এটা? স্যাম জানতে চাইলো।

ব্রিজম্যান আসলে পাইরেট হেনরি এভোরির আরেক নাম ছিলো।

এভোরি? রেমি বলে উঠলো। এভেরি আর এভোরি শব্দ দুটো প্রায় একই রকম শোনাচ্ছে। এটা কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার?

না, সেলমা জানালো। ভুল উচ্চারণের কারণে নামটা বদলে গেছে। তবে বেশিরভাগ নথিপত্রেই দুটো নামই ব্যবহার করা হয়েছে। হেনরি এভোরি বা এভেরি, যেটাই বলেন না কেন-আসলে এই লোকই ছিলো ক্যাপ্টেন হেনরি ব্রিজম্যান। প্রথমে দাস ব্যবসায়ী ছিলো, তারপর একসময় জলদস্যুতে পরিণত হয়। অবশ্য আমার দৃষ্টিতে দুটো আসলে একই জিনিস।

তো, কী হয়েছিলো তার? স্যাম জিজ্ঞেস করলো।

গায়েব হয়ে গিয়েছিলো পুরোপুরি। সর্বশেষ বাহামাসে দেখা গিয়েছিলো তাকে। ধারণা করা হয় এরপর ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিলো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাকি জীবন সেখানেই লুকিয়েছিলো। ঐ সময়টায় ওয়ান্টেড অপরাধীদের একজন ছিলো লোকটা। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই পৃষ্ঠাগুলো ছাড়া কিন্তু অন্য কোথায়ই ব্রিজম্যান বা ফ্যান্সির জামাইকা যাত্রা করার কোনো তথ্য নেই। স্পষ্টতই, চার্লস এভেরি এই তথ্যটা আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছিলো।

এছাড়া আর কী কী লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে?

দুটো জিনিস। এক, এভোরির প্রথমবার মিরাবেল আক্রমণ করার ব্যাপারটা। দুই, মিরাবেলর প্রতি আগ্রহ থাকা ইংরেজ বিনিয়োগকারীদের পরিচয়।

বিনিয়োগকারীদের? মানে, জাহাজের মালিক সংখ্যা একের থেকে বেশি?

মালিক আসলে একজনও হতে পারে। তবে কয়েকজন বিনিয়োগকারী থাকার অর্থ মনে হচ্ছে, জাহাজের ক্ষমতা আসলে বেশ কয়েকজনের হাতে ছিলো। আর ক্রু মেম্বারের বক্তব্য থেকে আমরা যেটা জানতে পেরেছি স্পেনের উপকূলে প্রথমবার মিরাবেল আক্রমণের সময় এভোরি একটা জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছিলো। ধরে নিচ্ছি সাইফার হুইলটাই কেড়ে নিয়েছিলো। এই আক্রমণটা হয়েছিলো জামাইকার ঘটনার আরো কয়েক বছর আগে। বক্তব্য থেকে জানা গেছে, এভোরি নাকি জাহাজের প্রতিটা কোনা খুঁজে খুঁজে দেখেছিলো। এর মানে সে আগে থেকেই জানতো যে হুইলটা ঐ মিরাবেলেই আছে। আর তাছাড়া জাহাজটা ধ্বংস বা নিজের জলদস্যু না ভিড়িয়ে ওটাকে ছেড়ে দিয়েছিলো এভোরি। এমনকি জাহাজের ক্যাপ্টেন বা ক্রুদেরও কাউকে হত্যা করেনি।

দ্রুত ওখান থেকে চলে যেতে চাইছিলো, স্যাম বলল। আর দ্বিতীয় আক্রমণটা হয়েছিলো জামাইকাতে?

মিরাবেল আসলে তাকে অনুসরণ করে গিয়েছিলো ওখানে। বক্তব্য অনুযায়ী, জামাইকাতে এভোরির থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা চুরি হয়েছিলো বলে জানা গেছে। এরপর মিরাবেল পালিয়ে যায়। ধরে নিচ্ছি সাইফার হুইলটা নিয়েই পালিয়েছিলো। ফ্যান্সির ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময়ই স্নেক আইল্যান্ডে ডুবে যায় জাহাজটা। আর এরপরের ইতিহাস তো আপনারা জানেনই। মিরাবেলের সাথে সাথে হুইলটাও হারিয়ে গিয়েছিলো এভোরির নাগাল থেকে। খুব সম্ভবত এই কারণেই পরবর্তীতে জলদস্যুতা ছেড়ে দিয়েছিলো লোকটা।

ইতিহাস বলছে ঐ সময়ের পর হেনরিকে আর দেখা যায়নি, স্যাম বলল! যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে এটাও তো ধরে নেওয়া যায় যে সে মিরাবেলকে আটকাতে পেরেছিলো। তাই না? হয়তো পাথরে ধাক্কা খেয়ে জাহাজের সাথে সাথে সেও ডুবে গিয়েছিলো পানিতে। এমনটার কি সম্ভাবনা নেই?

যৌক্তিক ধারণা, সেলমা জানালো। তবে স্নেক আইল্যান্ডের ঠিক কোথায় সাইফার হুইলটা খুঁজতে হবে এটার ম্যাপ কিন্তু অন্য কথা বলছে। ম্যাপটা দেখে মনে হচ্ছে এভোরি হুইলের সঠিক স্থানটা মনে গেঁথে নিয়ে ফিরে এসেছিলো। হয়তো পরবর্তীতে গিয়ে ওটা তুলে আনার ইচ্ছা ছিলো তার। তবে, লোকটার ভাগ্য খারাপ ছিলো। তার ব্রিজম্যান ছদ্মনামটা ফাঁস হয়ে গিয়েছিলো তখন। রয়েল নেভির সাথে সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ধাওয়া করছিলো তাকে। খুব সম্ভবত এরজন্যেই এভোরি স্নেক আইল্যান্ডে আর কখনো ফিরে যেতে পারেনি। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, সে ইংল্যান্ডে ফিরে এসেছিলো এবং গুপ্তসম্পদ তুলতে না পারায় কাঙাল হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো। লাযলোর ধারণা ইংল্যান্ডে ফিরে লোকটা তার বাকি থাকা সমস্ত অর্থ খরচ করেছিলো মূল সাইফার হুইলটা খোঁজার পিছনে। এই কারণেই শেষমেশ কাঙালে পরিণত হতে হয়েছিলো তাকে।

আমরা কি নিশ্চিত যে সে কখনো মূল সাইফার হুইলটা বের করতে পারেনি? আর, তাছাড়া এটার কি আসলেই কোনো অস্তিত্ব আছে? বলল রেমি।

পুরোপুরি নিশ্চিত বলা যায়, সেলমা জানালো। প্রথমত, হেনরি এভোরি যদি সাইফার হুইলটা হাতে পেয়ে যেতো, তাহলে চার্লস এভেরি কখনোই এটার পিছনে লাগতো না। লোকটা তার পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই জানে। আর দ্বিতীয়ত, লায়লোর গবেষণা কনফার্ম করছে যে আসলেই এটার অস্তিত্ব আছে। এটা দখল করার আগেই এভোরি-ব্রিজম্যান হয় মারা গিয়েছিলো নয়তো ধরা পড়ে গিয়েছিলো রয়েল নেভির হাতে। তবে, এই সাইফার হুইলটা কোথা থেকে এসেছিলো বা এটা মালিক কে ছিলো সেটার ব্যাপারে সে কিছু বলে যায়নি। ধরে নিচ্ছি, সে এই তথ্যগুলো জানতো। যাই হোক, চার্লস এভেরিও এই ঘোষণাপত্রগুলো পেয়ে গেছে এখন। কোনো সন্দেহ নেই যে সেও এখন এটার পিছে লেগেছে।

হাত বাড়িয়ে মেরিটাইম মিউজিয়াম থেকে আনা ডিজিটাল কপিটা টেনে এনে ওটার দিকে তাকালো স্যাম। কিংস্টনের আর্কাইভে পড়া কোর্টের বক্তব্যের কয়েকটা পৃষ্ঠাই শুধু আছে এখানে। তো, সে এই সাইফার হুইলটা প্রথমে কার থেকে চুরি করেছিলো সেটা জানা এখনো বাকি আছে আমাদের?

ঘাটাঘাটি করে মিরাবেল-এর দুজন বিনিয়োগকারীর পরিচয় বের করেছি আমরা। দুজনই ইংল্যান্ডে থাকতো। তারমানে ধরে নেওয়া যায় যে জাহাজটাও ইংল্যান্ডেরই ছিলো। তো, পরবর্তীতে ওখানেই যেতে হবে আপনাদের।

রেমির দিকে তাকালো স্যাম। তো, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে যাত্রার ব্যাপারে কী মত তোমার?

কোনো অমত নেই। বছরের এই সময়ের ব্রিটেন আমার বেশ ভালোই লাগে।

****

পরদিন বিকালের দিকে লন্ডন সিটি এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছালো ওরা। রাতটা বিশ্রাম তার পরদিন খুব সকাল সকাল কাজে লেগে গেলো আবার। সেলমা তাদেরকে দুটো নাম ও ঠিকানা দিয়েছে। একজন গ্রেস হারবার্ট, ব্রিস্টলের ঠিক পাশেই থাকে মানুষটা। অন্যজন হ্যারি ম্যাকগ্রেগর, থাকে কিছুটা দূরের নটিংহামের উত্তরে। তবে তাদের কার কাছে গেলে সুবিধা হবে সেই ব্যাপারের কিছুই বলতে পারেনি সেলমা। তাই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে আগে কোথায় যাবে সেটা নির্ধারণের জন্য কয়েন দিয়ে টস করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো স্যাম। হেডস আসলে হারবার্টের ওখানে যাবো। টেইলস আসলে ম্যাকগ্রেগরের ওখানে, বলে কয়েনটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার খাবলে ধরলো স্যাম।

হেডস আসুক, রেমি বলল। আমার মন বলছে ব্রিস্টলে গেলে হয়তো কিছু পাওয়া যাবে।

যদি ওখানে আমাদের আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটা না পাই, তাহলে কিন্তু তখন অনেক দূরের নটিংহামে যেতে হবে।

মহিলাদের অনুমানশক্তি হিসেবে ভেবে নাও এটাকে। আমি ব্রিস্টলের পক্ষে, হেডস আসুক।

হাত খুলে কয়েনটার দিকে তাকালো স্যাম। টেইলস। দেখেই কয়েনটা পকেটে ভরে রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, এভাবে খেলার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো মানে হয় না। তোমার অনুমানের প্রতি বিশ্বাস আছে আমার।

টেইলস এসেছে, তাই না?

গাড়ি এসে যাওয়ায় প্রশ্নটার জবাব না দিয়ে স্যাম বলল, তুমি চালাও, আর আমি দিক নির্দেশনা দিই। ঠিক আছে?

কী! আমি নাহয় ড্রাইভ করলাম, কিন্তু তুমি যে ম্যাপের দিকে মনোযোগ রাখবে সেটা কিভাবে বিশ্বাস করবো?

কখনো কি ভুল নির্দেশনা দিয়েছি আমি?

একবার কিন্তু…

বাদ দাও, বলে ভত্যকে বখশিস দিয়ে গাড়ির চাবিটা নিয়ে নিলো স্যাম।

লন্ডনকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। ধীরে ধীরে রাস্তার পাশের দালানের সংখ্যা কমছে, সেই সাথে বাড়তে শুরু করেছে খামারের সংখ্যাও। মৃদু কুয়াশাও পড়তে শুরু করেছে। উইন্ডশিল্ডের ওয়াইপার চালু করে নিলো স্যাম। পরের দুই ঘন্টা এই কুয়াশার ভিতর দিয়েই এগিয়ে গেলো ওরা।

পাহাড়ের ঢালের সবুজ দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। খুবই মনোরম একটা জায়গা।

হ্যাঁ, যদি কুয়াশাচ্ছন্ন শীতলতা তোমার পছন্দ হয় আর কী!

শুনে স্যামের দিকে তাকিয়ে রেমি বলল, এটার থেকে কি জামাইকার ঐ উত্তপ্ত আবহাওয়াই পছন্দ তোমার?

লা জোলার উষ্ণ বায়ুর আবহাওয়াই বেশি পছন্দ আমার।

জবাব না দিয়ে ফোনের পর্দার দিকে তাকালে রেমি। সোজা পথে আরো দশ মাইল পর একটা মোড় পাবে। মোড়ে গিয়ে ডানে বাঁক নিবে।

বাক নিয়ে খোয়া বিছানো দুই লেনের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। এভাবেই আরো কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে হারবার্টদের খামার বাড়িটা চোখে পড়লো ওদের। একটা বড়ো কটেজ এবং কিছু ছোটো ছোটো দালানে গড়ে উঠেছে বাড়িটা। কটেজের চিমনি দিয়ে ধোয়া বেরুচ্ছে।

পার্ক করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। নুড়ি বিছানো ড্রাইভওয়েটা ক্রস করে গিয়ে নক করলো দরজায়। এক মহিলা এসে খুললো দরজাটা। মহিলার বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি, বাদামি চুলগুলো ছোটো ছোটো করে ছাঁটা, কপালের দিকের চুলগুলো কিছুটা ধূসর বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। চোখগুলোও কিছুটা ধূসর। দরজা খুলে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা নিশ্চয় ফার্গো দম্পতি?

হ্যাঁ। আপনিই মিসেস হারবার্ট? বলল স্যাম।

আসলে, হারবার্ট-মিলার। তবে আমাকে গ্রেস বললে ডাকলেই খুশি হবো। আসুন, ভিতরে আসুন। চা চলবে? কেটলি চুলোতেই বসানো আছে।

অবশ্যই, বলল রেমি।

বলে তাদেরকে নিয়ে বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে গেলেন মহিলা। তারা রুমে গিয়ে বসার কিছুক্ষণ পরই চীনামাটির চায়ের কাপসহ একটা রুপালি ট্রে নিয়ে ফিরে এলেন আবার। লম্বা ভ্রমণের পর স্যাম আসলে এই মুহূর্তে একটা কড়া কফির আশা করছিলো, তবে তারপরও চায়ে আপত্তি জানালো না। দুধ চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে মিসেস হারবার্ট-মিলারের কথা শুনছে। নিজেকে ঐতিহাসিক সম্পদসমূহেরর উত্তরাধিকারিণী হিসেবে আবিষ্কারের পর চমকে যাওয়ার অভিজ্ঞতার ব্যাপারে জানাচ্ছেন মহিলা।

হুট করেই একদিন একটা কল এলো, চায়ের কাপে চিনি নিয়ে নাড়তে নাড়তে বলছেন মহিলা। সেটাও আবার লন্ডনের এক সলিসিটরের কল। কল দিয়ে জানতে চাইলো আমি মিলফোর্ড হারবার্টসের গ্রেস হারবার্ট কিনা। বলে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে নিলেন মহিলা। স্বাভাবিকভাবেই ঐসব সম্পদ বিক্রির তালিকায় তুলে দিয়েছিলাম আমরা। পুরোনো শীতল একটা দুর্গে গিয়ে। থাকার কথা চিন্তাও করতে পারি না আমি। যদিও মিলফোর্ড খুবই সুন্দর একটা জায়গা। এমনটাই শুনেছি আমি। তবে আমার মনে হয় না আমি চাইলেও আমার স্বামীকে ওখানে গিয়ে থাকার ব্যাপারে কখনো রাজি করাতে পারব কিনা।

জায়গাটা আসলেই সুন্দর, রেমি বলল। অনেক বছর আগে আমি একবার গিয়েছিলাম ওদিকে।

স্যাম অবশ্য আলোচনাটা আরো দ্রুত সারতে চাচ্ছে। তাই বলল, ওখানে কি ঐতিহাসিক মর্যাদাসম্পন্ন কিছু চোখে পড়েছে আপনার? অবশ্যই, ঐ দুৰ্গটা ছাড়া।

আমি আসলে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না। সব কিছুই ভাগাভাগি করা হয়ে গেছে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি দুৰ্গটা পেয়েছি, আর আমার নটিংহামের কাজিন হ্যারি ম্যাকগ্রেগর পেয়েছে ওখানের কিছু ভূসম্পত্তি পেয়েছে। খুব সম্ভবত সে হয়তো কিছু জানলে জানতে পারে। অবশ্য আমার মতো সেও ঐতিহাসিক মর্যাদার সবকিছু মিউজিয়ামে দিয়ে দিয়েছে। মিউজিয়াম বেশ আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করে নিয়েছে ওগুলো। যদিও পরে জানা গেছে যে স্যার এডমুন্ড হারবার্ট আসলে নাজায়েজ সন্তান ছিলেন। বলে বিস্কুটের প্লেটটা হাতে তুলে নিলেন মিসেস হারবার্ট-মিলফোর্ড। কুকি?

স্যাম তুলে নিলো একটা বিস্কুট। ধন্যবাদ। তবে রেমি নিলো না একটাও।

প্লেটটা আবার টেবিলের কোনায় রেখে মহিলা বললেন, আমার কাজিন আর আমি যে আসলেই আত্মীয় এটার প্রমাণ বলতে শুধু একটা পারিবারিক বংশলতিকার বইই আছে আমার কাছে। অন্যান্য জিনিসগুলোর সাথে বইটাও আমার ভাগে পড়েছিলো। যদি বংশলতিকাটা আমি ঠিকমতো পড়ে থাকি তাহলে আমরা মায়ের দিক থেকে জ্ঞাতি ভাই-বোন এবং পরিবারের সর্বশেষ পুরুষ উত্তরাধিকারের বংশধর।

ঐতিহাসিক জিনিসগুলোর কি কোনো তালিকা আছে আপনার কাছে? স্যাম জানতে চাইলো।

হ্যাঁ, আছে। আপনারা দেখতে চান?

হ্যাঁ, অবশ্যই।

টেবিল থেকে উঠে পাশের রুমে বিলের হিসাব করতে থাকা সেক্রেটারি কাছ থাকে একটা ম্যানিলা খাম নিয়ে এলেন মিসেস হারবার্ট-মিলার। তারপর খাম থেকে একটা কাগজের গোছা বের করে এনে তুলে দিলেন স্যামের হাতে। আসলে খুব বেশি কিছু ছিলো না। সবই নিলামের জন্য তুলে দেওয়া হয়েছিলো। মনে হয় খুব সম্ভবত তাদের কাছে সবগুলো জিনিসের ছবি তোলা আছে। ছবিগুলো এখনো আমাকে দেওয়া হয়নি।

স্যামের দিকে ঝুঁকে কাগজগুলোর দিকে তাকালো রেমি। দেখে বলল, তালিকাটা কিন্তু খুব একটা ছোটোও নয়।

ভেবে দেখুন, আমার মতো একজনের বৈঠকখানায় হাপসিকর্ড (বাদ্যযন্ত্র) থাকলে কেমন বিদঘুঁটে লাগতো? অথবা বর্ম রাখলে? যদি ওসব রাখার মতো কোনো আলাদা কক্ষও থাকতো, তারপরও বিদঘুঁটেই লাগতো। এরচেয়ে ভালো ওগুলো বিক্রি করে দিয়ে অর্থটা খামারের কাজে লাগানো। অবশ্য, তারপরও আমি কিছু জিনিস রেখে দিয়েছি।

তাই? রেমি বলল।

এই টি-সেটটা রেখে দিয়েছি। চমৎকার জিনিস এটা।

পিরিচের ধারে আঙুল বুলিয়ে দেখলো একবার। আসলেই।

কিছু পেইন্টিংও রেখে দিয়েছি, বলে দেয়ালে কোট-অফ-আর্মসের (বংশ পরিচায়ক চিহ্ন) দুইপাশে ঝুলানো খামারের দৃশ্যের দুটো ছবির দিকে নির্দেশ করলেন মহিলা। খামারবাড়িতে ওগুলোকে অতোটা বেমানান দেখায় না। আর পারিবারিক ক্রেস্টটা আসলে গৌরবের প্রতীক হিসেবে রাখা। স্বাভাবিকভাবেই, কেউ তো নিশ্চয় প্রতিদিন জানতে পারবে না যে সে এক শাসকের নাজায়েজ ছেলের বংশধর। যদিও সেই শাসক আসলে তেমন কেউ বড়ো কেউ ছিলো না, সাধারণ এক জমিদার ছিলো মাত্র। আর এর নিচের ঐ চামড়ার ঢালটা স্যার হারবার্টের সময়কালীনের নিদর্শন। তবে আমি ওটা রেখে দিয়েছি ওটার কেন্দ্রে থাকা কেল্টিক নটের নকশাটা থাকার কারণে।

রেমি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, আমি কি একটু কাছ থেকে দেখতে পারি ওটা?

অবশ্যই।

বলে উঠে দেয়ালের কাছে চলে গেলো রেমি।

ওদিকে স্যাম কাগজে থাকা তালিকাটা দেখতে দেখতে বলল, এখানে বেশ পাঁচমিশালী দ্রব্যাদির কয়েকটা বাক্সের কথা উল্লেখ আছে দেখি। ওগুলোতে কী আছে আসলে?

কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র। কাগজের স্তূপ, বইই বেশি। একটা বাক্স দেখে মনে হচ্ছিলো কেউ একজন কোনো ভাঙ্গা বৰ্ম ভরে রেখেছে ওটার ভিতর। অ্যাপ্রেইজারের ধারণা ওগুলোর কিছুর ঐতিহাসিক মূল্য থাকলে থাকতেও পারে। এজন্যেই আমি আর আমার কাজিন ওগুলোকে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি জানি না আসলেই ওগুলোর কোনো সত্যিকার মূল্য আছে কিনা….. বলতে বলতেই হুট করে মহিলার চোখ পড়লো স্যামের খালি চায়ের কাপটার দিকে। আরেককাপ দিবো?

না, না। ধন্যবাদ।

এরপর মহিলা নিজের কাপে আরেকবার চা ঢেলে নিয়ে বললেন, এমন না যে আমরা ধনী বলে ওগুলোকে ছেড়ে দিয়েছি। আসলে আমাদের ওগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় পড়ে থাকার চেয়ে জিনিসগুলোকে মিউজিয়ামে রাখাতেই আগ্রহ বেশি আমাদের। সামনের সপ্তাহান্তে হয়তো ফান্ড-রেইজারদের একটা অনুষ্ঠান আছে মিউজিয়ামে। ঐ অনুষ্ঠানেই জিনিসগুলোকে প্রদর্শনীতে রাখতে চাচ্ছে ওরা

ফান্ড-রেইজার? দেয়ালের কাছ থেকে ফিরে এসে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো রেমি। আমাদেরও যাওয়া উচিৎ তাহলে।

টিকিটের বিক্রি খুব সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে, বললেন মিসেস হারবার্ট মিলার। কয়েক সপ্তাহ আগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

কপাল খারাপ তাহলে, স্যাম বলল। ঐ অনুষ্ঠানের পূর্বেই কি জিনিসগুলো দেখার মতো সুযোগ করে দিতে পারবেন আপনি?

অবশ্যই।

বলে মিউজিয়ামের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির নাম ও যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বরটা তাদেরকে জানালেন মিসেস হারবাট-মিলার। দেরি না করে সাথে সাথেই মোবাইলে তথ্যগুলো টুকে নিলো স্যাম। আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল ওরা। তারপর একটা সময় সব কিছু সম্পর্কে জানার পর মহিলাকে অতিথিপরায়ণতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেওয়ার জন্য পা বাড়ালো ওরা।

দরজা দিয়ে বেরুতে যাবে ঠিক তখনই দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা পেইন্টিংগুলোর দিকে চোখ আটকে গেলো স্যামের। ছবির শিল্পীর নামটা তার পরিচিত না। তবে তার নজর আটকে গেছে কোট-অফ-আর্মসটা দেখে। ঘুরে মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, এটার একটা ছবি তুললে নিশ্চয় কিছু মনে করবেন না আপনি?

আরে নাহ। আপনি চাইলে ছবি তুলতে পারেন।

মোবাইল বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিলো স্যাম। কোট-অফ-আর্মস এবং এর নিচে ঝুলানো ঢাল দুটোরই ছবি তুলে নিচ্ছে। পারিবারিক চিহ্নের ইংরেজ ঐতিহ্যের সাথে খোদাইকৃত কেল্টিক নটটাকে কিছুটা উদ্ভট লাগছে। তবে কেউ যদি এর কোনো মানে বের করতে পারে, তাহলে একমাত্র সেলমাই পারবে না। তবে বয়সের প্রভাবে ঢালের চিহ্নটা ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় এবং মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠায় পরিষ্কার ছবি ভোলা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ফ্ল্যাশ বন্ধ করেই ছবি তুললো স্যাম। তবে রুমে আলো কম থাকায় এতেও খুব একটা লাভ হলো না। অবশ্য, সেলমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এটা দিয়েই তথ্য বের করে আনতে পারবে মেয়েটা। ছবি তোলা শেষে মহিলাকে আবারো ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো স্যাম।

মিসেস হারবার্ট-মিলার মুচকি হেসে বলল, আরে ধন্যবাদ লাগবে না। আপনাদের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লেগেছে আমার। তবে আমার স্বামী আপনাদের সাথে দেখা করতে পারেনি বলে দুঃখিত। হুট করেই বেড়া মেরামতের কাজ পড়ে গিয়েছে। তবে আমার মনে হয় গতকালের মেহমানদের ওপর কিছুটা অসন্তুষ্ট ও।

মেহমান? রেমি বলে উঠলো।

আপনাদের কালও কয়েকজন এসেছিলো উত্তরাধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে। সত্যি বলতে, আমি জানি না সবাই কেন এটা নিয়ে এতো মেতে আছে। দুৰ্গটা দেখলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন এটা। আমার স্বামীর ভাষায় ওটা শুধু পাথরের একটা স্তূপ মাত্র।

দরজার মুখে গিয়ে থেমে দাঁড়ালো স্যাম। আপনি কি তাদের নাম বলতে পারবেন? অথবা তারা কী নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছিলো সেটা?

দুঃখিত, নামগুলো ঠিক মনে নেই আমার। তবে তারাও আপনাদের মতোই মিউজিয়ামে দিয়ে দেওয়া বাক্সগুলো নিয়েই আগ্রহী ছিলো।

এরপর আর কিছু না বলে মহিলার থেকে বিদায় নিলো। গাড়িতে গিয়ে বসে ফোনটা রেমির হাতে দিয়ে স্যাম বলল, একটা কাজ করো। ছবিগুলো সেলমাকে পাঠিয়ে দাও।

কোট-অফ-আর্মসটা বেশ অদ্ভুত লাগলো। মহিলার পূর্বপুরুষ ছিলো সাধারণ এক জমিদারের নাজায়েজ ছেলে মাত্র। সেই তুলনায় ক্রেস্টে আভিজাতিক প্রতীকের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি।

আমিও ঠিক এটাই ভাবছি, বলতে বলতে খামারের ড্রাইভওয়ে থেকে মূল সড়কে গাড়ি বের করে আনলো স্যাম। সাথে রিয়ারভিউ মিররটাও চেক করে নিচ্ছে।

পাঠিয়ে দিয়েছি, বলে ফোনটা গাড়ির সেন্টার কনসোলে রেখে দিলো রেমি। তারা আমাদের আগে আসায় খুব একটা অবাক হইনি আমি।

প্রতিবারই তাদের থেকে এককদম পিছিয়ে আছি আমরা। এতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি এখন।

আশা করছি মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জিনিসগুলো দেখানোর আগে এদের ব্যাপারে কিছুটা খতিয়ে দেখবে। নাহলেও অন্ততপক্ষে পরিচয় পত্র দেখতে চাইবে।

ব্রিটিশ মিউজিয়াম সঠিক নিরাপত্তা প্রটোকল বজায় রাখবে বলেই ভাবতে চাচ্ছি আমি। হয়তো আমাদেরও তাদেরকে জানিয়ে রাখা দরকার যে আগামীকাল আমরা ওখানে যাবো।

৩১. ব্রিটিশ মিউজিয়ামে

৩১.

পরদিন সকালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গ্রেস হারবার্ট-মিলার এবং তার জ্ঞাতি ভাইয়ের ধার দেওয়া ঐতিহাসিক আর্টিফ্যাক্টগুলো দেখার অনুমতির জন্য ফোন করলো রেমি। ওপাশ থেকে এক তরুণী মেয়ে ফোন ধরে জানালো যে উইকেন্ডের অনুষ্ঠানের আগে মিস ওয়ালশ ওগুলো কাউকে দেখতে দিবে না।

রেমি জানতে চাইলো এই অবস্থায় তাদেরকে কেউ সাহায্য করতে পারবে কিনা। তবে উত্তরে হতাশই হতে হলো তাকে। অনুষ্ঠানের পূর্বে প্রদর্শনীতে রাখা আর্টিফ্যাক্ট বা স্টোররুমে রাখা অন্যান্য বস্তুগুলো কাউকে দেখতে দেবার মতো কোনো ক্ষমতা নেই কারো। সবকিছুই বিশাল এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করে রাখা হয়েছে। যদি তাদের কাছে অনুষ্ঠানের কোনো টিকেট থেকে না থাকে তাহলে পরের সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

চমৎকার, বলে হতাশ হয়ে ফোনটা টেবিলের ওপর রাখলো রেমি। কোনো লাভই হলো না।

হয়তো সেলমা সাহায্য করতে পারবে আমাদেরকে, স্যাম জানালো। অথবা লায়লো। তার তো এখানের কারো সাথে যোগাযোগ থাকার কথা।

আশা করা ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই এখন, বলে ঘড়ির তাকে তাকিয়ে আট ঘণ্টা সময় বিয়োগ করে নিলো রেমি। সেলমাদের সাথে তাদের সময়ের ব্যবধান প্রায় আট ঘন্টার মতো। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সেলমাকে ইমেইল করে দিয়ে বলল, তো, এখন বসে অপেক্ষা করবো শুধু?

বসে থাকার পরিবর্তে হাঁটতে বেরুতে পারি। গিয়ে মিউজিয়ামটাও একটু ঘেটে দেখে আসা যায় এই সুযোগে! কিসের বিরুদ্ধে লড়ছি সেটাও তো একটু দেখে আসা উচিৎ।

ভালো বলেছো। তোমার এইভাবে চিন্তার ধরনটা ভালো লাগে আমার, ফার্গো।

বলে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লো ওরা। হোটেল থেকে মিউজিয়ামের দূরত্ব খুব বেশি না। আধ-মাইলের মতো।

মিউজিয়ামে যেতেও বেশিক্ষণ লাগেনি তাদের। এখন মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে থাকা আর্টিফ্যাক্টগুলো দেখছে। দেখতে দেখতে এক সময় রোজেটা

২১৪

স্টোনের এসে দাঁড়ালো ওরা। এই পাথরটাকে রেমির কাছে সবসময়ই খুব রহস্যময় মনে হয়। আমাদের সাইফার হুইলের চাবিটাও যদি এখানে থাকতো, তাহলে খুব ভালো হতো না?

রেমির কথা শুনে ভিড়ের থেকে নজর সরিয়ে প্রকাণ্ড পাথরটার দিকে তাকালো। প্রদর্শনীতে রাখা বস্তুগুলো দেখার বদলে মানুষের জটলার দিকেই বেশি নজর স্যামের। এভেরির লোকদের দেখা পাওয়া নিয়েই বেশি দুঃশ্চিন্তা তার। এত সহজে পাওয়া গেলে কি চ্যালেঞ্জের মজা থাকে?

| সাইফারের অর্থ তো আর তোমাকে বের করতে হবে না, তাই এমনটা বলছো। বলে আশেপাশের দিকে তাকালো রেমি। তারপর ম্যাপটা দেখিয়ে বলল, এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গ্যালারি। মিশরীয় ভাস্কর্যের রুম এটা।

তখনই রেমির হাত ধরে পাথরের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে স্যাম বলল, একটু সাবধানে থাকতে হবে। যদি ঐ দুর্ঘটনায় মানে মিসেস হারবার্টের ওখানে ঘটা দুর্ঘটনাটায় লোকগুলো গুরুতর আহত হয়ে থাকে, তাহলে এভেরি হয়তো এখানে অন্য কাউকে পাঠিয়েছে।

ভালো বলেছে। আর তাছাড়া আমরা ঐ লোকগুলোর চেহারাও চিনে ফেলেছি এখন। এভেরিও সতর্ক হতে চাইবে।

যাই হোক, তোমার এই ম্যাপে কি বিশেষ অনুষ্ঠানটা কোথায় হবে সেটা বলা আছে?

না। তবে দিক নির্দেশনার দেওয়ার মতো ভালো কোনো গাইড পেলে জানতে সমস্যা হবে না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন গাইড পেয়ে গেলো ওরা। ধূসর চুলের এক মহিলা তাদেরকে বলল যে অনুষ্ঠানের জন্য রাখা প্রদর্শনীটা এখন তিন নম্বর রুমে রেখে দেওয়া আছে। সাথে জানালো, গ্রেট কোর্টে ঢুকে ডানের দিকে তাকালেই ওটার দরজাটা দেখতে পাবেন।

| মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রকাণ্ড কোর্টের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলো স্যাম ও রেমি। কাঁচ ও স্টিলের মিশ্রণে বানানো সিলিং-এর কারণে রুমটাকে খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই তাদের আকাঙিক্ষত রুমটা পেয়ে গেলো।

অবশ্য রুমটার দরজা আটকে রাখা হয়েছে। এছাড়া এক গার্ডও দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে।

যদিও গার্ড লোকটা তাদেরকে কোনো নতুন তথ্য দিতে পারলো না। অথবা লোকটার হয়তো তাদের সাথে নিয়ে এসব নিয়ে আলোচনা করারও কোনো ইচ্ছা ছিলো না।

হতাশ হয়ে রুমের সামনে থেকে সরে এসে রেমি জিজ্ঞেস করলো, কী করবো এখন? কোনো আইডিয়া আছে?

কোনো আইডিয়াই নেই আমার। বলে ঘড়ি দেখলো স্যাম। যদি কপাল ভালো হয়ে থাকে, তাহলে সেলমা হয়তো এতক্ষণে কিছুর ব্যবস্থা করে ফেলেছে।

তারপর বাইরে বেরিয়ে এক নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে সেলমাকে কল করলো স্যাম! ফোনটা ওপরের দিকে ধরে রেখেছে যেতে রেমিও কথা শুনতে পারে ঠিকমতত। সেলমা কল রিসিভি করতেই বলল, সুসংবাদ আছে। কোনো? | স্যরি, মি. ফার্গো। এটা খুবই হাই কোয়ালিটি একটা অনুষ্ঠান। ওয়েটিং লিস্টটাও বিশাল লম্বা। এদের মধ্যে অনেক বড়ো বড়ো সেলেব্রিটিও আছে। আয়োজকদের যদি বুঝতে পারেন যে আপনারা ঐ সব সেলেব্রিটির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, তাহলে তো সুযোগ পাবেন। নাহলে ওখানে ঢোকার কোনো সুযোগই নেই আপনাদের।

লাযলো? তার তো এখানে কারো সাথে যোগাযোগ থাকার কথা।

একাডেমিয়ার লোকদের কিন্তু রাজপরিবারের সদস্যদের উর্ধ্বে গিয়ে কিছুতে পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতা নেই। এমনকি মাল্টিমিলিয়নিয়রদেরও তা

নেই। অবশ্য, আমার কাছে অন্য একটা সুসংবাদ আছে।

কী নিয়ে ওটা…?

পারিবারিক প্রতীক গবেষণার জন্য অবশ্য একাডেমিয়ার লোকেরা বেশ কাজের। যাই হোক, এসব প্রতীক নিয়ে কতটা জানেন আপনারা?

রেমি বলল, এটুকুই জানি যে এটা নিয়ে ঘাটতে ঘাটতে তোমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।

আসলেই, সেলমা বলল। ােযলোর মতো, খামার মালিকের স্ত্রী আর তার নটিংহামের জ্ঞাতি ভাই শুধু সাধারণ এক জমিদারের অবৈধ ছেলের বংশধরই না। ঐ সাধারণ জমিদারও আসলে এডমুন্ড মর্টিমারের অবৈধ ছেলে। এডমুন্ড মর্টিমার মানে দ্বিতীয় লর্ড মর্টিমারের বংশধর।

আর এই মর্টিমারের গুরুত্ব…? স্যাম জানতে চাইলো।

তিনি ছিলেন রজার ডি মর্টিমার অর্থাৎ তৃতীয় লর্ড মর্টিমারের বাবা। এই রজার মটিমারের সাথে রানি ইসাবেল প্রণয় ছিলো বলেও শোনা যায়। নিঃসন্দেহেই ইসাবেলের ছেলে তৃতীয় এডওয়ার্ডের হাতে তার মারা পড়ার

এটাও একটা কারণ ছিলো।

বুঝলাম। তো এসবের সাথে আমাদের সাইফার হুইলের সম্পর্ক কী?

বলা কঠিন। এখনো এটা নিয়ে কাজ করছি, সাথে সাথে প্রতাঁকের বাকি অংশটা নিয়েও। ওটা একটা বিদেশি ভাষায় লেখা। সবকিছুরই আলাদা আলাদা অর্থ আছে।

আচ্ছা, কিছু পেলে জানিয়ো তবে, বলে কল কেটে দিলো স্যাম।

২১৬

এখন কী? ফোন রাখতেই বলল রেমি। | চলো কোনো পাবে যাই। লাঞ্চ করতে করতে পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে ভাবি।

রাস্তায় নেমে হাঁটা শুরু করতেই এক রোলস-রয়েস এসে দাঁড়ালো তাদের পাশে। গাড়ির পিছন সিট থেকে একটা লোক তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। লোকটার চুলগুলো কালো, তবে কপালের দিকের কিছু অংশ ধূসর হয়ে আছে। তাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে লোকটা। তবে লোকটার চাহনিতে বন্ধুসুলভ কোনো ছাপ নেই।

আপনার নিশ্চয় ফার্গো দম্পতি।

রেমির হাত ধরে তাকে পিছে টেনে আনলো স্যাম। তারপর গাড়িটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনি? চার্লস এভেরি?

হতাশ করতে হলো আপনাদের। না, আমি কলিন ফিস্ক। আপনারাও মনে হয় আমার বসের মতো একই জিনিসের পিছনে ছুটছেন, তাই না?

অরিজিনাল সাইফার হুইলটার পিছনেই তো?

আপনার কথা বুঝতে পারছি না আমি।

যাই হোক, গতকালকের গাড়ি দুর্ঘটনায় আমার লোকদের কেউ মারা যায়নি।

ওটা নিয়ে আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি বলেও মনে পড়ছে না, বলল স্যাম।

নিজে থেকেই জানালাম। নাহলে তোতা দুঃশ্চিন্তায় থাকবেন। যাই হোক, আপনারা মনে হয় মিউজিয়ামের অনুষ্ঠানের কোনো টিকেট পাননি?

আলতোভাবে কাঁধ ঝাঁকালো স্যাম। প্রদর্শনী তো আর একবারই হবে। অন্য সময়েও আসা যাবে। | আহারে। দুঃখ! তবে আমি থাকবো অনুষ্ঠানে।

কথাটা শুনে রেমি কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো, তাই? তা আপনি কিভাবে টিকেট ম্যানেজ করলেন?

এই তো, যোগাযোগের মাধ্যমে। মানুষের সাথে পরিচয় থাকলে আসলে সবই সম্ভব। আর এটা তো মিস করা যাবে না জাতীয় একটা অনুষ্ঠান। আমাকে তো থাকতে হবেই। অবশ্য আমার নাম ফার্গো হলে আলাদা ছিলো। যতদূর জানি এই নামটা কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত। যাই হোক, লন্ডনের ছুটি উপভোগ করতে থাকুন। এখানে কোথায় উঠেছেন? সেভয়তে না?

আপনি কোথায় উঠেছেন?

আপনাদেরটা বাদ দিয়ে অন্য কোনো একটায়। বলে শীতলভাবে হেসে ড্রাইভারকে গাড়ি টেনে নেওয়ার ইঙ্গিত করলো লোকটা।

গাড়িটা চলে যেতেই স্যামের পাশে এসে দাঁড়ালো রেমি। বলল, অস্বস্তি কর ছিলো সাক্ষাৎটা।

২১৭

আমি নিশ্চিত, ইচ্ছা করেই এমনটা করেছে।

আমরা কোথায় উঠেছি তাই বা জানলো কিভাবে? আমরা তো নিজেদের নামে চেক-ইন করিনি।

হয়তো ফাইভ স্টার হোটেলগুলোর তালিকা করে বের করেছে।

আমাদের হয়তো তাহলে এখন থেকে মাঝারি মানের কোনো একটা হোটেলে থাকা উচিৎ, বলে স্যামের হাতের সাথে নিজের হাত পেঁচিয়ে নিলো রেমি। তো, কী যেন লাঞ্চ আর যুদ্ধ পরিকল্পনার ব্যাপারে বলছিলে? আমার মনে হয়, এখন দুটোই দরকার আমাদের। | কাছেধারেই একটা পাৰ খুঁজে পেলো ওরা। ওটাতে গিয়ে মাছ ও চিপসের সাথে দুজনের জন্য দুই পাইট গিনেস বিয়ার অর্ডার করলো। পাবের দেয়ালের সাথে ঘেষে থাকা একটা টেবিলে বসেছে ওরা, যাতে জানালা ও প্রবেশমুখ দুটোর দিকেই নজর রাখা যায়।

খাওয়া শেষে আরেকটা বিয়ার অর্ডার করলো স্যাম। তবে রেমির আর বিয়ার পানের ইচ্ছা নেই। সে তাকিয়ে আছে তাদের টেবিলের পাশ কেটে যাওয়া দুই মহিলার দিকে। দুইজনের কথাবার্তাও কানে আসছে তার। তাদের মধ্যে একজনকে বলতে শুনলো, জানি না তুমি কেন এতো মন খারাপ করে আছো। তোমার এক্সও তো থাকবে ওখানে। ওটা শুধুই একটা বার্থডে পার্টি মাত্র, কয়েকজন আসবে, হ্যাপি বার্থডে গান গাইবে, চলে যাবে। এটুকুই তো। যাই হোক, তোমার খারাপ লাগলে আমিও যাবো না। অবশ্য তুমি হুট করে গিয়ে দেখা দিতে চাইলে আলাদা কথা।

রেমি…? কী বলছি শুনছো তুমি?

স্যামের দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকালো রেমি। স্যরি। না। শুনিনি কিছুই।

বলছি, তুমি চাইলে এখন এটা থেকে সরে যেতে পারো। আমি একাই সামলাতে পারবো। ব্রির ব্যাপারে তো সন্দেহ দূর হয়েছে আমাদের, আর…

| কী বললে? না। বেঁচে থাকতে চার্লস এভেরির মতো লোককে জিততে দিবো না আমি।

এটা কোনো খেলা না। লোকটা আমাদেরকে খুন করার চেষ্টাও করেছে। রেমি আমরা অনুষ্ঠানে যাব। কী?

এই মাত্র বেরিয়ে যাওয়া মহিলাগুলো এক বার্থডে পার্টিতে হুট করে গিয়ে উদয় হওয়া নিয়ে আলাপ করছিলো। আমরাও একই কাজ করতে পারি।

কিছু না বলে চুপ করে রইলো স্যাম। রেমির ব্যাখ্যার অপেক্ষা করছে।

২১৮

গত কয়েকবছরে অনেক ফান্ড-রেইজারকেই পার্টিতে আমন্ত্রণ করেছি আমরা। এদের মধ্যে অনেকেই দাওয়াত পেয়েও আসেনি। আবার দাওয়াত না পেয়েও পার্টিতে এসেছে অনেকজন। হয়নি এমন?

হ্যাঁ, হয়েছে। অনেকবারই হয়েছে এমন।

আমরাও এটাই করবো। খারাপ কী হতে পারে? ধরা পড়ে যাবো? ধরা পড়লে সসম্মানে উলটো ঘুরে ফিরে আসবো। আর ধরা না পড়লে? ধরা না পড়লে কিন্তু ঠিকই ভিতরে ঢুকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটা খুঁজতে পারবো।

.

ভাড়া করা মার্সিডিজের সিট থেকে প্রবেশমুখের দিকে তাকিয়ে আছে স্যাম। বিলাসবহুল গাড়িগুলো থেকে ফর্মাল পোশাক পরা মেহমানদের নামতে দেখছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ কড়াকড়ি। প্রচুর গার্ড দাঁড়িয়ে আছে প্রবেশমুখের সামনে। লিভারেড কর্মীরা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আমন্ত্রণপত্র চেক করছে। আমন্ত্রণপত্র ছাড়া ভিতরে ঢোকা একেবারেই অসম্ভব। এই কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনিতে কারো নজর এড়িয়ে ভিতরে ঢোকা খুব একটা সহজ হবে না।

কিভাবে ঢুকবো? কোনো আইডিয়া আছে? নিরাপত্তার বহর দেখে রেমিকে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

না। কী করবো? এমনভাবে হেঁটে যাবো যেন আমরা এই জায়গার মালিক?

এটাতেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। তাদের মনোযোগটা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া লাগবে। ব্যতিক্রমী কিছু ভাবা লাগবে,..

রাজপরিবারের সদস্যদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়াটা এমনিতেও কঠিন কিছু না।

এখানে কে কে আসছে তা জানো তুমি? গাড়ি থামাতে থামাতে জিজ্ঞেস করলো স্যাম।

অনুষ্ঠানটার নাম অ্যা রয়েল নাইট অ্যাট দ্য মিউজিয়াম। তাহলে তো নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, রাজপরিবারের দুই-একজন সদস্য থাকবেই।

এটা শুধু একটা থিমও হতে পারে।

এক বেয়ারা এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিলো তাদের জন্য। গাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রবেশমুখের সামনে অপেক্ষমান মানুষদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালো ওরা।

স্যাম খেয়াল করে দেখলো যে উপস্থিত মেহমানদের অনেকেই প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। নিশ্চিতভাবেই রেমির দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। অনুষ্ঠানের জন্য রেমি একটি চমৎকার হাত-কাটা কালো সিল্কের গাউন এবং গলায় হীরার একটি নেকলেস পরে এসেছে। নিশ্চিতভাবেই তার রূপের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। এমনকি ভিতরে ঢুকতে পারার চিন্তা বাদ দিয়ে স্যামও তাকিয়ে আছে রেমির দিকে। আসলেই অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে রেমিকে।

তারা দরজায় নাম ঘোষণা করে করে ভিতরে ঢোকাচ্ছে।

রেমির কণ্ঠস্বর শুনে আবারো বাস্তবে ফিরে এলো স্যাম। দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, নাম গোপন করে ঢুকতে চাইলে এটা বেশ সমস্যা করবে আমাদের।

তো, প্ল্যান কি এখন?

ওটা নিয়েই ভাবছি, বলল স্যাম। তবে সত্যি বলতে কোনো পরিকল্পনাই আসছে না তার মাথায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেলো ওরা। তাদের সামনে মাত্র আর দুইটা দম্পতিই আছে।

আইডিয়া পাওয়ার আশায় আশেপাশে তাকালো স্যাম। ঠিক তখনই। দরজায় দাঁড়ানো বেয়ারাকে বলতে শুনলো, স্যার জন কিম্ব্যাল, লেডি কিম্ব্যাল।

স্যাম, ফিসফিসিয়ে বলল রেমি। আমরা প্রায় এসে গেছি কিন্তু।

ওটা চার্লস এভেরির ভাড়াটে লোকটার রোলস-রয়েস না? হুট করে গাড়িটা দেখেই বলে উঠলো স্যাম। ফিস্ক না কী যেন নাম লোকটার?

রেমিও তাকালো গাড়িটার দিকে। হ্যাঁ, দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।

লোকটার কাছে বা তার ড্রাইভারের সাথে পিস্তল থাকার সম্ভাবনা কতটা বলে মনে হয় তোমার?

শতভাগ সম্ভাবনা আছে থাকার।

মাথা ঝাঁকালো স্যাম। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, আর কোনো সুন্দরী, ভীত মহিলা এই তথ্যটা জানলে কী হতে পারে বলে ধারণা তোমার?

এমন কেউ আছে তোমার পরিচিত?

সুন্দরী মহিলা? হ্যাঁ, এমন একজন আছে। তবে ভীত কেউ নেই।

তাই? আচ্ছা, সেটা এখনই জানা যাবে…

দরজার সামনে এসে পৌঁছে গেছে ওরা। দরজায় দাঁড়ানো লোকটা তাদের আমন্ত্রণপত্র দেখতে চাচ্ছে। ঠিক তখনই মু