শার্লোতে এ ব্যাপারে ওতিলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হলো। সেও একবার ক্যাপ্টেনের বিয়ের কথাটা তুলল। তার ধারণা ছিল ক্যাপ্টেন বিয়ে করবে না জীবনে। এডওয়ার্ড একথা একদিন জোর দিয়ে বলেছিল তাকে। শার্লোতে ওতিলেকে এই কথাই বোঝাতে চাইল যে পুরুষমানুষরা সব সময় ধৈর্য ও সংযম সহকারে চলতে পারে না। তারা সব সময় তাদের প্রতিশ্রুতি মেনে চলে না। হয়ত এটা অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলও হতে পারে।
বাগানে, পথে ও পাহাড়ে যে সব উন্নতিমূলক কাজ হচ্ছিল তা যথারীতি চালিয়ে যেতে লাগল শার্লোতে। বাড়ির সংসার খরচ আগের থেকে অনেক কমিয়ে দিয়ে অর্থ সঞ্চয় বাড়িয়ে দিল।
শার্লোতে দেখল বেশ কিছু কাজ হয়ে গেছে। যেমন লেকটা চওড়া হয়ে গেছে। তারপর চারপাশের পাড়গুলোও ঘাসে ঢাকা মনোরম বেড়াবার জায়গায় পরিণত হয়েছে। বাগানের পথটাও তৈরি হয়ে গেছে। আগের থেকে বেশ চওড়া হয়েছে। পাহাড়ের উপর গ্রীবাসের কাজও মোটামুটি শেষ। তবে ওতিলে বাড়ির স্থপতির কাজের খুব একটা প্রশংসা করতে পারল না। এবার কাজের গতি শ্লথ করে দিল শার্লোতে ইচ্ছা করে। কারণ সে চায় এডওয়ার্ড বাড়ি ফিরে যেন কিছু কাজ করার সুযোগ পায়। গোড়ার দিকের কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন হয়ে গেলে শেষের কাজটুকু সম্পন্ন করা অনেক সহজ ও আনন্দদায়ক হবে তার পক্ষে।
তবে আর একটা বড় কাজ করল শার্লোতে। গ্রামের ছেলেমেয়েদের উন্নতির জন্য সে নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য গড়ে তোলা পার্ক ও গ্রাম কি করে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয় তাও শেখাল। গ্রামের একদল ছেলেকে এক রঙের পোশাক করিয়ে দিল। তা পরে তারা পার্ক ও গ্রামের পথঘাট সব নিজেরা পরিষ্কার করবে। গাঁয়ের মেয়েদের সেলাই বোনা ও সুতো কাটার কাজ শিখিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিল শার্লোতে। তাকে এ ব্যাপারে ওতিলেও সাহায্য করল অনেকখানি। এ কাজ করতে গিয়ে ওতিলে ল্যান্সি নামে গাঁয়ের একটি ছোট্ট মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল। মেয়েটি এরপর থেকে তার কাছে কাছেই থাকত সব সময়। ওতিলে আর একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলল। সে হলো বাগানের মালী। এর একটা কারণ ছিল, মালী কথায় কথায় শুধু এডওয়ার্ডের নাম করত। সে কখন ফিরবে জিজ্ঞাসা করত ওতিলেকে। ওতিলেরও তো শুধু একই চিন্তা এডওয়ার্ডকে কেন্দ্র করেই দিনরাত আবর্তিত হয়। সব কাজের মধ্যে, সব বস্তুর মধ্যে সে শুধু এডওয়ার্ডকেই দেখে। এডওয়ার্ড কি ভালোবাসত না বাসত, সে কখন ফিরে কোন কাজটাকে পছন্দ করবে না করবে সে শুধু তাই নিয়ে ভাবত। আর তার সেই নারীর নিরুচ্চার ভাবনাটিকেই বাইরে প্রকাশ করে দিত বাগানের মালী।
ক্যাপ্টেন চলে যাওয়ার পর শার্লোতে যদি ওতিলোকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারত তাহলে তারা আগের মতোই নির্বিঘ্ন নিরাপদ দাম্পত্য জীবন সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারত। অবশ্য তাহলে ওতিলে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয় যেত। কিন্তু ওতিলে তো আজও নিঃস্ব এবং রিক্ত হয়ে গেছে মনে-প্রাণে। আজ তার মনের বায়বীয় শূন্যতা এতদূর বেড়ে গেছে সে তার চাপ তার স্বাভাবিক সংযমের বাধটাকে কাটিয়ে দিতে চাইছে এক ভয়ঙ্কর প্রবলতায়। সারা দিন এটা-সেটা কাজ করে ভুলে থাকার চেষ্টা ওতিলে। কিন্তু রাত্রিতে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতেই তীব্রতর হয়ে ওঠে তার শূন্য অন্তরে জ্বালা আর অশান্ত বেদনাবোধ। সে তখন সিন্দুক খুলে তার জন্মদিনে এডওয়ার্ডের দেওয়া উপহারগুলো বার করে দেখে সে জ্বালার কিছুটা মেটাবার চেষ্টা করে। সে উপহারের কিছুই সে ব্যবহার করেনি আজও।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
অবশেষে এডওয়ার্ডদের বাড়ির মনকষাকষির কথাটা মিটলাবের কানে গিয়ে উঠল। অবশ্য এই মনাকষাকষির ব্যাপারে নীরব নিঃশব্দ এই দাম্পত্য কলহের অবসানের জন্য কেউ তার সাহায্য চায়নি। তবু মিটলার ভাবল পরিবারের পুরনো বন্ধু হিসেবে তার একটা কর্তব্য আছে। তাই মিটলার একদিন নিজেই এডওয়ার্ডের নূতন ঠিকানা যোগাড় করে সেখানে চলে গেল।
বর্তমানে এডওয়ার্ড যেখানে থাকে সে জায়গাটা বড় মনোরম। জায়গা মানে প্রাকৃতিক লীলাভূমির মাঝে এক খামারবাড়ি। সাজানো বাগান দিয়ে ঘেরা। ঢালু উপত্যকাসংলগ্ন একটা প্রান্তরের মাঝখানে শান্তভাবে বয়ে চলেছে একটা নদীর স্রোত। কাছেই পাহাড়। গ্রামগুলো ছাড়া ছাড়া, একটু দূরে দূরে।
মিটলারের কথা মাঝে-মাঝে ভাবত এডওয়ার্ড। তাই তাকে দূর থেকে আসতে দেখে খুশি হলো। মনে মনে ঠিক করে ফেলল যদি তাকে শার্লোতে পাঠায় তাহলে তার কথাগুলো এড়িয়ে যাবে আজেবাজে উত্তর দিয়ে। আর যদি ওতিলে পাঠায় তাহলে সব কথা মন দিয়ে শুনবে। এডওয়ার্ডের ইচ্ছা এই মনোরম পরিবেশে সে একদিন ওতিলেকে নিয়ে একসঙ্গে বাস করবে। আর তা যদি একান্তই সম্ভব না হয় তাহলে সে এই খামারবাড়ি তাকে দান করে যাবে যাতে অন্য কাউকে বিয়ে করে ভবিষ্যতে এখানেই বসবাস করতে পারে ওতিলে।
মিটলার প্রথমে এমন একটা ভাব দেখাল যাতে মনে হবে সে কিছুই জানে না। এডওয়ার্ড যখন জানতে পারল মিটলার নিজের থেকে এসেছে, সে তাদের বাড়ির কোনও খবর জানে না বা কেউ তাকে পাঠায়নি তখন কিছুটা রেগে গেল মনে মনে। মিটলার তাকে এই নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের জন্য বন্ধুভাবে তিরস্কার করল। তখন এডওয়ার্ডও কোনও লুকোচুরি না করে মনের আসল ভাব, আসল আবেগের কথা বলে ফেলল অকুণ্ঠভাবে। সে বলল, আমি এখানে একা একা আছি বটে কিন্তু আসলে আমি সব সময় মনে মনে যুক্ত আছি, মিলিত আছি ওতিলের সঙ্গে। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। শার্লোতেকে আমি তার কাছে যাব না। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলতে চাই। তবু আমি চিঠি লিখি তাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু সে তার উত্তর দেয় না। তবে কি শার্লোতে নিষ্ঠুরভাবে তার কাছ থেকে কোনও প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছে যার জন্য সে আমাকে কোনও চিঠি লেখে না বা কোনও খবর দেয় না? তবে ওতিলে যদি সত্যি সত্যি আমাকে ভালোবাসে তাহলে কেন তবে সে সব বাঁধন ছিঁড়ে পালিয়ে এসে ধরা দিচ্ছে না আমার বাহুপাশে? আমার মনে হয় সে তা পারে। রাত্রিতে ঘুম ভেঙে গেলে ঘরের স্বল্প আলোয় ওতিলের মূর্তি দেখি আমি। অবশ্য আমার স্বপ্নে দেখা তার মূর্তিই হয়ত ছায়ামূর্তি পরিগ্রহ করে আলো-আঁধারি নৈশ পরিবেশে। আগে যখন আমরা এক বাড়িতে থাকতাম, রোজ দেখা হতো আমাদের সঙ্গে তখন রাত্রিতে স্বপ্ন কখনও দেখতাম না তাকে। কিন্তু আজকাল প্রায়ই তাকে স্বপ্নে দেখি। তার রূপ আরও উজ্জ্বল, আরও সুন্দর হয়ে ওঠে স্বপ্নের মাঝে। স্বপ্ন শেষে তার সেই মূর্তি মিলিয়ে যায়। আমি প্রতারিত হই ঠিক কিন্তু এ প্রতারণা বড় মধুর লাগে। বড় ভালো লাগে।
