এসব অতীতের কথা পড়তে কিছুটা ভালো লাগল এডওয়ার্ডের। দুঃখের সময় অতীতচারণা মনের শূন্যতাকে কিছুটা ভরিয়ে দেয়। এডওয়ার্ড প্রতিজ্ঞা করল মনে মনে, যত কষ্টই হোক তার, সে আর প্রাসাদে যাবে না। তার প্রিয়জনের দুঃখের বা চিন্তার কারণ হবে না।
দ্বিতীয় খণ্ড
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
ক্যাপ্টেন যাবার আগে বাড়ি নির্মাণের জন্য একজন স্থপতি নিয়োগ করেছিল। বয়সে যুবক হলেও সুদক্ষ এবং সে ছবি আঁকতে পারে। বলিষ্ঠ লম্বা চেহারা। বলিষ্ঠ অথচ ছিপছিপে। বিভিন্ন জায়গায় যে সব কাজকর্ম চলছিল, স্থপতিই তার দেখাশোনা করত। বিভিন্ন কাজের জন্য প্রায়ই বাড়ির ভিতরে আসতে হতো তাকে। মাঝে মাঝে সে শার্লোতে ও ওতিলের সঙ্গে কথাবার্তায় যোগদান করত। এক-একদিন সন্ধেবেলায় সে তাদের সঙ্গে গল্পগুজবও করত।
একদিন এক স্থানীয় আইনজীবী এসে দেখা করল শার্লোতের সঙ্গে। জনৈক স্থানীয় জমিদার তাকে পাঠিয়েছে। উকিলটিও বয়সে যুবক, বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে তার বক্তব্য তুলে ধরল। তার বক্তব্য হলো চার্চে যাবার পথের দুধারের যেসব পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিফলকগুলো ভেঙে চার্চের ভিতরে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে সেগুলোর পুনর্বিন্যাস করতে হবে। চার্চে যাবার পথটা খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় সে পথকে চওড়া করার জন্য এ কাজ করতে হয়েছে।
শার্লোতে উকিলের কথা শুনে বলল, আমি যা করেছি ঠিক করেছি। মৃত্যুর পর সব মানুষ একসঙ্গে উঁচু-নিচু নির্বিশেষে মিশিয়ে যাবে মাটিতে, কারও কোনও নাম সে মাটির উপর স্মারক হিসেবে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। আপনার বক্তব্যের মধ্যে কোনও যুক্তি নেই। আপনি বলতে চান মৃত্যুর পর সে কোথায় শুয়ে আছে, সেটা জানাবার জন্য স্মৃতিফলকের দরকার আছে। এটা কিন্তু নিছক ভাবালুতার কথা।
স্থপতি বলল, আমরা একটা কাজ করতে পারি। আমরা যাদের স্মৃতিফলক আছে তাদের একটা করে ছবি এঁকে চার্চের একটা ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতে পারি। এতে সব দিক বজায় থাকবে। ছবির মতো অল্প জায়গায় আরও ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে মৃতেরা।
শার্লোতের এতে কোনও অমত নেই। পরদিন ওরা চার্চে গিয়ে দেখল চার্চের গায়ে এক জায়গায় খানিকটা জায়গা খালি পড়ে রয়েছে। সেখানে একটা ঘর করা যেতে পারে স্বচ্ছন্দে। সেই ঘরে ছবিগুলো রাখা হবে। কিভাবে ছবিগুলো আঁকা হবে অতীত পরিবেশের সঙ্গে সংগতি রেখে তার নিদর্শন দেখাল স্থপতি।
এজন্য রোজ সন্ধেবেলায় সে নূতন নূতন ডিজাইন নিয়ে দেখাতে আসততা শার্লোতে ও ওতিলেকে।
চ্যাপেলের ঘরটার নির্মাণকার্য তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসতে লাগল। এই ঘরের চারদিকে চেয়ালে স্থপতি স্বর্গের আকাশনীল পটভূমিকায় দেবদূতের বর্ণাঢ্য ছবি আঁকবে। ঘরখানির সৌন্দর্য তাতে অনেক বেড়ে যাবে। কাজ শেষ করে স্থপতি একদিন শার্লোতে ও ওতিলেকে বলল, আপনারা সাত দিন ওখানে যাবেন না। তারপর যাবেন।
এর আগে কাজের সময় ওতিলে রোজ গিয়ে স্থপতির ছবি আঁকার কাজ দেখত। তাকে পরামর্শ দিত বিভিন্ন বিষয়ে। ছবির প্রতি ওতিলের আগ্রহ দেখে বিশেষ আশ্বস্ত হলো শার্লোতে। এডওয়ার্ডের চিন্তা থেকে তার মনটা যত মুক্ত হয় ততই ভালো তার পক্ষে।
ওতিলেকে একা প্রথমে পাঠিয়ে দিত শার্লোতে। বলল, তুমি গিয়ে আগে দেখে এস। তারপর আমি যাব।
ওতিলে গিয়ে সত্যিই মুগ্ধ হলো স্থপতির কাজ দেখে।
শার্লোতের চিঠির জবাব যথাসময়েই দিয়েছিল এডওয়ার্ড। কিন্তু তারপর অনেকদিন আর কোনও খবর পায়নি তার। তারপর একদিন খবরের কাগজে শার্লোতে এডওয়ার্ডের নাম দেখল। জানল এডওয়ার্ড যুদ্ধে যোগদান করেছে।
কথাটা জেনে মোটেই আশ্বস্ত হতে পারল না শার্লোতে। কারণ তার কেবলি মনে হতে লাগল যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আরও ভোগবাদী ও জেদি হয়ে উঠবে এডওয়ার্ড। তখন সে তার কামনার বস্তুকে ছেড়ে দেবার মতো কোনও উদারতাই দেখাতে পারবে না।
এদিকে এডওয়ার্ডের যুদ্ধে যোগদানের খবরটা জেনে রীতিমতো দুঃখ পেল ওতিলে। স্থপতির আঁকা চিত্রশিল্পের উপর তার নবজাগ্রত আগ্রহ ও অনুরাগ সত্ত্বেও এডওয়ার্ডের অভাবটা নতুন করে অনুভব করল সে।
তবু বাড়িতে একা একা থেকে এই বিচ্ছেদের সব ব্যথা-বেদনাকে সহ্য করে যাচ্ছিল ওতিলে। নির্জনতা যেমন কোনও ব্যথাকে লালন করে তেমনি তার ক্ষতের উপর শান্ত প্রলেপের কাজও করে। কিন্তু হঠাৎ একটা ঘটনার আঘাতে ওতিলের সব নির্জনতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
শার্লোতের মেয়ে লুসিয়ানে বোর্ডিং স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় অনেক লোকজন আনছে। বেশ কিছু আত্মীয়স্বজন আসছে। একটি ধনী সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে, যে প্রচুর সম্পত্তির মালিক সে লুসিয়ানেকে বিয়ে করতে চায়। সেও তার আত্মীয়স্বজন নিয়ে একই সঙ্গে আসছে।
সুতরাং বাড়িতে একসঙ্গে অনেকগুলি অতিথি ও আত্মীয় এসে হাজিল হলো। ওতিলের অস্বস্তি তাতে বেড়ে গেল অনেক। বাড়ির ঝি-চাকরেরা অতিথিদের দেখাশোনার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল ভীষণভাবে।
লুসিয়ানে বড় চঞ্চল প্রকৃতির। সে একবারও চুপ করে বসে থাকতে পারে না। অথচ যে ছেলেটি তাকে বিয়ে করতে চায় সে তার থেকে শান্ত। সে এসেছে শান্ত পরিবেশে তার ভাবি শাশুড়ির সঙ্গে পরিচিত হতে। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে বিয়ের আগেই।
