এডওয়ার্ড আমতা আমতা করে বলল, ওতিলেকে পাঠাতে চাও, ঠিক আছে। পাঠাবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কেন। আরও কিছুদিন পরে পাঠালেই তো চলবে।
শার্লোতে বুঝতে পারল এডওয়ার্ডের এই কুণ্ঠার পিছনে ওতিলের প্রতি তার আসক্তির তীব্রতাই ফুটে বার হয়ে পড়েছে। প্রকট হয়ে পড়ছে এক নগ্ন নির্লজ্জতায়। শান্তভাবে শার্লোতে বলল, নিজের সঙ্গে প্রতারণা করো না এডওয়ার্ড। এখন তোমার বোঝায় সময় হয়েছে। এখনও অনেক আছে। ওতিলেকে তুমি ভালোবাস কিন্তু এই ভয়ঙ্কর ভালোবাসাকে আর এগোতে দেওয়া উচিত নয়। এবার সাবধান হও। নিজেকে। সংযত করো।
এডওয়ার্ডকে চুপ করে থাকতে দেখে শার্লোতে বলল, একবার ভেবে দেখো এডওয়ার্ড, একবার তোমাকে হারিয়ে কত কষ্টে তোমাকে ফিরে পেয়েছি। আমার এই বহুকষ্টার্জিত সুখ, আমার স্বামীকে এভাবে আবার হারিয়ে যেতে দিও না। ওতিলে যদি এভাবে আমার স্বামীকে আমার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয় তাহলে সে কি জীবসে সুখী হবে ভেবেছ? কখনই নয়।
এডওয়ার্ড বলল, তুমি এই চরম কথাটা কেন ভাবছ এখন?
শার্লোতে শান্তভাবে বলল, মানুষের অসংযত উত্তাল প্রেমাবেগ সব সময় তাকে চরম অবস্থা, চরম ঘটনার দিকেই নিয়ে যায় এডওয়ার্ড। কোনও শুভবুদ্ধির কথা সে। শোনে না। তাই তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি আগে হতে।
এডওয়ার্ড বলল, ঠিক আছে তুমি যা করতে চাও করো, আমি বাধা দেব না।
শার্লোতে দেখল এই সুবর্ণ সুযোগ। এডওয়ার্ডের মত যখন একবার হয়েছে তখন। সব ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে পাকা করে নেওয়া উচিত। সেইমত সে ওতিলের যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলল।
এডওয়ার্ড তাকে আর কোনও বাধা দিল না। শুধু একটা অনুরোধ করল। বলল, আমাকে দিনকতক বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে দাও। তাতে আমার মনটা ভালো হবে।
সঙ্গে সঙ্গে শার্লোতে তাতে রাজি হয়ে তার যাবার ব্যবস্থা করে দিল। ঠিক হলো পরদিন অর্থাৎ একই দিনে দুজনেই বিদায় নেবে ঘর থেকে। এডওয়ার্ডের ঘোড়া ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব নিজের হাতে গুছিয়ে দিল শার্লোতে।
যাবার সময় শার্লোতেকে একটা চিঠি লিখে খামের মধ্যে রেখে গেল এডওয়ার্ড। লিখল যে বিপদের কবলে আমরা পড়েছি প্রিয়তমা তার থেকে উদ্ধার পাব কিনা জানি না। তবে আমার মনে হয় একটা কাজ করলে সব দিক রক্ষা পাবে। আমি এখন প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। অবস্থা অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত আমি ফিরব না। প্রাসাদের সব ভার এখন তোমার। তবে তোমাকে আর একটা কাজ করতে হবে। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ বলতে পার। যে কারণে ওতিলেকে দূরে পাঠাতে চাইছিলে তার কারণ যখন দূরীভূত তখন তুমি এবার হতে তাকে নিশ্চিন্তে প্রাসাদের মধ্যেই রাখবে। আমি চাই না। সে অন্য কোনও পরিবেশে গিয়ে থাক। সে বরং তোমার কাছে তোমার স্নেহচ্ছায়ায় থাক। তাতে আমি সুখী হব। আশা করি, তুমি তাকে যথারীতি স্নেহদানে ধন্য করবে। তার প্রতি যত্ন নেবে। আমার প্রেম, আমার ইচ্ছা বা কামনা-বাসনা ও আমার দুঃখের প্রতি তোমার যদি শ্রদ্ধা থাকে তাহলে আমার এ অনুরোধ তুমি রক্ষা করবে। বলা যায় না তাহলে হয়ত একদিন আমার মনের সব ক্ষত সেরেও যেতে পারে।
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
ওতিলে জানালা দিয়ে দেখতে পেল এডওয়ার্ড ঘোড়ায় চেপে চলে যাচ্ছে কোথায়। যেতে পারে, কিন্তু তার বড় বিস্ময় ও বেদানবোধ হচ্ছে এই ভেবে যে আজ সকালে যাবার আগে সে একটা কথাও বলেনি তার সঙ্গে। একথা যতই ভাবতে লাগল ততই অশান্ত হয়ে উছল তার মন।
শার্লোতে সব বুঝতে পেরে ওতিলেকে ঘর থেকে বাইরে বাগানে নিয়ে গেল বেড়াতে। একথা-সেকথা বলে তার মনটা শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। দুপুরে খাবার সময় ওতিলে দেখল শার্লোতে নিজেই টেবিল সাজিয়ে দুজনের খাবার আনল। ক্যাপ্টেন ও এডওয়ার্ডের চলে যাবার পর বাড়িতে খাবার টেবিলে তারা মাত্র দুটি প্রাণী। ওতিলে ভাবল শার্লোতে যখন নিজেই এ কাজ করছে তখন তাকে এ বাড়ি থেকে নিশ্চয় অন্যত্র পাঠিয়ে দেবে সে। এ বাড়িতে আর তাকে থাকতে দেবে না।
খাবার সময় শার্লোতে ক্যাপ্টেনের কথাটা একবার তুলল। বলল, ক্যাপ্টেন অন্য জায়গায় আরও ভালো কাজ পেয়েছে। তার উন্নতি হয়েছে। এবার সে বিয়ে করবে। আপাতত তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো উপায় নেই। ওদিকে ওতিলে ভাবতে লাগল এডওয়ার্ডের কথা। কোথায় গেল সে? তার থেকে এডওয়ার্ডকে কৌশলে বিচ্ছিন্ন করে দেবার জন্যই কি শার্লোতে তাকে কোন দূর দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে? এডওয়ার্ড কি এখন মোটেই আসবে না?
হঠাৎ ওতিলে দেখল এডওয়ার্ডের খাস চাকর তার ঘোড়ার গাড়িটা নিয়ে ফিরে এসেছে। শার্লোতে তার কারণ জানতে চাওয়ায় চাকর বলল, তার মালিকের গোটাকতক ফেলে যাওয়া জিনিস নেবার জন্য সে এসেছে। শার্লোতে বলল যা দেওয়া হয়েছে তাতেই চলে যাবে। অন্য কিছুর দরকার হবে না। আসলে এডওয়ার্ড তার বিশ্বাসী খাস চাকরকে পাঠিয়েছিল ওতিলের সাথে দেখা করে তাকে একটা কথা জানাবার জন্য। কিন্তু সর্বক্ষণ শার্লোতে উপস্থিত থাকায় সে কথা বলার কোনও অবকাশ পেল না এডওয়ার্ডের খাস ভৃত্য।
ওতিলের অবরুদ্ধ দুঃখের আবেগ ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। জীবনে আত্মসংযম কাকে বলে তা সে জানে না। আর তা না জানার জন্য সে আবেগ সংযত করা বা অবদমিত করে রাখা সম্ভব হচ্ছিল তা তার পক্ষে। এমন সময় শার্লোতে তাকে এবার এক জায়গায় বসিয়ে কৌশলে নানারকম গল্পের মাধ্যমে ধৈর্য ও সংযম শিক্ষা দিতে লাগল। ওতিলে মাঝখানে একবার বলল, আচ্ছা পিসি, মদ খেলে সব মানুষই কেমন যেন সংযম হারিয়ে ফেলে। যে মানুষ কম কথা বলে, যুক্তিবাদী, সৌজন্যপূর্ণ, সমদর্শী, আমি দেখেছি মদ খাওয়ার পর সে মানুষ কেমন পাল্টে যায় একেবারে। তার স্বাভাবিক বোধ, যুক্তি, নীতি কোথায় উবে যায় সব।
