তাছাড়া চারদিকের গ্রামাঞ্চল হতে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে লাগল গ্রামের লোক। অনেক ভিখিরিও আসতে লাগল। এডওয়ার্ড এসব আগেই ভেবে রেখেছিল। যাতে কোনও দিকে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার জন্য আগেই সে সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
সমস্ত প্রাসাদটাতে সবুজ পাতা আর ফুল দিয়ে সাজানো হলো। সারাদিন আনন্দে উৎসবে কেটে গেল। দিনের আলো নিবে যেতেই বাড়ির বিশিষ্ট অতিথিরা সবাই। জলাশয়ের ধারে ঘাসের উপর গাছের তলায় সাদা আসনে গিয়ে বসল। সেখানেই তাদের জলখাবার দেওয়া হলো। সেখানে থেকেই তারা সন্ধের সময় বাজি পোড়ানো দেখবে।
সব কাজ সুষ্ঠভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ঘটায় হর্ষের মাঝে বিষাদ নেমে এল। যে নূতন বাধের উপর এক বিরাট জনতা সমবেত হয়েছিল বাজি পোড়ানো দেখার জন্য সেই বাঁধের নরম মাটি মানুষের পায়ের চাপে ধসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জনতার এক অংশ হুড়মুড় করে পড়ে গেল জলাশয়ের জলে। এক প্রবল চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠল সকলে। ক্যাপ্টেন একদল সাহসী লোক নিয়ে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেল। বাঁধের উপর থেকে অবাঞ্ছিত লোকদের সরিয়ে দিল উদ্ধার কাজের সুবিধার জন্য। জলে যারা পড়ে গিয়েছিল সকলকেই অল্প সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে উপরে ভোলা হলো। কিন্তু একটি ছেলে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিল। সে একটা হাত উপরে তুলে ডুবছিল আর এক বার উঠছিল জলের উপর। তাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন পোশাক খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলের উপর। ডুব-সাঁতার দিয়ে তীর বেগে ছেলেটার। কাছে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে নৌকোটাকে কাছে আনার জন্য ইশারা করল। কৌতূহলী জনতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটাকে এনে মাটির উপর তুলতেই সার্জেন এসে তার চিকিৎসা শুরু করে দিল। ছেলেটা জল খেয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়ায় তাকে মরার মতো দেখাচ্ছিল।
এদিকে শার্লোতে এসে এডওয়ার্ডকে বলল, এই দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে বাজি পোড়ানোর উৎসব বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কিন্তু এডওয়ার্ড তাতে রাজি হলো না। বলল, সার্জেন ছেলেটার চিকিৎসার ভার নিয়েছে। আমাদের এ বিষয়ে করার কিছু। নেই। সুতরাং উৎসব বন্ধ করার কোনও যুক্তি নেই।
শার্লোতে ওতিলেকে ইশারায় বাড়ি ফিরতে বলল। ওতিলে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এডওয়ার্ড তার হাত ধরে আটকাল। শার্লোতে আর কোনও কথা না বলে চলে গেল। অতিথিরাও সকলে প্রাসাদে চলে গেল। অবশেষে এডওয়ার্ড দেখল জলের ধারে তারা মাত্র দুজনেই বসে আছে। এমন সময় তার সেই বিশ্বস্ত চাকর এসে জিজ্ঞাসা করল বাজি পোড়ানো শুরু হবে কিনা। এডওয়ার্ড বলল, নিশ্চয় হবে। শুরু করে দাও।
ওতিলে প্রাসাদে ফিরে যাবার জন্য অনুনয়-বিনয় করছিল। কিন্তু এডওয়ার্ড বলল,, তোমার এখন যাওয়া হবে না ওতিলে। তোমার জন্যই এত সব বাজি আমি আনিয়েছি। এ বাড়ির আলোকোজ্জুস তোমাকে দেখতেই হবে। আমি তোমার পাশে বসে থাকব। আজ আমার কত আনন্দ। এইসব গাছ আমি যে বছর বসাই সেই বছরেই তোমার জন্ম হয়। তখনও ছিল এমনি এক দিন আর ঠিক এমনি আবহাওয়া।
বাজি পোড়ানো শুরু হলো। কোনওটা কামানের গর্জন, কোনওটা বজ্রের গর্জনের সঙ্গে আকাশে চকিত আলোর পশরা মেলে আকাশে উঠতে লাগল বাজিগুলো আর তা দেখে এডওয়ার্ডের গা ঘেঁষে আরও ঘন হয়ে উঠতে লাগল ওতিলে। সঙ্গে এডওয়ার্ড সেই রংমশালের আলোর উত্তাপ অনুভব করতে লাগল তার বুকের ভিতরে। তার চোখ-মুখ এক গোপন আশার অদম্য উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
এদিকে প্রাসাদে ফিরে গিয়ে শার্লোতে দেখল সার্জেনের চেষ্টায় ছেলেটির চৈতন্য ফিরে এসেছে। সে খুশি হলো। ক্যাপ্টেন নিরাপদে একটি জীবনকে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচিয়েছে। এতে খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিল ক্যাপ্টেনকে। ক্যাপ্টেনও একা পেয়ে তার যাবার কথাটা জানিয়ে দিল। বলল, পরদিন সকালেই সে চলে যাবে। তার উন্নতির সব কথা এবার প্রকাশ করল শার্লোতের কাছে। শার্লোতেও এটা জানত আগে থেকে। তাই কিছুমাত্র বিস্মিত বা ব্যথিত না হয়ে সে সহজভাবে অভিনন্দন জানাল ক্যাপ্টনকে তারে ভাগ্যোন্নতিতে।
পরে কথাটা এডওয়ার্ডকেও জানানো হলো। কিন্তু এডওয়ার্ডের সমস্ত মন জুড়ে তখনও লেগে ছিল শুধু উৎসবের রং আর ওতিলের চিন্তা।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
পরদিন সকালেই ক্যাপ্টেন চলে গেল বাড়ি থেকে। যাবার সময় একটা চিঠিতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেল এডওয়ার্ডের প্রতি। ক্যাপ্টেনের প্রতি এক গোপন আসক্তির প্রবলতা সত্ত্বেও তার স্বভাবসুলভ আত্মসংযমের দ্বারা অতি সহজেই বিচ্ছেদের সব ব্যথা দমন করে ফেলল শার্লোতে। সে জানত আর কোনওদিন দেখা হবে না তার ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। তবুও কোনওরূপ বিচলিত না হয়ে বিদায় দিল আকাঙ্ক্ষিত প্রেমিককে।
শার্লোতে চাইছিল তার মতো এই আত্মসংযম, এই মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় সকল প্রেমিকেরই দেওয়া উচিত। জীবনে যা শ্ৰেয় আর জীবনে যা প্রেয় তার সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধন করে চলতে শেখা উচিত। এবার শার্লোতে ঠিক করে এডওয়ার্ডকে খোলাখুলি সব কথা বলে তাকে সাবধান করে দেবে। তাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিবে তার এই অবৈধ আত্মঘাতী প্রেমের খেলা কোথায় কোণ অশুভ পরিণতির দিকে নিয়ে চলেছে তাকে।
এডওয়ার্ডকে একা এক জায়গায় বসিয়ে শার্লোতে তাকে বলল, ক্যাপ্টেন চলে গেছে। এবার ওতিলের যাবার ব্যবস্থা করা হোক। আমার মেয়েকে বোডিং হাউস থেকে এনে তার জায়গায় ওতিলেকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। আমরা যেমন ছিলাম তেমনি আবার দুজনে দুজনের খুব কাছে আসতে পারব এডওয়ার্ড।
