এডওয়ার্ড ভাবতে লাগল এই পথের কাজ শেষ হলে ওতিলে এই পথ দিয়ে কত যাওয়া-আসা করবে। পথের ধারে সিমেন্টের আসনে বসে বিশ্রাম করবে। পাহাড়ের উপর গ্রীষ্মবাসটার কাজ শেষ হয়ে গেলে সেখানেও মাঝে মাঝে থাকবে ওতিলে। একমাত্র ওতিলেকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে যেন তার সকল কর্মতৎপরতা। ওতিলের জন্যই কাজগুলো যথাশীঘ্র শেষ করার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠল এডওয়ার্ড। শার্লোতে ও ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আলোচনা করে আরও বেশি লোক লাগাল, যদিও সে বুঝতে পারল নিজে বেশি তাড়াতাড়ি করতে গেলে কাজ খারাপ হবে।
ওতিলের প্রতি এডওয়ার্ডের আসক্তি এবং তাদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরাল তা দিনে দিনে বেড়ে যাওয়ায় মনে মনে চিন্তিত হয়ে উঠল শার্লোতে। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এ নিয়ে কিছু আলোচনাও করল সংযতভাবে। তারপর ওতিলের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করল। এমন ব্যবস্থা করল যাতে সে একা একা না থাকতে পারে, যাতে তাকে নিয়ে মানুষের কাছে থাকতে হয়।
ওতিলেকে দূরে পাঠাতে হবে। কাছাকাছি দুজনে থাকলে ওরা কিছুতেই সংযত করতে পারবে না নিজেদের। তাই তার জন্য একটা পরিকল্পনাও খাড়া করে ফেলল শার্লোতে। ও ঠিক করল ওর মেয়ে ন্যাসিয়ানেকে বোর্ডিং থেকে নিয়ে আসবে এবং তার জায়গায় পাঠাবে ওতিলেকে। ওদিকে তখন ক্যাপ্টেনও তার নূতন কাজের জায়গায় চলে যাবে। এইভাবে সে আগের মতোই তার স্বামীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাবে। এই সাময়িক যত সব পারিবারিক অশান্তির অবসান ঘটবে নিঃশেষে।
এদিকে ওতিলের অদর্শন অসহ্য হয়ে উঠল এডওয়ার্ডের কাছে। সে দেখল কোনও সময়েই ওতিলোকে একা পাওয়া বা তার সঙ্গে কথা বলা একরকম অসম্ভব হয়ে উঠেছে তার পক্ষে। একদিন সে চিঠি লিখে ওতিলেকে কোনওরকমে পৌঁছে দিল। ওতিলেও সে চিঠির জবাব দিল। অসাবধানতাবশত চিঠিটা পড়ে গেল তার হাত থেকে এবং সেটা শার্লোতের হাতে পড়ল। ওতিলের হাতের লেখাটা এডওয়ার্ডের মতো বলে সে সেটা এডওয়ার্ডের চিঠি ভেবে তার হাতেই দিল।
ক্রমশই এডওয়ার্ডের মেজাজটা খিটখিটে হয়ে উঠল। একদিন ওতিলের কাছে স্পষ্ট শার্লোতের উপর তার অযথা ক্রোধ প্রকাশ করল। ওতিলেও অন্যায়ভাবে ক্যাপ্টেনের নিন্দা করতে লাগল। এডওয়ার্ড মিথ্যা করে বলল, শার্লোতে ক্যাপ্টেনের প্রতি আসক্ত এবং সে নিজেই বিবাহবিচ্ছেদ চায়। ওতিলে বলল ক্যাপ্টেনও লোক ভালো হয়। সে এডওয়ার্ডের বাঁশি বাজানোর নিন্দা করে প্রকাশ্যে। ওতিলে চায় শার্লোতের সঙ্গে এডওয়ার্ডের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলেই তার স্ত্রীর শূন্য আসনে বসবে সে। তার। সুখের পথে আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে সব বাধা অপসারিত হয়ে যাবে।
এডওয়ার্ড যাই ভাবুক, শার্লোতে কিন্তু তার প্রতিজ্ঞায় অটল। ক্যাপ্টেনের প্রতি তার ক্রমবর্ধমান প্রেমাসক্তির কথা ভেবেই ওতিলের প্রতি ক্রমশই কঠোর হয়ে উঠেছিল সে। সে তাই ভেবেছিল। তার মতো আত্মসংযম ওতিলের নেই। সে বয়সে তরুণী। এই প্রেমাসক্তিকে বেশি বাড়তে দিলে তার পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ। সে তাই যথারীতি ওতিলেকে এডওয়ার্ডের কাছ থেকে দূরে দূরে রাখতে লাগল।
ক্যাপ্টেনের নিয়োগপত্র এসে গেল। দুখানি চিঠি খামের ভিতর ছিল। একটিতে ক্যাপ্টেনকে সব পরিকল্পনা রূপায়িত করতে হবে তার সব ছক লেখা ছিল। তার একখানি চিঠিতে ছিল ক্যাপ্টেনকে যে বেতন ও সুবিধা-সুযোগ দেওয়া হবে তার পূর্ণ বিবরণ।
ক্যাপ্টেন কিন্তু একথা বাইরে প্রকাশ করল না কারও কাছে। সে আগের মতো কাজকর্ম যথারীতি করে যেতে লাগল। এদিকে ওতিলের জন্মদিন এগিয়ে আসায় তার কাজ অনেক বেড়ে গেছে। এডওয়ার্ডের ইচ্ছা পাহাড়ের উপর যে গ্রীষ্মবাস নির্মিত হচ্ছে তার কাজ ঐ দিনের আগেই শেষ হওয়া চাই। তাতে যত বেশি লোক দরকার নিয়োগ করা হোক।
ক্যাপ্টেন একটা পরামর্শ দিল এডওয়ার্ডকে। তিনটে জলাশয় এক করে একটা হ্রদে পরিণত করার কোনও পরিকল্পনা যেন গ্রহণ করা না হয়। এর বদলে ছোট জলাশয়টার কিছু উন্নতিবিধান করা উচিত আর মাঝের জলাশয়টা একেবারে বুজিয়ে ফেলা উচিত। তবে এর পরামর্শ মানা নির্ভর করে এডওয়ার্ডের মর্জির উপর।
এডওয়ার্ড এখন ওতিলের জন্মদিনে তাকে কি কি উপহার দেবে তাই নিয়ে ব্যস্ত। এ বিষয়ে সে শার্লোতের উপর মোটেই নির্ভর করতে পারবে না। কারণ শার্লোতে তাকে যে সব জিনিস কিনতে বলেছে তা খুবই নিম্নমানের। তাই এ ব্যাপারে তার এক বিশ্বস্ত চাকরের উপর ভর দিয়েছে। সেই চাকর শহরের এটা বড় পোশাকের দোকানে। অনেক নূতন ফ্যাশনের পোশাকের অর্ডার দিয়েছে। এই চাকরই আবার এডওয়ার্ডকে পরামর্শ দিয়েছে ঐ দিন জলাশয়ের ধারে সন্ধের সময় বাজি পোড়ানোর ব্যবস্থা করতে। নানা রকমের রং-বেরঙের বাজি ছাড়া হবে জলাশয়ের এধার থেকে আর ওধার থেকে সমবেত দর্শকরা দেখবে আর সেই সব জ্বলন্ত বাজির প্রতিফলন পড়বে জলাশয়ের জলে।
পরামর্শটা সানন্দে গ্রহণ করল এডওয়ার্ড। সেই মতো ব্যবস্থাও সব হয়ে গেল।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
অবশেষে এডওয়ার্ডের সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি এসে গেল। সকাল থেকে নিমন্ত্রিত অতিথিদের আসা শুরু হয়ে গেল। বিশেষ করে যারা শার্লোতের জন্মদিনে বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর উৎসবে যোগ দিতে পারেনি, তারা সব এল।
