অবশেষে অতিথিদের যাবার সময় হলো। ওরা গিয়ে গাড়িতে উঠল।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
সেদিন অতিথিরা চলে গেল দুপুরে খাওয়ার সময় তাদের সমালোচনা করতে লাগল এডওয়ার্ড। শার্লোতে তাতে কিন্তু যোগ দিল না। চুপচাপ গম্ভীরভাবে খেয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ এডওয়ার্ড বলল, আজ একটা নৌকো ভাড়া করেছি বেশি টাকা দিয়ে। বিকালে লেকে বেড়াতে যাব। তৈরি হয়ে নাও।
ওরা তিনজনে বেরিয়ে পড়ল যথাসময়ে। ওতিলে কাজ নিয়ে বাড়িতেই রইল। লেকের ধারে গিয়ে পপলার গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে এডওয়ার্ড বলল, এইখানে একটা বসার জায়গা করতে হবে। যারা বেড়াতে আসবে লেকে তারা যাতে ভালোভাবে বসতে বা বিশ্রাম করতে পারে তার জন্য শান বাঁধানো একটা বড় বেদীর মতো জায়গা করে দিতে হবে।
নৌকোর উপর শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন উঠে পড়ল। এডওয়ার্ড সব শেষে উঠে দাঁড় ধরল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে সে ব্যস্ত হয়ে ক্যাপ্টেনের হাতে দাঁড়টা দিয়ে নেমে পড়ল। বলল, বাড়িতে একটা জিনিস ভুলে এসেছি। আমি বাড়ি যাচ্ছি। তোমরা যাও।
বাড়িতে এসে এডওয়ার্ড দেখল ওতিলে তখনও কাজ করছে। ওতিলেকে তার ঘরে খবর দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল এডওয়ার্ড। এই হচ্ছে প্রশস্ত সময়। বাড়িতে কেউ নেই। অবশেষে ওতিলে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে তরল ওতিলেকে। ওতিলেও যেন এই মুহূর্তটির জন্য প্রতীক্ষায় ছিল। সেও দুহাতে এডওয়ার্ডের গলাটা জড়িয়ে ধরল। এরপর দুজনে মুখোমুখি বসে নির্বিঘ্নে গল্প। করতে লাগল।
এদিকে এডওয়ার্ড নৌকো থেকে নেমে গেলে ক্যাপ্টেন নৌকো ছেড়ে দিল। নিজেই দাঁড় বেয়ে নিলে চলল। ক্যাপ্টেনের কাছে বসে ছিল শার্লোতে। কোনও কথা বলছিল না সে। ক্যাপ্টেন তাকে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা শুধু বোঝাচ্ছিল আর সে তা অন্যমনস্কভাবে শুনে চলেছিল।
হঠাৎ এক সময় শার্লোতে বলল, নৌকো ফেরান। বাড়ি ফেরা যাক। সন্ধে হয়ে আসছে।
সত্যিই তখন সূর্য ডুবে গেছে সারবন্দী পপলার আর পাইন গাছের ওপারে। গোধূলির ধূসর ছায়ায় আরও কালো হয়ে উঠেছে লেকের শান্ত জল। ক্যাপ্টেন দেখল ওরা অনেকটা চলে এসেছে। নৌকোটা ঘুরিয়ে কূলের দিকে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে ছেড়েছিল সেইখানে ফিরে যাবার জন্য চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জায়গাটা ঠিক করতে পারল না। অবশেষে সন্ধে হয়ে যেতে শার্লোতে থামবার কথা বলতে এক জায়গায় থামাল নৌকোটা। কিন্তু সেখানে জল। জলে নেমে তারপর কাদার মধ্যে দিয়ে পাড়ে যেতে হবে। ক্যাপ্টেন বলল, দাঁড়ান, আমি আগে নামি। তারপর আপনাকে তুলে পার করে দেব।
ক্যাপ্টেন আগে নিজে নামল জলকাদার মধ্যে। তারপর দুহাত বাড়িয়ে শার্লোতেকে তুলে নিল। শার্লোতেও তার গলাটা জড়িয়ে ধরল আবেগের সঙ্গে। শার্লোতের ভালো লাগছিল। ক্যাপ্টেন তাকে এইভাবে অনেকটা নিয়ে গিয়ে তবে খানিকটা শক্ত মাটি পেল। তাদের অব্যক্ত প্রেম এই দেহগত স্পর্শের নিবিড়তার মধ্যে এক ভাষাহীন নীরবতার বাজয় হয়ে উঠল। উত্তাল হয়ে উঠল রোমাঞ্চ ও শিহরণের মধ্যে।
শার্লোতেকে নামিয়ে দিয়ে ক্যাপ্টেনও সামলাতে পারল না নিজেকে। দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চুম্বন করল তাকে। এইভাবে আলিঙ্গন ও চুম্বনে অবাধে বেশ কিছুক্ষণ আবদ্ধ হয়ে রইল ওরা দুজনে। তারপর ক্যাপ্টেন হঠাৎ নিজের ভুল বুঝতে পেরে নতজানু হয়ে শার্লোতের একটা হাত টেনে নিয়ে বলল, ক্ষমা করো শার্লোতে। আবেগের বশে ভুল করে ফেলেছি।
শার্লোতে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল স্থির হয়ে। শার্লোতে শান্তভাবে বলল, আমাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রে আজকের এই ঘটনার যেন কোনও গুরুত্ব না থাকে। কাউন্ট তোমার কাজের চেষ্টা করছে। শীগগির তুমি এখানে থেকে চলে যাচ্ছ। এতে আমি একই সঙ্গে আনন্দ আর বেদনা অনুভব করছি। তুমি কাছে থাকলে আমার ক্ষতি হতো। নিজেকে সংযত করা কঠিন হতো ক্রমশ। আবার তুমি দূরে চলে গেলেও ব্যথা পাব মনে। যাই হোক, এখানেই সব কিছুর শেষ হোক। এখন বাড়ি চলো।
বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন ক্ষমা চাইল এডওয়ার্ডের কাছে। কিন্তু এডওয়ার্ডের মনে হলো ওরা তাড়াতাড়ি ফিরেছে।
এয়োদশ পরিচ্ছেদ
সেদিন লেক থেকে বেরিয়ে এসে রাতে শুতে যাবার সময় মনে মনে বেশ হাল্কা বোধ করছিল শার্লোতে। তার স্বভাবসিদ্ধ শান্ত সংযত হৃদয়সমুদ্রে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তার সাময়িক সামান্য এই দেহগত স্পর্শের ব্যাপারটা কোনও বিক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারল না। তার শোবার ঘরে ঢুকেই তার মনে হলো সে মনেপ্রাণে এডওয়ার্ডের স্ত্রী। গতকাল তার এই ঘরেই তার স্বামী রাত কাটিয়ে গেছে। শান্ত মনে শুয়ে পড়ল শার্লোতে।
এদিকে এডওয়ার্ডের ঘুম এল না কিছুতেই। আজ বিকালে ওতিলের আলিঙ্গনে ও চুম্বনের মাধ্যমে তার দেহগত স্পর্শের যে মাধুর্য লাভ করেছে তাতে মাতাল হয়ে উঠেছে তার দেহমন। আকাশে চাঁদ উঠতেই সে উপর থেকে নেমে নিচে গেল। ওতিলের ঘরের জানালার নিচে একটা বেঞ্চের উপর বসে বসে ভাবতে লাগল। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল এডওয়ার্ড।
খুব সকালেই ঘুম ভাঙল তার। ঘুম ভাঙতেই দেখল শ্রমিকরা আসতে শুরু করেছে। লোক আসতেই তাদের কাজে লাগিয়ে দিয়ে বিশেষ ব্যস্ততার সঙ্গে দেখাশোনা করতে লাগল। তখনও বাড়ির কেউ ওঠেনি।
