কাউন্টপত্নী কৌশলে এডওয়ার্ডের সঙ্গে এমন সব কথা বলছিল যাতে ওতিলের প্রতি এডওয়ার্ডের দৃষ্টিভঙ্গিটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। একবার খাবার টেবিলে সবার সামনে ওদের বাড়ির সামনের শরৎকালে বেড়াতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করল এডওয়ার্ডকে। বলল, শার্লোতেকে নিয়ে বর্ষার সময় অবশ্যই যাবেন।
এডওয়ার্ড তখন সকলের সামনেই কাউন্টপত্নীকে জিজ্ঞাসা করল, ওতিলে তাদের সঙ্গে যেতে পারবে কি না? কাউন্টপত্নী বলল, সেটা আপনার ইচ্ছা, আপনি আর কাকে সঙ্গে নেবেন না নেবেন আমি তার কি জানি?
সেদিন রাত্রিতে নৈশভোজনের পর এডওয়ার্ড কাউন্টের ঘরে গিয়ে তাদের যৌবনকালের গল্প করছিল। কাউন্ট একবার বললেন, তোমার মনে আছে, যৌবনে শার্লোতের পা দুটো কত সুন্দর ছিল?
এডওয়ার্ড আবেগের সঙ্গে বলল, অতীত কেন, আজও ওর পাদুটো সত্যিই সুন্দর এবং ওর পা কেন আমি ওর জুতোও চুম্বন করতে পারি।
কাউন্ট তাচ্ছিল্যভরে ভরে হেসে উঠলেন আনন্দে।
হাসি থামিয়ে একসময় কাউন্ট একটা অনুরোধ করলেন এডওয়ার্ডকে। বললেন, এখন কাউন্টপত্নী কোথায় আছে?
এডওয়ার্ড বলল, এখন মেয়েরা সব এক জায়গায় আছে। কিছুক্ষণ পর আপন আপন ঘরে শুতে যাবে।
কাউন্ট বললেন, কাউন্টপত্নীর ঘরে আমাকে একবার নিয়ে যাবে? সকাল থেকে আমরা নিরিবিলিতে একবারও দুজনে কোনও কথা বলতে পারিনি।
এডওয়ার্ড একটা জ্বলন্ত বাতি হাতে করে কাউন্টকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বাড়ির মধ্যে কত ঘর। কত গোপন দরজা। যে ঘর-দরজা একমাত্র এডওয়ার্ডের পক্ষেই নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব। কাউন্টপত্নীর নির্জন ঘরে কাউন্টকে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে অন্ধকারে ঘরের বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল এডওয়ার্ড।
তারপর তার নিজের ঘরে ফেরার পথে ওতিলের ঘরটার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করল। দেখল, ওতিলে তখনও তারই দেওয়া কাজ করে চলেছে। এডওয়ার্ডের প্রথম ইচ্ছা হচ্ছিল, ওতিলে একবার তার ঘর থেকে নির্জন বারান্দার অন্ধকারে এলেই তাকে জড়িয়ে ধরবে নিবিড়ভাবে।
কিন্তু ওতিলে এল না। ওতিলেকে না পেয়ে শার্লোতের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল এডওয়ার্ড। দেখল তার ঘরের দরজা বন্ধ। বন্ধ দরজার উপরে মৃদু করাঘাত করল। এদিকে শার্লোতে শুনতে পেয়ে বিশ্বাস করতে পারল না তার স্বামী এসে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরের বাইরে। কারণ আজকাল এডওয়ার্ড তার ঘরে মোটেই আসে না।
শার্লোতে একবার ভাবল ক্যাপ্টেন গোপনে দেখা করতে এসেছে তার সঙ্গে। কিন্তু ক্যাপ্টেন সে ধরনের মানুষ নয়। তার কথা ভেবে বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল গোটা অন্তরটা। তারপর ভাবল হয়ত কাউন্টপরী ও ওতিলে কোনও দরকারে কিছু চাইতে এসেছে। যাই হোক, এটা-সেটা ভাবার পর দরজা খুলে দিল। এডওয়ার্ডকে অকস্মাৎ তার ঘরের সামনে দেখে আশ্চর্য হলো। পোশাক খুলে শুতে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল শার্লোতে। খালি গা, জাঙিয়টা শুধু পরনে ছিল। এডওয়ার্ডকে ঘরে ঢুকতে দেখে খাটের কাছে একটা চেয়ারে গিয়ে বসল। এডওয়ার্ড হঠাৎ নতজানু হয়ে বলল, আজ আমি বন্ধুর কাছে শপথ করেছি শার্লোতে, তোমার পায়ের জুতো ও পা আমি চুম্বন করব।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সত্যি সত্যিই এডওয়ার্ড তা করল। শার্লোতে বাধা দিয়ে তাকে নিবৃত্ত করতে পারল না। শার্লোতে ভেবেছিল সাময়িক আবেগের একটা উচ্ছ্বাসের বশে তার ঘরে এসে পড়েছে এডওয়ার্ড এবং একটু পরেই সে চলে যাবে। কিন্তু এডওয়ার্ড গেল না। উল্টে ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে তার হাত ধরে বিছানার উপর উঠে গেল। দুজনে দুজনকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। পরস্পরকে বাহুবন্ধনে পরস্পরকে নিবিড়ভাবে ধরা দিলেও অন্ধকারে কেমন যেন সব একাকার হয়ে গেল।
যতক্ষণ ঘরে আলো জ্বালা ছিল ওরা দুজনে বেশ জানত ওদের সামনে কে রয়েছে, ওদের মনের মধ্যে যাই থাকুক। ওদের মনের গোপন কোণে অবৈধ কামনার যে কুটিল সাপটা লুকিয়ে ছিল তা অন্তত বাইরে আসার সাহস পায়নি। কিন্তু আলোটা নিবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের দাম্পত্য সম্পর্কে সব বন্ধন আর তার জলজ্যান্ত পার্থিবতাটা উবে গেল মুহূর্তে। সঙ্গে সঙ্গে মনের গোপন গর্ত থেকে কামনার সেই কুটিল সাপটা বেরিয়ে এল স্বচ্ছন্দে। জড়িয়ে ধরল দুজনকেই। শার্লোতের মনে হলো তার পাশে এডওয়ার্ড শুয়ে নেই, তার বদলে শুয়ে আছে তারই আকাক্ষিত নায়ক ক্যাপ্টেন আর এডওয়ার্ডের মনে হলো সে শার্লোতের মধ্য দিয়ে ওতিলেকেই আলিঙ্গন করছে, আসলে তার কাম্য নায়িকার দেহকে ভোগ করছে।
এইভাবে একদিকে বাস্তব ও কল্পনার সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ চলতে লাগল ওদের দাম্পত্যশয্যায়। এদিকে রক্তমাংসের বাস্তব মানুষ আর একদিকে আবেগ ও অনুভূতির রসে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত এক কল্পনা।
প্রাতরাশের টেবিলে দেখা গেল কাউন্ট ও কাউন্টপত্নী নববিবাহিত দম্পতির মতোই কেমন যেন হাসিখুশিতে সজীব। অথচ এডওয়ার্ড ও শার্লোতের মুখ দুটো। কেমন যেন শুকনো দেখাচ্ছিল। ওদের দুজনেররই মনে হচিচ্ছল ওরা যেন গতকাল রাতে গোপনে এক অপরাধ করে ফেলেছে। সেই গোপন অপরাধচেতনার নিম্নচাপে মুষড়ে পড়েছিল ওরা অস্বাভাবিকভাবে। বিশেষ করে এডওয়ার্ড যখন ওতিলের দিকে। আর শার্লোতে যখন ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাচ্ছিল তখন ওদের অবদমিত সেই অপরাধ চেতনাটা প্রকট হয়ে উঠছিল ওদের শুকনো মুখে।
