কিন্তু কাউন্ট বললেন অন্য কথা। তিনি বললেন, আমরা সাধারণত বৈবাহিক সম্পর্কটাকে অক্ষয় ও অচ্ছেদ্য বলে মনে করি। মিলনান্ত নাটক দেখে আমাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এই সব নাটকে দেখানো হয় বিয়েটাই যেন তাদের প্রেমের একমাত্র উদ্দেশ্য।
নায়ক-নায়িকার মিলন একমাত্র শুভ পরিণয়ে পরিণত হলেই যবনিকাপাত হয় কিন্তু জীবনটা নাটক নয়। সেখানে বিবাহিত জীবনের যবনিকার অন্তরালে অনেক দৃশ্যই সকলের অলক্ষে অগোচরে অনুষ্ঠিত হয়। পরে যবনিকা উঠলে দেখি সে প্রেমের আর কোনও কিছু অবশিষ্ট নেই।
শার্লোতে প্রতিবাদের সুরে বলল, সব ক্ষেত্রেই এটা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিবাহের রঙ্গমঞ্চে দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে অনেকে মঞ্চ ছেড়ে চলে। গিয়েও পরে আবার ফিরে এসে সেই একই ভূমিকায় অভিনয় করেছে।
কাউন্ট বললেন, তা হয়ত করেছে। কিন্তু আপনি দেখবেন জগতে অনেক কিছুই পরিবর্তনশীল তখন সেই ব্যাপক পরিবর্তনশীলতার মাঝে বিয়েটা যদি অক্ষয় অপরিবর্তনীয় একটা কিছু হয়ে যায় তাহলে সেটাকে অবশ্যই আমাদের বেখাপ্পা লাগবে মাঝে মাঝে।
এবার কাউন্ট এডওয়ার্ডকে লক্ষ করে বললেন, তবে অবশ্য আমি তোমাদের বিয়ের কথা বলছি না। তোমাদের এই পুনর্মিলনে আজ আমি যেমনি খুশি হয়েছি, তেমনি যখন তোমাদের প্রথম প্রেম ব্যর্থ হয়, তোমরা যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড় পরস্পর থেকে তখন আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই মনে। তোমরা যখন নাচের আসরে নাচতে দুজনে তখন তোমাদের খুব ভালো লাগত, তোমাদের জুটি ছিল চমৎকার। এডওয়ার্ডের বাবা যখন জোর করে ওর অন্যত্র বিয়ে দেয় তখন আমি এডওয়ার্ডকেই দোষ দিয়েছিলাম। আমি ওকে আরও শক্ত হতে বলেছিলাম।
কাউন্টপরী বলল, এ বিষয়ে আমি শার্লোতেকেও দোষ না দিয়ে পারছি না। কারণ আমি বেশ তখন লক্ষ করেছি ও এডওয়ার্ডকে ভালোবাসলেও মাঝে মাঝে ওর নজর অন্যদিকে ঘোরাফেরা করত যার জন্য এডওয়ার্ডকে বেশ কিছুদিন দেশভ্রমণে ঘুরে বেড়াতে হয়। অবশ্য ওর ভালোবাসায় নিষ্ঠার অভাব খুব একটা ছিল না।
কাউন্ট বললেন, আসল কি জান, মেয়েরা যাকে একবার ভালোবাসে তার প্রতি তাদের আসক্তির অনুভূতিটা বিচ্ছেদের দ্বারা বিকৃত বা বিলপ্ত হয় না। তা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে তাদের মনে।
কাউন্টপত্নী বলল, এতে তোমারাও কম যাও না।
কাউন্ট এডওয়ার্ডকে আবার বললেন, শার্লোতে প্রথম স্বামীর মত্যু আর তোমাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের এই বিবাহ তোমাদের অমর প্রেমের বিজয়পতাকাকে উড্ডীন করেছে নূতন করে। তবে অবশ্য সব বিবাহই ভালো নয়। অনেকের বিয়ের পর দেখতে একজন স্বেচ্ছাচারী ওয়ে ওঠে। বিয়েটাকে ব্যভিচারের ছাড়পত্র হিসাবে গণ্য করে। মানুষ তার প্রতিশ্রুতির কথা রাখবার চেষ্টা করে, কিন্তু পরিবর্তনশীল জগৎ, উদাসীন জগৎ মানুষের কোনও কথা রাখতে চায় না। সব ধুয়ে-মুছে ভেঙে-চুরে দিতে চায়।
শার্লোকে ওতিলের সামনে তাদের বিবাহ সম্পর্কে এই সব কথা আলোচনা করতেও চাইছিল না। এর আগে একবার কৌশলে সে প্রসঙ্গটা পাল্টাবার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়। কাউন্টও তার ইচ্ছার কথাটা ঠিক করতে পারেননি। শার্লোতে এবার প্রসঙ্গটা পাল্টাবার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে বলল, দেখুন, অতীতের কথা ঘাঁটাঘাঁটি করে আর কোনও লাভ নেই। বিয়ের ব্যাপারে কে কি করে, কে কতটা বিশ্বস্ত তা আমাদের দেখার দরকার নেই। তবে আমরা যতদূর সম্ভব আমাদের দাম্পত্য সম্পর্কের শূচিতা রক্ষা করে চলার চেষ্টা করি। আমাদের কথা রাখার চেষ্টা করে চলি। এইটুকুই শুধু বলতে পারি। অতীতে যে যা করেছি তা আর ফিরবে না। এখন ওকথা বাদ দিন।
এবার কাউন্ট বুঝতে পেরে চুপ করলেন। এরপর ঠিক হলো ক্যাপ্টেন আসার পর থেকে ওরা যে সব নূতন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এ অঞ্চলের পথঘাটের উন্নতির জন্য তা অতিথিদের দেখানো হবে। ওদের প্রাসাদের চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো অতিথিরা ঘুরে দেখবেন।
ওতিলে ঘরে রইল। তার দোষ নেই। সে এডওয়ার্ডের দেওয়া কাজ একমনে মলে করছিল। কারখানা বিক্রির কাগজপত্র এখনও সব তৈরি হয়নি। ও তাই করছিল।
ক্যাপ্টেন ওদের সঙ্গে গেল। ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে নদীর ধার দিয়ে সোজা পাহাড়ের উপর যে বাড়ি তৈরি হচ্ছিল সেখান পর্যন্ত গেল। সত্যিই জায়গাটা চমৎকার লাগল ওদের। এডওয়ার্ড ওদের চারদিকে আঙুল দিয়ে দেখাতে লাগল। পাথর ভেঙে এগিয়ে যাওয়া শীর্ণ নদী, জলাশয়ের স্বচ্ছ জল, প্রাসাদসংলগ্ন পপলার আর পাইন গাছের সাজানো বাগান আর এদিকে পাহাড়সংলগ্ন ঘন বন, সব মিলিয়ে এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য বড় মনোরম।
ক্যাপ্টেন নক্সাটা আনতে ভুলে গিয়েছিল বলে প্রাসাদে ফিরে গেল। এতক্ষণ সে মুখেই কাউন্টকে বোঝাচ্ছিল পরিকল্পনাটা। ক্যাপ্টেন চলে যেতে কাউন্ট শার্লোতের সঙ্গে এবং এডওয়ার্ড কাউন্টপত্নীর সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
কথায় কথায় কাউন্ট একসময় শার্লোতেকে বললেন, ক্যাপ্টেন ভদ্রলোক সত্যিই খুব কাজের লোক, গুণী লোক। এখানে বেচারা শুধু পড়ে আছে। আমি ওকে ভালো জায়গায় কাজের ব্যবস্থা করে দেব। এখনি ওর কাজের ব্যবস্থা করে চিঠি লিখে লোক পাঠাব এক জায়গায়।
কথা নয়, যেন শেল বিধল শার্লোতের কানে। ক্যাপ্টেন এত তাড়াতাড়ি তাদের বাড়ি থেকে চলে যাক এটা সে চায়নি। কোনও বহিঃপ্রকাশ না থাকলেও ক্যাপ্টেনের প্রতি তার তরল আসক্তিটা এবার শক্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তার প্রতি ভালোলাগার আলতো অস্পষ্ট ভাবটা এবার ঘন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তরুণী ওতিলের অনিবারণীয় আকর্ষণে এডওয়ার্ড ক্রমাগত যেভাবে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে তার মনে এডওয়ার্ডের আসনটা শূন্য হয়ে পড়েছে স্বাভাবিকভাবে। কর্মপাগল ভাবভোলা ক্যাপ্টেনের নিরাসক্ত ব্যক্তিত্ব ধীরে ধীরে তার মোহপ্রসারী আবেদনের ছটা বিস্তার করে শার্লোতের মনের সব শূন্যতাকে ভরিয়ে তুলেছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলে শান্তি পেত শার্লোতে। কিন্তু ক্যাপ্টেন এবার চলে যাবে। বাড়িটা আবার শূন্য হয়ে পড়বে আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনের পতিত জমিটাও।
একাদশ পরিচ্ছেদ
এদিকে সুচতরা কাউন্টপত্নী সরলপ্রকৃতির এডওয়ার্ডের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একটা নূতন জিনিস আবিষ্কার করে ফেলল। সে জিনিস হলো ওতিলের প্রতি তার ক্রমবর্ধমান আসক্তি। কাউন্টপত্নী বাড়িতে আসার পর থেকেই লক্ষ করছিল কথায় কথায় এডওয়ার্ড ওতিলের নাম উল্লেখ করছিল এবং তাকে বিভিন্নভাবে গুরুত্ব দান করছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
