এই বলে রাজমিস্ত্রী প্রথমে কান্নিক ও পরে হাতুড়িটা শার্লোতের হাতে দিল। শার্লোতেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। শার্লোতে প্রথমে একটি পাথর বসিয়ে দিল সিমেন্ট দেওয়া এক নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর হাতুড়ি দিয়ে তিনবার ঠুকল পাথরটার উপর।
ভিত্তিপ্রস্তর বাড়িটার এক কোণে স্থাপিত হবার পর রাজমিস্ত্রী আবার বলতে লাগল, আমরা যারা মিস্ত্রী তারা বাড়িটা নির্মাণ করলেও লোকে ইটকাটিয়েদের ও স্থপতিদের কাজটাকেই বড় করে দেখে। বাড়ি তৈরি হবার সময় ইটকাটিয়েরা যখন ইট কাটে তখন তারা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আর যখন বাড়িটা শেষ হয়ে যায় তখন তার স্থাপত্যমূলক কারুকার্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে সকলের। কিন্তু আজকের এই বাড়িটা যাতে অতীতের বহু সাক্ষ্য বহন করতে পারে তার জন্য আজকের দিনের বেশ কিছু নিদর্শনসম্বলিত ঢাকনাঢাকা এক বাক্স এই বাড়ির গর্তে প্রোথিত করব আজ আমরা। এতে আছে এ কালের বহু জ্ঞাতব্য তথ্যলেখা, কিছু প্রস্তরখণ্ড। এর সঙ্গে আছে ভালো বোতলে ভরা কিছু মদ আর আছে এ বছরে ছাপা আরও কিছু মুদ্রা যা বাড়ির মালিক দান করেছেন। এই বাক্সে আরও স্থান আছে। যদি কোনও অতিথি এ যুগের কিছু নিদর্শন ভাবীকালের লোকের জন্য দান করতে চান তাহলে তা দিতে পারেন।
একথা শুনে অতিথিরা বিস্মিত হয়ে গেল। তারপর একজন যুবক অফিসার এগিয়ে এসে বলল, আমার কোটের কয়েকটি বোম ছিঁড়ে আমি দিতে চাই।
তার দেখাদেখি মেয়েরাও চিরুনি, স্মোলিং সল্টের শৌখিন শিশি প্রভৃতি অনেক শৌখিন জিনিস বাক্সের মধ্যে ফেলে দিল। ওতিলেও কিছু দেবার কথা ভাবছিল। কিন্তু ঠিক করে উঠতে পারছিল না। এডওয়ার্ড তা বুঝতে পেরে সম্মতি দেওয়ায় সে তার গলা থেকে সোনার চেনটা খুলে বাক্সে ফেলে দিল। এই চেনেই একদিন তার বাবারও ফটোটা ঝোলানো থাকত।
এবার রাজমিস্ত্রী বলল, আমরা তাহলে বাক্সটি চিরকালের জন্য প্রোথিত করছি এই বাড়ির গর্ভে। আমরা চাই এই বাড়ির বর্তমান ও ভবিষ্যতের মালিকরা এই পাথরের বাক্সের মতোই অক্ষয় সুখের অধিকারী হোক। তবে এটাও ঠিক যে যেহেতু মানব জীবনের সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী, এই অক্ষর পাথরের বাক্স একদিন না একদিন এই মাটির গর্ভ থেকে উত্তোলিত হবেই। যে বাড়ির আমরা নির্মাণ করব তা যখন সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হবে তখন এ বাক্সটি তোলা হবেই।
এরপর বাক্সটি বসানো হলো একটি সুন্দর পানপাত্র হতে মদ খেয়ে রাজমিস্ত্রী গ্লাসটি সামনের দিকে ছুঁড়ে দিল। সেখানে আরও মিস্ত্রী ও শ্রমিক দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানটি দেখছিল। গ্লাসটি মাটিতে পড়ল না। তাদের মধ্যেই একজন লুফে নিয়ে পাশের লোকদের তা দেখাতে লাগল।
এদিকে ভিত্তিপ্রস্তরের কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মিস্ত্রী ও শ্রমিকরা কাজ শুরু করে দিল একযোগে। অতিথিরা তখন পাহাড়ের উপর থেকে চারদিকের দৃশ্য দেখতে লাগল। সামনের দিকে কয়েকটি গ্রাম দেখা যাচ্ছে আর দেখা যাচ্ছে রূপালি সুতোর মতো এক নদী। দূরে রাজধানীর বড় বড় প্রাসাদের চূড়াগুলোও দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির পিছনের দিকে ছিল শুধু অরণ্যাচ্ছাদিত পাহাড়। সেই সব পাহাড় আর বনের ভিতর থেকে এক বিশাল পর্বতমালার কয়েকটি নীল শৃঙ্গ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল দিগন্তকে আড়াল করে।
অতিথিরা অবাক বিস্ময়ে চারদিকের দৃশ্যাবলি দেখতে লাগল আশ মিটিয়ে। তাদের মধ্যে একজন পরামর্শ দিল, সামনে যে তিনটি পৃথক জলাশয় দেখা যাচ্ছে সেগুলি কেটে পরস্পরকে যুক্ত করে দিলে একটি বিরাট হ্রদে পরিণত হবে এই জলাশয়গুলো।
ক্যাপ্টেন বলল, হ্যাঁ তা করা যায়।
কিন্তু এডওয়ার্ড বলল, করতে পার, তবে মধ্য জলাশয়টির ধারে যে সব গাছ আছে সেগুলোকে বাঁচিয়ে করতে হবে। ঐ গাছগুলো আমি নিজের হাতে একদিন বসিয়েছি।
এই বলে ওতিলেকে এডওয়ার্ড তা ভালো করে দেখাল। ওতিলে জিজ্ঞাসা করল, গাছগুলো কতদিন আগে বসানো হয়েছে।
এডওয়ার্ড বলল, তুমি যখন দোলনায় দোল খেতে তখন আমি ঐ গাছ বসাই।
এবারে সকলে প্রাসাদে ফিরে এল। খাওয়া-দাওয়ার পর বসার ঘরে চারজনে বসল। গাঁয়ের অনেক লোক তাদের বাড়ির উঠোনে জমায়েত হয়েছিল। ক্যাপ্টেন তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে গ্রামকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রতি রবিবার ও ছুটির দিন তাদের নিজেদের হাতে কাজ করতে হবে।
গ্রামের লোকেরা সব চলে গেলে ওরা চারজনে বসে আবার ঘনিষ্ঠতার কথা বলতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ চাকরে একখানি চিঠি নিয়ে এল। চিঠি পড়ে এডওয়ার্ড শার্লোতেকে বলল, কাউন্ট আগামীকাল আসছেন।
শার্লোতে বলল, তাহলে কাউন্টপত্নীও আসছে নিশ্চয়?
এডওয়ার্ড বলল, হ্যাঁ, উনি আসবেন অন্য দিক থেকে। কাউন্ট আগামীকাল আমাদের এখানে থাকতে চেয়েছেন। ওঁরা এখানে রাতটা কাটিয়ে পরদিন আবার অন্য জায়গায় বেড়াতে যাবেন একসঙ্গে।
শার্লোতে বলল, তাহলে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুত হতে হবে।
ওতিলে সঙ্গে সঙ্গে বলল, কি কি করতে হবে আমাকে বলো।
শার্লোতে ওতিলেকে কি বলায় সে চলে গেল।
ক্যাপ্টেন জানতে চাইল দাম্পত্য সম্পর্ক বর্তমানে কি অবস্থায় আছে। কেননা ওদের কথা ও আগেই কিছু শুনেছিল। এডওয়ার্ড তখন বলল, কাউন্ট ও কাউন্টপত্নী ওদের বিয়ের পর দুজনেই প্রেমে পড়ে। জড়িয়ে পড়ে এক অবৈধ প্রেমসংসর্গের জালে। বিবাহ-বিচ্ছেদ হয় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিবাহ-বিচ্ছেদ হলো না।
