এডওয়ার্ড একটা জিনিস লক্ষ করল ওতিলে ঘরের মধ্যে সাংসারিক কাজকর্ম নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। বাইরে বেড়াতে গিয়েও সে বিভিন্ন কাজের অজুহাতে ঘরে ফেরার। চেষ্টা করে।
তবে সারা দিন যে কাজই করুক না, সন্ধের সময় তারা রোজ এক জায়গায় মিলিত হয়। একসঙ্গে বসে কথা বলে। আপন আপন মনের ভাব প্রকাশ করে।
অনেক দিন কবিতা ও গান-বাজনার আসর বসেনি। তাই সেদিন সন্ধ্যায় এডওয়ার্ড কতকগুলো প্রেমের কবিতা পড়তে লাগল আবৃত্তি করে। ওতিলে ডার ডান দিকে একটা চেয়ারে বসেছিল। সে চেয়ারটার কাছে টেনে এনে এডওয়ার্ডের ঘাড়ের উপর ঝুঁকে তার কোলের উপর রাখা বইটা অনুসরণ করতে লাগল। এডওয়ার্ডও আস্তে আস্তে পড়তে লাগল যাতে ওতিলে ঠিকমতো অনুসরণ করতে পারে তাকে। ওদের রকমসকম দেখে শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন পরস্পরের দিকে তাকাল। মৃদৃ হাসির রেখা ফুটে উঠল তাদের মুখে।
তারা আরও বিস্মিত হলো আর একটি ঘটনায়।
একদিন সন্ধের পর এডওয়ার্ড সকলকে বলল, আজ একটু বেশি সময় বসে যাও। আমি বাঁশি বাজাব। ওতিলে, আজ তুমি আমার সঙ্গে পিয়ানো বাজাবে।
ওতিলে ভালোভাবেই পিয়ানো বাজিয়ে যেতে লাগল। শার্লোতে একটা জিনিস লক্ষ করে আশ্চর্য হয়ে গেল, সে যেমন পিয়ানো বাজাবার সময় এডওয়ার্ডকে তাল রাখার সুযোগ দিত, ওতিলেও ঠিক তাই করল।
এবার শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন নিঃসন্দেহে বুঝতে পারল যে এডওয়ার্ডের প্রতি ওতিলের আগ্রহ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যৎ পরিণামের কথা ভেবে ওতিলের এ আগ্রহ যেমন সমর্থন করতে পারে না শালোতে তেমনি তার জন্য প্রকাশ্যে তিরস্কারও করতে পারে না।
এদিকে ক্যাপ্টেনও অনুভব করল বাস্তব অবস্থা তাকে ও শার্লোতেকে অনেক কাছে এনে ফেলেছে। অথচ সে এটা চায় না। চায় না বলেই সকালে রোজ শার্লোতে যখন বাগানে যায়, ইচ্ছা করে সেই সময়টা এড়িয়ে যায় ক্যাপ্টেন। পরে তা বুঝতে পেরে শার্লোতেও কিছু বলে না। শুধু ক্যাপ্টেনের প্রতি তার শ্রদ্ধাটা বেড়ে যায়। শার্লোতের সঙ্গে একা থাকতে চায় না ক্যাপ্টেন। কিন্তু তা না চাইলেও কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে শার্লোতের প্রতি তার আগ্রহ বেশ ফুটে উঠতে থাকে। শার্লোতের জন্মদিন উপলক্ষে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজের ব্যাপারে উঠেপড়ে লেগে যায় সে। ওদিকে পাহাড়ের ধারে পাথর ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় এডওয়ার্ড হঠাৎ হুকুম করল ক্যাপ্টেনকে, তোমার বেহালাটা নিয়ে এস। আর শার্লোতে পিয়ানো বাজাবে।
সত্যিই চমৎকার বাজাল ওরা দুজনে। বিশেষ দরদ দিয়ে বাজাল। ওদের বাজনা শুনে এডওয়ার্ড ঠাট্টা করে ওতিলেকে বলল, আমাদের থেকে ওরা আরও ভালো বাজিয়েছে। তা বাজাক। তবু আমরা যেমন বাজাচ্ছি তেমনি বাজিয়ে যাব দুজনে।
নবম পরিচ্ছেদ
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর কর্মতৎপরতার পর শার্লোতের জন্মদিন এসে গেল। দুটো রাস্তা আর পাহাড়ের উপর সেই গ্রীষ্মবাসের কাজ অনেক কষ্টে অনেক তাড়াহুড়ো করে শেষ হলো ক্যাপ্টেনের চেষ্টায়। একটি রাস্তা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে চার্চের পাশ দিয়ে পাহাড়ের মাথায় চলে গেছে। আর একটি পথ নদীর উঁচু বাঁধ হিসাবে গাঁয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে। এই রাস্তা বাঁধের মতোই নদীর জলোস হতে রক্ষা করবে গ্রামবাসীদের।
জন্মদিনে ওরা প্রথমে চার্চে গেল। সেখান থেকে অতিথিদের সঙ্গে যাবে পাহাড়ের উপর নূতন বাড়িতে। গাঁয়ের আবালবৃদ্ধবনিতা সব লোকই প্রায় ঘর ছেড়ে নূতন পথে নেমে পড়েছিল। তাদের খুশি আর ধরে না। সবাই নূতন পথে হাঁটছিল। কারণে অকারণে হেঁটে চলেছিল। গায়ের লোক ছাড়াও কিছু নিয়ন্ত্রিত অতিথি ছিল। তারা এ অঞ্চলের বিশিষ্ট লোক।
বাড়ির সকলের মধ্যে সবচেয়ে খুশি হয়েছিল আজ শার্লোতে। এক সময় সে এই খুশির আবেগে ক্যাপ্টেনের হাতে চাপ দিল। এবার পাহাড়ের চুড়ার উপর বাড়িটা তৈরির জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। একজন রাজমিস্ত্রী এক হাতে একটা হাতুড়ি আর এক হাতে একটা কনিক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছন্দোবদ্ধ একটা ছড়া আবৃত্তি করল। তার অর্থ হলো এই : বাড়ি নির্মাণের জন্য তিনটে জিনিস দরকার। প্রথমে চাই ভালো। জায়গা অর্থাৎ যেখানে বাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকবে এবং যেখানে তার ভিত্তি গাঁথা হবে সে জায়গাটা শক্ত হওয়া চাই। তারপর তার ভিত্তিটা খুব ভালো করে গাঁথা চাই। তারপর তার নির্মাণকার্য ভালো হওয়া চাই। প্রথমটির জন্য দায়ী হচ্ছেন বাড়ির মালিক কারণ যে জায়গায় বাড়ি নির্মিত হবে সে জায়গাটা তিনিই যোগাড় করবেন। দ্বিতীয়টার জন্য দায়ী স্থপতিরা কারণ কিভাবে ভিত্তি নির্মিত হবে সে নির্দেশ তারাই দেবেন। তবে তৃতীয়টির জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী হলো রাজমিস্ত্রীরা, কারণ বাড়ি নির্মাণের যাবতীয় কাজ তাদের হাতেই।
প্রধান রাজমিস্ত্রী এই ছড়ার মাধ্যমে উপরোক্ত কথাটি বলার পর বলল, তার কথা না বাড়িয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হোক। যে ইটটি এখন স্থাপন করা হবে, সব ইটগুলো হবে তার মতো একই রকমের। স্বভাবের দিক থেকে অনেক মানুষ এক হলেও আইনের দ্বারা তাদের সম্পর্ক যেমন ঘনীভূত হয় তেমনি ইটগুলো আকার প্রকারে এক হলেও সিমেন্টের শক্তি এদের ঐক্যবদ্ধ করবে এবং এই শক্তির দ্বারা তাদের সম্পর্ক আরও ঘনীভূত হয়ে উঠবে।
