এদিকে দুই বন্ধুতে কয়েকদিন ধরে দেখা না হওয়ায় অনেক কাজকর্ম করা হয়ে ওঠেনি। ক্যাপ্টেনের কেরানিও কাজের অভাবে প্রায় বসে আছে। একদিন এডওয়ার্ড ক্যাপ্টেনের ঘরে গিয়ে আবার কাজকর্ম শুরু করে দিল। কেরানিকেও প্রচুর কাজ দিল।
সেদিন কাজের ফাঁকে একবার এডওয়ার্ড ক্যাপ্টেনকে সময়ের কথা জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু ক্যাপ্টেন আশ্চর্য হয়ে দেখল ঘড়িতে সময়ে দম দেওয়া না হওয়ায় ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে। ক্যাপ্টেনের এ ধরনের ভুল কখনও হয় না। শার্লোতে কাছে থাকায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলতে গিয়ে ঘড়িতে দম দিতে ভুলে গিয়েছে ক্যাপ্টেন। তাই হয়। কোনও বিশেষ এক গৃহপরিবেশের মধ্যে পরিচিত কয়েকজন মানুষের কাজকর্ম করতে করতে হঠাৎ যদি নূতন মানুষের আবির্ভাব ঘটে সেখানে তাহলে স্বভাবতই মনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সেই নূতন আগন্তুকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। ক্যাপ্টেন ও এডওয়ার্ড দুজনেরই তাই হয়েছিল। তাদের সময়টা কোন দিকে কেটে গেল তা খেয়াল থাকল না।
দুই বন্ধুতে এক গোপন অলিখিত ও অজ্ঞাত চুক্তিতে যেন আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড যেমন ওতিলেকে পেয়ে খুশি তেমনি শার্লোতেকে কাছে পেয়ে ক্যাপ্টেনও খুশি। অথচ তারা কেউ কারও প্রতি বিন্দুমাত্রও ঈর্ষান্বিত নয়।
যে যার সঙ্গে সারাদিন কাটায়, বাইরে বেড়াতে যাবার সময়েও সে তারই সঙ্গে যায়। ওরা যখন একসঙ্গে চারজনে বেড়াতে বার হয় তখন এডওয়ার্ড ওতিলেকে নিয়ে এগিয়ে যায় আর ক্যাপ্টেন শালের্ণাতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ধীর গতিতে চলতে থাকে।
সেদিন ওরা পুরনো প্রাসাদ থেকে বনের মধ্যে অবস্থিত ওদের মিলের দিকে বেড়াতে গেল। প্রথমে একটা পথ ধরে ওরা সবাই এগিয়ে গেল। এডওয়ার্ড ওতিলের সঙ্গে অনেকটা এগিয়ে পড়েছিল। ক্যাপ্টেন পথের পাশের জায়গাগুলো দেখাচ্ছিল শার্লোতেকে। কিছুদূর যাবার পর দেখা গেল পথটা বনের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। সারা বনভূমি জুড়ে বড় বড় ছায়াশীতল গাছ। এখানে নদীটা থেমে এসেছে। নদীটা খুব শীর্ণ এবং অগভীর। পাথরের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে। এখানে কোনও সেতু বা সাঁকো না থাকায় নদীটা পার হতে ওদের কষ্ট হলো। একটা পাথর হতে আর একটা পাথরে পা দিয়ে পরে ওতিলের হাত ধরে তাকে পার করল এডওয়ার্ড। এইভাবে নদীটা পার হয়ে ওরা বনভূমিতে গিয়ে একটু বসল। এডওয়ার্ড ওতিলেকে বলল, তোমার বুকের লকেটে ছোট্ট একটা ফটো দেখছি, ওটা হয়ত তোমার বাবার। এটা ঘরের মধ্যে যত্ন করে রাখবে, সব সময় কাছে নিয়ে এভাবে বেড়াতে নেই। যে কোনও সময়ে কোথাও পড়ে যেতে পারে অথবা কারও লালসাকলুষ স্পর্শে ওটার পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে।
ওতিলে কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভিতর থেকে ফটোটা বার করে এডওয়ার্ডের হাতে দিয়ে বলল, আপনার এই পরামর্শের জন্য অনেক ধন্যবাদ। এটা এখন আপনি রেখে দিন। বাড়িতে গিয়ে আমি নেব।
ওরা মিলে গিয়ে আবার চারজনে একসঙ্গে হলো। মিলের পরিচালক ওদের খাতির করে বসিয়ে দুধ এনে দিল। বাড়ি ফেরার একটা ভালো পথ ধরিয়ে দিল। বাড়িতে ফিরে ওরা সবাই স্বীকার করল, মিলে যাওয়ার পথটা খারাপ; মিলের কাছে একটা সেতু করে দিলে এবং পথটা সোজা করলে তিন-চার ঘণ্টার পথটা হয়ে উঠবে এক ঘণ্টার।
এডওয়ার্ড ও ক্যাপ্টেন দুজনেই এর প্রয়োজনীয়তা একবাক্যে স্বীকার করল। কিন্তু শার্লোতে পাকা গৃহিণীর মতো টাকার কথা তুলল। বলল, তোমরা তো পরিকল্পনা করেই খালাস। কিন্তু এত টাকা আসবে কোথা হতে?
এডওয়ার্ড তখন নূতন যুক্তি খাড়া করে বলল, বছরের পর অনেক হিসাবপত্র করে মিলটা থেকে যা পাই তা খুবই সামান্য। তার থেকে মিলটা যদি বিক্রি করে দিই। তাহলে সেই টাকাটা আমরা এই কাজে লাগাতে পারি। তাহলে আমাদের পরিকল্পনা সার্থকভাবে রূপায়িত হবে।
ওতিলে এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এডওয়ার্ড তার সামনে বড় নক্সাটা ধরে বলল, ওতিলে, তোমার মতামত বলো। কোনও কুণ্ঠা না করে তোমার মত ব্যক্ত করো।
ওতিলে ভাল করে নক্সাটা দেখে পাহাড়ের উপর যেখানে গ্রীবাস বা বিশ্রামাগার করার কথা ছিল সেখানে হাত দিয়ে বলল, আমার মনে হয় গ্রীষ্মবাস এখানে না করে
একটু দূরে একেবারে বনের মধ্যে করা উচিত। তাহলে বাইরের জগৎ থেকে ওটা হয়ে পড়বে একেবারে অপরিদৃশ্য। ওখান থেকে আমাদের এই পুরনো প্রাসাদ বা গ্রাম কোনও কিছুই দেখা যাবে না।
ওতিলের কথায় এডওয়ার্ড মনে মনে কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেও পরে স্বীকার করল, কথাটা মন্দ নয়।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
ক্যাপ্টেন আর একবার সবাইকে জায়গাগুলোতে নিয়ে গিয়ে সকলের মতামত নিল। মাপজোপ করে নক্সা তৈরি করল এবং তার সঙ্গে ব্যয়ের তালিকাও দিল। তারপর একদিন এডওয়ার্ডের কাছে প্রস্তাব করল, শার্লোতের আসন্ন জন্মদিনে এই পরিকল্পনার ভিস্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলে ভালো হয়।
জন্মদিন পালন করার কোনও ইচ্ছা ছিল না এডওয়ার্ডের। সে বলল, এরপর ওতিলের জন্মদিন আসছে। তাহলে সেটাও পালন করতে হবে।
অবশেষে এডওয়ার্ড মত দিল এবং সেইমতো কাজ শুরু হলো। এই নূতন পরিকল্পনা অনুসারে একটি উন্নত প্রশস্ত পাকা রাস্তা গ্রাম ও প্রাসাদকে যুক্ত করবে এবং এক জায়গায় এই রাস্তাটা আর একটি পথের সঙ্গে মিলিত হবে, যে পথটা প্রাসাদের বাগান থেকে চলে গেছে পাহাড়ের উপর।
