ক্যাপ্টেন বলল, জনগণ ও ব্যবসাদরদের কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা, কোননা ভালো কাজ পাবে না তুমি। তাদের আশায় থাকলে কোনও কাজই হবে না। তাদের হুকুম করে করাতে হবে। কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব ছাড়া এ সব বিষয়ে কোনও কাজ হবে না।
এডওয়ার্ড বলল, তার কারণ, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি সম্বন্ধে পূর্ণমাত্রায় সচেতন। কিন্তু ভবিষ্যত্বের কথাও একেবারে ভাবে না। দৈনন্দিন জীবনের উর্ধ্বে কোনও কিছুই তারা দেখতে পায় না। তুমি ঠিকই বলেছ এ সব কাজে অবাধ জোর খাটাতে হবে।
দুই বন্ধুতে এইভাবে একমত হয়ে গেল। ঠিক হলো, ক্যাপ্টেন একটা নক্সা আঁকবে। দরকারমতো জায়গাগুলো মেপে নেবে।
নক্সা হয়ে যাবার পর পরিকল্পনাটা দেখল এডওয়ার্ড। রাস্তাটা উঁচু করতে ও নদীর গায়ে ফেলতে অনেক পাথর লাগবে। তার জন্য ক্যাপ্টেন প্রাসাদ থেকে পাহাড়ের চূড়ায় যাবার জন্য একটা পথের পরিকল্পনা করেছে। সেই চূড়ার উপর একটা বিশ্রামাগার হবে। বাইরের লোক এসে থাকতে পারবে। প্রাসাদের ঘরের জানালা থেকে তা দেখা যাবে। এই কাজের জন্য পাহাড় থেকে অনেক পাথর কাটতে হবে আর সেই পাথর দিয়ে রাস্তাটাকে উঁচু করা যাবে, আর নদীর গায়ে তা ফেলে তার ক্ষয়রোধ করা যাবে।
একটা ভিখিরি জ্বালাতন করছিল এডওয়ার্ডকে। তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে যেতে বললেও সে যাচ্ছিল না।
ক্যাপ্টেন বলল, এভাবে মানুষের ঘরে ঘরে বা পথে ভিক্ষা চাওয়া বা দেওয়া ঠিক নয়। মানুষের বদান্যতা ও দানশীলতার একটা সুনিয়ন্ত্রিত সীমা থাকবে। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষ যা কিছু দান করার দান করবে তা ভিখিরিরা সেখান থেকেই পাবে।
ক্যাপ্টেন আরও বলল, এই গাঁয়ে ঢোকবার দুই প্রান্তে দুই জায়গায় দুটো কেন্দ্র খোলা যেতে পারে ভিখিরিদের দানের জন্য। একদিকে একটা আছে পান্থশালা। আর একদিকে আছে এক বৃদ্ধ দম্পতি। আমাদের পক্ষ থেকে যা দেবার ওখানেই দিয়ে রাখব। সেখান থেকেই ভিখিরিরা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সাহায্য মাঝে মাঝে পাবে।
এডওয়ার্ড ক্যাপ্টেনের সঙ্গে গিয়ে জায়গা দুটো দেখে এল এবং তার পছন্দ হলো। আসার পথে এডওয়ার্ড একসময় ক্যাপ্টনকে বলল, মানুষ তার ইচ্ছার দৃঢ়তার দ্বারা ও ব্যক্তিত্বের জোরে কাজ করতে পারে। অনেক পরিকল্পনা রূপায়িত করতে পারে বাস্তবে। যেমন ধরো, নতুন বাড়ির বাগানে যে পথগুলো ভুল করে বানিয়েছিল শার্লোতে সেগুলো আরও অনেক চওড়া ও ভাল করে নির্মাণ করেছি আমরা।
ক্যাপ্টেন বলল, এতে শার্লোতে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সে এ ব্যাপারে কোনও আলোচনা হলে তাতে যোগদান করে না। এড়িয়ে যায়। ও বেশির ভাগ সময় ওতিলের কাছে থাকে।
এডওয়ার্ড বলল, আমরা আমাদের কাজ করে যাব সঠিক পথে। তাতে কে কি ভাবল বা কতটা ক্ষুণ্ণ হলো তা আমাদের দেখার দরকার নেই।
নূতন বাড়ির বাগান থেকে যে পথটা চওড়া হয়ে পাহাড়ের চূড়াটায় উঠে যাবে, নদীর ধার বরাবর গাঁয়ের রাস্তাটা উঁচু করে নির্মিত হয়ে বাঁধ হিসাবে কাজ করবে আর পাহাড়ের চূড়ার উপর একটা বিশ্রামাগার গড়ে উঠবে। কিন্তু এই সব পরিকল্পনা কার্যে রূপায়িত করতে অনেক টাকার দরকার। পাহাড় ভেঙে পাথর এনে রাস্তায় ফেলে রাস্তটা উঁচু করতে হবে। টাকা আছে শার্লোতের কাছে। তাকে শুধু কিসে কোন খাতে কত টাকা লাগবে বুঝিয়ে দিতে হবে।
ক্যাপ্টেন একদিন শার্লোতেকে নিয়ে পরিকল্পনার খাতাপত্র বুঝিয়ে দিল। অনেক কষ্ট করে সে পুরো পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় নক্সা আর খাতাপত্র সব তৈরি করেছে। অবশেষে ওদের তিনজনের মধ্যে ঠিক হলো, এবার হতে শার্লোতে ক্যাপ্টেনের ঘরে বসে পরিকল্পনার বিভিন্ন খাতে ধার্য টাকাকড়ির হিসাব বুঝে নেবে ও দরকার মতো টাকা বরাদ্দ করবে কাজ চালাবার জন্য।
সেই কথামতোই কাজ করে যেতে লাগলো শার্লোতে। ক্যাপ্টেন মানুষটা আজ অনেকখানি সহজ হয়ে উঠেছে তার কাছে। আজ সে মোটেই অসহনীয় নয় তার কাছে। বরং তার ভালো গুণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার কাছে। অথচ না জেনে এই ক্যাপ্টেনের আসার ব্যাপারে কত বিরোধিতা করেছিল একদিন। এই ক্যাপ্টেন আসার সঙ্গে সঙ্গে কতদিন ধরে গড়ে তোলা কত সাধের এক পরিকল্পনার উপর আপন ইচ্ছার রথচক্র চাপিয়ে নস্যাৎ করে দেওয়া সত্ত্বেও আজ তার কাছে বসে কাজ করতে বা তাকে সহ্য করে যেতে একটুও কষ্ট হয় না শার্লোতের। বরং ভালোভাবেই কেটে যায় তার।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
শার্লোতে আজকাল ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দিনের মধ্যে বেশির ভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকায় এডওয়ার্ডকে সময় কাটাতে হয় ওতিলের কাছে। আজকাল ওতিলের প্রতি এক বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব গড়ে ওঠায় তার সাহচর্যে ভালোই থাকে এডওয়ার্ড। আর ওতিলেও যতক্ষণ এডওয়ার্ড তার কাছে থাকে, নানারকমের কথা বলে তাকে প্রীত করার চেষ্টা করে। তাছাড়া এডওয়ার্ড যা যা ভালোবাসে তাই সে করে। সে যা খেতে ভালোবাসে তাই সে করে দেয়। এডওয়ার্ডের প্রতি তার ক্রমবর্ধমান আগ্রহের পরিচয় দিতে থাকে সে এইভাবে।
এডওয়ার্ডের প্রতি তার এই আগ্রহ বৃদ্ধির একটা কারণও ছিল। এডওয়ার্ডের দেহের বয়সটা আগের থেকে বাড়লেও তার মধ্যে একটা শিশুসুলভ সরলতার ভাব ছিল। সে ভাব তার কথায় ও আচরণে প্রায়ই প্রকাশ পেত। আর তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত ওতিলে।
