ওতিলে বলল, না আমি সত্যি তোমার এই হাঁটুর উপরে উঠতে পারিনি। তোমার কাছ থেকে এত স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েও আমি কোনও বিষয়ে কোনও উন্নতিই করতে পারিনি।
ওতিলেকে দেখে খুশি হলো এডওয়ার্ড। ওতিলের চেহারা সত্যিই সুন্দর হয়ে উঠেছে। তার বুদ্ধির উৎকর্ষ তেমন না হলেও তার দেহসৌষ্ঠব্যের মধ্যে কোনও অপূর্ণতা নেই। তাছাড়া সাংসারিক কাজকর্মেও বেশ পটু ওতিলে। বাড়িতে আসার পর থেকেই সব বিষয়ে শার্লোতেকে সাহায্য করতে শুরু করে দিয়েছে। কোনও কাজের কথা তাকে বলতে হয় না। সে নিজে থেকেই যখনকার যে কাজ সব ঠিক করে রাখে। সে যেন সবার সব মনের কথা বুঝতে পারে।
তার পড়াশুনোর ব্যাপারে শার্লোতে কোনও জোর করত না। সেটা তার উপরে ছেড়ে দিয়েছিল। শার্লোতে দেখল ওতিলের হাতের লেখা ভালো। সে ফরাসি ভাষায় কথা বলত।
একদিন তার সম্পর্কে স্কুলের কাগজপত্র সব ভালো করে দেখল শার্লোতে। দেখল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার অফিস থেকে তার সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তা হুবহু সত্যি। খাওয়াপরা সম্বন্ধে ওতিলের সত্যিই কোনো আগ্রহ নেই। তবে শার্লোতে যে মুহূর্তে তাকে ভালো পোশাক পরতে বলল এবং তার ব্যবস্থা করে দিল সেই মুহূর্ত থেকে সে ভালো পোশাক পরতে শুরু করল। উজ্জ্বল পোশাক পরার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহসৌন্দর্য আরও বেড়ে গেল। তার দিকে সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে লাগল। বিশেষ করে পুরুষমানুষের দৃষ্টি। তবে মানুষের রূপসৌন্দর্য মানুষের বহিরেন্দ্রিয় ও অন্তরেন্দ্রিয় উভয়ের উপরেই প্রভাব বিস্তার করে। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও দেহসৌন্দর্যের পানে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মনে কোনও পাপ বা অশুভচিন্তা প্রবেশ করতে পারে না।
ওতিলে আসার পর বাড়িতে পুরুষদের দৈনন্দিন আচরণের অনেক উন্নতি হলো। আগে এডওয়ার্ড ও ক্যাপ্টেন দুই বন্ধুতে যখন কাজে বা কথাবার্তায় মত্ত হয়ে উঠত খাওয়া বা বেড়াবার কথা ভুলেই যেত একরকম। ফলে অনেক সময় শার্লোতেকে বসে থাকতে হতো তাদের জন্য। আজকাল সকলে খাবার টেবিলে যথাসময়ে এসে হাজির হয়। খাওয়া শেষ করেও গল্প করে বেড়াতে যাবার সময় বার হতে দেরি করে না। মোটেই।
শার্লোতের মনে হলো দুটো মানুষই যেন হঠাৎ পাল্টে গেছে একেবারে। শুধু ওতিলের প্রতি নয়, তারা আজকাল শার্লোতের প্রতিও আগের থেকে শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছে। কোনও আলোচনা বা পাঠের সময় তার মতামতের উপরেও গুরুত্ব দেয় তারা। অবশ্য তারা ওতিলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর সব বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দান করত। দিনে দিনে এ গুরুত্ব বেড়ে যেতে লাগল। এবং ওতিলে এটা ভালোভাবেই লক্ষ্য করল। প্রত্যেকের প্রতিটি কথা, প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালনের অর্থ তার বুঝতে কিছু বাকি থাকল না। অথচ কোনও চপলতা দেখা দিল না তার আচরণের মধ্যে। তার কথাবার্তার মধ্যে কোনও উচ্ছ্বাস নেই। তার কর্মতৎপরতার মধ্যে কোনও চঞ্চলতা নেই। তেমনি তার পদক্ষেপের মধ্যেও কোনো শব্দ নেই। সব মিলিয়ে তার সমগ্র জীবনভঙ্গিমার ও জীবনযাত্রার মধ্যে এক সহজ ও শান্ত নিরুচ্চার সৌন্দর্য ছিল যা দেখে মৃগ্ধ হয়ে যেত সকলে। বিশেষ করে খুব খুশি হতো শার্লোতে। ওতিলের আসার কথা কথা সে-ই তুলেছিল প্রথমে।
একদিন শার্লোতে একটা শিক্ষা দিল ওতিলেকে। বলল, ছোট-বড় যে কোনও লোকের হাত থেকে কোনও জিনিস মাটিতে পড়ে গেলে তা কুড়িয়ে দিতে হয়। এতে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও নম্রতা প্রকাশ পায় আর ছোটদের প্রতি মানবিক মমতা ও সহানুভূতির পরিচয় দেওয়া হয়।
ওতিলে বলল, এটা কিন্তু আমার ভালো লাগে না। ইতিহাসে কিন্তু এ শিক্ষার কোনও সায় পাই না আমরা। ইতিহাসের একটা ঘটনার কথা মনে আছে আমার। ইংল্যান্ডের পরাজিত রাজা প্রথম চার্লসের যখন বিচার হচ্ছিল, যখন তিনি তাঁর তথাকথিত বিচারকদের সামনে তার রাজদণ্ড দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখন তার হাতের দণ্ডটা থেকে সোনার বলটা পড়ে যায়। তিনি ভেবেছিলেন বিচার সভায় উপস্থিত কেউ
কেউ সেটা তুলে দেবে আগের মতো। কিন্তু সেদিন কেউ এ উপকারটুকু করেনি তার। তখন তিনি নিজেই নত হয়ে সেটা কুড়িয়ে নেন।
এদিকে এডওয়ার্ড ও ক্যাপ্টেনের কাজ কমার পরিবর্তে বেড়েই যেতে লাগল দিনে দিনে। মাঝে মাঝে দুই বন্ধুকে বাইরে যেতে হয়। এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত গ্রামগুলো ঘুরে বেড়িয়ে দেখতে হয়।
একদিন দুজনে যখন বেড়াচ্ছিল, ক্যাপ্টেন তখন বলল, দেখো, কোনও কোনও গাঁ কত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আবার কোনও কোনও গা কত অপরিচ্ছন্ন। এখানকার রাস্তাগুলোও ভালো নয়। বড় আঁকাবাঁকা, খানা-ডোবায় ভর্তি। আমি তোমার এস্টেটের উন্নতির জন্য সুইজারল্যান্ডের কায়দায় একটা পার্কের চারদিকে একটা আদর্শ গ্রাম গড়ে তুলতে চাই।
এডওয়ার্ড তখন সমর্থনের সুরে বলল, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। আমাদের প্রাসাদের কাছে সে গ্রামটা রয়েছে সেটা নদীর ওপারে অর্ধবৃত্তাকারে স্থাপিত। সেখানে যাবার পথটা খুবই খারাপ। সে পথ কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, কোথাও জলের তলা দিয়ে গেছে। তার পর নদীতে যখন বর্ষার বান আসে তখন গাঁয়ের লোকেরা সকলেই স্বার্থপরের মতো নিজের ঘর বাঁচাবার চেষ্টা করে পথের জল আটকাতে চায়। কিন্তু পরের কথা ভাবে না। কিন্তু গাঁয়ের লোকেরা সকলে মিলে যদি চেষ্টা করে, যদি মিলেমিশে সকলেই হাত লাগায় তাহলে এই রাস্তাটাকে অনেক উঁচু করা যায়। তাহলে রাস্তাটাও অনেক উন্নত হবে আর সেটা বাধের মতো কাজ করবে, বানের কবল থেকেও গাটা রক্ষা পাবে।
