ক্যাপ্টেন একটু থেমে আবার বলল, সব বস্তুরই একটা তরল অবস্থা আছে আর সেই তরল অবস্থাতেই সে অন্য বস্তুর তরল অবস্থার সঙ্গে মিশতে চায়। কিন্তু সেই তরল অবস্থাটা একটু শক্ত হলেই তা গোলাকার রূপ ধারণ করে নিজেকে আর সব থেকে পূথক করে রাখতে চায় একটা বৃত্তসীমার মাঝে।
এডওয়ার্ড মাঝখানে বলল, কিন্তু সব তরল বস্তু আবার মিশতে চায় না পরস্পরের সঙ্গে, যেমন তেল আর জল। তাদের মেশানো হলে রসায়নবিদের সাহায্য নিতে হয়। অ্যালকালাইন দিলেই ওরা মিশে যায়। আবার অনেক সময় গবেষণাগারে দেখা যায় ভিন্নধর্মীয় বস্তুও পরস্পরে মিলেমিশে তৃতীয় এক বস্তুর সৃষ্টি করছে।
শার্লোতে বাধা দিয়ে বলল, রসায়নবিদের গবেষণাগারে লাইমস্টোন, সালফুরিক অ্যাসিড, অ্যালকালাইন প্রভৃতি বিভিন্ন উপাদানের মেলামেশার ফলে যে যাদু সৃষ্টি হয়, মানুষের জীবনে তা খাটে না। আমি দেখেছি মানুষ এই সব রাসায়নিক উৎপাদনের অনেক ঊর্ধ্বে। মানুষ অনেক পছন্দ করে যে আত্মীয়তা যে বন্ধুত্ব বেছে নেয়, পরে দেখা যায় তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাবে তাদের সে আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ফাটল ধরে।
এডওয়ার্ড রসিকতা করে বলল, সেক্ষেত্রে কেমিস্ট চতুর্থ ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটিয়ে সমস্যার সমাধান ঘটবে। কাউকে শুধূ হাতে ফিরতে হবে না।
শার্লোতে বলল, এসব কথা আমাদের জীবনে খাটুক বা না খাটুক, একটা বিষয়ে আমি আজ একমত হলাম।
এডওয়ার্ডের পানে তাকিয়ে শার্লোতে বলল, তুমি এবার থেকে সব জিনিস জোরে পড়বে। আমরা তা শুনে যাব। আমি দাঁড়িয়ে তোমার ঘাড়ের উপর দিয়ে বই-এর কোনখানে পড়ছ তা দেখার চেষ্টা করব না। ওতিলের কথা মনে করে আমি তা সহ্য করব। কারণ তাকেও আনতে হবে।
এই বলে একটা চিঠি এডওয়ার্তের হাতে দিল শার্লোতে।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
হেডমিস্ট্রেসের পত্র মাদামের চিঠি যথাসময়ে পাওয়া সত্ত্বেও উত্তর দিতে দেরি হলো, কারণ অনেক ছাত্রীরই অভিভাবকের পত্রের উত্তর দিতে হয় আমাকে। এজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আজ বেশি কথা লিখতেও পারব না, কারণ পরীক্ষার ফলাফল অভিভাবকদের জানাতে হবে। আপনার মেয়ে সব বিষয়েই প্রথম স্থান অধিকার করেছে। অনেক পারিতোষিক লাভ করেছে। এত ভালো মেয়ে এখানে রেখে দেওয়ার কোনও যুক্তিই দেখি না। ওতিলের কথা আমার সহকারিণীর চিঠিতে জানতে পারবেন।
সহকারিণীর পত্র
আমাদের মাননীয় প্রধান শিক্ষিকা আপনাকে এমন একটা কথা জানাতে দিয়েছেন যা তিনি নিজে জানাতে চান না। অবশ্য ওতিলের মধ্যে কি আছে, তার প্রকৃত অবস্থা কি তা আমিই সবচেয়ে ভালো জানি। আমি তাকে বাৎসরিক পরীক্ষার জন্য মোটেই ভালোভাবে প্রস্তুত করে তুলতে পারিনি শত চেষ্টা সত্ত্বেও। তার পরীক্ষার ফল সম্বন্ধে যে উদ্বেগ পোষণ করতাম মনে মনে তাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। অঙ্কে তার বুদ্ধি নেই তা নয়, তবু প্রায় সব অঙ্কই ভুল করছে। ইতিহাসের সন-তারিখ মনে রাখে না। ভূগোলে রাষ্ট্রীয় বিভাগ দেখাতে পারে না। অঙ্কনকার্যে তার হাত ভালো। কিন্তু এত বড় কাজ ফেঁদে বসেছিল যে সময়ে শেষ করতে পারেনি সে। খাতা দেবার পর পরীক্ষকরা আমাদের অর্থাৎ সে সব শিক্ষিকারা ক্লাসে পড়াই তাদের মতামত জানতে চান। আমি ওতিলের অন্তর্নিহিত যোগ্যতা ও গুণাগুণ সম্পর্কে সব কথা বলি। কিন্তু প্রধান পরীক্ষক তখন বলেন, এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে তার সামর্থ্য আছে, কিন্তু সে সামর্থ্য কর্মসম্পাদনের মধ্যে বাস্তব রূপ পায়নি।
সব মেয়ে যখন কোনও না কোনও প্রাইজ পেয়ে আনন্দে লাফাচ্ছিল, ওতিলে তখন ঘরের এক কোণে একটা জানালার ধারে স্তব্ধ হয়ে বসেছিল বাইরে শূন্য মনে তাকিয়ে। আমাদের প্রধান শিক্ষিকা যার প্রতিটি ছাত্রীর প্রতিই অসীম মমতা, তিনি ওতিলের কাছে গিয়ে বললেন, ভগবানের নামে বলল, এতখানি মূর্খতার পরিচয় তুমি কেন দিলে যখন সত্যি সত্যিই তুমি এতটা মূর্খ নও?– ওতিলে তখন ম্লান মুখে উত্তর দিল, ক্ষমা করবেন মা, আমার মাথা ধরেছিল পরীক্ষার সময়, যেমন আজ আবার ধরেছে। অন্য দিনকার মতো বেশি ধরেছে।
অথচ কি আশ্চয়! পরীক্ষার সময় লক্ষ্য করে দেখেছি ওতিলে একবারও তার কপালে হাত দেয়নি। যন্ত্রণার জন্য একবারও মুখটা বিকৃত করেনি। ওতিলেকে নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনা হয়। আমি তার সে আলোচনার ফল বা সিদ্ধান্তটুকু শুধু জানিয়ে দিচ্ছি। আমরা চাই ওতিলেকে আপনি আপনার কাছে নিয়ে গিয়ে কিছুদিন রাখুন। আপনারা ওখান থেকে যদি অন্য কোথাও চলে যান তখন আবার ওতিলে ফিরে আসবে সাদরে আমাদের কাছে। আর একটা কথা, ওতিলে কখনও কিছু বলতে চায়। না। কোনও কিছুও দাবি জানায় না। আবার কেউ কিছু তার কাছ থেকে চাইলেও সে প্রত্যাখ্যান করে না। এটাই তার স্বভাব।
চিঠি দুটো পড়ে সবাইকে শোনাল এডওয়ার্ড। তারপর বলল, ঠিক আছে। ওতিলেকে আনা হোক। সব ব্যবস্থা করে ফেল। ওতিলে এলে আমি প্রাসাদের ডান দিকে ক্যাপ্টেনের ঘরের কাছে একটা ঘরে চলে আসব। রাত পর্যন্ত পড়েও খুব সকালে ওঠে। দুজনে কাজ করা সহজ হবে তাহলে। আর ওতিলে থাকতে তোমার ঘরের পাশে। ওর আবার মাথা ধরার রোগ আছে। আমারও তাই। ওর বাঁদিকের কপালটা ধরে, আমার ডানদিকটা।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
একদিন প্রাসাদের সামনে একখানি ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। তার থেকে নামল ওতিলে। শার্লোতে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। সঙ্গে সঙ্গে ওতিলে বসে পড়ে তার হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরল। শার্লোতে ব্যস্তভাবে বলল, একি করছিস, নিজেকে এত ছোট ভাবছিস কেন?
