কয়েকদিনের মধ্যেই এডওয়ার্ড বুঝতে পারল ক্যাপ্টেন কত পরিশ্রমী। যে কাজ হাতে নেয় ক্যাপ্টেন তা কত নিখুঁতভাবে করে। শুধু তাই নয়, ক্যাপ্টেন আবার তার বন্ধুকে খানিক উপদেশও দিয়ে দিল। বলল, কাজ নিষ্ঠা আর একাগ্রতা মানুষের কাছ থেকে। কিন্তু জীবন চায় আনন্দ আর ভোগ-উপভোগ। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।
ক্যাপ্টেনের কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য একজন কেরানি নিযুক্ত করা হলো। সে। লোকটিও খুব পরিশ্রমী। সারাদিন সমানে কাজ করেও রাত্রিতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত থাকত।
তবে ক্যাপ্টেন সন্ধের দিকে কাজ থেকে নিজেকে কিছুক্ষণ ছিনিয়ে নিত। সন্ধের সময়টা সে বন্ধুর সঙ্গে গল্পগুজব করে কাটাত। যেদিন কোনো প্রতিবেশী বেড়াতে আসত না শার্লোতের কাছে, যেদিন সে একা থাকত, সেদিন সন্ধ্যায় ওরা দুই বন্ধুতেই শার্লোতের কাছে বসে গল্প করত।
ক্যাপ্টেন আসার পর তার স্বামীর মন কিছুটা সরে গেলেও একটা দিকে লাভ হয়েছে শার্লোতের। সংসারের কতকগুলো নূতন জরুরি ব্যবস্থা কিছুতেই দীর্ঘদিন ধরে সম্পন্ন করে উঠতে পারছিল না শার্লোতে। সেগুলো ক্যাপ্টেন এসে সহজেই করে ফেলল। আগে বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের ভাঁড়াটা ছিল নামমাত্র। ক্যাপ্টেন এসে সেটা বাড়াল। অনেক নূতন নূতন ওষুধ আনাল। বিশেষ করে আনাল জলে ডোবার ব্যাপারে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অনেক ওষুধ। তার দরকারও ছিল। এ অঞ্চলে লেক, নদী আর খাল-বিলের সংখ্যা অনেক। তাছাড়া মাঝে মাঝে বাঁধ প্রকল্পের কাজও হয়। এজন্য জলে ডোবার ঘটনা খুব একটা বিরল নয়। তবে জলের ডোবার একটা ঘটনা ক্যাপ্টেনের জীবনের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে ছিল। এটা এডওয়ার্ড শার্লোতকে একদিন বলেছিল। তারা দুজনেই জানত। আর জানত বলেই এ কথা নূতন করে তোলেনি ক্যাপ্টেনের কাছে।
ক্যাপ্টেন একদিন বলল, এত ওষুধপত্র তো আনালাম। কিন্তু এ অঞ্চলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেবার ও কাটাছেঁড়ার ব্যাপারে আরোগ্য করার জন্য একজন সার্জেন দরকার। আর এই ধরনের একজন লোকের সঙ্গে আমার জানাশোনাও আছে। তবে তাকে অবশ্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে।
অবশেষে সেই সার্জেন ভদ্রলোককে ক্যাপ্টেনের কথামতো আসতে লিখে দেওয়া হলো। এডওয়ার্ড সস্ত্রীক টাকাপয়সার হিসেব করে দেখল এই বাড়তি খরচের জন্য টাকার অভাব হবে না।
এতদিনে ক্যাপ্টেনের আসার ব্যাপারে আগেকার সব ক্ষোভ ও অসন্তোষ দূর হয়ে গেল শার্লোতের মন থেকে। আজকাল ক্যাপ্টেনকে দিয়ে ঘর-সংসারের অনেক কাজ সে করিয়ে নেয়। আজ সে বুঝল ক্যাপ্টেনের মতো একজন অভিজ্ঞ ও শক্ত লোকের আসার দরকার ছিল তাদের সংসারে।
এক-একদিন সন্ধের সময় এডওয়ার্ড কোনও বই আবৃত্তি করে পড়ে শোনাত ওদের। তার কণ্ঠটা গম্ভীর আর মিষ্টি ছিল। সে একসময় ভালো কবিতা আবৃত্তি করত। তবে তার একটা দোষ ছিল। সে যখন কিছু মন দিয়ে পড়ত বা আবৃত্তি করত, তখন শ্রোতাদের মধ্যে কেউ অন্য কোনও দিকে তাকালে বা অন্যমনস্ক হয়ে উঠলে সে কোনও মতেই সহ্য করতে পারত না। একদিন সন্ধের সময় সে কি একটা বই থেকে পড়ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল শার্লোতে তার বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। অর্থাৎ তার পড়ার কথা শুনছে না। এডওয়ার্ড তখন রেগে গিয়ে বলল, কথাগুলো ছাপা থাকলেও একথার সঙ্গে আমার অন্তরের আবেগ ও অনুভূমি মিশিয়ে আমি এগুলো তোমাদের অন্তরে সঞ্চার করে দিতে চাইছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আমার বুকের মধ্যে যে একটা জানালা আছে তাই দিয়ে সেই কথাগুলো পালিয়ে গেছে। তোমার অন্তরে ঢুকতে পারেনি।
যে কোনও অপ্রীতিকর প্রশ্নের উত্তর দেবার বা নীরস আলোচনাকে সরস করে তোলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল শার্লোতের। এডওয়ার্ডের কথায় সে বিমুঢ় না হয়ে সহজভাবে বলল, তোমার পড়ার মধ্যে আত্মীয়তার কথা ছিল। হঠাৎ আমার এক খুড়তুতো ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। তাই ক্ষণিকের জন্য আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি ও বই-এর মাঝে তাকিয়ে খুঁজতে থাকি তুমি কোথায় পড়ছ।
এডওয়ার্ড বলল, আসল কথা সব মানুষ নার্সিসাসের মতো সব বস্তুর মাঝে নিজের প্রতিফলন খুঁজে চলেছে।
শার্লোতে ক্যাপ্টেনের মুখপানে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, আত্মীয়তা বলতে আপনি কি বোঝেন?
ক্যাপ্টেন বলল, আমি অবশ্য দশ বছর আগে এ বিষয়ে যা পড়েছিলাম তার কথাই বলব। এখন অবশ্য আপনাদের একথা ভালো লাগবে কিনা জানি না?
এডওয়ার্ড বলল, এমন কোনও জ্ঞান নেই যা মানুষের সারা জীবনভর প্রযোজ্য হতে পারে। প্রাচীনকালের জ্ঞানী বৃদ্ধরা বলতেন, এটা আমরা যৌবনে শিখেছি। কিন্তু এখন খাটে না একথা। আজ আমরা প্রতি পাঁচ বছরেই নূতন নূতন কথা শিখছি। আজকের জ্ঞান ও সত্য কাল অচল হয়ে যাচ্ছে, জগন্টা এমনই পরিবর্তনশীল হয়ে পড়েছে।
শার্লোতে বলল, আমরা মেয়েরা অল্পতেই সন্তুষ্ট। অতশত চাই না। আমি শুধু জানতে চাই শব্দটা কি অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং এই শব্দের কোনও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য আছে কিনা। আমি তর্ক করতে চাই না এ নিয়ে। সেটা পণ্ডিতদের উপর ছেড়ে দিলাম।
ক্যাপ্টেন বলল, প্রথমে আমরা দেখতে পাই সব জীবন্ত প্রাণীই পরস্পরের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হয়ে বাঁচতে চায়। কিছু না কিছু জানতে চায়। তবে তারা যে কিছু জেনেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত না হলে তারা অজ্ঞাত বিষয়কে জানতে যায় না।
