নূতন বাড়িতে পৌঁছে ক্যাপ্টেন দেখল ফুলের মালা দিয়ে বাড়িটাকে চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। শার্লোতে বলল, আজ একদিকে দুটো উৎসব। এডওয়ার্ডের জন্মদিন আর আমাদের বন্ধুর শুভাগমন। এডওয়ার্ড অবশ্য চায় না ওর জন্মদিন পালিত হোক। নামকরণের দিনটাও পালন করে না ও।
এডওয়ার্ড বলল, নামকরণের কথা বলতে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। আমরা দুই বন্ধুতে ছোট থেকেই একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি, খেলা করেছি।
এডওয়ার্ড একসময় শার্লোতেকে বলল, আমরা এখন তিনজন। আর একজনের অবশ্যই জায়গা হবে প্রাসাদে।
এবার ওরা পাহাড়ের চূড়াটায় যাবার জন্য রাস্তা ধরল। এডওয়ার্ড বলল, বন্ধুকে পাহাড়টার উপর নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আসি আমাদের সম্পত্তির সীমানা কতদূর, তা না হলে মনে হবে এই ছোট উপত্যাকাটার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে আমাদের বাড়ির চৌহদ্দি।
শার্লোতে বলল, তাহলে এই সোজা পথে এস।
ঝোঁপঝাড়ে ভরা বেশ কিছু চড়াই পার হয়ে ওরা পাহাড়ের মাথাটায় গিয়ে উঠল। সেখান থেকে প্রাসাদটাকেও দেখা গেল না। সেখানে ওরা দেখতে পেল শুধু একটা প্রকাণ্ড লেক আর তার ওপরে আর একটা পাহাড় দিগন্তটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড় থেকে একটা নদী বের হয়ে সামনের লেকে এসে পড়েছে। লোকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে পপলার গাছের সারি। এডওয়ার্ড বলল, ঐ গাছগুলো আমি বসিয়েছি।
খুশি হয়ে পাহাড় থেকে নেমে এল ওরা। ক্যাপ্টেনের থাকার জায়গা দেখিয়ে দেওয়া হলো। ক্যাপ্টেন থাকবে প্রাসাদের ডানদিকে বারান্দাওয়ালা একটি প্রশস্ত ঘরে। সেখানে তার বইপত্র ও কাগজ সব গুছিয়ে রাখল। কিন্তু এডওয়ার্ড তাকে বেশ কয়েকদিন শান্তিতে থাকতে দিল না। ক্রমাগত চারপাশের জায়গাগুলো ঘোড়ায় চাপিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল। স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকের সঙ্গে পরিচয় দিয়ে দিল সে।
অবশেষে একদিস তার মনের গোপন কথাটা বলে ফেলল ক্যাপ্টেনকে। বলল, আবার যাবতীয় ভূসম্পত্তি কোথায় কি আছে তা তোমাকে দেখিয়ে দিলাম। এবার এর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নতি সম্পর্কে তোমার মতামত ও সাহায্য চাই। এটা আমার অনেক দিনের বাসনা।
ক্যাপ্টেন বলল, এই জেলাতে কোনখানে তোমার কত জমি আছে তা আগে জরিপ করে মেপে দেখতে হবে।
জমি মাপার সাজসরঞ্জাম তার সঙ্গেই ছিল। বলার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই মাপার কাজ শুরু করে দিল ক্যাপ্টেন। তারপর বাড়ি গিয়ে নক্সা করে এক বিরাট কাগজের উপর রং দিয়ে চিহ্নিত করে এডওয়ার্ডের কোথায় কত জমি আছে তা দেখিয়ে দিল। তা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল এডওয়ার্ড। জীবনে আজ সে যেন প্রথম ভালোভাবে তার ভৌম অধিকারের সীমানা যথাযথ বুঝতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমার স্ত্রীকে দেখাই।
ক্যাপ্টেন বলল, কি দরকার? সবাই সব বিষয়ে একমত নাও হতে পারে।
এডওয়ার্ড বলল, কিন্তু তার বাগান সাজানোর কাজটা সমর্থন করবে না তুমি? সেটা দেখেছ তো?
ক্যাপ্টেন বলল, আমি দেখেছি। কিন্তু তারিফ করতে পারছি না। উনি যে পথ নির্মাণ করেছেন তাতে দুজনে পাশাপাশি চলতে পারবে না। আর ঐ পথটাকে সোজা করতে হলে ঐ পাহাড়ের একটা অংশ ভাঙতে হবে।
এরপর সে তার নিজের পরিকল্পনার কথা বলল। নূতন বাড়ির বাগান থেকে বেরিয়ে পথটা কিভাবে পাহাড়ের উঁচু চূড়াটায় চলে যাবে। আর তাতে পয়সাও তেমন খরচ হবে না।
ক্যাপ্টেনের সমালোচনা ও পরিকল্পনা দুটোই ভালো লাগল এডওয়ার্ডের। সে। এটাই গ্রহণ করল। তারপর একদিন যখন দেখল শার্লোতে তার আগেকার সেই ভুল পরিকল্পনা অনুসারে কাজ শুরু করে দিয়েছে তখন তাকে কথাটা খুলে বলল।
শার্লোতে বুদ্ধিমতী। ক্যাপ্টেনের পরিকল্পনাটা যে ঠিক তা সে বুঝতে পারল সহজেই। তবু নিজের পরিকল্পনাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না। এ পরিকল্পনা একদিন সে অনেক কষ্ট করে গড়ে তোলে। এ কাজে তার অনেক সময় কেটে যেত। তাই সে সব জেনেও তর্ক করতে লাগল এডওয়ার্ডের সঙ্গে। তারপর হেরে নিজেই চুপ করল।
ক্যাপ্টেন আসার পর থেকে দিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময় এডওয়ার্ড তার বন্ধুর কাছেই থাকে। নানারকমের কথাবার্তা বলে। তার উপর আছে ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে যাওয়ার আর শিকার করা। শার্লোতের সঙ্গে আজকাল বিশেষ কোনও কথাই বলে না। এডওয়ার্ড। এর উপর হাতের কাজটা চলে যাওয়ায় খুব বেশি নিঃসঙ্গ বোধ করতে লাগল শার্লোতে।
এমন সময় শার্লোতে একটা কাজ পেল। বোর্ডিং থেকে ওতিলে সম্পর্কে চিঠি পেল। স্কুলের হেডমিসেট্রেস জানিয়েছে, ওতিলে অন্য সব মেয়েদের মতো ঠিক। পড়াশোনা আয়ত্ত করতে পারছে না। সে ভালো করে তৃপ্তির সঙ্গে খায় না। মাঝে মাঝে মাথা ধরে তার। বাঁ দিকের কপালটায় যন্ত্রণা করে। তবু আমরা আশা ছাড়িনি। বিশেষ আগ্রহ সহকারে ওর অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে ওর নিরানন্দ জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারব।
শার্লোতে আশ্বস্ত হলো। ওতিলের প্রতি প্রধান শিক্ষিকার স্নেহ ও আগ্রহ দেখে খুশি হলো সে। অবহেলা আর ঔদাসিন্যে ভরা এই জগতে কেউ যদি কারও প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখায় ও স্নেহ-প্রীতি দান করে তখন সত্যিই সেটা দেখার বিষয়।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
এডওয়ার্ডের যাবতীয় স্থাবর ভূম্পত্তির একটা প্রাথমিক নক্সা তৈরি হয়ে গেল। এবার ক্যাপ্টেন বন্ধুকে বলল, এরপর তোমার ভূসম্পত্তির সব বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। তারপর প্রজাদের ব্যাপারটা ঠিক করা হবে।
