শার্লোতে বলল, তবু আমি বিপদের অশুভ আভাস পাচ্ছি যেন।
এডওয়ার্ড বলল, ও সব অর্থহীন চিন্তা।
শার্লোতে বলল, এই সব আভাস মানুষের কর্মফল সম্বন্ধে অভিজ্ঞতাপ্রসূত এক একটা প্রাককল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। যাই হোক, আমাদের এ বিষয়ে ভাবার জন্য দিনকয়েক সময় দাও। হঠকারিতার সঙ্গে কিছু করো না।
এডওয়ার্ড বলল, কিন্তু যা কিছু করার এখনি করতে হবে। যা হোক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি তার চিঠির উত্তর দিতে যাচ্ছি।
শার্লোতে বলল, এখন তাকে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়ে দুকথা লিখে দাও।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
শার্লোতের কথায় বন্ধুর প্রতি সহানুভূতির উদ্দাম আবেগটা সত্যিই শান্ত ও প্রশমিত হলো এডওয়ার্ডের। তার কথার গুরুত্বটা ধীরে ধীরে বুঝল এডওয়ার্ড। তাছাড়া মনে তার কতকগুলো স্মৃতি জেগে উঠল শার্লোতের কথায়। সে প্রেম বিচ্ছেদে বিরহে মরে যায়নি, বরং ইন্দ্রিয়সংসর্গ ছাড়াই যা তীব্র হয়ে ওঠে দিনে দিনে, অমর ইন্দ্রিয়াতীত সে প্রেমের আশ্চর্য মধুর এক সুবাস অতীত জীবনের ভাঁজ থেকে তার কাছে যেন উঠে আসে সহসা।
এডওয়ার্ড ঠিক করে ফেলে শার্লোতের কথামতোই সে এখন চিঠির উত্তর লিখবে তার বন্ধুকে। এখন তাকে আসতে লিখবে না। কিন্তু চিঠি লিখতে গিয়ে ক্যাপ্টেনের খোলা চিঠিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর প্রতি সেই সকরুণ সহানুভূতির এক অদম্য প্রবলতা ভাসিয়ে নিয়ে গেল শার্লোতের কথাগুলোকে।
আজ একটা জিনিস অনুভব করল এডওয়ার্ড। আজ তার জীবনে তার ইচ্ছা এক প্রত্যক্ষ বিরোধিতা লাভ করল। তার স্ত্রী শার্লোতে আজ প্রত্যক্ষভাবে তার ইচ্ছার গতিরোধ করে দাঁড়িয়েছে। জীবনে এর আগে এমনভাবে তার ইচ্ছার গতিবেগ কেউ প্রতিহত করেনি। সে বাবা- মার একমাত্র প্রিয় সন্তানরূপে যা চেয়ে তাই একরকম পেয়েছে বিনা বাধায়। যৌবনে বাবা-মা এরকম তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিলেও এই বিরোধিতকার মাসুল সে সুদে-আসলে পেয়ে গেছে। তার প্রথমা স্ত্রী মারা যাবার পর সে অনেক সম্পত্তি লাভ করেছে এবং তার ফলে তার ইচ্ছার স্বাধীনতা আরও অনেক বেড়ে গেছে। সে ইচ্ছামতো ঘুরে বেরিয়েছে অনেক জায়গায়। ইচ্ছামতো তার প্রথম প্রেমের নায়িকা শার্লোতেকে দীর্ঘ দিন পর স্ত্রী হিসাবে ঘরে এনেছে। তবু আজ শার্লোতের কথাটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলেও সে কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না এডওয়ার্ড।
বন্ধুর চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে তাই তাকে আসতে বলতে পারল না। কোনও সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে শুধু লিখল অনেক দিন চিঠি দিতে না পারার জন্য সে দুঃখিত। অল্পদিনের মধ্যেই সন্তোষজনক আর একখানি চিঠি সে পাঠাচ্ছে।
পরদিন সকালেই আবার কথাটা তুলল শার্লোতে। আর এডওয়ার্ডের মনটা খুব ভালো ছিল। তার প্রতিটি কথার ওদার্যে ও মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল শার্লোতে নতুন করে। একসময়ে সে বলল, তুমি আমাকে সত্যিই বাধিত করলে এডওয়ার্ড। গতকাল যা আমি আমার স্বামীকে দিতে পারিনি আজ তা আমার প্রেমিককে না দিয়ে পারছি না। আজ না বলে পারছি না যে তোমার অকৃত্রিম বন্ধুপ্রীতির নিবিড়তা আমাকেও বিচলিত করে তুলেছে। আমার মধ্যেও জাগিয়ে তুলেছে অনুরূপ ভাব। তুমি যেমন ক্যাপ্টেনের কথা ভাবছ আমিও তেমনি ভাবছি ওতিলের কথা। আমি আমার মেয়ে লুসিয়ানের কথা ভাবছি না। সে ভালোই আছে। পড়াশুনো করছে। কিন্তু ওতিলে যে বোর্ডিং-হাউসে থাকে তার অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বেচারীর জন্য বড় দুঃখ হয়। তাই বলছিলাম কি তুমি যেমন ক্যাপ্টেনকে এখানে রাখতে চাও, আমিও তেমনি ওতিলকে এখানে এনে রাখতে চাই। এতদিন কিন্তু কথাটা বলতে পারিনি কারণ যে কারণে আমি তোমাকে বাধা দিচ্ছিলাম সেই কারণে আমি নিজের বন্ধুরও বিরোধিতা করেছিলাম। নিজেকে বাধা দিয়েছিলাম নিজে।
এডওয়ার্ড বলল, এ কিন্তু পুরোপুর স্বার্থপরতা। আমি ক্যাপ্টেনকে আনতে চাই। তুমি চাও ওতিলকে। একে যদি স্বার্থপরতা না বলো তো আর কাকে বলবে।
শার্লোতে সে কথায় কান না দিয়ে বলল, কিন্তু এ বিষয়ে একটা কথা আছে। তুমি কি মনে করো এক বাড়িতে ক্যাপ্টেনের কাছাকাছি ওতিলেকে রাখা ঠিক হবে? ক্যাপ্টেনের বয়স প্রায় তোমার মতোই আর ওতিলেও সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছে। তাছাড়া ওতিলে দেখতে ভালো।
এডওয়ার্ড বলল, আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না ওতিলের রূপটাকে কেন তুমি এত বড় করে দেখছ এবং সেটাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করছ। তার মাকে তুমি ভালোবাসতে বলে তাকে তুমি স্নেহ করো। তা করো তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না। সে সুন্দরী, তার চোখ দুটোও ভালো ঠিক। ক্যাপ্টেন তার প্রিয় একবার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিল দেশভ্রমণ থেকে আমি ফিরে আসার পর। কিন্তু সে আমার মনে মোটেই কোনও রেখাপাত করতে পারেনি।
শার্লোতে হেসে বলল, এজন্যই তো তোমাকে এত ভালো লাগে। তুমি তার কচি সৌন্দর্য ফেলে আমার মতো পুরনো বান্ধবীর প্রতি আকৃষ্ট হলে।
কথা বলতে বলতে ওরা যখন নূতন বাড়ির বাগান থেকে পুরনো প্রাসাদে ফিরছিল তখন একটি চাকর এসে খবর দিল ঘোড়ায় চেপে মিস্টার মিটলার এসেছে। চাকর মারফৎ জিজ্ঞাসা করছে তাকে প্রয়োজন আছে কিনা?
মিটলারের নাম শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠল এডওয়ার্ড। বলল, গিয়ে এখনি তাঁকে আদার-আপ্যায়ন করো। তাকে এনে বসার ঘরে বসাও। জলখাবার খেতে দাও। আমরা যাচ্ছি।
