মালী বলল, ওই ওখানে, নতুন বাড়ির মাঠে। প্রাসাদের উল্টোদিকে যে বাড়িটা তিনি করেছিলেন তার কাজ শেষ হয়ে গেছে। বাড়িটা সত্যিই আপনার ভালো লাগবে। কাজেই গাঁ, ওপর থেকে দেখতে পারেন। একটু ডানদিকে চার্চ। উল্টোদিকে এই প্রাসাদ আর বাগান।
এডওয়ার্ড বলল, হ্যাঁ, আমি লোকজনদের কাজ করতে দেখেছি।
মালী উৎসাহিত হয়ে বলল, বাড়িটার ডানদিকে একটা ছায়াঘেরা প্রান্তর উপত্যকায় গিয়ে মিশে গেছে। পাহাড়ে যাবার পথটা বড় চমৎকারভাবে নির্মাণ করা। গিন্নীমার সত্যিই বড় সূক্ষ্ম রুচিবোধ আছে।
এডওয়ার্ড বলল, এখন তাকে গিয়ে বলল, নতুন বাড়িটা আমি নিজে গিয়ে দেখতে চাই।
মালী ব্যস্ত হয়ে চলে গেল। মালী চলে গেলে এডওয়ার্ড একাই বাগান থেকে পুরনো প্রাসাদটাকে ফেলে রেখে নতুন বাড়িটাতে চলে গেল। তার স্ত্রী শার্লোতে তারই জন্য অপেক্ষা করছিল। শার্লোতে তাকে সঙ্গে করে উপরতলায় এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেল যেখান থেকে চারদিকের দৃশ্য সব দেখা যাবে।
সেখান থেকে চারদিকে খুঁটিয়ে দেখে সত্যিই খুশি হলো এডওয়ার্ড। বলল, সত্যি চমৎকার। তবে একটি ত্রুটি আছে। বাড়িটার আয়তন ছোট হয়ে গেছে।
শার্লোতে বলল, কিন্তু আমরা তো মাত্র দুজন প্রাণী। বেশি জায়গার দরকার কি? তাছাড়া এখানে দুজন ছাড়া আরও বেশি কিছু লোক ধরবে।
এডওয়ার্ড শান্ত কণ্ঠে বলল, দেখো, একটা কথা তোমাকে কদিন থেকে বলব ভাবছি, কিন্তু বলতে পারিনি। কিন্তু আজকের ডাকে একটা চিঠি পেয়ে আর না বলে পারছি না।
শার্লোতে বলল, আমিও এই রকম একটা কিছু লক্ষ্য করছি। কিন্তু কথাটা কি?
এডওয়ার্ড বলল, কথাটা আমাদের বন্ধু সেই ক্যাপ্টেনকে নিয়ে। তার এখন সত্যি বড় দুরবস্থা। তার মতো প্রতিভাবান কৃতিসম্পন্ন লোকের এইরকম অকর্মণ্য হয়ে পড়াটা
সত্যিই বড় দুঃখজনক। আমার কথা হলো এই যে ওকে আমরা এই বাড়িতে কিছুদিন রাখতে চাই
শার্লোতে শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলল, এ ব্যাপারটা কিন্তু একাধিক দিক থেকে ভেবে দেখতে হবে।
এডওয়ার্ড বলল, তার শেষ চিঠিখানিতে একটা চাপা অসন্তোষ ছিল। তবে যে কোনও কিছুর অভাব আছে তা নয়। আমার কাছ থেকে কোনও সাহায্য নিতেও সে অরাজি নয়। তা হবার কথা নয়। কারণ আমাদের দুই বন্ধুর জীবন এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে দেনাপাওনার হিসেব করা ভার। কে কার থেকে কত পাবে কেউ বলতে পারবে না। আর আসল কথাটা হলো এই যে, তার করার কিছু নেই। চুপচাপ কোলের উপর হাত গুটিয়ে বসে থাকা আর পড়া। এই কর্মহীন একাকীত্বে তার বেদনাটা তিনগুণ হয়ে যায়।
শার্লোতে বলল, তার পক্ষ থেকে আমি অনেক বন্ধু-বান্ধবকে চিঠি লিখেছিলাম। তাদের অনেকে তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল।
এডওয়ার্ড বলল, তা ঠিক। কিন্তু এই সব সাহায্যের প্রতিশ্রুতিই তাকে নূতন করে বেদনা দেয়। তারা যদি কোনও কাজ দেয় তাহলে তা গ্রহণ করলে ক্যাপ্টেনকে নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিতে হবে। আত্মবিক্রীত হতে হবে। আমি তার অবস্থাটা বেশ বুঝতে পারছি।
শার্লোতে বলল, বন্ধুর দুঃখে সমবেদনা জানানো খুবই ভালো কথা। কিন্তু আমাদের নিজের দিকটাও ভেবে দেখতে হবে।
এডওয়ার্ড বলল, আমি তা দেখেছি। খরচে কথা বলব না কারণ সে এখানে থাকলে অতি সামান্যই খরচ হবে। সে থাকলে আমাদের কোনও অসুবিধাই হবে না। বরং সুবিধা হবে। বাড়িটার ডানদিকে সে থাকতে পারবে। সে আমাদের বিষয় সম্পত্তির কাজ দেখাশোনা করতে পারবে। তার অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। গ্রামের লোকের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু চিন্তাশক্তি নেই। তথ্য পরিবেশনে কোনও যথার্থ্য নেই। আবার শহর থেকে যারা পড়াশুনা করছে তাদের চিন্তাশক্তি থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা নেই জমিজমা সম্বন্ধে। কিন্তু আমার বন্ধুর দুই-ই আছে। প্রাসাদের ব্রিজের সময়টা পার হয়ে গেলে তোমার কাজ আরও বেড়ে যাবে। তখন ও আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারবে।
শার্লোতে বলল, ভালো কথা। মানুষ বর্তমানটাকেই বড় করে দেখে। পুরুষরা কাজের লোক বলে এইরকম দেখাটাই স্বাভাবিক তাদের পক্ষে। কিন্তু মেয়েরা সব সময় সারা জীবনের কথা ভাবে। আমাদের অতীতটা একবার ভেবে দেখো। প্রথম যৌবনে আমরা ভালোবাসতাম পরস্পরকে। কিন্তু তোমার বাবা টাকা চাইলেন বলে একটা মোটা সম্পত্তির লোভে একটা বুড়ো মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন। আমারও এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাকে আমি ভালোবাসতে পারিনি। এইভাবে আমাদের বিচ্ছেদ হয়। কিন্তু তোমার স্ত্রী আর আমার স্বামী মারা যাওয়ায় সৌভাগ্যক্রমে আমরা মিলিত হই আবার। আকাঙ্ক্ষিত যে সুখ, অনাবিল অব্যাহত মিলনের যে আনন্দ একদিন আমরা পাইনি, সে সুখ সে আনন্দ আজ আমরা পূর্ণমাত্রায় পেতে চাই। তুমিও জীবনে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করেছ; আজ বিশ্রাম চাও। এর জন্য তোমারই কথায় আমার মেয়েকে বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার ভাইজিকেও অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছি।
এডওয়ার্ড বলল, আমি তোমার সব কথাই মেনে নিলাম। কিন্তু ক্যাপ্টেনের উপস্থিতি আমাদের এ মিলনকে কোনওভাবে ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
শার্লোতে তবু তর্কের ভঙ্গিতে বলল, আমি জানি অনেক মানুষের জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাব নানাভাবে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
এডওয়ার্ড বলল, তা ঘটিয়েছে এমন লোকদের জীবনে যাদের বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতা কিছুই নেই। যারা অন্ধের মতো চলে, নিজস্ব বিচারবুদ্ধি নেই, তাদের ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে।
