আমাদের প্রাচীনতম পরম পিতা যখন শান্ত হাতে
কৃষ্ণকুটিল মেঘমালা হতে বিদ্যুদ্দাম বিচ্ছুরিত করেন
তখন সেটাকে তার উজ্জ্বল পোশাকের অংশ ভেবে
চুম্বন করি, সঙ্গে সঙ্গে শিশুসুলভ এক বিকম্পনে
আলোড়িত হয়ে ওঠে আমার বুক।
কোনও মানুষ কখনও দেবতাদের সমান মহত্ত্ব অর্জন
করতে পারে না, কারণ যদি সে কোনও রকমে
তার উদ্ধত অহঙ্কারী মাথাটাকে নক্ষত্রদের রাজ্যে তুলে
নিয়ে যেতে পারে কখনও তাহলে সে কোথাও পাবে না
তার পা রাখার জায়গা, তখন সে হয়ে উঠবে
মেঘ আর বাতাসের হাতে অসহায় এক খেলার পাত্র।
যদি সে এই পৃথিবীর শক্ত মাটির উপর মাথা তুলে দাঁড়ায়
তাহলে তার সে মাথার উদ্ধত উচ্চতা এমন কি কোনও
ওক বা আঙ্গুর গাছের মাথার সমানও হতে পারবে না,
দেবতা তো দূরের কথা।
তাহলে দেবতা ও মানুষের মাঝে পার্থক্য কোথায়?
দুজনের মধ্যে অনন্তকাল থেকে বয়ে চলেছে
অসংখ্য তরঙ্গে তরঙ্গায়িত শাশ্বত এক ব্যবধানের নদী।
সে নদীর তরঙ্গ মাঝে মাঝে আমাদের উপরে তুলে দেয়।
কখনও বা আমাদের গ্রাস করে, আমাদের ভাসিয়ে বা ডুবিয়ে নিয়ে যায়।
এক সঙ্কীর্ণ আংটা দিয়ে ঘেরা আমাদের জীবনের অস্তিত্ব।
এইভাবে পাশাপাশি আমাদের অসংখ্য জীবনাস্তিত্বের
আংটা যুক্ত হয়ে অবিচ্ছিন্ন ও অব্যাহত করে তুলছে
আমাদের জীবনধারা ও বংশপরম্পর্যকে।
মেঘের রাজা (Erl konig)
We reitel so spat durch Neceht and Wind
কে এত রাত্রিতে এই উত্তাল বাতাসের মধ্য দিয়ে
ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছে জনমানবহীন পথের উপর দিয়ে?
কোনও এক শিশুপুত্রসহ পিতা যাচ্ছে, বনের মধ্যে
শিশুপুত্রটিকে চেপে ধরে কনকনে বাতাসের কামড় থেকে
রক্ষা করছে তাকে।
পিতা বলল পুত্রকে, হে আমার পুত্র, কেন তুমি মুখটাকে
ঢেকে রাখছ? পুত্র বলল, পিতা, দেখছ না উজ্জ্বল
পোশাক পরিহিত সোনার মুকুট মাথায় মেঘের রাজাকে?
পিতা বলল, ওটা আসলে রাজা নয়, মেঘের সৃষ্ট এক অলীক অবয়ব।
‘হে আমার প্রিয় শিশু, আমার সঙ্গে এস, আমি তোমার সঙ্গে
কত মজার মজার খেলা খেলব, নদীর ধারে কত ভালো ভালো ফুল আছে।
কত উজ্জ্বল চকচকে জমকালো পোশাক আছে আমার মার কাছে।’
পিতা, পিতা, শুনতে পাচ্ছ না, মেঘের রাজা কি বলছে আমার কানে কানে
‘চুপ করো পুত্র, ও হচ্ছে শুকনো পাতায় লাগা বাতাসের শব্দ।’
‘শোনো শোনো হে শিশু, তুমি আমার কাছে আসবে? আমার মেয়ে
তোমার দেখাশোনা করবে, রোজ রাতে সে নাচবে, তোমায় ঘুম পাড়াবে।’
শোনো, শোনো পিতা, মেঘের রাজার কন্যাকে দেখতে পাচ্ছ না?
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার সুন্দর চেহারা মুগ্ধ করেছে
আমাকে, যদি তুমি আমার কাছে না আস তাহলে জোর করে
তোমায় ধরে আনব আমি, জোর করে টেনে আনব তোমায়।
পিতা পিতা, দেখতে পাচ্ছ না, মেঘের রাজা আমায় ধরে
নিয়ে যাচ্ছে, আমায় আঘাত করেছে। হা হা, মেঘের রাজা–
ভীত সন্ত্রস্ত্র পিতা তাই ঘোড়ায় চেপে তার আহত পুত্রকে নিয়ে
পালিয়ে যাচ্ছে অজানার পথে। কোনও রকমে একটা গ্রাম খামারে
তাকে পৌঁছতে হবে। কিন্তু হায়, ছেলেটা তার পিতার কোলেই মারা গেল।
বীণাবাদকের গান (Herfenspieler)
Wer nie sein Brot mit Trunen
যার কষ্টার্জিত রুটির উপরে চোখের জল ঝরে পড়েনি,
যে কখনও সারারাত বিছানায় বসে কেঁদে কাটায়নি,
সে কখনও ঈশ্বরের মহিমাকে জানতে পারেনি।
হে ঈশ্বর, তুমিই আমাদের জীবন দান করো,
দরিদ্রদের অন্তরকে দোষ দিয়ে কলুষিত করো তুমিই।
তারপর দুঃখের সীমাহীন যন্ত্রণায় তুমিই তাদের ফেলে দাও।
মিগনন (Mignon)
Kennest du das land
তুমি কি জান সে দেশের ঠিকানা যেখানে লেমন ফুল ফোটে
থোকা থোকা, যেখানে সোনারবরণ কমলালেবু চকচক করতে থাকে
ঘন শ্যামল পাতার ফাঁকে ফাঁকে, যেখানে সবুজ বাতাস
ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে নীল আকাশ থেকে আর
মার্বেল গাছগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো?
সে দেশের ঠিকানা তুমি জান কি? আমি তোমাকে নিয়ে যাব সেই দেশেই।
সেখানকার বাড়িটা তোমার জানা আছে যার বিরাট ছাদটা
দাঁড়িয়ে আছে কতকগুলো স্তম্ভের উপর, যার সুসজ্জিত হলঘর
আর উজ্জ্বল প্রকোষ্ঠগুলো নির্জনতায় স্তব্ধ হয়ে আছে আর
মর্মর প্রান্তরের প্রতিমূর্তিগুলো তোমারই পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে?
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি সেখানেই যাব, সেই দেশেই যাব।
সে দেশের পথ তুমি জান কি?
চারদিকের বড় বড় পাহাড়গুলোর মাঝখান দিয়ে কুয়াশাঘেরা পথগুলো
এঁকেবেঁকে চলে গেছে, যেসব পাহাড়ের গুহায় প্রাচীন ড্রাগন
বাস করে, কত ঝর্না ঝাঁপিয়ে পড়ে যাদের মাথা থেকে।
সেই পাহাড়ি পথ দিয়ে আমরা সেখানে সেই দেশেই যাব প্রিয়তমা।
নিয়তির গান (Parzenlied)
Es furchte die Gotter
মানব সন্তানদের অবশ্যই ভয় করে চলতে হবে দেবতাদের।
কারণ দেবতাদের শ্বাশত হাতেই আছে আইনকানুনের
যত সব অনুশাসন যা তারা ইচ্ছামতো প্রয়োগ করতে পারেন।
যে সব মানুষকে দেবতারা তুলে দেন উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে।
সেই সব মানুষরা থাকে আরও ভয়ে ভয়ে, কারণ
সেই শিখরের উপর যেখানে দেবতাদের ভোজসভা বসে সেখানে
আছে বড় বড় মেঘের খাড়াই পাহাড় আর তার মাঝে মাঝে আছে
সীমাহীন শূন্যতা যেখানে একটু কোনও ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটলেই
মানুষকে পড়ে যেতে হবে তলিয়ে যেতে হবে সীমাহীন অন্ধকার
আর শূন্যতার মাঝে।
অথচ দেবতারা অবলীলাক্রমে এক মেঘের পাহাড় থেকে
আর এক পাহাড়ে যাওয়া-আসা করেন, সোনার টেবিলে
অনন্তকাল ধরে চলে তাদের ভোজসভা।
এইসব দেবতারা কোনও মানুষকে ভালোবাসলেও তার
বংশধরদের পরে চিনতে পারেন না, ভালোবাসেন না।
এ কথা নিয়তির, নিয়তির এ গান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত
হয়ে চলেছে পাহাড়ে-পর্বতে আবহমান কাল হতে।
রোমক শোকগাথা-১ (Romische Elegien)
Froh empfind cih mich nun
