আমার জীবনের সব শান্তি চলে গেছে, নীরব ব্যথাভারে
ভারী হয়ে উঠেছে আমার অন্তর, সে শান্তি ফিরে পাব না আর কখনও
না, আর কখনই না।
যে সব জায়গায় সে নেই সে সব জায়গা এক একটা আস্ত কবর
বলে মনে হয় আমার কাছে, সমস্ত জগৎটা হয়ে ওঠে দুঃসহভাবে তিক্ত
আমার মাথা ঘুরে গেছে, মন হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন।
আমার জীবনের সব শান্তি চলে গেছে, অন্তর হয়ে উঠেছে ভারী
এ শান্তি আর কখনও ফিরে পাব না জীবনে।
আমি আমার ঘরের জানালা দিয়ে কখনও তাকালে
শুধু তারই খোঁজ করি, ঘরের বাইরে গেলে যেন এগিয়ে যাই তারই দিকে।
তার সুন্দর চেহারা, মুখের হাসি, চোখের দৃষ্টি, কথা বলার ভঙ্গিমা,
হাতের মৃদু চাপ আর চুম্বন–না না আমি কখনও ভুলব না।
আজ আমার অন্তর একান্তভাবে চাইছে শুধু তার অন্তরকে
আর দেহ চাইছে তার দেহকে প্রাণভরে আলিঙ্গন ও চুম্বন করতে,
চাইছে তার চুম্বনের দুরন্তমধুর চাপে সমস্ত চেতনা হারিয়ে ফেলতে।
হ্রদের ধারে (Auf dem see)
und frische Nahrung, neus blut
আমি এখন এই মুহূর্তে বিরাজ করছি উদার প্রকৃতির বুকের উপর।
সহস্রধারার উৎসারিত বুকে তার বুকের রক্ত পান করছি আমি।
আর অফুরন্ত প্রাণবায়ু শোষণ করে নিচ্ছি আমি
আমার শুষ্ক নিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে।
এইভাবে সজীব ও সতেজ হয়ে উঠছি আমি, ফেটে পড়ছি
অদম্য প্রাণশক্তির অমিত উচ্ছ্বাসে।
ঢেউ-এর তালে তালে আমাদের নৌকোটা দুলছে
অভ্রলেহী পাহাড়গুলো প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পথের দু’পাশে।
হে আমার আয়ত উদার চক্ষু, কিসের ভারে অবনত হচ্ছ তুমি?
সোনালী স্বপ্নগুলো আবার ফিরে এসেছে? কিন্তু আমি তো
বিদায় দিয়েছি তাদের। চলে যাও হে সুবর্ণ স্বপ্নরাজি, কোনও প্রয়োজন নেই
এখানে তোমাদের, কারণ এখানে আছে জীবন, আছে প্রেম।
তরঙ্গায়িত এ হ্রদের জলে সোনার মতো কাঁপতে থাকে
আকাশের অসংখ্য তারার প্রতিফলন, দু পাশের নুয়ে পড়া গাছের
পরিণত ফলেরা প্রতিবিম্বিত হয়ে উঠে সে জলে।
আর ঠিক তখনি পলাতক নরম কুয়াশার দল দিগন্তের বুকে
ঘন হয়ে পান করতে থাকে আশ্চর্য এক আলোর নির্যাস।
শরৎ (Herbstgefule)
Fetter grine, du lamb
আমার জানালার ধারে বেড়ে ওঠা হে আঙ্গুরলতার
পাতাগুলো, তোমরা আরও সবুজ হয়ে ওঠ।
হে জাম ফলের দল, তোমরা বড় হও, পরিণত
ও পূর্ণাবয়ব হয়ে ওঠ আরও তাড়াতাড়ি।
সূর্যমাতার শেষ দৃষ্টির রশ্মি মমতার তাপ দান করেছে তোমাদের
উদার আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে নীল স্নেহের পশরা
চাঁদের মিষ্টি নিশ্বাস শীতল করেছে তোমাদের দেহগাত্রকে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমার সজীব প্রেমের তপ্ত অশ্রুর দ্বারা।
সিক্ত হচ্ছ তোমরা।
নৈশ পথিকের গান-১ (Wandurers Nacthlic)
Der du wib dem Himmel bist
তুমি স্বর্গ থেকে নেমে এসে আমার দুঃখ-বেদনার
সব আবেগকে স্তব্ধ করে দাও। আবার আমাদের মতো
যারা হতভাগ্য তাদের অন্তর পূর্ণ করে দাও দ্বিগুণ সান্ত্বনা দিয়ে।
কিন্তু এই সব আনন্দ-বেদনার অর্থ কি? আমার এসব ভালো লাগে না।
হে মধুর শান্তি, আমার বুকে এস, বুকে এস আমার
আর আমি কিছুই চাই না।
২
সমস্ত পাহাড় আর গাছের মাথাগুলো শান্ত, আশ্চর্যভাবে শান্ত
চারদিকে এত শান্ত যে কারও নিশ্বাস পর্যন্ত শোনা যায় না।
অনবরত কিচমিচ করতে থাকা ছোট ছোট পাখিগুলো
বনের গভীরে চলে গেছে। একটু থামো,
সব বিক্ষোভের ঢেউ পেরিয়ে শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে উঠবে
তোমারও অন্তরাত্মা।
ওদের মতো তুমিও শান্ত হয়ে উঠবে, নীরব হয়ে উঠবে।
চাঁদের প্রতি (An dev Mond)
Fullest wieder Bisch and Tal
আবার তুমি সমস্ত অরণ্য আর উপত্যকাকে তোমার
কুহেলিকাময় ঐশ্বয়ের প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দিয়েছ।
অবশেষে আমার আত্মাকে মুক্তি দিয়েছ তুমি।
পরম বন্ধুর মতো তুমি তোমার স্নিগ্ধ দৃষ্টির আলো
ছড়িয়ে দিচ্ছ তোমার প্রতিটি ঊষর প্রান্তরে।
অতীতের সুখ-দুঃখের প্রতিটি শব্দ ধ্বনিত
প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছে আমার শূন্য অন্তরে।
একা একা আনমনে পথ হেঁটে চলেছি আমি, আমার পথের দু’ধারে
কত আনন্দ-বেদনার ফুল ফুটে আছে, অথচ তাদের দিকে
আমি ফিরেও তাকাই না, শুধু এগিয়ে চলি আমি এক একা।
হে নদী, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গর্জন করতে করতে
ছুটে চল তুমি, আমি জানি সব হাসি সব চুম্বন মিথ্যা।
আজকের এই মূল্যবান রত্নটি একদিন লাভ করেছিলাম
আমি, একথা আজ ভুলে যেতে চাই আমি।
পাহাড় আর উপত্যকার মধ্য দিয়ে অশান্ত বেগে ছুটে চলো নদী।
শীতের রাতে বা মুক্তোর মতো বসন্তের সকালে
সমানভাবে তুমি বয়ে চলো, গর্জন করতে করতে ছুটে চলো।
কোনও রাগ দুঃখ না করে সে সব আসক্তিকে ঝেড়ে ফেলে
সরে যেতে পারে জগৎ থেকে সেই সুখী। সেই একমাত্র সুখী।
হায়, অন্তহীন রাত্রির অন্ধকারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও অবজ্ঞাত অবস্থায়
এক একা অন্তরের গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়ানো সত্যিই কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার!
জলের উপর আত্মার গান (Gesung der Geister uber der Wassen
Des menchen Seele
মানুষের আত্মা ঠিক জলের মতন, জল যেমন
আকাশ থেকে পড়ে আকাশেই উঠে যায়; আবার
পৃথিবীতেই ফিরে আসে তেমনি মানুষের আত্মাও
স্বর্গ থেকে আসে, স্বৰ্গকামনায় উন্মুখ থাকে সারাজীবন
অবশেষে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে।
পাহাড়, পর্বত হতে যে স্বচ্ছ জলধারা বেড়ে ঝরে পড়ে
পৃথিবীর সমতলে সেই জল বাষ্পীভূত হয়ে পরিণত হয়
ঘন মেঘে, যে মেঘ বৃষ্টির স্বচ্ছ রূপালি জল
হয়ে ঝরে পড়ে মাটির পৃথিবীতে।
সমতলভূমি এ জলের গতি যেখানে অব্যাহত অপ্রতিহত
সেখানে সে শান্ত স্বচ্ছ, সেখানে সে মাথার আকাশ
দু’পাশের পাহাড় আর গাছপালার প্রতিফলন স্বচ্ছন্দে
ধারণ করে তার শান্ত বুকে।
কিন্তু বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চল যেখানে পদে পদে গতি তার
ব্যাহত ও প্রতিহত সেখানে উচ্ছল প্রতিবাদে সে ফেনায়িত।
বাতাস জলকে দেখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে তার তরঙ্গমালাকে।
তাই জলও বাতাসকে দেখে ফুলে ওঠে আনন্দে, আবেগে উচ্ছ্বাসে।
হে মানবাত্মা, তুমি কত জলের মতো, তোমার ভাগ্য
বাতাসের মতোই কতই না অস্থির, কতই না চঞ্চল।
মানবতার সীমা (Grenzen der Menschlitef)
Wenn der uralte
