রানির মোট তিনজন সহচরী ছিল। একজন তার হাতির দাঁতের চেয়ার, একজন পাখা আর একজন বীণা ধারণ করে থাকত। অবশ্য আর একজন নূতন যুবতী সহচরীকে দেখা গেল।
আর সে হচ্ছে সেই বৃদ্ধা। এখন যুবতীতে পরিণত হয়ে উঠেছে হঠাৎ। বাতি হাতে বৃদ্ধা তা দেখে বলল, তুমি এখন যুবতী হয়েছ, আগে আমার স্ত্রী ছিলে। এখন তুমি যে কোনও যুবককে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে পার আজকের এই শুভদিনে।
যুবতী বলল, তুমি বুঝতে পারছ না তুমি নিজেও তো যুবক হয়ে উঠেছ।
এদিকে সূর্য ক্রমশ আকাশের উপরে উঠতে লাগল। সেই বিরাট আকাশদৈত্যটা সেতুর উপর দিয়ে যেতে যেতে হাত দিয়ে সূর্যটা আড়াল করায় তার বিশাল হাতের কালো ছায়ায় অস্বস্তি অনুভব করছিল চলমান জনতা। অনেকে ভয়ে নদীর জলে পড়ে যাচ্ছিল। তাই দেখে নূতন রাজা দৈত্যকে আক্রমণ করার জন্য তরবারি নিষ্কাশন করতে যাচ্ছিল। কোমর থেকে কিন্তু বৃদ্ধ তাকে নিবৃত্ত করল। বলল, ওর সময় হয়ে এসেছে। এখনি ওর ছায়া চিরতরে অপসারিত হবে।
সত্যিই দৈত্যটি হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল পথের উপর। তার বিপুলকার মৃতদেহটার চারদিকে ভিড় জমে উঠল কৌতূহলী মানুষের।
অবশেষে জনতা নূতন রাজা ও রানিকে দেখার জন্য মন্দিরের দিকে আসতে লাগল। রাজা ও রানিকে দর্শন করে ফিরে যাবার পথে জনতা অবাক চোখে দেখল তাদের পথে সোনার টুকরো ঝরে পড়ছে। শুধু একবার নয়, পথের কয়েক জায়গায় কয়েকবার এই ঘটনা ঘটল।
কবিতাগুচ্ছ
বসন্ত দিনের কবিতা (Mailied)
Wie herlick leucher mir die Natur
দেখ দেখ, প্রকৃতি কেমন নববধুর মতো
নবসাজে সজ্জিত হয়েছে শুধু আমারই জন্য;
দেখ দেখ, কেমন সূর্যের আলো হাসি হয়ে
ঝরে পড়ছে কুয়াশা ভেজা মাঠে মাঠে।
ফুল ফুটে উঠেছে প্রতিটি গাছের ডালে ডালে
হাজার কণ্ঠে ফেটে পড়ছে অরণ্যের নীরব আত্মা।
হে পৃথিবী, হে সূর্য, হে সুখ, তোমরাও
ফুটে ওঠ মানুষের বুকে বুকে;
হে আমার প্রেম, সবুজ পাহাড়ের উপর ঝুলতে থাকা
সোনালী মেঘের মতো ঝুলতে থাকো আমার অন্তরের আকাশে।
ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক আমার জীবনের শূন্য প্রান্তর।
হে আমার প্রিয়তমা, আমার গভীর ভালোবাসা
কত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তোমার মদির চোখের
নীল তারার গভীরে; আমি তোমাকে ভালোবাসি
ঠিক যেমন উড়ন্ত চিল ভালোবাসে নীল আকাশকে,
ঠিক যেমন সকালের ফুল ভালোবাসে আকাশের সোনালী গন্ধকে।
তুমি আমাকে দিয়েছ যৌবনের আনন্দ, তাইতো
আমি তোমাকে ভালোবাসি আমার রক্তের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে।
আমার সুখে আমার ভালোবাসার সুখে চিরসুখী হও প্রিয়তমা।
পথের ধারে গোলাপ (Heidenros lein)
Sah ein knub ein Koslein Stehn
পথের ধারে ফুটে ওঠা এক রক্ত গোলাপ দেখে
একটি ছেলে ছুটে গেল তার দিকে।
আহা কি সুন্দর গোলাপ, তাজা রক্তের মতো টকটকে লাল।
ছেলেটি বলল, ‘গোলাপ, আমি তোমায় তুলব।’
গোলাপ বলল, ‘আমাকে তুললে আমি তোমাকে।
কাঁটা দিয়ে বিধব যাতে আমার কথা চিরকাল মনে থাকে।’
দুষ্টু ছেলেটা সত্যি সত্যিই গোলাপটাকে তুলে ফেলল।
বৃন্ত থেকে আর গোলাপটাও তাকে বিধতে লাগল
কাঁটা দিয়ে; চিৎকার বা অভিযোগ অনুযোগে কোনও ফল হলো না।
অবশেষে গোলাপকে হার মানতে হলো
ছেলেটার দুষ্টুমির কাছে, সহ্য করতে হলো তার অশালীন ঔদ্ধতের রঙিন উচ্ছ্বাসকে।
অভ্যর্থনা ও বিদায়
Es Schling Meain Hez
আমি ঘোড়ায় চাপতেই আমার মনের আগেই
আমার অন্তরটা দ্রুত স্পন্দিত হতে হতে চলে গেল সেখানে।
রাত্রির কোলে প্রথমে ঢুকে গেল পৃথিবী আর তার পাহাড়গুলো।
কুয়াশায় গা ঢেকে বিশাল দেহী ওকগাছগুলো রইল দাঁড়িয়ে
আর ঝোঁপঝাড়ের ভিতর থেকে অন্ধকার
উঁকি মারতে লাগল অসংখ্য ভীরু কালো চোখ মেলে।
এমন সময় মেঘের পাহাড় থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ;
বাতাস আমার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল পাখা মেলে।
রাত্রির পেট থেকে বেরিয়ে আসা দানবগুলো
আমাকে ভয় দেখাতে লাগল বিভিন্নভাবে,
কিন্তু আমার সাহস আর সংকল্পের কাছে হার মানল তারা।
আমার রক্তে ছিল এক ভয়ঙ্কর উত্তাপ, চোখে ছিল দুঃসাহসী আলো।
তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তোমার চোখ থেকে
বেরিয়ে এল এক উদার আলোর ঝলকানি, তোমার মুখের
আনন্দকে ঘিরে ছিল এক উজ্জ্বল বসন্তের সমারোহ।
আমার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল আনন্দে।
হে ঈশ্বর, আমি এতখানি আশা করিনি, আমি এর যোগ্য নই।
কিন্তু হায়, সকলের সূর্য সরে যেতেই বিষাদ নেমে এল অন্তরে;
তোমার চুম্বনে যে আনন্দ পেয়েছিলাম সে আনন্দ
দুরন্ত বেদনা হয়ে নেমে এল তোমায় চোখের কম্পমান পাতায়।
আমি বিদায় নিলাম তোমার কাছ থেকে তুমি তাকিয়ে রইলে
আমার পথপানে তাকিয়ে রইলে সজল চোখে।
তবু ভালোবেসে ও ভালোবাসা পেয়ে যে সুখ পেয়েছি
সে ঈশ্বর, কেন তার কোনও তুলনা নেই? কেন, কেন?
গ্যানিমেড (Ganymed)
Wie in Morgeglanz
হে আমার প্রিয় বসন্ত, সকালের আলোয় কত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তোমায়
তোমার প্রেমের উত্তাপ আমার বুকে নিয়ে আসছে
অফুরন্ত সৌন্দর্য আর আনন্দের রঙিন সমারোহ।
আমি যদি তোমায় বুক ভরে আলিঙ্গন করতে পারতাম!
আমি যখন তোমার বুকে শুয়ে থাকি তোমার ফুল তোমার ঘাস
এসে বাধা বাঁধে আমার বুকের মাঝে।
তোমার দেহগ্রাত্রের বাতাস শীতল করে দেয় আমার বুকের
জলন্ত কামনাকে, কালের বাতাস হাত বুলিয়ে দেয় আমার গায়ে?
কুয়াশাঘেরা উপত্যকার ওপর থেকে নাইটিঙ্গেলরা আমায় ডাকে।
‘যাচ্ছি’ বলে ছুটে যাই আমি, ক্রমাগত উঠতে থাকি ওপরে।
মেঘেরা নেমে আসে। আমি চিৎকার করে বলি, হে পিতা,
তোমার বুকে স্থান দাও, আমাকে আলিঙ্গন করো।
থেলের রাজা (Der koning in Thale)
থেল দেশে এক রাজা ছিলেন।
তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুকালে এক সোনার কাপ দিয়ে যান রাজাকে।
রাজা জীবনে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই কাপটিকে,
যতবার তিনি মদপান করতেন সেই কাপ থেকে,
যতবার ভোজসভায় সেটিকে ব্যবহার করতেন ততবারই
চোখ থেকে জল ঝরে পড়ত তাঁর।
মৃত্যুকালে রাজা গোটা রাজ্যে ও রাজ্যের সব কিছু
নিঃশেষে দিয়ে গেলেন তাঁর উত্তরাধিকারীদের।
কিন্তু সেই কাপটি কাউকে দিলেন না।
তারপর এক শেষ ভোজসভায় শেষবারের মতো সেই কাপ থেকে
মদপান করে জানালা দিয়ে কাপটিকে ফেলে দিলেন।
প্রাসাদের পাশে বয়ে যাওয়া সমুদ্রের জলে।
স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রাজা পতনশীল
সেই কাপটির দিকে, তাকে ডুবে যেতে দেখলেন ধীরে ধীরে
তারপর চক্ষু দুটি মুদ্রিত হয়ে এল আপনা থেকে
জীবনের সব মদ পান করা হয়ে গেছে তার।
প্রমিথিযূস (Promeiheus)
হে জিয়াস, তোমার মেঘাস্ত্র দ্বারা সমস্ত স্বর্গলোক
সমস্ত অন্তরীক্ষ ছেয়ে দাও, পাহাড়ে পর্বতে
কাঁটাগাছ উপড়ে ফেলতে থাকো অর্বাচীন বালকের মতো
তোমার শক্তির পরিচয় করো ইচ্ছামতো।
অনেক কষ্টে গড়ে তোলা আমার পৃথিবী
তুমি ভেঙে দাও, যে ঘর তুমি কোনওদিন নিজে বাঁধনি
যে ঘরের শান্তির আস্বাদ নিজে কখনও পাওনি,
আমার সেই কত সাধের ঘরের শান্তি পুড়িয়ে ছারখার করে দাও।
হে স্বর্গস্থ দেবতাবৃন্দ, এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে
তোমাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া মানুষের উৎসর্গ আর অঞ্জলির উপর
বেঁচে থাকতে হয় তোমাদের; ভিক্ষুক আর শিশুর মতো নির্বোধ
আশাবাদী ঐ সব মর্ত মানুষগুলো না থাকলে অনশন করতে
হতো তোমাদের, শুকিয়ে মরতে হতো স্বর্গের সমস্ত দেবতাদের।
যখন আমি শিশু ছিলাম এবং এবং কোনও ব্যাপারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়তাম,
তখন সূর্যের দিকে বিহ্বল দৃষ্টি তুলে কাতর প্রার্থনা জানাতাম
অলক্ষ্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে, ভাবতাম তারা শুনতে পাবে আমার কথা।
কিন্তু উদ্ধত অত্যাচারী টিটানদের হাত থেকে কে আমায় রক্ষা করেছে?
কে আমায় রক্ষা করেছে নিশ্চিত মৃত্যু আর দাসত্বের নিষ্ঠুর কবল থেকে?
হে আমার উজ্জ্বল অন্তরাত্মা, তুমি কি নিজেকে নিজে উদ্ধার করনি?
অথচ নিজেকে নিজে উদ্ধার করে সে উদ্ধার জন্য শৈশবসূলভ
অজ্ঞতাহেতু ধন্যবাদ দিয়েছ সেই সব উদাসীন দেবতাদের।
কেন আমি তোমার সম্মান করব জিয়াস? কি কারণে?
তুমি কি কখনও আমার ভারাক্রান্ত হৃদয়ের ব্যথাভার দূর করেছ?
তুমি কি কখনও আমার ত্রাসক্লিষ্ট দুচোখের অশ্রু মুছিয়ে দিয়েছ?
সর্বশক্তিমান কাল আর শাশ্বত নিয়তি কি তোমার আমার
দুজনেরই অবিসম্বাদিত প্রভু নয় যারা আমায় সামান্য মানুষের পরিণত করেছে?
তুমি কি মনে ভাব আমার অপুষ্পিত স্বপ্নগুলো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠতে
পারেনি বলেই আমি জীবনকে ঘৃণা করতে থাকব, চলে যাব দূর অরণ্যে?
কিন্তু জেনে রেখো আমি এখানে এই পৃথিবীর বুকেই বসে আছি এবং থাকব,
মানবজাতিকে গড়ে তুলব আমার মনের মতো করে।
তারা হয়ে উঠবে আমারই মতো পৌরুষে অপরাজেয়, সুখে-দুঃখে অবিচলিত
তারা দুঃখ ভোগ করবে, কাঁদবে, আনন্দে উদ্বেল হবে।
আর আমারই মতো তোমার মতো যত সব দেবতাদের উপেক্ষার চোখে দেখবে।
চরকায় চাকায় (Greecheer am Spinnrrade)
Mein Ruh ist hin
