রাক্ষসী সেতুর রূপ ধারণ করে ওদের সবাইকে নদী পার দিল। নদীর ওপারে গিয়ে রাক্ষসী বলল, আমি নিজের জীবন দিয়ে ওদের বাঁচাব। তারপর পদ্মকে বল, তোমার দুটি হাতে একটি মৃতদেহের উপর আর একটি হাত আমার উপর রাখো।
পদ্মর একটি হাতের স্পর্শে যুবক ও তার সেই পাখিটি বেঁচে উঠল। যুবক উঠে দাঁড়াল। তবে তার স্মৃতি তখনও ফিরে আসেনি। আর একটি হাতের স্পর্শে রাক্ষসীর অসংখ্য মূল্যবান ধাতুর টুকরো ঝুড়িতে ভরে ভাসিয়ে দেওয়া হলো নদীর জলে।
এরপর বৃদ্ধ পরীদের বলল, আমি তোমাদের সেই মন্দিরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। তোমাদের কাছে আছে মন্দিরের চাবিকাঠি। তোমরা চাবি খুলে দিলে আমরা প্রবেশ করব তার মধ্যে।
ওরা গিয়ে দরজা খুলে মন্দিরের ভিতরে ঢুকতেই সোনার রাজা বলে উঠল, কোথা হতে আসছ তোমরা?
বৃদ্ধ তার বাতি হাতে বলল, পৃথিবী হতে।
রূপের রাজা বলল, কোথায় যাবে তোমরা?
বৃদ্ধ উত্তর করল, পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছি।
পিতলের রাজা বলল, কি চাও তোমরা আমাদের কাছে?
বৃদ্ধ বলল, তোমাদের নিয়ে যেতে এসেছি।
চতুর্থ রাজা কি বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সোনার রাজা বলল, তোমরা চলে যাও। আমার এ সোনা তোমাদের জন্য নয়।
এরপর তারা রূপোর রাজার কাছে গেল। রাজা বলল, আমি তোমাদের খাওয়াতে পারব না। তোমরা অন্য কোথাও যাও।
এরপর তারা চতুর্থ রাজার কাছে যেতে রাজা জিজ্ঞেস করল, কে বিশ্বকে শাসন করবে?
বৃদ্ধ উত্তর করল, যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।
রাজা বলল, তাহলে সে হচ্ছে আমি। বৃদ্ধ বলল, সময়ে হয়ে গেছে। কিন্তু পরেই দেখা যাবে।
পদ্ম তখন চতুর্থ রাজার ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে চুম্বন করল। হে দয়ালু পিতা, তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। এই বলে মূর্তিটাকে জড়িয়ে ধরল পদ্ম। গোটা পৃথিবীটা কেঁপে উঠল। গোটা মন্দিরটা ভয়ঙ্করভাবে দুলতে লাগল। যুবকটি ভরে বুড়িকে জড়িয়ে ধরল।
এবার ওরা বুঝতে পারল মন্দিরটা একটা বিরাট জলজাহাজের মতো এগিয়ে চলেছে। বৃদ্ধ বলল, আমরা নদীর উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা শীঘ্রই আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছব।
মন্দিরের কড়িবরগাগুলা ভেঙে পড়তে লাগল। যুবককে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিতে লাগল বৃদ্ধ। বুড়ির কাছে ছিল পদ্ম। হঠাৎ গুপ্ত পাহাড়ে ধাক্কা লাগা জাহাজের মতো আটকে গেল চলমান মন্দিরটা। ওরা অন্ধকারে বুঝতে পারল এটা কুঁড়েঘরের সামনে এসে পড়েছে ওরা। ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ। একটা বাতি জ্বলছে ঘরের ভিতরে।
দরজা খুলে গেলে দেখা গেল সেখানে ফেরিঘাটের মাঝি রয়েছে। বৃদ্ধ তার বাতির আলো দেখাল। যুবক একটি জায়গায় বসল। পদ্মকে বসাতে হলো অন্য জায়গায়। বৃদ্ধা বলল, আমার হাতটা কালো হয়ে রইল। ছোট হতে হতে এটা এবার উবে যাবে।
বৃদ্ধ বলল, সকালের আলো ফুটে উঠতেই নদীতে স্নান করে আসবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বৃদ্ধা ভয়ে ভয়ে বলল, নদীর ঋণ শোধ করা হয়নি। স্নান করলে আমার গোটা দেহ কালো হয়ে যাবে।
বৃদ্ধ বলল, সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে।
সকাল হতে প্রথম সূর্যের আলো ফুটে উঠতেই বৃদ্ধ চিৎকার করে বলল, ‘জ্ঞানবিদ্যা, রূপ আর শক্তি-এই তিনটি জিনিসই পৃথিবীকে চালায়। এই তিনটি শব্দের নাম করার সঙ্গে সঙ্গে সোনার, রূপোর ও পিতলের তিনজন রাজা উঠে একে একে। কিন্তু চতুর্থটি মাটির তলায় ঢুকে গেল।
এরপর বৃদ্ধ লাঠি হাতে যুবককে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। পিতলের রাজার সামনে এসে থামল ওরা। রাজা যুবককে বলল, বাঁ হাতে এই অস্ত্র ধারণ করো। ডান হাতটি মুক্ত রাখো।
পরে ওরা রূপের মূর্তির কাছে গেছে মূর্তিটি তার হাতে রাজদণ্ডটি দিয়ে বলল, তুমি আমার সব ভেড়া অর্থাৎ গবাদি পশুগুলো গ্রহণ করবে ও বেড়াবে।
সোনার রাজা তার গলায় ওক পাতার মালা পরিয়ে দিয়ে বলল, সব সময় মহানকে বরণ করে নেবে।
এবার বৃদ্ধ লক্ষ্য করল, তিন রাজার কাছ থেকে অস্ত্র, রাজদণ্ড আর মালা-এই তিনটি জিনিস পেয়ে যুবকটির দেহমনে একটি বিরাট পরিবর্তন এসেছে। অস্ত্র ও রাজদণ্ড লাভ করে সে দেহে পায় প্রচুর শক্তি। আর মনে পায় দৃঢ়তা। আর ওক পাতার মালাটি গলায় পরার সঙ্গে সঙ্গে মুখখানি হয়ে ওঠে অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। এবার সে হারানো স্মৃতি ফিরে পায়।
যুবকটি তখন আবেগের সঙ্গে বলে ওঠে, হে আমার প্রিয়তমা পদ্ম, তোমার খণ্ড অন্তরের সূচিতা ও ভালোবাসার থেকে পৃথিবীতে অন্য কি আকাক্ষার বস্তু থাকতে পারে?
এরপর বৃদ্ধের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, হে আমার প্রিয় বন্ধু, আর একটি শক্তির কথা ভুলে গেছ তোমরা। তা হলো প্রেমের শক্তি।
এই বলে যে অবগুণ্ঠিত পদ্মকে আলিঙ্গন করল। পদ্মের গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। বৃদ্ধ হাসিমুখে বলল, প্রেম শাসন করে না, তবে নিয়ন্ত্রিত করে।
এতক্ষণ ওরা লক্ষ্য করেনি। এবার ওরা দেখল নদীর ধারে এক বিরাট সেতু নির্মিত হয়েছে। নদীর বুক থেকে স্তম্ভ গড়ে উঠে সে সেতুকে ধারণ করে আছে। তার উপর দিয়ে জলস্রোত এগিয়ে আসছে। অসংখ্য নরনারী এপারের সেই মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের নতুন রাজা ও রানিকে অভিবাদন জানাতে আসছে।
বৃদ্ধ বলল, সেই রাক্ষসীর স্মৃতির প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করো। কারণ সেই তোমাদের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন দান করে। এই নদীর সেতুও গড়ে উঠেছে তারই প্রচেষ্টায়।
