বুড়ি বলল, সে কোনও দুঃখ ও বিপর্যয়ের অবসান হবেই। তারপরেই আবার সুখ। কোনও চিন্তা নেই। আমি তাহলে চলি। নদীকে আমার প্রতিশ্রুত ফুলগুলো এনে না দিলে আমার হাতটা এমনি কালো আর ছোট রয়ে যাবে।
যাবার সময় ঝুড়ি থেকে সেই পাথরটা বার করে বলল, এটা আমার স্বামী উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছে তোমাকে। আমাদের কুকুর মপ পাথর হয়ে গেছে। একে তুমি জীবন দান করে নিজের কাছে রেখে দেবে। এ তোমাবে বড় আনন্দ দেবে। আমরা। তাতেই সুখী হব।
পদ্ম বলল, তুমি তাহলে আমার পাখিটিকে নিয়ে যাও। তোমার স্বামীকে বলে এর মৃতদেহটিকে পাথরে পরিণত করে দেবে। পরে আমি একে জীবন দান করে আবার পাখিতে পরিণত করব। তখন এই পাখি আর তোমাদের মপ আমার কাছে থেকে আমাকে আনন্দ দান করবে।
বুড়ি ঝুড়ি মাথায় করে চলে যেতেই সবুজ রাক্ষসী এসে হাজির হলো। এসে পদ্মকে বলল, মন্দির নির্মিত হয়ে গেছে।
পদ্ম বলল, কিন্তু সে মন্দির নদীর উপরে দাঁড়িয়ে নেই কেন?
রাক্ষসী বলল, আমি রাজাদের সঙ্গে দেখা করেছি ও কথা বলেছি।
পদ্ম বলল, কখন তারা জানাবে?
রাক্ষসী বলল, আমি নিজের কানে এক আকাশবাণী শুনেছি, সময় হয়ে গেছে। আর দেরি নেই।
পদ্মের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এমন সময় তার তিনজন সহচরী এসে প্রস্তুত হয়ে উঠল তার সেবার জন্য। পদ্ম তখন সেই পাথরটার উপরে ঝুঁকে কি করতেই মপ বেঁচে উঠল। মপকে নিয়ে খেলায় মেতে উঠল পদ্ম। চমৎকার দেখতে কুকুরটা। তাকে কোলে নিয়ে মাঝে মাঝে বুকে চেপে ধরে চুম্বন করতে লাগল। মপকে পেয়ে বেশ খুশিমনে খেলা করছিল পদ্ম। কিন্তু হঠাৎ সেই বিষণ্ণ যুবকটি এসে পড়ায় বাধা পেল পদ্ম। যুবকের হাতে ছিল সেই বাজপাখিটা যে পদ্মের ছোট পাখিটাকে আজই হত্যা করে।
যুবকের হাতে বাজপাখিটিকে দেখেই রেগে গেল পদ্ম। বলল, ও পাখি নিয়ে এখানে আসা তোমার উচিত হয়নি।
যুবক বলল, এর জন্য আমার পাখিকে দোষ না দিয়ে তোমার ভাগ্যকে দোষ দেওয়া উচিত।
এদিকে পদ্মের আদর পেয়ে মপের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। সে আরও আদর চাইতে লাগল পদ্মের কাছে। পদ্মও তার ঘাড়ে-মাথায় হাত বোলাতে লাগল। এবার হাততালি দিয়ে মপকে যেতে বলল পদ্ম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছুটে গিয়ে ফিরিয়ে আনল। তারপর তাকে কোলে নিয়ে বসিয়ে বুকের উপর চেপে ধরে ঠোঁট দিয়ে চুম্বন করতে লাগল।
যুবকটি তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল বিস্ময়ে। সে বলল, আমি তোমার জন্য সর্বস্বান্ত হয়েছি। আমাকে কি এই দৃশ্য দেখতে হবে? সামান্য একটা ইতর প্রাণী তোমার ভালোবাসা, তোমার বুকের স্বর্গ আর চুম্বন আলিঙ্গনের মাধুর্য লাভ করেছ তা আমাকে নিজের চোখে দেখতে হবে? আমি কি তাহলে ঐ মাধুর্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়ে নদীতীরের নির্জন পথ ধরে অজানার দিকে চলে যাব? না তা যাব না, তোমার বুকে যদি পাথর থাকে তাহলে আমি সে পাথরে পরিণত হব। তোমার স্পর্শে যদি মৃত্যু থাকে তাহলে আমি সেই মৃত্যু লাভ করব।
এই বলে পদ্মের দিকে এগিয়ে গেল যুবকটি। পদ্ম হাত বাড়িয়ে নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু যুবকটি তা শুনল না। অবশেষে পদ্মকে জোর করে স্পর্শ করতেই যুবকটির প্রাণহীন দেহটি ঢলে পড়ল মাটিতে। শোকে-দুঃখে চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল পদ্মর। তার সহচরীরা তাকে হাতির দাঁতের চেয়ারে বসিয়ে বীণা বাজিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে লাগল। রাক্ষসী বলল, বাতি হাতে সেই বৃদ্ধকে ডেকে পাঠাও। এখনও আশা আছে।
এমন সময় ঝুড়ি মাথায় সেই বুড়ি এসে হাজির হলো। বলল, নদীর কাছে আমি ঋণী বলে মাঝি বা দৈত্য আমাকে নদী পর করতে চাইছে না। এদিকে আমার হাতটা আরও কালো ও ছোট হয়ে যাচ্ছে।
রাক্ষসী বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে, কোনও চিন্তা নেই। তুমি তোমার স্বামীকে পাঠিয়ে দাওগে। তুমি যাও, সেই পরীদের দেখতে পাবে। চোখে না দেখলেও তাদের কথা শুনতে পেয়ে অনুরোধ করবে। তারা অথবা দৈত্য তোমাকে নদী পার করে দেবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশে একটি বাজপাখি দেখতে পেল রাক্ষসী। তার লালচে পাখাগুলো সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। তারপরেই বাতি হাতে সেই বৃদ্ধ এসে হাজির হলো। তাকে দেখে পদ্ম বিশেষ খুশি হলো। বলল, এত তাড়াতাড়ি কেমন করে তুমি এলে?
বৃদ্ধ বলল, আমার হাতের বাতি যখন নিভে আসে তখন আমি বুঝতে পারি কোথাও আমার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর তখনি আমি আকাশে মুখ তুলে তাকাই। দেখি একটি বাজপাখি আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
যাই হোক, বাতি হাতে বৃদ্ধ একটি উঁচু পাথরের উপর বসে রাক্ষসীকে বলল, তুমি সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে মৃতদেহকে ঘিরে থাকো। পদ্মের মৃত পাখিটাকেও ওই কুণ্ডলীর মধ্যে এনে দাও।
ইতোমধ্যে বুড়ি একটি ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিল। বৃদ্ধ তার বাতির আলো কুণ্ডলীপরিবৃত যুবকের মৃতদেহের উপর ফেলতে লাগল। কিন্তু রাত্রি ঘন হয়ে ওঠায় তখন কিছু হলো না। এমন সময় পরীরাও এসে হাজির হলো। রাত্রিতে শুধু পরীরা। ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। বৃদ্ধের বাতির আলো ছাড়াও পদ্ম আর পরীদের গা থেকে জ্যোতি বার হচ্ছিল। সকাল হতে একটি মিছিল করে সার দিয়ে সবাই নদীর দিকে এগিয়ে চলল। প্রথমে পরীরা, পরে ঝুড়ির ভিতর মৃতদেহ ও সেই মৃত পাখিটা ভরে তাই মাথায় করে বৃদ্ধা প্রতিবেশিনী রাক্ষসী, বাতি হাতে বৃদ্ধ, সুন্দরী পদ্ম আর তার সহচরীরা।
