বৃদ্ধ বলল, কি হয়েছে? বৃড়ি বলল, দুজন পরী এসে আমাদের দেওয়ালে যে সব সোনা ছিল তা সব তুলে নিয়েছে। পরে তারা গা ঝাড়া দিতে কিছু সোনার টুকরো তাদের গা থেকে ঝরে পড়ে আর তাই থেকে একটা টুকরো আমাদের প্রিয় কুকুর খেয়ে ফেলতেই সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। এতে আমার মনে দারুণ দুঃখ হয়। এমন জানলে আমি তাদের ঘাটের মাঝিকে তাদের ঋণ শোধের দায়িত্ব নিতাম না।
বৃদ্ধ বলল, ঋণটা কি?
বুড়ি বলল, তিনটে পিঁয়াজ আর তিনটে করে দুরকমের ফুল।
বৃদ্ধ বলল, তুমি তোমার কথামতো তাদের কাজ দেবে। ওরা সাধ্যমতো আমাদের উপকার করবে।
বুড়ি বলল, আমি কাল সকালেই নদীর ধারে মাঝিকে তা দিয়ে দেব।
বৃদ্ধের ঘরের ভিতর এতক্ষণ যে আগুন জ্বলছিল তা নিবিয়ে যেতে বৃদ্ধ তার বাতিটা আবার জ্বালল। সেই রহস্যময় বাতির আলোয় চারদিকের পাথরের দেওয়ালগুলো সব সোনা হয়ে গেল। আর তাদের মরা কুকুর হয়ে উঠল অতি মূল্যবান এক উজ্জ্বল ধাতু। বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে বলল, একটি ঝুড়িতে এই মূল্যবান পাথরটি আর ফুলগুলো সাজিয়ে তুমি পদ্মের কাছে চলে যাও। রাক্ষসীর পিঠে নদীর ওপারে গিয়ে তুমি চলে যাবে সুন্দরী পদ্মের প্রাসাদে। যে পারথটিকে একবার ছুঁলেই আমাদের কুকুর আবার প্রাণ ফিরে পাবে। পদ্মকে বলবে, তার দুঃখের দিন শেষ হয়ে এসেছে। তার সব বিপদ সব দুঃখ সুখে পরিণত হবে।
বুড়ি তার ঝুড়িতে সব কিছু সাজিয়ে সকাল হতেই বার হয়ে পড়ল তার কুঁড়ে থেকে। এ ঝুড়িতে মরা কোনও জীবজন্তু একেবারে হালকা হয়ে যায়। কিন্তু কোনও টাটকা শাকসজী ভীষণ ভারী হয়ে ওঠে। বুড়ির তাই ঝুড়ি মাথায় পথ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। নদীর কাছাকাছি যেতেই বুড়ি দেখল, সেই দৈত্যটা নদীর জল থেকে উঠে আসছে। সে বুড়ির কাছে এসে তার ঝুড়ি থেকে একটা করে ফুল খেয়ে ফেলল।
বুড়ি একান্তে ভাবল তার বাগানে গিয়ে ফুলগুলো আবার নিয়ে আসবে। কিন্তু ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় কেটে গেল। এদিকে ফেরিঘাটের মাটিও এসে গেল। মাঝির নৌকোতে এক পথিক ছিল। মাঝিকে দেখে বুড়ি বলল, সেই পরীদের ঋণ মেটাতে এসেছি। এই নাও তোমার জিনিস। কিন্তু মাঝি দুটি করে ফুল দেখে রেগে গেল। বুড়ি অনুনয় বিনয় করে বলল, এখন থেকে নয় ঘণ্টার মধ্যে আমি বাড়ি থেকে বাকি ফুলগুলো এনে দেব। কিন্তু মাঝি বলল, নদীর ভাগ না নিয়ে আমি এর থেকে কিছু নিতে পারব না। তুমি তাহলে নদীর জলে তোমার হাত ডুবিয়ে শপথ করো, তুমি বাকি ফুল এনে দেবে যথাসময়ে।
বুড়ি তাই করল। কিন্তু জল থেকে হাতটি বার করে আনতে দেখল তার ফর্সা হাতটা কালো হয়ে গেছে। মাঝি বলল, তুমি ঋণ শোধ করে দিলেই হাতটা আবার সাদা হয়ে উঠবে। না দিলে ঐ রকমই রয়ে যাবে চিরকাল।
বুড়ি বলল, না, আমি ঋণ শোধ করে দেব। এই বলে সে ঝুড়ি নিয়ে চলে গেল। ফুল না থাকায় ঝুড়িটা খুব হালকা বোধ হচ্ছিল। সে নদীর ধার দিয়ে যেতে যেতে দেখল মাঝি যে যুবক পথিককে নদী পার করে এনেছিল সেই যুবকটি নদীর বালুচরের উপর দিয়ে কোথায় হেঁটে চলেছে। যুবকটি দেখতে খুব সুন্দর। তার সঙ্গে কথা বলার অনেক চেষ্টা করল বুড়ি। কিন্তু যুবকটি হেঁটে যেতে লাগল। অবশেষে বুড়ি তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলল, তুমি আমার সঙ্গে হাঁটাতে পেরে উঠবে না। আমি সবুজ রাক্ষসীর সাহায্যে নদী পার হয়ে সুন্দরী পদ্মের কাছে যাব।
এ কথা শুনে যুবক বলল, আমিও যাব সেখানে। কিন্তু কি উপহার নিয়ে যাচ্ছ?
বুড়ি বলল, আমি আমার গোপন কথা কিছুই বলব না যদি তুমি তোমার কথা না বল।
বুড়ি প্রথমে তার সব কাহিনী বলতে যুবকটি ঝুড়ি থেকে পাথরের মপকে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। সে বলল, আমারও একদিন রাজ্য ছিল, ধনদৌলত ছিল। কিন্তু এখন আমার কিছুই নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব।
কিন্তু তার নিজের জীবনকাহিনীর কথা কিছু বলল না। বুড়ির কৌতূহল কিন্তু মিটল না। যুবকটি বরং বুড়ির কাছে জানতে চাইল, বাতি হাতে সেই বৃদ্ধ লোকটি কে, সেই রহস্যময় বাতির আলোর অর্থ কি এবং তার দুঃখের শেষ কি করে হবে।
কথা বলতে বলতে দূরে নদীর উপর এক বিরাট সেতু দেখতে পেল তারা। সেতুটা সূর্যের আলোয় অতিশয় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। এত উজ্জ্বল বস্তু কখনও তারা দেখেনি।
তারা পান্নার মতো সবুজ ও উজ্জ্বল সেতুর উপর দিয়ে নদী পার হয়ে লাগল। কিন্তু ওপারে না পৌঁছুতে সেতুটা সেই সবুজ রাক্ষসীর চেহারায় পরিণত হলো। সে তখন তার পিঠে করে তাদের ওপারে পৌঁছে দিল। তারা ধন্যবাদ দিল রাক্ষসীকে।
এখান থেকে ওরা যাবে পদ্মের প্রাসাদে। তারা সেখানে কোনও লোক চোখে না দেখলেও কাদের ফিসফিস কথা কানে এল তাদের। বুঝল আরও জনকতক লোক পদ্মের কাছে যাবে সন্ধের সময়।
ঝুড়ি নিয়ে বুড়ি সন্ধে হতেই পদ্মের বাগানে চলে গেল একা। সে দেখল পদ্ম বীণা সহযোগে গান গাইছে আর গানের সুরের যাদুতে মাতাল হয়ে উঠছে চারদিকের বাতাস, হ্রদের জলে ঢেউ জাগছে। বুড়ি বলল, তোমাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম তার থেকে তুমি এখন অনেক সুন্দর হয়ে উঠেছ পদ্ম।
পদ্ম নিজের প্রশংসা মোটেই শুনতে চাইল না। সে বলল, আমার একটি ছোট পাখি ছিল। আমার বীণার উপর বসে গান করত। একটু আগে সে মারা যায়। তার কবর থেকে আর একটি গাছ গজিয়ে উঠবে আমার বাগানে। আমি যাদের ভালোবাসি তাদের মৃতদেহ কবর দিয়ে তার উপর একটি গাছের চারা বসাই।
