পরীরা বলল, এই কথা? আচ্ছা এই নাও। এই বলে তারা যতই গা নাড়া দিতে লাগল ততই সোনার টাকা ঝরে পড়তে লাগল। সে টাকা সংখ্যায় এত বেশি যে রাক্ষসী তা খেয়ে শেষ করতে পারছিল না। সেই সব সোনার টাকা খেয়ে আরও বেড়ে গেল রাক্ষসীর দেহগ্রাত্রের উজ্জ্বলতা। এদিকে পরীদের সেই হতে আলোর ছটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল। যাই হোক, রাক্ষসী বলল, তোমরা আমাকে অনেক দিয়েছ, কি বর চাও বলো।
পরীরা বলল, সুন্দরী পদ্ম কোথায় থাকে বলতে পার? তুমি আমাদের তার প্রাসাদে এখনি নিয়ে চলো।
এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাক্ষসী বলল, এ বর তো এত তাড়াতাড়ি দান করতে পারব না। পদ্মা থাকে নদীর ওপারে। এই দুর্যোগপূর্ণ রাত্রিতে নদীর পার হওয়া সম্ভব নয়।
পরীরা বলল, দুষ্ট নদীটা আমাদের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু ও আমাদের মাঝে এক ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু মাঝিকে ডাকো।
রাক্ষসী বলল, মাঝি এপারের লোককে নিয়ে যাবে ওপারে। কিন্তু ওপারের লোককে যাকে একবার পার করেছে তাকে সে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না। তবে আগামী কাল দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে আমি নিজেই তোমাদের পার করে দেব।
পরীরা বলল, কিন্তু দিন দুপুরে তো আমরা পার হই না, বা কোথাও যাওয়া-আসা করি না।
রাক্ষসী বলল, তাহলে কাল সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তাহলে তোমরা এক দৈত্যের ছায়ার উপর ভর করে নদী পার হতে পারবে।
পরীরা বলল, তা কি করে সম্ভব?
রাক্ষসী বলল, নিকটেই এক রাক্ষস বাস করে। তার দেহটা এমনই দুর্বল ও অশক্ত যে সে তার হাত দিয়ে একটা তৃণখণ্ডও তুলতে পারে না। তার ছায়াই সব কাজ করে। তাই সে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সন্ধের সময় দৈত্য নদীর ধারে এলে তার ছায়ার উপর তোমরা চেপে বসলেই সে তোমাদের পার করে দেবে।
তখন পরীরা ও রাক্ষসী আপন আপন জায়গায় চলে গেল। রাক্ষসী তার পাহাড়ের খাদের ভিতরে গিয়ে এক সুড়ঙ্গপথ দিয়ে আরও গভীরে যেতে লাগল। অন্ধকারে তার গায়ের আলোকছটায় পথ চিনে চিনে সম্প্রতি সে এই সুড়ঙ্গটাকে আবিষ্কার করেছে। সেই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে গুঁড়ি মেরে গিয়ে একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছল রাক্ষসী। দেখল মার্বেল পাথরের এক বিরাট মন্দির চত্বরের ওপর এক বিশাল সোনার মূর্তি। দেখল কোনও এক রাজার প্রতিমূর্তি। দেহটা বিশাল হলেও মাথাটা ছোট।
রক্ষসীকে দেখে প্রতিমূর্তিটি জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলতে লাগল।
রাক্ষসীকে বলল, সোনার থেকে দামী কি?
রাক্ষসী উত্তর করল আলো।
রাজা জিজ্ঞাসা করল, আলোর থেকে স্বচ্ছ কি?
রাক্ষসী বলল, কথা।
কথা বলতে বলতে রাক্ষসী আর এক জায়গায় চোখ পড়তে দেখল রূপোর এক প্রতিমূতি। এটিও কোনো এক রাজার। তার মুকুট ও রাজদণ্ড মূল্যবান ধাতু দিয়ে সজ্জিত। মূর্তিটির পিছনের দেওয়ালের ছিদ্র দিয়ে আলো আসছিল। তাতে রাক্ষসী আর একটি পিতলের তৈরি প্রতিমূর্তি দেখতে পেল। কিন্তু পরে আর একটি মূর্তি দেখতে পেল।
রাক্ষসীর কি মনে হলো সে চতুর্থ প্রতিমূর্তিটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু এমন সময় একটি বাতি হাতে এক বৃদ্ধ কৃষক কোথা থেকে সেখানে এসে হাজির হলো। তাকে দেখে সোনার রাজমূর্তিটি বলে উঠল, এখানে আমাদের আলো আছে।
তুমি আবার আলো নিয়ে এলে কেন?
বৃদ্ধ বলল, তুমি তো জান আমি কোনও অন্ধকারকে আলোকিত করতে পারি না।
রূপোর রাজমূর্তিটি বলল, আমার রাজ্য কখন ধ্বংস হবে?
বৃদ্ধ লোকটি বলল, অনেক দেরি আছে।
পিতলের রাজমূর্তি বলল, আমার কখন উত্থান ঘটবে?
বৃদ্ধ বলল, খুব শীঘ্রই।
রূপোর রাজা বলল, আমি কার সঙ্গে মিলিত হব?
বৃদ্ধ বলল, তোমার বড় ভাই-এর সঙ্গে?
রূপোর রাজা বলল, ছোট ভাই-এর কি হবে?
বৃদ্ধ বলল, তার মৃত্যু ঘটবে।
চতুর্থ রাজমূর্তিটি বলল, আমি কিন্তু এখনও ক্লান্ত হয়ে উঠিনি।
ইতিমধ্যে রাক্ষসী গোটা মন্দিরটা ঘুরে চতুর্থ রাজার কাছে গিয়ে দেখল তার সুন্দর মুখে বিষাদ জমে রয়েছে। মূর্তিটি কি ধাতুতে তৈরি তা ঠিক বোঝা গেল না। তবে মনে হলো সোনা, রূপো আর পিতল অর্থাৎ যে তিনটি ধাতু দিয়ে তার তিন ভাই-এর মূর্তিগুলো গঠিত সেই তিন ধাতুর মিশ্রণে ও সমন্বয়ে তার প্রতিমূর্তিটি গড়া। তবে গঠনকার্যে কিছু ত্রুটি থাকায় ধাতুগুলো ঠিকমতো মিশ্রিত হয়নি।
সোনার রাজা বৃদ্ধকে বলল, তুমি কতগুলো ধাঁধা বা রহস্য জান?
বৃদ্ধ বলল, তিনটি।
রাজা বলল, কোনটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বৃদ্ধ বলল, যেটি আগেই প্রকাশিত হয়েছে?
পিতলের রাজা তখন বলল, তুমি ওটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেবে?
বৃদ্ধ উত্তর করল, চতুর্থ ধাঁধাটি না জানা পর্যন্ত পারব না।
চতুর্থ রাজা বলল, আমি গ্রাহ্য করি না তোমাদের।
রাক্ষসী বলল, আমি চতুর্থ ধাঁধাটি জানি। রাক্ষসী বৃদ্ধের কাছে গিয়ে তার কানে কানে কথাটা বলল।
বৃদ্ধ হঠাৎ চিৎকার করে গম্ভীর গলায় বলল, সময় হয়ে গেছে।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কথাটার তীব্র প্রতিধ্বনি চারদিকে শোনা যেতে লাগল। প্রতিমূর্তিগুলো কাঁপতে লাগল। তখন বৃদ্ধ লোকটি পশ্চিম দিকে ও রাক্ষসী পূর্ব দিকে চলে গেল।
বৃদ্ধ বাতি হাতে যেদিকেই যেতে লাগল সেদিককার সব পাথর সোনা, সব গাছ রূপো আর সব জীবজন্তু মূল্যবান ধাতুতে পরিণত হয়ে উঠল। কিন্তু তার বাতির আলো অন্য কোনও আলোর কাছে কাজ করে না। শুধু এক নরম আলো বিকীরণ করে। বৃদ্ধ তাঁর কুঁড়েঘরে ফিরে দেখল তার স্ত্রী বসে বাসে কাঁদছে। তার স্ত্রী বলল, তোমাকে আজ বাইরে যেতে দিয়ে কি ভুলই না করেছি।
