কিছু পরে নাটালিয়া ফেলিক্সকে কোলে করে অন্যত্র নির্জনে নিয়ে গেল। সেখানে নাটালিয়ার প্রশ্নের উত্তর ফেলিক্স শান্তভাবে সবল সে গ্লাসের জল খেয়েছে। সে কথা নাটালিয়া এসে সকলকে জানাতে নিশ্চিত হলো। সংশয়মুক্ত হলো উইলেম।
এবার যাবার দিন হয়ে গেল। আব্বেও যাবেন। রওনা হতে আর দুদিন বাকি। কাউন্টপত্নী সকলের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যাবার সময় নাটালিয়াকে গোপনে কি বলে গেলেন।
ফ্রেডারিক এসে হঠাৎ একটা খবর দিল সকলের সামনে! উইলেমকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, আমি সব শুনেছি। নাটালিয়ার সঙ্গে তোমার বিয়ের সব ঠিকঠাক। একটি রুদ্ধদার ঘরে আব্বেকে তার মনের কথা বলছিল নাটালিয়া। সে কথা আমি শুনেছি। ফেলিক্সের অসুখের সময় সেই অতন্দ্র রাত্রিতে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে। উইলেমকেই বিয়ে করবে।
এদিকে কাউন্ট লোথারিও উইলেমকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমার বিয়ে না হলে আমার বিয়েও হবে না। থেরেসার সঙ্গে নাটালিয়ার এক চুক্তি হয়েছে। থেরেসার ইচ্ছা দুটি দম্পতি একসঙ্গে উপস্থিত থাকবে বিবাহের বেদীতে। লোথারিও উইলেমকে জড়িয়ে ধরে নাটালিয়ার কাছে নিয়ে গেলেন। ওদিক থেকে থেরেসা সঙ্গে করে নিয়ে এল নাটালিয়াকে।
ফ্রেডারিক ঠাট্টা করে বলল, আমার যত সব পুরনো কথা মনে পড়ছে। লজ্জার কিছু নেই। আজ তোমার সুখ দেখে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে কিশোর পুত্র মলের কথা।
যে তার বাবার গাধা খুঁজতে গিয়ে এক রাজ্য পেয়ে যায়।
উইলেম বলল, রাজ্য লাভ করেছি কিনা জানি না। তবে একটা জিনিস বলতে পারি। আজ যে সুখ আমি লাভ করলাম তার আমি যোগ্য নই এবং এ সুখের বিনিময়ে অন্য কোনও কিছু গ্রহণ করতে পারব না সারা জীবনের মধ্যে।
এ ফেয়ারি টেল (গল্প)
এ ফেয়ারি টেল (গল্প)
সারা দিনের কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে নদীর ধারে তার কুঁড়েঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিল ফেরিঘাটের বৃদ্ধ মাঝি। নদীটা বড়। তার উপর সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে। মাঝরাতে হঠাৎ এক প্রবল চিৎকারে ঘুম থেকে আচমকা জেগে উঠল মাঝি। বুঝল জনকতক পথিক নদী পার হওয়ার জন্য তাকে ডাকছে।
কুঁড়ের দরজা খুলেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে চমকে উঠল মাঝি। অবাক হয়ে দেখল ঘাটের কাছে বাঁধা তার নৌকোর পাশে দুজন পরী নাচছে। বড় সুন্দর সে নাচ। পরী দুটি ছিল পথিকদের সঙ্গে। তারা মানুষের মতো গলায় মাঝিকে বলল, যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি তাদের পর করে দিতে হবে।
মাঝিও দেরি না করে নৌকো ছেড়ে দিল। পথিকরা দুর্বোধ্য ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছিল আর হাসছিল। মাঝে মাঝে নাচানাচি করছিল আর তাতে নৌকোটা দুলছিল। মাঝি বলল, এতে নৌকো উল্টে যেতে পারে। কিন্তু এ কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিয়ে আরও বেশি দাপাদাপি শুরু করে দিল।
যাই হোক, অবশেষে নৌকো নদীর ওপারে গিয়ে ভিড়ল। পথিকরা তখন কতকগুলো সোনার টাকা নৌকোর পাটাতনে ফেলে দিয়ে বলল, এই নাও তোমার পারিশ্রমিক।
মাঝি বলল, তোমাদের সোনার টাকা ফিরিয়ে নাও। এতে তোমাদেরও বিপদ ঘটতে পারে। আমারও বিপদ হতে পারে। একটুকরো সোনা যদি কোনওরকমে নদীর জলে পড়ে যায় তাহলে নদী আমাকে ও আমার নৌকোটাকে গ্রাস করে ফেলবে।
পথিকরা বলল, আমরা যা একবার দিই তা ফিরিয়ে নিই না।
মাঝি তখন সোনার টাকাগুলো কুড়িয়ে তার টুপির মধ্যে ভরে নিয়ে বলল, এগুলো তাহলে আমি নদীর ধারে মাটিতে পুঁতে ফেলব।
এমন সময় পরী দুজন নৌকো থেকে নেমে চলে যাচ্ছিল। মাঝি বলল, তোমরা আমার পারের কড়ি দিয়ে যাও।
পরীরা বলল, যে লোক সোনা নেয় না সে লোকের কোনও মজুরি পাওয়া উচিত নয়।
মাঝি বলল, পৃথিবীর মাটিতে জন্মানো ফল ছাড়া আমি কিছু নিই না। আমাকে তিন রকমের ফল দিতে হবে। আমার পারের কড়ির বদলে।
পরীরা বলল, পরে দেব। এই বলে তারা চলে গেল। মাঝিও নৌকো ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিল, কিন্তু নদী পার না হয়ে সেই দিকের তীর ঘেঁষে নিচে নেমে যেতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর নদীর ধারে একটা পাহাড় দেখতে পেল। আরও দেখল পাহাড়ের মাঝখানে একটা প্রকাণ্ড খাদ। মাঝি সেই খাদের ভিতর সোনার টাকাগুলো সব ছুঁড়ে দিল। তারপর নৌকো ঘুরিয়ে সে চলে গেল।
সেই খাদের ভিতর এক মায়াবী রাক্ষসী থাকত। সোনার প্রতি তার খুব লোভ ছিল। সে সোনার টাকাগুলো একে একে সব গিলে ফেলল। তার সঙ্গে সঙ্গে তার গা দিয়ে এক জ্যোতি বার হতে লাগল। কোথা থেকে এই সোনা এল তা জানার জন্য গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ল রাক্ষসী। যে দিকে যে পথে সে যেতে লাগল, তার গা থেকে বার হওয়া আলোর ছটায় আলোকিত হয়ে উঠল রাত্রির সে অন্ধকার পথ। সে আলোর ছটায় গাছের পাতাগুলো পান্নার মতো সবুজ ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। রাক্ষরী যদিও পাহাড় আর শুকনো প্রান্তর ভালোবাসে, তথাপি সে জলাশয়ের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত যেতে লাগল। অবশেষে সে সেই পরী দুজনের দেখা পেল। সুন্দর পরীদের দেখে তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা হলো।
রাক্ষসী পরীদের জিজ্ঞাসা করল কোথা থেকে সোনার টাকাগুলো এসেছে তার সন্ধান তারা দিতে পারে কি না। সে বলল, আমি যখন আমার পাহাড়ের খাদের ভিতর বসেছিলাম তখন মনে হলো স্বর্গ থেকে একরাশ সোনার টাকা ঝরে পড়ল আমার মুখে।
