ফেলিক্সকে কোলে করে বুকে চেপে ধরে কিছুটা শান্তি পেল উইলেম। সেই ইতালীয় ভদ্রলোক হঠাৎ এসে পড়লেন। সকলের সঙ্গে আলাপ করার পর উইলেমের সঙ্গেও আলাপ-পরিচয় হলো। ইতালির লম্বার্ডি অঞ্চলের লোক। বয়স অল্প।
ইতালীয় ভদ্রলোক তাঁর পরিচয়ের যে পূর্ণ বিবরণ লিখে এনেছিলেন তাতে অনেক আশ্চর্য নূতন কথা জানা গেল। অনেক জটিলতার জট খুলল। তাতে জানা গেল, বৃদ্ধ বীণাবাদক তাঁর অর্ধোন্মাদ ভাই অগাস্টিন এবং মিগনন তার স্পেরাবা নামে এক বোনের বিকলাঙ্গ মেয়ে, সমুদ্রতীরের একটি বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল। স্পেরাবা থাকত কনভেন্টে। সেখান থেকে সে চুরি হয়ে যায়। তার টুপিটা সমুদ্রের এক খাড়ির জলে। ভাসতে দেখা যায়। লোকে ভাবে সে জলে ডুবে গেছে। মিগননা তাঁর ভাইঝি। ভাইঝির মৃত্যুসংবাদে মার্শেজী কাতর হলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভাইঝির ত্রাণকর্তা উইলেমের প্রতি জানালের অকৃত্রিম মমতা।
উইলেমকে মার্শেজী বললেন, আপনি ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে চলুন। দেখবেন মিগননের জন্মস্থান, তার বাল্যের লীলাভুমি। আপনি তাকে স্নেহ করতেন।
এমন সময় সহসা কাউন্টপত্নী এসে হাজির হলেন। উইলেমের হাতটা ধরে একটু চাপ দিয়ে তার মুখপানে গভীর দৃষ্টিতে একবার তাকালেন। তারপর তার বোন। নাটালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
আগে মার্শেজীর হাতে লেখা বিস্তৃত বিবরণটি সকলের সামনে পড়ে শোনালেন। হতভাগ্য মিগনন ও বৃদ্ধ বীণাবাদক প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে দুঃখে ভারী হয়ে উঠল সকলের হৃদয়। ভাগ্য বিড়ম্বনার এই সব সকরুণ কাহিনী শুনে অনেকে চোখের জল মুছতে লাগলেন।
একমাত্র মিগননের কথা ভেবেই ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে মার্শেজীর সঙ্গে প্রথমে জার্মানি ও পরে ইতালি যেতে চাইলেন উইলেম। তার ভাইঝি মিগননের প্রতি সদয় ব্যবহার ও স্নেহপ্রীতির জন্য উইলেমকে মোটা রকমের সম্পত্তি দান করতে চান মার্শেজী। ওর ছেলের বাড়িতে গেলে উনি উইলেমকে তা দেবেন। আপাতত কিছু মূল্যবান ধাতু ও রত্ন উপহার দিলেন।
উইলেম ডাক্তারের কাছে লোক পাঠাল বীণাবাদকের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। সে ভালো হয়ে উঠলেও তাকেও নিয়ে যাবে সঙ্গে করে।
উইলেম এদিকে লক্ষ্য করল থেরেসা ক্রমশই কাউন্ট লোথারিওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। তারা হয় তো চাইছে যে সে এখান থেকে চলে গেলেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা।
ডাক্তার লোক মারফৎ কোনও খবর না পাঠিয়ে নিজে এলেন। এসে অদ্ভুত একটা খবর দিলেন। বললেন বীণাবাদক এখন দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে নূতন মানুষ হয়ে উঠেছে। ভাক্তারকে এবার তার আসল পরিচয়ের কথা বলা হলো। বলো হলো তার আসল নাম অগাস্টিন। খ্যাতিসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক।
অগাস্টিনকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তার আসল পরিচয় তাকে বলা হলো না। মার্শেজীকেও বলা হলো না। ওরা সকলে ভাবল বীণাবাদকরূপী অগাস্টিন সত্যিই ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু অগাস্টিন সকলের সঙ্গে ভালোভাবে কথাবার্তা বললেও ফেলিক্সকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তাকাচ্ছিল তার দিকে। ওরা কেউ বুঝতে পারল না তার ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিটা তখনও অবদমিত হয়নি একেবারে।
একদিন সকলে বসে গল্প করছিল। উইলেম কবে রওনা হবে তা নিয়ে কথা হচ্ছিল এমন সময় ব্যস্তভাবে অগাস্টিন উন্মাদের মতো ঘরে ঢুকল। তার মধ্যে হঠাৎ উন্মত্ততা জেগে উঠেছে দেখে সকলে তাকে ধরে ফেলল। সে তখন স্বাভাবিক মানুষের মতো বলে উঠল, আমাকে নয়, ছেলেটাকে পার তো বাঁচাও গে। আমি তাকে বিষ খাইয়েছি।
সকলে ছুটে গেল ফেলিক্সের কাছে। দেখল একটা টেবিলের সামনে ফেলিক্স বসে রয়েছে। তার সামনে টেবিলে রয়েছে একটি গ্লাস ও একটি বোতল। গ্লাসের জলে মাত্রাতিরিক্ত আফিম মিশিয়ে দিয়েছিল অগাস্টিন। ফেলিক্সকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে বলল, গ্লাসের জল খেয়েছি। তখন হতাশ হয়ে উইলেম মাথা চাপড়াতে লাগল। ভাবল ফেলিক্সকে আর বাঁচানো যাবে না।
ডাক্তারকে ডাকা হলো। ডাক্তার বললেন, চেষ্টার কোনও ত্রুটি হবে না। নাটালিয়া ফেলিক্সকে কোলে করে বসে রইল। তার পা দুটো রইল উইলেমের কোলে। ভিড় দেখে কাঁদছিল ফেলিক্স। সারারাত এইভাবে কাটল। নাটালিয়া সামনে বসে রইল। নাটানিয়ার হাতে প্রায়ই হাত ঠেকছিল উইলেমের। নাটালিয়া তার পানে তাকাচ্ছিল শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টিতে।
এদিকে অগাস্টিনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকাল হতেই একজন এসে খবর দিল অগাস্টিন উপরতলার একটি ঘরে রক্তাল্পত অবস্থায় পড়ে আছে। পাশে একটা ধারাল ক্ষুর। সেই ক্ষুর দিয়ে নিজের গলার শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছে অগাস্টিন।
ডাক্তার গিয়ে অতিকষ্টে রক্ত বন্ধ করে গলায় ব্যান্ডেজ করে দিল। কিন্তু কিছু পরে অগাস্টিন বলল, আমি মার্শেজীর লেখাটা এক জায়গায় পড়ে থাকতে দেখে সব জানতে পারি। তখন দেখি এত কাণ্ডের পর আর আমার বেঁচে থাকার কোনও অর্থ হয় না। তাই আত্মহত্যা করলাম।
পরে ফাঁক পেয়ে নিজের হাতের ব্যান্ডেজ সরিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষণের ফলে মারা গেল অগাস্টিন।
এদিকে ফেলিক্সের অবস্থা আগেই মতোই রইল। ডাক্তার নাড়ি টিপে দেখল কোনও বিকার নেই। বিষক্রিয়ার কোনও কুফল দেখা গেল না। অনেকে নিশ্চিন্ত হলো। কিন্তু একা উইলেম বলল, এখনও বিপদ কাটেনি। ফেলিক্স বলেছে ও গ্লাসের জল খেয়েছে।
