হঠাৎ মিগনন দাঁড়িয়ে এসব দেখতে দেখতে নাটালিয়ার পায়ের কাছে পড়ে গেল। উইলেম তাকে দুহাতে তুলে ধরে ঘরে নিয়ে গেল। তাকে মৃত ভেবে আকুলভাবে কাঁদতে লাগল। তাকে থেরেসা সরিয়ে নিলে গেল অন্য ঘরে। কিন্তু কারও কোনও সান্ত্বনায় কান দিল না উইলেম। বলতে লাগল, আমারই হৃদয়হীনতার জন্য ওর মৃত্যু ঘটেছে। ও আমার কত উপকার করেছে। নিজে আহত হয়েও রক্তাক্ত দেহে আমার সেবা করে আমাকে বাঁচিয়েছে।
ডাক্তার ও সার্জেন এসে বললেন, একেবারে আশা ত্যাগ করবেন না। দেখি কি করতে পারি।
উইলেম লক্ষ্য করল এই সার্জেনই নাটালিয়ার নির্দেশে এই বনে গিয়ে তার চিকিৎসা করে।
ঠিক এই সময় কাউন্ট লোথারিও, আব্বে ও জার্নো এসে হাজির হলো প্রাসাদে। জার্নো উইলেমকে সরিয়ে নিলে গেল। কিন্তু তার কোনও কথা ভালো লাগল না উইলেমের। কুষ্ঠির কথা, তার ভবিষ্যতের কথা, কোনও কিছুই আকৃষ্ট করতে পারল না তাকে। বিশেষ করে এই শোকদুঃখের সময়ে জার্নো তার বিয়ের কথাটা তোলায় তার রাগ হলো জার্নোর উপার। জার্নো বলল, ঐ আব্বে এসে গেছেন। সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে সকল কথা ওঁকে বলো। সাক্ষাৎ নিয়তির মতো উনি সব ঠিক করে দেবেন। উনি অনেকের মধ্যে অনেক মিলন অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটিয়ে থাকেন।
এক জায়গায় সবাই যখন বসে গল্প করছিল, একজন দূত এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল কাউন্ট লোথারিওর হাতে। কাউন্ট বললেন, তোমার মালিক কখন আসবেন?
কিন্তু দূত তা বলতে পারল না। এই অতিথি কে হাতে পারে এই নিয়ে সবাই যখন জল্পনা-কল্পনা করছিল তখন ফ্রেডারিক এসে হাজির হলো সবাইকে অবাক করে দিয়ে। আশ্চর্য হলো উইলেম যখন সে নিজের চোখে দেখল কাউন্ট লোথারিও ও নাটালিয়ার ভাই হচ্ছে তার অতিপরিচিত ফিলিনার বালকভৃত্য ফ্রেডারিক।
এদিকে উইলেমকে তাদের প্রাসাদে দেখে খুব খুশি হলো ফ্রেডারিক। বলল, ইনি যখন অভিনয় করতেন তখন আমি এদের সাজাতাম। ইনি আমার যথেষ্ট উপকার করেছেন। একবার ঘুষিবৃষ্টি হতেও আমাকে রক্ষা করেন।
ফ্রেডারিককে দেখে পুরনো দিনের অনেক কথা মনে পড়ল উইলেমের। একটু সরে গিয়ে ফ্রেডারিক তাকে বলল, ফিলিনার জন্য আমি তোমাকে ঈর্ষা করতাম। একদিন রাত্রে ফিলিনাই সাদা পোশাক পরে তোমার ঘরে যায়। এতে আমার ঈর্ষা আরো বেড়ে যায়। ছোকরা অফিসারের বেশে আমিই শেষের দিকটায় তার ঘরে ছিলাম। আমার সঙ্গে সে তোমাদের দল ছেড়ে চলে আসে এবং এখন একটা নির্জন প্রাসাদে আমার সঙ্গেই থাকে। গ্রামাঞ্চলের সেই প্রাসাদে আমরা বেশ সুখেই আছি।
ফ্রেডারিক চলে গেলে জার্নো এল উইলেমের কাছে। উইলেম বলল, এখানকার ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন দেখছি আমার থেরেসার প্রতি আর সে আসক্তি নেই।
সেদিন নাটালিয়ার পাশে উইলেম আর জার্নো বসেছিল। নাটালিয়া একসময় জার্নোকে বলল, কয়েকদিন ধরে দেখছি তুমি যেন কি ভাবছ সব সময়।
জার্নো বলল, হ্যাঁ সত্যিই তাই। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমি ভাবছি। অবশ্য ব্যাপারটা আমার বন্ধু উইলেমের উপর অনেকটা নির্ভর করছে। শোনো বন্ধু, অল্পদিনের মধ্যে তুমি আমার সঙ্গে আমেরিকা যাচ্ছ।
আকাশ থেকে পড়ল যেন উইলেম। আমেরিকা যাব। আমি একথা কখনও ভাবিওনি।
জার্নো বলল, আজ সারা পৃথিবীর মধ্যে আমেরিকা দ্রুত সমৃদ্ধি ও উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন দেশের লোক তাই সেখানে গিয়ে গড়ে তুলছে নূতন নূতন উপনিবেশ। গড়ে উঠছে কত রকমের কাজ-কারবার। তুমিও আমার সঙ্গে যেতে পার। অবশ্য দুটো বিষয়ের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে পার। হয় তুমি জার্মানিতে যেতে।
উইলেম বলল, তোমার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখতে হবে। এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না।
ফ্রেডারিক সব সময়ে বেশি কথা বলে। সে এই কথা শুনে ভ্রমণের গুণাগুণ সম্বন্ধে এক দীর্ঘ বক্তৃতা শুরু করে দিল। তারপর শেষকালে বলল, লিভিয়াকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। ব্যর্থ প্রেমের সব দুঃখ অন্তত সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দিতে পারবে। আমাদের বন্ধু উইলেম তো পরিত্যক্ত রমণীকে ভালোবেসে গ্রহণ করতে ওস্তাদ। না হয় তো আমিই লিভিয়াকে গ্রহণ করে আমেরিকা পাড়ি দিতে পারি।
জার্নো বলল, বড় দেরি হয়ে গেছে, আমি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।
নাটালিয়া বলল, ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে আহত নারীকে এ প্রস্তাব দান করা এক জঘন্য কাজ।
নাটালিয়া আরও কি বলতে যাচ্ছিল এমন সময় আব্বে এসে আর একটা প্রস্তাব উত্থাপন করলেন উইলেমের কাছে। বললেন, কাউন্টের কাকার বন্ধু এক ইতালীয় ভদ্রলোক আসছেন এখানে। উনি সমগ্র জার্মানি পরিভ্রমণ করবেন। উনি সঙ্গে এমন একজন জার্মান যুবক চান সে ভালো জার্মান ভাষা জানে এবং যে সামাজিক মেলামেশায় সক্ষম। আমরা তাই তোমাকেই ঠিক করেছি।
উইলেম বলল, আপনি বললেই যে মানতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমাকে ভেবে দেখতে হবে ব্যাপারটা। তাছাড়া আমি গেলে আমার ছেলে ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
আব্বে বললেন, তা কি সম্ভব হবে?
একমাত্র নাটালিয়ার উপস্থিতি ছাড়া আর কারও উপস্থিতি ভালো লাগছিল না উইলেমের। তবে নাটালিয়া কাছে থাকলেও ওদের যে কোনও প্রভাব বিসদৃশ ঠেকছিল উইলেমের কাছে। মনে হচ্ছিল এক-একটা প্রস্তাব হলো তাকে এখান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলার এক-একটা হীন চক্রান্ত। মনে হচ্ছিল বিয়ে বা নিবিড় পারিবারিক সুখশান্তি তার ভাগ্যে আর নাই। মেরিয়ানাকে সে প্রথমে ভালোবেসেছিল, কিন্তু পায়নি। তারপর ফিলিনার প্রতি তার প্রেমাসক্তি জাগে, কিন্তু তাকেও কাছে পায়নি। তারপর অরেলিয়ার। অকাল মৃত্যু তার প্রতি তার আসক্তিকে ঘন হতে দেয়নি। পরিশেষে তার বারবার প্রতিহত ও ব্যর্থ প্রেমের নদীটি ক্লান্ত থেরেসার বুকে চিরতরে ঢলে পড়তে চায় ক্লান্ত হয়ে, কিন্তু এরা তাও হতে দিল না। এখন শুধু বাকি আছে নাটালিয়া।
