ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল মিগনন। অবশ্য দুর্বলতা তখনও ছিল তার দেহে। রোজ একবার করে উইলেম তাকে নিয়ে বেড়াত। তার জীবনের উদ্ধারকর্তাকে প্রেমিক হিসাবে কল্পনা করেছিল মিগনন তার অপরিণত মনে। উইলেম যখন কাছে না থাকত তখন ফেলিক্স থাকত তার কাছে।
নাটালিয়া বলল, থেরেসার সঙ্গে আপনার বিয়ের কথা ঠিক হওয়ার কথাটা জানতে পারলে খুব রেগে যাবে।
উইলেমও বিয়ের কথাটা মিগননকে জানাতে সাহস পেল না।
অবশেষে থেরেসার বহু প্রতিক্ষিত চিঠিটা এসে গেল। নাটালিয়া নিজে তার বান্ধবীর চিঠিটা উইলেমের হাতে তুলে দিল। বলল, এখন খুশি তো? থেরেসা আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। আমার মতামত চেয়েছিল। আমার প্রতি আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। উইলেম গম্ভীর মুখে চিঠিটা খুলল। তাতে লেখা আছে, আমি তোমার, তুমি আমার। আমরা যেহেতু কোনও আবেগের দ্বারা প্রভাবিত হইনি, আমাদের পারস্পরিক শুভেচ্ছা উৎফুল্লতা ও যুক্তিবোধের দ্বারা আমাদের বিবাহ-বন্ধনকে সার্থক করে তুলব। আমি তোমার ফেলিক্সকে বুকে চেপে ধরে অনেক শান্তি পাব। তাকে মার মতো মনে মানুষ করব। আমি ভাবব, সে আমারই সন্তান। তুমি আমার বাড়িতে চলে এলেই আমরা হয়ে উঠব একচ্ছত্র অধিপতি। আমরা শুরু করব আমাদের সুখের জীবন।
নাটালিয়া তার ভাই লোথারিওকে একটা চিঠি লিখল। এমন সময় হঠাৎ জার্নো এসে হাজির। জার্নো এসে বলল, আমি জানি না আমার বন্ধু কি মনে করবে। তার নিয়তি ঘটনার গতিকে ফিরিয়ে দিতে পারে।
উইলেম বলল, আজ আমি সত্যিই খুশি। আজ আমার সারা জীবনের সকল আশা, সকল আকাক্ষা সফল হতে চলেছে এই মিলনের মধ্যে।
জার্নোর কাছ থেকে উইলেম যখন শুনল থেরেসা তার মার নিজের সন্তান নয় বলে কাউন্ট লোথারিও তার মন পাল্টেছে এবং থেরেসাকে গ্রহণের পথে অন্য কোথাও বাধা নেই, তখন উইলেম বলল, তিনি আমার অকৃত্রিম অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি তাঁরই জন্য, তাঁকে প্রীত করার জন্যই থেরেসার পাণিগ্রহণ করতে চেয়েছিলাম আবার তাঁরই খাতিরে থেরেসাকে ত্যাগ করে তার হাতে তুলে দিতে পারব। একথা কাউন্টকে গিয়ে জানিয়ে দিয়ে যাও।
জার্নো ঘোড়ায় করে চলে গেল।
কাউন্ট লোথারিও সত্যি সত্যিই তাঁর মত পাল্টেছেন। তিনি এখন নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছেন সুইজারল্যান্ডে থাকাকালে থেরেসার যে কুপথগামিনী ব্যভিচারিণী মার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়, থেরেসা তার সন্তান নয়। থেরেসার মা অন্য নারী, তিনি ইহজগতে নেই। এবার থেরেসাকে গ্রহণ করতে কোনও বাধা নেই।
উইলেম প্রথমে ভেবেছিল এটা বুঝি জার্নোর চক্রান্ত। কিন্তু লোথারিওর একখানি চিঠি তাদের সব সন্দেহ ভঞ্জন করে নিল। নাটালিয়াকে লোথারিও লিখেছেন, তোমার উপর এমন গুরুদ্বায়িত্ব এসে পড়েছে নাটালিয়া। তার তোমরই উপর নির্ভর করছে তোমার এই ভাই-এর ভবিষ্যৎ সুখ-শান্তি। একদিকে থেরেসাকে বোঝাতে হবে তোমাকেই। আবার আমার বন্ধুও যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। তাকে কোনও মতেই তুমি ছাড়বে না। আশা করি শীঘ্রই মন ঠিক হয়ে যাবে।
নাটালিয়া চিঠি পড়ে শান্ত কণ্ঠে উইলেমকে বলল, কথা দাও, তুমি আমার অমতে কোনওদিন আমার এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে না।
উইলেম তার হাত বাড়িয়ে বলল, কথা দিচ্ছি, এবার হতে তোমার মতেই চলব এ ব্যাপারে। তোমার অমতে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব না।
বাগানে গিয়ে কিছু ফুল তুলল নাটালিয়া। বিভিন্ন রঙের বিচিত্র ধরনের ফুল। নাটালিয়া বলল, তোমাকে নিয়ে আমার কাকার কাছে যাব। আমার জীবনের সব আনন্দ সকল শান্তি এখন তোমার হাতেই নির্ভর করছে।
ফুল তোলার পর কথা বলতে বলতে প্রাসাদের এমন একটি দিকে যেতে লাগল যেখানে সচরাচর কেউ যায় না। নাটালিয়া বলল, এ দিকটায় আমার কাকা থাকতেন, এ ফুল তাঁরই জন্য নিয়ে যাচ্ছি।
হলঘরে ঢুকতেই মর্মরপ্রস্তরের এক মূর্তি দেখতে পেল উইলেম। জানল ইনিই ছিলেন নাটালিয়ার কাকা। এ এক অদ্ভুত জগৎ। চারদিকে শুধু নানা ধরনের ভালো ভালো ছবি। কত অপরূপ ভাস্কর্য ও চিত্রকলার সার্থক নিদর্শন। দেখতে দেখতে দুচোখ জুড়িয়ে গেল উইলেমের এই নির্জন পরিত্যক্ত অঞ্চলে আপাতদৃষ্টিতে কোনও প্রাণচাঞ্চল্য দেখতে না পেলেও এই শিল্পসৃষ্টির মধ্যে স্তব্ধ জীবনের এমন এক চিরন্তন রূপ দেখতে পেল উইলেম, যে রূপ অবিচ্ছিন্ন কালপ্রবাহে চিরপ্রবহমান। মৃত্যুশীতল এক অতীতাশ্রয়ী স্তব্ধতার সঙ্গে কালজয়ী প্রাণচঞ্চলতার এক প্রচ্ছন্ন তাপপ্রবাহ মিলেমিশে এক অদ্ভুত জীবন রসায়নে পরিণত হয়ে উঠেছে যেন।
কথা বলতে বলতে ওরা হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় ছেলেরা ছোটাছুটি করতে করতে এগিয়ে এল তাদের দিকে। ফেলিক্স বলল, আমি আগে এসেছি। মিগনন বলল, আমি। আসলে হঠাৎ থেরেসা আসায় ওরা খবর দিতে এসেছে ছুটে। মিগনন হাঁপাচ্ছিল। নাটালিয়া তাকে ধরে বলল, দুষ্টু মেয়ে কোথাকার, আমি তোকে বলেছি না, মোটেই ছুটবি না। বুকটা লাফাচ্ছে।
থেরেসা এগিয়ে এসে আবেগের সঙ্গে উইলেমকে বলল, কেমন আছ হে আমার বন্ধু? ওদের দ্বারা তুমি তাহলে এখনও প্রতারিত হওনি?
উইলেম এগিয়ে যেতেই ছুটে গিয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল থেরেসা। বলল, হে আমার মনের মানুষ, আমার স্বামী। তুমি আবার চিরদিনের। বলতে বলতে পাগলের মতো চুম্বন করতে লাগল উইলেমকে। ফেলিক্স তার গাউনটা ধরে টানতে টানতে বলল, মা, আমি এখানে রয়েছি।
