হঠাৎ উইলেমের মনে হলো থেরেসাকে চিঠিটা লিখে ভুল করেছে। এ চিঠি লেখা উচিত হয়নি তাকে। এই কাউন্ট লোথারিওই ছিলেন একদিন থেরেসার প্রেমিক এবং মনোনীত স্বামী-এ কথাটা কোনওদিন ভুলে যেতে পারবে না।
কাউন্ট তার বোনের লেখা একটুকরো কাগজ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে লোকটা কাউন্টপত্নী কি না তা বুঝতে পারল না। কাউন্ট লোথারিওর দুটি বোন আছে। একজন হচ্ছে সেই কাউন্টপত্নী যার সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে ব্যারনপত্নীর মাধ্যমে। আর একজনের নাম নাটালিয়া যে সেই জঙ্গলে দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত ও আহত হলে তার আরোগ্যলাভের ব্যবস্থা করে অনেক উপকার সাধন করে। অনিন্দ্যসুন্দরী বীরাঙ্গনা মূর্তিটি তার অন্তরের অনেকখানি শ্রদ্ধা ও আসক্তি কেড়ে নেয়।
লোথারিও তার বোনের বাড়ি থেকে যে ঘোড়ার গাড়িতে করে এসেছিলেন সেই গাড়িতে করেই পরদিন রাত্রিশেষে ফেলিক্সকে নিয়ে রওনা হলো উইলেম। দুটি বোনের মধ্যে কোন বোন তাকে ডেকেছে তা নিশ্চিতভাবে জানতে না পারায় যেতে মন সরছিল না তার। গাড়িতে অনবরত সেই কথাই ভাবছিল।
শহরের মধ্যে একটি বড় বাড়ির গাড়িবারান্দার নিচে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল। বাড়ির চাকর এসে দরজা খুলে দিল। আর একজন চাকর এসে বলল, আপনার জন্য অনেক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। তাকে সঙ্গে করে দোতলার একটি ঘরে নিয়ে গেল। ফেলিক্সকে বিছানার উপর শুইয়ে দিল উইলেম। উইলেম চাকরের মুখে ব্যারনপত্নী আছে শুনে ভেবেছিল কাউন্টপত্নীই তাকে ডেকেছেন। কিন্তু তার ঘরে যে এসে হঠাৎ ঢুকল সে হচ্ছে লোথারিওর অন্য বোন নাটালিয়া। উইলেম নতজানু হয়ে নাটালিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত চুম্বন করল। নাটালিয়া তার কুশশ জিজ্ঞাসা করার পর মিগননের কথা তুলল। বলল, আপনি ফিলিক্সকে তার কাছে রাখার ব্যবস্থা করলে সে ভাল থাকবে। এখন সে মেয়েছেলের পোশাক পরে। আমি তাকে ভালো পোশাক দিয়েছি।
পরদিন সকালে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল উইলেম। চাকর এসে প্রাতরাশের জন্য ডেকে নিয়ে গেল। উইলেম গিয়ে দেখল, নাটালিয়া তার জন্য অপেক্ষা করছে। কথায় কথায় নাটালিয়ার কাছ থেকে জানতে পারল উইলেম তাদের আর এক ভাই আছে। তিনি প্রায় হাসিখুশির সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। তাঁর নাম ফ্রেডারিক। আব্বে সম্বন্ধে প্রশ্ন করে উইলেম জানল আব্বে হচ্ছে নাটালিয়াদের গৃহশিক্ষক। বর্তমানে তার দাদার কাছেই থাকেন। তবে ওঁর জীবনের একমাত্র আদর্শ হলো, কাজ করে যাওয়া। তবে তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ ইচ্ছামতো কোনও মহৎ কাজ করতে পারে না। মানুষ আপন জন্মগত কর্মপ্রবৃত্তি আর প্রেরণার বশেই কাজ করে যায়। ইচ্ছা করলেই কেউ কবি হতে পারে না।
এমন সময় ডাক্তার ঘরে ঢোকায় আলোচনাটা থেমে গেল। ডাক্তারকে মিগননের কথা জিজ্ঞাসা করায় বললেন, সে অনেক কথা। বলছি।
নাটালিয়া ফেলিক্সকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বলে গেল, ছেলেটাকে আগে হতে দেখতে সে মনে মনে প্রস্তুত হয়ে উঠবে আপনাকে দেখার জন্য।
নাটালিয়া চলে গেল ডাক্তার অবাধে ও অকুষ্ঠভাবে বলতে লাগলেন, মিগননের ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়। আপনি শুনলে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাবেন। ওর বিভিন্ন কথা, গান প্রভৃতি থেকে আমরা জেনেটি ওর বাড়ি ইত্যালির মিলান শহরের কোথাও। ওর শৈশবে দড়ির খেলা দেখানোর একটি দল ওকে চুরি করে নিয়ে আসে। তাইও আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেনি। তারপর ও একদিন অদ্ভুত এক স্বীকারোক্তি করে বসে। আপনার নিশ্চয় সেই আশ্চর্য এক রাত্রির কথা মনে আছে যে রাত্রে এক অদৃশ্য নারী জড়িয়ে ধরে আপনাকে, অথচ আলো জ্বেলে আর দেখতে পাননি তাকে। সেই রাতে আপনি হ্যামলেটের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
উইলেম শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় কোনওরকমে বলল, আমার ভয় হচ্ছে। সে মেয়ে মিগনন নয় নিশ্চয়?
ডাক্তার বললেন, সে মেয়ে মিগনন কিনা জানি না, তবে ও কিন্তু সে রাতে আপনার বিছানার ভিতরে লুকিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। এই কামনা সে রাতে প্রবল হয়ে উঠেছিল ওর মনে। কিন্তু সাদা পোশাকপরা অন্য এক মেয়েকে দেখে তাকে প্রতিদ্বন্দিনী ভেবে ও পালিয়ে গিয়ে বৃদ্ধ বীণাবাদকের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আকাক্ষিত ব্যক্তির প্রতি অদম্য সঙ্গলিপ্সার সঙ্গে অজানা প্রতিদ্বন্দ্বিনীর প্রতি এক প্রবল ঈর্ষা মিলেমিশে সে রাতে ভয়ঙ্করভাবে বিক্ষুব্ধ ও উত্তাল করে তুলেছিল ওর অনুভূতিকে।
উইলেম বিব্রত হয়ে ডাক্তারকে বলল, কিন্তু তার কাছে আমি গিয়ে কি করব? বরং আমার উপস্থিতি অহেতুক উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে তার মধ্যে। তাতে কোনও ফল হবে না।
ডাক্তার বললেন, যেখানে আমি রোগ নিরাময় করতে পারি না সেখানে সে রোগকে কিছুটা প্রশমিত করতে পারি। প্রেমের বস্তুর উপস্থিতি প্রেমিক-প্রেমিকার মন থেকেও ধ্বংসাত্মক চিন্তাগুলোকে সরিয়ে দিতে পারে। তার অনেক প্রমাণ আমি পেয়েছি। তবে তুমি গিয়ে তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবে। তার ফল কি হয় সেটা আমরা লক্ষ্য করব।
নাটালিয়া এসে উইলেমকে সঙ্গে করে মিগননের কাছে নিয়ে গেল। উইলেম গিয়ে দেখল মিগনন শান্তভাবে শুয়ে আছে, আর তার বুকের উপর ফেলিক্স খেলা করছে। ফেলিক্সকে পেয়ে ও অনেকখানি শান্ত হয়ে উঠেছে। উইলেম যা ভেবেছিল তা কিন্তু হলো না। তাকে দেখে কোনও উত্তেজনা প্রকাশ করল না মিগনন। শুধু বোঝা গেল সে খুশি হয়েছে মনে মনে উইলেমকে দেখে।
