উইলেম অধৈর্য হয়ে বলল, খুব হয়েছে বারবারা। অনেক কিছু করেছ, এবার একটা কাজ করো। আমার মেরিয়ানাকে বার করে দাও। তুমি নিশ্চয়ই তাকে লুকিয়ে রেখেছ কোথাও।
বারবারা বলল, সে আর ইহজগতে নেই। তার কবরের কাছে ফেলিক্সকে নিয়ে যাও। বলবে তোমার মাকে প্রণাম করো।
কিন্তু বারবারার এত কথাতেও উইলেম ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না ফেলিক্স তার ঔরসজাত সন্তান কি না। এ বিষয়ে সন্দেহাতীত কোনও সত্যে পৌঁছাতে পারছিল না সে। কেবলি মনে হচ্ছিল বারবারা তার সঙ্গে চাতুরি খেলছে। পরের ছেলের সব দায়িত্বভার তার কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইছে কৌশলে।
মাদাম, মেলিনা তার এই সন্দেহ বাড়িয়ে দিল। বলল, ফেলিক্স অরেলিয়ার ছেলে। ও তোমার ছেলে নয়।
লার্তেস, সার্লো বা দলের অন্য সবাই উইলেমের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতে লাগল। উইলেম বলল, সে অভিনয় আর করবে না। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে একমাত্র মাদাম মেলিনা ছাড়া আর তাকে এ বিষয়ে ভেবে দেখার জন্য কোনও অনুরোধ করল না। মাদাম মেলিনা বারবার তাকে বলল, আপনি আবার ফিরে আসুন। আমরা আপনার কাছে অনেক ঋণী।
উইলেম বলল, সে কথা তো কেউ স্বীকার করে না।
স্থানীয় নাট্যমোদী লোকেরা উইলেমের অভিনয়ের প্রচুর প্রশংসা করতে লাগল। তাকে নাট্য জগতে আবার ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। কিন্তু উইলেম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওয়ার্নারকে একটা চিঠিতে লিখে দিল, আমি অভিনয় ছেড়ে দিয়ে তোমার কথামতো চলতে চাই। আমি আবার আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে ফিরে যেতে চাই।
একবার ঠিক করল উইলেম বারবারা, ফেলিক্স, মিগনন, এই তিনজনকেই থেরেসার কাছে পাঠিয়ে দেবে। সেইখানে ওরা থাকবে। মাঝে মাঝে ও গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবে। কিন্তু পরে ঠিক করল বারবারাকে একটা মাসিক বৃত্তি দিয়ে বিদায় করে দেবে। শুধু মিগনন আর ফেলিক্সকে পাঠাবে থেরেসার কাছে।
মনে মনে উইলেম যতই ভাবতে লাগল ফেলিক্স থেরেসার কাছে থাকবে, থেরেসা তাকে মার মতো স্নেহ করবে, তাকে কোলে করবে, ততই থেরেসা আরও প্রিয় হয়ে উঠতে লাগল তার কাছে। ফেলিক্সকে কোলে করা অবস্থায় থেরেসার এক কাল্পনিক মূর্তি খাড়া করে বড় আনন্দ পাচ্ছিল সে মনে মনে।
মিগনন তাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। অনেক করে তাকে বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিল থেরেসার কাছে। তারই জন্য ফেলিক্সকেও তার সঙ্গে পাঠাতে হলো। ফেলিক্সকে সে ভালোবাসে এবং তার টানে টানে সেও যাবে। ওদের পাঠিয়ে দেবার পর কাজকর্ম ও কথাবার্তা সব সেরে সে রওনা হলো কাউন্ট লোথারিওর প্রাসাদের অভিমুখে। প্রাসাদে গিয়ে দেখল শুধু জার্নো ছাড়া আর কেউ তখন প্রাসাদে নেই। জার্নো আর ডাক্তার আব্বে বাইরে গেছে। কাউন্ট নিজেও নেই। তবে তিনি আমাদের সকলকে একটা কাজের ভার দিয়ে গেছেন। এই অঞ্চলে একটা বড় ভূসম্পত্তি বিক্রি হচ্ছে। তিনি সেটা কেনার ভার আমাদর সকলের উপর দিয়ে গেছেন। দরদাম সব কিছু ঠিক করতে হবে।
কিছুক্ষণ আগে আব্বে এসে গেল। আব্বে ফেলিক্সকে এর মধ্যেই দেখে ফেলেছেন থেরেসার বাড়িতে। একথা-সেকথা বলার পর ফেরিক্সের কথা তুলে উইলেম তার মনের আসল সন্দেহের কথাটা বলল আব্বেকে। আব্বে অকুণ্ঠভাবে বললেন, ফেলিক্স। তোমারই সন্তান। তার মাও গুণবতী রমণী ছিলেন। আমি বলছি। এতে কোনও সন্দেহ। করো না।
এমন সময় ফেলিক্স একজনের সঙ্গে এসে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাকে বুকের উপর চেপে ধরল উইলেম। তার সকল সন্দেহ, সকল জ্বালা দূর হয়ে গেল। নিমেষে।
প্রাসাদের মধ্যে হঠাৎ ওয়ার্নারকে দেখে অবাক হয়ে গেল উইলেম। পরে জানল কাউন্ট লোথারিও যে ভূসম্পত্তি কিনতে যাচ্ছেন সেটি আসলে তাদের। ওয়ার্নার তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চয় কথাবার্তা বলছে। ওয়ার্নার তার শেষ চিঠিটা পেয়েছিল যথাসময়ে।
ওয়ার্নার বলল, আমার মনে হয় এই নূতন পরিবেশে কাউন্টের মতো এই সব দ্র ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তোমার উন্নতি হয়েছে। এখন তোমার চেহারা ও পোশাক-আশাকের উন্নতি হয়েছে।
উইলেম বলল, বাড়ির মেয়েদের খবর কী?
ওয়ার্নার বলল, সব ভালো আছে। আমার ছেলে হয়েছে দুটি। তোমার মা-বোন ভালো আছে। জমিজমার ব্যবস্থাও সব ঠিক হয়ে গেলে তুমি যাবে। তোমার কাজ আছে।
ফেলিক্সের কথাটা ওয়ার্নারের কাছে তুলল না উইলেম। ওয়ার্নার কিভাবে সেটা নেবে বুঝতে পারল না। অথচ ফেলিক্স তার কাছে সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওয়ার্নারওে তার কথা কিছু জিজ্ঞাসা করেনি।
হঠাৎ উইলেমের একটা কথা মনে হলো। মনে হলো যে সে ফেলিক্স, মিগননের প্রতি ঠিকমতো নজর দেয়নি। মিসননের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারত। ফেলিক্সের মতো সোনার চাঁদ ছেলের জন্য আরও আদর-যত্নের ব্যবস্থা করতে পারত।
অনেক ভাবনা-চিন্তা করে থেরেসাকে একখানা চিঠি খিলল উইলেম। থেরেসার মতো সেবাপরায়ণা মেয়ের উপরেই সে তার নিজের ও ছেলেদের ভবিষ্যৎকে অকুণ্ঠভাবে ছেড়ে দিতে পারে। সে তাই সংক্ষেপে চিঠিখানিকে থেরেসার কুশল জিজ্ঞাসা করে তাকে তার অন্তরের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও একই সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবও জানিয়েছিল।
চিঠিখানা থেরেসার কাছে সবেমাত্র পৌঁছতে কাউন্ট লোথারিও ফিরে এলেন প্রাসাদে। ব্যস্তভাবে বললেন, তোমার বোন তোমাকে অবিলম্বে তার বাড়িতে তোমাকে পাঠিয়ে দিতে বলেছে। এদিকে মিগননের অবস্থা খারাপ। তোমার সেখানে অভিলম্বে যাওয়া একান্ত দরকার।
