আমি বললাম, দীর্ঘ দশ বছর পর তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে।
সে হাসিমুখে বলল, আমারও যে কি আনন্দ হচ্ছে তোমাকে দেখে তা বুঝিয়ে বলতে পারছি না। আমি তার স্বামীর কথা তুললাম। সে তার ছেলেমেয়েদের সবাইকে ডাকল। বড় মেয়েটি মুখখানা তার মতোই হয়ে উঠেছে। আমার মনে হলো আমি যেন এক কমলালেবুর বনে এসেছি। আমার চারদিকে শুধু ফল আর ফুলের এক অদ্ভুত সোনালী সংসার।
কাউন্টের কথা শেষ হয়ে গেলে উইলেম ফেলিক্সের কথা তুলল। কাউন্ট অশান্ত হয়ে বলল, আপনি কার কথা বলছেন?
উইলেম বলল, অরেলিয়ার গর্ভে আমার ঔরসে যে সন্তানের জন্ম হয় তার কথা বলছি।
লোথারিও বললেন, অরেলিয়ার গর্ভে আমার কোনও সন্তানের জন্ম হয়নি। তার কোনও সন্তান হয়নি। সে নিজের মুখে আপনাকে একথা বলেছিল?
উইলেম বলল, না, স্পষ্ট করে বলেনি। তবে অনেকেই তাই মনে করেন।
কাউন্ট বললেন, যাই হোক, আপনি ওদের নিয়ে আসুন এখানে। আপনি মিগনন নামে যে মেয়েটির কথা বলছেন সে থাকবে থেরেসার কাছে। খুব ভালো থাকবে। আর ফেলিক্স আপাতত আপনার কাছেই থাকবে।
জার্নো বলল, তবে তোমায় থিয়েটার ছাড়তে হবে। ও তোমার দ্বারা হবে না।
উইলেম বলল, আগে ওদের নিয়ে আসি তো। তারপর সেকথা ভেবে দেখা যাবে।
একটা বিষয়ে নিশ্চিত হলো উইলেম। সে কাউন্টের কাছে জানতে পারল, ফেলিক্স অরেলিয়ার সন্তান নয়। এক বৃদ্ধার কাছ থেকে পাওয়া একটি ছেলে যাকে সে মানুষ করত এবং যাকে অনেকে তার ছেলে মনে করত।
অবশেষে এই শহরে তার বাগানবাড়িতে পৌঁছে দেখল সব ঠিক আছে। একটি ঘরে সে ফেলিক্স ও মিগননকে এক বৃদ্ধার কাছে বসে থাকতে দেখল। এদের দুজনকেই সে নিয়ে যাবে থেরেসার কাছে। তার কাছে ওরা সুখে থাকবে। আর তাতে সে নিজে হয়ে উঠবে নিশ্চিন্ত।
হঠাৎ যেন ভূত দেখে চমকে উঠল উইলেম। এই বৃদ্ধা আর কেউ নয়, বারবারা মেরিয়ানার গৃহকত্রী। প্রথমটার চিনতে পারেনি। উইলেম কড়াভাবে জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা তুমিই কি ফেলিক্সকে অরেলিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলে?
এদিকে ছেলেরা উইলেমকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বারবারা চুপ করে থাকায় উইলেম আবার জিজ্ঞাসা করল, মেরিয়ানা এখন কোথায়?
এবার বারবারা ভারী গলায় বলল, সে আর ইহলোকে নেই।
উইলেম ব্যস্ত হয়ে বলল, আর ফেলিক্স
ফেলিক্স হচ্ছে মেরিয়ানারই হতভাগ্য সন্তান। সে রত্ন আজ তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি সে আমাদের একদিন অনেক দুঃখ দিয়ে আজ তোমাকে প্রচুর সুখ দান করবে।
বারবারা উঠে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে উইলেম বলল, কোনও কাগজপত্র আছে?
বারবারা উঠে গিয়ে মেরিয়ানার একটি চিঠি এনে দিল। সত্যিই মেরিয়ানার হাতের লেখা। উইলেম চিনতে পারল। মেরিয়ানা লিখেছে, জানি না এ চিঠি তোমার হাতে পৌঁছবে কি না। যদি তোমার হাতে যায় তাহলে তোমার হতভাগ্য সেই বান্ধবীর জন্য দুফোঁটা চোখের জল ফেলো। মনে রাখবে তোমার প্রেমই তার মৃত্যু ঘটায়। কয়েকদিন প্রসবযন্ত্রণা ভোগ করার পর একটি পুত্র প্রসব করে মারা যাচ্ছি আমি। আমি তোমার প্রতি বিশ্বস্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছি। বারবারার কথা শুনবে?
বারবারা বলল, তবু ভালো, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও, তোমার প্রেমাস্পদকে হারালেও তোমার সন্তানকে পেয়েছ। তুমি যদি শোনো সে তোমার জন্য কতখানি কষ্ট করেছে, কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কতদূর বিশ্বস্ত ছিল তোমার প্রতি তাহলে দুঃখ রাখবার জায়গা থাকবে না তোমার মনে।
মিগনন উইলেমকে বলল, হ্যাঁ, মালিক, ফেলিক্স তোমারই ছেলে।
উইলেম বারবারাকে বলল, হ্যাঁ তোমাকে শুনতে হবে। মেরিয়ানার সব কথা, শেষ কথা শুনতে হবে।
বারবারা উইলেমের ঘরে এল গভীর রাতে। এল মেরিয়ানার কথা শোনাতে। তিন গ্লাস শ্যাম্পেন নিয়ে এসে নিজে এক গ্লাস খেয়ে উইলেমকে এক গ্লাস দিয়ে এক গ্লাস রেখে দিল মেরিয়ানার আত্মার জন্য। বলল, মেরিয়ানার কাছে রাত্রিতে যখন তুমি আসতে তখন আমি এমনি করে তিন গ্লাস শ্যাম্পেন আনতাম।
বারবারা বলল, মেরিয়ানার সঙ্গে তোমার যেদিন শেষ দেখা হয় সেদিন তুমি তার ঘরের মেঝের উপর একখানি চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলে এবং তা নিয়ে গিয়েছিলে। তা মনে আছে? তাকে কি লেখা ছিল?
উইলেম বলল, হ্যাঁ সব মনে আছে। সে চিঠি কোনও এক বিক্ষুব্ধ প্রেমিকের লেখা যার সঙ্গে আগের দিন সন্ধ্যার তার প্রেমিকা ভালো ব্যবহার করেনি এবং যে সেদিন সন্ধ্যাতেও আসে ভালো ব্যবহারের প্রত্যাশায়। সে প্রেমিক সেদিন রাতেও এসেছিল তোমাদের ঘরে। তাকে আমি অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে দেখেছি তোমাদের বাড়ি থেকে।
উইলেমের কথায় বেশ কিছুটা ক্ষোভ ছিল। বারবারা বলল, তুমি তাকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলে, কিন্তু সে রাত্রে মেরিয়ানা কত কষ্টে কাটায়, কত দুঃখ পায় তার খবর তুমি জান না। তুমি জান না সেই ক্রুদ্ধ প্রেমিকের সঙ্গে দুটি দিনের মধ্যে একদিনও কোনও কথা বলেনি মেরিয়ানা। আমি শুধু তাকে মিথ্যা অজুহাত আর মিষ্টি কথায় তুষ্ট করে পাঠিয়ে দিই। আসল কথা তুমি আসার পর থেকে এক বিরাট পরিবর্তন আসে মেরিয়ানার জীবনে। তার আগে নবার্গ নামে এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে তার আলাপ হয়। ছেলেটি তাকে মনপ্রাণে ভালোবাসে। আমিও বারবার তাকে নর্বার্গের নিবেদিত প্রেমকে বরণ করে নেবার জন্য অনুরোধ করি। মাঝে মাঝে তাকে কত ভালো ভালো উপহার পাঠাত নৰ্বার্গ। মেরিয়ানার মন কুণ্ঠা ও দ্বিধার দোলায় দুলতে থাকে সব সময়। তুমি তার সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে সব কুণ্ঠা দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে তোমাকেই গ্রহণ করে বসে সে। আমার এতে ইচ্ছা না থাকলেও বাধা দিতে পারিনি কারণ তার সুখই হলো আমার সুখ। আমার কথার অবাধ্য হলেও আমি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারতাম না তার কাছ থেকে। মেয়েটা ছিল শিশুর মতো সরল এবং সৎ। তার সরলতা ও সততার সুযোগ নিয়েছে অনেকে অনেকবার। তুমি রাগ করে চলে গেলে, আর এলে না। অথচ দিনের পর দিন সে পথ চয়ে বসে থেকেছে। তোমার কথা ভেবে ভেবে দিন কাটিয়েছে। আর সেই প্রতিটি মুহূর্তের সকল দুঃখ-বেদনার নীরব সাক্ষী হয়ে আছি আমি। তোমার মনে যাই থাক একবার দেখা করে সব কথা বলতে পারতে। কিন্তু তুমি আর একবারও এলেও না। তার মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী একমাত্র তুমিই। পালা করে আমরা দিনের পর দিন জানালার ধারে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। যদি তুমি রাস্তা দিয়ে যাও। সে জানালা থেকে একবার সরে গেলেই আমাকে গিয়ে দাঁড়াতে হতো। বিরক্তি সত্ত্বেও তারই জন্য এ কাজ করতে হতো আমায়।
