আমাদের পাড়ায় এক ধনী সম্পত্তিশালিনী মহিলা ছিলেন। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি তাকে বললাম আমি তাঁর ঘরসংসার দেখাশোনা করব। ভদ্রমহিলা রাজি হলেন। আমি তাঁর ঘরেই থাকতাম। কিন্তু লিভিয়া আসাতে লিভিয়াকেই তিনি। রাখলেন ঘরের কাজকর্ম করার জন্য। অবশ্য তিনি আমাকেও তার সম্পত্তি দেখাশোনার কাজ দিলেন। তাঁর অনেক বন ছিল। আমি সেই বনাঞ্চল থেকে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করলাম। লিভিয়া যে বাড়িতে থাকত সেই বাড়িতে কাউন্ট লোথারিও মাঝে মাঝে যাতায়াত করতেন। তিনি ছিলেন ঐ মহিলার আত্মীয়। সেই সূত্রে লিভিয়া ও আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ-পরিচয় হয়। একবার আমি পুরুষের পোশাক পরে বন্দুক কাঁধে করে শিকার করতে যাই। লিভিয়া দেখতে খারাপ না হলেও সমাজের নিচু স্তর থেকে আসা এক মেয়ে সে। আর আচার-আচরণ ও কথাবার্তার মধ্যে কোনো মার্জিত ভাব বা সূক্ষ্মতা ছিল না। আমার মধ্যে এই ভাবটা থাকায় লোথারিও আমাকেই পছন্দ করত বেশি।
একদিন সেই ভদ্রমহিলা আমাকে জানিয়ে দিলেন লোথারিও আমার পাণিগ্রহণ করতে চেয়েছে। আমার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে একথা শুনে এক অপার আনন্দ অনুভব করলাম আমি। এরপর লোথারিও যেদিন এল সেই বাড়িতে সেদিন দুহাত। বাড়িয়ে লোথারিও জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমিও খুশি হয়ে আলিঙ্গন করলাম তাকে। তারপর আমার বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেল।
একদিন লোথারিও এলে আমি তার একটা ফটো চাইলাম। তার ফটোটা সযত্নে রাখার জন্য আমি আমার গয়নার কৌটোটা এনে খুলে ফেললাম। হঠাৎ তার মধ্যে আমার মার ফটোটা দেখে ছোঁ মেরে সেটা তুলে নিল লোথারিও। ভালো করে দেখে। বলল, কে এই মহিলা? সুইজ্যারল্যান্ডে বেড়াতে যাবার সময় তার সঙ্গে আলাপ হয় আমার। সাময়িকভাবে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল।
আমি বললাম, উনি আমার মা। এখন ফ্রান্সে থাকেন। মার ছবিখানা নিয়ে কি একবার ভাবল লোথারিও। তারপর হাতে মুখটা ঢেকে বেদনার্ত অস্ফুট স্বরে বলল আমার মতো হতভাগ্য লোক আর পৃথিবীতে নেই।
এই বলে আমাকে কোনও কথা না বলে বেরিয়ে চলে গেল সে। বাইরে ঘোড়ায় চেপে আমার পানে তাকিয়ে হাতটা নাড়িয়ে ঘোড়া ছেড়ে দিল।
পরে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সুইজারল্যান্ডে থাকার সময় মার সঙ্গে এক অবৈধ সংসর্গ হয় লোথারিওর। সেই জন্য সে আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। আমিও এ বিষয়ে এ নিয়ে তাকে কোনও পীড়াপীড়ি করিনি। আমি তাকে সহজেই মুক্তি দিই। এই সুযোগে লিভিয়া ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল লোথারিওর সঙ্গে।
কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠটা ভারী হয়ে উঠল থেরেসার। সে একটা হাত আবেগের সঙ্গে বাড়িয়ে দিল উইলেমের দিকে। উইলেম সে হাতটা নিয়ে চুম্বন করল। তারপর বলল, চলো, যাওয়া যাক।
ওরা থেরেসার বাড়ি ফিরে দেখল দরজার সামনে বিষণ্ণ মুখে বসে রয়েছে লিভিয়া। লিভিয়া উইলেমকে বলল, আমি ওদের চক্রান্ত বুঝতে পেরেছি। আমাকে সরিয়ে দিয়ে ওরা সব লুটেপুটে খাবে। তোমাকেও ওরা ওদের স্বার্থ চরিতার্থ করার যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।
সন্ধের সময় দুটো ছোট ছেলে এল থেরেসার কাছে পড়তে। থেরেসা বলল, আমি সন্ধেয় গ্রামের কিছু গরিব ছেলেমেয়েকে পড়াই। লোথারিওর বোনও মাঝে মাঝে আসে। এই মহীয়সী নারীর সঙ্গে তুমি যদি পরিচিত হও তাহলে তার সৌন্দর্যে, ঔদার্যে ও মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়ে যাবে।
উইলেম এই কথা স্বীকার করতে পারল না যে এই নারীর সঙ্গে ঘটনাক্রমে অনেক আগেই সে পরিচিত হয় এবং সেই পরিচয় অনেক দুঃখ নিয়ে আসে তার জীবনে। যাই হোক, থেরেসা প্রসঙ্গ পাল্টে দেওয়ার পুরনো স্মৃতির অপ্রীতিকর এক পীড়নের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে গেল উইলেম।
পরদিন কাউন্ট লোথারিওর প্রাসাদে ফিরে যাবার জন্য তৈরি হলো উইলেম। লিভিয়ার সঙ্গে দেখা করে বলল, কাউন্ট আমাকে ভীষণ ভালোবাসে এবং শীঘ্রই দেখা হবে আমাদের সঙ্গে। দিনকতকের মধ্যেই আমি যাচ্ছি। ওদের সব চক্রান্ত ভেঙে দেব আমি।
প্রাসাদে একা একা ফিরে এল উইলেম। দেখল আব্বে ও ডাক্তার নেই। কাউন্টের কাছে রয়েছে শুধু জানেনা। কাউন্ট এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। জার্নো বলল, আজ তাহলে আপনার ভ্রমণটা বেশ আনন্দদায়ক হয়েছে।
কাউন্ট বললেন, তা ঠিক বলতে পার। বেশ কিছুদিন পর আমি ঘোড়ায় চেপে নদী পার হয়ে মাঠের ওপারে গ্রামে চলে গেলাম পুরনো অভ্যাসের বশে। ঠিক সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে ঘোড়ার বেগটা কমিয়ে দিলাম।
জার্না বলল, আপনি এক চাষির মেয়েকে ভালোবাসতেন। আপনি হয়ত তাদের বাড়িতেই চলে গিয়েছিলেন।
. কাউন্ট বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই। সেই মেয়েটির দূরে কোথাও বিয়ে হয়েছে। সে এখন ছয়টি সন্তানের জননী। তবে শুনেছি সে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে করে তার বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। তাদের বাড়ির সামনে কজন ছেলেমেয়ে খেলা করছিল। আমি যেতেই একটি মেয়ে একটি ছেলেকে আমার ঘোড়ার কাছ থেকে নিয়ে গেল। আমি ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়াটা দূরে এক জায়গায় বেঁধে রেখে তাদের বাড়িতে গেলাম। তাদের দেখে ঠিকই চিনতে পারলাম। সে আগের থেকে বেশ মোটা হয়েছে। আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। সেও আমায় চিনতে পেরে হাতটা বাড়িয়ে দিল। তার মুখে লজ্জারুণ ভাব নেই। অন্তরের কোনও গোপন আলোড়ন মুখে-চোখে রঙিন চাঞ্চল্যে ফেটে পড়ল না। তবু তাকে আমার ভালো লাগল। তার কোলে ছেলে ছিল। আগেকার দিনের তার সেই তারুণ্যে যত সব চঞ্চলতা, যৌবনের যত উত্তাল আর উদ্দমতা মাতৃত্বের এক শান্ত শীতল যৌবনের মধ্যে কেমন গাঢ় ও স্তব্ধ হয়ে উঠেছে। সে গাঢ়তা সে স্তব্ধতার মধ্যে কম মনোহারিতা নেই।
