উইলেম বলল, এভাবে কাউকে আমি প্রতারণা কখনও করিনি, যদিও অবশ্য এ প্রতারণা একজনের ভালোর জন্য।
উইলেমের যেতে মন সরছিল না দেখে জার্নো বলল, ওখানে গেলে তোমার লাভ ছাড়া লোকসান হবে না। থেরেসা সাধারণ মেয়ে নয়। ওখান থেকেই তুমি তোমার কাউন্টপত্নীর খোঁজ পেয়ে যাবে।
আর কোনও প্রতিবাদ করল না উইলেম। গাড়ি এসে নিচের তলায় গাড়িবারান্দার কাছে দাঁড়াল। লিভিয়ার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। ঝি-চাকরদের বলল, রাত্রির আগেই চলে আসবে।
গাড়িতে ওঠে লিভিয়া উইলেমকে বলল, থেরেসার সঙ্গে একসময় লোথারিওর ভালোবাসা ছিল। সে অনেক পুরুষকেই ঠকিয়েছে।
নির্দিষ্ট বাড়ির সমানে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই উকিল ভদ্রলোক এসে ওদের অভ্যর্থনা করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বললেন, থেরেসা চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। কাছাকাছি কোনও শহরেই আছে।
উইলেমরা বলল, আমরা তাঁকে খুঁজে এনে দেব।
আবার গাড়ি ছেড়ে দিল। কয়েকটা গা ঘুরে বেড়াতে হলো। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। লিভিয়া কোচম্যানকে ফিরে যেতে বলল। তখন রাত্রি হয়ে গেছে। কোচম্যান বলল, পথ হারিয়ে ফেলেছি। সকাল না হলে উপায় নেই।
এইভাবে সারারাত পথেই কেটে গেল। চোখের পাতা এক করল না লিভিয়া। কিছুটা বেলার পর কোনও এক গাঁয়ের এক বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই এক যুবতী এসে গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়াল। তাকে দেখে কিছুক্ষণ তার পানে তাকিয়ে উইলেমের কোলের উপর মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল লিভিয়া।
উইলেমকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। থেরেসার সঙ্গে পরিচয় হলো তার। থেরেসা নিজের মুখেই তার পরিচয় দিলো। এক মুহূর্তেই তার বন্ধু করে নিল। তাকে লিভিয়ার কথা জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, লিভিয়া খুব রেগে গেছে। তাকে যারা ভুলিয়ে ঘর থেকে বার করে এনেছে তাদের দলে তোমাকেও টেনেছে। সে বলেছে তোমার মুখ সে আর দেখবে না।
কাউন্ট লোথারিওর খুব প্রশংসা করতে লাগল উইলেম। থেরেসা বলল আমার মনের কথাটাই আপনি বলে দিলেন। আমিও সত্যিই খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখি লোথারিওকে।
উইলেম বলল, তাঁর মতো উদারহৃদয় আর সরল প্রকৃতির লোক আমি খুব কম দেখেছি। কিন্তু তিনি যাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছেন তারা সবাই ভালো নয়। সেটাই। সুখের বিষয়।
এইভাবে থেরেসার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল উইলেম। তাকে বিশ্রাম করতে বলে ঘরের কাজে অন্যত্র উঠে গেল থেরেসা। বর্তমানে তার কোনও ঝি-চাকর বা বঁধুনী নেই। আগে ছিল। তাই ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়।
সারা দুপুর ও বিকেলটা একা একা কাটাল উইলেম। সন্ধের একটু আগে তার ঘরের দরজা খুলে হঠাৎ একজন সুদর্শন যুবক ঢুকল। ঢুকেই বলল, বেড়াতে যাবেন?
উইলেম ভালো করে তাকিয়ে দেখল থেরেসাই পুরুষের পোশাক পরে এসেছে। যাই হোক, দুজনেই বেড়াতে বের হলো। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা মাঠ পার হয়ে ওরা একটা পাহাড়ের উপর উঠতে লাগল। তারপর একটা বসার জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ল দুজনে। থেরেসা বলতে আরম্ভ করল তার নিজের জীবনের ইতিহাস।
আমার বাবা ছিলেন এই অঞ্চলের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সদা আনন্দময়, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন মিতব্যয়ী এক মানুষ। নির্ভরযোগ্য বন্ধু, স্নেহশীল পিতা। বাবার চরিত্রে আমি শুধু একটা দোষই দেখছি। সেটা হলো অযোগ্য স্ত্রীর প্রতি অত্যধিক অসংগত সহনশীলতা। আমার মা ছিলেন বাবার ঠিক উল্টো প্রকৃতির। নারীসুলভ বোধ মার চরিত্রে খুঁজে পেতাম না আমি। তাঁর মন সময় সময় বাইরে পড়ে থাকত। থিয়েটার, যাত্রা, নাটক, লোকজন নিয়ে বাইরের জীবনেই থাকতেন তিনি। স্নেহ-ভালোবাসায় কোনও আন্তরিকতা কোনওদিন ছিল না তাঁর মধ্যে। তিনি কখনও আমাকে আদর করেছেন বা ভালোবেসে কিছু তুলে দিয়েছেন হাতে-একথা আমার মনে পড়ে না। বরং বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে প্রায়ই তিরস্কার করতেন। যতক্ষণ মা বাড়িতে থাকতেন না, ততক্ষণ আমরা অর্থাৎ আমি ও বাবা বেশ ভালো থাকতাম। বাবার সঙ্গে বেড়াতে যেতাম। মাঠে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতাম। হাসিখুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠত আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত। কিন্তু মার কাছে বাবার সেই আনন্দোজ্জ্বল মূর্তিটি কেমন ম্লান হয়ে যেত এক বিমর্ষতায়। কথায় কথায় রাগারাগি করতেন মা। মার সামনে কোনও কথা বলতে পারতেন না বাবা। তার কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেও পারতেন না। মার কাছে বাবাকে যেন নিষ্প্রভ দেখাত সব সময়।
এক সময় মা দূর গ্রামাঞ্চলের এক এস্টেটে চলে গেলেন। সংসারে আমি আর বাবা। আমরা তখন হাতে স্বর্গসুখ পেলাম। মার অবর্তমানে প্রতিটি মুহূর্ত অবাধ স্বর্গসুখ অনুভব করতে লাগলাম। কিন্তু সে স্বর্গসুখ বেশি দিল সইল না। হঠাৎ বাবার ডান অঙ্গটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেল। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় বাকশক্তি হারিয়ে ফেললেন বাবা। সব সময় তাঁকে দেশে মনে হতো তিনি যেন কি বলতে চাইছেন। বাবা বলতে বা লিখতে পারতেন না। অন্য সময় এর আগে বাবার চোখ দুটো আয়নার মতো ঝকঝক করত। কিন্তু এখন সে চোখ এমনই ঘোলাটে হয়ে উঠল যে তাতে কোনও ভাব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে পারত না।
অবশেষে সব কষ্ট থেকে মুক্তি পেলেন বাবা। বাবা মারা গেলেন। বাবার মৃত্যুর পর মার কাছে লিখলাম। তাঁর কাছে লিভিয়া তখন থাকত। আমার সমবয়সী লিভিয়া তাঁর দেখাশোনা করত। কিন্তু মা আমাকে যেতে নিষেধ করলেন। আমাকে কোনওমতেই তিনি সহ্য করতে পারবেন না। আমি নিজের জন্যেই ভাবছিলাম। এমন সময় একদিন লিভিয়া এসে হাজির হলো আমার কাছে। মা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।
