সকালে উঠতেই উইলেম শুনল কাউন্ট লোথারিও ঘোড়ার চেপে কোথায় বেরিয়ে গেছেন। বিপশ আব্বের সঙ্গে কথা হচ্ছিল উইলেমের। এমন সময় একজন বিক্ষুব্ধ মহিলা ঘরে ঢুকে আব্বোকে বিক্ষোভের সঙ্গে বলল, তাকে তোমরা কোথায় পাঠালে? এই তোমাদের চক্রান্ত।
আব্বে শান্তভাবে বললেন, আপনি শান্ত হোন, তিনি এখনি এসে পড়বেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা কোচ এসে থামল প্রাসাদের সামনে। আহত কাউন্টকে ধরাধরি করে নামানো হলো। ভদ্রমহিলা চিৎকার করে বলতে লাগল, ও আহত হয়েছে। হা ভগবান, কি হবে!
হঠাৎ উইলেম কাউন্টের দলের মধ্যে জার্নোকে দেখতে পেল। জার্নোর সঙ্গে তার। আগে থেকেই পরিচয় ছিল। জার্নোর সঙ্গে উইলেমের পরিচয় হয় এর আগে। ওরা দল বেঁধে নাটক করার জন্য সেই সময় কাউন্টের প্রাসাদে বাস করত। জার্নো ঠাট্টা করে উইলেমকে বলল, যেখানেই নাটক সেখানেই তুমি। এখানেও এখন এক নাটক জমে উঠেছে।
জার্নো অন্যত্র চলে গেলে আব্বে উইলেমকে বললেন, কিছুদিন আগে আমাদের কাউন্ট লিভিয়া নামে এক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মহিলাটি এই প্রাসাদেরই। একজন হিসাবে বাস করতে থাকেন। পরে কাউন্ট কিছুটা অনাসক্ত হয়ে পড়েন তার প্রতি। এতে লিভিয়া চলে যান। কথাটা তার পূর্ববর্তী স্বামী জানতে পেরে কাউন্টকে এক ডুয়েলে আহ্বান জানান। আজ সেই ডুয়েলে কাউন্ট ও লিভয়ার স্বামী দুজনেই আহত হলো। এই জন্য লিভিয়া এত বিক্ষুব্ধ। এখন তিনি কাউন্টের জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন।
উইলেম আশ্চর্য হয়ে দেখল কাউন্টের চিকিৎসার জন্য সে সার্জন এল সেই সার্জেনই একদিন সে পথের ধারে জঙ্গলে দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা করে। জার্নো ও সার্জেনকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল উইলেম। আগেকার সেই রহস্যটা ঘনীভূত হয়ে উঠল আরও।
আব্বে উইলেমকে বললেন, কাউন্ট চান আপনি দিনকতকের জন্য এখানে তার আতিথ্য গ্রহণ করুন। তিনি একটু সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনার বাড়িতে চিঠি দেবার প্রয়োজন হলে দিন। আমার যথাশীঘ্র পাঠিয়ে দিব।
ডাক্তার এসে জার্নোকে খবর দিল, ভয়ের কোনও কারণ নেই। কাউন্ট শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবেন। উইলেম তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ডাক্তার চলে গেল। উইলেম একসময় জার্নোকে বলল, আপনি তো অনেক কিছু জানেন। আচ্ছা বলতে পারেন কি এই কাউন্ট পরিবারের সঙ্গে আগেকার সেই আমাদের পরিচিত কাউন্ট পরিবারের কোনও সম্পর্ক আছে কি না?
জার্নো বলল, যে কাউন্টের ভূত হয়ে তাঁকে তুমি ভয় দেখিয়েছিলে তিনি এই কাউন্ট লোথারিওর ভগ্নিপতি। যে কাউন্টপত্নী তোমার জন্য আজ পাগল হতে বসেছে। সেই কাউন্টপত্নী লোথারিওর আপন বোন। লোথারিওর কোনো সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর বিষয়সম্পত্তি গরীব-দুঃখীদের অর্থাৎ তথাকথিত এক নিম্নশ্রেণীর লোকদের দান, করে যাবেন।
উইলেম ভয়ে ভয়ে বলল, লোথারিও আমার সম্পর্কে সব ব্যাপার জানেন।
জার্না বলল, সব জানেন।
উইলেম বলল, তাহলে আমি চলে যাই এখান থেকে। আমি তাহলে কেমন করে কোন মুখে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব?
জার্নো উত্তর করল, কিন্তু এখন তো আগের মতো অত সহজে পালিয়ে যেত পারবে না বন্ধু। এখন আমার অফুরন্ত অবসর। আমার বন্ধু, পরম উপকারী হিতাকাক্ষী বন্ধু যুবরাজের মৃত্যু ঘটায় এখন আমি নিঃসঙ্গ কর্মহীন। এখন তোমার সেই বেদের খবর কি? তাদের নিয়ে আবার কি নাটক করলে?
উইলেম বিরক্তির সঙ্গে বলল, খুব শাস্তি পেয়েছি। তাদের কথা আর বলো না। ওরা একেবারে অপদার্থ। এতটুকু চিন্তাশক্তি ওদের কারও নেই। নিজেদের প্রকৃত যোগ্যতা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই ওদের। ওরা সবাই মনে করে ওরা এক-একজন মহান অতুলনীয় অভিনেতা। বিন্দুমাত্র কেউ ওদের সমালোচনা করলেই ক্ষেপে যায়। ওরা চির অভাবী। কিন্তু যুক্তি ও সুরুচিকে ওরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।
উইলেম একটু চুপ কর থেকে বলল, তুমি সব জার্নো। একবার আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে পার না?
জার্নো বলল, ধীরে ধীরে সব হবে। ধৈর্য ধরো।
জার্নো একবার সেই মানসিক রোগের ডাক্তারকে পাঠাল প্রাসাদে যাঁর আশ্রমে বৃদ্ধ বীণাবাদককে ভর্তি করে দিয়েছে উইলেস এবং যার সঙ্গে একদিন তার আলাপও হয়। এই ডাক্তারই বর্তমানে তার পরিচিত কাউন্টদম্পত্তির চিকিৎসা করছেন।
উইলেম কৌতূহলের সঙ্গে বৃদ্ধ বীণাবাদকের কথা জিজ্ঞাসা করল। ডাক্তার বললেন, মনে হয় ভালো হয়ে যাবে। কোনও এক আত্মীয়ের সঙ্গে ওর ভালোবাসা হয়, একটা সন্তানও হয়। তাদের মৃত্যু হবার পর হতাশা ও বিষাদের আতিশয্যে ও এই রকম হয়ে পড়ে। ওর সমগ্র অস্তিত্ব হয়ে ওঠে এক অন্তহীন অন্ধকার শূন্যতা। ওর একটা ধারণা হয়, কোনো এক বালকের দ্বারা ওর মৃত্যু হবে। প্রথমে ও মিগননের পোশাকের জন্য তাকে বালক ভেবেছিল। পরে ওর রাগটা পড়ে ফেলিক্সের ওপর। বেটাছেলেদের সব পুড়িয়ে মারার জন্যই হয়ত ও বাড়িতে আগুন লাগায়।
ডাক্তার চলে গেছেন। কাউন্টদম্পতির কথা আর জিজ্ঞাসা করা হলো না। এদিকে জার্নো একটা বড় কাজের ভার দিল উইলেমের উপর। জার্নো বলল, ডাক্তার এইমাত্র বলেছেন লিভিয়াক দুই-একদিনের জন্য বাইরে কোথায় সরিয়ে নিয়ে যাওয় দরকার। ও দিনরাত কাউন্টের কাছে বসে আছে। ওর অত্যধিক প্রেমানুরাগ এবং আদরযত্নের আতিশয্য কাউন্টের আরোগ্যলাভের পথে প্রচুর বাধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ওকে এমনি কোথাও যেতে বললে কাউন্টকে ছেড়ে যেতে চাইবে না। তাই আমরা একটা পরিকল্পনা করেছি। আমরা ওকে বলব আমাদের এই পরিবারের উকিলের বাড়িতে একবার ওকে যেতে হবে। তার প্রণয়িনী ফ্রলিন থেরেসা তাকে ছেড়ে চলে গেছে এইমাত্র আমরা খবর পেয়েছি। লিভিয়া গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেবে। তিনি বলবেন থেরেসা হয়ত কাছাকাছি কোথাও আছে। লিভিয়া তখন বলবে আমরা তখন তাকে খুঁজে নিয়ে আসছি। তারপর যে ঘোড়ার গাড়িতে করে তোমরা যাবে তাতে করেই এখানে-সেখানে খোঁজ করে বেড়াবে। লিভিয়া ফিরতে চাইলে সরাসরি তাকে বাধা দেবে না। কিন্তু তখন রাত্রি হয়ে যাবে। তার কোচম্যানকে বলা থাকবে সে ঘুরপথে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটিয়ে দেবে।
