যাই হোক, আমার বোন ভালো হয়ে উঠল। নির্বিঘ্নে সন্তান প্রসব হলো। তবে যাবতীয় সেবা-শুশ্রূষার কাজ আমাকেই করতে হলো। আমাকে তাদের ঘরে থেকে। যেতে হলো কিছুদিন। বোনের স্বামীর সঙ্গে আমার বোনের সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল। না। তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। অনেক সময় তাদের ঝগড়া মেটাতে হতো আমাকে। আমি অনেক করে আমার ভগ্নিপতিকে বোঝাতাম।
আমার বোন আবার সন্তানসম্ভবা হলো কিছুকাল পরে। প্রসবব্যথা উঠলে আবার তাকে দেখতে গেলেন বাবা। আর এক পুত্রসন্তান প্রসব করল সে। ছেলের মুখ দেখে। খুশি হলেন বাবা। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে আর বেশিদিন বাবা রইলেন না এ জগতে।
বাবার মৃত্যু এক অদ্ভুত পরিবর্তন নিয়ে এল আমার জীবনে। বাবা বেঁচে থাকতে সব সময় কাজ নিয়ে থাকতাম। ঘর-সংসারেরর কাজ, সেবা-শুশ্রূষার কাজ, কত রকমের কাজ। সময়ের কত অভাব। একটু ইচ্ছেমতো পড়াশুনো করতে পারতাম না। সব সময় বাঁধাধরা নিয়মের মধ্য দিয়ে চলতে হতো। কিন্তু এখন আমার হাতে অফুরন্ত সময়। আমি একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না এই সময়। কোনও প্রিয়বস্তুর পিছনে। ছুটে চলা বা কোনো প্রিয় কাজ করে যাওয়ার মধ্যে মানুষের প্রকৃত সুখ নেই। মানুষ যে পথ ন্যায়ের পথ, ধর্মের পথ বা মহৎ পথ বলে মনে করে সেই পথে অবাধে চলতে পারার মধ্যেই আমার প্রকৃত সুখ। সে পথ চলায় দুঃখ থাকলেও তাতে পাওয়ার অপার সুখ।
আমি সবাইক ছেড়ে একা সেই পথেই চলা শুরু করেছিলাম। আমি তাতেই সুখ পেতাম। আমার সে সুখের অর্থ কেউ বুঝতে পারত না। এই সময় আমার মনটা এতই সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছিল যে আমি আমার দেহটাকে বাইরের এক জড়বস্তু বলে মনে করতাম। আমার মনে হতে দেহ-আত্মা দুটো পৃথক বস্তু। মনে হতো আমার দেহের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই।
আমার কাকার বাড়িতে যে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সেই প্রকৃতিবাদী ডাক্তার একবার বেড়াতে এলেন আমাদের বাড়িতে। দিনকতক তার সঙ্গে কথা বলে বেশ কাটল। তিনিও আমাকে বলতেন দেহটাকে বাইরের প্রকৃতি জগতেরই এক অঙ্গ বলে মন করবেন। ঈশ্বর যদি বিশ্বাস করেন তাহলে প্রকৃত জগতের সব বস্তুর মধ্যেই সেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করবেন। দেখবেন তাতে আনন্দ পাবেন। বুঝবেন সেই ঈশ্বরই প্রতিটি বস্তুর স্বরূপ। আসল সত্তা।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি ঠিক তাই দেখতাম।
এদিকে আমার এই বিবাহিত বোনকে নিয়ে আবার বিপদে পড়লাম। প্রায় প্রতি বছরই তার সন্তান হতে লাগল একটি করে। কিন্তু কন্যা সন্তান হতে লাগল বেশি। এতে তার স্বামী বিরক্তিবোধ করতে লাগল। তার চাই পুত্র সন্তান। আমার বোন সন্তানসম্ভবা হলেই সে আশা করত পুত্র সন্তান। কিন্তু কন্যা হলেই হতাশ হতো। তার মুখ ভার হতো। তার একটা কারণও ছিল। যে বিরাট ভূসম্পত্তির যে মালিক হয়েছিল ভবিষ্যতে তারা এই সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে, তাদের বাবাকে সাহায্য করতে পারবে।
এবার আমার বোনের চতুর্থবার। এবারও তার স্বামী অন্যবারের মতো পুত্র সন্তান আশা করেছিল। নিবিড় প্রত্যাশায় দিন গণনা করছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারল না। হঠাৎ ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেল। এদিকে আমার বোন পর পর দুবার দুটি কন্যা সন্তান প্রসব করার পর এবার সত্যিই একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। দুঃখের বিষয় তার স্বামী এত আশা করেও তা দেখে যেতে পারল না।
প্রসবের পর আমার বোনও আর রইল না পৃথিবীতে। তিন-চারটি সন্তানের বোঝা আমার ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে অকালে মারা গেল হঠাৎ।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
আবার বসন্ত এল। রঙে রসে পত্রপল্লবে উজ্জ্বল হয় উঠল চারদিকের প্রকৃতি। আকাশে মেঘ-বৃষ্টি নেই, সমুদ্রে ঝড় নেই, পাহাড়ে কুয়াশা নেই। যেদিকেই তাকানো যায় শুধু আলো আর রং। নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল উইলেম ঘোড়ায় চেপে। একটা পাহাড়ের কাছে একটা লোককে দেখতে পেয়ে তাকে কাউন্ট লোথারিরও বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞাসা করল। লোকটি বলল, ঐ পাহাড়টার ওধারে। ওই কাউন্ট লোথারিওর সঙ্গে দেখা করে তাকে অরেলিয়ার দেওয়া চিঠি আর পাণ্ডুলিপিটা দিতে হবে।
লোথারিওর প্রাসাদে যেতেই এক মোটা ভদ্রলোক তার সামনে এগিয়ে এল। বলল, কাউন্টের সঙ্গে দেখা হবে না। অনেক লোক আগে থেকেই তাঁর দর্শনপ্রার্থী হয়ে। বসে আছে। উইলেমের অনেক অনুনয়-বিনয়ে লোকটি তাকে কাউন্টের কাছে নিয়ে গেল।
কাউন্টের চেহারা দেখতে ভালো। কিন্তু তখন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। উইলেমকে দেখেই বললেন, আপনাকে বসিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত। একটা অদ্ভুত সংবাদ পেয়ে আমি ব্যস্ত ও বিব্রত আছি। আপনি আজ রাত্রিটা এখানে থেকে যান।
এরপর বিশপ আব্বেকে ডেকে বলে দিলেন, দেখবেন এর যেন কোনও অসুবিধা হয়। উইলেম অরেলিয়ার কাগজপত্র সব দিয়ে দিল।
শোবার সময় পোশাক ছাড়তে গিয়ে দেখল তার পুঁটলির কাপড়চোপড়ের সঙ্গে সেই ওড়নাটা ভরে দিয়েছে মিগনন; সেটার এক প্রান্তে লেখা ছিল, পালাও যুবক, পালাও। লেখাটা পড়ে উইলেমের মনে হলো কোথায় কার কাছে পালাবে সে। তার মনে হলো একথা না বলে বলা উচিত ছিল, নিজের কাছে ফিরে যাও।
রাত্রিতে একটা স্বপ্ন দেখল উইলেম। সে স্বপ্নে মেরিয়ানা আর অরেলিয়া দুজনকেই দেখল।
