আমার পক্ষে। নার্সিস বলল, তার স্ত্রী হিসাবে আমার কোন গোঁড়া মতবাদ পোষণ করা চলবে না। অর্থাৎ তার মতে চলতে হবে। আমার নিজের মত সব ব্যাপারে জাহির করা চলবে না। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে জানিয়ে দিলাম আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। নার্সিস তখন বিদায় নিল আমার কাছ থেকে চিরদিনের জন্য। পরে বিয়ে হয় ওর। সুখে ঘর-সংসার করতে থাকে। আমার কাছেও বিয়ের জন্য অনেক ভালো ভালো। প্রস্তাব আসতে লাগল। কিন্তু আমি কিছু ঠিক করতে পারলাম না।
তবে নার্সিসকে হারিয়ে আমি যেন এই মাটির পৃথিবীতে ফিরে এলাম। মহৎ প্রেমের বায়বীয় ভাবাদর্শটা কেমন উবে গেল মুহূর্তে। আমি আমার বেশভূষা ও পোশাক-আশাকের দিকে মন দিলাম। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেলা করতে লাগলাম।
এই সময় আমাদের বাড়িতে আমার বাবার এক খুড়তুতো ভাই যাতায়াত শুরু করলেন। তিনি আমাদের বাড়ি আগে বিশেষ আসতেন না। বহুদিন তাঁকে দেখিনি। তিনি তার মার একমাত্র সন্তান। ভবিষ্যতে সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন তিনি। বর্তমানেও তাকে কোনো চাকরি করতে হয় না। কিন্তু আমার বাবাকে চাকরির মাইনেটার উপর নির্ভর করতে হয়।
কাকাকে আসা-যাওয়া করতে দেখে আমাদের বাড়ির কেউ কেউ মনে করল, তিনি আর বিয়ে-থা করবেন না। তিনি বিয়ে করেছিলেন কিন্তু তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান। মারা যায়। তারপর থেকে তিনি আর বিয়ে করেননি। তাই সবাই ভাবল আর যদি কাকা বিয়ে না করেন তাহলে তার প্রচুর বিষয়সম্পত্তি সব আমাদের দান করে যাবেন।
কিন্তু কাকা এবার তার আসল উদ্দেশ্যটা বললেন। তিনি বললেন, আমার ছোট্ট বোনটাকে তিনি তাঁর ঠিক করা এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। পাত্রটি ভালো। ভবিষ্যতে তিনিই তাদের দেখাশোনা করবেন। আর পাশের গ্রামে একটা চার্চে আমার একটা চাকরি ঠিক করেছেন। যা হোক কিছু করে নিয়মিত মাইনে পেয়ে যাব।
কাকার পছন্দ করা পাত্রকে আমার ছোট বোনের ঠিক পছন্দ না হলেও কাকার মুখের উপর কথা বলতে পারলাম না। সুতরাং বিয়ে হলো। আমিও চাকরি করতে লাগলাম। কিন্তু আমার শরীরে সহ্য হলো না। অসময়ে খাওয়া-দাওয়া, অত্যধিক হাঁটাহাঁটি এ সব সহ্য হলো না আমার শরীরে। আমি ক্রমশই ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলাম। আমার শরীর ভেঙে গেল।
বিপদের উপর বিপদ। আমার মা এক দুরারোগ্য রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। পাঁচ বছর পর মারা গেলেন। আমার বাবাও সঙ্গে সঙ্গে শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। স্বাভাবিকভাবে এই পারিবারিক অশান্তির জন্য আমার মন-মেজাজ দারুণ খারাপ হয়ে উঠল।
অন্ধকারের মাঝে আবার এক আলোকরশ্মি দেখতে পেলাম আমি। কতখানি নির্ভরযোগ্য সে আলো তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না। তবু সে আলোকে গ্রহণ না করে পারলাম না। এই সময় ফিলো নামে এক মধ্যবয়সী বিশিষ্ট ভদ্রলোক আমাদের পাড়াতে কিছু সম্পত্তি কিনে বাস করতে লাগলেন। আমরা পরিচিত হয়ে উঠলাম পরস্পরের সঙ্গে। তিনি আমার উপর বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। নার্সিসের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকলেও ফিলো তার থেকে আরও প্রাণখোলা এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন।
যদিও আমি ঈশ্বরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম তথাপি রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে এটা বেশ বুঝতে পারলাম যে একমাত্র মৃত্যুর পর ছাড়া ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন সম্ভব নয়। মাটির পৃথিবীতে থাকতে হলে রক্তমাংসের মানুষ চাই। নার্সিসকে ভালোবেসে যে ভুল করেছিলাম আবার সেই ভুল করে বসলাম আমি। আমি ফিলোকেও ভালোবেসে ফেললাম। দিনে দিনে সে ভালবাসা বেড়ে যেতে লাগল। আমি আমার এক ভালোবাসার অনুভূতিটাকে নিজেই ঘৃণা করতে লাগলাম। তবু সে অনুভূতিটাকে দূর করতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম মানবজীবনের এক শাশ্বত দুর্বলতার ফাঁদে ধরা পড়ে গেছি আমি। এ থেকে পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই। আমার রুগ্ন বাবাকে রোজ দেখতে আসত ফিলো। কাকাও তাকে ভালোবাসতেন।
কাকা এবার আমার ছোট বোনের বিয়ের দিন ঠিক করলেন। বিরাট জাঁকজমকের ব্যবস্থা করলেন। বিয়ের সময় আমি ফিলোর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ফিলো আমাকে চুপিচুপি বলল, কোনও বিয়ের সময় বরকনের হাতে হাত দেখলেই আমার সর্বাঙ্গে যেন আগুনের এক ঢেউ খেলে যায়।
কাকা আমার যে বোনের বিয়ের উপলক্ষে সবাইকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে গেলেন। আমরা কাকার বাড়িতে দিনকতক থেকে গেলাম বিয়ে উপলক্ষে। আমার বোনর বিয়ে হয়ে গেল। সেখানে এক ডাক্তারের সঙ্গে পরিচয় হলো আমাদের। কাকার প্রাসাদোপম বাড়িতে কিছু ভালো ছবি ছিল। আমি তা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।
কাকা আমার যে বোনের বিয়ে দিলেন তাকে একটা গ্রাম্য এস্টেট দিয়েছিলেন। জমিজমা ঘরবাড়ি সব ছিল তাতে। বিয়ের পর আমার বোন সেখানে চলে গেল।
এরপরেই শুরু হলো দুঃখের পালা। আমার অসুখ বেড়ে গেল। আমার এক বোনের বিয়ে হলেও আর এক অবিবাহিত বোন ছিল বাড়িতে। তার স্বাস্থ্য ছিল ভালো। আমি যখন রুগ্ন বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, আমার বোন সংসারের কাজকর্ম করত। হঠাৎ তার হৃদরোগ দেখা দিল। তিন সপ্তাহ ভোগার পর মারা গেল সে। শোকে-দুঃখে বাবার রোগ যেন আরও বেড়ে গেল।
আমার বিবাহিত বোন সন্তানসম্ভবা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তার প্রসবব্যথা দেখা দিল। বাবা অসুস্থ শরীরেই বোনকে দেখতে গেলেন আমাকে নিয়ে। তিনি বললেন, হয়ত শেষ বয়সে আমাকে সব সন্তানই হারাতে হবে।
