ঠিক এই সময় একদিন বাবা তাঁর এক পরিচিত যুবককে বাড়িতে নিয়ে এলেন। যুবকটি ভালো চাকরি করত বৈদেশিক বিভাগে। এক সান্ধ্য আড্ডায় তার সঙ্গে রোজ দেখা হতো বাবার। সেইখানেই আলাপ। তার কথাবার্তা ও আচরণ বেশি মিষ্টি লাগল আমার। বাবাও তার প্রায়ই প্রশংসা করতেন। একদিনকার এক ঘটনায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম আমরা দুজনে। যুবকটির নাম ছিল নার্সিস।
একদিন কোনো এক বাড়িতে এক সান্ধ্য ভোজসভায় আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। এই ধরনের ভোজসভায় আমার যেতে মোটেই মন সরত না। আমাদের সমাজে লোকদের মোটেই ভালো লাগত না আমার। কারণ তাদের মধ্যে কোনও সংস্কৃতিবোধ ছিল না। বিজ্ঞান বা কলাবিদ্যা কোনওটার প্রতিই ঝোঁক ছিল না তাদের। তারা শুধু পশুর মতো খেতে আর ফুর্তি করতে জানত। হৈ-হুঁল্লোড় করে আমোদ-আহ্লাদের প্রতি তাদের প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমার নিজের সমাজের প্রতি অনীহার যে ফাঁক বা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল আমার মনে নার্সিস তা পূরণ করে দিয়েছিল।
আমার বোনরা গেলেও এই সান্ধ্য ভোজের আসরে আমি গেলাম না। কিন্তু যখন শুনলাম নার্সিসও সেখানে নিমন্ত্রিত হয়েছে এবং যাবে তখন না গিয়ে পারলাম না। গিয়ে দেখি সবাই খুব মদ্যপান করছে। ফরফিট’ খেলা চলছে। ওই খেলায় হারলেই তাকে জরিমানা দিতে হয়। নার্সিস হারলে তার জরিমানা স্বরূপ একটা শাস্তি দেওয়া হয় তাকে। সে উপস্থিত প্রত্যেকের কানে কানে একটা করে মিষ্টি কথা বলে বেড়াবে। নার্সিস তাই করতে শুরু করে দিল। কোনও এক ক্যাপ্টেনের এক সুন্দরী স্ত্রী ছিল। সেই মহিলার কানে মিষ্টি কথা বলতে গিয়ে অনেকক্ষণ তার গা ঘেঁষে কানে মুখটা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নার্সিস। এতে তার স্বামী ক্যাপ্টেন খুব রেগে গেল। রেগে গিয়ে এক ঘুষি মেরে দিল নার্সিসকে। তারপর দুজনেই তারবারি বার করল খাপ থেকে। কিন্তু নার্সিস তা বার করার আগেই ক্যাপ্টেন তার পিঠে, মাথায় ও হাতে তরবারির ঘা বসিয়ে দিল। নার্সিসের গা থেকে রক্ত পড়তে লাগল। তাকে নিয়ে আমি সেই বাড়িরই একটা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। ক্যাপ্টেনকে ওরা শান্ত করল। তারপর ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে দিল নার্সিসকে। কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ল সে। তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। আঘাতের জন্য জ্বর এসে গেল।
কথাটা শুনে আমার বাবা খুব রেগে গেলেন। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ডুয়েল লড়ে তাকে আহত করলেন। এদিকে নার্সিস সেরে উঠতে মাস দুই লাগল। সেরে উঠতেই আমাদের বাড়ি এসে প্রথমে আমাকে ধন্যবাদ জানাল যেন আমিই তার একমাত্র উদ্ধারকারিণী।
এরপর থেকে প্রায়ই সে আমাকে তার প্রেমের কিছু কিছু নিদর্শন পাঠাত। মাঝে মাঝে আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হতো। তবে আমাদের মেলামেলার মধ্যে কোনও উত্তাপ বা উচ্ছ্বাস ছিল না। আমি আমার মনের কথা কারও কাছে বলতে পারতাম না। স্বভাবতই এই সময় প্রায়ই ঈশ্বরের কথা ভাবতাম। আমার স্বাস্থ্য ও দেহগত কান্তি ফিরে পাওয়ার জন্য প্রায়ই ধন্যবাদ জানাতাম তাকে।
বসন্তকাল আসতেই একদিন খবর না দিয়ে হঠাৎ আমার কাছে এসে হাজিল হলো নার্সিস। আমি তখন আমার ঘরে একা ছিলাম। সে এল এবার পূর্ণ প্রেমিকের বেশে। আমাদের ভালোবাসাবাসির ব্যাপারে সে খোলাখুলিভাবে আমার মত চাইল।
তার প্রতি আমার কিছুটা শ্রদ্ধা ও আসক্তি থাকলেও তাকে আমার সম্পূর্ণরপে নির্ভরযোগ্য বলে মনে হলো না। তবু আমি সরাসরি তাকে প্রত্যাখান না করে আমার বাবা-মার মত নিতে বললাম। সে বাবাকে বুঝিয়ে বলল। বাবা আমার মত চাইলেন। আমি চুপ করে রইলাম।
যাই হোক, এইভাবে আমাদের প্রেম পারিবারিক সমর্থন লাভ করল। কিন্তু আমার অমতে বিয়ে হলো না। নার্সিসকে আমি সত্যিই ভালোবাসতাম। আমার বেশভূষযার সকল পরিপাট্য, আমার নৃত্যের সমস্ত ছন্দ তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। আমি তাকে খুশি করার জন্য এসব করতাম। কোনও ভোজসভায় সে না গেলেও আমিও যেতাম না। তবু দেহ-মনের ব্যবধানটা আমাদের মাঝে সমানেই রয়ে গেল। এতে নার্সিসের অমত ছিল। তা থাকাই স্বাভাবিক। তবু আমার জেদ। দেহসংসর্গহীন কামগন্ধহীন এক মহৎ প্রেমের বায়বীয় ভাবাদর্শে মত্ত হয়ে উঠেছিলাম আমি যেন মনে মনে।
আমি বই পড়তে ভালোবাসতাম। বেশির ভাগ সময় একটা একা থাকতে চাইতাম। নার্সিস প্রায়ই আমার জন্য বিভিন্ন রকমের বই নিয়ে আসত। নানা বিষয় আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করত। আমি কিন্তু আমার মনের কথা বেশি প্রকাশ করতাম না। এই সময় আমাদের পাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এসে বাস করতে থাকে। কোনও কাউন্টের পরিবার। উঁচু মহলে তাদের যোগাযোগ। ক্রমে আমি তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলাম।
সরকারি বিভাগে এক সময় কিছু ভালো পদ খালি হলো। তাতে নার্সিস ঢোকার জন্য অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু পরে দেখা গেল তার থেকে অযোগ্য ব্যক্তি সে পদ পেয়ে গেল। তার সঙ্গে আমিও কিছুটা হতাশ হলাম। তবু তাকে সান্ত্বনা দিলাম।
আমাদের মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে শহরের চারদিকে কথা উঠতে লাগল। আমার সুনাম জড়িয়ে আছে এ কথার মধ্যে। আমি আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলার জন্য চাপ দিলাম নার্সিসের উপর।
কিন্তু নার্সিস স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে ভালো চাকরি না পাওয়া পর্যন্তক আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। তবে চাকরি পেলেই বিয়ে করবে। আমি বাড়িতে জানিয়ে দিলাম আমাদের বিয়ের ব্যাপারে সব ঠিক হয়ে আছে। তার জন্য ভাবতে হবে না। মাস নয়েকের মধ্যে নার্সিস চাকরি পেয়ে গেল। এবার নার্সিস এসে আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করল। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে এমন এক শর্ত জুড়ে দিল যা মানা সম্ভব হলো
